কদিন আগে অবসরে বসে বসে ফেসবুকে রিল দেখছিলাম। হঠাৎ একটা রিলে আটকে যেতে হলো। এক নারী বিড়ালকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন।পরে দেখলাম, বিড়ালটি মৃত। শোকে কাঁদছেন ওই নারী। নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে এলো।
কিছুদিন আগের ঘটনা। রাত ৩টায় কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ভাবছিলাম, হয়তো কোনো শিশু কাঁদছে। কিন্তু না- পাশের ফ্ল্যাট থেকে আসছে কান্নার আওয়াজ।পাঁচ বছরের বিড়াল জেরি মারা গেছে। শোকে হাউমাউ করে কাঁদছেন।
পরদিন সকালে পাশের বাসার একজনের মন্তব্য ছিল, এত কান্নার কী আছে? সামান্য তো একটা বিড়াল। কিন্তু ঘটনা একটা বা দুটো নয়, প্রায়ই দেখা যায়, পোষা বিড়ালের মৃত্যুতে মানুষ কাদে। কখনও কখনও গভীরভাবেই কাঁদে।
বিজ্ঞান বলছে, অতি আদরের বিড়ালের মৃত্যুতে প্রাণীদের এই কান্না নিছক ‘পাগলামি’ নয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর এক বিজ্ঞান। বিবর্তন সূত্র।
বিড়াল মানেই ‘শিশু’: আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মস্তিষ্ক বিড়াল ও মানবশিশুর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারে না। নিউরোসায়েন্স বলে- বিড়ালের মুখ নিওটেনি (শিশুসদৃশ বৈশিষ্ট্য) ট্রিগার করে আপনার প্যারেন্টিং নেটওয়ার্ক। বিড়াল যখন মিউ করে, তখন তার ফ্রিকোয়েন্সি (২২০-৫২০ হার্জ) একটি ক্ষুধার্ত মানবশিশুর কান্নার সঙ্গে মিলে যায়।
পিএলওএস ওয়ান জার্নালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের ‘মিউ’ শুধু মানুষের জন্যই বিবর্তিত হয়েছে। অন্য বিড়ালের জন্য তারা তেমন করে ডাকে না। যে কারণে বিড়াল মারা গেলে আপনার মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া দেয় যেন আপনার সন্তান মারা গেছে। কান্না তাই অনিচ্ছাকৃত।
বন্ধনের রসায়ন: যখন আপনি বিড়ালকে আদর করেন, তখন আপনার ও বিড়ালের- উভয়ের মস্তিষ্কেই অক্সিটোসিন (বন্ধন হরমোন) বেড়ে যায়। জাপানের আজাবু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের দিকে ১০ মিনিট তাকিয়ে থাকলেই মানুষের অক্সিটোসিন ১২ ভাগ বাড়ে। এখন এই হরমোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কী হয়? মস্তিষ্কের পুরস্কার সিস্টেম ভেঙে পড়ে। কান্না তখন এক ধরনের রাসায়নিক প্রত্যাহার- ডোপামিনের ঘাটতি পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা।
রাজধানীর কামরাঙিচরের আলফা বললেন, “আমি চারুকে হারিয়ে এক মাস শুধু কাঁদতাম। বুঝতাম না কেন। ডাক্তার বললেন, আপনার মস্তিষ্কের ‘অ্যাটাচমেন্ট সার্কিট’ আঘাত পেয়েছে।”
একাকী শহরের সঙ্গী: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ঢাকা, চট্টগ্রামের ফ্ল্যাটবাসী অনেকের জন্য বিড়াল একমাত্র সত্তা যার কাছে বিচারহীন ভালোবাসা পাওয়া যায়। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া কিন্তু বিড়াল টের পায় না। আবার চাকরি হারিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন মেজাজে যখন বসে আছেন, তখন বিড়াল আপনার গা ঘেঁষে ঘুমাবে। রাতের নিঃসঙ্গতা আপনাকে দগ্ধ করছে? দেখবেন, বিড়ালের নিঃশ্বাসের শব্দ জানিয়ে দিচ্ছে আপনি একা নন।
মনোবিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ৬৭ ভাগ পোষা বিড়ালের মালিক তাদের বিড়ালকে ‘সন্তানের মতো’ বা ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হিসেবে দেখেন। তাদের হারানো মানে সন্তান হারানোর মতোই। তাই বিড়ালের মৃত্যুতে কান্না কেবল বিড়ালের জন্য নয়- একাকি শহরে ফেলে যাওয়া মানুষের জন্য, যে সম্পর্কের বিকল্প ছিল না, তার জন্য।
কেন কান্না আরও বাড়ে: মানুষের মৃত্যুতে সমাজ সহানুভূতি জানায়, ছুটি দেয়। বিড়াল মারা গেলে অনেকে বলে, ‘আরেকটা কিনে নেন’ অথবা ‘এত কান্না কেন?’এই অনুভূতি ডিসএনফ্রানচাইজড গ্রিফ (অধিকারবঞ্চিত শোক) আরও তীব্র করে।
যন্ত্রণা প্রকাশের সুযোগ না থাকলে তা ভেতরে দমবন্ধ হয়ে পড়ে। ফেটে বেরোয় আরও তীব্র কান্নায়। হার্ভার্ডের অধ্যাপক ড. হ্যারি হ্যারিসনের মতে, “পোষা প্রাণী হারানোর শোক প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকের চেয়ে শারীরবৃত্তীয়ভাবে আলাদা নয়। একমাত্র পার্থক্য হলো সামাজিক স্বীকৃতি।”
কান্না কি ঠিক: আপনি যদি বিড়াল মারা গেলে কাঁদেন, তাহলে বুঝবেন- আপনার ইমোশনাল ব্রেন (লিম্বিক সিস্টেম) ঠিকঠাক কাজ করছে। কান্নার মাধ্যমে স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) ও টক্সিন বেরিয়ে যায়। এটি শরীরের প্রাকৃতিক নিরাময়।যারা কাঁদেন না, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা ও উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
গ্রামে যেখানে বিড়াল ‘ইঁদুর ধরা’ প্রাণী, শহরে তা ‘পারিবারিক সদস্য’। তাই শহরের মানুষের কান্না বেশি তীব্র- এটি অস্বাভাবিক নয়, বরং নগরায়নেরই একটি ফল।
আপনার প্রতিবেশী বিড়াল হারিয়ে হাউমাউ করে কাঁদলে তাকে দুর্বল বা পাগল ভাববেন না। ওই কান্নার ভেতর আছে বিবর্তনের হাজার বছরের প্যারেন্টিং প্রবৃত্তি, আছে অক্সিটোসিনের ভাঙা বন্ধন, আছে নগর নিঃসঙ্গতার নীরব আর্তনাদ।
বিড়াল হয়তো কথা বলে না, কিন্তু তাদের চুপ থাকাটাই আমাদের সবচেয়ে গভীর আবেগ জাগায়। আর সেই আবেগ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়- কান্নাই সবচেয়ে সত্যিকারের বিদায়।কারণ, “যে কাঁদতে পারে না, সেও বাঁচতে পারে না। আর যে বিড়ালের জন্য কাঁদে, সে বোঝে ভালোবাসার কোনো ভাষা নেই।”

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
কদিন আগে অবসরে বসে বসে ফেসবুকে রিল দেখছিলাম। হঠাৎ একটা রিলে আটকে যেতে হলো। এক নারী বিড়ালকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন।পরে দেখলাম, বিড়ালটি মৃত। শোকে কাঁদছেন ওই নারী। নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে এলো।
কিছুদিন আগের ঘটনা। রাত ৩টায় কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ভাবছিলাম, হয়তো কোনো শিশু কাঁদছে। কিন্তু না- পাশের ফ্ল্যাট থেকে আসছে কান্নার আওয়াজ।পাঁচ বছরের বিড়াল জেরি মারা গেছে। শোকে হাউমাউ করে কাঁদছেন।
পরদিন সকালে পাশের বাসার একজনের মন্তব্য ছিল, এত কান্নার কী আছে? সামান্য তো একটা বিড়াল। কিন্তু ঘটনা একটা বা দুটো নয়, প্রায়ই দেখা যায়, পোষা বিড়ালের মৃত্যুতে মানুষ কাদে। কখনও কখনও গভীরভাবেই কাঁদে।
বিজ্ঞান বলছে, অতি আদরের বিড়ালের মৃত্যুতে প্রাণীদের এই কান্না নিছক ‘পাগলামি’ নয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর এক বিজ্ঞান। বিবর্তন সূত্র।
বিড়াল মানেই ‘শিশু’: আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মস্তিষ্ক বিড়াল ও মানবশিশুর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারে না। নিউরোসায়েন্স বলে- বিড়ালের মুখ নিওটেনি (শিশুসদৃশ বৈশিষ্ট্য) ট্রিগার করে আপনার প্যারেন্টিং নেটওয়ার্ক। বিড়াল যখন মিউ করে, তখন তার ফ্রিকোয়েন্সি (২২০-৫২০ হার্জ) একটি ক্ষুধার্ত মানবশিশুর কান্নার সঙ্গে মিলে যায়।
পিএলওএস ওয়ান জার্নালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের ‘মিউ’ শুধু মানুষের জন্যই বিবর্তিত হয়েছে। অন্য বিড়ালের জন্য তারা তেমন করে ডাকে না। যে কারণে বিড়াল মারা গেলে আপনার মস্তিষ্ক প্রতিক্রিয়া দেয় যেন আপনার সন্তান মারা গেছে। কান্না তাই অনিচ্ছাকৃত।
বন্ধনের রসায়ন: যখন আপনি বিড়ালকে আদর করেন, তখন আপনার ও বিড়ালের- উভয়ের মস্তিষ্কেই অক্সিটোসিন (বন্ধন হরমোন) বেড়ে যায়। জাপানের আজাবু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়ালের দিকে ১০ মিনিট তাকিয়ে থাকলেই মানুষের অক্সিটোসিন ১২ ভাগ বাড়ে। এখন এই হরমোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে কী হয়? মস্তিষ্কের পুরস্কার সিস্টেম ভেঙে পড়ে। কান্না তখন এক ধরনের রাসায়নিক প্রত্যাহার- ডোপামিনের ঘাটতি পূরণের ব্যর্থ চেষ্টা।
রাজধানীর কামরাঙিচরের আলফা বললেন, “আমি চারুকে হারিয়ে এক মাস শুধু কাঁদতাম। বুঝতাম না কেন। ডাক্তার বললেন, আপনার মস্তিষ্কের ‘অ্যাটাচমেন্ট সার্কিট’ আঘাত পেয়েছে।”
একাকী শহরের সঙ্গী: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ঢাকা, চট্টগ্রামের ফ্ল্যাটবাসী অনেকের জন্য বিড়াল একমাত্র সত্তা যার কাছে বিচারহীন ভালোবাসা পাওয়া যায়। প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া কিন্তু বিড়াল টের পায় না। আবার চাকরি হারিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন মেজাজে যখন বসে আছেন, তখন বিড়াল আপনার গা ঘেঁষে ঘুমাবে। রাতের নিঃসঙ্গতা আপনাকে দগ্ধ করছে? দেখবেন, বিড়ালের নিঃশ্বাসের শব্দ জানিয়ে দিচ্ছে আপনি একা নন।
মনোবিজ্ঞানীদের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার ৬৭ ভাগ পোষা বিড়ালের মালিক তাদের বিড়ালকে ‘সন্তানের মতো’ বা ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ হিসেবে দেখেন। তাদের হারানো মানে সন্তান হারানোর মতোই। তাই বিড়ালের মৃত্যুতে কান্না কেবল বিড়ালের জন্য নয়- একাকি শহরে ফেলে যাওয়া মানুষের জন্য, যে সম্পর্কের বিকল্প ছিল না, তার জন্য।
কেন কান্না আরও বাড়ে: মানুষের মৃত্যুতে সমাজ সহানুভূতি জানায়, ছুটি দেয়। বিড়াল মারা গেলে অনেকে বলে, ‘আরেকটা কিনে নেন’ অথবা ‘এত কান্না কেন?’এই অনুভূতি ডিসএনফ্রানচাইজড গ্রিফ (অধিকারবঞ্চিত শোক) আরও তীব্র করে।
যন্ত্রণা প্রকাশের সুযোগ না থাকলে তা ভেতরে দমবন্ধ হয়ে পড়ে। ফেটে বেরোয় আরও তীব্র কান্নায়। হার্ভার্ডের অধ্যাপক ড. হ্যারি হ্যারিসনের মতে, “পোষা প্রাণী হারানোর শোক প্রিয়জনের মৃত্যুর শোকের চেয়ে শারীরবৃত্তীয়ভাবে আলাদা নয়। একমাত্র পার্থক্য হলো সামাজিক স্বীকৃতি।”
কান্না কি ঠিক: আপনি যদি বিড়াল মারা গেলে কাঁদেন, তাহলে বুঝবেন- আপনার ইমোশনাল ব্রেন (লিম্বিক সিস্টেম) ঠিকঠাক কাজ করছে। কান্নার মাধ্যমে স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল) ও টক্সিন বেরিয়ে যায়। এটি শরীরের প্রাকৃতিক নিরাময়।যারা কাঁদেন না, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা ও উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
গ্রামে যেখানে বিড়াল ‘ইঁদুর ধরা’ প্রাণী, শহরে তা ‘পারিবারিক সদস্য’। তাই শহরের মানুষের কান্না বেশি তীব্র- এটি অস্বাভাবিক নয়, বরং নগরায়নেরই একটি ফল।
আপনার প্রতিবেশী বিড়াল হারিয়ে হাউমাউ করে কাঁদলে তাকে দুর্বল বা পাগল ভাববেন না। ওই কান্নার ভেতর আছে বিবর্তনের হাজার বছরের প্যারেন্টিং প্রবৃত্তি, আছে অক্সিটোসিনের ভাঙা বন্ধন, আছে নগর নিঃসঙ্গতার নীরব আর্তনাদ।
বিড়াল হয়তো কথা বলে না, কিন্তু তাদের চুপ থাকাটাই আমাদের সবচেয়ে গভীর আবেগ জাগায়। আর সেই আবেগ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়- কান্নাই সবচেয়ে সত্যিকারের বিদায়।কারণ, “যে কাঁদতে পারে না, সেও বাঁচতে পারে না। আর যে বিড়ালের জন্য কাঁদে, সে বোঝে ভালোবাসার কোনো ভাষা নেই।”

আপনার মতামত লিখুন