গ্রীষ্মের প্রখর খরতাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী সংকট| একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাতের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচু¤^ী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে কয়লা ও তেলের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের চুলায় হাঁড়ি চাপানোকেই আজ এক অনিশ্চিত ও কষ্টকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে|
ঢাকার মিরপুরের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী ডেলিভারি রাইডার রশিদ আহমেদ যখন ভোররাতে তেলের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তার মোটরসাইকেলের চাকা থমকে যাওয়ার সুতাটি বাঁধা আছে হাজার মাইল দূরের হরমুজ প্রণালীতে| তিনটি ফুয়েল স্টেশন ঘুরেও তেল না পেয়ে রশিদ আহমেদের দিনটি যখন অসম্পূর্ণ ডেলিভারি আর শূন্য পকেটে শেষ হয়, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক অবরুদ্ধ অর্থনীতির করুণ আর্তি| ‘গ্লোবাল ভয়েসেস’ এ উল্লিখিত রশিদের এই অভিজ্ঞতা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটিই এখন বাংলাদেশের সেই নতুন সাধারণ বাস্তবতা, যেখানে অন্যের শুরু করা যুদ্ধ আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে এবং রান্নাঘরের হাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে|
পারস্য উপসাগরের সেই ভূ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ কেন বাংলাদেশের এক প্রান্তিক কৃষকের ভিটায় বা শহুরে শ্রমিকের ঘরে অন্ধকার নিয়ে আসে, তা বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি| এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০২ থেকে ১১৪ ডলারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে| বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এক কাঠামোগত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে|
বাংলাদেশের মতো দেশ, যা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তার জন্য এটি একটি অস্তিত্বের সংকট| আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ˆবশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট| এই সংকটের ঢেউ যখন বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এক গভীর পক্ষাঘাতের শিকার হয়েছে| সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম আর্থিক সংকটের কারণে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছেন না| সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ এখন ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে|
কয়লা ও তেলের এই তীব্র সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে| দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে নেমে এসেছে| বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার এবং মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন কয়লার অভাবে ধুঁকছে| এসএস পাওয়ারের উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে এবং মাতারবাড়ীর উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে| এসএস পাওয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর কয়লাবোঝাই জাহাজের ভাড়া প্রতি টনে অন্তত ১০ ডলার বেড়েছে, যা সরকার বহন করতে না চাওয়ায় কয়লা আমদানি এখন লোকসানের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে|
মাতারবাড়ী কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে কারণ সে দেশের সরকার উৎপাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে| এর ফলে, ১৬ এপ্রিল একটি কয়লার জাহাজ আসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য| কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও বকেয়া বিল না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে| প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা পিডিবির লোকসান ও ভর্তুকির বোঝাকে আরও ভারী করছে| গত অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার পরও পিডিবির লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা; বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সহজেই অনুমেয়|
বিদ্যুতের এই ঘাটতি এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের কৃষি ও সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায়| হরমুজ প্রণালী কেবল তেলের নয়, বরং সারেরও এক সংকীর্ণ জীবনরেখা| কাতার, সৌদি আরব এবং ওমান থেকে আসা বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া ও ফসফেট এই পথ দিয়েই বাংলাদেশে আসে| ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করার পর পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে যে, পূর্বনির্ধারিত এলএনজি কার্গো সময়মতো পৌঁছাবে না|
এর ফলে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে| সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশের বোরো ধানের মৌসুমের মাঝামাঝি—যখন কৃষকের ধানক্ষেতে সবচেয়ে বেশি সেচ ও সারের প্রয়োজন হয়| ডিজেলের মজুত কমে মাত্র নয় দিনের সরবরাহে এসে দাঁড়িয়েছিল| যদিও সরকার ভারত থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫,০০০ মেট্রিক টন ডিজেল এনেছে, কিন্তু তা ছিল সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো| এই সার ও সেচ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে ধানের ফলনে, যা আগামী কয়েক মাস পর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত হয়ে দেখা দেবে|
জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ এখন রান্নাঘরের চুলায় গিয়ে ঠেকেছে| এলপিজি সংকটের কারণে ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| বাংলাদেশের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১২, ৫০০ টাকা, সেখানে আয়ের ১০ শতাংশই চলে যাচ্ছে কেবল রান্নার গ্যাসের পেছনে| পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নওগাঁ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের খরচ এক সপ্তাহেই ১৪,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সম্মিলিত প্রভাব বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে|
কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গরিবের মোটা ¯^র্ণা চাল এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর সরু মিনিকেট চাল কিনতে ক্রেতার লাগছে ৮৫ টাকা| সবজির বাজারে উত্তাপ আরও ভয়াবহ; বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আর করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে| ৮০ টাকা কেজির নিচে বাজারে এখন কোনো সবজি মেলাই ভার| মাছ-মাংসের বাজারেও একই অস্থিরতা বিরাজ করছে| কেজিপ্রতি সোনালি মুরগি ৪০০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে, যা নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের জন্যও বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে| মুদি পণ্যের দোকানে সরু মসুর ডাল ১৫০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে|
এই ত্রিমুখী সংকটের ফলে বাংলাদেশের জনজীবন আজ দিশেহারা| রাজধানী ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে| চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও বরিশালের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা| চট্টগ্রামে ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে| লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে তীব্র পানির সংকটে পড়েছেন নগরবাসী| কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে|
গার্মেন্টস মালিকরা জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন| বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের উৎস ˆতরি পোশাক শিল্প আজ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, যার ফলে রপ্তানি আয় অন্তত ২ শতাংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে| এটি ˆবদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যা টাকাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে| দুর্বল টাকা মানেই হলো আমদানি করা প্রতিটি চালের দানা আর প্রতিটি ফোঁটা তেল আগের চেয়ে বেশি দামে কেনা|
হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধবিরতি সাময়িক ¯^স্তি দিলেও, আমাদের আমদানিনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব আজ প্রতিটি ঘরকে অন্ধকার ও ক্ষুধার মুখে ঠেলে দিয়েছে| যে যুদ্ধ রশিদ আহমেদের আয়ের পথ বন্ধ করেছে, সেই একই যুদ্ধ আজ ভ্যানচালক এনায়েতউল্লাহর ডাল-ভাতের ¯^প্নকে কেড়ে নিচ্ছে| ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এবং ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনার এই বোঝা নিয়ে আমরা কতদিন চলতে পারব, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার রাতে এবং প্রতিটি বাজারের অসহনীয় মূল্যে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে|
পঁচানব্বই শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর এই যে আকাশচু¤^ী নির্ভরশীলতা, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়| এটি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল| পদ্ধতিগত সংস্কার, বাজার তদারকিতে কঠোর নজরদারি এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের কার্যকর ব্যবহার ছাড়া এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই| আমাদের এখন এমন এক অর্থনীতির দিকে যাত্রা করতে হবে যেখানে আমাদের রাতের খাবারের দাম পারস্য উপসাগরের কামান দাগানোর ওপর নির্ভর করবে না| পদ্ধতিগতভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোই হলো এই অদৃশ্য যুদ্ধের হাত থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে বাঁচানোর একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সমাধান| আপাতত, রশিদ আহমেদরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মধ্যপ্রাচ্যের সেই আগুন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সোনালি ¯^প্নগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে|
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী|]

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
গ্রীষ্মের প্রখর খরতাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে এক অভূতপূর্ব ত্রিমুখী সংকট| একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাতের উত্তাপে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচু¤^ী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে কয়লা ও তেলের তীব্র সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে এসে ঠেকেছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, যা দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের চুলায় হাঁড়ি চাপানোকেই আজ এক অনিশ্চিত ও কষ্টকর বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে|
ঢাকার মিরপুরের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী ডেলিভারি রাইডার রশিদ আহমেদ যখন ভোররাতে তেলের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে তার মোটরসাইকেলের চাকা থমকে যাওয়ার সুতাটি বাঁধা আছে হাজার মাইল দূরের হরমুজ প্রণালীতে| তিনটি ফুয়েল স্টেশন ঘুরেও তেল না পেয়ে রশিদ আহমেদের দিনটি যখন অসম্পূর্ণ ডেলিভারি আর শূন্য পকেটে শেষ হয়, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির দুর্ভোগ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক অবরুদ্ধ অর্থনীতির করুণ আর্তি| ‘গ্লোবাল ভয়েসেস’ এ উল্লিখিত রশিদের এই অভিজ্ঞতা আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটিই এখন বাংলাদেশের সেই নতুন সাধারণ বাস্তবতা, যেখানে অন্যের শুরু করা যুদ্ধ আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ঘরের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে এবং রান্নাঘরের হাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে|
পারস্য উপসাগরের সেই ভূ-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ কেন বাংলাদেশের এক প্রান্তিক কৃষকের ভিটায় বা শহুরে শ্রমিকের ঘরে অন্ধকার নিয়ে আসে, তা বুঝতে হলে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি| এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রভাবে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে ১০২ থেকে ১১৪ ডলারের দিকে ছুটতে শুরু করেছে| বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এক কাঠামোগত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে|
বাংলাদেশের মতো দেশ, যা তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তার জন্য এটি একটি অস্তিত্বের সংকট| আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ˆবশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট| এই সংকটের ঢেউ যখন বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত এক গভীর পক্ষাঘাতের শিকার হয়েছে| সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি চরম আর্থিক সংকটের কারণে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছেন না| সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষ থেকে পিডিবির কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ এখন ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে|
কয়লা ও তেলের এই তীব্র সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে| দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে উৎপাদন ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে নেমে এসেছে| বাঁশখালীর ১৩২০ মেগাওয়াট এসএস পাওয়ার এবং মাতারবাড়ী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন কয়লার অভাবে ধুঁকছে| এসএস পাওয়ারের উৎপাদন ৩০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে এবং মাতারবাড়ীর উৎপাদন ১৫০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে| এসএস পাওয়ারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর কয়লাবোঝাই জাহাজের ভাড়া প্রতি টনে অন্তত ১০ ডলার বেড়েছে, যা সরকার বহন করতে না চাওয়ায় কয়লা আমদানি এখন লোকসানের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে|
মাতারবাড়ী কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে কারণ সে দেশের সরকার উৎপাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে| এর ফলে, ১৬ এপ্রিল একটি কয়লার জাহাজ আসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য| কয়লার পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও বকেয়া বিল না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে| প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ২০ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা পিডিবির লোকসান ও ভর্তুকির বোঝাকে আরও ভারী করছে| গত অর্থবছরে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার পরও পিডিবির লোকসান ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা; বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সহজেই অনুমেয়|
বিদ্যুতের এই ঘাটতি এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের কৃষি ও সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকায়| হরমুজ প্রণালী কেবল তেলের নয়, বরং সারেরও এক সংকীর্ণ জীবনরেখা| কাতার, সৌদি আরব এবং ওমান থেকে আসা বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া ও ফসফেট এই পথ দিয়েই বাংলাদেশে আসে| ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করার পর পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে যে, পূর্বনির্ধারিত এলএনজি কার্গো সময়মতো পৌঁছাবে না|
এর ফলে দেশের পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দিতে হয়েছে| সেই সময়টি ছিল বাংলাদেশের বোরো ধানের মৌসুমের মাঝামাঝি—যখন কৃষকের ধানক্ষেতে সবচেয়ে বেশি সেচ ও সারের প্রয়োজন হয়| ডিজেলের মজুত কমে মাত্র নয় দিনের সরবরাহে এসে দাঁড়িয়েছিল| যদিও সরকার ভারত থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৫,০০০ মেট্রিক টন ডিজেল এনেছে, কিন্তু তা ছিল সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো| এই সার ও সেচ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে ধানের ফলনে, যা আগামী কয়েক মাস পর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ সংকেত হয়ে দেখা দেবে|
জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ এখন রান্নাঘরের চুলায় গিয়ে ঠেকেছে| এলপিজি সংকটের কারণে ১২.৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| বাংলাদেশের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি যেখানে ১২, ৫০০ টাকা, সেখানে আয়ের ১০ শতাংশই চলে যাচ্ছে কেবল রান্নার গ্যাসের পেছনে| পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নওগাঁ থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পরিবহনের খরচ এক সপ্তাহেই ১৪,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে| জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের এই সম্মিলিত প্রভাব বাজারে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে|
কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গরিবের মোটা ¯^র্ণা চাল এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর সরু মিনিকেট চাল কিনতে ক্রেতার লাগছে ৮৫ টাকা| সবজির বাজারে উত্তাপ আরও ভয়াবহ; বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, আর করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে| ৮০ টাকা কেজির নিচে বাজারে এখন কোনো সবজি মেলাই ভার| মাছ-মাংসের বাজারেও একই অস্থিরতা বিরাজ করছে| কেজিপ্রতি সোনালি মুরগি ৪০০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে, যা নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের জন্যও বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে| মুদি পণ্যের দোকানে সরু মসুর ডাল ১৫০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে|
এই ত্রিমুখী সংকটের ফলে বাংলাদেশের জনজীবন আজ দিশেহারা| রাজধানী ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে| চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও বরিশালের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু ও বৃদ্ধরা| চট্টগ্রামে ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে| লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না, ফলে তীব্র পানির সংকটে পড়েছেন নগরবাসী| কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে|
গার্মেন্টস মালিকরা জেনারেটর চালিয়েও উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন| বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের উৎস ˆতরি পোশাক শিল্প আজ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে, যার ফলে রপ্তানি আয় অন্তত ২ শতাংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে| এটি ˆবদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যা টাকাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে| দুর্বল টাকা মানেই হলো আমদানি করা প্রতিটি চালের দানা আর প্রতিটি ফোঁটা তেল আগের চেয়ে বেশি দামে কেনা|
হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধবিরতি সাময়িক ¯^স্তি দিলেও, আমাদের আমদানিনির্ভরতা এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব আজ প্রতিটি ঘরকে অন্ধকার ও ক্ষুধার মুখে ঠেলে দিয়েছে| যে যুদ্ধ রশিদ আহমেদের আয়ের পথ বন্ধ করেছে, সেই একই যুদ্ধ আজ ভ্যানচালক এনায়েতউল্লাহর ডাল-ভাতের ¯^প্নকে কেড়ে নিচ্ছে| ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এবং ৪২ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পাওনার এই বোঝা নিয়ে আমরা কতদিন চলতে পারব, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি লোডশেডিংয়ের অন্ধকার রাতে এবং প্রতিটি বাজারের অসহনীয় মূল্যে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে|
পঁচানব্বই শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর এই যে আকাশচু¤^ী নির্ভরশীলতা, এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়| এটি আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল| পদ্ধতিগত সংস্কার, বাজার তদারকিতে কঠোর নজরদারি এবং দেশীয় জ্বালানি উৎসের কার্যকর ব্যবহার ছাড়া এই বহুমুখী সংকট থেকে মুক্তির আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই| আমাদের এখন এমন এক অর্থনীতির দিকে যাত্রা করতে হবে যেখানে আমাদের রাতের খাবারের দাম পারস্য উপসাগরের কামান দাগানোর ওপর নির্ভর করবে না| পদ্ধতিগতভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোই হলো এই অদৃশ্য যুদ্ধের হাত থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে বাঁচানোর একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী সমাধান| আপাতত, রশিদ আহমেদরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, আর মধ্যপ্রাচ্যের সেই আগুন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সোনালি ¯^প্নগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে|
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী|]

আপনার মতামত লিখুন