সংবাদ

‘বড় মাথাব্যাথা মোটরবাইক’: রাজধানীতে পাম্প ৮০টি, বাইক ১২ লাখ


ফয়েজ আহমেদ তুষার
ফয়েজ আহমেদ তুষার
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩০ পিএম

‘বড় মাথাব্যাথা মোটরবাইক’: রাজধানীতে পাম্প ৮০টি, বাইক ১২ লাখ

  • ঢাকার বাইরের বাইকও চলে রাইড শেয়ারে
  • ‘ফুয়েল অ্যাপে’ সমাধান দেখছেন ভুক্তভোগীরা

বেশ কিছুদিন ধরেই রাজধানীসহ সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি ও গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশী ভিড় দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের।

সরকার বলছে, ভোক্তাদের এই তেল কেনা, ‘প্যানিক বায়িং’ বা ‘আতঙ্কিত হয়ে কেনার হিড়িক’। সরকারপক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ি, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশী; যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ৭৫ শতাংশ।

এই মোটরসাইকেল চলে পেট্রোল বা অকটেনে। আর বাইকারদের ভিড় পাম্পগুলোতে সবচেয়ে বেশী। অন্যান্য যানবাহনের লাইনও আছে, তবে তুলনামুলক কম।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ি, ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২২ লাখের কিছু বেশী; এরমধ্যে ১২ লাখের মতো মোটরসাইকেল। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র বলছে, ঢাকায় নিবন্ধন করা মোটরসাইকেলের বাইরেও রাজধানীতে অসংখ্য মোটরসাইকেল চালাচল করে, যেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত। এসব বাইকার রাইড শেয়ারের কাজ পেশা হিসেবে নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশে সচল পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা দুই হাজার ৩২৯টি। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে আছে ৬০৭টি। তবে রাজধানী ঢাকায় পেট্রোল পাম্প ৮০টি।

আগে ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় এবং সারাদেশেই ছোটখাটো দোকানে খোলা তেল (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) বিক্রি হতো। জরুরি প্রয়োজনে অনেক বাইকার সেসব দোকান থেকে তেল নিত। জ্বালানি খাতে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ওইসব দোকান বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপনে কিছু দোকান অবশ্য পরিচিতদের কাছে তেল বিক্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

দিনে একটি পাম্পে কয়টি বাইক যায়

বিআরটিএর তথ্য ধরে হিসাব করলে, ঢাকায় ১২ লাখ বাইকার প্রতিদিন তেল নিলে গড়ে প্রতিটি পাম্পে বাইক যাবে ১৫ হাজার। এরসঙ্গে যুক্ত হবে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত যেসব বাইক রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য ঢাকায় চলছে, সেগুলো।

যদি ধরে নেওয়া হয়, ঢাকায় যত বাইক নিবন্ধন হয়েছে, তার অর্ধেক চলে। তাহলেও প্রতিটি পাম্পে দৈনিক ভিড় করবে ৭৫০০ বাইক।

যদি ধরা হয়, ঢাকায় নিবন্ধিত বাইকের এক-তৃতীয়ংশ চলছে, তাহলে রাজধানীর প্রতিটি পাম্পে দৈনিক ভিড় হবে ৫০০০ হাজার বাইকারের।

বাইক চালান এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন সাধারণ বাইকার (যিনি রাইড শেয়ার করেন না) সাধারণত প্রতি সপ্তাহে একবার তেল নেন। ব্যতিক্রম আছেন, তবে সেই সংখ্যা একেবারেই কম।

আর যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের একটা অংশ প্রতিদিন তেল নেন। আরেকটা অংশ একদিন পরপর তেল নেন। সপ্তাহে একবার তেল নেন, রাইড শেয়ার করা এমন বাইকার খুঁজে পাওয়া কঠিন।

কারণ সারাদিন বাইক চালালে, গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ কিলোমিটার চললে ঢাকার যানজটে চার-পাঁচ লিটার তেল অনায়েসেই শেষ হয়ে যায়। আর বাইকের ট্যাংকে সাধারণত ৮ থেকে ১২ লিটার তেল ধরে। অনেকের পকেটে ট্যাংক পুরো করার মতো পর্যাপ্ত টাকা থাকে না।

আবার অনেকে পরদিনের জন্য বেশী তেল ট্যাংকে জমিয়ে রাখতে চান না। কারণ, তিনি পরদিন নিজে না চালিয়ে পরিচিত কাউকে বাইকটা ভাড়া দেবেন; যিনি রাইড শেয়ারের কাজ করেন তবে নিজের বাইক নাই।

প্রকৃত চিত্র কী

যদি এমন ধরা হয়, রাজধানীতে প্রতিদিন ৪ লাখ মোটরসাইকেল চলাচল করে। এরমধ্যে অর্ধেক বা দুই লাখ রাইড শেয়ারের কাজ  করে। তাহলে, দুই লাখ বাইকার সপ্তাহে একবার একটি পাম্পে যান। বাকী দুই লাখ বাইকারের মধ্যে এক লাখ প্রতিদিন, আর এক লাখ বাইকার একদিন পর একদিন কোন না কোন পাম্পে তেল আনতে যান।

এই পরিসংখ্যান ধরে হিসেব করলে, দৈনিক একটি পাম্পে তেল নিতে সাধারণ বাইকার যান ৩৫৭ জনের মতো। রাইড শেয়ার করেন এমন বাইকার যান ১৮৭৫ জনের মতো।

অর্থাৎ, ঢাকার একটি পাম্পে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২৩২টি মোটরসাইকেল তেল নেয়ার জন্য লাইন ধরে। এলাকা ও সময় ভেদে এই লাইন কখনো দীর্ঘ আবার কখনো কম হয়।

একটি পাম্প যদি দৈনিক ২৪ ঘন্টাই খোলা রাখা হয়, প্রতি মিনিটে গড়ে একটি বাইকে তেল দেয়, তাহলে দিনে মোট এক হাজার ৪৪০টি বাইকে তেল দিতে পারবে। এতে, ৭৯২টি বাইক তেল পাবে না।

তবে বাইকের ট্যাংক খোলা, তেল ভরা, ট্যাংক বন্ধ করা, টাকা দেওয়া- সব মিলিয়ে এক মিনিটে একটা বাইক বিদায় হওয়া কঠিন। আবার, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২৪ ঘন্টা বেশীরভাগ পাম্পই খোলা থাকে না। ‘তেল শেষ’ বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে অনেক পাম্প। কোন কোন পাম্প সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে বন্ধ করে দেয়। জানতে চাইলে বলে, ‘তেল শেষ’।

সে হিসেবে পাম্পে লম্বা লাইন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এতো বাইক কোথায় ছিল

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কিছুদিন আগেও তো এই লাইন ছিল না। তখন কী বাইকাররা তেল নেয়নি? এর জবাব বাইকারদের কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

মগবাজারের বাসিন্দা শেফিক সুমন সংবাদকে বলেন, তিনি বাইক খুব একটা চালান না। সাধারণত ট্যাংক ভরে তেল নেন। একবার তেল নিলে পনেরো দিনেও পাম্পে যান না। তার দাবি তিনি রোজার ঈদের পরদিন অর্থাৎ ২২ মার্চ তেল নিয়েছিলেন। গতকাল পর্যন্ত আর নিতে হয়নি। তিনি বলেন, “তেলের জন্য যে লাইন দেখি, অতি জরুরি ছাড়া বাইক বেরই করি না। তাই তেল এখনো শেষ হয়নি।”

তিনি ফুয়েল অ্যাপ বিডিতে নিবন্ধন করেছেন জানিয়ে বলেন, “এটা ভালো উদ্যোগ। সব বাইকারদের অ্যাপের আওতায় আনা গেলে ভোগান্তি দ্রতই কমে যাবে।”

আরেক বাইকার হানিফ সরকার সংবাদকে বলেন, তিনি ঢাকায় রাইড শেয়ারের কাজ করছেন এক বছর ধরে। কখনো পাম্পে এমন ভিড় দেখেননি। হানিফ বলেন, “ভাই তেল লইতে যেই লাইন, সন্ধ্যায় পাম্পে গেলে সকাল হইয়া যায়।”

হানিফ সরকার জানান, তিনি মাঝখানে কয়েকদিন আরেকজন বাইকারের কাছ থেকে তেল কিনেছেন। হানিফের দাবি, ওই বাইকার একটি পাম্পের এক কর্মীর সঙ্গে সমঝোতা করে দিনে একবার, রাতে একবার তেল নেন। তার বাইকের ট্যাংকে ১২ লিটার তেল ধরে। বাসায় গিয়ে ট্যাংক থেকে তেল বের করে দুই লিটারের বোতলে ভরেন। এরপর পরিচিতি বাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।

হানিফ বলেন, “দুই লিটার অকটেন ৫০০ টাকা নেয় ভাই। আগে খ্যাপ মারতো (রাইড শেয়ার)। এখন ছাইড়া দিছে। পাম্পের লোকগো কিছু ভাগ দেয়; তেল আনে আর বেচে। প্রতিদিন চাইর-পাঁচ হাজার টাকা ইনকাম।” তার দাবি, এ কাজ এখন অনেক বাইকারই করছে। তার ভাষায়, “লাইন-ঘাট যেগো আছে, তারা কামাইতাছে।”

খাত সংশ্লিষ্টরা এই পরিস্থিতির নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ‘প্যানিক’ বায়িং, অবৈধ মুজদ, নজরদারিতে সরকারের ঘাটতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৈনিক চাহিদার তুলনায় ‘কম সরবরাহ’।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, পাম্পে মোটরসাইকেলের চাপ কমাতে ফুয়েল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। ঢাকার ১৮টি পাম্পে ইতোমধ্যে কিউআর কোড দিয়ে তেল কেনার পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফুয়েল অ্যাপের তালিকায় সোমবার (২০ এপ্রিল) নতুন যুক্ত হয়েছে ১৯ জেলা। সেগুলো হলো- গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “আমদের তো প্রবলেম বাইক।” তার ভাষ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতেই মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড চালু করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “আমরা ঢাকাকে কিউআর কোড সিস্টেমে আনছি। প্রত্যেকটা বাইকারদের কাছে কিউআর কোড দিয়ে দেব। ওই কিউআর কোড ধরলে কী পরিমাণে তেল সে পাবার কথা পেয়ে যাবে। সারাদিনে অন্য কোনো পাম্পে গিয়ে আর তেল পাবে না।”

পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অস্থির অনেকেই বলছেন, ফুয়েল অ্যাপটা দ্রুত সব বাইকারের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিৎ। এতে ভোগান্তি দ্রুত কমে আসবে।

দেশে যেসব যানবাহন চলাচল করে সেগুলোর মধ্যে বাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার (লেগুনা), লঞ্চ এবং ট্রেন মূলত ডিজেলে চলে। এরমধ্যে কিছু গণপরিহবহন (বাস) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে (সিএনজি) চলে।

ব্যক্তিগত গাড়ি বেশীরভাগই অকটেনে, কিছু সিএনজিতে চলে। কিছু ব্যাক্তিগত গাড়ি (বড় ও শক্তিশালী এসইউভি) ডিজেলেও চলে। সিএনজি চালিত কিছু যানবাহন আবার এলপিজিতে (অটোগ্যাস) রূপান্তর করে চালানো হচ্ছে। কিছু নতুন গাড়িও অটোগ্যাসে রূপান্তর হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬


‘বড় মাথাব্যাথা মোটরবাইক’: রাজধানীতে পাম্প ৮০টি, বাইক ১২ লাখ

প্রকাশের তারিখ : ২০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

  • ঢাকার বাইরের বাইকও চলে রাইড শেয়ারে
  • ‘ফুয়েল অ্যাপে’ সমাধান দেখছেন ভুক্তভোগীরা

বেশ কিছুদিন ধরেই রাজধানীসহ সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ সারি ও গ্রাহকদের চরম ভোগান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশী ভিড় দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের।

সরকার বলছে, ভোক্তাদের এই তেল কেনা, ‘প্যানিক বায়িং’ বা ‘আতঙ্কিত হয়ে কেনার হিড়িক’। সরকারপক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ি, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখের বেশী; যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ৭৫ শতাংশ।

এই মোটরসাইকেল চলে পেট্রোল বা অকটেনে। আর বাইকারদের ভিড় পাম্পগুলোতে সবচেয়ে বেশী। অন্যান্য যানবাহনের লাইনও আছে, তবে তুলনামুলক কম।

বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ি, ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২২ লাখের কিছু বেশী; এরমধ্যে ১২ লাখের মতো মোটরসাইকেল। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র বলছে, ঢাকায় নিবন্ধন করা মোটরসাইকেলের বাইরেও রাজধানীতে অসংখ্য মোটরসাইকেল চালাচল করে, যেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত। এসব বাইকার রাইড শেয়ারের কাজ পেশা হিসেবে নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করেন।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশে সচল পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা দুই হাজার ৩২৯টি। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে আছে ৬০৭টি। তবে রাজধানী ঢাকায় পেট্রোল পাম্প ৮০টি।

আগে ঢাকার বিভিন্ন মহল্লায় এবং সারাদেশেই ছোটখাটো দোকানে খোলা তেল (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) বিক্রি হতো। জরুরি প্রয়োজনে অনেক বাইকার সেসব দোকান থেকে তেল নিত। জ্বালানি খাতে অস্থিরতা শুরুর পর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ওইসব দোকান বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোপনে কিছু দোকান অবশ্য পরিচিতদের কাছে তেল বিক্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

দিনে একটি পাম্পে কয়টি বাইক যায়

বিআরটিএর তথ্য ধরে হিসাব করলে, ঢাকায় ১২ লাখ বাইকার প্রতিদিন তেল নিলে গড়ে প্রতিটি পাম্পে বাইক যাবে ১৫ হাজার। এরসঙ্গে যুক্ত হবে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় নিবন্ধিত যেসব বাইক রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য ঢাকায় চলছে, সেগুলো।

যদি ধরে নেওয়া হয়, ঢাকায় যত বাইক নিবন্ধন হয়েছে, তার অর্ধেক চলে। তাহলেও প্রতিটি পাম্পে দৈনিক ভিড় করবে ৭৫০০ বাইক।

যদি ধরা হয়, ঢাকায় নিবন্ধিত বাইকের এক-তৃতীয়ংশ চলছে, তাহলে রাজধানীর প্রতিটি পাম্পে দৈনিক ভিড় হবে ৫০০০ হাজার বাইকারের।

বাইক চালান এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন সাধারণ বাইকার (যিনি রাইড শেয়ার করেন না) সাধারণত প্রতি সপ্তাহে একবার তেল নেন। ব্যতিক্রম আছেন, তবে সেই সংখ্যা একেবারেই কম।

আর যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের একটা অংশ প্রতিদিন তেল নেন। আরেকটা অংশ একদিন পরপর তেল নেন। সপ্তাহে একবার তেল নেন, রাইড শেয়ার করা এমন বাইকার খুঁজে পাওয়া কঠিন।

কারণ সারাদিন বাইক চালালে, গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ কিলোমিটার চললে ঢাকার যানজটে চার-পাঁচ লিটার তেল অনায়েসেই শেষ হয়ে যায়। আর বাইকের ট্যাংকে সাধারণত ৮ থেকে ১২ লিটার তেল ধরে। অনেকের পকেটে ট্যাংক পুরো করার মতো পর্যাপ্ত টাকা থাকে না।

আবার অনেকে পরদিনের জন্য বেশী তেল ট্যাংকে জমিয়ে রাখতে চান না। কারণ, তিনি পরদিন নিজে না চালিয়ে পরিচিত কাউকে বাইকটা ভাড়া দেবেন; যিনি রাইড শেয়ারের কাজ করেন তবে নিজের বাইক নাই।

প্রকৃত চিত্র কী

যদি এমন ধরা হয়, রাজধানীতে প্রতিদিন ৪ লাখ মোটরসাইকেল চলাচল করে। এরমধ্যে অর্ধেক বা দুই লাখ রাইড শেয়ারের কাজ  করে। তাহলে, দুই লাখ বাইকার সপ্তাহে একবার একটি পাম্পে যান। বাকী দুই লাখ বাইকারের মধ্যে এক লাখ প্রতিদিন, আর এক লাখ বাইকার একদিন পর একদিন কোন না কোন পাম্পে তেল আনতে যান।

এই পরিসংখ্যান ধরে হিসেব করলে, দৈনিক একটি পাম্পে তেল নিতে সাধারণ বাইকার যান ৩৫৭ জনের মতো। রাইড শেয়ার করেন এমন বাইকার যান ১৮৭৫ জনের মতো।

অর্থাৎ, ঢাকার একটি পাম্পে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ২৩২টি মোটরসাইকেল তেল নেয়ার জন্য লাইন ধরে। এলাকা ও সময় ভেদে এই লাইন কখনো দীর্ঘ আবার কখনো কম হয়।

একটি পাম্প যদি দৈনিক ২৪ ঘন্টাই খোলা রাখা হয়, প্রতি মিনিটে গড়ে একটি বাইকে তেল দেয়, তাহলে দিনে মোট এক হাজার ৪৪০টি বাইকে তেল দিতে পারবে। এতে, ৭৯২টি বাইক তেল পাবে না।

তবে বাইকের ট্যাংক খোলা, তেল ভরা, ট্যাংক বন্ধ করা, টাকা দেওয়া- সব মিলিয়ে এক মিনিটে একটা বাইক বিদায় হওয়া কঠিন। আবার, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২৪ ঘন্টা বেশীরভাগ পাম্পই খোলা থাকে না। ‘তেল শেষ’ বলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে অনেক পাম্প। কোন কোন পাম্প সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে বন্ধ করে দেয়। জানতে চাইলে বলে, ‘তেল শেষ’।

সে হিসেবে পাম্পে লম্বা লাইন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এতো বাইক কোথায় ছিল

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কিছুদিন আগেও তো এই লাইন ছিল না। তখন কী বাইকাররা তেল নেয়নি? এর জবাব বাইকারদের কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

মগবাজারের বাসিন্দা শেফিক সুমন সংবাদকে বলেন, তিনি বাইক খুব একটা চালান না। সাধারণত ট্যাংক ভরে তেল নেন। একবার তেল নিলে পনেরো দিনেও পাম্পে যান না। তার দাবি তিনি রোজার ঈদের পরদিন অর্থাৎ ২২ মার্চ তেল নিয়েছিলেন। গতকাল পর্যন্ত আর নিতে হয়নি। তিনি বলেন, “তেলের জন্য যে লাইন দেখি, অতি জরুরি ছাড়া বাইক বেরই করি না। তাই তেল এখনো শেষ হয়নি।”

তিনি ফুয়েল অ্যাপ বিডিতে নিবন্ধন করেছেন জানিয়ে বলেন, “এটা ভালো উদ্যোগ। সব বাইকারদের অ্যাপের আওতায় আনা গেলে ভোগান্তি দ্রতই কমে যাবে।”

আরেক বাইকার হানিফ সরকার সংবাদকে বলেন, তিনি ঢাকায় রাইড শেয়ারের কাজ করছেন এক বছর ধরে। কখনো পাম্পে এমন ভিড় দেখেননি। হানিফ বলেন, “ভাই তেল লইতে যেই লাইন, সন্ধ্যায় পাম্পে গেলে সকাল হইয়া যায়।”

হানিফ সরকার জানান, তিনি মাঝখানে কয়েকদিন আরেকজন বাইকারের কাছ থেকে তেল কিনেছেন। হানিফের দাবি, ওই বাইকার একটি পাম্পের এক কর্মীর সঙ্গে সমঝোতা করে দিনে একবার, রাতে একবার তেল নেন। তার বাইকের ট্যাংকে ১২ লিটার তেল ধরে। বাসায় গিয়ে ট্যাংক থেকে তেল বের করে দুই লিটারের বোতলে ভরেন। এরপর পরিচিতি বাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।

হানিফ বলেন, “দুই লিটার অকটেন ৫০০ টাকা নেয় ভাই। আগে খ্যাপ মারতো (রাইড শেয়ার)। এখন ছাইড়া দিছে। পাম্পের লোকগো কিছু ভাগ দেয়; তেল আনে আর বেচে। প্রতিদিন চাইর-পাঁচ হাজার টাকা ইনকাম।” তার দাবি, এ কাজ এখন অনেক বাইকারই করছে। তার ভাষায়, “লাইন-ঘাট যেগো আছে, তারা কামাইতাছে।”

খাত সংশ্লিষ্টরা এই পরিস্থিতির নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ‘প্যানিক’ বায়িং, অবৈধ মুজদ, নজরদারিতে সরকারের ঘাটতি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৈনিক চাহিদার তুলনায় ‘কম সরবরাহ’।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, পাম্পে মোটরসাইকেলের চাপ কমাতে ফুয়েল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। ঢাকার ১৮টি পাম্পে ইতোমধ্যে কিউআর কোড দিয়ে তেল কেনার পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফুয়েল অ্যাপের তালিকায় সোমবার (২০ এপ্রিল) নতুন যুক্ত হয়েছে ১৯ জেলা। সেগুলো হলো- গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “আমদের তো প্রবলেম বাইক।” তার ভাষ্য, পরিস্থিতি সামাল দিতেই মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড চালু করা হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “আমরা ঢাকাকে কিউআর কোড সিস্টেমে আনছি। প্রত্যেকটা বাইকারদের কাছে কিউআর কোড দিয়ে দেব। ওই কিউআর কোড ধরলে কী পরিমাণে তেল সে পাবার কথা পেয়ে যাবে। সারাদিনে অন্য কোনো পাম্পে গিয়ে আর তেল পাবে না।”

পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অস্থির অনেকেই বলছেন, ফুয়েল অ্যাপটা দ্রুত সব বাইকারের জন্য বাধ্যতামূলক করে দেওয়া উচিৎ। এতে ভোগান্তি দ্রুত কমে আসবে।

দেশে যেসব যানবাহন চলাচল করে সেগুলোর মধ্যে বাস, ট্রাক, হিউম্যান হলার (লেগুনা), লঞ্চ এবং ট্রেন মূলত ডিজেলে চলে। এরমধ্যে কিছু গণপরিহবহন (বাস) তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে (সিএনজি) চলে।

ব্যক্তিগত গাড়ি বেশীরভাগই অকটেনে, কিছু সিএনজিতে চলে। কিছু ব্যাক্তিগত গাড়ি (বড় ও শক্তিশালী এসইউভি) ডিজেলেও চলে। সিএনজি চালিত কিছু যানবাহন আবার এলপিজিতে (অটোগ্যাস) রূপান্তর করে চালানো হচ্ছে। কিছু নতুন গাড়িও অটোগ্যাসে রূপান্তর হচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত