সংবাদ

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নতুন সংকট!


ফয়েজ আহমেদ তুষার
ফয়েজ আহমেদ তুষার
প্রকাশ: ৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নতুন সংকট!

  • অব্যাহতি চান প্রকল্প পরিচালক

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে আবারও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক (পিডি) এবং সরকারের যুগ্ম সচিব আছমা আরা বেগম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রকল্পটির জন্য আবারও নতুন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় তার এই সরে দাঁড়ানোর আবেদন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিলেও তা একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে।

প্রকল্প পরিচালক তার অব্যাহতির আবেদনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান, তার দুই সন্তান বর্তমানে বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের জন্য মায়ের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য প্রয়োজন। এ অবস্থায় এমন একটি বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও শ্রম দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কারণ জানতে যুগ্ম সচিব আসমা আরা বেগমের মোবাইল ফোনে একাধিক কল করা এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি তিনি।

তার অব্যহতির আবেদনপত্রেও প্রকল্পটির সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ও আন্তরিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হলেও দীর্ঘ ১৭ বছরেও এটি আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা হিসেবে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক। পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বিপিসিতে প্রেষণে যোগদান করেন।

তবে প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদন এই প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। তার আবেদন গৃহীত হলে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য আবারও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

এদিকে প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ প্রকল্পটি একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি প্রকল্প। এই প্রকল্পে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বা অভিজ্ঞ কোনো কর্মকর্তার প্রকল্প পরিচালক হওয়া জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তারা আরও জানান, শুরুতেই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরও সরকার সেটি বাতিল করে। এসব বিষয় নিয়েও মন্ত্রণালয়ের ভেতরে অস্বস্তি রয়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক অব্যাহতি নিলে তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবেন যেন পরবর্তীতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো কর্মকর্তাকে এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়। পরে ২০১২ সালে দৈনিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। কিন্তু ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। একই সঙ্গে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। অথচ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পরও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করলেই এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও স্থিতিশীল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একের পর এক প্রশাসনিক ও বাস্তবায়নগত জটিলতা দূর করা না গেলে ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানো কঠিন হবে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যায়নি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রায় ১৭ বছর অপেক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন গতি পাবে, এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও পরামর্শক নিয়োগে জটিলতা এবং প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদনে সেই প্রত্যাশা আবারও বড় ধাক্কা খেল।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬


ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নতুন সংকট!

প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

  • অব্যাহতি চান প্রকল্প পরিচালক

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে আবারও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক (পিডি) এবং সরকারের যুগ্ম সচিব আছমা আরা বেগম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রকল্পটির জন্য আবারও নতুন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় তার এই সরে দাঁড়ানোর আবেদন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিলেও তা একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে।

প্রকল্প পরিচালক তার অব্যাহতির আবেদনটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানান, তার দুই সন্তান বর্তমানে বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের জন্য মায়ের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য প্রয়োজন। এ অবস্থায় এমন একটি বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও শ্রম দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কারণ জানতে যুগ্ম সচিব আসমা আরা বেগমের মোবাইল ফোনে একাধিক কল করা এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি তিনি।

তার অব্যহতির আবেদনপত্রেও প্রকল্পটির সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা ও আন্তরিকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হলেও দীর্ঘ ১৭ বছরেও এটি আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এরপর ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা হিসেবে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক। পরবর্তীতে গত ২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বিপিসিতে প্রেষণে যোগদান করেন।

তবে প্রকল্পের দায়িত্ব নেওয়ার পরও বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদন এই প্রক্রিয়াকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। তার আবেদন গৃহীত হলে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য আবারও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

এদিকে প্রকল্পটির সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ প্রকল্পটি একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি প্রকল্প। এই প্রকল্পে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বা অভিজ্ঞ কোনো কর্মকর্তার প্রকল্প পরিচালক হওয়া জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তারা আরও জানান, শুরুতেই প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরও সরকার সেটি বাতিল করে। এসব বিষয় নিয়েও মন্ত্রণালয়ের ভেতরে অস্বস্তি রয়েছে।

বিপিসির একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক অব্যাহতি নিলে তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবেন যেন পরবর্তীতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো কর্মকর্তাকে এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়। পরে ২০১২ সালে দৈনিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। কিন্তু ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। একই সঙ্গে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে। অথচ দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদনের পরও প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করলেই এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও স্থিতিশীল প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একের পর এক প্রশাসনিক ও বাস্তবায়নগত জটিলতা দূর করা না গেলে ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানো কঠিন হবে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যায়নি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রকল্প ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রায় ১৭ বছর অপেক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন গতি পাবে, এমন প্রত্যাশা তৈরি হলেও পরামর্শক নিয়োগে জটিলতা এবং প্রকল্প পরিচালকের সরে দাঁড়ানোর আবেদনে সেই প্রত্যাশা আবারও বড় ধাক্কা খেল।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত