সংবাদ

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

বালাইনাশকের অপব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ


প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম

বালাইনাশকের অপব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ
কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে

উচ্চফলনশীল (উফশী) ফসলের ব্যবহার শুরু হয়| এর পাশাপাশি কৃষিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান— যেমন সার

ও বালাইনাশকের—প্রচলন বাড়তে থাকে| এখানে বালাইনাশক বলতে মূলত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও

আগাছানাশককে বোঝানো হয়েছে|

উফশী যুগের শুরুর দিকে এসব বালাইনাশকের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না; গাছের পুষ্টি ও পানির চাহিদা পূরণ

করলেই ভালো ফলন পাওয়া যেত| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে| ফসলের নিবিড়তা বাড়ার

সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়| ফলে এসব বালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করতে

বালাইনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে|

এর ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক অবস্থারও

উন্নতি হয়েছে| তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা| বালাইনাশকের

সঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং নির্বিচার ব্যবহার মানুষের ¯^াস্থ্য,

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে| ¯^ল্পমেয়াদে

খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই অপব্যবহার আজ ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই এক বড়

হুমকি হয়ে উঠেছে|

কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা|

কিন্তু বাস্তবে এই পদার্থগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকামাকড় ছাড়াও নিরীহ ও উপকারী প্রাণীরও ক্ষতি করে

থাকে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষও এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না|

কৃষিক্ষেত্রে যারা সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করেন— যেমন কৃষক ও শ্রমিক—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

থাকেন| কীটনাশক মিশ্রণ ˆতরি করা, স্প্রে করা বা সংরক্ষণ করার সময় তারা সরাসরি এইসব বিষাক্ত

পদার্থসমূহের সংস্পর্শে আসেন| ফলে তাদের মধ্যে তীব্র বিষক্রিয়া যেমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোখ

জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ইত্যাদি লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে| এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে|

তবে বিপদের সীমা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়| বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি এবং বাতাসের

মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে| আমরা যে ফল, সবজি বা শস্য প্রতিদিন খাই, তার

অনেকগুলোতেই অল্প পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি অ¯^াভাবিক নয়| দীর্ঘদিন ধরে এই অল্পমাত্রার বিষ

গ্রহণ আমাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়| গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি

কীটনাশকের সংস্পর্শ পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (যেমন লিউকেমিয়া,

লিম্ফোমা, প্রোস্টেট ক্যানসার), হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত|

শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, বুদ্ধিমত্তা

কমে যায় এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়| গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি,

কারণ তাদের শরীর এসব বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে দুর্বল|

মানব¯^াস্থ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে|

প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যেখানে সবাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তু

কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়| বিশেষ করে বিস্তৃত-প্রভাবী কীটনাশক শুধু

ক্ষতিকর পোকামাকড়ই নয়, বরং উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও ধ্বংস করে| উদাহরণ হিসেবে

নিওনিকোটিনয়েড নামক এক ধরনের বালাইনাশককে ধরা যায়| এই বালাইনাশক গাছের শিকড় থেকে শুরু করে

পাতা, ফুল এমনকি মধু ও পরাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে| ফলে মৌমাছি, ভ্রমর এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী

পোকামাকড় যখন এই গাছের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা বিষক্রিয়ার শিকার হয়|

পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি ˆবশ্বিক খাদ্য

নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি| পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এই

পরাগায়নকারীদের ওপর নির্ভরশীল| যদি এদের সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনও কমে যাবে, যা

ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের কারণ হতে পারে| এছাড়া পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীল

পাখি, বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যও কমে যায়| আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ‘আপাত-

অপ্রয়োজনীয়’ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যায়, যেগুলো আসলে অনেক উপকারী পোকামাকড়ের জন্য খাদ্য ও

আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত| একইভাবে, ছত্রাকনাশক মাটির উপকারী ছত্রাক ধ্বংস করে, যা গাছের পুষ্টি

গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এভাবে ধীরে ধীরে একটি জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে

এবং তার জায়গায় ˆতরি হয় দুর্বল ও একঘেয়ে পরিবেশ|

বালাইনাশকের পরিবেশগত প্রভাব এখানেই শেষ নয়; মাটি, পানি এবং বাতাসও বালাইনাশকের কারণে দূষিত হয়|

ফসলের ওপর স্প্রে করা কীটনাশকের একটি বড় অংশ বাতাসে ভেসে বা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দূরবর্তী

স্থানের মাটিতে বা জলাশয়ে পৌঁছে যায়| মাটিতে থাকা অগণিত ক্ষুদ্র জীব— যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,

প্রোটোজোয়া এবং কেঁচো—মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| কিন্তু বালাইনাশক

এই উপকারী জীবগুলোকে ধ্বংস করে, যার ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়, পুষ্টি চক্র ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে

মাটির উর্বরতা কমে যায়|

পানি দূষণের ক্ষেত্রেও বালাইনাশক একটি বড় সমস্যা| এগুলো নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে জলজ

প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে| মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী এতে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়,

প্রজননে ব্যর্থ হয় বা আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হয়| কিছু ক্ষেত্রে পানিতে অতিরিক্ত ˆশবাল জন্মায়, যা

পরে পচে গিয়ে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়| এর ফলে ‘মৃত অঞ্চল’ ˆতরি হয়, যেখানে কোনো প্রাণ বাঁচতে

পারে না|

এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—বালাইনাশকের ওপর অতিরিক্ত

নির্ভরশীলতা আমাদেরকে এক ধরনের ‘বালাইনাশক ট্রেডমিল’-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে| অর্থাৎ, পোকামাকড়

ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে একই ফল পেতে হলে আরও বেশি বা আরও

শক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে খরচ বাড়ে, পরিবেশের ক্ষতি বাড়ে এবং মানুষের

¯^াস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে| এই চক্র থেকে বের হওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে|

সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি| বালাইনাশকের নির্ভরতা

কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে| সমšি^ত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) একটি

যুতসই ব্যবস্থা হতে পারে| এটা এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক উপায়, ˆজব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজেন

সঠিক মাত্রায় ¯^ল্পকালীন-জবংরফঁধষ প্রভাবসমৃদ্ধ বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা

হয়| এর পাশাপাশি ফসলের ˆবচিত্র্য বৃদ্ধি, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং মাটির ¯^াস্থ্য রক্ষা—এসব

বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া জরুরি| প্রসঙ্গত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই ˆজবচাষের পরামর্শ

দিয়ে থাকেন| কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে সহসা ˆজবচাষের প্রচলন করতে গেলে দেশে প্রচণ্ড

খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পরে| এজন্য সবধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ধীরে

ধীরে এগোতে হবে| তারপরেও সারাদেশের জন্য এই ধরনের চাষ প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে হয় না|

একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি| কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ

সরঞ্জামের ব্যবহার এবং বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি|

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বালাইনাশকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি

করা|

সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা

হওয়ার কথা নয়; মূল সমস্যা ˆতরি হয় এর অপব্যবহার থেকে| কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখন সেই সঠিক

অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি| একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের মধ্যেই

সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের ¯^াস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে

জড়িত| আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ এসব বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর| তাই

এখনই সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার|

[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬


বালাইনাশকের অপব্যবহারে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ

প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে

উচ্চফলনশীল (উফশী) ফসলের ব্যবহার শুরু হয়| এর পাশাপাশি কৃষিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান— যেমন সার

ও বালাইনাশকের—প্রচলন বাড়তে থাকে| এখানে বালাইনাশক বলতে মূলত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও

আগাছানাশককে বোঝানো হয়েছে|

উফশী যুগের শুরুর দিকে এসব বালাইনাশকের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না; গাছের পুষ্টি ও পানির চাহিদা পূরণ

করলেই ভালো ফলন পাওয়া যেত| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে| ফসলের নিবিড়তা বাড়ার

সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়| ফলে এসব বালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করতে

বালাইনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে|

এর ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক অবস্থারও

উন্নতি হয়েছে| তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা| বালাইনাশকের

সঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং নির্বিচার ব্যবহার মানুষের ¯^াস্থ্য,

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে| ¯^ল্পমেয়াদে

খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই অপব্যবহার আজ ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই এক বড়

হুমকি হয়ে উঠেছে|

কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা|

কিন্তু বাস্তবে এই পদার্থগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকামাকড় ছাড়াও নিরীহ ও উপকারী প্রাণীরও ক্ষতি করে

থাকে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষও এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না|

কৃষিক্ষেত্রে যারা সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করেন— যেমন কৃষক ও শ্রমিক—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

থাকেন| কীটনাশক মিশ্রণ ˆতরি করা, স্প্রে করা বা সংরক্ষণ করার সময় তারা সরাসরি এইসব বিষাক্ত

পদার্থসমূহের সংস্পর্শে আসেন| ফলে তাদের মধ্যে তীব্র বিষক্রিয়া যেমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোখ

জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ইত্যাদি লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে| এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে|

তবে বিপদের সীমা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়| বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি এবং বাতাসের

মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে| আমরা যে ফল, সবজি বা শস্য প্রতিদিন খাই, তার

অনেকগুলোতেই অল্প পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি অ¯^াভাবিক নয়| দীর্ঘদিন ধরে এই অল্পমাত্রার বিষ

গ্রহণ আমাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়| গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি

কীটনাশকের সংস্পর্শ পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (যেমন লিউকেমিয়া,

লিম্ফোমা, প্রোস্টেট ক্যানসার), হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত|

শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, বুদ্ধিমত্তা

কমে যায় এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়| গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি,

কারণ তাদের শরীর এসব বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে দুর্বল|


মানব¯^াস্থ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে|

প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যেখানে সবাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তু

কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়| বিশেষ করে বিস্তৃত-প্রভাবী কীটনাশক শুধু

ক্ষতিকর পোকামাকড়ই নয়, বরং উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও ধ্বংস করে| উদাহরণ হিসেবে

নিওনিকোটিনয়েড নামক এক ধরনের বালাইনাশককে ধরা যায়| এই বালাইনাশক গাছের শিকড় থেকে শুরু করে

পাতা, ফুল এমনকি মধু ও পরাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে| ফলে মৌমাছি, ভ্রমর এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী

পোকামাকড় যখন এই গাছের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা বিষক্রিয়ার শিকার হয়|

পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি ˆবশ্বিক খাদ্য

নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি| পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এই

পরাগায়নকারীদের ওপর নির্ভরশীল| যদি এদের সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনও কমে যাবে, যা

ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের কারণ হতে পারে| এছাড়া পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীল

পাখি, বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যও কমে যায়| আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ‘আপাত-

অপ্রয়োজনীয়’ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যায়, যেগুলো আসলে অনেক উপকারী পোকামাকড়ের জন্য খাদ্য ও

আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত| একইভাবে, ছত্রাকনাশক মাটির উপকারী ছত্রাক ধ্বংস করে, যা গাছের পুষ্টি

গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এভাবে ধীরে ধীরে একটি জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে

এবং তার জায়গায় ˆতরি হয় দুর্বল ও একঘেয়ে পরিবেশ|

বালাইনাশকের পরিবেশগত প্রভাব এখানেই শেষ নয়; মাটি, পানি এবং বাতাসও বালাইনাশকের কারণে দূষিত হয়|

ফসলের ওপর স্প্রে করা কীটনাশকের একটি বড় অংশ বাতাসে ভেসে বা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দূরবর্তী

স্থানের মাটিতে বা জলাশয়ে পৌঁছে যায়| মাটিতে থাকা অগণিত ক্ষুদ্র জীব— যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,

প্রোটোজোয়া এবং কেঁচো—মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| কিন্তু বালাইনাশক

এই উপকারী জীবগুলোকে ধ্বংস করে, যার ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়, পুষ্টি চক্র ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে

মাটির উর্বরতা কমে যায়|

পানি দূষণের ক্ষেত্রেও বালাইনাশক একটি বড় সমস্যা| এগুলো নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে জলজ

প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে| মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী এতে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়,

প্রজননে ব্যর্থ হয় বা আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হয়| কিছু ক্ষেত্রে পানিতে অতিরিক্ত ˆশবাল জন্মায়, যা

পরে পচে গিয়ে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়| এর ফলে ‘মৃত অঞ্চল’ ˆতরি হয়, যেখানে কোনো প্রাণ বাঁচতে

পারে না|

এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—বালাইনাশকের ওপর অতিরিক্ত

নির্ভরশীলতা আমাদেরকে এক ধরনের ‘বালাইনাশক ট্রেডমিল’-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে| অর্থাৎ, পোকামাকড়

ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে একই ফল পেতে হলে আরও বেশি বা আরও

শক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে খরচ বাড়ে, পরিবেশের ক্ষতি বাড়ে এবং মানুষের

¯^াস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে| এই চক্র থেকে বের হওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে|

সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি| বালাইনাশকের নির্ভরতা

কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে| সমšি^ত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) একটি

যুতসই ব্যবস্থা হতে পারে| এটা এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক উপায়, ˆজব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজেন

সঠিক মাত্রায় ¯^ল্পকালীন-জবংরফঁধষ প্রভাবসমৃদ্ধ বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা

হয়| এর পাশাপাশি ফসলের ˆবচিত্র্য বৃদ্ধি, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং মাটির ¯^াস্থ্য রক্ষা—এসব

বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া জরুরি| প্রসঙ্গত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই ˆজবচাষের পরামর্শ

দিয়ে থাকেন| কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে সহসা ˆজবচাষের প্রচলন করতে গেলে দেশে প্রচণ্ড

খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পরে| এজন্য সবধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ধীরে

ধীরে এগোতে হবে| তারপরেও সারাদেশের জন্য এই ধরনের চাষ প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে হয় না|

একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি| কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ

সরঞ্জামের ব্যবহার এবং বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি|

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বালাইনাশকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি

করা|

সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা

হওয়ার কথা নয়; মূল সমস্যা ˆতরি হয় এর অপব্যবহার থেকে| কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখন সেই সঠিক

অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি| একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের মধ্যেই

সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের ¯^াস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে

জড়িত| আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ এসব বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর| তাই

এখনই সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার|

[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত