বাংলা
সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের
নামের সঙ্গে বিদ্রোহী কবির অভিধা অবিচ্ছেদ্যভাবে
জড়িয়ে গেছে| এর পেছনে প্রধান
কারণ, তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহ’
কবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তা| ১৯২২ সালে কবিতাটি
প্রকাশিত হলে সাহিত্য-মহলে
বিপুল সাড়া পড়ে যায়|
ঐ বছরেই প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় কবিতাটা স্থান পায়| অগ্নি-বীণার
অন্যান্য কবিতাও দ্রোহ, উদ্দীপনা ও জাগরণমূলক| তাঁর
প্রথম দিকের আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ
যেমন বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, সাম্যবাদী প্রভৃতি
বইয়ের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ এবং সংগ্রামের আবহ
আছে| সন্দেহ নেই বিপ্লব সাম্য
ও মানবতা নজরুল-কাব্যের প্রধান সুর| এর পাশপাশি
প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি
ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছেন| এবং তাঁর প্রেমের
কবিতা অসাধারণ চিত্রকল্প-সমৃদ্ধ| এমনকি বিদ্রোহী কবিতার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রণ-নিনাদেও তাঁর
প্রেমিক মনের অনুরণন শোনা
যায়| যেমন, “মম এক হাতে
বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য|” (বিদ্রোহী)| অথবা “আমি গোপন-প্রিয়ার
চকিত চাহনি, ছল করে দেখা
অনুখন/আমি চপল মেয়ের
ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির
কন-কন|” (প্রাগুক্ত)|
দোলন-চাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু-হিন্দোল এবং চক্রবাক— এই
চারটি কাব্যগ্রন্থে নজরুলের প্রেমিক সত্তা ধরা দিয়েছে| প্রেমিক
হিসেবে তিনি রোমান্টিক, সেই
সাথে বিরহ-ক্লিষ্ট এবং
স্মৃতি-কাতর| প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ-যন্ত্রণায় তিনি বিষণ্ন এবং
অন্তর্মুখী|
চক্রবাক
কাব্যগ্রন্থ ১৯২৯ সালে প্রকাশিত
হয়| এখানে ১৯টি কবিতা আছে|
এ কাব্যে তিনি অন্তর্গত দুঃখ
ও হতাশাকে ˆশল্পিক মাধুর্যে চিত্রিত করেছেন এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে
সর্বজনীন রূপে তুলে ধরেছেন|
প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তিনি প্রেম ও
বিরহ-যন্ত্রণাকে অনুভব করেছেন|
চক্রবাক
কাব্যগ্রন্থে ‘চক্রবাক’ নামে একটি কবিতা
আছে| চক্রবাক-চক্রবাকী পৌরাণিক লোক কাহিনী অনুযায়ী
প্রেম ও বিরহের প্রতীক|
তারা সারাদিন একসাথে থাকলেও কোনো এক অভিশাপের
কারণে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত
তারা একে অপরের কাছ
থেকে দূরে থাকতে বাধ্য
হয়| সারারাত ধরে নদীর দুই
পাড়ে বসে তারা কান্নাকাটি
করে একে অপরকে কাছে
ডাকতে থাকে| রাতের এই বিরহ শেষে
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাদের
পুনরায় মিলন ঘটে| তাদের
এই প্রাত্যহিক মিলন ও বিরহের
ঘটনা কবি মানবীয় প্রেম
ও বিরহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন| এই কাব্যে তিনি
নিজেকে চক্রবাক রূপে কল্পনা করেছেন|
চক্রবাক-চক্রবাকীর এই বিরহের স্মৃতি
অব্যক্ত বেদনার উৎস রূপে কবির
বুকের গভীরে জমা আছে| তিনি
বলেন,
“এপার
ওপার জুড়িয়া অন্ধকার/মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,/তারই এই কূলে
নিশি নিশি কাঁদে জাগি/চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি|
/ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে/কোন সুখ-দিনে
এই সে নদীর ধারে/পেয়েছিল তারে সারা দিবসের
সাথি,/তারপর এল বিরহের চির-রাতি,—/আজিও তাহার বুকের
ব্যথার কাছে, /সেই সে স্মৃতি
পালক পড়িয়া আছে!” (চক্রবাক)|
‘বাতায়ন
পাশে গুবাক-তরুর সারি’ কাজী
নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য একটি প্রেমের কবিতা|
কবিতাটিতে অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া আছে| কবি
এখানে জানালার পাশের সুপারি গাছের সারির সাথে তার রাত্রিকালীন
প্রগাঢ় সখ্য এবং বিচ্ছেদের
ঘটনা প্রবাহকে অনন্য মাত্রায় চিত্রিত করেছেন| এ কবিতায় কবি
প্রকৃতির মধ্যে প্রেম ও বিরহকে অনুভব
করেছেন| দেশের পরাধীনতার অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রার
আহ্বানও রয়েছে এ কবিতায়| তিনি
তাঁর জানালার অপর পাশের নিসর্গ-প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়ে
ঘুমন্ত দেশবাসীকে জেগে ওঠার বার্তা
দিয়েছেন|
“অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার
শীর্ণ কপোল রাখি/কাঁদিতেছে
চাঁদ, মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই
বাকি|” (বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর
সারি)|
এই
কবিতায় একসারি সুপারি গাছের উপমাকে কেন্দ্র করে কবি ব্যক্তিগত
প্রেমের বিষাদময়তাকে ধরতে চেয়েছেন| জানালার
পাশের গুবাক-তরু অর্থাৎ সুপারি
গাছগুলো কবির নিঃসঙ্গ রাতের
সঙ্গী| কবি এই সুপারি-সারির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর প্রিয়ার রূপের
তুলনা করেছেন| এই কবিতার বুননে
অসাধারণ কল্পনা শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং এখানে
ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলোও অতুলনীয়| যেমন,
“তোমাদের
আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে/সারারাত মোরা কয়েছি যে
কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!—/জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত
যখন জল, /তোমাদের পাতা
মনে হতো যেনো সুশীতল
করতল/আমার প্রিয়ার!
—তোমার শাখার পল্লব-মর্মর/মনে হত যেন
তারই কণ্ঠের আবেদন সকাতর| /তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা, /তোমার
দেহেরই মতন দিঘল তাহার
দেহের রেখা|/ তব ঝিরঝির মিরমির
যেন তারি কুণ্ঠিত বাণী,
/তোমার শাখায় ঝোলানো তারি শাড়ির আঁচলখানি|/
—তোমার পাখার হাওয়া/তারি অঙ্গুলি পরশের
মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!” (বাতায়ন
পাশে গুবাক তরু)|
নজরুল
প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে তাঁর প্রেমিক-হৃদয়ের
সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছেন| চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় তার স্বাক্ষর আছে|
এবং এখানে নজরুলের প্রেমের যে অভিব্যক্তি, তা
অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং স্মৃতিময়| বিরহী
মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য তিনি বার
বার বর্ষার প্রসঙ্গ এনেছেন|
‘বাদল
রাতের পাখি’ কবিতায় বর্ষার আবহে প্রেম ও
বিরহের বেদনা ফুটে উঠেছে| বর্ষার
রাতে প্রকৃতির বিষণ্ন রূপের সাথে কবি-হৃদয়ের
বিরহ-কাতরতা মিশে গেছে| এখানে
বাদল রাতের পাখি প্রকৃতপক্ষে কবি
নিজেই| তাঁর বেদনার সঙ্গে
প্রকৃতিও যেন সমব্যথী| তবে
তিনি মনে করেন প্রিয়
মানুষ একবার ছেড়ে চলে গেলে
অসময়ে তাকে আর পাওয়া
যায় না| একথারই প্রতিধ্বনি
শোনা যায় কবি যখন
বলেন—
“বাদল-রাতের পাখি! /কবে পোহায়েছে বাদলের
রাতি, তবে কেন থাকি
থাকি/কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’
শেফালির বনে একা, /শাওনে
যাহারে পেলে না, তারে
কি ভাদরে পাইবে দেখা?... /তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ
কথা কও’ সে কাঁদনে
তব সাথে/ভাঙিয়া পড়েছে
আকাশের মেঘ গহীন শাওন-রাতে|” (বাদল-রাতের পাখি)|
প্রেম
নজরুলের কাব্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা
জুড়ে আছে| তবে কবিতায়
তাঁর এই প্রেম সুখের
নয়, বরং গভীর বিষাদময়|
এর জন্য সম্ভবত তাঁর
ব্যক্তিগত জীবনের অসফল প্রেমের বিরাট
ভূমিকা আছে| তাঁর জীবনে
যেসব প্রেমের উপলক্ষ এসেছে তা সফল হয়নি|
নার্গিস
ছিলেন নজরুল-জীবনের প্রথম নারী, যার সঙ্গে তাঁর
প্রথম পরিচয় এবং প্রণয়| এবং
এই প্রণয় বিয়েতেও গড়ায়| কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিয়ের রাত হতেই বিচ্ছেদের
শুরু| এ এক অবিশ্বাস্য
ঘটনা! তাঁর জীবনের আরেকটি
ব্যর্থ প্রেমের অধ্যায় ফজিলাতুন্নেছা| ১৯২৮ সালে মুসলিম
সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে নজরুল
ঢাকায় আসলে তাঁর বন্ধু
কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে পরিচয় হয়| ফজিলাতুন্নেছা ১৯২৭
সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
গণিত শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে এম.এস.সি. ডিগ্রি
অর্জন করেন| নজরুল প্রথম সাক্ষাতেই ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েন| কিন্তু এই প্রেমে তিনি
কোনো সাড়া পাননি| তবে
সাড়া না পেলেও তার
স্মৃতি কবি-হৃদয়ে থেকে
যায়| যদিও এই ক্ষণিক
পরিচয়ের অতৃপ্ত প্রেম-যন্ত্রণার তীব্রতা দুই-তিন বছরের
মধ্যেই ফুরিয়ে যায়| ১৯২৮ সালে
ফজিলাতুন্নেছা বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে
ইংল্যান্ডে গমন করলে নজরুল
ব্যথাতুর হয়ে ‘বর্ষা-বিদায়’
কবিতাটি রচনা করেন| এই
কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার
বিদায়ের সঙ্গে বর্ষা-বিদায়ের সাদৃশ্য কল্পনা করেছেন| যেমন, “ওগো বাদলের পরী!
/যাবে কোন দূরে, ঘাটে
বাঁধা তব কেতকী পাতার
তরী| /ওগো ও ক্ষণিকা,
পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব?
/পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ
অভিনব? /তোমার কপোল-পরশ না
পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু, /তোমারে
স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে
বেণু|” (বর্ষা-বিদায়)|
কাজী
নজরুলের প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে প্রেমের যে রূপ দেখা
যায়, তা অনেকটাই কাঁচা
আবেগঘন| তাতে প্রেমের উচ্ছ্বাস
এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবল| তবে প্রেমের শাশ্বত
রূপ সেখানে অনুপস্থিত| কিন্তু চক্রবাক কাব্যে তাঁর প্রেমে গভীরতা
এসেছে| তিনি অনুধাবন করেছেন
প্রেমের ক্ষেত্রে মিলন নয়, বিরহই
চিরন্তন সত্য| এবং লক্ষণীয় ব্যাপার
হলো, এখানে প্রেমের প্রকাশ অপরূপ শিল্প-সুষমামণ্ডিত| বিচিত্র চিত্রকল্পে তিনি প্রেমের মহিমা
বর্ণনা করেছেন| এ প্রসঙ্গে দুটি
উদাহরণ—
“তোমারে
পড়িছে মনে/আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরনে, /যূথিকার
অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে/কেতকী-বধূর অবগুণ্ঠিত ও
বুকে-/তোমারে পড়িছে মনে|” (তোমারে পড়িছে মনে)|
অথবা
“আমার
বেদনা আজি রূপ ধরি’
শত গীত-সুরে/নিখিল
বিরহী-কণ্ঠে-বিরহিণী-তব তরে ঝুরে|
/এ-পারে ও-পারে
মোরা, নাই নাই কূল!
/তুমি দাও আঁখি-জল,
আমি দেই ফুল!” (প্রাগুক্ত)|
নজরুলকে
পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে হবে|
কেননা বিদ্রোহ, প্রতিবাদ এবং মানবতার জয়গানে
উচ্চকিত কণ্ঠের যে কবিকে সবাই
চেনে, চক্রবাকে এসে কোমল, বিরহ-কাতর এক ভিন্নতর
কবি-সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়| আরেকটা বিষয়,
শুধু ভাবগত দিক থেকেই নয়,
প্রকরণ-প্রকৌশলের দিক অর্থাৎ উপমা,
রূপক প্রভৃতি চিত্রকল্পের ব্যবহারেও এই কাব্যে তিনি
অসাধারণ উৎকর্ষতার সাক্ষ্য রেখেছেন|

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬
বাংলা
সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের
নামের সঙ্গে বিদ্রোহী কবির অভিধা অবিচ্ছেদ্যভাবে
জড়িয়ে গেছে| এর পেছনে প্রধান
কারণ, তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহ’
কবিতার অভাবনীয় জনপ্রিয়তা| ১৯২২ সালে কবিতাটি
প্রকাশিত হলে সাহিত্য-মহলে
বিপুল সাড়া পড়ে যায়|
ঐ বছরেই প্রকাশিত নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নি-বীণায় কবিতাটা স্থান পায়| অগ্নি-বীণার
অন্যান্য কবিতাও দ্রোহ, উদ্দীপনা ও জাগরণমূলক| তাঁর
প্রথম দিকের আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ
যেমন বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, সাম্যবাদী প্রভৃতি
বইয়ের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ এবং সংগ্রামের আবহ
আছে| সন্দেহ নেই বিপ্লব সাম্য
ও মানবতা নজরুল-কাব্যের প্রধান সুর| এর পাশপাশি
প্রেমের কবি হিসেবেও তিনি
ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছেন| এবং তাঁর প্রেমের
কবিতা অসাধারণ চিত্রকল্প-সমৃদ্ধ| এমনকি বিদ্রোহী কবিতার ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রণ-নিনাদেও তাঁর
প্রেমিক মনের অনুরণন শোনা
যায়| যেমন, “মম এক হাতে
বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য|” (বিদ্রোহী)| অথবা “আমি গোপন-প্রিয়ার
চকিত চাহনি, ছল করে দেখা
অনুখন/আমি চপল মেয়ের
ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির
কন-কন|” (প্রাগুক্ত)|
দোলন-চাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু-হিন্দোল এবং চক্রবাক— এই
চারটি কাব্যগ্রন্থে নজরুলের প্রেমিক সত্তা ধরা দিয়েছে| প্রেমিক
হিসেবে তিনি রোমান্টিক, সেই
সাথে বিরহ-ক্লিষ্ট এবং
স্মৃতি-কাতর| প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিচ্ছেদ-যন্ত্রণায় তিনি বিষণ্ন এবং
অন্তর্মুখী|
চক্রবাক
কাব্যগ্রন্থ ১৯২৯ সালে প্রকাশিত
হয়| এখানে ১৯টি কবিতা আছে|
এ কাব্যে তিনি অন্তর্গত দুঃখ
ও হতাশাকে ˆশল্পিক মাধুর্যে চিত্রিত করেছেন এবং ব্যক্তিগত বেদনাকে
সর্বজনীন রূপে তুলে ধরেছেন|
প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তিনি প্রেম ও
বিরহ-যন্ত্রণাকে অনুভব করেছেন|
চক্রবাক
কাব্যগ্রন্থে ‘চক্রবাক’ নামে একটি কবিতা
আছে| চক্রবাক-চক্রবাকী পৌরাণিক লোক কাহিনী অনুযায়ী
প্রেম ও বিরহের প্রতীক|
তারা সারাদিন একসাথে থাকলেও কোনো এক অভিশাপের
কারণে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত
তারা একে অপরের কাছ
থেকে দূরে থাকতে বাধ্য
হয়| সারারাত ধরে নদীর দুই
পাড়ে বসে তারা কান্নাকাটি
করে একে অপরকে কাছে
ডাকতে থাকে| রাতের এই বিরহ শেষে
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাদের
পুনরায় মিলন ঘটে| তাদের
এই প্রাত্যহিক মিলন ও বিরহের
ঘটনা কবি মানবীয় প্রেম
ও বিরহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন| এই কাব্যে তিনি
নিজেকে চক্রবাক রূপে কল্পনা করেছেন|
চক্রবাক-চক্রবাকীর এই বিরহের স্মৃতি
অব্যক্ত বেদনার উৎস রূপে কবির
বুকের গভীরে জমা আছে| তিনি
বলেন,
“এপার
ওপার জুড়িয়া অন্ধকার/মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,/তারই এই কূলে
নিশি নিশি কাঁদে জাগি/চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি|
/ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে/কোন সুখ-দিনে
এই সে নদীর ধারে/পেয়েছিল তারে সারা দিবসের
সাথি,/তারপর এল বিরহের চির-রাতি,—/আজিও তাহার বুকের
ব্যথার কাছে, /সেই সে স্মৃতি
পালক পড়িয়া আছে!” (চক্রবাক)|
‘বাতায়ন
পাশে গুবাক-তরুর সারি’ কাজী
নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য একটি প্রেমের কবিতা|
কবিতাটিতে অনুচ্চারিত বিষাদের ছায়া আছে| কবি
এখানে জানালার পাশের সুপারি গাছের সারির সাথে তার রাত্রিকালীন
প্রগাঢ় সখ্য এবং বিচ্ছেদের
ঘটনা প্রবাহকে অনন্য মাত্রায় চিত্রিত করেছেন| এ কবিতায় কবি
প্রকৃতির মধ্যে প্রেম ও বিরহকে অনুভব
করেছেন| দেশের পরাধীনতার অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রার
আহ্বানও রয়েছে এ কবিতায়| তিনি
তাঁর জানালার অপর পাশের নিসর্গ-প্রকৃতি থেকে বিদায় নিয়ে
ঘুমন্ত দেশবাসীকে জেগে ওঠার বার্তা
দিয়েছেন|
“অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার
শীর্ণ কপোল রাখি/কাঁদিতেছে
চাঁদ, মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই
বাকি|” (বাতায়ন-পাশে গুবাক তরুর
সারি)|
এই
কবিতায় একসারি সুপারি গাছের উপমাকে কেন্দ্র করে কবি ব্যক্তিগত
প্রেমের বিষাদময়তাকে ধরতে চেয়েছেন| জানালার
পাশের গুবাক-তরু অর্থাৎ সুপারি
গাছগুলো কবির নিঃসঙ্গ রাতের
সঙ্গী| কবি এই সুপারি-সারির বিভিন্ন অনুষঙ্গে তাঁর প্রিয়ার রূপের
তুলনা করেছেন| এই কবিতার বুননে
অসাধারণ কল্পনা শক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং এখানে
ব্যবহৃত চিত্রকল্পগুলোও অতুলনীয়| যেমন,
“তোমাদের
আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে/সারারাত মোরা কয়েছি যে
কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!—/জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত
যখন জল, /তোমাদের পাতা
মনে হতো যেনো সুশীতল
করতল/আমার প্রিয়ার!
—তোমার শাখার পল্লব-মর্মর/মনে হত যেন
তারই কণ্ঠের আবেদন সকাতর| /তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা, /তোমার
দেহেরই মতন দিঘল তাহার
দেহের রেখা|/ তব ঝিরঝির মিরমির
যেন তারি কুণ্ঠিত বাণী,
/তোমার শাখায় ঝোলানো তারি শাড়ির আঁচলখানি|/
—তোমার পাখার হাওয়া/তারি অঙ্গুলি পরশের
মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!” (বাতায়ন
পাশে গুবাক তরু)|
নজরুল
প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে তাঁর প্রেমিক-হৃদয়ের
সাদৃশ্য আবিষ্কার করেছেন| চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় তার স্বাক্ষর আছে|
এবং এখানে নজরুলের প্রেমের যে অভিব্যক্তি, তা
অত্যন্ত বেদনাবিধুর এবং স্মৃতিময়| বিরহী
মনের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য তিনি বার
বার বর্ষার প্রসঙ্গ এনেছেন|
‘বাদল
রাতের পাখি’ কবিতায় বর্ষার আবহে প্রেম ও
বিরহের বেদনা ফুটে উঠেছে| বর্ষার
রাতে প্রকৃতির বিষণ্ন রূপের সাথে কবি-হৃদয়ের
বিরহ-কাতরতা মিশে গেছে| এখানে
বাদল রাতের পাখি প্রকৃতপক্ষে কবি
নিজেই| তাঁর বেদনার সঙ্গে
প্রকৃতিও যেন সমব্যথী| তবে
তিনি মনে করেন প্রিয়
মানুষ একবার ছেড়ে চলে গেলে
অসময়ে তাকে আর পাওয়া
যায় না| একথারই প্রতিধ্বনি
শোনা যায় কবি যখন
বলেন—
“বাদল-রাতের পাখি! /কবে পোহায়েছে বাদলের
রাতি, তবে কেন থাকি
থাকি/কাঁদিছ আজিও ‘বউ কথা কও’
শেফালির বনে একা, /শাওনে
যাহারে পেলে না, তারে
কি ভাদরে পাইবে দেখা?... /তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ
কথা কও’ সে কাঁদনে
তব সাথে/ভাঙিয়া পড়েছে
আকাশের মেঘ গহীন শাওন-রাতে|” (বাদল-রাতের পাখি)|
প্রেম
নজরুলের কাব্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা
জুড়ে আছে| তবে কবিতায়
তাঁর এই প্রেম সুখের
নয়, বরং গভীর বিষাদময়|
এর জন্য সম্ভবত তাঁর
ব্যক্তিগত জীবনের অসফল প্রেমের বিরাট
ভূমিকা আছে| তাঁর জীবনে
যেসব প্রেমের উপলক্ষ এসেছে তা সফল হয়নি|
নার্গিস
ছিলেন নজরুল-জীবনের প্রথম নারী, যার সঙ্গে তাঁর
প্রথম পরিচয় এবং প্রণয়| এবং
এই প্রণয় বিয়েতেও গড়ায়| কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিয়ের রাত হতেই বিচ্ছেদের
শুরু| এ এক অবিশ্বাস্য
ঘটনা! তাঁর জীবনের আরেকটি
ব্যর্থ প্রেমের অধ্যায় ফজিলাতুন্নেছা| ১৯২৮ সালে মুসলিম
সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে নজরুল
ঢাকায় আসলে তাঁর বন্ধু
কাজী মোতাহার হোসেনের মাধ্যমে ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে পরিচয় হয়| ফজিলাতুন্নেছা ১৯২৭
সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
গণিত শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে এম.এস.সি. ডিগ্রি
অর্জন করেন| নজরুল প্রথম সাক্ষাতেই ফজিলাতুন্নেছার প্রেমে পড়েন| কিন্তু এই প্রেমে তিনি
কোনো সাড়া পাননি| তবে
সাড়া না পেলেও তার
স্মৃতি কবি-হৃদয়ে থেকে
যায়| যদিও এই ক্ষণিক
পরিচয়ের অতৃপ্ত প্রেম-যন্ত্রণার তীব্রতা দুই-তিন বছরের
মধ্যেই ফুরিয়ে যায়| ১৯২৮ সালে
ফজিলাতুন্নেছা বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে
ইংল্যান্ডে গমন করলে নজরুল
ব্যথাতুর হয়ে ‘বর্ষা-বিদায়’
কবিতাটি রচনা করেন| এই
কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার
বিদায়ের সঙ্গে বর্ষা-বিদায়ের সাদৃশ্য কল্পনা করেছেন| যেমন, “ওগো বাদলের পরী!
/যাবে কোন দূরে, ঘাটে
বাঁধা তব কেতকী পাতার
তরী| /ওগো ও ক্ষণিকা,
পুব-অভিসার ফুরাল কি আজি তব?
/পহিল ভাদরে পড়িয়াছে মনে কোন দেশ
অভিনব? /তোমার কপোল-পরশ না
পেয়ে পাণ্ডুর কেয়া-রেণু, /তোমারে
স্মরিয়া ভাদরের ভরা নদীতটে কাঁদে
বেণু|” (বর্ষা-বিদায়)|
কাজী
নজরুলের প্রথম দিকের কবিতাগুলোতে প্রেমের যে রূপ দেখা
যায়, তা অনেকটাই কাঁচা
আবেগঘন| তাতে প্রেমের উচ্ছ্বাস
এবং প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবল| তবে প্রেমের শাশ্বত
রূপ সেখানে অনুপস্থিত| কিন্তু চক্রবাক কাব্যে তাঁর প্রেমে গভীরতা
এসেছে| তিনি অনুধাবন করেছেন
প্রেমের ক্ষেত্রে মিলন নয়, বিরহই
চিরন্তন সত্য| এবং লক্ষণীয় ব্যাপার
হলো, এখানে প্রেমের প্রকাশ অপরূপ শিল্প-সুষমামণ্ডিত| বিচিত্র চিত্রকল্পে তিনি প্রেমের মহিমা
বর্ণনা করেছেন| এ প্রসঙ্গে দুটি
উদাহরণ—
“তোমারে
পড়িছে মনে/আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরনে, /যূথিকার
অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে/কেতকী-বধূর অবগুণ্ঠিত ও
বুকে-/তোমারে পড়িছে মনে|” (তোমারে পড়িছে মনে)|
অথবা
“আমার
বেদনা আজি রূপ ধরি’
শত গীত-সুরে/নিখিল
বিরহী-কণ্ঠে-বিরহিণী-তব তরে ঝুরে|
/এ-পারে ও-পারে
মোরা, নাই নাই কূল!
/তুমি দাও আঁখি-জল,
আমি দেই ফুল!” (প্রাগুক্ত)|
নজরুলকে
পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে হবে|
কেননা বিদ্রোহ, প্রতিবাদ এবং মানবতার জয়গানে
উচ্চকিত কণ্ঠের যে কবিকে সবাই
চেনে, চক্রবাকে এসে কোমল, বিরহ-কাতর এক ভিন্নতর
কবি-সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়| আরেকটা বিষয়,
শুধু ভাবগত দিক থেকেই নয়,
প্রকরণ-প্রকৌশলের দিক অর্থাৎ উপমা,
রূপক প্রভৃতি চিত্রকল্পের ব্যবহারেও এই কাব্যে তিনি
অসাধারণ উৎকর্ষতার সাক্ষ্য রেখেছেন|

আপনার মতামত লিখুন