সংবাদ

‘ইয়াবার ডিউটিতে আছি, দোয়া করো মা’


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

‘ইয়াবার ডিউটিতে আছি, দোয়া করো মা’

​‘ইয়াবার ডিউটিতে আছি, দোয়া করো মা।’ মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষবার ঠিক এ কথাই বলেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মো. তিতাস শেখ।

কিন্তু এর পরদিনই কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে। তার এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে 'ঘোর অন্ধকার'। সন্তান হারানোর শোকে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা, আর স্বামী হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী।
​শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো বাড়ি ও এলাকজুড়ে এখন শুধু কান্নার রোল ও শোকের মাতম। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর ছেলের স্মৃতিচারণ করে বিলাপ করছেন মা রেখা বেগম।

একই রকম করুণ অবস্থা তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারেরও। মাত্র চার বছরের সংসারজীবনেই চিরতরে থেমে গেল তাদের সাজানো গোছানো স্বপ্নের পথচলা। স্বামীকে হারিয়ে এখন তিনি বাকরুদ্ধ।

​কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিতাসের মা রেখা বেগম বিলাপ করতে করতে জানান, মৃত্যুর মাত্র একদিন আগেই ফোন করে তিতাস তাকে বলেছিল সন্ত্রাসী ও মাদককারীদের আস্তানা ধ্বংসে অভিযানে যাওয়ার কথা।

তখন সে বলেছিলেন, ‘মা, আমি ইয়াবার ডিউটিতে যাচ্ছি, আমার জন্য দোয়া করো।’ এদিকে তিতাসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন শোকার্ত স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য তারা অপেক্ষায় রয়েছেন। যে বাড়িতে কিছুদিন আগেও ছিল প্রাণবন্ত আনন্দ, সেখানে এখন শুধুই স্বজন হারানোর তীব্র বেদনা।

​সেনাবাহিনীর যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে হেলিকপ্টারযোগে তিতাসের মরদেহ তার নিজ এলাকা নগরকান্দায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সন্তানকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে অপেক্ষায় আছেন মা, আর স্বামীর মুখখানি দেখতে আকুল হয়ে আছেন স্ত্রী।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিতাস শেখ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং মাত্র এক মাস আগে তাকে কক্সবাজারে পদায়ন করা হয়েছিল।

​গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ইয়াবার ডিউটিতে আছেন এবং সন্ত্রাসী ও মাদকচক্রের আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরই তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার মর্মান্তিক সংবাদ আসে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলাকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিতে গুরুতর আহত হন তিতাস শেখ। তার বুকের বাম পাশে গুলি লাগে। প্রথমে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​স্থানীয় বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ এ বিষয়ে বলেন, দেশের জন্য তার এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত গৌরবের এবং তার এই মৃত্যু শহীদি মর্যাদার সমান। দেশ ও জাতির জন্য তার এই অবদানের কথা সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি সবার কাছে নিহত তিতাসের মাগফিরাতের জন্য দোয়া কামনা করেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও তিতাসের মামা হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার জানান, সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরাসরি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন এবং হেলিকপ্টারে করে মরদেহ নগরকান্দা হেলিপ্যাডে পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এছাড়া নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ইতিমধ্যে তিতাসের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মরদেহ নিরাপদে গ্রামে পৌঁছানোর বিষয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


‘ইয়াবার ডিউটিতে আছি, দোয়া করো মা’

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

​‘ইয়াবার ডিউটিতে আছি, দোয়া করো মা।’ মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শেষবার ঠিক এ কথাই বলেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মো. তিতাস শেখ।

কিন্তু এর পরদিনই কক্সবাজারের টেকনাফে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে। তার এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে 'ঘোর অন্ধকার'। সন্তান হারানোর শোকে পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা, আর স্বামী হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী।
​শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো বাড়ি ও এলাকজুড়ে এখন শুধু কান্নার রোল ও শোকের মাতম। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর ছেলের স্মৃতিচারণ করে বিলাপ করছেন মা রেখা বেগম।

একই রকম করুণ অবস্থা তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তারেরও। মাত্র চার বছরের সংসারজীবনেই চিরতরে থেমে গেল তাদের সাজানো গোছানো স্বপ্নের পথচলা। স্বামীকে হারিয়ে এখন তিনি বাকরুদ্ধ।

​কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিতাসের মা রেখা বেগম বিলাপ করতে করতে জানান, মৃত্যুর মাত্র একদিন আগেই ফোন করে তিতাস তাকে বলেছিল সন্ত্রাসী ও মাদককারীদের আস্তানা ধ্বংসে অভিযানে যাওয়ার কথা।

তখন সে বলেছিলেন, ‘মা, আমি ইয়াবার ডিউটিতে যাচ্ছি, আমার জন্য দোয়া করো।’ এদিকে তিতাসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন শোকার্ত স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে মানুষ। প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য তারা অপেক্ষায় রয়েছেন। যে বাড়িতে কিছুদিন আগেও ছিল প্রাণবন্ত আনন্দ, সেখানে এখন শুধুই স্বজন হারানোর তীব্র বেদনা।

​সেনাবাহিনীর যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে হেলিকপ্টারযোগে তিতাসের মরদেহ তার নিজ এলাকা নগরকান্দায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সন্তানকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরতে অপেক্ষায় আছেন মা, আর স্বামীর মুখখানি দেখতে আকুল হয়ে আছেন স্ত্রী।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিতাস শেখ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং মাত্র এক মাস আগে তাকে কক্সবাজারে পদায়ন করা হয়েছিল।

​গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে মায়ের সঙ্গে শেষ ফোনালাপে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি ইয়াবার ডিউটিতে আছেন এবং সন্ত্রাসী ও মাদকচক্রের আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরই তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার মর্মান্তিক সংবাদ আসে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলাকালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিতে গুরুতর আহত হন তিতাস শেখ। তার বুকের বাম পাশে গুলি লাগে। প্রথমে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

​স্থানীয় বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ এ বিষয়ে বলেন, দেশের জন্য তার এই আত্মত্যাগ অত্যন্ত গৌরবের এবং তার এই মৃত্যু শহীদি মর্যাদার সমান। দেশ ও জাতির জন্য তার এই অবদানের কথা সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি সবার কাছে নিহত তিতাসের মাগফিরাতের জন্য দোয়া কামনা করেন।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও তিতাসের মামা হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার জানান, সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরাসরি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন এবং হেলিকপ্টারে করে মরদেহ নগরকান্দা হেলিপ্যাডে পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এছাড়া নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ইতিমধ্যে তিতাসের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং মরদেহ নিরাপদে গ্রামে পৌঁছানোর বিষয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত