সংবাদ

সুপ্রিম কোর্টের রায়

ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই হবে


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম

ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই হবে
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইন্টান্সিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া আইনসিদ্ধ এবং সংবিধানসম্মত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ স্পষ্ট করে বলেছে, ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া তাদের আইনি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করেনি। সংবিধানের আর্টিকেল ৩২৪ এবং রিপ্রেসেন্টেশন অফ দ্য পিপল অ্যাক্ট অনুযায়ী এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বৈধ।

আগামী ৩০ মে থেকে দেশের ১৬টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই এসআইআর-এর চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হতে চলেছে, যেখানে ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যাদের নাম ২০০২ বা ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাদের পুরনো তালিকার কারও সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণ করতে নথি জমা দিতে হয়েছে। প্রথমদিকে আধার কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মানতে চায়নি কমিশন, তবে পরে আদালতের নির্দেশে সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা ভেবে আধারকেও গ্রহণযোগ্য নথির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে প্রথম এই প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে মৃত ভোটারসহ প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গেও অতীতে বিপুল সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। বিরোধী দলগুলি শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল এবং অভিযোগ তুলছিল যে এটি আসলে এনআরসি-সদৃশ একটি ব্যবস্থা। যদিও আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে-এসআইআর কোনওভাবেই ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনশিপ নয়, বরং এটি শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি আইনি পদ্ধতি।

তবে এখানেই শেষ নয়-আদালত একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই নাগরিকত্ব বাতিল নয়। নাগরিকত্ব নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে সরকারের হাতে, এবং সেই প্রক্রিয়া চলবে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫৫ অনুযায়ী। অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশন শুধু তালিকা সংশোধন করতে পারে, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।

কিন্তু এত কিছুর পরেও উঠছে বড় প্রশ্ন- যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়, তখন কি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক নয়? অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে কি কমিশন কার্যত একটি “ক্লিন চিট” পেল? প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে মানুষ যে নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা করে, এই রায়ের পর তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এখন সাধারণ মানুষের- যদি কেউ মনে করেন তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, যদি তার নাম বাদ পড়ে যায়, তাহলে তিনি কোথায় যাবেন? যখন শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ধরা হয় সুপ্রিম কোর্টকে, সেখান থেকেই যদি নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ বৈধতা পায়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?

তবে বিষয়টাকে একপাক্ষিকভাবে দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়বে না। আদালত একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে নাগরিকদের অধিকারও পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। যাদের নাম বাদ গেছে, তাদের জন্য আইনি লড়াইয়ের পথ খোলা রাখা হয়েছে এবং নাগরিক প্রমাণিত হলে তাদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় যুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এই রায় একদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার পক্ষে, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষার দিকেও নজর রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইন যা বলছে, জনমানস তা সবসময় একইভাবে গ্রহণ করে না। আর ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক ন্যারেটিভ।

শেষ পর্যন্ত, এই রায় শুধুমাত্র একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়- এটি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাস- এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এখন দেখার বিষয়, এই বার্তাকে মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে- স্বস্তি হিসেবে, নাকি নতুন আশঙ্কা হিসেবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৭ মে ২০২৬


ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই হবে

প্রকাশের তারিখ : ২৭ মে ২০২৬

featured Image

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অফ ইন্ডিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইন্টান্সিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া আইনসিদ্ধ এবং সংবিধানসম্মত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ স্পষ্ট করে বলেছে, ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া তাদের আইনি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনও কাজ করেনি। সংবিধানের আর্টিকেল ৩২৪ এবং রিপ্রেসেন্টেশন অফ দ্য পিপল অ্যাক্ট অনুযায়ী এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বৈধ।

আগামী ৩০ মে থেকে দেশের ১৬টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই এসআইআর-এর চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হতে চলেছে, যেখানে ভোটার তালিকা নতুন করে যাচাই করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় যাদের নাম ২০০২ বা ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাদের পুরনো তালিকার কারও সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণ করতে নথি জমা দিতে হয়েছে। প্রথমদিকে আধার কার্ডকে প্রমাণ হিসেবে মানতে চায়নি কমিশন, তবে পরে আদালতের নির্দেশে সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা ভেবে আধারকেও গ্রহণযোগ্য নথির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জুন মাসে বিহারে প্রথম এই প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে মৃত ভোটারসহ প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গেও অতীতে বিপুল সংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। বিরোধী দলগুলি শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল এবং অভিযোগ তুলছিল যে এটি আসলে এনআরসি-সদৃশ একটি ব্যবস্থা। যদিও আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে-এসআইআর কোনওভাবেই ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনশিপ নয়, বরং এটি শুধুমাত্র ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি আইনি পদ্ধতি।

তবে এখানেই শেষ নয়-আদালত একইসঙ্গে এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই নাগরিকত্ব বাতিল নয়। নাগরিকত্ব নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে সরকারের হাতে, এবং সেই প্রক্রিয়া চলবে সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট, ১৯৫৫ অনুযায়ী। অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশন শুধু তালিকা সংশোধন করতে পারে, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।

কিন্তু এত কিছুর পরেও উঠছে বড় প্রশ্ন- যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপকে বৈধতা দেয়, তখন কি সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক নয়? অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই রায়ের মাধ্যমে কি কমিশন কার্যত একটি “ক্লিন চিট” পেল? প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে মানুষ যে নিরপেক্ষতার প্রত্যাশা করে, এই রায়ের পর তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা এখন সাধারণ মানুষের- যদি কেউ মনে করেন তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, যদি তার নাম বাদ পড়ে যায়, তাহলে তিনি কোথায় যাবেন? যখন শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ধরা হয় সুপ্রিম কোর্টকে, সেখান থেকেই যদি নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ বৈধতা পায়, তখন সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় দাঁড়াবে?

তবে বিষয়টাকে একপাক্ষিকভাবে দেখলে পুরো ছবি ধরা পড়বে না। আদালত একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে নাগরিকদের অধিকারও পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। যাদের নাম বাদ গেছে, তাদের জন্য আইনি লড়াইয়ের পথ খোলা রাখা হয়েছে এবং নাগরিক প্রমাণিত হলে তাদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় যুক্ত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, এই রায় একদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার পক্ষে, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষার দিকেও নজর রেখেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- আইন যা বলছে, জনমানস তা সবসময় একইভাবে গ্রহণ করে না। আর ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হচ্ছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক ন্যারেটিভ।

শেষ পর্যন্ত, এই রায় শুধুমাত্র একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়- এটি দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাস- এই তিনটির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এখন দেখার বিষয়, এই বার্তাকে মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে- স্বস্তি হিসেবে, নাকি নতুন আশঙ্কা হিসেবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত