সংবাদ

১১ জ্যৈষ্ঠ নজরুলজয়ন্তী স্মরণে

নজরুলের প্রেমিক সত্তা: প্রসঙ্গ ‘চক্রবাক’


আনোয়ার মল্লিক
আনোয়ার মল্লিক
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১১:০৬ এএম

নজরুলের প্রেমিক সত্তা: প্রসঙ্গ ‘চক্রবাক’
কাজী নজরুল ইসলাম

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের নামের সঙ্গে বিদ্রোহী কবির অভিধা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে| এর পেছনে প্রধান কারণ, তাঁর রচিতবিদ্রোহকবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তা| ১৯২২ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহিত্য-মহলে বিপুল সাড়া পড়ে যায়| বছরেই প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় কবিতাটা স্থান পায়| অগ্নি-বীণার অন্যান্য কবিতাও দ্রোহ, উদ্দীপনা জাগরণমূলক| তাঁর প্রথম দিকের আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ যেমন বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, সাম্যবাদী প্রভৃতি বইয়ের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ এবং সংগ্রামের আবহ আছে| সন্দেহ নেই বিপ্লব সাম্য মানবতা নজরুল-কাব্যের প্রধান সুর| এর পাশপাশি প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছেন| এবং তাঁর প্রেমের কবিতা অসাধারণ চিত্রকল্প-সমৃদ্ধ| এমনকি বিদ্রোহী কবিতার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রণ-নিনাদেও তাঁর প্রেমিক মনের অনুরণন শোনা যায়| যেমন, “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য|” (বিদ্রোহী)| অথবাআমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন/আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন-কন|” (প্রাগুক্ত)|

দোলন-চাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু-হিন্দোল এবং চক্রবাকএই চারটি কাব্যগ্রন্থে নজরুলের প্রেমিক সত্তা ধরা দিয়েছে| প্রেমিক হিসেবে তিনি রোমান্টিক, সেই সাথে বিরহ-ক্লিষ্ট এবং স্মৃতি-কাতর| প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ-যন্ত্রণায় তিনি বিষণ্ন এবং অন্তর্মুখী|

চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয়| এখানে ১৯টি কবিতা আছে| কাব্যে তিনি অন্তর্গত দুঃখ হতাশাকে ˆশল্পিক মাধুর্যে চিত্রিত করেছেন এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে সর্বজনীন রূপে তুলে ধরেছেন| প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তিনি প্রেম বিরহ-যন্ত্রণাকে অনুভব করেছেন|

চক্রবাক কাব্যগ্রন্থেচক্রবাকনামে একটি কবিতা আছে| চক্রবাক-চক্রবাকী পৌরাণিক লোক কাহিনী অনুযায়ী প্রেম বিরহের প্রতীক| তারা সারাদিন একসাথে থাকলেও কোনো এক অভিশাপের কারণে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত তারা একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়| সারারাত ধরে নদীর দুই পাড়ে বসে তারা কান্নাকাটি করে একে অপরকে কাছে ডাকতে থাকে| রাতের এই বিরহ শেষে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাদের পুনরায় মিলন ঘটে| তাদের এই প্রাত্যহিক মিলন বিরহের ঘটনা কবি মানবীয় প্রেম বিরহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন| এই কাব্যে তিনি নিজেকে চক্রবাক রূপে কল্পনা করেছেন| চক্রবাক-চক্রবাকীর এই বিরহের স্মৃতি অব্যক্ত বেদনার উৎস রূপে কবির বুকের গভীরে জমা আছে| তিনি বলেন,

এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার/মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,/তারই এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি/চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি| /ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে/কোন সুখ-দিনে এই সে নদীর ধারে/পেয়েছিল তারে সারা দিবসের সাথি,/তারপর এল বিরহের চির-রাতি,—/আজিও তাহার বুকের ব্যথার কাছে, /সেই সে স্মৃতি পালক পড়িয়া আছে!” (চক্রবাক)|

বাতায়ন পাশে গুবাক-তরুর সারিকাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য একটি প্রেমের কবিতা| কবিতাটিতে অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া আছে| কবি এখানে জানালার পাশের সুপারি গাছের সারির সাথে তার রাত্রিকালীন প্রগাঢ় সখ্য এবং বিচ্ছেদের ঘটনা প্রবাহকে অনন্য মাত্রায় চিত্রিত করেছেন| কবিতায় কবি প্রকৃতির মধ্যে প্রেম বিরহকে অনুভব করেছেন| দেশের পরাধীনতার অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রার আহ্বানও রয়েছে কবিতায়| তিনি তাঁর জানালার অপর পাশের নিসর্গ-প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়ে ঘুমন্ত দেশবাসীকে জেগে ওঠার বার্তা দিয়েছেন|

অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার শীর্ণ কপোল রাখি/কাঁদিতেছে চাঁদ, মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকি|” (বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি)|

এই কবিতায় একসারি সুপারি গাছের উপমাকে কেন্দ্র করে কবি ব্যক্তিগত প্রেমের বিষাদময়তাকে ধরতে চেয়েছেন| জানালার পাশের গুবাক-তরু অর্থাৎ সুপারি গাছগুলো কবির নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী| কবি এই সুপারি-সারির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর প্রিয়ার রূপের তুলনা করেছেন| এই কবিতার বুননে অসাধারণ কল্পনা শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং এখানে ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলোও অতুলনীয়| যেমন,

তোমাদের আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে/সারারাত মোরা কয়েছি যে কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!—/জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত যখন জল, /তোমাদের পাতা মনে হতো যেনো সুশীতল করতল/আমার প্রিয়ার!  —তোমার শাখার পল্লব-মর্মর/মনে হত যেন তারই কণ্ঠের আবেদন সকাতর| /তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা, /তোমার দেহেরই মতন দিঘল তাহার দেহের রেখা|/ তব ঝিরঝির মিরমির যেন তারি কুণ্ঠিত বাণী, /তোমার শাখায় ঝোলানো তারি শাড়ির আঁচলখানি|/ —তোমার পাখার হাওয়া/তারি অঙ্গুলি পরশের মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!” (বাতায়ন পাশে গুবাক তরু)|

নজরুল প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে তাঁর প্রেমিক-হৃদয়ের সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছেন| চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় তার স্বাক্ষর আছে| এবং এখানে নজরুলের প্রেমের যে অভিব্যক্তি, তা অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং স্মৃতিময়| বিরহী মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য তিনি বার বার বর্ষার প্রসঙ্গ এনেছেন|

বাদল রাতের পাখিকবিতায় বর্ষার আবহে প্রেম বিরহের বেদনা ফুটে উঠেছে| বর্ষার রাতে প্রকৃতির বিষণ্ন রূপের সাথে কবি-হৃদয়ের বিরহ-কাতরতা মিশে গেছে| এখানে বাদল রাতের পাখি প্রকৃতপক্ষে কবি নিজেই| তাঁর বেদনার সঙ্গে প্রকৃতিও যেন সমব্যথী| তবে তিনি মনে করেন প্রিয় মানুষ একবার ছেড়ে চলে গেলে অসময়ে তাকে আর পাওয়া যায় না| একথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় কবি যখন বলেন

বাদল-রাতের পাখি! /কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি/কাঁদিছ আজিওবউ কথা কওশেফালির বনে একা, /শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?... /তুমি কাঁদিয়াছবউ কথা কওসে কাঁদনে তব সাথে/ভাঙিয়া পড়েছে আকাশের মেঘ গহীন শাওন-রাতে|” (বাদল-রাতের পাখি)|

প্রেম নজরুলের কাব্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে| তবে কবিতায় তাঁর এই প্রেম সুখের নয়, বরং গভীর বিষাদময়| এর জন্য সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অসফল প্রেমের বিরাট ভূমিকা আছে| তাঁর জীবনে যেসব প্রেমের উপলক্ষ এসেছে তা সফল হয়নি|

নার্গিস ছিলেন নজরুল-জীবনের প্রথম নারী, যার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় এবং প্রণয়| এবং এই প্রণয় বিয়েতেও গড়ায়| কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিয়ের রাত হতেই বিচ্ছেদের শুরু| এক অবিশ্বাস্য ঘটনা! তাঁর জীবনের আরেকটি ব্যর্থ প্রেমের অধ্যায় ফজিলাতুন্নেছা| ১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে নজরুল ঢাকায় আসলে তাঁর বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে পরিচয় হয়| ফজিলাতুন্নেছা ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে এম.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন| নজরুল প্রথম সাক্ষাতেই ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েন| কিন্তু এই প্রেমে তিনি কোনো সাড়া পাননি| তবে সাড়া না পেলেও তার স্মৃতি কবি-হৃদয়ে থেকে যায়| যদিও এই ক্ষণিক পরিচয়ের অতৃপ্ত প্রেম-যন্ত্রণার তীব্রতা দুই-তিন বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়| ১৯২৮ সালে ফজিলাতুন্নেছা বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে গমন করলে নজরুল ব্যথাতুর হয়েবর্ষা-বিদায়কবিতাটি রচনা করেন| এই কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার বিদায়ের সঙ্গে বর্ষা-বিদায়ের সাদৃশ্য কল্পনা করেছেন| যেমন, “ওগো বাদলের পরী! /যাবে কোন দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী| /ওগো ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব? /পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ অভিনব? /তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু, /তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেণু|” (বর্ষা-বিদায়)|

কাজী নজরুলের প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে প্রেমের যে রূপ দেখা যায়, তা অনেকটাই কাঁচা আবেগঘন| তাতে প্রেমের উচ্ছ্বাস এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবল| তবে প্রেমের শাশ্বত রূপ সেখানে অনুপস্থিত| কিন্তু চক্রবাক কাব্যে তাঁর প্রেমে গভীরতা এসেছে| তিনি অনুধাবন করেছেন প্রেমের ক্ষেত্রে মিলন নয়, বিরহই চিরন্তন সত্য| এবং লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এখানে প্রেমের প্রকাশ অপরূপ শিল্প-সুষমামণ্ডিত| বিচিত্র চিত্রকল্পে তিনি প্রেমের মহিমা বর্ণনা করেছেন| প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ

তোমারে পড়িছে মনে/আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরনে, /যূথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে/কেতকী-বধূর অবগুণ্ঠিত বুকে-/তোমারে পড়িছে মনে|” (তোমারে পড়িছে মনে)|

অথবা

আমার বেদনা আজি রূপ ধরিশত গীত-সুরে/নিখিল বিরহী-কণ্ঠে-বিরহিণী-তব তরে ঝুরে| /-পারে -পারে মোরা, নাই নাই কূল! /তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দেই ফুল!” (প্রাগুক্ত)|

নজরুলকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে হবে| কেননা বিদ্রোহ, প্রতিবাদ এবং মানবতার জয়গানে উচ্চকিত কণ্ঠের যে কবিকে সবাই চেনে, চক্রবাকে এসে কোমল, বিরহ-কাতর এক ভিন্নতর কবি-সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়| আরেকটা বিষয়, শুধু ভাবগত দিক থেকেই নয়, প্রকরণ-প্রকৌশলের দিক অর্থাৎ উপমা, রূপক প্রভৃতি চিত্রকল্পের ব্যবহারেও এই কাব্যে তিনি অসাধারণ উৎকর্ষতার সাক্ষ্য রেখেছেন|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


নজরুলের প্রেমিক সত্তা: প্রসঙ্গ ‘চক্রবাক’

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের নামের সঙ্গে বিদ্রোহী কবির অভিধা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে| এর পেছনে প্রধান কারণ, তাঁর রচিতবিদ্রোহকবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তা| ১৯২২ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহিত্য-মহলে বিপুল সাড়া পড়ে যায়| বছরেই প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় কবিতাটা স্থান পায়| অগ্নি-বীণার অন্যান্য কবিতাও দ্রোহ, উদ্দীপনা জাগরণমূলক| তাঁর প্রথম দিকের আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ যেমন বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, সাম্যবাদী প্রভৃতি বইয়ের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ এবং সংগ্রামের আবহ আছে| সন্দেহ নেই বিপ্লব সাম্য মানবতা নজরুল-কাব্যের প্রধান সুর| এর পাশপাশি প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছেন| এবং তাঁর প্রেমের কবিতা অসাধারণ চিত্রকল্প-সমৃদ্ধ| এমনকি বিদ্রোহী কবিতার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রণ-নিনাদেও তাঁর প্রেমিক মনের অনুরণন শোনা যায়| যেমন, “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য|” (বিদ্রোহী)| অথবাআমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন/আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন-কন|” (প্রাগুক্ত)|

দোলন-চাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু-হিন্দোল এবং চক্রবাকএই চারটি কাব্যগ্রন্থে নজরুলের প্রেমিক সত্তা ধরা দিয়েছে| প্রেমিক হিসেবে তিনি রোমান্টিক, সেই সাথে বিরহ-ক্লিষ্ট এবং স্মৃতি-কাতর| প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ-যন্ত্রণায় তিনি বিষণ্ন এবং অন্তর্মুখী|

চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয়| এখানে ১৯টি কবিতা আছে| কাব্যে তিনি অন্তর্গত দুঃখ হতাশাকে ˆশল্পিক মাধুর্যে চিত্রিত করেছেন এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে সর্বজনীন রূপে তুলে ধরেছেন| প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তিনি প্রেম বিরহ-যন্ত্রণাকে অনুভব করেছেন|

চক্রবাক কাব্যগ্রন্থেচক্রবাকনামে একটি কবিতা আছে| চক্রবাক-চক্রবাকী পৌরাণিক লোক কাহিনী অনুযায়ী প্রেম বিরহের প্রতীক| তারা সারাদিন একসাথে থাকলেও কোনো এক অভিশাপের কারণে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত তারা একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়| সারারাত ধরে নদীর দুই পাড়ে বসে তারা কান্নাকাটি করে একে অপরকে কাছে ডাকতে থাকে| রাতের এই বিরহ শেষে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাদের পুনরায় মিলন ঘটে| তাদের এই প্রাত্যহিক মিলন বিরহের ঘটনা কবি মানবীয় প্রেম বিরহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন| এই কাব্যে তিনি নিজেকে চক্রবাক রূপে কল্পনা করেছেন| চক্রবাক-চক্রবাকীর এই বিরহের স্মৃতি অব্যক্ত বেদনার উৎস রূপে কবির বুকের গভীরে জমা আছে| তিনি বলেন,

এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার/মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,/তারই এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি/চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি| /ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে/কোন সুখ-দিনে এই সে নদীর ধারে/পেয়েছিল তারে সারা দিবসের সাথি,/তারপর এল বিরহের চির-রাতি,—/আজিও তাহার বুকের ব্যথার কাছে, /সেই সে স্মৃতি পালক পড়িয়া আছে!” (চক্রবাক)|

বাতায়ন পাশে গুবাক-তরুর সারিকাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য একটি প্রেমের কবিতা| কবিতাটিতে অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া আছে| কবি এখানে জানালার পাশের সুপারি গাছের সারির সাথে তার রাত্রিকালীন প্রগাঢ় সখ্য এবং বিচ্ছেদের ঘটনা প্রবাহকে অনন্য মাত্রায় চিত্রিত করেছেন| কবিতায় কবি প্রকৃতির মধ্যে প্রেম বিরহকে অনুভব করেছেন| দেশের পরাধীনতার অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রার আহ্বানও রয়েছে কবিতায়| তিনি তাঁর জানালার অপর পাশের নিসর্গ-প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়ে ঘুমন্ত দেশবাসীকে জেগে ওঠার বার্তা দিয়েছেন|

অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার শীর্ণ কপোল রাখি/কাঁদিতেছে চাঁদ, মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকি|” (বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর সারি)|

এই কবিতায় একসারি সুপারি গাছের উপমাকে কেন্দ্র করে কবি ব্যক্তিগত প্রেমের বিষাদময়তাকে ধরতে চেয়েছেন| জানালার পাশের গুবাক-তরু অর্থাৎ সুপারি গাছগুলো কবির নিঃসঙ্গ রাতের সঙ্গী| কবি এই সুপারি-সারির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর প্রিয়ার রূপের তুলনা করেছেন| এই কবিতার বুননে অসাধারণ কল্পনা শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং এখানে ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলোও অতুলনীয়| যেমন,

তোমাদের আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে/সারারাত মোরা কয়েছি যে কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!—/জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত যখন জল, /তোমাদের পাতা মনে হতো যেনো সুশীতল করতল/আমার প্রিয়ার!  —তোমার শাখার পল্লব-মর্মর/মনে হত যেন তারই কণ্ঠের আবেদন সকাতর| /তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা, /তোমার দেহেরই মতন দিঘল তাহার দেহের রেখা|/ তব ঝিরঝির মিরমির যেন তারি কুণ্ঠিত বাণী, /তোমার শাখায় ঝোলানো তারি শাড়ির আঁচলখানি|/ —তোমার পাখার হাওয়া/তারি অঙ্গুলি পরশের মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!” (বাতায়ন পাশে গুবাক তরু)|

নজরুল প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে তাঁর প্রেমিক-হৃদয়ের সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছেন| চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় তার স্বাক্ষর আছে| এবং এখানে নজরুলের প্রেমের যে অভিব্যক্তি, তা অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং স্মৃতিময়| বিরহী মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য তিনি বার বার বর্ষার প্রসঙ্গ এনেছেন|

বাদল রাতের পাখিকবিতায় বর্ষার আবহে প্রেম বিরহের বেদনা ফুটে উঠেছে| বর্ষার রাতে প্রকৃতির বিষণ্ন রূপের সাথে কবি-হৃদয়ের বিরহ-কাতরতা মিশে গেছে| এখানে বাদল রাতের পাখি প্রকৃতপক্ষে কবি নিজেই| তাঁর বেদনার সঙ্গে প্রকৃতিও যেন সমব্যথী| তবে তিনি মনে করেন প্রিয় মানুষ একবার ছেড়ে চলে গেলে অসময়ে তাকে আর পাওয়া যায় না| একথারই প্রতিধ্বনি শোনা যায় কবি যখন বলেন

বাদল-রাতের পাখি! /কবে পোহায়েছে বাদলের রাতি, তবে কেন থাকি থাকি/কাঁদিছ আজিওবউ কথা কওশেফালির বনে একা, /শাওনে যাহারে পেলে না, তারে কি ভাদরে পাইবে দেখা?... /তুমি কাঁদিয়াছবউ কথা কওসে কাঁদনে তব সাথে/ভাঙিয়া পড়েছে আকাশের মেঘ গহীন শাওন-রাতে|” (বাদল-রাতের পাখি)|

প্রেম নজরুলের কাব্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে| তবে কবিতায় তাঁর এই প্রেম সুখের নয়, বরং গভীর বিষাদময়| এর জন্য সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অসফল প্রেমের বিরাট ভূমিকা আছে| তাঁর জীবনে যেসব প্রেমের উপলক্ষ এসেছে তা সফল হয়নি|

নার্গিস ছিলেন নজরুল-জীবনের প্রথম নারী, যার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় এবং প্রণয়| এবং এই প্রণয় বিয়েতেও গড়ায়| কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিয়ের রাত হতেই বিচ্ছেদের শুরু| এক অবিশ্বাস্য ঘটনা! তাঁর জীবনের আরেকটি ব্যর্থ প্রেমের অধ্যায় ফজিলাতুন্নেছা| ১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে নজরুল ঢাকায় আসলে তাঁর বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে পরিচয় হয়| ফজিলাতুন্নেছা ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে এম.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন| নজরুল প্রথম সাক্ষাতেই ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েন| কিন্তু এই প্রেমে তিনি কোনো সাড়া পাননি| তবে সাড়া না পেলেও তার স্মৃতি কবি-হৃদয়ে থেকে যায়| যদিও এই ক্ষণিক পরিচয়ের অতৃপ্ত প্রেম-যন্ত্রণার তীব্রতা দুই-তিন বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যায়| ১৯২৮ সালে ফজিলাতুন্নেছা বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে গমন করলে নজরুল ব্যথাতুর হয়েবর্ষা-বিদায়কবিতাটি রচনা করেন| এই কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার বিদায়ের সঙ্গে বর্ষা-বিদায়ের সাদৃশ্য কল্পনা করেছেন| যেমন, “ওগো বাদলের পরী! /যাবে কোন দূরে, ঘাটে বাঁধা তব কেতকী পাতার তরী| /ওগো ক্ষণিকা, পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব? /পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ অভিনব? /তোমার কপোল-পরশ না পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু, /তোমারে স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে বেণু|” (বর্ষা-বিদায়)|

কাজী নজরুলের প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে প্রেমের যে রূপ দেখা যায়, তা অনেকটাই কাঁচা আবেগঘন| তাতে প্রেমের উচ্ছ্বাস এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবল| তবে প্রেমের শাশ্বত রূপ সেখানে অনুপস্থিত| কিন্তু চক্রবাক কাব্যে তাঁর প্রেমে গভীরতা এসেছে| তিনি অনুধাবন করেছেন প্রেমের ক্ষেত্রে মিলন নয়, বিরহই চিরন্তন সত্য| এবং লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এখানে প্রেমের প্রকাশ অপরূপ শিল্প-সুষমামণ্ডিত| বিচিত্র চিত্রকল্পে তিনি প্রেমের মহিমা বর্ণনা করেছেন| প্রসঙ্গে দুটি উদাহরণ

তোমারে পড়িছে মনে/আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরনে, /যূথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে/কেতকী-বধূর অবগুণ্ঠিত বুকে-/তোমারে পড়িছে মনে|” (তোমারে পড়িছে মনে)|

অথবা

আমার বেদনা আজি রূপ ধরিশত গীত-সুরে/নিখিল বিরহী-কণ্ঠে-বিরহিণী-তব তরে ঝুরে| /-পারে -পারে মোরা, নাই নাই কূল! /তুমি দাও আঁখি-জল, আমি দেই ফুল!” (প্রাগুক্ত)|

নজরুলকে পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে হবে| কেননা বিদ্রোহ, প্রতিবাদ এবং মানবতার জয়গানে উচ্চকিত কণ্ঠের যে কবিকে সবাই চেনে, চক্রবাকে এসে কোমল, বিরহ-কাতর এক ভিন্নতর কবি-সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়| আরেকটা বিষয়, শুধু ভাবগত দিক থেকেই নয়, প্রকরণ-প্রকৌশলের দিক অর্থাৎ উপমা, রূপক প্রভৃতি চিত্রকল্পের ব্যবহারেও এই কাব্যে তিনি অসাধারণ উৎকর্ষতার সাক্ষ্য রেখেছেন|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত