মানুষকে ভালোবেসে ভাত চেয়েছিল সে। এক থালা ভাত তাকে দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু সেই ভাতের প্রতিটি দানার দাম তাকে শোধ করতে হয়েছে নিজের নিথর শরীর দিয়ে; প্রতি ফোঁটা তাজা রক্ত দিয়ে।
২০২৪
সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে
যে নৃশংসতা ঘটেছিল, তা কেবল একটি
হত্যাকাণ্ড নয়, তা ছিল
একবিংশ শতাব্দীর বুকে দাঁড়িয়ে এক
মানবিকতার চরম অপমৃত্যু। মোবাইল
চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে দফায় দফায় প্রায়
৩ ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে হত্যা
করার সেই লোমহর্ষক ঘটনার
তদন্তে উঠে এসেছে গা
শিউরে ওঠা সব তথ্য।
কাঁচি দিয়ে চুল কেটে
দেওয়া, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে পুরো শরীর
থেঁতলে দেওয়া, বুকে লাথি আর
অমানবিক নির্যাতনের সেই বিবরণী এখন
শুধুই আদালত আর পুলিশের নথিতে
বন্দি।
একটি
সাজানো সংসার যেভাবে শ্মশান হলো
বরগুনা
জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের দুয়ানী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তোফাজ্জল। ৩৫ বছরের এক
যুবকের এই করুণ পরিণতির
গভীরে লুকিয়ে আছে এক বুক
ভাঙা হাহাকার। স্থানীয় প্রতিবেশীদের মতে, তোফাজ্জলকে হারিয়ে
তার পুরো পরিবারের শেষ
প্রদীপটি নিভে গেছে। আজ
তোফাজ্জলের দেশের বাড়িতে পড়ে আছে কেবল
পরিবারের সদস্যদের সারিবদ্ধ কবর, সেখানে জীবিত
বলতে আর কেউ নেই।
অনুসন্ধানে
জানা যায়, ২০১১ সালের
১১ মার্চ এক সড়ক দুর্ঘটনায়
প্রাণ হারান তোফাজ্জলের পিতা আব্দুর রহমান।
সেই শোক কাটিয়ে ওঠার
আগেই ২০১৩ সালের ১০
আগস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
তার মা বিউটি বেগম।
বাবা-মাকে হারিয়ে তোফাজ্জল
তখন বড় ভাই পুলিশের
সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. নাসিরের ওপর
ভরসা করে বাঁচতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, ২০২৩ সালের ৭
এপ্রিল লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
একমাত্র ভাই নাসিরও। একে
একে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে তোফাজ্জল সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
স্থানীয়
ইউপি সদস্য মো. কবির ও
সাবেক ইউপি সদস্য কালা
বৈরাগী জানান, তোফাজ্জল অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র ছেলে
ছিলেন। তিনি বরিশাল বিএম
কলেজ থেকে সফলতার সাথে
অনার্স ও মাস্টার্স শেষ
করেছিলেন। এরপর পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন
থানায় রাইটার হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন বছর
কাজও করেন এবং পাশাপাশি
চাকরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু একটি প্রভাবশালী পরিবারের
মেয়ের সাথে তার সম্পর্কের
জেরে তাকে স্থানীয় চেয়ারম্যান
বেধড়ক মারধর করেন। পরিবারের সবাইকে হারানোর তীব্র মানসিক কষ্ট এবং ভালোবাসার
মানুষের কাছ থেকে পাওয়া
অপমান ও শারীরিক নির্যাতনের
চোট সহ্য করতে না
পেরে একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন মেধাবী এই যুবক। কিন্তু
ভারসাম্যহীন হয়েও তিনি কখনো
কারও ক্ষতি করেননি, যেখানে যেতেন কেবল একটু খাবার
চাইতেন।
৩
ঘণ্টার সেই নরক গুলজার: নথিতে ঘাতকদের জবানবন্দি
তদন্ত
সংস্থা পিবিআই এর অতিরিক্ত পুলিশ
সহকারী সুপার হান্নানুল ইসলাম দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে গত বছরের
১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনের বিরুদ্ধে
আদালতে চার্জশিট জমা দেন, যা
গত ১০ মার্চ আদালত
গ্রহণ করেছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার
হওয়া ঘাতকদের জবানবন্দিতে তোফাজ্জলের ওপর চলা সেই
৩ ঘণ্টার নারকীয় তাণ্ডবের চিত্র ফুটে উঠেছে।
গ্রেপ্তার
আসামি ওয়াজিবুল ১৬৪ ধারায় দেওয়া
জবানবন্দিতে বলেন, "সেদিন দুপুরে হলে টুর্নামেন্ট চলার
সময় ৬টি মোবাইল চুরি
হয়েছিল। সন্ধ্যার পর হলের মাঠে
ফুটবল খেলা দেখার সময়
তোফাজ্জল এসে রকি ও
সুলতানের পাশে বসে। তারা
তাকে চিনত না। তাই
দুপুরের মোবাইল চুরির সন্দেহে তাকে প্রথমে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। এরপর
আরও ২০-৩০ জন
মিলে তোফাজ্জলকে হলের গেস্টরুমে নিয়ে
যায় এবং রকি ও
সুলতান তাকে লাঠি দিয়ে
বেদম মারপিট করে।"
হৃদয়হীনতার
চরম পর্যায় দেখা যায় তখন,
যখন তোফাজ্জলকে ক্যান্টিনে নিয়ে পেট পুরে
ভাত খাওয়ানো হয়। তোফাজ্জল হয়তো
ভেবেছিলেন, ভাত যেহেতু দিয়েছে,
এরা তাকে আর মারবে
না। কিন্তু ভাত খাওয়া শেষে
তাকে এক্সটেনশন ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়।
আসামি সুমনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, "সেখানে তাকে চড়, থাপ্পড়
ও কিলঘুষি মারার পর ক্রিকেট খেলার
স্ট্যাম্প দিয়ে তার সমস্ত
শরীরে আঘাত করা হয়।
তোফাজ্জল যন্ত্রণায় চিৎকার করলেও কারও মন গলেনি।
এরপর সুমন নামের একজন
কাঁচি দিয়ে তোফাজ্জলের মাথার
চুল কেটে দেয়।"
নির্যাতনের
মাত্রা এখানেই শেষ হয়নি। আসামি
জালাল ও সাজ্জাদ তোফাজ্জলের
হাতের ওপর স্ট্যাম্প রেখে
দুই পাশ থেকে পা
দিয়ে চেপে ধরে বর্বরোচিত
কায়দায় নির্যাতন চালায়। জালাল তার জবানবন্দিতে স্বীকার
করেন, "মারপিটের যন্ত্রণা সইতে না পেরে
তোফাজ্জল একপর্যায়ে চুরির মিথ্যা কথা স্বীকার করতে
বাধ্য হয়।" সাজ্জাদ জানান, সে গাছের ডাল
ভেঙে এনে সেই ডাল
দিয়ে তোফাজ্জলকে হত্যার উদ্দেশ্যে এপাশ-ওপাশ করে
পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। আঘাতে
আঘাতে তোফাজ্জলের পা দিয়ে যখন
রক্ত বের হচ্ছিল, তখন
ঘাতকরা রক্ত বন্ধ করতে
কাপড় দিয়ে পা বেঁধে
দেয়, যেন নির্যাতন আরও
কিছুক্ষণ চালিয়ে যাওয়া যায়!
বাঁচার
শেষ সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছিল ঘাতকেরা
তদন্ত
কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন রাত ৭টা ৪০
মিনিটে তোফাজ্জল ফজলুল হক মুসলিম হলের
ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন এবং রাত ১০টার
পর পর্যন্ত তার ওপর পাশবিক
নির্যাতন চালানো হয়। ঘটনার খবর
পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল
টিমের গাড়ি এবং হাউজ
টিউটরসহ চারজন শিক্ষক দ্রুত হলের মাঠে উপস্থিত
হন। শিক্ষকেরা তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য
প্রক্টোরিয়াল টিমের গাড়িতে তুলে দিতে বললেও,
উন্মত্ত ছাত্ররা গাড়ি আটকে সময়ক্ষেপণ
করে। ততক্ষণে তোফাজ্জল সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়েন।
অবশেষে
রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে
তাকে শাহবাগ থানায় নেওয়া হলে পুলিশ তার
আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে দ্রুত ঢাকা
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে
যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ততক্ষণে
অনেক দেরি হয়ে গেছে।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর
কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তোফাজ্জলকে মৃত
ঘোষণা করেন। ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে
স্পষ্ট বলা হয়েছে, তোফাজ্জলের
শরীরে গভীর ও গুরুতর
আঘাতজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর মূল
কারণ। সিসিটিভির প্রায় ৯০ ঘণ্টার ফুটেজ
ও ৬৪টি ভিডিও ক্লিপ
পর্যালোচনা করে এই পৈশাচিকতার
সত্যতা নিশ্চিত করেছে পিবিআই।
বিচার
চেয়ে স্তব্ধ নীরবতা
বিবেকের
দংশন আর একাকীত্বের অন্ধকার
নিয়ে বরগুনার যে বাড়িটিতে তোফাজ্জল
একদিন হেসে-খেলে বেড়াতেন,
সেটি আজ কেবলই এক
ভূতুড়ে স্মৃতি। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মানুষকে আলো দেখাতে শেখায়,
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলের গেস্টরুমের
অন্ধকার কোণে নিভে গেল
একটি বংশের শেষ প্রদীপ। আগামী
১৪ জুন এই আলোচিত
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা
হয়েছে, যেখানে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
আইনের
টেবিলে বিচার হয়তো হবে, দণ্ড
পাবেন অপরাধীরা। কিন্তু বাংলার মানুষের বিবেক কি এই দায়
এড়াতে পারবে? তোফাজ্জল নামের সেই ভারসাম্যহীন যুবকের
শেষ আর্তনাদ আর ক্ষুধার্ত পেটে
ভাতের বদলে ক্রিকেট স্ট্যাম্পের
সেই নির্মম আঘাত—আজও যেন
আমাদের সমাজব্যবস্থার দিকে এক বিরাট
প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
মানুষকে ভালোবেসে ভাত চেয়েছিল সে। এক থালা ভাত তাকে দেওয়াও হয়েছিল। কিন্তু সেই ভাতের প্রতিটি দানার দাম তাকে শোধ করতে হয়েছে নিজের নিথর শরীর দিয়ে; প্রতি ফোঁটা তাজা রক্ত দিয়ে।
২০২৪
সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে
যে নৃশংসতা ঘটেছিল, তা কেবল একটি
হত্যাকাণ্ড নয়, তা ছিল
একবিংশ শতাব্দীর বুকে দাঁড়িয়ে এক
মানবিকতার চরম অপমৃত্যু। মোবাইল
চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে দফায় দফায় প্রায়
৩ ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে হত্যা
করার সেই লোমহর্ষক ঘটনার
তদন্তে উঠে এসেছে গা
শিউরে ওঠা সব তথ্য।
কাঁচি দিয়ে চুল কেটে
দেওয়া, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে পুরো শরীর
থেঁতলে দেওয়া, বুকে লাথি আর
অমানবিক নির্যাতনের সেই বিবরণী এখন
শুধুই আদালত আর পুলিশের নথিতে
বন্দি।
একটি
সাজানো সংসার যেভাবে শ্মশান হলো
বরগুনা
জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের দুয়ানী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন তোফাজ্জল। ৩৫ বছরের এক
যুবকের এই করুণ পরিণতির
গভীরে লুকিয়ে আছে এক বুক
ভাঙা হাহাকার। স্থানীয় প্রতিবেশীদের মতে, তোফাজ্জলকে হারিয়ে
তার পুরো পরিবারের শেষ
প্রদীপটি নিভে গেছে। আজ
তোফাজ্জলের দেশের বাড়িতে পড়ে আছে কেবল
পরিবারের সদস্যদের সারিবদ্ধ কবর, সেখানে জীবিত
বলতে আর কেউ নেই।
অনুসন্ধানে
জানা যায়, ২০১১ সালের
১১ মার্চ এক সড়ক দুর্ঘটনায়
প্রাণ হারান তোফাজ্জলের পিতা আব্দুর রহমান।
সেই শোক কাটিয়ে ওঠার
আগেই ২০১৩ সালের ১০
আগস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
তার মা বিউটি বেগম।
বাবা-মাকে হারিয়ে তোফাজ্জল
তখন বড় ভাই পুলিশের
সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মো. নাসিরের ওপর
ভরসা করে বাঁচতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, ২০২৩ সালের ৭
এপ্রিল লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান
একমাত্র ভাই নাসিরও। একে
একে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে তোফাজ্জল সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
স্থানীয়
ইউপি সদস্য মো. কবির ও
সাবেক ইউপি সদস্য কালা
বৈরাগী জানান, তোফাজ্জল অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র ছেলে
ছিলেন। তিনি বরিশাল বিএম
কলেজ থেকে সফলতার সাথে
অনার্স ও মাস্টার্স শেষ
করেছিলেন। এরপর পাথরঘাটাসহ বিভিন্ন
থানায় রাইটার হিসেবে প্রায় সাড়ে তিন বছর
কাজও করেন এবং পাশাপাশি
চাকরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু একটি প্রভাবশালী পরিবারের
মেয়ের সাথে তার সম্পর্কের
জেরে তাকে স্থানীয় চেয়ারম্যান
বেধড়ক মারধর করেন। পরিবারের সবাইকে হারানোর তীব্র মানসিক কষ্ট এবং ভালোবাসার
মানুষের কাছ থেকে পাওয়া
অপমান ও শারীরিক নির্যাতনের
চোট সহ্য করতে না
পেরে একপর্যায়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন মেধাবী এই যুবক। কিন্তু
ভারসাম্যহীন হয়েও তিনি কখনো
কারও ক্ষতি করেননি, যেখানে যেতেন কেবল একটু খাবার
চাইতেন।
৩
ঘণ্টার সেই নরক গুলজার: নথিতে ঘাতকদের জবানবন্দি
তদন্ত
সংস্থা পিবিআই এর অতিরিক্ত পুলিশ
সহকারী সুপার হান্নানুল ইসলাম দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে গত বছরের
১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনের বিরুদ্ধে
আদালতে চার্জশিট জমা দেন, যা
গত ১০ মার্চ আদালত
গ্রহণ করেছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার
হওয়া ঘাতকদের জবানবন্দিতে তোফাজ্জলের ওপর চলা সেই
৩ ঘণ্টার নারকীয় তাণ্ডবের চিত্র ফুটে উঠেছে।
গ্রেপ্তার
আসামি ওয়াজিবুল ১৬৪ ধারায় দেওয়া
জবানবন্দিতে বলেন, "সেদিন দুপুরে হলে টুর্নামেন্ট চলার
সময় ৬টি মোবাইল চুরি
হয়েছিল। সন্ধ্যার পর হলের মাঠে
ফুটবল খেলা দেখার সময়
তোফাজ্জল এসে রকি ও
সুলতানের পাশে বসে। তারা
তাকে চিনত না। তাই
দুপুরের মোবাইল চুরির সন্দেহে তাকে প্রথমে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে। এরপর
আরও ২০-৩০ জন
মিলে তোফাজ্জলকে হলের গেস্টরুমে নিয়ে
যায় এবং রকি ও
সুলতান তাকে লাঠি দিয়ে
বেদম মারপিট করে।"
হৃদয়হীনতার
চরম পর্যায় দেখা যায় তখন,
যখন তোফাজ্জলকে ক্যান্টিনে নিয়ে পেট পুরে
ভাত খাওয়ানো হয়। তোফাজ্জল হয়তো
ভেবেছিলেন, ভাত যেহেতু দিয়েছে,
এরা তাকে আর মারবে
না। কিন্তু ভাত খাওয়া শেষে
তাকে এক্সটেনশন ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে যাওয়া হয়।
আসামি সুমনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, "সেখানে তাকে চড়, থাপ্পড়
ও কিলঘুষি মারার পর ক্রিকেট খেলার
স্ট্যাম্প দিয়ে তার সমস্ত
শরীরে আঘাত করা হয়।
তোফাজ্জল যন্ত্রণায় চিৎকার করলেও কারও মন গলেনি।
এরপর সুমন নামের একজন
কাঁচি দিয়ে তোফাজ্জলের মাথার
চুল কেটে দেয়।"
নির্যাতনের
মাত্রা এখানেই শেষ হয়নি। আসামি
জালাল ও সাজ্জাদ তোফাজ্জলের
হাতের ওপর স্ট্যাম্প রেখে
দুই পাশ থেকে পা
দিয়ে চেপে ধরে বর্বরোচিত
কায়দায় নির্যাতন চালায়। জালাল তার জবানবন্দিতে স্বীকার
করেন, "মারপিটের যন্ত্রণা সইতে না পেরে
তোফাজ্জল একপর্যায়ে চুরির মিথ্যা কথা স্বীকার করতে
বাধ্য হয়।" সাজ্জাদ জানান, সে গাছের ডাল
ভেঙে এনে সেই ডাল
দিয়ে তোফাজ্জলকে হত্যার উদ্দেশ্যে এপাশ-ওপাশ করে
পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। আঘাতে
আঘাতে তোফাজ্জলের পা দিয়ে যখন
রক্ত বের হচ্ছিল, তখন
ঘাতকরা রক্ত বন্ধ করতে
কাপড় দিয়ে পা বেঁধে
দেয়, যেন নির্যাতন আরও
কিছুক্ষণ চালিয়ে যাওয়া যায়!
বাঁচার
শেষ সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছিল ঘাতকেরা
তদন্ত
কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন রাত ৭টা ৪০
মিনিটে তোফাজ্জল ফজলুল হক মুসলিম হলের
ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন এবং রাত ১০টার
পর পর্যন্ত তার ওপর পাশবিক
নির্যাতন চালানো হয়। ঘটনার খবর
পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল
টিমের গাড়ি এবং হাউজ
টিউটরসহ চারজন শিক্ষক দ্রুত হলের মাঠে উপস্থিত
হন। শিক্ষকেরা তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য
প্রক্টোরিয়াল টিমের গাড়িতে তুলে দিতে বললেও,
উন্মত্ত ছাত্ররা গাড়ি আটকে সময়ক্ষেপণ
করে। ততক্ষণে তোফাজ্জল সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়েন।
অবশেষে
রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে
তাকে শাহবাগ থানায় নেওয়া হলে পুলিশ তার
আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে দ্রুত ঢাকা
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে
যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ততক্ষণে
অনেক দেরি হয়ে গেছে।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর
কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তোফাজ্জলকে মৃত
ঘোষণা করেন। ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে
স্পষ্ট বলা হয়েছে, তোফাজ্জলের
শরীরে গভীর ও গুরুতর
আঘাতজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর মূল
কারণ। সিসিটিভির প্রায় ৯০ ঘণ্টার ফুটেজ
ও ৬৪টি ভিডিও ক্লিপ
পর্যালোচনা করে এই পৈশাচিকতার
সত্যতা নিশ্চিত করেছে পিবিআই।
বিচার
চেয়ে স্তব্ধ নীরবতা
বিবেকের
দংশন আর একাকীত্বের অন্ধকার
নিয়ে বরগুনার যে বাড়িটিতে তোফাজ্জল
একদিন হেসে-খেলে বেড়াতেন,
সেটি আজ কেবলই এক
ভূতুড়ে স্মৃতি। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মানুষকে আলো দেখাতে শেখায়,
সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলের গেস্টরুমের
অন্ধকার কোণে নিভে গেল
একটি বংশের শেষ প্রদীপ। আগামী
১৪ জুন এই আলোচিত
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা
হয়েছে, যেখানে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা তামিলের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
আইনের
টেবিলে বিচার হয়তো হবে, দণ্ড
পাবেন অপরাধীরা। কিন্তু বাংলার মানুষের বিবেক কি এই দায়
এড়াতে পারবে? তোফাজ্জল নামের সেই ভারসাম্যহীন যুবকের
শেষ আর্তনাদ আর ক্ষুধার্ত পেটে
ভাতের বদলে ক্রিকেট স্ট্যাম্পের
সেই নির্মম আঘাত—আজও যেন
আমাদের সমাজব্যবস্থার দিকে এক বিরাট
প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন