বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে
উচ্চফলনশীল (উফশী) ফসলের ব্যবহার শুরু হয়| এর পাশাপাশি কৃষিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান— যেমন সার
ও বালাইনাশকের—প্রচলন বাড়তে থাকে| এখানে বালাইনাশক বলতে মূলত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও
আগাছানাশককে বোঝানো হয়েছে|
উফশী যুগের শুরুর দিকে এসব বালাইনাশকের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না; গাছের পুষ্টি ও পানির চাহিদা পূরণ
করলেই ভালো ফলন পাওয়া যেত| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে| ফসলের নিবিড়তা বাড়ার
সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়| ফলে এসব বালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করতে
বালাইনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে|
এর ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক অবস্থারও
উন্নতি হয়েছে| তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা| বালাইনাশকের
সঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং নির্বিচার ব্যবহার মানুষের ¯^াস্থ্য,
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে| ¯^ল্পমেয়াদে
খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই অপব্যবহার আজ ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই এক বড়
হুমকি হয়ে উঠেছে|
কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা|
কিন্তু বাস্তবে এই পদার্থগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকামাকড় ছাড়াও নিরীহ ও উপকারী প্রাণীরও ক্ষতি করে
থাকে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষও এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না|
কৃষিক্ষেত্রে যারা সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করেন— যেমন কৃষক ও শ্রমিক—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
থাকেন| কীটনাশক মিশ্রণ ˆতরি করা, স্প্রে করা বা সংরক্ষণ করার সময় তারা সরাসরি এইসব বিষাক্ত
পদার্থসমূহের সংস্পর্শে আসেন| ফলে তাদের মধ্যে তীব্র বিষক্রিয়া যেমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোখ
জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ইত্যাদি লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে| এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে|
তবে বিপদের সীমা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়| বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি এবং বাতাসের
মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে| আমরা যে ফল, সবজি বা শস্য প্রতিদিন খাই, তার
অনেকগুলোতেই অল্প পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি অ¯^াভাবিক নয়| দীর্ঘদিন ধরে এই অল্পমাত্রার বিষ
গ্রহণ আমাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়| গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি
কীটনাশকের সংস্পর্শ পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (যেমন লিউকেমিয়া,
লিম্ফোমা, প্রোস্টেট ক্যানসার), হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত|
শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, বুদ্ধিমত্তা
কমে যায় এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়| গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি,
কারণ তাদের শরীর এসব বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে দুর্বল|
মানব¯^াস্থ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে|
প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যেখানে সবাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তু
কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়| বিশেষ করে বিস্তৃত-প্রভাবী কীটনাশক শুধু
ক্ষতিকর পোকামাকড়ই নয়, বরং উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও ধ্বংস করে| উদাহরণ হিসেবে
নিওনিকোটিনয়েড নামক এক ধরনের বালাইনাশককে ধরা যায়| এই বালাইনাশক গাছের শিকড় থেকে শুরু করে
পাতা, ফুল এমনকি মধু ও পরাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে| ফলে মৌমাছি, ভ্রমর এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী
পোকামাকড় যখন এই গাছের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা বিষক্রিয়ার শিকার হয়|
পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি ˆবশ্বিক খাদ্য
নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি| পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এই
পরাগায়নকারীদের ওপর নির্ভরশীল| যদি এদের সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনও কমে যাবে, যা
ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের কারণ হতে পারে| এছাড়া পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীল
পাখি, বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যও কমে যায়| আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ‘আপাত-
অপ্রয়োজনীয়’ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যায়, যেগুলো আসলে অনেক উপকারী পোকামাকড়ের জন্য খাদ্য ও
আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত| একইভাবে, ছত্রাকনাশক মাটির উপকারী ছত্রাক ধ্বংস করে, যা গাছের পুষ্টি
গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এভাবে ধীরে ধীরে একটি জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে
এবং তার জায়গায় ˆতরি হয় দুর্বল ও একঘেয়ে পরিবেশ|
বালাইনাশকের পরিবেশগত প্রভাব এখানেই শেষ নয়; মাটি, পানি এবং বাতাসও বালাইনাশকের কারণে দূষিত হয়|
ফসলের ওপর স্প্রে করা কীটনাশকের একটি বড় অংশ বাতাসে ভেসে বা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দূরবর্তী
স্থানের মাটিতে বা জলাশয়ে পৌঁছে যায়| মাটিতে থাকা অগণিত ক্ষুদ্র জীব— যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,
প্রোটোজোয়া এবং কেঁচো—মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| কিন্তু বালাইনাশক
এই উপকারী জীবগুলোকে ধ্বংস করে, যার ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়, পুষ্টি চক্র ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে
মাটির উর্বরতা কমে যায়|
পানি দূষণের ক্ষেত্রেও বালাইনাশক একটি বড় সমস্যা| এগুলো নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে জলজ
প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে| মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী এতে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়,
প্রজননে ব্যর্থ হয় বা আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হয়| কিছু ক্ষেত্রে পানিতে অতিরিক্ত ˆশবাল জন্মায়, যা
পরে পচে গিয়ে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়| এর ফলে ‘মৃত অঞ্চল’ ˆতরি হয়, যেখানে কোনো প্রাণ বাঁচতে
পারে না|
এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—বালাইনাশকের ওপর অতিরিক্ত
নির্ভরশীলতা আমাদেরকে এক ধরনের ‘বালাইনাশক ট্রেডমিল’-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে| অর্থাৎ, পোকামাকড়
ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে একই ফল পেতে হলে আরও বেশি বা আরও
শক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে খরচ বাড়ে, পরিবেশের ক্ষতি বাড়ে এবং মানুষের
¯^াস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে| এই চক্র থেকে বের হওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে|
সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি| বালাইনাশকের নির্ভরতা
কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে| সমšি^ত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) একটি
যুতসই ব্যবস্থা হতে পারে| এটা এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক উপায়, ˆজব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজেন
সঠিক মাত্রায় ¯^ল্পকালীন-জবংরফঁধষ প্রভাবসমৃদ্ধ বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা
হয়| এর পাশাপাশি ফসলের ˆবচিত্র্য বৃদ্ধি, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং মাটির ¯^াস্থ্য রক্ষা—এসব
বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া জরুরি| প্রসঙ্গত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই ˆজবচাষের পরামর্শ
দিয়ে থাকেন| কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে সহসা ˆজবচাষের প্রচলন করতে গেলে দেশে প্রচণ্ড
খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পরে| এজন্য সবধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ধীরে
ধীরে এগোতে হবে| তারপরেও সারাদেশের জন্য এই ধরনের চাষ প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে হয় না|
একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি| কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ
সরঞ্জামের ব্যবহার এবং বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি|
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বালাইনাশকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি
করা|
সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা
হওয়ার কথা নয়; মূল সমস্যা ˆতরি হয় এর অপব্যবহার থেকে| কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখন সেই সঠিক
অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি| একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের ¯^াস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে
জড়িত| আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ এসব বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর| তাই
এখনই সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার|
[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে
উচ্চফলনশীল (উফশী) ফসলের ব্যবহার শুরু হয়| এর পাশাপাশি কৃষিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান— যেমন সার
ও বালাইনাশকের—প্রচলন বাড়তে থাকে| এখানে বালাইনাশক বলতে মূলত কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও
আগাছানাশককে বোঝানো হয়েছে|
উফশী যুগের শুরুর দিকে এসব বালাইনাশকের খুব বেশি প্রয়োজন হতো না; গাছের পুষ্টি ও পানির চাহিদা পূরণ
করলেই ভালো ফলন পাওয়া যেত| কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে| ফসলের নিবিড়তা বাড়ার
সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়| ফলে এসব বালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করতে
বালাইনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে|
এর ফলে ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক অবস্থারও
উন্নতি হয়েছে| তবে এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা| বালাইনাশকের
সঠিক নিয়ম না মেনে ব্যবহার, মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ এবং নির্বিচার ব্যবহার মানুষের ¯^াস্থ্য,
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে| ¯^ল্পমেয়াদে
খাদ্যচাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই অপব্যবহার আজ ধীরে ধীরে আমাদের অস্তিত্বের জন্যই এক বড়
হুমকি হয়ে উঠেছে|
কীটনাশক মূলত জীবহত্যাকারী রাসায়নিক পদার্থ, যাদের কাজ হলো নির্দিষ্ট জীব বা পোকামাকড় ধ্বংস করা|
কিন্তু বাস্তবে এই পদার্থগুলো নির্দিষ্ট ক্ষতিকর পোকামাকড় ছাড়াও নিরীহ ও উপকারী প্রাণীরও ক্ষতি করে
থাকে| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মানুষও এসব পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না|
কৃষিক্ষেত্রে যারা সরাসরি কীটনাশক ব্যবহার করেন— যেমন কৃষক ও শ্রমিক—তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
থাকেন| কীটনাশক মিশ্রণ ˆতরি করা, স্প্রে করা বা সংরক্ষণ করার সময় তারা সরাসরি এইসব বিষাক্ত
পদার্থসমূহের সংস্পর্শে আসেন| ফলে তাদের মধ্যে তীব্র বিষক্রিয়া যেমন বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, চোখ
জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি ইত্যাদি লক্ষ্মণ দেখা দিতে পারে| এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে|
তবে বিপদের সীমা শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়| বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ খাদ্য, পানি এবং বাতাসের
মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে| আমরা যে ফল, সবজি বা শস্য প্রতিদিন খাই, তার
অনেকগুলোতেই অল্প পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি অ¯^াভাবিক নয়| দীর্ঘদিন ধরে এই অল্পমাত্রার বিষ
গ্রহণ আমাদের শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়| গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি
কীটনাশকের সংস্পর্শ পারকিনসনস রোগ, আলঝেইমার, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার (যেমন লিউকেমিয়া,
লিম্ফোমা, প্রোস্টেট ক্যানসার), হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রজনন ক্ষমতার হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত|
শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে—তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়, বুদ্ধিমত্তা
কমে যায় এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়| গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি,
কারণ তাদের শরীর এসব বিষাক্ত পদার্থের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে দুর্বল|
মানব¯^াস্থ্যের পাশাপাশি কীটনাশকের অপব্যবহার জীববৈচিত্র্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে|
প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের অংশ, যেখানে সবাই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল| কিন্তু
কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে ভেঙে দেয়| বিশেষ করে বিস্তৃত-প্রভাবী কীটনাশক শুধু
ক্ষতিকর পোকামাকড়ই নয়, বরং উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও ধ্বংস করে| উদাহরণ হিসেবে
নিওনিকোটিনয়েড নামক এক ধরনের বালাইনাশককে ধরা যায়| এই বালাইনাশক গাছের শিকড় থেকে শুরু করে
পাতা, ফুল এমনকি মধু ও পরাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে| ফলে মৌমাছি, ভ্রমর এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী
পোকামাকড় যখন এই গাছের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা বিষক্রিয়ার শিকার হয়|
পরাগায়নকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি ˆবশ্বিক খাদ্য
নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি| পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এই
পরাগায়নকারীদের ওপর নির্ভরশীল| যদি এদের সংখ্যা কমে যায়, তাহলে ফসল উৎপাদনও কমে যাবে, যা
ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের কারণ হতে পারে| এছাড়া পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে গেলে তাদের ওপর নির্ভরশীল
পাখি, বাদুড় এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যও কমে যায়| আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে অনেক ‘আপাত-
অপ্রয়োজনীয়’ উদ্ভিদ ধ্বংস হয়ে যায়, যেগুলো আসলে অনেক উপকারী পোকামাকড়ের জন্য খাদ্য ও
আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করত| একইভাবে, ছত্রাকনাশক মাটির উপকারী ছত্রাক ধ্বংস করে, যা গাছের পুষ্টি
গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এভাবে ধীরে ধীরে একটি জটিল ও প্রাণবন্ত বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ে
এবং তার জায়গায় ˆতরি হয় দুর্বল ও একঘেয়ে পরিবেশ|
বালাইনাশকের পরিবেশগত প্রভাব এখানেই শেষ নয়; মাটি, পানি এবং বাতাসও বালাইনাশকের কারণে দূষিত হয়|
ফসলের ওপর স্প্রে করা কীটনাশকের একটি বড় অংশ বাতাসে ভেসে বা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে দূরবর্তী
স্থানের মাটিতে বা জলাশয়ে পৌঁছে যায়| মাটিতে থাকা অগণিত ক্ষুদ্র জীব— যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক,
প্রোটোজোয়া এবং কেঁচো—মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| কিন্তু বালাইনাশক
এই উপকারী জীবগুলোকে ধ্বংস করে, যার ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়, পুষ্টি চক্র ব্যাহত হয় এবং ধীরে ধীরে
মাটির উর্বরতা কমে যায়|
পানি দূষণের ক্ষেত্রেও বালাইনাশক একটি বড় সমস্যা| এগুলো নদী, হ্রদ এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে জলজ
প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে ওঠে| মাছসহ অনেক জলজ প্রাণী এতে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়,
প্রজননে ব্যর্থ হয় বা আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হয়| কিছু ক্ষেত্রে পানিতে অতিরিক্ত ˆশবাল জন্মায়, যা
পরে পচে গিয়ে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয়| এর ফলে ‘মৃত অঞ্চল’ ˆতরি হয়, যেখানে কোনো প্রাণ বাঁচতে
পারে না|
এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে—বালাইনাশকের ওপর অতিরিক্ত
নির্ভরশীলতা আমাদেরকে এক ধরনের ‘বালাইনাশক ট্রেডমিল’-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছে| অর্থাৎ, পোকামাকড়
ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ফলে একই ফল পেতে হলে আরও বেশি বা আরও
শক্তিশালী বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে খরচ বাড়ে, পরিবেশের ক্ষতি বাড়ে এবং মানুষের
¯^াস্থ্যঝুঁকিও বাড়তে থাকে| এই চক্র থেকে বের হওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে|
সমাধানের পথ হিসেবে আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি| বালাইনাশকের নির্ভরতা
কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পদ্ধতির দিকে এগোতে হবে| সমšি^ত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) একটি
যুতসই ব্যবস্থা হতে পারে| এটা এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রাকৃতিক উপায়, ˆজব নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজেন
সঠিক মাত্রায় ¯^ল্পকালীন-জবংরফঁধষ প্রভাবসমৃদ্ধ বালাইনাশক ব্যবহার করে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা
হয়| এর পাশাপাশি ফসলের ˆবচিত্র্য বৃদ্ধি, উপকারী পোকামাকড় সংরক্ষণ এবং মাটির ¯^াস্থ্য রক্ষা—এসব
বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া জরুরি| প্রসঙ্গত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অনেকেই ˆজবচাষের পরামর্শ
দিয়ে থাকেন| কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে সহসা ˆজবচাষের প্রচলন করতে গেলে দেশে প্রচণ্ড
খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পরে| এজন্য সবধরনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো নিয়ে পরিকল্পনামাফিক ধীরে
ধীরে এগোতে হবে| তারপরেও সারাদেশের জন্য এই ধরনের চাষ প্রযোজ্য হতে পারে বলে মনে হয় না|
একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি| কৃষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ, নিরাপদ
সরঞ্জামের ব্যবহার এবং বালাইনাশকের সঠিক মাত্রা ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি|
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত বালাইনাশকের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি
করা|
সবশেষে বলা যায়, বালাইনাশক সঠিকভাবে ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা
হওয়ার কথা নয়; মূল সমস্যা ˆতরি হয় এর অপব্যবহার থেকে| কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এখন সেই সঠিক
অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছি| একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা শুধু বেশি ফসল উৎপাদনের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের ¯^াস্থ্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে
জড়িত| আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ এসব বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি তার ওপর| তাই
এখনই সময় সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার|
[লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

আপনার মতামত লিখুন