আসাদ চৌধুরী গত শতকের ষাটের
দশকের কবি| ঐ সময়
যে সকল কবি আধুনিক
বাংলা কবিতায় অসামান্য অবদান রেখেছেন, আসাদ চৌধুরী তাদের
অন্যতম| বরিশালে জন্ম এবং বেড়ে
ওঠা হলেও তাঁর জীবনের
প্রায় পুরো সময় কেটেছে
ঢাকায়| বরিশালের বিএম কলেজ
থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন| সেখান থেকে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
অর্জন করেন| রবীন্দ্র কাব্যের রোমান্টিক গীতিময়তা থেকে বাংলা কবিতার
মুক্তির প্রয়াসে তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ এবং ভাষায় যে
পরিবর্তন আসে তা ছিলো
মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক| ঐ কাব্য আন্দোলনের
অভিঘাত ঢাকায় অনুরণিত হয় পঞ্চাশের দশকে
এসে| শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ
শামসুল হক প্রমুখ কবিগণের
হাতে আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তি রচিত হয়| ষাটের
দশকে এসে বাংলা কবিতা
ফুলে, ফসলে শোভিত হয়ে
তার স্বকীয়তা খুঁজে পায়| এই দশকে
আমরা কয়েকজন শক্তিশালী কবির দেখা পাই|
তাদের মধ্যে
শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ,
নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান,
আসাদ চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ,মহাদেব সাহা
প্রমুখ ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর|
আসাদ চৌধুরী এই দশকের একজন
জননন্দিত কবি| ১৯৬৪ সালে
রফিক আজাদসহ আরও কয়েকজন মিলে
কথিত যে ‘স্যাড জেনারেশন’
গঠিত হয়েছিলো আসাদ চৌধুরী ছিলেন
তার অন্যতম সদস্য| যদিও এর আয়ু
ছিলো ক্ষণস্থায়ী| ১৯৭৫ সালে তাঁর
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তবক দেওয়া পান’
প্রকাশিত হলে তা যথেষ্ট
পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে| ষাটের
দশক ছিল বাংলাদেশের সামাজিক,
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণের
কাল| এই দশকের কবিগণ
তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা এবং
সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ
সাক্ষী| কিন্তু রাজনৈতিক এই উন্মত্ততা সত্ত্বেও
আসাদ চৌধুরীর কাব্যস্বর ছিলো নরম, মাধুর্যময়|
এমনকি তাঁর প্রথম জীবনের
কাব্যগ্রন্থগুলোতে সময়ের প্রভাব ছায়া ফেলেনি| রাজনৈতিক
ডামাডোলের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিত্বের শালীনতা
এবং কাব্য স্বরের স্নিগ্ধতা অক্ষুন্ন ছিলো| চিন্তা এবং বিশ্বাসে তিনি
ছিলেন সম্পূর্ণরূপে আধুনিক| কিন্তু এই আধুনিকতা তাঁকে
তাঁর অতীত ঐতিহ্য থেকে
বিচ্যুত করতে পারেনি| তিনি
একদিকে যেমন নাগরিক অভিজাত
মননকে অন্তরে ধারণ করতেন, অন্যদিকে
লোকজ ঐতিহ্যকেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন|
আসাদ চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা|
প্রতিবাদের কবি, বিদ্রোহের কবি
হিসেবে তিনি বহুল স্বীকৃত|
তাঁর কবিতা একদিকে যেমন যে কোনো
অসঙ্গতি, অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, অন্যদিকে অন্তর্গত বিষাদের একটা প্রবাহ নিস্তরঙ্গভাবে
বয়ে চলে|
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিরিশ লক্ষ
মানুষ শহীদ হন| এবং
দুই লক্ষ নারী তাদের
সম্ভ্রম হারান| এইসব বীরাঙ্গনা নারী
তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এদেশের মুক্তির জন্য| তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত
করেননি, তাঁদের চোখে মুখে ছিলো
প্রতিশোধের আগুন: “নদীর জলে আগুন
ছিল/আগুন ছিল বৃষ্টিতে/আগুন ছিল বীরাঙ্গনার/উদাস করা দৃষ্টিতে|/আগুন ছিল গানের
সুরে/ আগুন ছিল কাব্যে/
মরার চোখে আগুন ছিল/একথা কে ভাববে?”
(তখন সত্যি মানুষ ছিলাম, তবক দেওয়া পান)|
একটি ˆবষম্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের জন্য একাত্তরে আমাদের
শহীদেরা প্রাণ দিয়েছিলেন| তাঁরা শিক্ষার অধিকার চেয়েছিলেন| জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে
মিলে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়া ছিল তাদের
স্বপ্ন| কিন্তু আমরা শহীদের সেই
স্বপ্নের কথা ভুলে গেছি|
তারা যা চেয়েছিল বাংলাদেশ
আজ আর সে কথা
বলে না| কবির বেদনা-সিক্ত উচ্চারণ—
“তোমাদের যা বলার ছিল/বলছে কি তা
বাংলাদেশ?/ শেষ কথাটি সুখের
ছিল?/ঘৃণার ছিল?/ না কি ক্রোধের,/প্রতিশোধের,/কোনটা ছিল?/ না কি কোনো
দুঃখের/না কি মনে
তৃপ্তি ছিল,/দীপ্তি ছিল—
/এই যাওয়াটাই সুখের|/তোমাদের যা বলার ছিল/
বলছে কি তা বাংলাদেশ?”
(শহীদের প্রতি, যে পারে পারুক)|
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আসাদ
চৌধুরী সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন| প্রথম দিকে তিনি স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের
অনুপ্রাণিত করতে কাজ করেন|
পরবর্তীতে কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত
‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগ দেন|
ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, ত্যাগের কাহিনি এবং নরঘাতক পাকিস্তানি
বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাসমূহ তিনি বিশদভাবে জানতে
পারেন| এজন্য তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের
প্রসঙ্গ অত্যন্ত আবেগ এবং বেদনার
সঙ্গে উঠে এসেছে| একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধের বহু মাত্রিক দিক
ছিল| জনাব তাজউদ্দীন আহমদের
নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার এই যুদ্ধের সকল
দিক থামলে যুদ্ধে বিজয়ের ভিত রচনা করেছিলেন|
যুদ্ধ যেমন দেশের অভ্যন্তরে
করতে হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা ষড়যন্ত্র এবং
বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে| ভারত
এবং তৎকালীন রাশিয়া আমাদের পক্ষে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সৌদিসহ
আরব বিশ্ব বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল| যুদ্ধের পক্ষ
এবং বিপক্ষ শক্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে| ফলে জাতিসংঘ
হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের
আরেকটি রণক্ষেত্র| তখন জাতিসংঘের মহাসচিব
ছিলেন তৎকালীন বার্মার নাগরিক উথান্ট|
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের নিরস্ত্র
মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা কবি ‘রিপোর্ট
১৯৭১’ কবিতায় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় চিত্রিত করেছেন:
“জনাব উথান্ট,/জাতিসংঘ ভবনের মেরামত অনিবার্য আজ|/আমাকে দেবেন,
গুরু, দয়া করে তার
ঠিকাদারি?/বিশ্বাস করুন রক্তমাখা ইটের
যোগান/পৃথিবীর সর্বনিম্ন হারে একমাত্র আমি
দিতে পারি/যদি চান
শিশুর গলিত খুলি, দেওয়ালে
দেওয়ালে শিশুদের রক্তের/আলপনা
প্লিজ আমাকে কন্ট্রাক্ট দিন/দশ লক্ষ
মৃতদেহ থেকে/দুর্গন্ধের দুর্বোধ্য
জবান শিখে রিপোর্ট লিখেছি—
পড়ো, পাঠ করো|/কুড়ি
লক্ষ আহতের আর্তনাদ থেকে/ঘৃণাকে জেনেছি—
পড়ো, পাঠ করো|/চল্লিশ
হাজার ধর্ষিতা নারীর কাছে,/জুলুমের সবক নিয়েছি— পড়ো,
পাঠ করো|/দুঃখের স্মৃতিতে
ডোবা আশি লক্ষ শরণার্থী/শিখিয়েছে দীর্ঘশ্বাসে কতোটুকু ক্রোধ লেখা থাকে|” (রিপোর্ট
১৯৭১, যে পারে পারুক)|
আসাদ চৌধুরীর প্রথম দিকের কাব্যগুলো যেমন: তবক দেওয়া পান
(১৯৭৫), বিত্ত নাই বেসাত নাই
(১৯৭৬), প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়
১৯৭৬), জলের মধ্যে লেখাজোকা
(১৯৮২) প্রভৃতি| এসব গ্রন্থের মূল
সুর ছিলো বিষাদ এবং
ˆনরাশ্য| কবিতায় তিনি দুঃখকে নানাভাবে
উদযাপন করেছেন| চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদান এবং ঘটনা প্রবাহের
মধ্যে তীব্র অসংগতি তাঁর কবিতায় অবলীলায়
উঠে এসেছে| তাঁর বেশ কিছু
কবিতায় গোলাপের প্রসঙ্গ এসেছে| সবাই গোলাপ ফুল
ভালোবাসে| এর সৌরভ মনোমুগ্ধকর|
কিন্তু কবি গোলাপের দিকে
হাত বাড়িয়ে সৌরভের পরিবর্তে পান কাঁটার আঘাত:
“গোলাপের মধ্যে যাব|/বাড়ালাম হাত/ফিরে এলো রক্তাক্ত
আঙুল|/সাপিনীর কারুকার্য/নগ্ন নতজানু/ চরাচরে আবেগ
বিলায়|/ আমার অধরে শুধু
/দাঁতের আঘাত|” (আত্মজীবনী: ১ তবক দেওয়া
পান)|
“গোলাপের কাছে হাত রেখে”
শীর্ষক কবিতায় কবির বিষণ্নতা ঝরে
পরেছে| শুধু গোলাপই নয়,
সৌন্দর্যের আধার যে জ্যোৎস্না,
তাও কবির কাছে সৌন্দর্যহীন|
তাঁর জীবনের বিষাদের প্রতিবি¤^ যেন তিনি জ্যোৎস্নার
মধ্যেও দেখতে পান| এবং এর
ফলে জ্যোৎস্নাকে তাঁর কাছে দেউলিয়া
মনে হয়েছে| তিনি বলেন:
“গোলাপ আপনি কেমন আছেন?,
শুনি|
জ্যোৎস্না না আপনি দেউলে
হননি আজো?
কুশল শুধাই কেননা বাড়ছে দ্বিধা
পার্স থেকে শেষ ফুলটিও
ঝরে যায়|”
(গোলাপের কাঁধে
হাত রেখে, তবক দেওয়া পান)
কবির এই বিষাদ সর্বব্যাপী|
কেননা তিনি বড়ই নিঃসঙ্গ|
কেউ তাঁর ডাকে সাড়া
দেয় না| বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী
সবাই তাঁর থেকে দূরে|
প্রকৃতির কোনো আয়োজনেই কবির
অংশগ্রহণ নেই| শুধু মানুষই
নয়, প্রকৃতির অন্য সব উপাদানও
কবির প্রতি যেন বৈরী ভাবাপন্ন|
“আমার ডাকে কেউ সাড়া
দিলো না,/না মালঞ্চ,
না আকাশ/না সমুদ্র|/তাকের ওপর ওষুধের শিশি,/আর ছোটো পর্দা
টানা সংক্ষিপ্ত জানালা|” (রোগশয্যায়, তবক দেওয়া পান)|
‘যদি আলোই না হয়’
কবিতায় আমরা কবিকে দেখি
প্রবল হতাশাগ্রস্ত| কারও কাছ থেকে
তিনি কোনো আশার বাণী
শুনতে পান না| সর্বত্রই
শুধু আশা ভঙ্গের বেদনা|
একদিকে কবি কারও কাছ
থেকে কোনো আশার বাণী
শুনতে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তিনিও
প্রিয় মানুষের কাছে উপস্থিত হচ্ছেন
একেবারে শূন্য হাতে| এই দোলাচলে কবি
হৃদয় দগ্ধীভূত| কবি প্রশ্ন রাখেন:
“হে আমার ক্লান্তিহীন যাত্রার
স্টেশন,/তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপে শুধু আমারই আঙ্গুল
পোড়ে কেন? /যদি আলোই না
হয়,/ কেন প্রদীপ মিছেমিছি
আসাদের মতো জ্বলবে?”
(যদি আলোই না হয়,
তবক দেওয়া পান)
আসাদ চৌধুরীর সতীর্থ অন্তত আরও দুইজন কবির
মধ্যে আমরা বিষাদময়তার ছায়া
দেখি| একজন শহীদ কাদরী
এবং আরেকজন আবুল হাসান| শহীদ
কাদরী কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন
উদ্বাস্তু হিসেবে| এবং ঢাকায় তিনি
ভবঘুরে হিসেবে বিচরণ করেছেন| ফলে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী
মনোভাব তার মধ্যে সংক্রামিত
হয়েছিল| আবুল হাসান ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে
দেন| ভালো কোনো চাকরি
পান নাই জীবনে| ফলে
তার জীবনও ছিলো অনিশ্চয়তায় ভরা|
হয়তো এ-কারণেই জীবনের
প্রতি একটা বিতৃষ্ণা ছিলো
তাঁর| কিন্তু আসাদ চৌধুরীর জীবন
যথেষ্ট সুস্থির ছিলো| তাঁর পূর্ব পুরুষ
ছিলেন জমিদার| তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায়
চাকরি করে অবশেষে বাংলা
একাডেমির চাকরিতে থিতু হয়েছিলেন| ব্যক্তিগত
জীবনে তিনি দুঃখী ছিলেন
না| কিন্তু চারপাশের মানুষের দুঃখ, বিষাদ তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে|
সামষ্টিক দুঃখ তাঁর ব্যক্তিগত
দুঃখ হয়ে ওঠে|
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত “প্রশ্ন
নেই উত্তরে পাহাড়” কাব্যগ্রন্থের একেবারে শেষে স্থান পেয়েছে
এর নাম কবিতাটি| তুলনামূলক
একটি দীর্ঘ কবিতা এটি| শেরপুরে দেখা
এক গারো রমণীর কাজের
বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবিতার
শুরু| নতুন ব্লেডের চেয়েও
ঝকঝকে গারোদের উঠোন ঘরবাড়ি| সৈনিকের
শৃঙ্খলায় সারি বাঁধা আনারসের
চারা দেখে কবি হতবিহ্বল|
দুঃখে ভরা এইসব মানুষের
জীবন| কিন্তু তাদের মুখে কোনো দুঃখের
ছাপ নেই| সব সময়
লেগে থাকে হাসির আস্তরণ|
অন্যদিকে এদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জীবনও দ্বন্দ্বমুখর| এখানে বনের পশু এবং
মানুষ সবাইকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে
হয়| উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরে জীবনকে
টেনে নিয়ে যায় দক্ষিণের
সমুদ্র পারের মানুষ| যুগের পর যুগ দক্ষিণের
ভাটি অঞ্চলের মানুষ ক্ষুধায়, বঞ্চনায় বেঁচে আছে| জীবন নিয়ে
তাদের প্রশ্নের, অভিযোগের কোনো প্রতিকার নেই|
এখানে সবকিছুই চলে যেন নিয়তির
ইশারায়| কবি দক্ষিণের কোনো
এক স্থানে ভ্রমণে গিয়ে সেখানে একটি
হোটেলে ছিলেন| কবি বলেন— “হোটেল
থেকে নেমেই রিকশাঅলার সাথে দর- কষাকষি,/
একটি ভিক্ষুক হাজার হাজার বছরের/ অভিযোগহীন, প্রশ্নহীন হাত মেলে ধরেছে—/
জীবনানন্দের ম্লান কিশোরী, অধিকারবঞ্চিত ভাটিদেশের বেদনা—/ তার ক্লান্ত ক্লান্ত
ক্লান্ত হাতে ফুলের মালা,/চারিদিকে ফিনকি-দেয়া জ্যোৎস্না|/আমি
মৃদুকণ্ঠে পৃথিবীকে বসুন্ধরা বলে ডাকলাম|/অশ্রু
আর ঘাম যুগ যুগ
ঝরছে—/প্রশ্ন নেই/প্রতিকার চেয়ে,
না চেয়েও, অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে
গ্যাছে—/ কোনো প্রশ্ন নেই/
তটভূমিতে আছাড় খায় গর্জন,
নোনা গর্জন|” (প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়)
কবির একটা ˆবশিষ্ট্য হলো অন্যের দুঃখকে
তিনি নিজের জীবনে উপলব্ধি করেন| এ-কারণেই হয়তো
দুঃখ তার পিছু ছাড়ে
না| যখনই তিনি ভাবেন
দুঃখের অবসান হয়েছে, দুঃখ তাকে ছেড়ে
চলে গেছে, ঠিক তখনই আরেকটি
নতুন দুঃখ এসে তাঁর
দরোজায় কড়া নাড়ে| বিষয়টা
চমৎকারভাবে উঠে এসেছে তাঁর
একটি কবিতায়:
“এই বুঝি শেষ দুঃখ,/এরপর অন্য কোনো
দুঃখ-টুঃখ নেই,/দুঃখ
তার যবনিকা ফেলে দিয়ে চলে
গ্যাছে শেষে—/আমিও বাহিরে এসে
সিগ্রেট ধরাবো/সমস্ত দুঃখের বাইরে ভাসাবো সাঁতার|/আরেক রকম দুঃখ
ভিন্ন ব্যথা গায়/ দরজায় টোকা,
দ্যায়,/সুখ ভেবে তাকে
আমি বারবার তোয়াজ করছি/ না কি সেই
লোভে/ করুণ ভিখিরি হয়ে/দুঃখগুলো ঘরের চৌকাঠে পড়ে
থাকে|” (আমার দুঃখ-টুঃখ,
বিত্ত নাই বেসাত নাই)
কবি আসাদ চৌধুরীর মানবিক
বোধ, সত্য এবং সুন্দরের
প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা,
সর্বোপরি সকল প্রকার কূপমণ্ডূকতা
এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন প্রতিবাদের জন্য তিনি স্মরণীয়
হয়ে থাকবেন|

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
আসাদ চৌধুরী গত শতকের ষাটের
দশকের কবি| ঐ সময়
যে সকল কবি আধুনিক
বাংলা কবিতায় অসামান্য অবদান রেখেছেন, আসাদ চৌধুরী তাদের
অন্যতম| বরিশালে জন্ম এবং বেড়ে
ওঠা হলেও তাঁর জীবনের
প্রায় পুরো সময় কেটেছে
ঢাকায়| বরিশালের বিএম কলেজ
থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন| সেখান থেকে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
অর্জন করেন| রবীন্দ্র কাব্যের রোমান্টিক গীতিময়তা থেকে বাংলা কবিতার
মুক্তির প্রয়াসে তিরিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ এবং ভাষায় যে
পরিবর্তন আসে তা ছিলো
মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক| ঐ কাব্য আন্দোলনের
অভিঘাত ঢাকায় অনুরণিত হয় পঞ্চাশের দশকে
এসে| শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ
শামসুল হক প্রমুখ কবিগণের
হাতে আধুনিক বাংলা কবিতার ভিত্তি রচিত হয়| ষাটের
দশকে এসে বাংলা কবিতা
ফুলে, ফসলে শোভিত হয়ে
তার স্বকীয়তা খুঁজে পায়| এই দশকে
আমরা কয়েকজন শক্তিশালী কবির দেখা পাই|
তাদের মধ্যে
শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ,
নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান,
আসাদ চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ,মহাদেব সাহা
প্রমুখ ছিলেন স্বমহিমায় ভাস্বর|
আসাদ চৌধুরী এই দশকের একজন
জননন্দিত কবি| ১৯৬৪ সালে
রফিক আজাদসহ আরও কয়েকজন মিলে
কথিত যে ‘স্যাড জেনারেশন’
গঠিত হয়েছিলো আসাদ চৌধুরী ছিলেন
তার অন্যতম সদস্য| যদিও এর আয়ু
ছিলো ক্ষণস্থায়ী| ১৯৭৫ সালে তাঁর
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তবক দেওয়া পান’
প্রকাশিত হলে তা যথেষ্ট
পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে| ষাটের
দশক ছিল বাংলাদেশের সামাজিক,
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণের
কাল| এই দশকের কবিগণ
তৎকালীন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা এবং
সর্বোপরি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ
সাক্ষী| কিন্তু রাজনৈতিক এই উন্মত্ততা সত্ত্বেও
আসাদ চৌধুরীর কাব্যস্বর ছিলো নরম, মাধুর্যময়|
এমনকি তাঁর প্রথম জীবনের
কাব্যগ্রন্থগুলোতে সময়ের প্রভাব ছায়া ফেলেনি| রাজনৈতিক
ডামাডোলের মধ্যেও তাঁর ব্যক্তিত্বের শালীনতা
এবং কাব্য স্বরের স্নিগ্ধতা অক্ষুন্ন ছিলো| চিন্তা এবং বিশ্বাসে তিনি
ছিলেন সম্পূর্ণরূপে আধুনিক| কিন্তু এই আধুনিকতা তাঁকে
তাঁর অতীত ঐতিহ্য থেকে
বিচ্যুত করতে পারেনি| তিনি
একদিকে যেমন নাগরিক অভিজাত
মননকে অন্তরে ধারণ করতেন, অন্যদিকে
লোকজ ঐতিহ্যকেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন|
আসাদ চৌধুরী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা|
প্রতিবাদের কবি, বিদ্রোহের কবি
হিসেবে তিনি বহুল স্বীকৃত|
তাঁর কবিতা একদিকে যেমন যে কোনো
অসঙ্গতি, অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, অন্যদিকে অন্তর্গত বিষাদের একটা প্রবাহ নিস্তরঙ্গভাবে
বয়ে চলে|
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তিরিশ লক্ষ
মানুষ শহীদ হন| এবং
দুই লক্ষ নারী তাদের
সম্ভ্রম হারান| এইসব বীরাঙ্গনা নারী
তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন এদেশের মুক্তির জন্য| তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথা নত
করেননি, তাঁদের চোখে মুখে ছিলো
প্রতিশোধের আগুন: “নদীর জলে আগুন
ছিল/আগুন ছিল বৃষ্টিতে/আগুন ছিল বীরাঙ্গনার/উদাস করা দৃষ্টিতে|/আগুন ছিল গানের
সুরে/ আগুন ছিল কাব্যে/
মরার চোখে আগুন ছিল/একথা কে ভাববে?”
(তখন সত্যি মানুষ ছিলাম, তবক দেওয়া পান)|
একটি ˆবষম্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশের জন্য একাত্তরে আমাদের
শহীদেরা প্রাণ দিয়েছিলেন| তাঁরা শিক্ষার অধিকার চেয়েছিলেন| জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে
মিলে অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়া ছিল তাদের
স্বপ্ন| কিন্তু আমরা শহীদের সেই
স্বপ্নের কথা ভুলে গেছি|
তারা যা চেয়েছিল বাংলাদেশ
আজ আর সে কথা
বলে না| কবির বেদনা-সিক্ত উচ্চারণ—
“তোমাদের যা বলার ছিল/বলছে কি তা
বাংলাদেশ?/ শেষ কথাটি সুখের
ছিল?/ঘৃণার ছিল?/ না কি ক্রোধের,/প্রতিশোধের,/কোনটা ছিল?/ না কি কোনো
দুঃখের/না কি মনে
তৃপ্তি ছিল,/দীপ্তি ছিল—
/এই যাওয়াটাই সুখের|/তোমাদের যা বলার ছিল/
বলছে কি তা বাংলাদেশ?”
(শহীদের প্রতি, যে পারে পারুক)|
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আসাদ
চৌধুরী সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন| প্রথম দিকে তিনি স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের
অনুপ্রাণিত করতে কাজ করেন|
পরবর্তীতে কলকাতায় অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত
‘জয় বাংলা’ পত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগ দেন|
ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, ত্যাগের কাহিনি এবং নরঘাতক পাকিস্তানি
বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাসমূহ তিনি বিশদভাবে জানতে
পারেন| এজন্য তাঁর কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের
প্রসঙ্গ অত্যন্ত আবেগ এবং বেদনার
সঙ্গে উঠে এসেছে| একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধের বহু মাত্রিক দিক
ছিল| জনাব তাজউদ্দীন আহমদের
নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার এই যুদ্ধের সকল
দিক থামলে যুদ্ধে বিজয়ের ভিত রচনা করেছিলেন|
যুদ্ধ যেমন দেশের অভ্যন্তরে
করতে হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা ষড়যন্ত্র এবং
বাধা মোকাবেলা করতে হয়েছে| ভারত
এবং তৎকালীন রাশিয়া আমাদের পক্ষে থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সৌদিসহ
আরব বিশ্ব বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিল| যুদ্ধের পক্ষ
এবং বিপক্ষ শক্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে| ফলে জাতিসংঘ
হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের
আরেকটি রণক্ষেত্র| তখন জাতিসংঘের মহাসচিব
ছিলেন তৎকালীন বার্মার নাগরিক উথান্ট|
মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি গণহত্যা এবং বাংলাদেশের নিরস্ত্র
মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা কবি ‘রিপোর্ট
১৯৭১’ কবিতায় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় চিত্রিত করেছেন:
“জনাব উথান্ট,/জাতিসংঘ ভবনের মেরামত অনিবার্য আজ|/আমাকে দেবেন,
গুরু, দয়া করে তার
ঠিকাদারি?/বিশ্বাস করুন রক্তমাখা ইটের
যোগান/পৃথিবীর সর্বনিম্ন হারে একমাত্র আমি
দিতে পারি/যদি চান
শিশুর গলিত খুলি, দেওয়ালে
দেওয়ালে শিশুদের রক্তের/আলপনা
প্লিজ আমাকে কন্ট্রাক্ট দিন/দশ লক্ষ
মৃতদেহ থেকে/দুর্গন্ধের দুর্বোধ্য
জবান শিখে রিপোর্ট লিখেছি—
পড়ো, পাঠ করো|/কুড়ি
লক্ষ আহতের আর্তনাদ থেকে/ঘৃণাকে জেনেছি—
পড়ো, পাঠ করো|/চল্লিশ
হাজার ধর্ষিতা নারীর কাছে,/জুলুমের সবক নিয়েছি— পড়ো,
পাঠ করো|/দুঃখের স্মৃতিতে
ডোবা আশি লক্ষ শরণার্থী/শিখিয়েছে দীর্ঘশ্বাসে কতোটুকু ক্রোধ লেখা থাকে|” (রিপোর্ট
১৯৭১, যে পারে পারুক)|
আসাদ চৌধুরীর প্রথম দিকের কাব্যগুলো যেমন: তবক দেওয়া পান
(১৯৭৫), বিত্ত নাই বেসাত নাই
(১৯৭৬), প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়
১৯৭৬), জলের মধ্যে লেখাজোকা
(১৯৮২) প্রভৃতি| এসব গ্রন্থের মূল
সুর ছিলো বিষাদ এবং
ˆনরাশ্য| কবিতায় তিনি দুঃখকে নানাভাবে
উদযাপন করেছেন| চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদান এবং ঘটনা প্রবাহের
মধ্যে তীব্র অসংগতি তাঁর কবিতায় অবলীলায়
উঠে এসেছে| তাঁর বেশ কিছু
কবিতায় গোলাপের প্রসঙ্গ এসেছে| সবাই গোলাপ ফুল
ভালোবাসে| এর সৌরভ মনোমুগ্ধকর|
কিন্তু কবি গোলাপের দিকে
হাত বাড়িয়ে সৌরভের পরিবর্তে পান কাঁটার আঘাত:
“গোলাপের মধ্যে যাব|/বাড়ালাম হাত/ফিরে এলো রক্তাক্ত
আঙুল|/সাপিনীর কারুকার্য/নগ্ন নতজানু/ চরাচরে আবেগ
বিলায়|/ আমার অধরে শুধু
/দাঁতের আঘাত|” (আত্মজীবনী: ১ তবক দেওয়া
পান)|
“গোলাপের কাছে হাত রেখে”
শীর্ষক কবিতায় কবির বিষণ্নতা ঝরে
পরেছে| শুধু গোলাপই নয়,
সৌন্দর্যের আধার যে জ্যোৎস্না,
তাও কবির কাছে সৌন্দর্যহীন|
তাঁর জীবনের বিষাদের প্রতিবি¤^ যেন তিনি জ্যোৎস্নার
মধ্যেও দেখতে পান| এবং এর
ফলে জ্যোৎস্নাকে তাঁর কাছে দেউলিয়া
মনে হয়েছে| তিনি বলেন:
“গোলাপ আপনি কেমন আছেন?,
শুনি|
জ্যোৎস্না না আপনি দেউলে
হননি আজো?
কুশল শুধাই কেননা বাড়ছে দ্বিধা
পার্স থেকে শেষ ফুলটিও
ঝরে যায়|”
(গোলাপের কাঁধে
হাত রেখে, তবক দেওয়া পান)
কবির এই বিষাদ সর্বব্যাপী|
কেননা তিনি বড়ই নিঃসঙ্গ|
কেউ তাঁর ডাকে সাড়া
দেয় না| বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী
সবাই তাঁর থেকে দূরে|
প্রকৃতির কোনো আয়োজনেই কবির
অংশগ্রহণ নেই| শুধু মানুষই
নয়, প্রকৃতির অন্য সব উপাদানও
কবির প্রতি যেন বৈরী ভাবাপন্ন|
“আমার ডাকে কেউ সাড়া
দিলো না,/না মালঞ্চ,
না আকাশ/না সমুদ্র|/তাকের ওপর ওষুধের শিশি,/আর ছোটো পর্দা
টানা সংক্ষিপ্ত জানালা|” (রোগশয্যায়, তবক দেওয়া পান)|
‘যদি আলোই না হয়’
কবিতায় আমরা কবিকে দেখি
প্রবল হতাশাগ্রস্ত| কারও কাছ থেকে
তিনি কোনো আশার বাণী
শুনতে পান না| সর্বত্রই
শুধু আশা ভঙ্গের বেদনা|
একদিকে কবি কারও কাছ
থেকে কোনো আশার বাণী
শুনতে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে তিনিও
প্রিয় মানুষের কাছে উপস্থিত হচ্ছেন
একেবারে শূন্য হাতে| এই দোলাচলে কবি
হৃদয় দগ্ধীভূত| কবি প্রশ্ন রাখেন:
“হে আমার ক্লান্তিহীন যাত্রার
স্টেশন,/তোমার সন্ধ্যাপ্রদীপে শুধু আমারই আঙ্গুল
পোড়ে কেন? /যদি আলোই না
হয়,/ কেন প্রদীপ মিছেমিছি
আসাদের মতো জ্বলবে?”
(যদি আলোই না হয়,
তবক দেওয়া পান)
আসাদ চৌধুরীর সতীর্থ অন্তত আরও দুইজন কবির
মধ্যে আমরা বিষাদময়তার ছায়া
দেখি| একজন শহীদ কাদরী
এবং আরেকজন আবুল হাসান| শহীদ
কাদরী কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন
উদ্বাস্তু হিসেবে| এবং ঢাকায় তিনি
ভবঘুরে হিসেবে বিচরণ করেছেন| ফলে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী
মনোভাব তার মধ্যে সংক্রামিত
হয়েছিল| আবুল হাসান ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা ছেড়ে
দেন| ভালো কোনো চাকরি
পান নাই জীবনে| ফলে
তার জীবনও ছিলো অনিশ্চয়তায় ভরা|
হয়তো এ-কারণেই জীবনের
প্রতি একটা বিতৃষ্ণা ছিলো
তাঁর| কিন্তু আসাদ চৌধুরীর জীবন
যথেষ্ট সুস্থির ছিলো| তাঁর পূর্ব পুরুষ
ছিলেন জমিদার| তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায়
চাকরি করে অবশেষে বাংলা
একাডেমির চাকরিতে থিতু হয়েছিলেন| ব্যক্তিগত
জীবনে তিনি দুঃখী ছিলেন
না| কিন্তু চারপাশের মানুষের দুঃখ, বিষাদ তাকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করে|
সামষ্টিক দুঃখ তাঁর ব্যক্তিগত
দুঃখ হয়ে ওঠে|
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত “প্রশ্ন
নেই উত্তরে পাহাড়” কাব্যগ্রন্থের একেবারে শেষে স্থান পেয়েছে
এর নাম কবিতাটি| তুলনামূলক
একটি দীর্ঘ কবিতা এটি| শেরপুরে দেখা
এক গারো রমণীর কাজের
বর্ণনার মধ্য দিয়ে কবিতার
শুরু| নতুন ব্লেডের চেয়েও
ঝকঝকে গারোদের উঠোন ঘরবাড়ি| সৈনিকের
শৃঙ্খলায় সারি বাঁধা আনারসের
চারা দেখে কবি হতবিহ্বল|
দুঃখে ভরা এইসব মানুষের
জীবন| কিন্তু তাদের মুখে কোনো দুঃখের
ছাপ নেই| সব সময়
লেগে থাকে হাসির আস্তরণ|
অন্যদিকে এদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের জীবনও দ্বন্দ্বমুখর| এখানে বনের পশু এবং
মানুষ সবাইকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে
হয়| উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরে জীবনকে
টেনে নিয়ে যায় দক্ষিণের
সমুদ্র পারের মানুষ| যুগের পর যুগ দক্ষিণের
ভাটি অঞ্চলের মানুষ ক্ষুধায়, বঞ্চনায় বেঁচে আছে| জীবন নিয়ে
তাদের প্রশ্নের, অভিযোগের কোনো প্রতিকার নেই|
এখানে সবকিছুই চলে যেন নিয়তির
ইশারায়| কবি দক্ষিণের কোনো
এক স্থানে ভ্রমণে গিয়ে সেখানে একটি
হোটেলে ছিলেন| কবি বলেন— “হোটেল
থেকে নেমেই রিকশাঅলার সাথে দর- কষাকষি,/
একটি ভিক্ষুক হাজার হাজার বছরের/ অভিযোগহীন, প্রশ্নহীন হাত মেলে ধরেছে—/
জীবনানন্দের ম্লান কিশোরী, অধিকারবঞ্চিত ভাটিদেশের বেদনা—/ তার ক্লান্ত ক্লান্ত
ক্লান্ত হাতে ফুলের মালা,/চারিদিকে ফিনকি-দেয়া জ্যোৎস্না|/আমি
মৃদুকণ্ঠে পৃথিবীকে বসুন্ধরা বলে ডাকলাম|/অশ্রু
আর ঘাম যুগ যুগ
ঝরছে—/প্রশ্ন নেই/প্রতিকার চেয়ে,
না চেয়েও, অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে
গ্যাছে—/ কোনো প্রশ্ন নেই/
তটভূমিতে আছাড় খায় গর্জন,
নোনা গর্জন|” (প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়)
কবির একটা ˆবশিষ্ট্য হলো অন্যের দুঃখকে
তিনি নিজের জীবনে উপলব্ধি করেন| এ-কারণেই হয়তো
দুঃখ তার পিছু ছাড়ে
না| যখনই তিনি ভাবেন
দুঃখের অবসান হয়েছে, দুঃখ তাকে ছেড়ে
চলে গেছে, ঠিক তখনই আরেকটি
নতুন দুঃখ এসে তাঁর
দরোজায় কড়া নাড়ে| বিষয়টা
চমৎকারভাবে উঠে এসেছে তাঁর
একটি কবিতায়:
“এই বুঝি শেষ দুঃখ,/এরপর অন্য কোনো
দুঃখ-টুঃখ নেই,/দুঃখ
তার যবনিকা ফেলে দিয়ে চলে
গ্যাছে শেষে—/আমিও বাহিরে এসে
সিগ্রেট ধরাবো/সমস্ত দুঃখের বাইরে ভাসাবো সাঁতার|/আরেক রকম দুঃখ
ভিন্ন ব্যথা গায়/ দরজায় টোকা,
দ্যায়,/সুখ ভেবে তাকে
আমি বারবার তোয়াজ করছি/ না কি সেই
লোভে/ করুণ ভিখিরি হয়ে/দুঃখগুলো ঘরের চৌকাঠে পড়ে
থাকে|” (আমার দুঃখ-টুঃখ,
বিত্ত নাই বেসাত নাই)
কবি আসাদ চৌধুরীর মানবিক
বোধ, সত্য এবং সুন্দরের
প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা,
সর্বোপরি সকল প্রকার কূপমণ্ডূকতা
এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন প্রতিবাদের জন্য তিনি স্মরণীয়
হয়ে থাকবেন|

আপনার মতামত লিখুন