প্রথাগত আবেগের পরিচিত সীমানা পেরিয়ে কবিতা যখন মহাকাশের অন্ধকার, বিজ্ঞানের বিস্ময় আর ডিজিটাল জীবনের অনন্ত আলোর দিকে মুখ ফেরায়, তখন চেনা কাব্যভূমির ভেতরেই জন্ম নেয় অন্য এক অনুভবের ভূগোল। শারদুল সজলের “নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ” সেই ভূগোলেরই এক অভিনব মানচিত্র। এখানে দূর নক্ষত্রের আলো এসে মিশে যায় মানুষের একান্ত অন্ধকারে, অ্যালগরিদমের শীতল যুক্তির পাশে জেগে থাকে বুকের গভীর নিঃসঙ্গতা। মহাবিশ্বের বিপুল বিস্তার, সময়ের রহস্য, গণিতের নিখুঁত হিসাব, প্রযুক্তির বিচিত্র শব্দ আর মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা একে অন্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই কবিতাগুলোয় নির্মাণ করে এক অনন্য জগৎ। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ শুধু প্রযুক্তি ও মহাকাশের কবিতা নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতেরও এক অনুসন্ধান। দূর নক্ষত্রের দিকে তাকাতে তাকাতে মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতার কাছেই ফিরে আসে।
উৎসর্গপত্রেই কবি নিজের মেজাজ জানিয়ে দেন। একার সন্ন্যাসের কবি জীবনানন্দ দাশকে লেখা সেই উৎসর্গে কবিতা কোনো হরিণ নয়, যাকে দল বেঁধে ছুটে গিয়ে শিকার করতে হবে। কবিতা এখানে নির্জনে ডুবে থাকা এক নিঃসঙ্গ নরক। তার কোনো সভা নেই, সমিতি নেই, নেই কোনো জনারণ্যের উল্লাস। আছে শুধু ভোগবিদ্ধ একার সন্ন্যাস। এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই সজলের কবিতার অন্তর্গত আবহ যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোলাহলে ভরা আধুনিক জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়েও তিনি নির্মাণ করেন এক গভীর একাকিত্বের মহাবিশ্ব। সেই মহাবিশ্বে মানুষ ক্ষণিকের এক মহাজাগতিক ধূলিকণা। আর নরক কোনো দূরবর্তী অন্ধকার নয়, মানুষের প্রতিদিনের যাপনের মধ্যেই তার নীরব উপস্থিতি।
সূচিপত্র বলছে, বইটি তিন ভাগে সাজানো। প্রথম ভাগের নাম ‘নক্ষত্রের অ্যালগরিদম ও শূন্যের শুরু’। মাঝের ভাগ ‘দেশ, ধর্ম ও ঈশ্বরের ছাই’। শেষ ভাগ ‘ম্যাগমা, পৃথিবী ও অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু’। তিনটি শিরোনাম পাশাপাশি রাখলেই বইয়ের পথচলা ধরা পড়ে। কবি আকাশ থেকে শুরু করেন, সমাজ আর বিশ্বাসের ভেতর দিয়ে হাঁটেন, শেষে মাটির নিচের গলিত আগুনে নেমে আসেন।
তবে এই বইয়ের সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যটি তার বিষয়ের তালিকায় নয়, বৈজ্ঞানিক ধারণাকে কবিতার ভাষায় রূপান্তর করার পদ্ধতিতে। বিজ্ঞানের শব্দ এখানে নিছক চমক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। ডার্ক এনার্জি, অ্যান্টিগ্রাভিটি, সিঙ্গুলারিটি, সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম, ব্ল্যাকহোল, মহাবিশ্বের বিস্তার কিংবা সংখ্যার হিসাব কবির কাছে মানুষের প্রেম, একাকিত্ব, অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ ভাবার নতুন উপমা। ফলে বিজ্ঞান এখানে কবিতার বাইরের কোনো জগৎ নয়। সেটিই কবিতার ভেতরের একটি ভাষা।
প্রথম কবিতা ‘অ্যান্টিগ্রাভিটি’ যেন মহাবিশ্বের ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার এক দৃশ্য দিয়ে তার দরজা খোলে। মহাবিশ্বের দূরত্ব বাড়তে থাকে, প্রেমিকাও প্রতি মুহূর্তে এক পারসেক করে সরে যান। ডার্ক এনার্জি এখানে শুধু মহাজাগতিক বিচ্ছিন্নতার শক্তি নয়, সবকিছুকে দূরে ঠেলে দেওয়া এক অনন্ত মোহের প্রতীক। তারপর হঠাৎ বদলে যায় কবিতার সুর। কবি লেখেন, “মাল্টিভার্সের বাইরে/ যেখানে জড়ো হই আমরা— খণ্ড খণ্ড হয়ে/ অর্গানিক মনের বহুতল ভবনে/ ভালোবাসা একধরনের অ্যান্টিগ্রাভিটি/ যা মানুষকে ভাসিয়ে রাখে/ যতক্ষণ না তার ছায়া শূন্যে ওড়ে”। বিজ্ঞানের শুষ্ক সমীকরণ তখন আর শুষ্ক থাকে না। তার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় মানুষের গভীর, জলজ আবেগ। ভালোবাসা যেন মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে উঠে যাওয়ার এক গোপন শক্তি। তবু সেই উড্ডয়নেরও শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে শূন্যতা। কবি জানেন, মানুষ যত দূরেই ভেসে যাক, তার ছায়া শেষ পর্যন্ত সেই শূন্যতার দিকেই উড়ে যায়।
‘ভগ্নাংশ’ কবিতায় গণিতের ভাষা আরও সরাসরি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। কবি মানুষকে ভগ্নাংশ আর দশমিকে মিলিয়ে দেখেন। “মানুষ মূলত— ভগ্নাংশ, দশমিক/ কিংবা ভুল টাইপ করা সাপলুডু প্রাণী”। কারও শৈশব কাটা গেছে ভাগচিহ্নে, কারও মুখে লেগে আছে শূন্যের মতো ঠাণ্ডা আলো। সংখ্যার এই ভাষা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অসম্পূর্ণতার ভাষা হয়ে ওঠে। এই কবিতাতেই বইয়ের শিরোনামের আংশিক উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। গভীর রাতে নরকের ওয়াই-ফাই কানেক্ট হলে কবি যেন মৃত আত্মাদের মেসেজ পান। জীবন তখন রূপ নেয় “নিজেরই মাথা খেয়ে বড়ো হওয়া নরক”-এ।
‘অন্ধকার বিন্দু’ কবিতায় কবি যন্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করান মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তাকে। “আমি সফটওয়্যার নই, অন্ধকার বিন্দুর আত্মা রিয়েলিটি/ সৃষ্টিশীল এক হিউম্যান-সিঙ্গুলারিটি” উচ্চারণে মানুষ যেন তার নিজের অদৃশ্য কেন্দ্রটিকে খুঁজে পায়। ‘ওভ ঞবিহঃু ড়হব, ডযু হড়ঃ ঙহবঃু ড়হব?’ কবিতায় ইংরেজি সংখ্যার নাম নিয়ে খেলতে খেলতে কবি পৌঁছে যান আরও গভীর এক মানবিক সত্যে। “১০ আঙুলে মানুষ প্রযুক্তি বানায়,/ কিন্তু নিজের ১ ফোঁটা কান্নার সফটওয়্যার ঠিক করতে পারে না”। প্রযুক্তির বিপুল সামর্থ্যের সামনে মানুষের এই এক ফোঁটা কান্নাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে দুর্বোধ্য বাস্তবতা।
এইখানেই বইটির বিজ্ঞানভিত্তিক কবিতার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়। কবি প্রযুক্তিকে অস্বীকার করেন না, তার কাছে আত্মসমর্পণও করেন না। প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতির পাশে তিনি রেখে দেন মানুষের সেই অন্তর্গত অঞ্চলটির প্রশ্ন, যেখানে কোনো অ্যালগরিদমের আলো এখনো পৌঁছায়নি। মানুষ সফটওয়্যার বানাতে পারে, পৃথিবীর জটিলতা হিসাব করতে পারে, অথচ নিজের কান্নার ভাষা তার কাছেই থেকে যায় অজানা। অ্যালগরিদম যত নিখুঁত হয়, মানুষের একাকিত্ব ততই যেন তার হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
প্রেমের ক্ষেত্রেও কবির দৃষ্টি প্রসারিত বহুদূর। ‘ইউনিভার্সের বাইরে’ কবিতায় তিনি এক অসীম ক্ষমতাবান সত্তার মতো পৃথিবীকে পকেটে নিয়ে হাঁটেন। কোটি কোটি ভূমিকম্প আর গ্রহের সংঘর্ষ গিলে ফেলার পর তিনি দেখেন, হাতের তালুতে থাকা পৃথিবীটা একখণ্ড ছেঁড়া কাগজের মতো পড়ে আছে। এরপর রৌরব ভেঙে প্রেমিকার নামে এক প্রেমগাছ বোনার মধ্য দিয়ে কবিতাটি পরিণতি পায়। ‘পৃথিবী ১টা কামড়ে খাওয়া আপেল’ কবিতায় প্রেমের তীব্রতা আরও এক ধাপ উঁচুতে পৌঁছায়। মস্তিষ্কজুড়ে ছুটে চলা একক ছায়ার চোখে পৃথিবী হয়ে ওঠে এক কামড়ে খাওয়া তুচ্ছ আপেল। মহাবিশ্বের আকার এখানে প্রেমের আকারকে বড় করে তোলে।
তবে শারদুল সজল শুধু দূর গ্রহের বাসিন্দা নন। পৃথিবীর ধুলো, স্মৃতি আর শেকড়ের টানও তাঁর কবিতায় প্রবল। ‘মা এক পুরোনো রেডিও’ কবিতায় মায়ের কণ্ঠ পুরোনো রেডিও তরঙ্গ হয়ে ভেসে আসে। কোটি কোটি আলোকবর্ষের হিসাব শেষে এসে থামে একটি ছোট্ট প্রশ্নে। “ভাত খেয়েছিস?” মহাজাগতিক দূরত্ব পেরিয়ে মায়ের এই প্রশ্নটি আবার ঘরের ভেতরে ফিরিয়ে আনে কবিতাকে। প্রযুক্তির রূপক এখানে আড়াল হয়ে দাঁড়ায় না, আলোর কাজ করে। ‘অঙ্ক বই’, ‘জন্মসড়ক’ ও ‘এ ভাষা আমার’ কবিতাতেও শেকড়, শৈশব, স্মৃতি ও মাতৃভাষার পৃথিবী ফিরে আসে।
জীবনের পাশে মৃত্যু নিয়েও কবির একটি নিজস্ব, শান্ত দৃষ্টি আছে। ‘মৃত্যু মানে ভ্রমণে বের হওয়া’ কবিতায় মৃত্যু একটি অণুজীবের মতো দেহের কোষে চুপচাপ বসে থাকে। শেষে সেই ভয়ের ছায়া সরে যায়। মৃত্যু হয়ে ওঠে ভ্রমণ। ‘কবির মৃত্যু’ কবিতায় স্রষ্টা আত্মাদের ডেকে জানতে চান, তারা কারা। উত্তর আসে, ‘কবি’। প্রতিটি আত্মার ভেতরে কয়েকশ পৃথিবীকে ডুবে থাকতে দেখেন তিনি। বিজ্ঞানের ভাষা, মহাজাগতিক কল্পনা ও কবির আত্মপরিচয় এখানে একই জায়গায় এসে মিশে যায়।
মহাজাগতিক ভাবনার পাশে পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতাও তীব্র এই গ্রন্থে। ‘ফিলিস্তিনির শিশু’ কবিতায় যুদ্ধের ভেতর জন্ম নেওয়া একটি শিশুর পৃথিবী প্রথাগত শৈশবের বিপরীত। তার বাবা তাকে শেখান কীভাবে পাথরের সুড়ঙ্গে লুকাতে হয়, কীভাবে অল্প জল ভাগ করে খেতে হয়। তার কাছে “মৃত্যু আমাদের ক্লাস টিচার”। ‘নরকের ডর-ভর’ কবিতায় সেই যুদ্ধ আরও বড় ক্যানভাসে ধরা পড়ে। স্রষ্টা মানুষকে প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু মানুষ সেই কবিতা পুনর্লিখিত করে প্রেমের বদলে রক্ত লিখেছে। ভবিষ্যতের কোনো গবেষণায় ভিনগ্রহীরা জানবে, পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের প্রথম ডিলিটেড প্রজেক্ট ফাইল। প্রযুক্তির এই ভাষাই এখানে সভ্যতার আত্মধ্বংসের ভাষা হয়ে ওঠে।
ধর্ম আর বিশ্বাসের প্রশ্নেও কবি সরব। ‘আমি, শংকর ও মাহিন’ কবিতায় শৈশবের বন্ধুত্ব একদিন ধর্মীয় পরিচয়ের বিভাজনে ভেঙে যায়। বন্ধু আর বন্ধু থাকে না, হিন্দু ও মুসলিম হয়ে যায়। কবি থেকে যান মাঝখানে। ‘এই ধর্ম ও রাষ্ট্র দিয়ে আমি কী করব?’ কবিতায় ব্যক্তিগত ভালোবাসার সামনে ধর্ম ও রাষ্ট্রের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ‘বিশ্বাস’ কবিতায় ঈশ্বরকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখার কল্পনাও আসে। এই কবিতাগুলো বইয়ের আরেকটি স্তর খুলে দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষায় যে প্রশ্ন মানুষকে মহাবিশ্বের সামনে দাঁড় করায়, একই প্রশ্ন ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভাষায় তাকে নিজের সমাজের সামনে দাঁড় করায়।
শারদুল সজলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দৃশ্যকল্প এবং দুটি দূরবর্তী জগতকে একই সুতোয় গাঁথার দক্ষতা। ‘মঙ্গল গ্রহে সবজিচাষ’ কবিতায় তিনি মঙ্গলে আলু চাষ করেন। প্রতিটি আলুর গায়ে জন্মায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। শিশুরা সেই দেশগুলো পকেটে ভরে খেলে, মার্বেলের মতো ছুড়ে মারে এদিক-ওদিক। কয়েকটি লাইনে সীমান্তের রাজনীতি শিশুর হাতের খেলনা হয়ে যায়। ‘বৈদ্যুতিক টেবিলে নিকোলা টেসলা ও শারদুল সজলের চা-সংলাপ’ কবিতায় অঙ্কের হিসাব, সক্রেটিসের প্রশ্ন আর ঈশ্বরের সাপলুডু খেলা একই টেবিলে ভিড় করে। শেষে “বৈদ্যুতিক চায়ে টগবগ করে সিদ্ধ হচ্ছে কয়েকশ ভবিষ্যৎ”। বইয়ের নাম তখন আর শুধু একটি কাব্যিক শব্দবন্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে কবির কল্পনার একটি প্রতীকী কেন্দ্র।
‘চাঁদছুরি’তে রসবোধ আরও উদ্ভট হয়ে ওঠে। কবি নিজেকে খুন করতে যে ভাড়াটে খুনিকে ঠিক করেছিলেন, সে চাঁদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজেকেই খুন করার জন্য ভাড়াটে খোঁজে। আর ‘অন্ধকার’ কবিতায় ব্ল্যাকহোলের চেয়েও মানুষের বুকের অন্ধকারকে গভীর বলা হয়। “মানুষের বুকের অন্ধকার থেকে/ নিরেট কোনো অন্ধকার নেই পৃথিবীতে”। মহাজাগতিক অন্ধকার শেষপর্যন্ত মানুষের ভেতরের অন্ধকারের কাছে এসে ছোট হয়ে যায়। এই উল্টো করে দেওয়াই কবির দৃশ্যকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এত সম্ভাবনার মাঝেও আমার পাঠে একটি ছোট্ট চাওয়া থেকে যায়। এটি অবশ্যই ব্যক্তিগত পাঠ-ব্যাখ্যা। বৈজ্ঞানিক শব্দ বইজুড়ে বারবার ফিরে আসে। কোথাও কোথাও সেগুলো আবেগের একটু আগে হেঁটে যায়। অথচ কবির নিজের কবিতাতেই এর আরও শক্তিশালী সমাধানের নমুনা আছে। ‘যেখানে সন্ধ্যা সেদ্ধ হয়’ কবিতায় যে নক্ষত্রের আলো আজও পৃথিবীতে পৌঁছায়নি, পরের লাইনেই সেই রূপক নেমে আসে শাহবাগে চা বানানো কেতলির বাষ্পীভূত ধোঁয়ায়। আকাশ আর মাটির এই মিলন কবির সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর একটি। দূরের নক্ষত্র আর ঘরের চায়ের কাপ যখন একই অনুভূতির মধ্যে এসে দাঁড়ায়, তখন বৈজ্ঞানিক শব্দ আর আলাদা কোনো শব্দভাণ্ডার থাকে না। তারা হয়ে ওঠে কবিতারই স্বাভাবিক ভাষা।
নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ তাই শুধু বিজ্ঞান নিয়ে লেখা কবিতার বই নয়। এর বিশেষত্ব হলো, বিজ্ঞানকে কবি মানুষের পুরোনো প্রশ্নগুলোর সামনে নতুন আয়না হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রেম এখানে মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে দাঁড়ায়। মানুষ হয়ে যায় ভগ্নাংশ। কান্নারও যেন একটি সফটওয়্যার দরকার হয়। মা হয়ে ওঠেন রেডিও তরঙ্গ। মৃত্যু হয়ে ওঠে ভ্রমণ। পৃথিবী হয়ে যায় মহাবিশ্বের একটি ডিলিটেড প্রজেক্ট ফাইল। আর ভবিষ্যৎ কখনো নক্ষত্রের ভেতর নয়, মানুষের নিজের মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
শেষ কবিতা ‘আমি’তে কবি লিখেছেন, আগামী ভোরে জেগে ওঠা সেই আমির মুখ ফসকে বেরিয়ে আসবে কয়েকশ ভবিষ্যৎ। তারপর তিনবার ‘আমি’ উচ্চারণ করে শেষ হয় বই। মনে হয়, নক্ষত্রের ওপার থেকে কেউ যেন অন্ধকার ভেদ করে নিজের নাম ধরে ডাকছে। শারদুল সজলের কবিতায় তাই দূর আকাশের আলো আর ঘরের জানালা একই সঙ্গে জেগে থাকে। একদিকে মহাবিশ্বের অসীম বিস্তার, অন্যদিকে মানুষের একান্ত ঘর, তার নিঃসঙ্গতা, তার প্রতিদিনের জীবন। এই দুই দূর প্রান্তকে একই কবিতার আকাশে ধরে রাখার চেষ্টাতেই নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ খুঁজে পায় তার নিজস্ব কাব্যিক স্বর।
এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার আলাদা হিসাব মেলাতে গেলে হয়তো তার ভেতরের সেই বৃহৎ সুরটি আড়ালে থেকে যায়। বরং অনুসরণ করা যায় তার নিজস্ব পথটি। সেই পথে নক্ষত্র আছে, অ্যালগরিদম আছে, অন্ধকার আছে। আছে মানুষের বুকের উষ্ণতাও। সেখানে মহাকাশের অসীমতা যেমন আছে, তেমনি আছে শাহবাগের চায়ের কেতলিতে ফুটতে থাকা একেবারে কাছের পৃথিবী। দূর নক্ষত্র থেকে শহরের চায়ের দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথেই কবি মাপতে চান মানুষের দূরত্ব, তার একাকিত্ব, তার ভবিষ্যৎ। আর সেই পথের এক প্রান্তে কয়েকশ ভবিষ্যতের দরজা খুলে যায়। অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন নিঃসঙ্গ কবি, যার হাতে কবিতা ছাড়া আর কোনো মানচিত্র নেই।
নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ। শারদুল সজল। প্রকাশক: অনুপ্রাণন প্রকাশন। প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। পৃষ্ঠা: ৬৪। মূল্য: ২৪০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রথাগত আবেগের পরিচিত সীমানা পেরিয়ে কবিতা যখন মহাকাশের অন্ধকার, বিজ্ঞানের বিস্ময় আর ডিজিটাল জীবনের অনন্ত আলোর দিকে মুখ ফেরায়, তখন চেনা কাব্যভূমির ভেতরেই জন্ম নেয় অন্য এক অনুভবের ভূগোল। শারদুল সজলের “নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ” সেই ভূগোলেরই এক অভিনব মানচিত্র। এখানে দূর নক্ষত্রের আলো এসে মিশে যায় মানুষের একান্ত অন্ধকারে, অ্যালগরিদমের শীতল যুক্তির পাশে জেগে থাকে বুকের গভীর নিঃসঙ্গতা। মহাবিশ্বের বিপুল বিস্তার, সময়ের রহস্য, গণিতের নিখুঁত হিসাব, প্রযুক্তির বিচিত্র শব্দ আর মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা একে অন্যের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই কবিতাগুলোয় নির্মাণ করে এক অনন্য জগৎ। অনুপ্রাণন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ শুধু প্রযুক্তি ও মহাকাশের কবিতা নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতেরও এক অনুসন্ধান। দূর নক্ষত্রের দিকে তাকাতে তাকাতে মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতার কাছেই ফিরে আসে।
উৎসর্গপত্রেই কবি নিজের মেজাজ জানিয়ে দেন। একার সন্ন্যাসের কবি জীবনানন্দ দাশকে লেখা সেই উৎসর্গে কবিতা কোনো হরিণ নয়, যাকে দল বেঁধে ছুটে গিয়ে শিকার করতে হবে। কবিতা এখানে নির্জনে ডুবে থাকা এক নিঃসঙ্গ নরক। তার কোনো সভা নেই, সমিতি নেই, নেই কোনো জনারণ্যের উল্লাস। আছে শুধু ভোগবিদ্ধ একার সন্ন্যাস। এই কয়েকটি পঙ্ক্তিতেই সজলের কবিতার অন্তর্গত আবহ যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোলাহলে ভরা আধুনিক জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়েও তিনি নির্মাণ করেন এক গভীর একাকিত্বের মহাবিশ্ব। সেই মহাবিশ্বে মানুষ ক্ষণিকের এক মহাজাগতিক ধূলিকণা। আর নরক কোনো দূরবর্তী অন্ধকার নয়, মানুষের প্রতিদিনের যাপনের মধ্যেই তার নীরব উপস্থিতি।
সূচিপত্র বলছে, বইটি তিন ভাগে সাজানো। প্রথম ভাগের নাম ‘নক্ষত্রের অ্যালগরিদম ও শূন্যের শুরু’। মাঝের ভাগ ‘দেশ, ধর্ম ও ঈশ্বরের ছাই’। শেষ ভাগ ‘ম্যাগমা, পৃথিবী ও অস্তিত্বের ছেঁড়া স্নায়ু’। তিনটি শিরোনাম পাশাপাশি রাখলেই বইয়ের পথচলা ধরা পড়ে। কবি আকাশ থেকে শুরু করেন, সমাজ আর বিশ্বাসের ভেতর দিয়ে হাঁটেন, শেষে মাটির নিচের গলিত আগুনে নেমে আসেন।
তবে এই বইয়ের সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্যটি তার বিষয়ের তালিকায় নয়, বৈজ্ঞানিক ধারণাকে কবিতার ভাষায় রূপান্তর করার পদ্ধতিতে। বিজ্ঞানের শব্দ এখানে নিছক চমক দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। ডার্ক এনার্জি, অ্যান্টিগ্রাভিটি, সিঙ্গুলারিটি, সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম, ব্ল্যাকহোল, মহাবিশ্বের বিস্তার কিংবা সংখ্যার হিসাব কবির কাছে মানুষের প্রেম, একাকিত্ব, অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ ভাবার নতুন উপমা। ফলে বিজ্ঞান এখানে কবিতার বাইরের কোনো জগৎ নয়। সেটিই কবিতার ভেতরের একটি ভাষা।
প্রথম কবিতা ‘অ্যান্টিগ্রাভিটি’ যেন মহাবিশ্বের ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার এক দৃশ্য দিয়ে তার দরজা খোলে। মহাবিশ্বের দূরত্ব বাড়তে থাকে, প্রেমিকাও প্রতি মুহূর্তে এক পারসেক করে সরে যান। ডার্ক এনার্জি এখানে শুধু মহাজাগতিক বিচ্ছিন্নতার শক্তি নয়, সবকিছুকে দূরে ঠেলে দেওয়া এক অনন্ত মোহের প্রতীক। তারপর হঠাৎ বদলে যায় কবিতার সুর। কবি লেখেন, “মাল্টিভার্সের বাইরে/ যেখানে জড়ো হই আমরা— খণ্ড খণ্ড হয়ে/ অর্গানিক মনের বহুতল ভবনে/ ভালোবাসা একধরনের অ্যান্টিগ্রাভিটি/ যা মানুষকে ভাসিয়ে রাখে/ যতক্ষণ না তার ছায়া শূন্যে ওড়ে”। বিজ্ঞানের শুষ্ক সমীকরণ তখন আর শুষ্ক থাকে না। তার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় মানুষের গভীর, জলজ আবেগ। ভালোবাসা যেন মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে উঠে যাওয়ার এক গোপন শক্তি। তবু সেই উড্ডয়নেরও শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে শূন্যতা। কবি জানেন, মানুষ যত দূরেই ভেসে যাক, তার ছায়া শেষ পর্যন্ত সেই শূন্যতার দিকেই উড়ে যায়।
‘ভগ্নাংশ’ কবিতায় গণিতের ভাষা আরও সরাসরি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়। কবি মানুষকে ভগ্নাংশ আর দশমিকে মিলিয়ে দেখেন। “মানুষ মূলত— ভগ্নাংশ, দশমিক/ কিংবা ভুল টাইপ করা সাপলুডু প্রাণী”। কারও শৈশব কাটা গেছে ভাগচিহ্নে, কারও মুখে লেগে আছে শূন্যের মতো ঠাণ্ডা আলো। সংখ্যার এই ভাষা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনের অসম্পূর্ণতার ভাষা হয়ে ওঠে। এই কবিতাতেই বইয়ের শিরোনামের আংশিক উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। গভীর রাতে নরকের ওয়াই-ফাই কানেক্ট হলে কবি যেন মৃত আত্মাদের মেসেজ পান। জীবন তখন রূপ নেয় “নিজেরই মাথা খেয়ে বড়ো হওয়া নরক”-এ।
‘অন্ধকার বিন্দু’ কবিতায় কবি যন্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করান মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তাকে। “আমি সফটওয়্যার নই, অন্ধকার বিন্দুর আত্মা রিয়েলিটি/ সৃষ্টিশীল এক হিউম্যান-সিঙ্গুলারিটি” উচ্চারণে মানুষ যেন তার নিজের অদৃশ্য কেন্দ্রটিকে খুঁজে পায়। ‘ওভ ঞবিহঃু ড়হব, ডযু হড়ঃ ঙহবঃু ড়হব?’ কবিতায় ইংরেজি সংখ্যার নাম নিয়ে খেলতে খেলতে কবি পৌঁছে যান আরও গভীর এক মানবিক সত্যে। “১০ আঙুলে মানুষ প্রযুক্তি বানায়,/ কিন্তু নিজের ১ ফোঁটা কান্নার সফটওয়্যার ঠিক করতে পারে না”। প্রযুক্তির বিপুল সামর্থ্যের সামনে মানুষের এই এক ফোঁটা কান্নাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে দুর্বোধ্য বাস্তবতা।
এইখানেই বইটির বিজ্ঞানভিত্তিক কবিতার স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়। কবি প্রযুক্তিকে অস্বীকার করেন না, তার কাছে আত্মসমর্পণও করেন না। প্রযুক্তির প্রতিটি অগ্রগতির পাশে তিনি রেখে দেন মানুষের সেই অন্তর্গত অঞ্চলটির প্রশ্ন, যেখানে কোনো অ্যালগরিদমের আলো এখনো পৌঁছায়নি। মানুষ সফটওয়্যার বানাতে পারে, পৃথিবীর জটিলতা হিসাব করতে পারে, অথচ নিজের কান্নার ভাষা তার কাছেই থেকে যায় অজানা। অ্যালগরিদম যত নিখুঁত হয়, মানুষের একাকিত্ব ততই যেন তার হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
প্রেমের ক্ষেত্রেও কবির দৃষ্টি প্রসারিত বহুদূর। ‘ইউনিভার্সের বাইরে’ কবিতায় তিনি এক অসীম ক্ষমতাবান সত্তার মতো পৃথিবীকে পকেটে নিয়ে হাঁটেন। কোটি কোটি ভূমিকম্প আর গ্রহের সংঘর্ষ গিলে ফেলার পর তিনি দেখেন, হাতের তালুতে থাকা পৃথিবীটা একখণ্ড ছেঁড়া কাগজের মতো পড়ে আছে। এরপর রৌরব ভেঙে প্রেমিকার নামে এক প্রেমগাছ বোনার মধ্য দিয়ে কবিতাটি পরিণতি পায়। ‘পৃথিবী ১টা কামড়ে খাওয়া আপেল’ কবিতায় প্রেমের তীব্রতা আরও এক ধাপ উঁচুতে পৌঁছায়। মস্তিষ্কজুড়ে ছুটে চলা একক ছায়ার চোখে পৃথিবী হয়ে ওঠে এক কামড়ে খাওয়া তুচ্ছ আপেল। মহাবিশ্বের আকার এখানে প্রেমের আকারকে বড় করে তোলে।
তবে শারদুল সজল শুধু দূর গ্রহের বাসিন্দা নন। পৃথিবীর ধুলো, স্মৃতি আর শেকড়ের টানও তাঁর কবিতায় প্রবল। ‘মা এক পুরোনো রেডিও’ কবিতায় মায়ের কণ্ঠ পুরোনো রেডিও তরঙ্গ হয়ে ভেসে আসে। কোটি কোটি আলোকবর্ষের হিসাব শেষে এসে থামে একটি ছোট্ট প্রশ্নে। “ভাত খেয়েছিস?” মহাজাগতিক দূরত্ব পেরিয়ে মায়ের এই প্রশ্নটি আবার ঘরের ভেতরে ফিরিয়ে আনে কবিতাকে। প্রযুক্তির রূপক এখানে আড়াল হয়ে দাঁড়ায় না, আলোর কাজ করে। ‘অঙ্ক বই’, ‘জন্মসড়ক’ ও ‘এ ভাষা আমার’ কবিতাতেও শেকড়, শৈশব, স্মৃতি ও মাতৃভাষার পৃথিবী ফিরে আসে।
জীবনের পাশে মৃত্যু নিয়েও কবির একটি নিজস্ব, শান্ত দৃষ্টি আছে। ‘মৃত্যু মানে ভ্রমণে বের হওয়া’ কবিতায় মৃত্যু একটি অণুজীবের মতো দেহের কোষে চুপচাপ বসে থাকে। শেষে সেই ভয়ের ছায়া সরে যায়। মৃত্যু হয়ে ওঠে ভ্রমণ। ‘কবির মৃত্যু’ কবিতায় স্রষ্টা আত্মাদের ডেকে জানতে চান, তারা কারা। উত্তর আসে, ‘কবি’। প্রতিটি আত্মার ভেতরে কয়েকশ পৃথিবীকে ডুবে থাকতে দেখেন তিনি। বিজ্ঞানের ভাষা, মহাজাগতিক কল্পনা ও কবির আত্মপরিচয় এখানে একই জায়গায় এসে মিশে যায়।
মহাজাগতিক ভাবনার পাশে পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতাও তীব্র এই গ্রন্থে। ‘ফিলিস্তিনির শিশু’ কবিতায় যুদ্ধের ভেতর জন্ম নেওয়া একটি শিশুর পৃথিবী প্রথাগত শৈশবের বিপরীত। তার বাবা তাকে শেখান কীভাবে পাথরের সুড়ঙ্গে লুকাতে হয়, কীভাবে অল্প জল ভাগ করে খেতে হয়। তার কাছে “মৃত্যু আমাদের ক্লাস টিচার”। ‘নরকের ডর-ভর’ কবিতায় সেই যুদ্ধ আরও বড় ক্যানভাসে ধরা পড়ে। স্রষ্টা মানুষকে প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু মানুষ সেই কবিতা পুনর্লিখিত করে প্রেমের বদলে রক্ত লিখেছে। ভবিষ্যতের কোনো গবেষণায় ভিনগ্রহীরা জানবে, পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের প্রথম ডিলিটেড প্রজেক্ট ফাইল। প্রযুক্তির এই ভাষাই এখানে সভ্যতার আত্মধ্বংসের ভাষা হয়ে ওঠে।
ধর্ম আর বিশ্বাসের প্রশ্নেও কবি সরব। ‘আমি, শংকর ও মাহিন’ কবিতায় শৈশবের বন্ধুত্ব একদিন ধর্মীয় পরিচয়ের বিভাজনে ভেঙে যায়। বন্ধু আর বন্ধু থাকে না, হিন্দু ও মুসলিম হয়ে যায়। কবি থেকে যান মাঝখানে। ‘এই ধর্ম ও রাষ্ট্র দিয়ে আমি কী করব?’ কবিতায় ব্যক্তিগত ভালোবাসার সামনে ধর্ম ও রাষ্ট্রের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ‘বিশ্বাস’ কবিতায় ঈশ্বরকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রাখার কল্পনাও আসে। এই কবিতাগুলো বইয়ের আরেকটি স্তর খুলে দেয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষায় যে প্রশ্ন মানুষকে মহাবিশ্বের সামনে দাঁড় করায়, একই প্রশ্ন ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভাষায় তাকে নিজের সমাজের সামনে দাঁড় করায়।
শারদুল সজলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দৃশ্যকল্প এবং দুটি দূরবর্তী জগতকে একই সুতোয় গাঁথার দক্ষতা। ‘মঙ্গল গ্রহে সবজিচাষ’ কবিতায় তিনি মঙ্গলে আলু চাষ করেন। প্রতিটি আলুর গায়ে জন্মায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। শিশুরা সেই দেশগুলো পকেটে ভরে খেলে, মার্বেলের মতো ছুড়ে মারে এদিক-ওদিক। কয়েকটি লাইনে সীমান্তের রাজনীতি শিশুর হাতের খেলনা হয়ে যায়। ‘বৈদ্যুতিক টেবিলে নিকোলা টেসলা ও শারদুল সজলের চা-সংলাপ’ কবিতায় অঙ্কের হিসাব, সক্রেটিসের প্রশ্ন আর ঈশ্বরের সাপলুডু খেলা একই টেবিলে ভিড় করে। শেষে “বৈদ্যুতিক চায়ে টগবগ করে সিদ্ধ হচ্ছে কয়েকশ ভবিষ্যৎ”। বইয়ের নাম তখন আর শুধু একটি কাব্যিক শব্দবন্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে কবির কল্পনার একটি প্রতীকী কেন্দ্র।
‘চাঁদছুরি’তে রসবোধ আরও উদ্ভট হয়ে ওঠে। কবি নিজেকে খুন করতে যে ভাড়াটে খুনিকে ঠিক করেছিলেন, সে চাঁদরোগে আক্রান্ত হয়ে নিজেকেই খুন করার জন্য ভাড়াটে খোঁজে। আর ‘অন্ধকার’ কবিতায় ব্ল্যাকহোলের চেয়েও মানুষের বুকের অন্ধকারকে গভীর বলা হয়। “মানুষের বুকের অন্ধকার থেকে/ নিরেট কোনো অন্ধকার নেই পৃথিবীতে”। মহাজাগতিক অন্ধকার শেষপর্যন্ত মানুষের ভেতরের অন্ধকারের কাছে এসে ছোট হয়ে যায়। এই উল্টো করে দেওয়াই কবির দৃশ্যকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এত সম্ভাবনার মাঝেও আমার পাঠে একটি ছোট্ট চাওয়া থেকে যায়। এটি অবশ্যই ব্যক্তিগত পাঠ-ব্যাখ্যা। বৈজ্ঞানিক শব্দ বইজুড়ে বারবার ফিরে আসে। কোথাও কোথাও সেগুলো আবেগের একটু আগে হেঁটে যায়। অথচ কবির নিজের কবিতাতেই এর আরও শক্তিশালী সমাধানের নমুনা আছে। ‘যেখানে সন্ধ্যা সেদ্ধ হয়’ কবিতায় যে নক্ষত্রের আলো আজও পৃথিবীতে পৌঁছায়নি, পরের লাইনেই সেই রূপক নেমে আসে শাহবাগে চা বানানো কেতলির বাষ্পীভূত ধোঁয়ায়। আকাশ আর মাটির এই মিলন কবির সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর একটি। দূরের নক্ষত্র আর ঘরের চায়ের কাপ যখন একই অনুভূতির মধ্যে এসে দাঁড়ায়, তখন বৈজ্ঞানিক শব্দ আর আলাদা কোনো শব্দভাণ্ডার থাকে না। তারা হয়ে ওঠে কবিতারই স্বাভাবিক ভাষা।
নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ তাই শুধু বিজ্ঞান নিয়ে লেখা কবিতার বই নয়। এর বিশেষত্ব হলো, বিজ্ঞানকে কবি মানুষের পুরোনো প্রশ্নগুলোর সামনে নতুন আয়না হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রেম এখানে মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে দাঁড়ায়। মানুষ হয়ে যায় ভগ্নাংশ। কান্নারও যেন একটি সফটওয়্যার দরকার হয়। মা হয়ে ওঠেন রেডিও তরঙ্গ। মৃত্যু হয়ে ওঠে ভ্রমণ। পৃথিবী হয়ে যায় মহাবিশ্বের একটি ডিলিটেড প্রজেক্ট ফাইল। আর ভবিষ্যৎ কখনো নক্ষত্রের ভেতর নয়, মানুষের নিজের মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
শেষ কবিতা ‘আমি’তে কবি লিখেছেন, আগামী ভোরে জেগে ওঠা সেই আমির মুখ ফসকে বেরিয়ে আসবে কয়েকশ ভবিষ্যৎ। তারপর তিনবার ‘আমি’ উচ্চারণ করে শেষ হয় বই। মনে হয়, নক্ষত্রের ওপার থেকে কেউ যেন অন্ধকার ভেদ করে নিজের নাম ধরে ডাকছে। শারদুল সজলের কবিতায় তাই দূর আকাশের আলো আর ঘরের জানালা একই সঙ্গে জেগে থাকে। একদিকে মহাবিশ্বের অসীম বিস্তার, অন্যদিকে মানুষের একান্ত ঘর, তার নিঃসঙ্গতা, তার প্রতিদিনের জীবন। এই দুই দূর প্রান্তকে একই কবিতার আকাশে ধরে রাখার চেষ্টাতেই নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ খুঁজে পায় তার নিজস্ব কাব্যিক স্বর।
এই বইয়ের প্রতিটি কবিতার আলাদা হিসাব মেলাতে গেলে হয়তো তার ভেতরের সেই বৃহৎ সুরটি আড়ালে থেকে যায়। বরং অনুসরণ করা যায় তার নিজস্ব পথটি। সেই পথে নক্ষত্র আছে, অ্যালগরিদম আছে, অন্ধকার আছে। আছে মানুষের বুকের উষ্ণতাও। সেখানে মহাকাশের অসীমতা যেমন আছে, তেমনি আছে শাহবাগের চায়ের কেতলিতে ফুটতে থাকা একেবারে কাছের পৃথিবী। দূর নক্ষত্র থেকে শহরের চায়ের দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত এই পথেই কবি মাপতে চান মানুষের দূরত্ব, তার একাকিত্ব, তার ভবিষ্যৎ। আর সেই পথের এক প্রান্তে কয়েকশ ভবিষ্যতের দরজা খুলে যায়। অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন নিঃসঙ্গ কবি, যার হাতে কবিতা ছাড়া আর কোনো মানচিত্র নেই।
নরকের ডর-ভর ও কয়েকশ ভবিষ্যৎ। শারদুল সজল। প্রকাশক: অনুপ্রাণন প্রকাশন। প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৬। প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত। পৃষ্ঠা: ৬৪। মূল্য: ২৪০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন