সংবাদ

১১ জ্যৈষ্ঠ নজরুলজয়ন্তী স্মরণে

মহাসিন্ধুর বুকে নজরুল-জয়ন্তী পালন


এম আবদুল আলীম
এম আবদুল আলীম
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১১:১৮ এএম

মহাসিন্ধুর বুকে নজরুল-জয়ন্তী পালন
নজরুলকে গান গেয়ে শোনাচ্ছেন শিল্পী রেনু ভৌমিক

সিন্ধুর প্রতি নজরুলের আকর্ষণ ছিল গভীর| নানাভাবে-নানারূপে তিনি এর সৌন্দর্য লীলা উপভোগ করেছেন| হে বন্ধু, হে পবিত্র, হে সুন্দর, হে মহান, হে বিদ্রোহী; কত বিশেষণেই না তিনি সিন্ধুকে সম্বোধিত করেছেন! সিন্ধুর মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করেছেন বিরহ-বিষাদের অতলগভীর রহস্যময়তা| স্বীয় চিত্তের সীমাহীন বিরহযন্ত্রণাকে তিনি মহাসিদ্ধুর বিশাল গর্জনের সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছেন| ‘সিন্ধু-হিন্দোলকাব্যের শুরুতেই নজরুল লিখেছিলেন— ‘হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর,/হে চির-বিরহী,/হে অতৃপ্ত! রহিরহি’/কোন& বেদনায়/উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?’ শুধু তাই নয়, সুস্থ অবস্থায় তিনি বারবার সিন্ধুপাড়ে হাজির হয়েছেন| দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের আশায় ভক্ত-অনুরাগী-শুভানুধ্যায়ীরা মহাসিন্ধুর বুকে জাহাজ ভাসিয়ে তাঁকে নিয়ে গেছেন সুদূর বিলেত মুল্লুকে| সিন্ধুর সঙ্গে নজরুল-সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে| আজ তুলে ধরতে চাই মহাসিন্ধুর বুকে এক ব্যতিক্রমী নজরুল-জয়ন্তী পালনের কথা|

সালটি ছিল ১৯৫৩| নজরুল তখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে বাক&রুদ্ধ| ভারতবর্ষের চিকিৎসকরা তাঁর সুস্থ হওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন| কিন্তু কবির ভক্ত, অনুরাগী শুভাকাঙ্ক্ষীরা নাছোড়বান্দা| তাঁরা চাইলেন শেষ চেষ্টাটুকু করতে| কেবল চাওয়া নয়— ‘নজরুল নিরাময় সমিতিগঠন ফান্ড সংগ্রহ করে তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিলেতে পাঠানো হয়| ১০ মে হাওড়া স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হলো| বিপুলসংখ্যক ভক্ত-অনুরাগী সেখানে হাজির হয়েছিলেন কবিকে বিদায়-সংবর্ধনা জানাতে| জাহাজ ছাড়ার আগে কবি কয়েক দিন অবস্থান করেন বোম্বাই বন্দরেরসী গ্রীনহোটেলে| ১৩ মে বিকেল ৪টায় হোটেলটির কন&ফারেন্স রুমে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের তারকারা কবিকে রাজসিক সংবর্ধনা প্রদান করে| কক্ষভর্তি লোকজনের মাঝে কবিকে জুঁই ফুলের মালা গলায় দিয়ে ধুতি গরদের পাঞ্জাবি পরিয়ে একটি ফরাসের ওপর কবিকে বসানো হয়| একে একে সেখানে উপস্থিত হন তুলসী লাহিড়ী, অনিল বিশ^াস, রবীন চ্যাটার্জী, বিমল রায়, নবেন্দু ঘোষ, হেমন্ত কুমার, হিতেন চৌধুরী, বিপীন গুপ্ত, অশোক কুমার, প্রদীপ কুমার, কে. এস. ইউসুফ, কামাল আমরোহী, কে. . আব্বাস, জোশ মলিহাবাদী, কাইফি আজমি, ফিরাক গোরখপুরী, শৈলেন্দ্র, খৈয়াম, সাহীর লুধিয়ানভী, মাজাজ লাখনাভী, কাতিল সিপাহী, রোশন, মুকেশ, নীতিন বোস, নৌশদ আলী, প্রমোদ চক্রবর্তী, শশধর মুখার্জী, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, লু নারাভি, তালাত মাহমুদসহ বাংলা বু¤^াইয়ের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক তারকা| হলভর্তি মানুষের কোলাহল মুহূর্তেই পিনপতনের নীরবতায় পরিণত হয় হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়েরফুলের জলসায় নীরব কেন কবিগানের সুর তোলার পর| এর পর একে এক উর্দুতে কবির প্রশস্তিমূলক সের পাঠ করেন জোশ মলিহাবাদী, কাইফ আজমি এবং ফিরাক গোরখপুরী| নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করলেন কেউ কেউ, কেউ দিলেন ভাষণ| অন্যদিকে কবির চিকিৎসার জন্য তোলা হচ্ছিল টাকা| অনুষ্ঠান শেষ হয় তাঁর হাতে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি বেগুনী ভেলভেট কাপড়ের থলি তুলে দিয়ে| আয়োজনে কবি ছিলেন নির্বাক| তিনি আপন খেয়ালে হাতে থাকা কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে থাকেন| শেষে গলার মালাটাও ছিঁড়ে ফেলেন| টাকার থলিটি কবির হাতে তুলে দেওয়া হলে বড় বড় চোখ করে একবার তাকিয়ে দেখেন এবং কয়েকটা অবোধ্য আওয়াজ করে ফরাসের ওপর থপ করে ফেলে দেন|    

পরদিন ১৪ মে সিন্ধিয়া কোম্পানির জাহাজজল আজাদবোম্বাই বন্দরের আলেকজান্দ্রা ডকের জেটি ছেড়ে যাত্রা শুরু করে| কবির বিলেতযাত্রার সঙ্গী ছিলেন পত্নী প্রমীলা দেবী, কনিষ্ঠ পুত্র অনিরুদ্ধ কাজী, সেবিকা মিস লতিকা ঘোষ এবংনজরুল নিরাময় সমিতি প্রতিনিধি রবিউদ্দীন আহমদ| ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, এডেন বন্দর, লোহিত সাগর, পোর্ট সুদান, সুয়েজ খাল, পোর্ট ˆসয়দ পাড়ি দিয়ে জাহাজ ছুটতে থাকে বিলেতের পথে| উত্তাল সমুদ্রের বুকে কবিকে নিয়ে চলে নানা আয়োজন| কেউ গান গেয়ে শোনান, কেউ কবিতা আবৃত্তি করেন, কেউ আবার সমুদ্রপীড়ায় কাতর কবিকে শুশ্রূষা করেন| প্রদ্যোৎ সেন নজরুলের সামনে বসে গাইতেন— ‘আগে জানলি তোর ভাঙ্গা নৌকায় চড়তাম না|’ গানটি শুনে কখনো কখনো নজরুল চঞ্চল হয়ে উঠতেন, কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেন| এতে প্রমীলা দেবী উল্লসিত হয়ে উঠতেন এবং বলতেন— ‘হে ঈশ্বর! ওঁর মুখে দুটো একটা কথা ফিরিয়ে দাও!’ 

মহাসিন্ধুর উত্তাল তরঙ্গ উজিয়ে জাহাজ চলছে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরের দিকে| বিলেতযাত্রার দুসপ্তাহ অতিক্রান্ত হলে ঘনিয়ে আসে ১১ জ্যৈষ্ঠ, কবির ৫৪তম জন্মদিন| দিনটি মহাসমারোহে পালনের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়| জাহাজের সহযাত্রী ডা. অশোক বাগচীর ওপর ভার পড়ে নজরুলের কিছু গানের আংশিক ইংরেজি অনুবাদ করা এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের| কবিপুত্র অনিরুদ্ধ কাজীকে দেওয়া হয় গান পরিচালনার দায়িত্ব| পিয়ানো বাজানোর দায়িত্ব পড়ে মিস পিয়ার্সনের ওপর, যিনি ১৯৫১-তে টমাস কুকের অফিসে বসে বিলিতি টিকিট বিক্রি করতেন, তিনি কবির সঙ্গে একই জাহাজে বিলেতে যাচ্ছিলেন| মুখ্য গায়কের দায়িত্ব বর্তায় প্রদ্যোৎ সেনের ওপর| আরও নানাজনের মাঝে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়|

১১ জ্যৈষ্ঠ সকাল থেকেই জাহাজে সাজসাজ রব দেখা গেল| জাহাজজল আজাদতখন উত্তর আফ্রিকার কূল ঘেঁষে মাল্টা দ্বীপকে ডাইনে রেখে ছুটছে আলজিয়ার্স বন্দরের দিকে| জাহাজের প্রধান দেওয়ান-খানায় ফরাস বিছানো হলো| অনুষ্ঠান শুরুর আগেই কক্ষটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়| কবিকেবাবুসাহেবসাজিয়ে সবার মাঝখানে বসানো হয়| তাঁর এক পাশে বসেন প্রমীলা দেবী, অন্য পাশে অনিরুদ্ধ কাজী| জন্মদিনে প্রিয় কবিকে মাল্যভূষিত করা হবে না, তা কী হয়? কিন্তু মহাসমুদ্রের বুকে ফুল পাওয়া যাবে কোথায়? ভারতীয় বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন রবার্টস-এর স্ত্রী একটি উপায় খুঁজে বের করেন| তিনি সাদা টিসু পেপারের এক বিকল্প গেঁড়োর মালা গেঁথে তাতে ফুলে সুরভি ছড়িয়ে দিয়ে কবির গলায় পরিয়ে দেন| সকলে করতালি দিয়ে কবিকে জন্মদিনের অভিবাদন জানায়| নজরুলের রচনার অংশবিশেষ ইংরেজিতে পাঠ করে ডা. অশোক বাগচী অনুষ্ঠান সূচনা করেন| তাঁর অনূদিত নজরুল-সংগীত গাইলেন কেউ কেউ| যখন নজরুলেরকারার লৌহ কাপটগানটি গাওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি কিছুক্ষণের জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়েন| এর পর প্রদ্যোৎ সেন একের পর এক গেয়ে চলেন নজরুল-সংগীত| পিয়ার্সনের পিয়ানোর সুরে অনিরুদ্ধ কাজী গাইলেন পিতার গান| রবিউদ্দীন আহমদও তুলেছিলেন সুরের মূর্ছনা| প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠান চলে| সিন্ধিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন স্মিথ কবিকে রূপার তৈরিজল-আজাদজাহাজের একটি মডেল উপহার দেন| কিন্তু যাঁর জন্য এতো আয়োজন, তাঁর কিন্তু নিয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না| কবির জন্মদিনের আনন্দে সিন্ধুর বুকে উত্তাল-তরঙ্গ উঠলেও তাঁর চিত্তকে আলোড়িত করেনি| তিনি একমনে শিশুর মতো কাগজ ছিঁড়তে থাকেন| যাঁর প্রতি ভক্তদের এতো ভালোবাসা, এতো উচ্ছ্বাস, তিনি ছিলেন নির্বাক! ভাবা যায়? একসময় যাঁর মুখের উদ্দাম হাসি আর বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বিদ্রোহের আবেগমাখা গান-কবিতা চারিদিকের নীরবতা ভেঙে খান খান করে দিতো, আজ তিনি নীরব! এর চেয়ে মহা ট্র্যাজেডির ক্লাইমেক্স আর কী হতে পারে!   

নজরুলের দুর্দিনে বিলেতযাত্রার পথে মহাসিদ্ধুর বুকে এই জন্মদিন পালন ছিল সত্যিই ব্যতিক্রমী   তাৎপর্যপূর্ণ| কবির প্রতি তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের ভালোবাসার যে কখনোই কমতি ঘটেনি, এটি ছিল তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ| কবির জন্মদিনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে মহাসিন্ধুর উত্তাল তরঙ্গের বুকে ভেসে চলা জানাতে জাহাজের কামরায় সেদিন দেশি-বিদেশি নানা ভাষাভাষি মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন সিন্ধুসম ভালোবাসা নিয়ে| ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, পেশাসবকিছু ভুলে তাঁরা ভালোবাসার ডালিভর্তি ফুল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন| ফুলের এই জলসায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কবি সেদিন ছিলেন বাক&রুদ্ধনীরব| তিনি বাক&রুদ্ধ না থাকলে কত আবেগ আর ভালোবাসার মাধ্যমেই যে ভক্তদের এমন আয়োজনের প্রতিদান দিতেন, তা ভাবা যায় না| নজরুলের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর সাড়ম্বরেজাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁর অনেক জন্মদিন পালন করা হয়েছে, কিন্তু মহাসিন্ধুর বুকে পালিত সেই ৫৪তম নজরুল-জয়ন্তী ছিল ব্যতিক্রমী এবং বিশেষ তাৎপর্যবাহী|  

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


মহাসিন্ধুর বুকে নজরুল-জয়ন্তী পালন

প্রকাশের তারিখ : ২১ মে ২০২৬

featured Image

সিন্ধুর প্রতি নজরুলের আকর্ষণ ছিল গভীর| নানাভাবে-নানারূপে তিনি এর সৌন্দর্য লীলা উপভোগ করেছেন| হে বন্ধু, হে পবিত্র, হে সুন্দর, হে মহান, হে বিদ্রোহী; কত বিশেষণেই না তিনি সিন্ধুকে সম্বোধিত করেছেন! সিন্ধুর মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করেছেন বিরহ-বিষাদের অতলগভীর রহস্যময়তা| স্বীয় চিত্তের সীমাহীন বিরহযন্ত্রণাকে তিনি মহাসিদ্ধুর বিশাল গর্জনের সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছেন| ‘সিন্ধু-হিন্দোলকাব্যের শুরুতেই নজরুল লিখেছিলেন— ‘হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর,/হে চির-বিরহী,/হে অতৃপ্ত! রহিরহি’/কোন& বেদনায়/উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?’ শুধু তাই নয়, সুস্থ অবস্থায় তিনি বারবার সিন্ধুপাড়ে হাজির হয়েছেন| দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের আশায় ভক্ত-অনুরাগী-শুভানুধ্যায়ীরা মহাসিন্ধুর বুকে জাহাজ ভাসিয়ে তাঁকে নিয়ে গেছেন সুদূর বিলেত মুল্লুকে| সিন্ধুর সঙ্গে নজরুল-সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে| আজ তুলে ধরতে চাই মহাসিন্ধুর বুকে এক ব্যতিক্রমী নজরুল-জয়ন্তী পালনের কথা|

সালটি ছিল ১৯৫৩| নজরুল তখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে বাক&রুদ্ধ| ভারতবর্ষের চিকিৎসকরা তাঁর সুস্থ হওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন| কিন্তু কবির ভক্ত, অনুরাগী শুভাকাঙ্ক্ষীরা নাছোড়বান্দা| তাঁরা চাইলেন শেষ চেষ্টাটুকু করতে| কেবল চাওয়া নয়— ‘নজরুল নিরাময় সমিতিগঠন ফান্ড সংগ্রহ করে তাঁকে চিকিৎসার জন্য বিলেতে পাঠানো হয়| ১০ মে হাওড়া স্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হলো| বিপুলসংখ্যক ভক্ত-অনুরাগী সেখানে হাজির হয়েছিলেন কবিকে বিদায়-সংবর্ধনা জানাতে| জাহাজ ছাড়ার আগে কবি কয়েক দিন অবস্থান করেন বোম্বাই বন্দরেরসী গ্রীনহোটেলে| ১৩ মে বিকেল ৪টায় হোটেলটির কন&ফারেন্স রুমে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের তারকারা কবিকে রাজসিক সংবর্ধনা প্রদান করে| কক্ষভর্তি লোকজনের মাঝে কবিকে জুঁই ফুলের মালা গলায় দিয়ে ধুতি গরদের পাঞ্জাবি পরিয়ে একটি ফরাসের ওপর কবিকে বসানো হয়| একে একে সেখানে উপস্থিত হন তুলসী লাহিড়ী, অনিল বিশ^াস, রবীন চ্যাটার্জী, বিমল রায়, নবেন্দু ঘোষ, হেমন্ত কুমার, হিতেন চৌধুরী, বিপীন গুপ্ত, অশোক কুমার, প্রদীপ কুমার, কে. এস. ইউসুফ, কামাল আমরোহী, কে. . আব্বাস, জোশ মলিহাবাদী, কাইফি আজমি, ফিরাক গোরখপুরী, শৈলেন্দ্র, খৈয়াম, সাহীর লুধিয়ানভী, মাজাজ লাখনাভী, কাতিল সিপাহী, রোশন, মুকেশ, নীতিন বোস, নৌশদ আলী, প্রমোদ চক্রবর্তী, শশধর মুখার্জী, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, লু নারাভি, তালাত মাহমুদসহ বাংলা বু¤^াইয়ের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক তারকা| হলভর্তি মানুষের কোলাহল মুহূর্তেই পিনপতনের নীরবতায় পরিণত হয় হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়েরফুলের জলসায় নীরব কেন কবিগানের সুর তোলার পর| এর পর একে এক উর্দুতে কবির প্রশস্তিমূলক সের পাঠ করেন জোশ মলিহাবাদী, কাইফ আজমি এবং ফিরাক গোরখপুরী| নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করলেন কেউ কেউ, কেউ দিলেন ভাষণ| অন্যদিকে কবির চিকিৎসার জন্য তোলা হচ্ছিল টাকা| অনুষ্ঠান শেষ হয় তাঁর হাতে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটি বেগুনী ভেলভেট কাপড়ের থলি তুলে দিয়ে| আয়োজনে কবি ছিলেন নির্বাক| তিনি আপন খেয়ালে হাতে থাকা কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে থাকেন| শেষে গলার মালাটাও ছিঁড়ে ফেলেন| টাকার থলিটি কবির হাতে তুলে দেওয়া হলে বড় বড় চোখ করে একবার তাকিয়ে দেখেন এবং কয়েকটা অবোধ্য আওয়াজ করে ফরাসের ওপর থপ করে ফেলে দেন|    

পরদিন ১৪ মে সিন্ধিয়া কোম্পানির জাহাজজল আজাদবোম্বাই বন্দরের আলেকজান্দ্রা ডকের জেটি ছেড়ে যাত্রা শুরু করে| কবির বিলেতযাত্রার সঙ্গী ছিলেন পত্নী প্রমীলা দেবী, কনিষ্ঠ পুত্র অনিরুদ্ধ কাজী, সেবিকা মিস লতিকা ঘোষ এবংনজরুল নিরাময় সমিতি প্রতিনিধি রবিউদ্দীন আহমদ| ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, এডেন বন্দর, লোহিত সাগর, পোর্ট সুদান, সুয়েজ খাল, পোর্ট ˆসয়দ পাড়ি দিয়ে জাহাজ ছুটতে থাকে বিলেতের পথে| উত্তাল সমুদ্রের বুকে কবিকে নিয়ে চলে নানা আয়োজন| কেউ গান গেয়ে শোনান, কেউ কবিতা আবৃত্তি করেন, কেউ আবার সমুদ্রপীড়ায় কাতর কবিকে শুশ্রূষা করেন| প্রদ্যোৎ সেন নজরুলের সামনে বসে গাইতেন— ‘আগে জানলি তোর ভাঙ্গা নৌকায় চড়তাম না|’ গানটি শুনে কখনো কখনো নজরুল চঞ্চল হয়ে উঠতেন, কিছু একটা বলার চেষ্টা করতেন| এতে প্রমীলা দেবী উল্লসিত হয়ে উঠতেন এবং বলতেন— ‘হে ঈশ্বর! ওঁর মুখে দুটো একটা কথা ফিরিয়ে দাও!’ 

মহাসিন্ধুর উত্তাল তরঙ্গ উজিয়ে জাহাজ চলছে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরের দিকে| বিলেতযাত্রার দুসপ্তাহ অতিক্রান্ত হলে ঘনিয়ে আসে ১১ জ্যৈষ্ঠ, কবির ৫৪তম জন্মদিন| দিনটি মহাসমারোহে পালনের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়| জাহাজের সহযাত্রী ডা. অশোক বাগচীর ওপর ভার পড়ে নজরুলের কিছু গানের আংশিক ইংরেজি অনুবাদ করা এবং অনুষ্ঠান আয়োজনের| কবিপুত্র অনিরুদ্ধ কাজীকে দেওয়া হয় গান পরিচালনার দায়িত্ব| পিয়ানো বাজানোর দায়িত্ব পড়ে মিস পিয়ার্সনের ওপর, যিনি ১৯৫১-তে টমাস কুকের অফিসে বসে বিলিতি টিকিট বিক্রি করতেন, তিনি কবির সঙ্গে একই জাহাজে বিলেতে যাচ্ছিলেন| মুখ্য গায়কের দায়িত্ব বর্তায় প্রদ্যোৎ সেনের ওপর| আরও নানাজনের মাঝে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়|

১১ জ্যৈষ্ঠ সকাল থেকেই জাহাজে সাজসাজ রব দেখা গেল| জাহাজজল আজাদতখন উত্তর আফ্রিকার কূল ঘেঁষে মাল্টা দ্বীপকে ডাইনে রেখে ছুটছে আলজিয়ার্স বন্দরের দিকে| জাহাজের প্রধান দেওয়ান-খানায় ফরাস বিছানো হলো| অনুষ্ঠান শুরুর আগেই কক্ষটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়| কবিকেবাবুসাহেবসাজিয়ে সবার মাঝখানে বসানো হয়| তাঁর এক পাশে বসেন প্রমীলা দেবী, অন্য পাশে অনিরুদ্ধ কাজী| জন্মদিনে প্রিয় কবিকে মাল্যভূষিত করা হবে না, তা কী হয়? কিন্তু মহাসমুদ্রের বুকে ফুল পাওয়া যাবে কোথায়? ভারতীয় বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন রবার্টস-এর স্ত্রী একটি উপায় খুঁজে বের করেন| তিনি সাদা টিসু পেপারের এক বিকল্প গেঁড়োর মালা গেঁথে তাতে ফুলে সুরভি ছড়িয়ে দিয়ে কবির গলায় পরিয়ে দেন| সকলে করতালি দিয়ে কবিকে জন্মদিনের অভিবাদন জানায়| নজরুলের রচনার অংশবিশেষ ইংরেজিতে পাঠ করে ডা. অশোক বাগচী অনুষ্ঠান সূচনা করেন| তাঁর অনূদিত নজরুল-সংগীত গাইলেন কেউ কেউ| যখন নজরুলেরকারার লৌহ কাপটগানটি গাওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি কিছুক্ষণের জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়েন| এর পর প্রদ্যোৎ সেন একের পর এক গেয়ে চলেন নজরুল-সংগীত| পিয়ার্সনের পিয়ানোর সুরে অনিরুদ্ধ কাজী গাইলেন পিতার গান| রবিউদ্দীন আহমদও তুলেছিলেন সুরের মূর্ছনা| প্রায় এক ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠান চলে| সিন্ধিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্যাপ্টেন স্মিথ কবিকে রূপার তৈরিজল-আজাদজাহাজের একটি মডেল উপহার দেন| কিন্তু যাঁর জন্য এতো আয়োজন, তাঁর কিন্তু নিয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না| কবির জন্মদিনের আনন্দে সিন্ধুর বুকে উত্তাল-তরঙ্গ উঠলেও তাঁর চিত্তকে আলোড়িত করেনি| তিনি একমনে শিশুর মতো কাগজ ছিঁড়তে থাকেন| যাঁর প্রতি ভক্তদের এতো ভালোবাসা, এতো উচ্ছ্বাস, তিনি ছিলেন নির্বাক! ভাবা যায়? একসময় যাঁর মুখের উদ্দাম হাসি আর বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো বিদ্রোহের আবেগমাখা গান-কবিতা চারিদিকের নীরবতা ভেঙে খান খান করে দিতো, আজ তিনি নীরব! এর চেয়ে মহা ট্র্যাজেডির ক্লাইমেক্স আর কী হতে পারে!   

নজরুলের দুর্দিনে বিলেতযাত্রার পথে মহাসিদ্ধুর বুকে এই জন্মদিন পালন ছিল সত্যিই ব্যতিক্রমী   তাৎপর্যপূর্ণ| কবির প্রতি তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের ভালোবাসার যে কখনোই কমতি ঘটেনি, এটি ছিল তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ| কবির জন্মদিনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে মহাসিন্ধুর উত্তাল তরঙ্গের বুকে ভেসে চলা জানাতে জাহাজের কামরায় সেদিন দেশি-বিদেশি নানা ভাষাভাষি মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন সিন্ধুসম ভালোবাসা নিয়ে| ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, পেশাসবকিছু ভুলে তাঁরা ভালোবাসার ডালিভর্তি ফুল নিয়ে হাজির হয়েছিলেন| ফুলের এই জলসায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কবি সেদিন ছিলেন বাক&রুদ্ধনীরব| তিনি বাক&রুদ্ধ না থাকলে কত আবেগ আর ভালোবাসার মাধ্যমেই যে ভক্তদের এমন আয়োজনের প্রতিদান দিতেন, তা ভাবা যায় না| নজরুলের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর সাড়ম্বরেজাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁর অনেক জন্মদিন পালন করা হয়েছে, কিন্তু মহাসিন্ধুর বুকে পালিত সেই ৫৪তম নজরুল-জয়ন্তী ছিল ব্যতিক্রমী এবং বিশেষ তাৎপর্যবাহী|  


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত