সংবাদ

বিশ্লেষণ: টর্চ জ্বালিয়ে রাতে সংঘর্ষ কি আদিম রণকৌশল


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

বিশ্লেষণ: টর্চ জ্বালিয়ে রাতে সংঘর্ষ কি আদিম রণকৌশল
রাতের অন্ধকারে টর্চের আলোয় সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত

রাত তখন গভীর। গ্রামবাংলার চিরচেনা শান্ত নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে খানখান হয়ে যায় তীব্র আলোর ঝলকানিতে। মাদারীপুরের নয়ারচর গোলচত্বরে মঙ্গলবার রাতে দৃশ্যটি ছিল ঠিক এমনই। শত শত টর্চলাইটের আলোয় এলাকা যেন দিনের মতো ফর্সা হয়ে ওঠে। তবে সেই আলো কোনো উৎসবের নয়, বরং এক ভয়াবহ সংঘাতের সংকেত।

গত কয়েক বছরে দেশের বিশেষ কিছু এলাকায় ‘টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষের’ এই বিচিত্র ও ভয়ংকর দৃশ্য ডিজিটাল স্ক্রিনে নিয়মিত ভেসে উঠছে। কেন একদল মানুষ সংঘর্ষের রজনী রাতকে বেছে নেয়? কেন এই টর্চলাইটের ব্যবহার? এর পেছনে যেমন রয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা, তেমনি রয়েছে গভীর আদিম ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।

তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি ঘটেছে মাদারীপুর সদর উপজেলার নয়ারচরে। তাছাড়া একই ঘটনা দেখা গেছে, শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও সদর এলাকায়, ফরিদপুরের সালথা, ভৈরব ও ভাঙ্গায় এবং মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজং এলাকায়। 

এসব এলাকার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো — এগুলো হয় চরাঞ্চল, না হয় হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ। এখানে যাতায়াত কঠিন। পুলিশ পৌঁছাতে সময় লাগে। আর সেই ফাঁকটাই কাজে লাগান সংঘর্ষকারীরা। আধিপত্য বিস্তার, জমির মালিকানা কিংবা পাওনা টাকার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বংশপরম্পরায় চলে আসা বিবাদগুলো রাতের অন্ধকারে নতুন মাত্রা পায়।

এসব সংঘর্ষে টর্চের ব্যবহার শুধু ‘আলো ফেলার’ জন্য নয়, এটি একাধিক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের অবস্থান, বাড়ি বা দলনেতাকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য টর্চের আলো ব্যবহার করা হয়। এটি যেন এক ধরনের ‘স্পটলাইট’ — যার ওপর আলো পড়ে, তিনিই প্রথম আঘাতের শিকার হন। মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার ও সাগর ব্যাপারীকে চিহ্নিত করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।

তীব্র টর্চের আলো সরাসরি চোখে ফেলা হলে প্রতিপক্ষ সাময়িকভাবে ‘ফ্ল্যাশ ব্লাইন্ডনেস’ অর্থাৎ ‘সাময়িক অন্ধত্বের’ শিকার হন। সে কিছুক্ষণের জন্য চোখে অন্ধকার দেখেন। দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই কৌশলটি আক্রমণকারীর জন্য মারণাস্ত্রের মতো কাজ করে। একই সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, যেন এলাকা পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায়- শুধু টর্চের আলোয় ভাসে আক্রমণকারীরা।

আবার, টর্চের আলো পিটপিট করে জ্বালিয়ে বা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফেলে দলের সদস্যরা নিজেদের অবস্থান ও আক্রমণের দিক সম্পর্কে সংকেত দেয়। এটি এক ধরনের ‘সিগন্যালিং ডিভাইস’ - যা আদি যুগের আগুনের ধোঁয়ার মতো কাজ করে।

অন্যদিকে, দেশীয় অস্ত্র যেমন টেঁটা, বল্লম, রামদা, ককটেল নিয়ে যখন দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়, তখন অন্ধকারে আপনজনকেও আঘাত করার আশঙ্কা থাকে। টর্চের আলো সেই ভুল এড়াতে সাহায্য করে। আলো যার ওপর পড়ে, সে ‘শত্রু’। মাদারীপুরের নয়ারচরের ঘটনাটি যেন টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের কেইস স্টাডি। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে নয়াচর এলাকার গোলাম মওলা সরদারের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নেন একই এলাকার সাইদুল ব্যাপারী। গোলাম মওলার অভিযোগ, পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হলেও কাজ হয়নি। টাকা ফেরত চাইতে থাকেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সালিশও হয়েছে। কিন্তু কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। এখানেই লুকিয়ে আছে সংঘর্ষের মূল কারণ- আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব। সালিশ ব্যর্থ হওয়ার পর আর কোনো পথ খোলা থাকে না। ফলে টাকা ফেরতের এই বিরোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আধিপত্যের লড়াইয়ে।

অভিযোগ গেল ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় নয়াচর গোলচত্বরে গেলে গোলাম মওলার ওপর হামলা চালায় সাইদুল ব্যাপারী ও তার লোকজন। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাত সাড়ে ৮টার দিকে দেশীয় অস্ত্র আর টর্চলাইট হাতে দুই পক্ষ মুখোমুখি। শুরু হয় ইটপাটকেল, টেঁটা ও রামদার লড়াই।পুলিশের উপস্থিতিতেও থামেনি সংঘর্ষ। এতে উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন। শুধু সংঘর্ষ নয়, হামলাকারীরা নয়াচর এলাকার দুজনের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত আকবর মোল্লা বলেন, “আমি কোনো দলের না। তবু একদল লোক টেঁটা, রামদা দিয়ে আমার দোকান ভাঙচুর করে সব মাল লুট করে নিয়ে গেছে। আমি গরিব মানুষ, এখন কী করে খাব? আমি এর বিচার চাই।”

এটি টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের আরেকটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়, তখন তার শিকার হন নিরীহ সাধারণ মানুষ। যারা কোনো পক্ষের নন- শুধু দিন আনে দিন খায় - তারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় শিকার।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডি-ইন্ডিভিউডিয়েশন’ (দলীয় মনোভাবের কারণে ব্যক্তিগত দায়িত্বজ্ঞান লোপ পাওয়া) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ভিড়ের মধ্যে বা অন্ধকারের সুযোগে মানুষের নিজের বিবেক ও লোকলজ্জার ভয় কমে যায়। দিনের আলোয় যে মানুষটি পরিচিত সমাজকে ভয় পায়, রাতের অন্ধকারে মুখ গামছায় বেঁধে টর্চের তীব্র আলোর আড়ালে সে হিংস্র হয়ে ওঠে।

কারণটি সহজ: নাম বা পরিচয়হীনতার সুযোগ। সে মনে করে, অন্ধকারে তাকে কেউ চিনতে পারবে না। ফলে পুলিশের চার্জশিট বা সামাজিক বিচার থেকে সে বেঁচে যাবে। এই ‘নামহীনতা’ একজন শান্ত মানুষকেও দাঙ্গাবাজ করে তোলে। এছাড়াও দলগত চাপের কারণে একবার সংঘর্ষ শুরু হলে, পেছনে ফিরে তাকানোর সময় পান না কেউ। দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মানসিকতা যেকোনো বিবেকবান মানুষকেও নির্দয় করে তোলে।

নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলে, আদিম মানুষ রাতের আঁধারেই শিকার করত। শিকারের সময় তারা আলো (আগুনের লেলিহান শিখা বা মশাল) ব্যবহার করত শিকারকে চিহ্নিত করতে ও দলকে সংকেত দিতে। আর শিকার যখন জানতে পারত যে আলো এসেছে তার দিকেই - আতঙ্কে জমে যেত। এই প্যাটার্ন আজও অমলিন। টর্চলাইটের তীব্র আলো সরাসরি প্রতিপক্ষের চোখে ফেলা মানে - ‘তুমি আমার নিশানা, তুমি এখান থেকে নড়তে পারবে না’। এটি প্রতিপক্ষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব তৈরি করে। আক্রমণকারী তখন আরও নির্দ্বিধায় কাজ করতে পারে।

মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার বলেন, “আমার মাথা ও চোখে আঘাত করেছে।” এই চোখে আঘাত করার পেছনে মূলত টর্চের আলো ও আঘাতের সমন্বয় ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। আদিম মানুষের শিকারের পদ্ধতিতে যেমন ‘ঘেরাও করে আলো ফেলে শিকার করা’ থাকত, আজকের গ্রামীণ সংঘর্ষেও দেখা যায়- প্রথমে এলাকা ঘিরে ফেলা, তারপর বিদ্যুৎ কেটে টর্চ জ্বালিয়ে হামলা।

চরাঞ্চল বা হাওর এলাকায় যাতায়াত অত্যন্ত দুর্গম। দিনের বেলা পুলিশ বা প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো কঠিন। তাই রাতের অন্ধকারকে বেছে নেওয়া হয়, যাতে সংঘর্ষ শেষে দ্রুত নৌকায় বা কাঁশবনের আড়ালে সটকে পড়া যায়। 

মাদারীপুরের নয়ারচর এলাকাটিও চরাঞ্চল। এখানে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এলাকায় এসেছিল, কিন্তু ততক্ষণে সংঘর্ষ চরম রূপ নিয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। এসব এলাকায় প্রায়ই পুলিশের উপস্থিতি কম থাকে। থানা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। ততক্ষণে সংঘর্ষ শেষ, আহতরা হাসপাতালে, আর অন্ধকার গিলে নিয়েছে সব প্রমাণ।

বর্তমান ডিজিটাল মিডিয়াগুলো এই সংঘর্ষগুলোকে কেবল ‘উত্তেজনাপূর্ণ ভিজ্যুয়াল’ হিসেবে প্রচার করে। যেটিকে ‘কসমেটিক সাংবাদিকতা’ বলা হচ্ছে। খবরের ভেতরের গভীরতা বা এর পেছনের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিশ্লেষণ না করে কেবল ‘টর্চলাইটের রহস্যময় আলো’ আর ‘বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য’ দিয়ে ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে।

কিছু টেলিভিশন চ্যানেল তো সরাসরি রাতের সংঘর্ষের ‘লাইভ টেলিকাস্ট’ দেয়, যেন এটি একটি খেলা বা বিনোদন। তথ্যের গভীরতার চেয়ে উপস্থাপনার গ্ল্যামার বড় হয়ে ওঠায় পাঠকরা ঘটনার পেছনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ব্যর্থ হন।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন কোনো সমাজে আইনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায় এবং গোষ্ঠীগত শক্তিই চূড়ান্ত সত্য বলে গণ্য হয়, তখন মানুষ এমন ‘গেরিলা স্টাইল’ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘যৌথ পরিবার থেকে ভাঙন’ ও ‘অর্থনৈতিক অস্বস্তি’। আগে গ্রামের বড় জমিদার বা মাতুব্বর বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। এখন সেই কাঠামো নেই। আইনি ব্যবস্থা জটিল ও ব্যয়বহুল। অনেকের ধারণা একমাত্র পথ — আত্মরক্ষার নামে দল গঠন আর রাতের আক্রমণ।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, যেসব এলাকায় সংঘর্ষের প্রবণতা বেশি, সেখানে নিয়মিত রাতের টহল ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মসজিদের ইমামদের নিয়ে বিরোধ মীমাংসার কমিটি গঠন করা জরুরি। গ্রামের মানুষ যাতে বুঝতে পারেন, রাতে সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ - সে বিষয়ে প্রচারণা চালানো। 

সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানো ও ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি করা সম্ভব। এতে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সহজ হবে।গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। সংঘর্ষের লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও প্রতিরোধমূলক প্রতিবেদন প্রচার করতে হবে। সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। 

টর্চলাইটের এই সংঘর্ষ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা। যেখানে আইন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে চায়। যার মাধ্যম হয়ে ওঠে টেঁটা, বল্লম ও ককটেল। টর্চের আলো প্রতিপক্ষকে দেখায় বটে, কিন্তু একই আলো আক্রমণকারীর মুখোশও উন্মোচন করে। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা এই আলো সভ্যতার আলো নয়, বরং এক আদিম অন্ধকারেরই বহিঃপ্রকাশ। যতক্ষণ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত না হবে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না যাবে, ততক্ষণ এই টর্চলাইটের রণকৌশল কেবল স্ক্রিনে ভিউ বাড়িয়ে যাবে। আসল ট্র্যাজেডি আড়ালেই থেকে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬


বিশ্লেষণ: টর্চ জ্বালিয়ে রাতে সংঘর্ষ কি আদিম রণকৌশল

প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

রাত তখন গভীর। গ্রামবাংলার চিরচেনা শান্ত নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙে খানখান হয়ে যায় তীব্র আলোর ঝলকানিতে। মাদারীপুরের নয়ারচর গোলচত্বরে মঙ্গলবার রাতে দৃশ্যটি ছিল ঠিক এমনই। শত শত টর্চলাইটের আলোয় এলাকা যেন দিনের মতো ফর্সা হয়ে ওঠে। তবে সেই আলো কোনো উৎসবের নয়, বরং এক ভয়াবহ সংঘাতের সংকেত।

গত কয়েক বছরে দেশের বিশেষ কিছু এলাকায় ‘টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষের’ এই বিচিত্র ও ভয়ংকর দৃশ্য ডিজিটাল স্ক্রিনে নিয়মিত ভেসে উঠছে। কেন একদল মানুষ সংঘর্ষের রজনী রাতকে বেছে নেয়? কেন এই টর্চলাইটের ব্যবহার? এর পেছনে যেমন রয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা, তেমনি রয়েছে গভীর আদিম ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।

তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি জেলায় এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি ঘটেছে মাদারীপুর সদর উপজেলার নয়ারচরে। তাছাড়া একই ঘটনা দেখা গেছে, শরীয়তপুরের জাজিরা ও নড়িয়ায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল ও সদর এলাকায়, ফরিদপুরের সালথা, ভৈরব ও ভাঙ্গায় এবং মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি ও লৌহজং এলাকায়। 

এসব এলাকার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো — এগুলো হয় চরাঞ্চল, না হয় হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ। এখানে যাতায়াত কঠিন। পুলিশ পৌঁছাতে সময় লাগে। আর সেই ফাঁকটাই কাজে লাগান সংঘর্ষকারীরা। আধিপত্য বিস্তার, জমির মালিকানা কিংবা পাওনা টাকার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বংশপরম্পরায় চলে আসা বিবাদগুলো রাতের অন্ধকারে নতুন মাত্রা পায়।

এসব সংঘর্ষে টর্চের ব্যবহার শুধু ‘আলো ফেলার’ জন্য নয়, এটি একাধিক কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের অবস্থান, বাড়ি বা দলনেতাকে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য টর্চের আলো ব্যবহার করা হয়। এটি যেন এক ধরনের ‘স্পটলাইট’ — যার ওপর আলো পড়ে, তিনিই প্রথম আঘাতের শিকার হন। মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার ও সাগর ব্যাপারীকে চিহ্নিত করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ।

তীব্র টর্চের আলো সরাসরি চোখে ফেলা হলে প্রতিপক্ষ সাময়িকভাবে ‘ফ্ল্যাশ ব্লাইন্ডনেস’ অর্থাৎ ‘সাময়িক অন্ধত্বের’ শিকার হন। সে কিছুক্ষণের জন্য চোখে অন্ধকার দেখেন। দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই কৌশলটি আক্রমণকারীর জন্য মারণাস্ত্রের মতো কাজ করে। একই সময়ে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, যেন এলাকা পুরোপুরি অন্ধকারে ডুবে যায়- শুধু টর্চের আলোয় ভাসে আক্রমণকারীরা।

আবার, টর্চের আলো পিটপিট করে জ্বালিয়ে বা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফেলে দলের সদস্যরা নিজেদের অবস্থান ও আক্রমণের দিক সম্পর্কে সংকেত দেয়। এটি এক ধরনের ‘সিগন্যালিং ডিভাইস’ - যা আদি যুগের আগুনের ধোঁয়ার মতো কাজ করে।

অন্যদিকে, দেশীয় অস্ত্র যেমন টেঁটা, বল্লম, রামদা, ককটেল নিয়ে যখন দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়, তখন অন্ধকারে আপনজনকেও আঘাত করার আশঙ্কা থাকে। টর্চের আলো সেই ভুল এড়াতে সাহায্য করে। আলো যার ওপর পড়ে, সে ‘শত্রু’। মাদারীপুরের নয়ারচরের ঘটনাটি যেন টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের কেইস স্টাডি। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে নয়াচর এলাকার গোলাম মওলা সরদারের কাছ থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নেন একই এলাকার সাইদুল ব্যাপারী। গোলাম মওলার অভিযোগ, পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হলেও কাজ হয়নি। টাকা ফেরত চাইতে থাকেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সালিশও হয়েছে। কিন্তু কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। এখানেই লুকিয়ে আছে সংঘর্ষের মূল কারণ- আইনি ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব। সালিশ ব্যর্থ হওয়ার পর আর কোনো পথ খোলা থাকে না। ফলে টাকা ফেরতের এই বিরোধ ধীরে ধীরে রূপ নেয় আধিপত্যের লড়াইয়ে।

অভিযোগ গেল ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় নয়াচর গোলচত্বরে গেলে গোলাম মওলার ওপর হামলা চালায় সাইদুল ব্যাপারী ও তার লোকজন। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাত সাড়ে ৮টার দিকে দেশীয় অস্ত্র আর টর্চলাইট হাতে দুই পক্ষ মুখোমুখি। শুরু হয় ইটপাটকেল, টেঁটা ও রামদার লড়াই।পুলিশের উপস্থিতিতেও থামেনি সংঘর্ষ। এতে উভয় পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন। শুধু সংঘর্ষ নয়, হামলাকারীরা নয়াচর এলাকার দুজনের দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত আকবর মোল্লা বলেন, “আমি কোনো দলের না। তবু একদল লোক টেঁটা, রামদা দিয়ে আমার দোকান ভাঙচুর করে সব মাল লুট করে নিয়ে গেছে। আমি গরিব মানুষ, এখন কী করে খাব? আমি এর বিচার চাই।”

এটি টর্চ জ্বালিয়ে সংঘর্ষের আরেকটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরে। যখন দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই হয়, তখন তার শিকার হন নিরীহ সাধারণ মানুষ। যারা কোনো পক্ষের নন- শুধু দিন আনে দিন খায় - তারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় শিকার।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডি-ইন্ডিভিউডিয়েশন’ (দলীয় মনোভাবের কারণে ব্যক্তিগত দায়িত্বজ্ঞান লোপ পাওয়া) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ভিড়ের মধ্যে বা অন্ধকারের সুযোগে মানুষের নিজের বিবেক ও লোকলজ্জার ভয় কমে যায়। দিনের আলোয় যে মানুষটি পরিচিত সমাজকে ভয় পায়, রাতের অন্ধকারে মুখ গামছায় বেঁধে টর্চের তীব্র আলোর আড়ালে সে হিংস্র হয়ে ওঠে।

কারণটি সহজ: নাম বা পরিচয়হীনতার সুযোগ। সে মনে করে, অন্ধকারে তাকে কেউ চিনতে পারবে না। ফলে পুলিশের চার্জশিট বা সামাজিক বিচার থেকে সে বেঁচে যাবে। এই ‘নামহীনতা’ একজন শান্ত মানুষকেও দাঙ্গাবাজ করে তোলে। এছাড়াও দলগত চাপের কারণে একবার সংঘর্ষ শুরু হলে, পেছনে ফিরে তাকানোর সময় পান না কেউ। দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মানসিকতা যেকোনো বিবেকবান মানুষকেও নির্দয় করে তোলে।

নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলে, আদিম মানুষ রাতের আঁধারেই শিকার করত। শিকারের সময় তারা আলো (আগুনের লেলিহান শিখা বা মশাল) ব্যবহার করত শিকারকে চিহ্নিত করতে ও দলকে সংকেত দিতে। আর শিকার যখন জানতে পারত যে আলো এসেছে তার দিকেই - আতঙ্কে জমে যেত। এই প্যাটার্ন আজও অমলিন। টর্চলাইটের তীব্র আলো সরাসরি প্রতিপক্ষের চোখে ফেলা মানে - ‘তুমি আমার নিশানা, তুমি এখান থেকে নড়তে পারবে না’। এটি প্রতিপক্ষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব তৈরি করে। আক্রমণকারী তখন আরও নির্দ্বিধায় কাজ করতে পারে।

মাদারীপুরের ঘটনায় গোলাম মওলা সরদার বলেন, “আমার মাথা ও চোখে আঘাত করেছে।” এই চোখে আঘাত করার পেছনে মূলত টর্চের আলো ও আঘাতের সমন্বয় ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়। আদিম মানুষের শিকারের পদ্ধতিতে যেমন ‘ঘেরাও করে আলো ফেলে শিকার করা’ থাকত, আজকের গ্রামীণ সংঘর্ষেও দেখা যায়- প্রথমে এলাকা ঘিরে ফেলা, তারপর বিদ্যুৎ কেটে টর্চ জ্বালিয়ে হামলা।

চরাঞ্চল বা হাওর এলাকায় যাতায়াত অত্যন্ত দুর্গম। দিনের বেলা পুলিশ বা প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো কঠিন। তাই রাতের অন্ধকারকে বেছে নেওয়া হয়, যাতে সংঘর্ষ শেষে দ্রুত নৌকায় বা কাঁশবনের আড়ালে সটকে পড়া যায়। 

মাদারীপুরের নয়ারচর এলাকাটিও চরাঞ্চল। এখানে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ এলাকায় এসেছিল, কিন্তু ততক্ষণে সংঘর্ষ চরম রূপ নিয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। এসব এলাকায় প্রায়ই পুলিশের উপস্থিতি কম থাকে। থানা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। ততক্ষণে সংঘর্ষ শেষ, আহতরা হাসপাতালে, আর অন্ধকার গিলে নিয়েছে সব প্রমাণ।

বর্তমান ডিজিটাল মিডিয়াগুলো এই সংঘর্ষগুলোকে কেবল ‘উত্তেজনাপূর্ণ ভিজ্যুয়াল’ হিসেবে প্রচার করে। যেটিকে ‘কসমেটিক সাংবাদিকতা’ বলা হচ্ছে। খবরের ভেতরের গভীরতা বা এর পেছনের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিশ্লেষণ না করে কেবল ‘টর্চলাইটের রহস্যময় আলো’ আর ‘বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য’ দিয়ে ভিউ পাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে।

কিছু টেলিভিশন চ্যানেল তো সরাসরি রাতের সংঘর্ষের ‘লাইভ টেলিকাস্ট’ দেয়, যেন এটি একটি খেলা বা বিনোদন। তথ্যের গভীরতার চেয়ে উপস্থাপনার গ্ল্যামার বড় হয়ে ওঠায় পাঠকরা ঘটনার পেছনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বুঝতে ব্যর্থ হন।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন কোনো সমাজে আইনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায় এবং গোষ্ঠীগত শক্তিই চূড়ান্ত সত্য বলে গণ্য হয়, তখন মানুষ এমন ‘গেরিলা স্টাইল’ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘যৌথ পরিবার থেকে ভাঙন’ ও ‘অর্থনৈতিক অস্বস্তি’। আগে গ্রামের বড় জমিদার বা মাতুব্বর বিবাদের মীমাংসা করে দিতেন। এখন সেই কাঠামো নেই। আইনি ব্যবস্থা জটিল ও ব্যয়বহুল। অনেকের ধারণা একমাত্র পথ — আত্মরক্ষার নামে দল গঠন আর রাতের আক্রমণ।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, যেসব এলাকায় সংঘর্ষের প্রবণতা বেশি, সেখানে নিয়মিত রাতের টহল ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মসজিদের ইমামদের নিয়ে বিরোধ মীমাংসার কমিটি গঠন করা জরুরি। গ্রামের মানুষ যাতে বুঝতে পারেন, রাতে সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ - সে বিষয়ে প্রচারণা চালানো। 

সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা বসানো ও ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি করা সম্ভব। এতে হামলাকারীদের শনাক্ত করা সহজ হবে।গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। সংঘর্ষের লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করে বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও প্রতিরোধমূলক প্রতিবেদন প্রচার করতে হবে। সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। 

টর্চলাইটের এই সংঘর্ষ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা। যেখানে আইন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে মানুষ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে চায়। যার মাধ্যম হয়ে ওঠে টেঁটা, বল্লম ও ককটেল। টর্চের আলো প্রতিপক্ষকে দেখায় বটে, কিন্তু একই আলো আক্রমণকারীর মুখোশও উন্মোচন করে। অন্ধকারে জ্বলে ওঠা এই আলো সভ্যতার আলো নয়, বরং এক আদিম অন্ধকারেরই বহিঃপ্রকাশ। যতক্ষণ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত না হবে এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না যাবে, ততক্ষণ এই টর্চলাইটের রণকৌশল কেবল স্ক্রিনে ভিউ বাড়িয়ে যাবে। আসল ট্র্যাজেডি আড়ালেই থেকে যাবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত