ছোটবেলায় বাবা-মা নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছিলেন। তবে জীবনের নানা প্রতিকূলতা আর সামাজিক অবহেলার মধ্য দিয়ে স্বপন থেকে আজ তিনি স্বপ্না। পরিচয়ের নানা সংকট ও মানুষের কটূক্তিকে পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেছে নিয়েছেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা এই খামারই এখন তার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জমিতে বসবাস করেন ২৩ বছর বয়সী তৃতীয় লিঙ্গের তরুণী স্বপ্না। বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগমের সংসারে আর্থিক অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। নিজেদের এক ইঞ্চি জমিও না থাকলেও কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার তাগিদে একসময় মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। এ সময় তাকে নানা কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিলেও ভেঙে পড়েননি। বরং সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন তিনি।
স্বপ্নার মা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই, সরকারি জায়গায় থাকি। একদিন পাশের বাড়ির এক গৃহস্থকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও শখ জাগে। মেয়ের আগ্রহ দেখে ওর বাবা ১৩ ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই ওর এই স্বাবলম্বী হওয়ার যাত্রা শুরু।’
শুরুতে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করেন স্বপ্না। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে ১২টিতে দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে তার ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরে আরও কয়েকটি মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। ক্ষতি কাটিয়ে নতুন উদ্যমে আবারও খামার পরিচালনা শুরু করেন।
বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এর মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাতের উন্নত জাতের ছাগল রয়েছে। স্বপ্নার দাবি, তার খামারের প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
স্বপ্না জানান, খামারের বড় ষাঁড় বা পাঠা দিয়ে প্রজনন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। পাশাপাশি বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ আসে। গত বছর চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজায় ১০টি ছাগল বিক্রি করে তিনি মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় করেছেন।
স্বপ্না দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি চাই না জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে রোগবালাইয়ে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে, তবু হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে চাই।’
সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নার এই লড়াই স্থানীয়ভাবে এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। মাত্র দুটি ছাগল নিয়ে শুরু করা তার এই খামার এখন আত্মনির্ভরশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬
ছোটবেলায় বাবা-মা নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছিলেন। তবে জীবনের নানা প্রতিকূলতা আর সামাজিক অবহেলার মধ্য দিয়ে স্বপন থেকে আজ তিনি স্বপ্না। পরিচয়ের নানা সংকট ও মানুষের কটূক্তিকে পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বেছে নিয়েছেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা এই খামারই এখন তার ঘুরে দাঁড়ানোর এবং জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায় রেলওয়ের জমিতে বসবাস করেন ২৩ বছর বয়সী তৃতীয় লিঙ্গের তরুণী স্বপ্না। বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগমের সংসারে আর্থিক অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। নিজেদের এক ইঞ্চি জমিও না থাকলেও কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে নিয়েছেন তিনি।
স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার তাগিদে একসময় মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো। এ সময় তাকে নানা কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিলেও ভেঙে পড়েননি। বরং সিদ্ধান্ত নেন, অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করবেন। সেই ভাবনা থেকেই ছাগল পালনের উদ্যোগ নেন তিনি।
স্বপ্নার মা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই, সরকারি জায়গায় থাকি। একদিন পাশের বাড়ির এক গৃহস্থকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও শখ জাগে। মেয়ের আগ্রহ দেখে ওর বাবা ১৩ ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল দিয়েই ওর এই স্বাবলম্বী হওয়ার যাত্রা শুরু।’
শুরুতে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করেন স্বপ্না। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে ১২টিতে দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে তার ছয়টি ছাগল মারা যায়। পরে আরও কয়েকটি মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। ক্ষতি কাটিয়ে নতুন উদ্যমে আবারও খামার পরিচালনা শুরু করেন।
বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এর মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাতের উন্নত জাতের ছাগল রয়েছে। স্বপ্নার দাবি, তার খামারের প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
স্বপ্না জানান, খামারের বড় ষাঁড় বা পাঠা দিয়ে প্রজনন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। পাশাপাশি বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ আসে। গত বছর চট্টগ্রামের বিভিন্ন পূজায় ১০টি ছাগল বিক্রি করে তিনি মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় করেছেন।
স্বপ্না দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি চাই না জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে রোগবালাইয়ে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসানও হয়েছে, তবু হাল ছাড়িনি। আমার স্বপ্ন খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার যদি আমাকে একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আরও উন্নতভাবে ছাগল পালন করতে পারব। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও উদাহরণ তৈরি করতে চাই।’
সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্নার এই লড়াই স্থানীয়ভাবে এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। মাত্র দুটি ছাগল নিয়ে শুরু করা তার এই খামার এখন আত্মনির্ভরশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আপনার মতামত লিখুন