সংবাদ

শুরুতেই হোঁচট খেলো ইস্টার্ন রিফাইনারীর দ্বিতীয় তেল শোধন প্রকল্প


ফয়েজ আহমেদ তুষার
ফয়েজ আহমেদ তুষার
প্রকাশ: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৫ এএম

শুরুতেই হোঁচট খেলো ইস্টার্ন রিফাইনারীর দ্বিতীয় তেল শোধন প্রকল্প
ছ‌বি: সংগৃ‌হিত

  • সক্রিয় ‘দেশি-বিদেশি চক্র’
  • চূড়ান্ত মূল্যায়ন পর্যায়ে পাঁচ প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত তালিকা, দরপত্র বাতিল
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আবারো দীর্ঘসুত্রিতার আশঙ্কা

দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির পরও দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে পারছে না সরকার।

বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে বাধার মুখে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প। কখনো অর্থায়ন, কখনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন পদ্ধতি, আবার কখনো পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে জটিলতায় আটকে যাচ্ছে এর অগ্রগতি।

সর্বশেষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক (পিএমসি) নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে প্রকল্পটি আরও অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে; যা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরোধিতা ও প্রভাবের কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নের উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের এই টানাপোড়েনে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ প্রতিনিয়ত দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিগ্রহ পরিস্থিতির কারণে যেখানে নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা উচিত, সেখানে উদ্যোগ নেওয়ার পরও পিছিয়ে গেল প্রকল্পটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নে নতুন করে উদ্যোগ শুরু হলেও শুরুতেই আবার বাধার মুখে পড়েছে। গত ১৯ অক্টোবর পিএমসি নিয়োগের চলমান আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম শুরুতেই বড় ধরনের হোঁচট খেল।

জ্বালানি বিভাগের উপসচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে চলমান আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়েছে। একই সঙ্গে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণ করে নতুন করে রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (আরইওআই) আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিএমসি নিয়োগের বিদ্যমান কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পিপিআর-২০২৫ অনুসরণ করে গঠিত কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখার পরও কেন পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হলো?

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অধিকতর স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের স্বার্থে আপাতত পরামর্শক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তবে শিগগিরই নতুন করে দরপত্র ডাকা হবে।" প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফিলতি বা অদক্ষতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সেই বিষয়গুলোও ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে।"

১৩ বছর ধরে ঝুলে আছে প্রকল্প

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) নিয়ন্ত্রণ করে বিপিসি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর ২০১২ সালে বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। বর্তমানে ইআরএলের বার্ষিক ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। এরপর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের (ইআইএল) সঙ্গে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল চুক্তি করে বিপিসি। চুক্তি অনুসারে পরবর্তী বছরের মধ্যেই ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারি ঋণ অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাকি টাকা বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের কথা ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ Shire ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

পিপিপি বিতর্ক ও পুনর্গঠিত ডিপিপি

প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকাকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই সময় শিল্পগ্রুপ এস আলম ও বসুন্ধরা গ্রুপ এটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়। শেষ পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের কাজ পাওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে ইআরএল-২ প্রকল্পটি আবার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি (ডিপার্টমেন্টাল প্রজেক্ট প্রোফাইল) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরে দুই দফা কাটছাঁট করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং বাকি ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহনের কথা বলা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সরকার। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে এর সম্পূর্ণ ব্যয় উঠে আসবে।

পাঁচ প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত তালিকা, দরপত্র বাতিল

প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পিএমসি নিয়োগের জন্য গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। ২০ জুলাই দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে এতে বিভিন্ন দেশের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্র যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য আট সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। বিপিসির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিতে বুয়েট, শিপিং করপোরেশন, বিপিসি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন।

কমিটি থাইল্যান্ডের ফস্টার হুইলার, তুরস্কের বিআরআরসি ইন্ডাস্ট্রিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসটিপি সৌদি টেকনোলজি প্রজেক্ট জেভি, ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়ালসহ পাঁচটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করে। পিপিআর-২০২৫ অনুসারে তৈরি আগ্রহপত্রের শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর রিফাইনারি প্রকল্পে পিএমসি হিসেবে কাজ করার অন্তত ২০ বছরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট সক্ষমতার পূর্বশর্ত পূরণ করেছিল এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই।

এত যাচাই-বাছাইয়ের পরও দরপত্র বাতিলের কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "পিএমসি দরপত্রে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীতে বাদ পড়া একটি বিদেশি কোম্পানি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই নতুন করে দরপত্র ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি।"

বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, আগের আরইওআই ও টিওআর তৈরিতে বুয়েটের অধ্যাপক, পেট্রোবাংলার পরিচালকসহ অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। এখন নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত ছয় মাস বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে, যা প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতাকে আরও বাড়াবে।

কেন দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও ইআরএল-২ প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় এসপিএম-এর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রতি বছর দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে এবং তা আমদানির মাধ্যমেই পূরণ করতে হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আমদানি করে দেশেই পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে, যা দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করবে।

এ ছাড়া এই প্রকল্পে ক্রুড অয়েল ব্লেন্ডিংয়ের সুবিধা থাকায় জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেলে ১৮ থেকে ১৯ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, "দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ইআরএল-২ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন যত দেরি হবে, ততই জ্বালানি তেল আমদানি ও ব্যবসা নিয়ে তাদের ফায়দা লোটার সুযোগ তৈরি হবে।"

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


শুরুতেই হোঁচট খেলো ইস্টার্ন রিফাইনারীর দ্বিতীয় তেল শোধন প্রকল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

  • সক্রিয় ‘দেশি-বিদেশি চক্র’
  • চূড়ান্ত মূল্যায়ন পর্যায়ে পাঁচ প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত তালিকা, দরপত্র বাতিল
  • প্রকল্প বাস্তবায়নে আবারো দীর্ঘসুত্রিতার আশঙ্কা

দীর্ঘদিন ধরে নানা উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির পরও দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে পারছে না সরকার।

বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন পর্যায়ে বাধার মুখে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প। কখনো অর্থায়ন, কখনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন পদ্ধতি, আবার কখনো পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে জটিলতায় আটকে যাচ্ছে এর অগ্রগতি।

সর্বশেষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক (পিএমসি) নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে প্রকল্পটি আরও অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে; যা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরোধিতা ও প্রভাবের কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নের উদ্যোগ। দীর্ঘদিনের এই টানাপোড়েনে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ প্রতিনিয়ত দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিগ্রহ পরিস্থিতির কারণে যেখানে নিজেদের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা উচিত, সেখানে উদ্যোগ নেওয়ার পরও পিছিয়ে গেল প্রকল্পটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নে নতুন করে উদ্যোগ শুরু হলেও শুরুতেই আবার বাধার মুখে পড়েছে। গত ১৯ অক্টোবর পিএমসি নিয়োগের চলমান আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এতে প্রকল্পের পরবর্তী কার্যক্রম শুরুতেই বড় ধরনের হোঁচট খেল।

জ্বালানি বিভাগের উপসচিব দেওয়ান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে চলমান আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করতে হয়েছে। একই সঙ্গে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণ করে নতুন করে রিকোয়েস্ট ফর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (আরইওআই) আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিএমসি নিয়োগের বিদ্যমান কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, পিপিআর-২০২৫ অনুসরণ করে গঠিত কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখার পরও কেন পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হলো?

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে অধিকতর স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের স্বার্থে আপাতত পরামর্শক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। তবে শিগগিরই নতুন করে দরপত্র ডাকা হবে।" প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফিলতি বা অদক্ষতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "সেই বিষয়গুলোও ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে।"

১৩ বছর ধরে ঝুলে আছে প্রকল্প

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) নিয়ন্ত্রণ করে বিপিসি। স্বাধীনতার ৪১ বছর পর ২০১২ সালে বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। বর্তমানে ইআরএলের বার্ষিক ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। এরপর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের (ইআইএল) সঙ্গে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল চুক্তি করে বিপিসি। চুক্তি অনুসারে পরবর্তী বছরের মধ্যেই ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারি ঋণ অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাকি টাকা বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয়ের কথা ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ Shire ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।

পিপিপি বিতর্ক ও পুনর্গঠিত ডিপিপি

প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকাকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই সময় শিল্পগ্রুপ এস আলম ও বসুন্ধরা গ্রুপ এটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়। শেষ পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের কাজ পাওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে ইআরএল-২ প্রকল্পটি আবার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি (ডিপার্টমেন্টাল প্রজেক্ট প্রোফাইল) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। পরে দুই দফা কাটছাঁট করে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ সরকারি ঋণ এবং বাকি ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহনের কথা বলা হয়। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সরকার। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর পাঁচ বছরের মধ্যে এর সম্পূর্ণ ব্যয় উঠে আসবে।

পাঁচ প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত তালিকা, দরপত্র বাতিল

প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পিএমসি নিয়োগের জন্য গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। ২০ জুলাই দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে এতে বিভিন্ন দেশের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্র যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য আট সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। বিপিসির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমিটিতে বুয়েট, শিপিং করপোরেশন, বিপিসি ও ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন।

কমিটি থাইল্যান্ডের ফস্টার হুইলার, তুরস্কের বিআরআরসি ইন্ডাস্ট্রিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড এসটিপি সৌদি টেকনোলজি প্রজেক্ট জেভি, ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়ালসহ পাঁচটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করে। পিপিআর-২০২৫ অনুসারে তৈরি আগ্রহপত্রের শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর রিফাইনারি প্রকল্পে পিএমসি হিসেবে কাজ করার অন্তত ২০ বছরের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট সক্ষমতার পূর্বশর্ত পূরণ করেছিল এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই।

এত যাচাই-বাছাইয়ের পরও দরপত্র বাতিলের কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "পিএমসি দরপত্রে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তীতে বাদ পড়া একটি বিদেশি কোম্পানি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই নতুন করে দরপত্র ডাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি।"

বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, আগের আরইওআই ও টিওআর তৈরিতে বুয়েটের অধ্যাপক, পেট্রোবাংলার পরিচালকসহ অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা যুক্ত ছিলেন। এখন নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত ছয় মাস বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে, যা প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতাকে আরও বাড়াবে।

কেন দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন?

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও ইআরএল-২ প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় এসপিএম-এর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্রতি বছর দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে এবং তা আমদানির মাধ্যমেই পূরণ করতে হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) আমদানি করে দেশেই পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে, যা দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করবে।

এ ছাড়া এই প্রকল্পে ক্রুড অয়েল ব্লেন্ডিংয়ের সুবিধা থাকায় জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি ব্যারেলে ১৮ থেকে ১৯ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, "দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ইআরএল-২ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন যত দেরি হবে, ততই জ্বালানি তেল আমদানি ও ব্যবসা নিয়ে তাদের ফায়দা লোটার সুযোগ তৈরি হবে।"


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত