সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট। তবে প্রথম দিকেই বাজারে দেখা দিয়েছে এক ধরনের ‘মন্দাভাব’। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর পশুখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে এবার হাটে বিক্রেতাদের হাঁকানো দাম যেমন কিছুটা বেশি, তেমনই বিপুল পশুর ভিড়ে ক্রেতার সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গবাদিপশু হাটে আসায়, অনেকে ব্যাপারীকে গরু নিয়ে বাড়িতে ফেরত যেতে হতে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের।
৭-৮ বছরে
এমন জমজমাট হাট দেখেনি রাজধানীবাসী
পুরান ঢাকার
বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবার প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত গরু হাটে দেখা যাচ্ছে।
আগে রাস্তার দুধারে শুধু গরু বাধা থাকলেও এবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রোড ডিভাইডারেও
গরু বেধে রাখা হচ্ছে। তারপরও হাটে জায়গা হচ্ছে না। রাস্তার এতো সংখ্যক গরুর জন্য যান
চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান,
গত ৭-৮ বছরে এমন জমজমাট হাট দেখা যায় নি। ঈদের সপ্তাখানেক আগে এতো সংখ্যক গরু আসতে
দেখা যায় নি। আগের বছরগুলো শুধু শুনতে হয়েছে গরু সংকট। আর এবার এতো গরুর জন্য নিজেদের
বাড়িতে ঢোকা বা বের হতেই সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু হাটে পশুর এই উপচে পড়া ভিড় থাকলেও ক্রেতাদের
প্রধান অভিযোগ; বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম হাকছেন।
বড় গরু ঘিরে
শুধু ভিড়, ক্রেতা মিলছে ছোট ও মাঝারিতে
রাজধানীর মিরপুরের
কালশী, আফতাব নগর, গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, বড় গরুর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি
দেখা গেছে। টাঙ্গাইল থেকে ১৭টি গরু এনেছেন হোসেন আলী। তিনি বলেন, ‘সবাই গরুটা দেখছে,
ছবি তুলছে। কিন্তু দাম বলছে কম।
এদিকে বৃষ্টি
থামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে পশুর হাটে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। পরিবার নিয়ে অনেকেই
আসেন পছন্দের গরু কিনতে। বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর ক্রেতাদের ভিড় মিলিয়ে জমে
উঠতে শুরু করেছে কোরবানির হাট। তবে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রতি
ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তুলনামূলক কম দামের কারণে এসব গরুর সামনে ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার
মতো।
হাটে আসা লিংক
রোডের নুসরাত বলেন, "আমরা মাঝারি গরু খুঁজছি। বাজেট এক লাখ টাকার মধ্যে। কিন্তু
ছোট গরুরও দাম অনেক বেশি হাঁকা হচ্ছে। দরদাম করেও খুব একটা কমানো যাচ্ছে না।"
অন্যদিকে মেরাদিয়ার
বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, "হাটে গরু প্রচুর আছে, তবে বিক্রেতারা দাম বেশি চাচ্ছেন।
তারপরও দর দাম করে একটা গরু কেনার ইচ্ছা আছে।"
ব্যবসায়ীদের
যুক্তি: ‘আমাদের সব খরচ বেড়েছে’
ব্যাপারিরা
বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি খামার ও গ্রামাঞ্চল থেকে বেশি দামে গরু কিনতে হয়েছে।
সে কারণে এবার দাম একটু বেশি।
পাবনা থেকে
আসা ব্যাপারী আব্দুল লতিফ বলেন, "আমরা গ্রাম থেকে এবার বেশি দামে গরু কিনেছি।
আবার ট্রাক ভাড়াও অনেক বেড়েছে। তাই কম দামে বিক্রি করা কঠিন। আমার দাম খুব বেশি চাচ্ছি
না। অল্প কিছু লাভ হলেই ছেড়ে দিচ্ছি।"
সিরাজগঞ্জের
ব্যাপারী মো. মামুন বলেন, "হাটে গরু এনেছি তিন দিন হচ্ছে। আজই প্রথম বিক্রি করতে
পেরেছি। দুপুরের দিক থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। আমাদের ধারণা আগামীকাল ও পরশু মূল বিক্রি
শুরু হবে।"
দামের বিষয়ে
তিনি স্পষ্ট করে জানান, "সবাই শুধু হাটের দাম দেখেন, কিন্তু একটি গরু ঢাকায় আনতে
কত খরচ হয় সেটা অনেকেই বোঝেন না।"
টাঙ্গাইলের
ব্যাপারী মাসুদ জানান, "ছোট গরুর চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। আমরা আশা করছি আগামীকাল
এবং পরশু ক্রেতাদের মূল চাপ দেখা যাবে।"
গবাদিপশু
ফেরত যেতে পারে: ক্ষতির সম্মুখিন হবে প্রান্তিক খামারিরা
প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমছে। গত বছর (২০২৫)
ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিলো, যা তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে ১৩ লাখ
কম। এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার হলেও চাহিদা হতে পারে ১
কোটি ১ লাখ।
তবে বিশ্লেষকরা
মনে করছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে এবার
কোরবানি ৯১ লাখের চেয়েও কম হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ
জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, "খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তারা প্রতিদিনের
খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।"
অধ্যাপক রিপন
কুমার মণ্ডলও মনে করেন, মধ্যবিত্তের অনেকেই এখন গরু কিনতে না পেরে ছাগল কিনছেন বা কোরবানি
দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন।
বাংলাদেশ ডেইরি
অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, একটি ৫-৬ মণ ওজনের গরু
কোরবানিতে বিক্রি না হলে সেটা পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। কারণ এ গরুগুলো
ঠিক কোরবানি কেন্দ্র করেই প্রস্তুত করা। তখন খামারিরা ব্যাপক লোকসানে পড়েন। এমনিতেই
গত কয়েক বছর পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ছে।

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মে ২০২৬
সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট। তবে প্রথম দিকেই বাজারে দেখা দিয়েছে এক ধরনের ‘মন্দাভাব’। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর পশুখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে এবার হাটে বিক্রেতাদের হাঁকানো দাম যেমন কিছুটা বেশি, তেমনই বিপুল পশুর ভিড়ে ক্রেতার সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গবাদিপশু হাটে আসায়, অনেকে ব্যাপারীকে গরু নিয়ে বাড়িতে ফেরত যেতে হতে পারে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের।
৭-৮ বছরে
এমন জমজমাট হাট দেখেনি রাজধানীবাসী
পুরান ঢাকার
বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, এবার প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত গরু হাটে দেখা যাচ্ছে।
আগে রাস্তার দুধারে শুধু গরু বাধা থাকলেও এবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রোড ডিভাইডারেও
গরু বেধে রাখা হচ্ছে। তারপরও হাটে জায়গা হচ্ছে না। রাস্তার এতো সংখ্যক গরুর জন্য যান
চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান,
গত ৭-৮ বছরে এমন জমজমাট হাট দেখা যায় নি। ঈদের সপ্তাখানেক আগে এতো সংখ্যক গরু আসতে
দেখা যায় নি। আগের বছরগুলো শুধু শুনতে হয়েছে গরু সংকট। আর এবার এতো গরুর জন্য নিজেদের
বাড়িতে ঢোকা বা বের হতেই সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু হাটে পশুর এই উপচে পড়া ভিড় থাকলেও ক্রেতাদের
প্রধান অভিযোগ; বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম হাকছেন।
বড় গরু ঘিরে
শুধু ভিড়, ক্রেতা মিলছে ছোট ও মাঝারিতে
রাজধানীর মিরপুরের
কালশী, আফতাব নগর, গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, বড় গরুর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি
দেখা গেছে। টাঙ্গাইল থেকে ১৭টি গরু এনেছেন হোসেন আলী। তিনি বলেন, ‘সবাই গরুটা দেখছে,
ছবি তুলছে। কিন্তু দাম বলছে কম।
এদিকে বৃষ্টি
থামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে পশুর হাটে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। পরিবার নিয়ে অনেকেই
আসেন পছন্দের গরু কিনতে। বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দরদাম আর ক্রেতাদের ভিড় মিলিয়ে জমে
উঠতে শুরু করেছে কোরবানির হাট। তবে বড় গরুর তুলনায় ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর প্রতি
ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তুলনামূলক কম দামের কারণে এসব গরুর সামনে ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার
মতো।
হাটে আসা লিংক
রোডের নুসরাত বলেন, "আমরা মাঝারি গরু খুঁজছি। বাজেট এক লাখ টাকার মধ্যে। কিন্তু
ছোট গরুরও দাম অনেক বেশি হাঁকা হচ্ছে। দরদাম করেও খুব একটা কমানো যাচ্ছে না।"
অন্যদিকে মেরাদিয়ার
বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, "হাটে গরু প্রচুর আছে, তবে বিক্রেতারা দাম বেশি চাচ্ছেন।
তারপরও দর দাম করে একটা গরু কেনার ইচ্ছা আছে।"
ব্যবসায়ীদের
যুক্তি: ‘আমাদের সব খরচ বেড়েছে’
ব্যাপারিরা
বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি খামার ও গ্রামাঞ্চল থেকে বেশি দামে গরু কিনতে হয়েছে।
সে কারণে এবার দাম একটু বেশি।
পাবনা থেকে
আসা ব্যাপারী আব্দুল লতিফ বলেন, "আমরা গ্রাম থেকে এবার বেশি দামে গরু কিনেছি।
আবার ট্রাক ভাড়াও অনেক বেড়েছে। তাই কম দামে বিক্রি করা কঠিন। আমার দাম খুব বেশি চাচ্ছি
না। অল্প কিছু লাভ হলেই ছেড়ে দিচ্ছি।"
সিরাজগঞ্জের
ব্যাপারী মো. মামুন বলেন, "হাটে গরু এনেছি তিন দিন হচ্ছে। আজই প্রথম বিক্রি করতে
পেরেছি। দুপুরের দিক থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। আমাদের ধারণা আগামীকাল ও পরশু মূল বিক্রি
শুরু হবে।"
দামের বিষয়ে
তিনি স্পষ্ট করে জানান, "সবাই শুধু হাটের দাম দেখেন, কিন্তু একটি গরু ঢাকায় আনতে
কত খরচ হয় সেটা অনেকেই বোঝেন না।"
টাঙ্গাইলের
ব্যাপারী মাসুদ জানান, "ছোট গরুর চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি। আমরা আশা করছি আগামীকাল
এবং পরশু ক্রেতাদের মূল চাপ দেখা যাবে।"
গবাদিপশু
ফেরত যেতে পারে: ক্ষতির সম্মুখিন হবে প্রান্তিক খামারিরা
প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমছে। গত বছর (২০২৫)
ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিলো, যা তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে ১৩ লাখ
কম। এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার হলেও চাহিদা হতে পারে ১
কোটি ১ লাখ।
তবে বিশ্লেষকরা
মনে করছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে এবার
কোরবানি ৯১ লাখের চেয়েও কম হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ
জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, "খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তারা প্রতিদিনের
খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।"
অধ্যাপক রিপন
কুমার মণ্ডলও মনে করেন, মধ্যবিত্তের অনেকেই এখন গরু কিনতে না পেরে ছাগল কিনছেন বা কোরবানি
দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন।
বাংলাদেশ ডেইরি
অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, একটি ৫-৬ মণ ওজনের গরু
কোরবানিতে বিক্রি না হলে সেটা পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। কারণ এ গরুগুলো
ঠিক কোরবানি কেন্দ্র করেই প্রস্তুত করা। তখন খামারিরা ব্যাপক লোকসানে পড়েন। এমনিতেই
গত কয়েক বছর পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ছে।

আপনার মতামত লিখুন