সংবাদ

খাপড়া ওয়ার্ড জেল হত্যা দিবস


আকমল হোসেন
আকমল হোসেন
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৮ পিএম

খাপড়া ওয়ার্ড জেল হত্যা দিবস
ঐতিহাসিক খাপড়া ওয়ার্ড

শিক্ষাবিদ প্রখ্যাত লেখক ও নোবেল বিজয়ী বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, শাসক যদি জনস্বার্থের বিপক্ষে থাকে সেই দেশে মানুষ,আর লেখক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, যেখানে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয়না সেমখানে ভালো মানুষ জন্মেনা। জ্ঞানীরা কোন কিছুকে প্রতিরোধ করে যুক্তি দিয়ে আর মূর্খরা প্রতিহত করে অস্ত্র দিয়ে। সাম্প্রতিককালে সুফি দর্শণের ফকিরদের উপর হামলা হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াএবং তাদের মাজার ও খানকা ভেঙে দেয়ার ঘটনাই তার জলন্ত উদাহরণ। এ ধরনের পূর্বের ঘটনার কারণে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর জেলখানায় খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।

বাঙালির প্রবাদে বলে ’গড়নের কালে যার ইস্পাত হয় চুরি, বালি দিলে ধার ওঠেনা খালি লোহার ছুরি’ অথবা হয়কাটে ধারে নয়কাটে ভারে’ ৭৬ বছরের ইতিহাসে দুটি বিষয়েরই সত্যতা প্রমানিত হয়েছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। প্রথমটি ঘটেছে ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের নিকট পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আর ২০২৩ সালে এসে রাষ্ট্র হিসেবে দেওলিয়ার পথে পাকিস্তানের গতিপথ রচনা হয়ে। সামরিক শাসন, হত্যা- ক্যুর রাজনীতি পাকিস্তানের পিছু ছাড়ছেনা। জুলাই অভ্যত্থানের পর পাকিস্তানের সেই অচল তত্ব  অনেকেই সামনে আনার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  স¦তসিদ্ধ সত্যকে উপেক্ষা করে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ১৯৪৭সালে সাধের যে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলো, সেই  ইসলামী রাষ্ট্রের আসল চরিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠার কারণে ২২ বছরেই তার মৃতু ঘণ্টা বেজেছিল। ওরা শুধু পূর্ব বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবেই বঞ্চিত করেনি,ভাষা ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে গিয়েছিলো, নারীদের পর্দার অন্তরালে রাখার ব্যবস্থা করেছিল, আজকে যেমনটি করছে আফগান তালেবান ও ইরানি শাসকের । ¯^াধীন মুক্ত চিন্তা ছিলো ওদের তরিকায় নাজায়েজ, এমনকি নারীদের  কপালে টিপ পড়াকে তারা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল শহীদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, বাংলা নববর্ষ পালন ও বাংলা ভাষাকে ওরা হিন্দুয়ানি ভাষার তকমা দিয়ে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। যারা এহেন কাজের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেছিল তাদেরকেই পাকিস্তান সরকার জেলে ঢুকিয়েছিল, জেলের সেলগুলো ভরেছিল সেই সব মানুষ এবং বামপন্থী নেতাকর্মীদের দ্বারা। বাইরে নির্যাতন যেমন ছিল জেলেও ছিল, তার প্রমাণ ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড।

কারাগার বা জেলখানা প্রত্যেক দেশের সরকারের একটি অতি প্রাচীন ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। কারাগার ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের অপরাধ দমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। আদালত কর্তৃক প্রমানিত বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি (কয়েদী) বিচারাধীন বিভিন্ন ব্যক্তি (হাজতি) এমন কি সমাজে নিরাপত্তাহীনতায় অবস্থানকারী মানুষের নিরাপত্তা বিধান করতে পুলিশ সেভ কাস্টোডি এবং জেলখানা গুলি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি একটি সংশোধনাগার হিসেবে পৃথিবীতে ব্যবহার হলেও আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা দেয়। যদিও ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় কারা সপ্তাহে (১৭-২৪) কারাগারগুলিকে সংশোধনাগার হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছিল। কারা সপ্তাহের শ্লোগান ছিল ‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”।

বৃটিশ ও পাকিস্তন আমলে তাদের দ্বারা পরিচালিত জেলখানা ও কারাগারগুলি ছিল টর্চার সেল। তাদের অন্যায় কাজের সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন করাকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে রাজনীতিকদের ঐ সকল জেলখানার অমানবিক পরিবেশে আটকিয়ে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। একই সময় বৃটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবেই ছিল। একজন মানুষ অপরাধ করেছে, সেই অপরাধ করার কারণ কি ? সেটা বের করার জন্য জেলখানাগুলিতে মনোবিজ্ঞানীদের রাখা হতো। সঠিকভাবে কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান দিত। এইভাবে কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে অপরাধ প্রবনতা দুর করার উদ্দ্যোগ নেয়া হতো। অথচ আমাদের দেশের জেলখানাতে ছোটখাট অপরাধী গেলে বড় অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে। ভি, আই, পি, সেলে রাখা হয় দাগী সন্ত্রাসীকে, চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, হত্যাকারীর সাথে রাখা হয় রাজনৈতিক বন্দীদের ফলে পরিবেশগত ক্রুটি ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার জন্য আমাদের দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি। বন্দীদের দেখাশোনা করা বন্দীদের শতভাগ নিরাপত্তা বিধান করা এবং তাদের বিশৃঙ্খল জীবন থেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করে তোলাই কারা প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করার উপর লক্ষ্যের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই ভূ-খন্ডে ¯^াধীনতা প্রাপ্তির পরও জেলখানার সেফ কাস্টডিতে নির্মম হত্যা সংগঠিত হয়েছে, বীরের রক্তস্রোতে জেলখানার সেল ভেসেছে। ¯^াধীন পাকিস্তানে ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে যেমন ঘটেছে, তেমনি ¯^াধীন বাংলাদেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও ঘটেছে। প্রথমটি কারা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ঘটেছে দ্বিতীয়টি কারা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ঘটেছে। তবে দুটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় শাসকের ইন্ধনে ঘটেছে।

সামরিক সরকারের দ্বারাও জেলখানার বিচার ছাড়া অথবা প্রহসনমূলক বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩রা নভে¤^র জেল হত্যা দিবস সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু ধারণা থাকলেও অনেক ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানিনা। বিষয়টি জানাতেই অতীত কিছু ঘটনার আলোকপাত করা দরকার। 


১৯৫০ সালের জেলহত্যা দিবস: ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগসহ অনেকেই আনন্দে বলেছিল হাতমে ঘড়ি মুখমে পান, লরকে লেঙ্গে পাকিস্তান, অন্যদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে করকাতার গড়ের মাঠে সমাবেশ করে  বলেছিল ‘লাখো ইনসান ভুখা হায়, ইয়া আজাদী ঝুটা হায়’ এটি বলার তথাকথিত অপরাধে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করাসহ সারাদেশ থেকে তিন হাজারের বেশি কমিউনিস্ট কর্মীদের জেলে ঢুকিয়ে রেখেছিল মুসলীম লীগ সরকার। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৯ জন বন্দীর ওপর মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলি বর্ষণে নিহত হয়েছিলেন ৭ জন। বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। ঐ সেলে ৩২ জন কমিউনিস্ট বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বন্দী হিসেবে আটক ছিলেন ১৯৫০ সালের পাকিস্থানের নিরাপত্তা আইনে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতী তত্বের ভিত্তিতে ধর্মের আলোকে দেশ বিভাগের বিপক্ষে ছিলেন কমিউনিস্টরা। কোলকাতার গড়ের মাঠে বিশাল সমাবেশ কের কমিউনিস্টরা বলেছিল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়না, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এটাই বলে।

তারা শ্লোগান তুলেছিল লাখো ইনসান ভূখা হায় ইয়াআজাদী ঝুটা হায়। বামপন্থীদের এহেন কার্যক্রমে মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্ট পাটিকে শুধু নিষিদ্ধই করেনি কমিউনিস্ট কর্মীদের বিনা বিচারে জেলে ভরেছিল। পাকিস্থানের সরকারই শুধু নয় জেল কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট বন্দীদের অভিহিত করতো  দেশদ্রোহী ভারতের পঞ্চম বাহিনী ও পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টায় তৎকালীন জেল সুপার মি. বিল সাপ্তাহিক জেল পরিদর্শনে আসে, তার সঙ্গে ছিল জেল ডাক্তার, দুই জন ডেপুটি জেলার, হেড ওয়ার্ডরা, জেল কর্মকর্তা ও সিপাহীরা। 

খাপড়া ওয়ার্ডের বারান্দার জেল সুপারের নিকট ওয়ার্ডের বন্দীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন যশোরের কমরেড আব্দুল হক। জেলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পরিবেশগত উন্নয়নের দাবি জানালে জেলার তাদের ধমক দিয়ে মন্তব্য করে তোমরা দেশদ্রোহী, ভারতের পঞ্চম বাহিনী পাকিস্তানের শত্রু, তোমাদের এর চেয়ে ভাল খাবার দেয়া যাবে না। এই নিয়ে তর্কবির্তকের এক পর্যায়ে মি. বিলের হাতে থাকা বেত দিয়ে বন্দীদের মারতে উদ্যাত হয়। একজন বন্দী বিলের ঐ বেত ধরে ফেলে। ধস্তা ধস্তির এক পর্যায় মি. বিলসহ কয়েকজনকে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়া হয়। মি. বিল বের হয়ে আসেন এবং খাপড়া ওয়ার্ড তালাবদ্ধ করে পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। জেলের সিপাহীরা জানালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। রাজবন্দীরা ঘরের ভিতর থেকে নারিকেলের ছোবড়ার গদি, লোহার খাট চৌকি ইত্যাদি খাড়া করে ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখার চেষ্টা করে কিন্তু গুলির নিকট এই প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়। নিহত হোন ৭ জন কমিউনিস্ট রাজবন্দী। বাকিরা আহত হয়েছিল, যাদের সংখ্যা ৩২ জন। আহত রাজবন্দীদের চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়। রাজশাহীর জেলার তৎকালীন অবাঙালী জেলা প্রশাসক পাকিস্থান নামক শিশু রাষ্ট্রকে যারা ধ্বংস করতে চায়, তাদের প্রতি সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে। কথায় বলে শাসক পরিবর্তন হলেও শাসন পরিবর্তন হয়না,যার কারণে ¯^াধীন বাংলাদেশে ,¯^াধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং জাতীয় চার নেতাকেও জেল হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কিছু মুক্ত চিন্তার মানুষকে জেলের মধ্যে মৃত্যর শিকার হতে দেখা গেছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যিনি মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, ক্ষমতায় যেয়েই তিনি নিপিড়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এটাতো আধুনিক সভ্য সমাজে কারো কাম্য নয়।

মানুষের জন্য কমন কতগুলো ইস্যুতে সরকারি দল, বিরোধী দলের একটা কমন সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। আশাকরি রাজনীতিকরা সেই বিষয়টা ভাববেন,নইলে এই অমানবিকতার শিকার সবাইকে হতে হবে, কাউকে দুদিন আগে বা দুদিন পরে, যার উদাহরণ র‌্যাব গঠন, যারা এটি ˆতরি করেছিলেন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আজ তারা শায়েস্তা হচ্ছেন। নির্বাহি আদেশে রাজনৈতিক দরের কার্যক্রম বন্ধ ইটও কোন গনতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক কালচার হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম  এবং আগামী বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিষয়টি ভাবনায় নিতে হবে।

[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]




আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬


খাপড়া ওয়ার্ড জেল হত্যা দিবস

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

শিক্ষাবিদ প্রখ্যাত লেখক ও নোবেল বিজয়ী বারট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, শাসক যদি জনস্বার্থের বিপক্ষে থাকে সেই দেশে মানুষ,আর লেখক শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, যেখানে দেহের মৃত্যুর হিসাব রাখা কিন্তু মনের মৃত্যুর হিসাব রাখা হয়না সেমখানে ভালো মানুষ জন্মেনা। জ্ঞানীরা কোন কিছুকে প্রতিরোধ করে যুক্তি দিয়ে আর মূর্খরা প্রতিহত করে অস্ত্র দিয়ে। সাম্প্রতিককালে সুফি দর্শণের ফকিরদের উপর হামলা হত্যা, কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াএবং তাদের মাজার ও খানকা ভেঙে দেয়ার ঘটনাই তার জলন্ত উদাহরণ। এ ধরনের পূর্বের ঘটনার কারণে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহীর জেলখানায় খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল।

বাঙালির প্রবাদে বলে ’গড়নের কালে যার ইস্পাত হয় চুরি, বালি দিলে ধার ওঠেনা খালি লোহার ছুরি’ অথবা হয়কাটে ধারে নয়কাটে ভারে’ ৭৬ বছরের ইতিহাসে দুটি বিষয়েরই সত্যতা প্রমানিত হয়েছে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। প্রথমটি ঘটেছে ১৯৭১ সালে পূর্বপাকিস্তানের নিকট পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আর ২০২৩ সালে এসে রাষ্ট্র হিসেবে দেওলিয়ার পথে পাকিস্তানের গতিপথ রচনা হয়ে। সামরিক শাসন, হত্যা- ক্যুর রাজনীতি পাকিস্তানের পিছু ছাড়ছেনা। জুলাই অভ্যত্থানের পর পাকিস্তানের সেই অচল তত্ব  অনেকেই সামনে আনার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  স¦তসিদ্ধ সত্যকে উপেক্ষা করে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ১৯৪৭সালে সাধের যে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলো, সেই  ইসলামী রাষ্ট্রের আসল চরিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠার কারণে ২২ বছরেই তার মৃতু ঘণ্টা বেজেছিল। ওরা শুধু পূর্ব বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবেই বঞ্চিত করেনি,ভাষা ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে গিয়েছিলো, নারীদের পর্দার অন্তরালে রাখার ব্যবস্থা করেছিল, আজকে যেমনটি করছে আফগান তালেবান ও ইরানি শাসকের । ¯^াধীন মুক্ত চিন্তা ছিলো ওদের তরিকায় নাজায়েজ, এমনকি নারীদের  কপালে টিপ পড়াকে তারা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল শহীদ মিনারে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, বাংলা নববর্ষ পালন ও বাংলা ভাষাকে ওরা হিন্দুয়ানি ভাষার তকমা দিয়ে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল। যারা এহেন কাজের সমালোচনা ও প্রতিবাদ করেছিল তাদেরকেই পাকিস্তান সরকার জেলে ঢুকিয়েছিল, জেলের সেলগুলো ভরেছিল সেই সব মানুষ এবং বামপন্থী নেতাকর্মীদের দ্বারা। বাইরে নির্যাতন যেমন ছিল জেলেও ছিল, তার প্রমাণ ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডের হত্যাকাণ্ড।

কারাগার বা জেলখানা প্রত্যেক দেশের সরকারের একটি অতি প্রাচীন ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। কারাগার ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের অপরাধ দমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। আদালত কর্তৃক প্রমানিত বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি (কয়েদী) বিচারাধীন বিভিন্ন ব্যক্তি (হাজতি) এমন কি সমাজে নিরাপত্তাহীনতায় অবস্থানকারী মানুষের নিরাপত্তা বিধান করতে পুলিশ সেভ কাস্টোডি এবং জেলখানা গুলি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি একটি সংশোধনাগার হিসেবে পৃথিবীতে ব্যবহার হলেও আমাদের দেশে ভিন্ন চিত্র দেখা দেয়। যদিও ২০০৮ সালে বাংলাদেশে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় কারা সপ্তাহে (১৭-২৪) কারাগারগুলিকে সংশোধনাগার হিসাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছিল। কারা সপ্তাহের শ্লোগান ছিল ‘রাখিব নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ”।

বৃটিশ ও পাকিস্তন আমলে তাদের দ্বারা পরিচালিত জেলখানা ও কারাগারগুলি ছিল টর্চার সেল। তাদের অন্যায় কাজের সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার আদায়ে আন্দোলন করাকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে রাজনীতিকদের ঐ সকল জেলখানার অমানবিক পরিবেশে আটকিয়ে রেখে নির্যাতন চালানো হতো। একই সময় বৃটেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবেই ছিল। একজন মানুষ অপরাধ করেছে, সেই অপরাধ করার কারণ কি ? সেটা বের করার জন্য জেলখানাগুলিতে মনোবিজ্ঞানীদের রাখা হতো। সঠিকভাবে কারণ অনুসন্ধান করে তার সমাধান দিত। এইভাবে কাজের মধ্য দিয়ে সমাজে অপরাধ প্রবনতা দুর করার উদ্দ্যোগ নেয়া হতো। অথচ আমাদের দেশের জেলখানাতে ছোটখাট অপরাধী গেলে বড় অপরাধী হয়ে বের হয়ে আসে। ভি, আই, পি, সেলে রাখা হয় দাগী সন্ত্রাসীকে, চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, হত্যাকারীর সাথে রাখা হয় রাজনৈতিক বন্দীদের ফলে পরিবেশগত ক্রুটি ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার জন্য আমাদের দেশের জেলখানাগুলো সংশোধনাগার হিসেবে এখনও গড়ে ওঠেনি। বন্দীদের দেখাশোনা করা বন্দীদের শতভাগ নিরাপত্তা বিধান করা এবং তাদের বিশৃঙ্খল জীবন থেকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রস্তুত করে তোলাই কারা প্রশাসনের মূল দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করার উপর লক্ষ্যের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই ভূ-খন্ডে ¯^াধীনতা প্রাপ্তির পরও জেলখানার সেফ কাস্টডিতে নির্মম হত্যা সংগঠিত হয়েছে, বীরের রক্তস্রোতে জেলখানার সেল ভেসেছে। ¯^াধীন পাকিস্তানে ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে যেমন ঘটেছে, তেমনি ¯^াধীন বাংলাদেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও ঘটেছে। প্রথমটি কারা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ঘটেছে দ্বিতীয়টি কারা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ঘটেছে। তবে দুটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় শাসকের ইন্ধনে ঘটেছে।

সামরিক সরকারের দ্বারাও জেলখানার বিচার ছাড়া অথবা প্রহসনমূলক বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩রা নভে¤^র জেল হত্যা দিবস সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু ধারণা থাকলেও অনেক ঘটনা সম্পর্কে আমরা জানিনা। বিষয়টি জানাতেই অতীত কিছু ঘটনার আলোকপাত করা দরকার। 


১৯৫০ সালের জেলহত্যা দিবস: ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগসহ অনেকেই আনন্দে বলেছিল হাতমে ঘড়ি মুখমে পান, লরকে লেঙ্গে পাকিস্তান, অন্যদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে করকাতার গড়ের মাঠে সমাবেশ করে  বলেছিল ‘লাখো ইনসান ভুখা হায়, ইয়া আজাদী ঝুটা হায়’ এটি বলার তথাকথিত অপরাধে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করাসহ সারাদেশ থেকে তিন হাজারের বেশি কমিউনিস্ট কর্মীদের জেলে ঢুকিয়ে রেখেছিল মুসলীম লীগ সরকার। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৯ জন বন্দীর ওপর মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর গুলি বর্ষণে নিহত হয়েছিলেন ৭ জন। বাকিরা সবাই আহত হয়েছিলেন। ঐ সেলে ৩২ জন কমিউনিস্ট বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বন্দী হিসেবে আটক ছিলেন ১৯৫০ সালের পাকিস্থানের নিরাপত্তা আইনে। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতী তত্বের ভিত্তিতে ধর্মের আলোকে দেশ বিভাগের বিপক্ষে ছিলেন কমিউনিস্টরা। কোলকাতার গড়ের মাঠে বিশাল সমাবেশ কের কমিউনিস্টরা বলেছিল, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়না, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এটাই বলে।

তারা শ্লোগান তুলেছিল লাখো ইনসান ভূখা হায় ইয়াআজাদী ঝুটা হায়। বামপন্থীদের এহেন কার্যক্রমে মুসলিম লীগ সরকার কমিউনিস্ট পাটিকে শুধু নিষিদ্ধই করেনি কমিউনিস্ট কর্মীদের বিনা বিচারে জেলে ভরেছিল। পাকিস্থানের সরকারই শুধু নয় জেল কর্তৃপক্ষ কমিউনিস্ট বন্দীদের অভিহিত করতো  দেশদ্রোহী ভারতের পঞ্চম বাহিনী ও পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে। ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টায় তৎকালীন জেল সুপার মি. বিল সাপ্তাহিক জেল পরিদর্শনে আসে, তার সঙ্গে ছিল জেল ডাক্তার, দুই জন ডেপুটি জেলার, হেড ওয়ার্ডরা, জেল কর্মকর্তা ও সিপাহীরা। 

খাপড়া ওয়ার্ডের বারান্দার জেল সুপারের নিকট ওয়ার্ডের বন্দীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন যশোরের কমরেড আব্দুল হক। জেলে খাদ্যের মান বৃদ্ধি পরিবেশগত উন্নয়নের দাবি জানালে জেলার তাদের ধমক দিয়ে মন্তব্য করে তোমরা দেশদ্রোহী, ভারতের পঞ্চম বাহিনী পাকিস্তানের শত্রু, তোমাদের এর চেয়ে ভাল খাবার দেয়া যাবে না। এই নিয়ে তর্কবির্তকের এক পর্যায়ে মি. বিলের হাতে থাকা বেত দিয়ে বন্দীদের মারতে উদ্যাত হয়। একজন বন্দী বিলের ঐ বেত ধরে ফেলে। ধস্তা ধস্তির এক পর্যায় মি. বিলসহ কয়েকজনকে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়া হয়। মি. বিল বের হয়ে আসেন এবং খাপড়া ওয়ার্ড তালাবদ্ধ করে পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। জেলের সিপাহীরা জানালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে। রাজবন্দীরা ঘরের ভিতর থেকে নারিকেলের ছোবড়ার গদি, লোহার খাট চৌকি ইত্যাদি খাড়া করে ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখার চেষ্টা করে কিন্তু গুলির নিকট এই প্রতিরোধ ব্যর্থ হয়। নিহত হোন ৭ জন কমিউনিস্ট রাজবন্দী। বাকিরা আহত হয়েছিল, যাদের সংখ্যা ৩২ জন। আহত রাজবন্দীদের চিকিৎসা না দিয়ে পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়। রাজশাহীর জেলার তৎকালীন অবাঙালী জেলা প্রশাসক পাকিস্থান নামক শিশু রাষ্ট্রকে যারা ধ্বংস করতে চায়, তাদের প্রতি সঠিক ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে। কথায় বলে শাসক পরিবর্তন হলেও শাসন পরিবর্তন হয়না,যার কারণে ¯^াধীন বাংলাদেশে ,¯^াধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী এবং জাতীয় চার নেতাকেও জেল হত্যার শিকার হতে হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কিছু মুক্ত চিন্তার মানুষকে জেলের মধ্যে মৃত্যর শিকার হতে দেখা গেছে। বিরোধী দলে থাকার সময় যিনি মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, ক্ষমতায় যেয়েই তিনি নিপিড়নের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এটাতো আধুনিক সভ্য সমাজে কারো কাম্য নয়।

মানুষের জন্য কমন কতগুলো ইস্যুতে সরকারি দল, বিরোধী দলের একটা কমন সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন। আশাকরি রাজনীতিকরা সেই বিষয়টা ভাববেন,নইলে এই অমানবিকতার শিকার সবাইকে হতে হবে, কাউকে দুদিন আগে বা দুদিন পরে, যার উদাহরণ র‌্যাব গঠন, যারা এটি ˆতরি করেছিলেন প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আজ তারা শায়েস্তা হচ্ছেন। নির্বাহি আদেশে রাজনৈতিক দরের কার্যক্রম বন্ধ ইটও কোন গনতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক কালচার হওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যত প্রজন্ম  এবং আগামী বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিষয়টি ভাবনায় নিতে হবে।

[লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি]





সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত