সংবাদ

সুতিয়া নদীর তীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী অতুলপ্রসাদ


কামরুজ্জামান
কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২১ এএম

সুতিয়া নদীর তীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী অতুলপ্রসাদ
অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের ব্রাহ্ম মন্দিরের সামনে অবস্থিত

গাজীপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেন। তিনি একাধারে গীতিকার, কবি, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে রয়েছে তার সমৃদ্ধ অবদান।

অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের ব্রাহ্ম মন্দিরের সামনে অবস্থিত। মন্দিরটি বর্তমান কাওরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের ঠিক পেছনে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা থেকে শ্রীপুর হয়ে বর্মী বাজার, সেখান থেকে কাওরাইদ বাজারে যেতে হয়। মাওনা থেকে কাওরাইদের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। কাওরাইদ বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত সুতিয়া নদীর দক্ষিণ পাড়ে, নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত সমাধিস্থলটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।

সুতিয়া নদীর পাড়, শ্রীপুর ও গফরগাঁও উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নদীর ওপর নির্মিত সংযোগ সেতু, অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল এবং পুরোনো ব্রাহ্ম মন্দির—সব মিলিয়ে জায়গাটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমী, জ্ঞানপিপাসু এবং দর্শনার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ঘুরে এলাম বিখ্যাত গান ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা!’-এর রচয়িতা ও সুরকার অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল।

‘ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে করব না তো মানা,

হাতের কলম জনম দুঃখী, তাকে বেচো না।

আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি।’

এ ধরনের জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা অতুলপ্রসাদ সেন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ভাওয়াল জনপদের উত্তরের শেষ প্রান্তে, সুতিয়া নদীর তীরে।

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট ভারতের লক্ষ্ণৌতে তার মৃত্যু হয়। পরে তার চিতাভস্মের একাংশ বাংলাদেশে আনা হয়। ঢাকা বিভাগের তৎকালীন গাজীপুরের কাওরাইদ গ্রামে সুতিয়া নদীর তীরে একটি ব্রাহ্ম মন্দিরের পাশে তা সমাহিত করা হয়। মন্দিরটির নাম ‘কাওরাইদ ব্রাহ্ম মন্দির’ বলে জানা যায়। অনেকের ধারণা, এই মন্দিরের নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয়েছে কাওরাইদ। সে সময় সমাধিস্থলে স্থাপিত স্মৃতিফলকে বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা লেখা হয়েছিল—‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’

অতুলপ্রসাদ সেনের মাতামহ ভাওয়ালের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছারিবাড়ি ছিল কাওরাইদ গ্রামে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে স্মৃতিফলকটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে সেখানে নতুন ফলক স্থাপন করা হয়। তাতে লেখা হয়, ‘আমার যে শূন্য ডালা তুমি ভরিও/শুধু তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও।’

দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ অতুলপ্রসাদ সেনের স্মৃতি সংরক্ষণে তার সমাধিস্থলে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা প্রয়োজন। সেখানে তার জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দেশপ্রেমের নানা দিক তুলে ধরা গেলে নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

সমাধিস্থলটি সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে এটি একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া। আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


সুতিয়া নদীর তীরে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী অতুলপ্রসাদ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

গাজীপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেন। তিনি একাধারে গীতিকার, কবি, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে রয়েছে তার সমৃদ্ধ অবদান।

অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের ব্রাহ্ম মন্দিরের সামনে অবস্থিত। মন্দিরটি বর্তমান কাওরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের ঠিক পেছনে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা থেকে শ্রীপুর হয়ে বর্মী বাজার, সেখান থেকে কাওরাইদ বাজারে যেতে হয়। মাওনা থেকে কাওরাইদের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। কাওরাইদ বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত সুতিয়া নদীর দক্ষিণ পাড়ে, নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত সমাধিস্থলটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।

সুতিয়া নদীর পাড়, শ্রীপুর ও গফরগাঁও উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নদীর ওপর নির্মিত সংযোগ সেতু, অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল এবং পুরোনো ব্রাহ্ম মন্দির—সব মিলিয়ে জায়গাটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যপ্রেমী, জ্ঞানপিপাসু এবং দর্শনার্থীদের জন্য নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ঘুরে এলাম বিখ্যাত গান ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালোবাসা!’-এর রচয়িতা ও সুরকার অতুলপ্রসাদ সেনের সমাধিস্থল।

‘ঘরদোর বেচো ইচ্ছে হলে করব না তো মানা,

হাতের কলম জনম দুঃখী, তাকে বেচো না।

আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি।’

এ ধরনের জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা অতুলপ্রসাদ সেন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ভাওয়াল জনপদের উত্তরের শেষ প্রান্তে, সুতিয়া নদীর তীরে।

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট ভারতের লক্ষ্ণৌতে তার মৃত্যু হয়। পরে তার চিতাভস্মের একাংশ বাংলাদেশে আনা হয়। ঢাকা বিভাগের তৎকালীন গাজীপুরের কাওরাইদ গ্রামে সুতিয়া নদীর তীরে একটি ব্রাহ্ম মন্দিরের পাশে তা সমাহিত করা হয়। মন্দিরটির নাম ‘কাওরাইদ ব্রাহ্ম মন্দির’ বলে জানা যায়। অনেকের ধারণা, এই মন্দিরের নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয়েছে কাওরাইদ। সে সময় সমাধিস্থলে স্থাপিত স্মৃতিফলকে বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা লেখা হয়েছিল—‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।’

অতুলপ্রসাদ সেনের মাতামহ ভাওয়ালের জমিদার কালীনারায়ণ গুপ্তের কাছারিবাড়ি ছিল কাওরাইদ গ্রামে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে স্মৃতিফলকটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে সেখানে নতুন ফলক স্থাপন করা হয়। তাতে লেখা হয়, ‘আমার যে শূন্য ডালা তুমি ভরিও/শুধু তুমি যে শিব তাহা বুঝিতে দিও।’

দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার প্রতি আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ অতুলপ্রসাদ সেনের স্মৃতি সংরক্ষণে তার সমাধিস্থলে একটি জাদুঘর নির্মাণ করা প্রয়োজন। সেখানে তার জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দেশপ্রেমের নানা দিক তুলে ধরা গেলে নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

সমাধিস্থলটি সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে এটি একটি আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া। আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত