সংবাদ

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার


মতিউর রহমান
মতিউর রহমান
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|

র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|

২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|

পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|

২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|

তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|

ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


নারীদের নিয়ন্ত্রণে সোশ্যাল মিডিয়া যখন নতুন হাতিয়ার

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

এক দশকেরও বেশি সময় আগে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্পটি জাতীয় এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল, তখন এর প্রধানতম ভিত্তি ছিল প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন| বিশেষ করে বাংলাদেশের নারী সমাজের জন্য ডিজিটাল বিপ্লবকে মনে করা হয়েছিল এক বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে লাফিয়ে ওঠার সোপান| আশা করা হয়েছিল, সোশ্যাল মিডিয়া হবে এমন একটি ‘গ্রেট লেভেলার’ বা সমতাকারী শক্তি, যা গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে, ভৌগোলিক ও সামাজিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলবে এবং নীরবদের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেবে| কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে এই উজ্জ্বল আশাবাদী বয়ানের নিচে লুকিয়ে থাকা একটি অন্ধকার ও বিপজ্জনক বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রযুক্তি কেবল মুক্তির পথ নয়, বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের এক আধুনিক ও ডিজিটাল কারারক্ষী হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে| নারীদের শরীর, কণ্ঠস্বর এবং প্রকাশকে অভূতপূর্ব নিপুণতায় নজরদারি, পণ্যায়ন এবং শাস্তি দেয়ার এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগত|

র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট বা আমূল নারীবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ডিজিটাল সহিংসতা কোনো আকস্মিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পিতৃতন্ত্রের এক বিবর্তনশীল কৌশল| পিতৃতন্ত্র তার আধিপত্য বজায় রাখতে সবসময়ই নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়| অতীতে যখন নিয়ন্ত্রণ কেবল চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের মাধ্যমে নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়েছে| এখানে নারীর যৌনতা ও স্বায়ত্তশাসনকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে| অন্যদিকে, উত্তর-আধুনিক নারীবাদের প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে এই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে একেকটি ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’| ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো যে নজরদারি ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যেখানে বন্দি সবসময় অনুভব করে যে সে নজরদারির নিচে আছে, সোশ্যাল মিডিয়া বাংলাদেশের নারীদের জন্য ঠিক সেই জেলখানায় পরিণত হয়েছে| এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি পোশাকের পছন্দ বা প্রতিটি সাহসী মন্তব্য একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক ও ডিজিটাল জনতার বিচারে প্রতিনিয়ত ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে|

২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপ, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে, এই নতুন ধরনের সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে| প্রথমবারের মতো এই সরকারি পরিসংখ্যানে ‘প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ বা টিএফজিবিভি পরিমাপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে| এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারকারী নারীদের ৮.৩ শতাংশ তাদের জীবনে অন্তত একবার অবাঞ্ছিত যৌন যোগাযোগ, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল, ছবি-ভিত্তিক নির্যাতন বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন| ২০-২৪ বছর বয়সী তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হারের চিত্র আরও আঁতকে ওঠার মতো—প্রায় ১৬ শতাংশ| শহরাঞ্চলেও এই হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি| সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত শারীরিক সহিংসতার ক্ষেত্রে যেখানে পরিচিত ব্যক্তি বা নিকটাত্মীয়রাই প্রধান অপরাধী হয়ে থাকেন, সেখানে ডিজিটাল সহিংসতার ক্ষেত্রে ৪৬ শতাংশ অপরাধীই হলো সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি| এটি প্রমাণ করে যে, অনলাইন পিতৃতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট সীমানা বা সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে না; এটি একটি নামহীন ও সর্বব্যাপী শক্তি হিসেবে নারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করছে|

পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্যই হলো নারীর শরীরকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ, আনন্দ এবং তথাকথিত ‘পারিবারিক সম্মান’-এর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা| বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে যেখানে ‘লজ্জা’ এবং ‘পর্দা’র সাংস্কৃতিক চাপ অত্যন্ত প্রবল, সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এই অবদমনকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার এখন এই ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে| বর্তমানে ‘ডিপফেক রিভেঞ্জ পর্ন’ তৈরির জন্য কোনো নারীর ব্যক্তিগত গ্যালারিতে প্রবেশ করার আর প্রয়োজন হয় না| ফেইসবুক বা টিকটক প্রোফাইল থেকে সাধারণ একটি ছবি নিয়ে এআই টুলের মাধ্যমে যে কারো মুখকে আপত্তিকর ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে| সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে নারী অ্যাক্টিভিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি কয়েক গুণ বেড়েছে| এই ধরনের আক্রমণ কেবল সম্মানহানি নয়, বরং নারীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলে| কারণ আমাদের সমাজে নারীর ‘পবিত্রতা’ ও ‘মর্যাদা’র ওপরই তার বিয়ের সম্ভাবনা, শিক্ষার সুযোগ এবং পরিবারের নিরাপত্তা সরাসরি নির্ভরশীল|

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার পেছনে এক অদৃশ্য ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে| এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক মডেলটি এমনভাবে তৈরি যেখানে ‘এনগেজমেন্ট’ বা সম্পৃক্ততা যত বেশি, মুনাফা তত বেশি| গবেষণায় দেখা গেছে, ইতিবাচক সংবাদের চেয়ে নেতিবাচক ও ক্ষোভ সৃষ্টিকারী বিষয়বস্তু দ্রুত ভাইরাল হয়| ফলে যখনই কোনো নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কোনো পুরুষতান্ত্রিক অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়, অ্যালগরিদম সেই বিদ্বেষমূলক পোস্টকেই হাজার হাজার মানুষের ফিডে পৌঁছে দেয়| এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলো ˆলঙ্গিক বৈষম্য ও অবমাননাকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে| জুডিথ বাটলারের ‘লিঙ্গ পারফরম্যাটিভিটি’ তত্ত্ব এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক| অনলাইনে নারীদের প্রতিনিয়ত একটি আদর্শায়িত এবং সমাজ-অনুমোদিত নারীত্ব ‘পারফর্ম’ করতে বাধ্য করা হচ্ছে| যদি কোনো নারী তার স্বাধীন মতামত দেয় বা প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে কোনো আচরণ করে, তবে ডিজিটাল জনতা তাকে ‘শেইমিং’ বা লজ্জিত করার মাধ্যমে সীমানা মনে করিয়ে দেয়| এটি এক প্রকার ডিজিটাল গণপিটুনি, যা নারীর স্ব-প্রকাশের অধিকারকে কেড়ে নেয়|

২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার যে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সাইবার জগতকে নারীদের জন্য আরও বেশি প্রতিকূল করে তুলেছে| বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠী এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে লিঙ্গ সমতার বিরুদ্ধাচারণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে| নারী উন্নয়ন নীতি বা নারীর জনজীবনে অংশগ্রহণকে ‘সংস্কৃতিবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে যে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হয়, তা সরাসরি নারীর শারীরিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে| এর ফলে অনেক মেধাবী নারী তাদের পেশাগত কাজ বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে আসছেন| তারা পোস্ট করার আগে শতবার ভাবছেন, পাছে কোনো সাইবার হামলায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়| এই যে ‘ভয়’ এবং ‘স্ব-সেন্সরশিপ’—এটাই হলো ডিজিটাল পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিজয়| যখন একজন নারী হয়রানির ভয়ে নিজের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেন, তখন পিতৃতন্ত্র বিনা রক্তপাতে তার লক্ষ্য অর্জন করে|

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে যেসব আইনি বা কারিগরি ব্যবস্থার কথা বলা হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত| বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো প্রযুক্তির দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না| এআই-জেনারেটেড সহিংসতার ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা বা অপরাধীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জটিল| আবার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারী আইনি সাহায্য নিতেও ভয় পান, কারণ আইনি প্রক্রিয়াটি অনেক সময় তাকে আবারও মানসিকভাবে হেনস্তা করে| তথাকথিত লিবারেল সমাধানগুলো কেবল উপরিভাগের ক্ষত সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মূল কাঠামোগত সমস্যা—অর্থাৎ সমাজে বদ্ধমূল থাকা নারীবিদ্বেষ এবং প্রযুক্তির ওপর পুরুষের একাধিপত্যকে প্রশ্ন করে না| একটি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল স্থাপত্যের এমন এক মৌলিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে মুনাফার চেয়ে নাগরিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বেশি গুরুত্ব পাবে|

তবে এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়| বাংলাদেশের নারীরা ডিজিটাল স্পেসকে কেবল আক্রমণের জায়গা হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবেও গড়ে তুলছেন| বিভিন্ন ফেমিনিস্ট নেটওয়ার্ক, হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট এবং আইনি সহায়তা সংস্থাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত| তারা সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সরকারকে নীতি পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে| ২০২৪ সালের সরকারি জরিপে প্রযুক্তি-সহায়তায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র এখন এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পারছে| কিন্তু পরিসংখ্যানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন|

ডিজিটাল বাংলাদেশ কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়| এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এদেশের নারীরা এই ডিজিটাল স্পেসে কতটা নিরাপদ এবং স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারছেন তার ওপর| পিতৃতন্ত্র তার খোলস বদলে অনলাইনে যে প্যানোপটিকন তৈরি করেছে, তা ভাঙতে হলে সম্মিলিত লড়াই প্রয়োজন| আমাদের বুঝতে হবে যে, ডিজিটাল সহিংসতা কোনো ‘ভার্চুয়াল’ সমস্যা নয়; এটি একটি বাস্তব অপরাধ যা রক্তমাংসের মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়| যতক্ষণ না আমরা পুঁজিবাদী প্রযুক্তির লাভমুখী চরিত্র এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের এই মেলবন্ধনকে রুখতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত ডিজিটাল ক্ষমতায়নের স্বপ্ন এদেশের নারীদের জন্য একটি নিষ্ঠুর মরীচিকা হয়েই থাকবে| যে নারীরা আজ কারখানায় সেলাই করছেন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাবে গবেষণা করছেন, তাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো অ্যালগরিদমিক যান্ত্রিকতায় বা সাইবার বুলিংয়ের ডিজিটাল চাবুকে স্তব্ধ হয়ে না যায়— সেটি নিশ্চিত করাই হোক আগামীর অঙ্গীকার|

[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত