সংবাদ

আসাদ চৌধুরীর কবিতা

বিদ্রোহ ও বিষাদের পংক্তিমালা


আনোয়ার মল্লিক
আনোয়ার মল্লিক
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৭ এএম

বিদ্রোহ ও বিষাদের পংক্তিমালা
আসাদ চৌধুরী / জন্ম: ১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩; মৃত্যু: ৫ অক্টোবর, ১৯২৩)

আসাদ চৌধুরী গত শতকের ষাটের দশকের কবি| সময় যে সকল কবি আধুনিক বাংলা কবিতায় অসামান্য অবদান রেখেছেন, আসাদ চৌধুরী তাদের অন্যতম| বরিশালে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা হলেও তাঁর জীবনের প্রায় পুরো সময় কেটেছে ঢাকায়| বরিশালের বিএম  কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন| সেখান থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন| রবীন্দ্র কাব্যের রোমান্টিক গীতিময়তা থেকে বাংলা কবিতার মুক্তির প্রয়াসে তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ এবং ভাষায় যে পরিবর্তন আসে তা ছিলো মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক| কাব্য আন্দোলনের অভিঘাত ঢাকায় অনুরণিত হয় পঞ্চাশের দশকে এসে| শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ কবিগণের হাতে আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তি রচিত হয়| ষাটের দশকে এসে বাংলা কবিতা ফুলে, ফসলে শোভিত হয়ে তার স্বকীয়তা খুঁজে পায়| এই দশকে আমরা কয়েকজন শক্তিশালী কবির দেখা পাই| তাদের  মধ্যে শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান  সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, আসাদ চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ,মহাদেব সাহা প্রমুখ ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর|

আসাদ চৌধুরী এই দশকের একজন জননন্দিত কবি| ১৯৬৪ সালে রফিক আজাদসহ আরও কয়েকজন মিলে কথিত যেস্যাড জেনারেশনগঠিত হয়েছিলো আসাদ চৌধুরী ছিলেন তার অন্যতম সদস্য| যদিও এর আয়ু ছিলো ক্ষণস্থায়ী| ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থতবক দেওয়া পানপ্রকাশিত হলে তা যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে| ষাটের দশক ছিল বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক জাগরণের কাল| এই দশকের কবিগণ তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী| কিন্তু রাজনৈতিক এই উন্মত্ততা সত্ত্বেও আসাদ চৌধুরীর কাব্যস্বর ছিলো নরম, মাধুর্যময়| এমনকি তাঁর প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলোতে সময়ের প্রভাব ছায়া ফেলেনি| রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিত্বের শালীনতা এবং কাব্য স্বরের স্নিগ্ধতা অক্ষুন্ন ছিলো| চিন্তা এবং বিশ্বাসে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে আধুনিক| কিন্তু এই আধুনিকতা তাঁকে তাঁর অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি| তিনি একদিকে যেমন নাগরিক অভিজাত মননকে অন্তরে ধারণ করতেন, অন্যদিকে লোকজ ঐতিহ্যকেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন|

আসাদ চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা| প্রতিবাদের কবি, বিদ্রোহের কবি হিসেবে তিনি বহুল স্বীকৃত| তাঁর কবিতা একদিকে যেমন যে কোনো অসঙ্গতি, অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, অন্যদিকে অন্তর্গত বিষাদের একটা প্রবাহ নিস্তরঙ্গভাবে বয়ে চলে|

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হন| এবং দুই লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারান| এইসব বীরাঙ্গনা নারী তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এদেশের মুক্তির জন্য| তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, তাঁদের চোখে মুখে ছিলো প্রতিশোধের আগুন: “নদীর জলে আগুন ছিল/আগুন ছিল বৃষ্টিতে/আগুন ছিল বীরাঙ্গনার/উদাস করা দৃষ্টিতে|/আগুন ছিল গানের সুরে/ আগুন ছিল কাব্যে/ মরার চোখে আগুন ছিল/একথা কে ভাববে?” (তখন সত্যি মানুষ ছিলাম, তবক দেওয়া পান)|

একটি ˆবষম্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের জন্য একাত্তরে আমাদের শহীদেরা প্রাণ দিয়েছিলেন| তাঁরা শিক্ষার অধিকার চেয়েছিলেন| জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়া ছিল তাদের স্বপ্ন| কিন্তু আমরা শহীদের সেই স্বপ্নের কথা ভুলে গেছি| তারা যা চেয়েছিল বাংলাদেশ আজ আর সে কথা বলে না| কবির বেদনা-সিক্ত উচ্চারণ

তোমাদের যা বলার ছিল/বলছে কি তা বাংলাদেশ?/ শেষ কথাটি সুখের ছিল?/ঘৃণার ছিল?/ না কি ক্রোধের,/প্রতিশোধের,/কোনটা ছিল?/ না কি কোনো দুঃখের/না কি মনে তৃপ্তি ছিল,/দীপ্তি ছিল— /এই যাওয়াটাই সুখের|/তোমাদের যা বলার ছিল/ বলছে কি তা বাংলাদেশ?” (শহীদের প্রতি, যে পারে পারুক)|

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আসাদ চৌধুরী সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন| প্রথম দিকে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে কাজ করেন| পরবর্তীতে কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিতজয় বাংলাপত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগ দেন| ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, ত্যাগের কাহিনি এবং নরঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাসমূহ তিনি বিশদভাবে জানতে পারেন| এজন্য তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ অত্যন্ত আবেগ এবং বেদনার সঙ্গে উঠে এসেছে| একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বহু মাত্রিক দিক ছিল| জনাব তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার এই যুদ্ধের সকল দিক থামলে যুদ্ধে বিজয়ের ভিত রচনা করেছিলেন| যুদ্ধ যেমন দেশের অভ্যন্তরে করতে হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা ষড়যন্ত্র এবং বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে| ভারত এবং তৎকালীন রাশিয়া আমাদের পক্ষে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সৌদিসহ আরব বিশ্ব বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল| যুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে| ফলে জাতিসংঘ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র| তখন জাতিসংঘের মহাসচিব ছিলেন তৎকালীন বার্মার নাগরিক উথান্ট|

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা কবিরিপোর্ট ১৯৭১কবিতায় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় চিত্রিত করেছেন:

জনাব উথান্ট,/জাতিসংঘ ভবনের মেরামত অনিবার্য আজ|/আমাকে দেবেন, গুরু, দয়া করে তার ঠিকাদারি?/বিশ্বাস করুন রক্তমাখা ইটের যোগান/পৃথিবীর সর্বনিম্ন হারে একমাত্র আমি দিতে পারি/যদি চান শিশুর গলিত খুলি, দেওয়ালে দেওয়ালে শিশুদের রক্তের/আলপনা

প্লিজ আমাকে কন্ট্রাক্ট দিন/দশ লক্ষ মৃতদেহ থেকে/দুর্গন্ধের দুর্বোধ্য জবান শিখে রিপোর্ট লিখেছিপড়ো, পাঠ করো|/কুড়ি লক্ষ আহতের আর্তনাদ থেকে/ঘৃণাকে জেনেছিপড়ো, পাঠ করো|/চল্লিশ হাজার ধর্ষিতা নারীর কাছে,/জুলুমের সবক নিয়েছিপড়ো, পাঠ করো|/দুঃখের স্মৃতিতে ডোবা আশি লক্ষ শরণার্থী/শিখিয়েছে দীর্ঘশ্বাসে কতোটুকু ক্রোধ লেখা থাকে|” (রিপোর্ট ১৯৭১, যে পারে পারুক)|

আসাদ চৌধুরীর প্রথম দিকের কাব্যগুলো যেমন: তবক দেওয়া পান (১৯৭৫), বিত্ত নাই বেসাত নাই (১৯৭৬), প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড় ১৯৭৬), জলের মধ্যে লেখাজোকা (১৯৮২) প্রভৃতি| এসব গ্রন্থের মূল সুর ছিলো বিষাদ এবং ˆনরাশ্য| কবিতায় তিনি দুঃখকে নানাভাবে উদযাপন করেছেন| চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদান এবং ঘটনা প্রবাহের মধ্যে তীব্র অসংগতি তাঁর কবিতায় অবলীলায় উঠে এসেছে| তাঁর বেশ কিছু কবিতায় গোলাপের প্রসঙ্গ এসেছে| সবাই গোলাপ ফুল ভালোবাসে| এর সৌরভ মনোমুগ্ধকর| কিন্তু কবি গোলাপের দিকে হাত বাড়িয়ে সৌরভের পরিবর্তে পান কাঁটার আঘাত: “গোলাপের মধ্যে যাব|/বাড়ালাম হাত/ফিরে এলো রক্তাক্ত আঙুল|/সাপিনীর কারুকার্য/নগ্ন নতজানু/ চরাচরে  আবেগ বিলায়|/ আমার অধরে শুধু /দাঁতের আঘাত|” (আত্মজীবনী: তবক দেওয়া পান)|

গোলাপের কাছে হাত রেখেশীর্ষক কবিতায় কবির বিষণ্নতা ঝরে পরেছে| শুধু গোলাপই নয়, সৌন্দর্যের আধার যে জ্যোৎস্না, তাও কবির কাছে সৌন্দর্যহীন| তাঁর জীবনের বিষাদের প্রতিবি¤^ যেন তিনি জ্যোৎস্নার মধ্যেও দেখতে পান| এবং এর ফলে জ্যোৎস্নাকে তাঁর কাছে দেউলিয়া মনে হয়েছে| তিনি বলেন:

গোলাপ আপনি কেমন আছেন?, শুনি|

জ্যোৎস্না না আপনি দেউলে হননি আজো?

কুশল শুধাই কেননা বাড়ছে দ্বিধা

পার্স থেকে শেষ ফুলটিও ঝরে যায়|”

   (গোলাপের কাঁধে হাত রেখে, তবক দেওয়া পান)

কবির এই বিষাদ সর্বব্যাপী| কেননা তিনি বড়ই নিঃসঙ্গ| কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দেয় না| বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবাই তাঁর থেকে দূরে| প্রকৃতির কোনো আয়োজনেই কবির অংশগ্রহণ নেই| শুধু মানুষই নয়, প্রকৃতির অন্য সব উপাদানও কবির প্রতি যেন বৈরী ভাবাপন্ন|

আমার ডাকে কেউ সাড়া দিলো না,/না মালঞ্চ, না আকাশ/না সমুদ্র|/তাকের ওপর ওষুধের শিশি,/আর ছোটো পর্দা টানা সংক্ষিপ্ত জানালা|” (রোগশয্যায়, তবক দেওয়া পান)|

যদি আলোই না হয়কবিতায় আমরা কবিকে দেখি প্রবল হতাশাগ্রস্ত| কারও কাছ থেকে তিনি কোনো আশার বাণী শুনতে পান না| সর্বত্রই শুধু আশা ভঙ্গের বেদনা| একদিকে কবি কারও কাছ থেকে কোনো আশার বাণী শুনতে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তিনিও প্রিয় মানুষের কাছে উপস্থিত হচ্ছেন একেবারে শূন্য হাতে| এই দোলাচলে কবি হৃদয় দগ্ধীভূত| কবি প্রশ্ন রাখেন: “হে আমার ক্লান্তিহীন যাত্রার স্টেশন,/তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপে শুধু আমারই আঙ্গুল পোড়ে কেন? /যদি আলোই না হয়,/ কেন প্রদীপ মিছেমিছি আসাদের মতো জ্বলবে?”

(যদি আলোই না হয়, তবক দেওয়া পান)

আসাদ চৌধুরীর সতীর্থ অন্তত আরও দুইজন কবির মধ্যে আমরা বিষাদময়তার ছায়া দেখি| একজন শহীদ কাদরী এবং আরেকজন আবুল হাসান| শহীদ কাদরী কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন উদ্বাস্তু হিসেবে| এবং ঢাকায় তিনি ভবঘুরে হিসেবে বিচরণ করেছেন| ফলে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তার মধ্যে সংক্রামিত হয়েছিল| আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে দেন| ভালো কোনো চাকরি পান নাই জীবনে| ফলে তার জীবনও ছিলো অনিশ্চয়তায় ভরা| হয়তো -কারণেই জীবনের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা ছিলো তাঁর| কিন্তু আসাদ চৌধুরীর জীবন যথেষ্ট সুস্থির ছিলো| তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন জমিদার| তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করে অবশেষে বাংলা একাডেমির চাকরিতে থিতু হয়েছিলেন| ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুঃখী ছিলেন না| কিন্তু চারপাশের মানুষের দুঃখ, বিষাদ তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে| সামষ্টিক দুঃখ তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ হয়ে ওঠে|

১৯৭৬ সালে প্রকাশিতপ্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়কাব্যগ্রন্থের একেবারে শেষে স্থান পেয়েছে এর নাম কবিতাটি| তুলনামূলক একটি দীর্ঘ কবিতা এটি| শেরপুরে দেখা এক গারো রমণীর কাজের বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবিতার শুরু| নতুন ব্লেডের চেয়েও ঝকঝকে গারোদের উঠোন ঘরবাড়ি| সৈনিকের শৃঙ্খলায় সারি বাঁধা আনারসের চারা দেখে কবি হতবিহ্বল| দুঃখে ভরা এইসব মানুষের জীবন| কিন্তু তাদের মুখে কোনো দুঃখের ছাপ নেই| সব সময় লেগে থাকে হাসির আস্তরণ|

অন্যদিকে এদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জীবনও দ্বন্দ্বমুখর| এখানে বনের পশু এবং মানুষ সবাইকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়| উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরে জীবনকে টেনে নিয়ে যায় দক্ষিণের সমুদ্র পারের মানুষ| যুগের পর যুগ দক্ষিণের ভাটি অঞ্চলের মানুষ ক্ষুধায়, বঞ্চনায় বেঁচে আছে| জীবন নিয়ে তাদের প্রশ্নের, অভিযোগের কোনো প্রতিকার নেই| এখানে সবকিছুই চলে যেন নিয়তির ইশারায়| কবি দক্ষিণের কোনো এক স্থানে ভ্রমণে গিয়ে সেখানে একটি হোটেলে ছিলেন| কবি বলেন— “হোটেল থেকে নেমেই রিকশাঅলার সাথে দর- কষাকষি,/ একটি ভিক্ষুক হাজার হাজার বছরের/ অভিযোগহীন, প্রশ্নহীন হাত মেলে ধরেছে—/ জীবনানন্দের ম্লান কিশোরী, অধিকারবঞ্চিত ভাটিদেশের বেদনা—/ তার ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত হাতে ফুলের মালা,/চারিদিকে ফিনকি-দেয়া জ্যোৎস্না|/আমি মৃদুকণ্ঠে পৃথিবীকে বসুন্ধরা বলে ডাকলাম|/অশ্রু আর ঘাম যুগ যুগ ঝরছে—/প্রশ্ন নেই/প্রতিকার চেয়ে, না চেয়েও, অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে গ্যাছে—/ কোনো প্রশ্ন নেই/ তটভূমিতে আছাড় খায় গর্জন, নোনা গর্জন|” (প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়)

কবির একটা ˆবশিষ্ট্য হলো অন্যের দুঃখকে তিনি নিজের জীবনে উপলব্ধি করেন| -কারণেই হয়তো দুঃখ তার পিছু ছাড়ে না| যখনই তিনি ভাবেন দুঃখের অবসান হয়েছে, দুঃখ তাকে ছেড়ে চলে গেছে, ঠিক তখনই আরেকটি নতুন দুঃখ এসে তাঁর দরোজায় কড়া নাড়ে| বিষয়টা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে তাঁর একটি কবিতায়:

এই বুঝি শেষ দুঃখ,/এরপর অন্য কোনো দুঃখ-টুঃখ নেই,/দুঃখ তার যবনিকা ফেলে দিয়ে চলে গ্যাছে শেষে—/আমিও বাহিরে এসে সিগ্রেট ধরাবো/সমস্ত দুঃখের বাইরে ভাসাবো সাঁতার|/আরেক রকম দুঃখ ভিন্ন ব্যথা গায়/ দরজায় টোকা, দ্যায়,/সুখ ভেবে তাকে আমি বারবার তোয়াজ করছি/ না কি সেই লোভে/ করুণ ভিখিরি হয়ে/দুঃখগুলো ঘরের চৌকাঠে পড়ে থাকে|” (আমার দুঃখ-টুঃখ, বিত্ত নাই বেসাত নাই)

কবি আসাদ চৌধুরীর মানবিক বোধ, সত্য এবং সুন্দরের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা, সর্বোপরি সকল প্রকার কূপমণ্ডূকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন প্রতিবাদের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


বিদ্রোহ ও বিষাদের পংক্তিমালা

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

আসাদ চৌধুরী গত শতকের ষাটের দশকের কবি| সময় যে সকল কবি আধুনিক বাংলা কবিতায় অসামান্য অবদান রেখেছেন, আসাদ চৌধুরী তাদের অন্যতম| বরিশালে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা হলেও তাঁর জীবনের প্রায় পুরো সময় কেটেছে ঢাকায়| বরিশালের বিএম  কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন| সেখান থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন| রবীন্দ্র কাব্যের রোমান্টিক গীতিময়তা থেকে বাংলা কবিতার মুক্তির প্রয়াসে তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ এবং ভাষায় যে পরিবর্তন আসে তা ছিলো মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক| কাব্য আন্দোলনের অভিঘাত ঢাকায় অনুরণিত হয় পঞ্চাশের দশকে এসে| শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ কবিগণের হাতে আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তি রচিত হয়| ষাটের দশকে এসে বাংলা কবিতা ফুলে, ফসলে শোভিত হয়ে তার স্বকীয়তা খুঁজে পায়| এই দশকে আমরা কয়েকজন শক্তিশালী কবির দেখা পাই| তাদের  মধ্যে শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান  সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, আসাদ চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ,মহাদেব সাহা প্রমুখ ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর|

আসাদ চৌধুরী এই দশকের একজন জননন্দিত কবি| ১৯৬৪ সালে রফিক আজাদসহ আরও কয়েকজন মিলে কথিত যেস্যাড জেনারেশনগঠিত হয়েছিলো আসাদ চৌধুরী ছিলেন তার অন্যতম সদস্য| যদিও এর আয়ু ছিলো ক্ষণস্থায়ী| ১৯৭৫ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থতবক দেওয়া পানপ্রকাশিত হলে তা যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে| ষাটের দশক ছিল বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক জাগরণের কাল| এই দশকের কবিগণ তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা এবং সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী| কিন্তু রাজনৈতিক এই উন্মত্ততা সত্ত্বেও আসাদ চৌধুরীর কাব্যস্বর ছিলো নরম, মাধুর্যময়| এমনকি তাঁর প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলোতে সময়ের প্রভাব ছায়া ফেলেনি| রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিত্বের শালীনতা এবং কাব্য স্বরের স্নিগ্ধতা অক্ষুন্ন ছিলো| চিন্তা এবং বিশ্বাসে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে আধুনিক| কিন্তু এই আধুনিকতা তাঁকে তাঁর অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি| তিনি একদিকে যেমন নাগরিক অভিজাত মননকে অন্তরে ধারণ করতেন, অন্যদিকে লোকজ ঐতিহ্যকেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন|

আসাদ চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা| প্রতিবাদের কবি, বিদ্রোহের কবি হিসেবে তিনি বহুল স্বীকৃত| তাঁর কবিতা একদিকে যেমন যে কোনো অসঙ্গতি, অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, অন্যদিকে অন্তর্গত বিষাদের একটা প্রবাহ নিস্তরঙ্গভাবে বয়ে চলে|

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিরিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হন| এবং দুই লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারান| এইসব বীরাঙ্গনা নারী তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এদেশের মুক্তির জন্য| তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, তাঁদের চোখে মুখে ছিলো প্রতিশোধের আগুন: “নদীর জলে আগুন ছিল/আগুন ছিল বৃষ্টিতে/আগুন ছিল বীরাঙ্গনার/উদাস করা দৃষ্টিতে|/আগুন ছিল গানের সুরে/ আগুন ছিল কাব্যে/ মরার চোখে আগুন ছিল/একথা কে ভাববে?” (তখন সত্যি মানুষ ছিলাম, তবক দেওয়া পান)|

একটি ˆবষম্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের জন্য একাত্তরে আমাদের শহীদেরা প্রাণ দিয়েছিলেন| তাঁরা শিক্ষার অধিকার চেয়েছিলেন| জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মিলে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়া ছিল তাদের স্বপ্ন| কিন্তু আমরা শহীদের সেই স্বপ্নের কথা ভুলে গেছি| তারা যা চেয়েছিল বাংলাদেশ আজ আর সে কথা বলে না| কবির বেদনা-সিক্ত উচ্চারণ

তোমাদের যা বলার ছিল/বলছে কি তা বাংলাদেশ?/ শেষ কথাটি সুখের ছিল?/ঘৃণার ছিল?/ না কি ক্রোধের,/প্রতিশোধের,/কোনটা ছিল?/ না কি কোনো দুঃখের/না কি মনে তৃপ্তি ছিল,/দীপ্তি ছিল— /এই যাওয়াটাই সুখের|/তোমাদের যা বলার ছিল/ বলছে কি তা বাংলাদেশ?” (শহীদের প্রতি, যে পারে পারুক)|

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আসাদ চৌধুরী সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন| প্রথম দিকে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে কাজ করেন| পরবর্তীতে কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিতজয় বাংলাপত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগ দেন| ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, ত্যাগের কাহিনি এবং নরঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাসমূহ তিনি বিশদভাবে জানতে পারেন| এজন্য তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ অত্যন্ত আবেগ এবং বেদনার সঙ্গে উঠে এসেছে| একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বহু মাত্রিক দিক ছিল| জনাব তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার এই যুদ্ধের সকল দিক থামলে যুদ্ধে বিজয়ের ভিত রচনা করেছিলেন| যুদ্ধ যেমন দেশের অভ্যন্তরে করতে হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা ষড়যন্ত্র এবং বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে| ভারত এবং তৎকালীন রাশিয়া আমাদের পক্ষে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সৌদিসহ আরব বিশ্ব বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল| যুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে| ফলে জাতিসংঘ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র| তখন জাতিসংঘের মহাসচিব ছিলেন তৎকালীন বার্মার নাগরিক উথান্ট|

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা কবিরিপোর্ট ১৯৭১কবিতায় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় চিত্রিত করেছেন:

জনাব উথান্ট,/জাতিসংঘ ভবনের মেরামত অনিবার্য আজ|/আমাকে দেবেন, গুরু, দয়া করে তার ঠিকাদারি?/বিশ্বাস করুন রক্তমাখা ইটের যোগান/পৃথিবীর সর্বনিম্ন হারে একমাত্র আমি দিতে পারি/যদি চান শিশুর গলিত খুলি, দেওয়ালে দেওয়ালে শিশুদের রক্তের/আলপনা

প্লিজ আমাকে কন্ট্রাক্ট দিন/দশ লক্ষ মৃতদেহ থেকে/দুর্গন্ধের দুর্বোধ্য জবান শিখে রিপোর্ট লিখেছিপড়ো, পাঠ করো|/কুড়ি লক্ষ আহতের আর্তনাদ থেকে/ঘৃণাকে জেনেছিপড়ো, পাঠ করো|/চল্লিশ হাজার ধর্ষিতা নারীর কাছে,/জুলুমের সবক নিয়েছিপড়ো, পাঠ করো|/দুঃখের স্মৃতিতে ডোবা আশি লক্ষ শরণার্থী/শিখিয়েছে দীর্ঘশ্বাসে কতোটুকু ক্রোধ লেখা থাকে|” (রিপোর্ট ১৯৭১, যে পারে পারুক)|

আসাদ চৌধুরীর প্রথম দিকের কাব্যগুলো যেমন: তবক দেওয়া পান (১৯৭৫), বিত্ত নাই বেসাত নাই (১৯৭৬), প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড় ১৯৭৬), জলের মধ্যে লেখাজোকা (১৯৮২) প্রভৃতি| এসব গ্রন্থের মূল সুর ছিলো বিষাদ এবং ˆনরাশ্য| কবিতায় তিনি দুঃখকে নানাভাবে উদযাপন করেছেন| চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদান এবং ঘটনা প্রবাহের মধ্যে তীব্র অসংগতি তাঁর কবিতায় অবলীলায় উঠে এসেছে| তাঁর বেশ কিছু কবিতায় গোলাপের প্রসঙ্গ এসেছে| সবাই গোলাপ ফুল ভালোবাসে| এর সৌরভ মনোমুগ্ধকর| কিন্তু কবি গোলাপের দিকে হাত বাড়িয়ে সৌরভের পরিবর্তে পান কাঁটার আঘাত: “গোলাপের মধ্যে যাব|/বাড়ালাম হাত/ফিরে এলো রক্তাক্ত আঙুল|/সাপিনীর কারুকার্য/নগ্ন নতজানু/ চরাচরে  আবেগ বিলায়|/ আমার অধরে শুধু /দাঁতের আঘাত|” (আত্মজীবনী: তবক দেওয়া পান)|

গোলাপের কাছে হাত রেখেশীর্ষক কবিতায় কবির বিষণ্নতা ঝরে পরেছে| শুধু গোলাপই নয়, সৌন্দর্যের আধার যে জ্যোৎস্না, তাও কবির কাছে সৌন্দর্যহীন| তাঁর জীবনের বিষাদের প্রতিবি¤^ যেন তিনি জ্যোৎস্নার মধ্যেও দেখতে পান| এবং এর ফলে জ্যোৎস্নাকে তাঁর কাছে দেউলিয়া মনে হয়েছে| তিনি বলেন:

গোলাপ আপনি কেমন আছেন?, শুনি|

জ্যোৎস্না না আপনি দেউলে হননি আজো?

কুশল শুধাই কেননা বাড়ছে দ্বিধা

পার্স থেকে শেষ ফুলটিও ঝরে যায়|”

   (গোলাপের কাঁধে হাত রেখে, তবক দেওয়া পান)

কবির এই বিষাদ সর্বব্যাপী| কেননা তিনি বড়ই নিঃসঙ্গ| কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দেয় না| বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবাই তাঁর থেকে দূরে| প্রকৃতির কোনো আয়োজনেই কবির অংশগ্রহণ নেই| শুধু মানুষই নয়, প্রকৃতির অন্য সব উপাদানও কবির প্রতি যেন বৈরী ভাবাপন্ন|

আমার ডাকে কেউ সাড়া দিলো না,/না মালঞ্চ, না আকাশ/না সমুদ্র|/তাকের ওপর ওষুধের শিশি,/আর ছোটো পর্দা টানা সংক্ষিপ্ত জানালা|” (রোগশয্যায়, তবক দেওয়া পান)|

যদি আলোই না হয়কবিতায় আমরা কবিকে দেখি প্রবল হতাশাগ্রস্ত| কারও কাছ থেকে তিনি কোনো আশার বাণী শুনতে পান না| সর্বত্রই শুধু আশা ভঙ্গের বেদনা| একদিকে কবি কারও কাছ থেকে কোনো আশার বাণী শুনতে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তিনিও প্রিয় মানুষের কাছে উপস্থিত হচ্ছেন একেবারে শূন্য হাতে| এই দোলাচলে কবি হৃদয় দগ্ধীভূত| কবি প্রশ্ন রাখেন: “হে আমার ক্লান্তিহীন যাত্রার স্টেশন,/তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপে শুধু আমারই আঙ্গুল পোড়ে কেন? /যদি আলোই না হয়,/ কেন প্রদীপ মিছেমিছি আসাদের মতো জ্বলবে?”

(যদি আলোই না হয়, তবক দেওয়া পান)

আসাদ চৌধুরীর সতীর্থ অন্তত আরও দুইজন কবির মধ্যে আমরা বিষাদময়তার ছায়া দেখি| একজন শহীদ কাদরী এবং আরেকজন আবুল হাসান| শহীদ কাদরী কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন উদ্বাস্তু হিসেবে| এবং ঢাকায় তিনি ভবঘুরে হিসেবে বিচরণ করেছেন| ফলে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তার মধ্যে সংক্রামিত হয়েছিল| আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে দেন| ভালো কোনো চাকরি পান নাই জীবনে| ফলে তার জীবনও ছিলো অনিশ্চয়তায় ভরা| হয়তো -কারণেই জীবনের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা ছিলো তাঁর| কিন্তু আসাদ চৌধুরীর জীবন যথেষ্ট সুস্থির ছিলো| তাঁর পূর্ব পুরুষ ছিলেন জমিদার| তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করে অবশেষে বাংলা একাডেমির চাকরিতে থিতু হয়েছিলেন| ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুঃখী ছিলেন না| কিন্তু চারপাশের মানুষের দুঃখ, বিষাদ তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে| সামষ্টিক দুঃখ তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ হয়ে ওঠে|

১৯৭৬ সালে প্রকাশিতপ্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়কাব্যগ্রন্থের একেবারে শেষে স্থান পেয়েছে এর নাম কবিতাটি| তুলনামূলক একটি দীর্ঘ কবিতা এটি| শেরপুরে দেখা এক গারো রমণীর কাজের বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবিতার শুরু| নতুন ব্লেডের চেয়েও ঝকঝকে গারোদের উঠোন ঘরবাড়ি| সৈনিকের শৃঙ্খলায় সারি বাঁধা আনারসের চারা দেখে কবি হতবিহ্বল| দুঃখে ভরা এইসব মানুষের জীবন| কিন্তু তাদের মুখে কোনো দুঃখের ছাপ নেই| সব সময় লেগে থাকে হাসির আস্তরণ|

অন্যদিকে এদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জীবনও দ্বন্দ্বমুখর| এখানে বনের পশু এবং মানুষ সবাইকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়| উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরে জীবনকে টেনে নিয়ে যায় দক্ষিণের সমুদ্র পারের মানুষ| যুগের পর যুগ দক্ষিণের ভাটি অঞ্চলের মানুষ ক্ষুধায়, বঞ্চনায় বেঁচে আছে| জীবন নিয়ে তাদের প্রশ্নের, অভিযোগের কোনো প্রতিকার নেই| এখানে সবকিছুই চলে যেন নিয়তির ইশারায়| কবি দক্ষিণের কোনো এক স্থানে ভ্রমণে গিয়ে সেখানে একটি হোটেলে ছিলেন| কবি বলেন— “হোটেল থেকে নেমেই রিকশাঅলার সাথে দর- কষাকষি,/ একটি ভিক্ষুক হাজার হাজার বছরের/ অভিযোগহীন, প্রশ্নহীন হাত মেলে ধরেছে—/ জীবনানন্দের ম্লান কিশোরী, অধিকারবঞ্চিত ভাটিদেশের বেদনা—/ তার ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত হাতে ফুলের মালা,/চারিদিকে ফিনকি-দেয়া জ্যোৎস্না|/আমি মৃদুকণ্ঠে পৃথিবীকে বসুন্ধরা বলে ডাকলাম|/অশ্রু আর ঘাম যুগ যুগ ঝরছে—/প্রশ্ন নেই/প্রতিকার চেয়ে, না চেয়েও, অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে গ্যাছে—/ কোনো প্রশ্ন নেই/ তটভূমিতে আছাড় খায় গর্জন, নোনা গর্জন|” (প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়)

কবির একটা ˆবশিষ্ট্য হলো অন্যের দুঃখকে তিনি নিজের জীবনে উপলব্ধি করেন| -কারণেই হয়তো দুঃখ তার পিছু ছাড়ে না| যখনই তিনি ভাবেন দুঃখের অবসান হয়েছে, দুঃখ তাকে ছেড়ে চলে গেছে, ঠিক তখনই আরেকটি নতুন দুঃখ এসে তাঁর দরোজায় কড়া নাড়ে| বিষয়টা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে তাঁর একটি কবিতায়:

এই বুঝি শেষ দুঃখ,/এরপর অন্য কোনো দুঃখ-টুঃখ নেই,/দুঃখ তার যবনিকা ফেলে দিয়ে চলে গ্যাছে শেষে—/আমিও বাহিরে এসে সিগ্রেট ধরাবো/সমস্ত দুঃখের বাইরে ভাসাবো সাঁতার|/আরেক রকম দুঃখ ভিন্ন ব্যথা গায়/ দরজায় টোকা, দ্যায়,/সুখ ভেবে তাকে আমি বারবার তোয়াজ করছি/ না কি সেই লোভে/ করুণ ভিখিরি হয়ে/দুঃখগুলো ঘরের চৌকাঠে পড়ে থাকে|” (আমার দুঃখ-টুঃখ, বিত্ত নাই বেসাত নাই)

কবি আসাদ চৌধুরীর মানবিক বোধ, সত্য এবং সুন্দরের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা, সর্বোপরি সকল প্রকার কূপমণ্ডূকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন প্রতিবাদের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত