সংবাদ

মমতার তৃণমূলে ভয়াবহ ভাঙন!


দীপক মুখার্জী
দীপক মুখার্জী প্রতিনিধি, কলকাতা
প্রকাশ: ৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

মমতার তৃণমূলে ভয়াবহ ভাঙন!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। পালাবদলের পর থেকেই যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরণে রূপ নিল। দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে একাধিক বিধায়ক সরাসরি বিধানসভায় উপস্থিত হয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করলেন।যা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে, দলের বহিষ্কৃত দুই নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দ্বিপন সাহা ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় হাজির হন। শুধু চিঠি জমা দিয়েই থেমে থাকেননি, একে একে বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়করাও উপস্থিত হয়ে বুঝিয়ে দেন- এই লড়াই আর আড়ালে নেই, এখন তা প্রকাশ্য শক্তিপরীক্ষা।

বিধানসভায় কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠকের পর বিদ্রোহী বিধায়কেরা স্পিকারের কক্ষে যান। তাদের জমা দেওয়া চিঠিতে এখনও মমতা ব্যানার্জীকেই সভানেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে ডেপুটি লিডার হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন ও শিউলি সাহার। মুখ্য সচেতক হিসেবে রাখা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।

এদিন সকাল থেকেই বিধানসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যাদের মধ্যে ছিলেন অরূপ রায়, শিউলি সাহা, আখরুজ্জামান, সাবিনা ইয়াসমিন, চন্দ্রনাথ সিংহ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে।

বিধানসভায় ঢোকার আগে চন্দ্রনাথ সিংহ সরাসরি ঘোষণা করেন, “আমরা ঋতব্রত ব্যানার্জীকেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়েছি।”

অন্যদিকে, সন্দীপন সাহার দাবি- দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক তাদের সঙ্গেই রয়েছেন। যদিও অনেক বিধায়ক এই বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে এড়িয়ে গিয়েছেন, তবুও ভিতরে ভিতরে যে বড়সড় ভাঙন তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এর মধ্যেই পাল্টা পদক্ষেপ নেয় দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী স্পিকার রথীনবসুকে চিঠি দিয়ে বর্ষীয়ান নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান। যদিও স্পিকার শহরে না থাকায় সেই চিঠি গ্রহণ করা হয়নি। এই অবস্থাতেই আসে নাটকীয় মোড়।

এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে শোভনদের চট্টোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু আচমকাই বিদ্রোহী শিবির নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তুলে ধরে- যা সরাসরি দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া না দিলেও দলীয় সূত্রে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, “দলবিরোধী কার্যকলাপ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। শৃঙ্খলাভঙ্গ হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, দলের মুখপাত্রদের দাবি- এই ‘সংখ্যার খেলা’ আসলে বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল। তাদের মতে, তৃণমূল এখনও ঐক্যবদ্ধ এবং নেতৃত্ব নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা নেই।

এদিকে বিদ্রোহী শিবির আগেই দাবি করেছিল, তারা ৫২-৫৫ জন বিধায়কের তালিকা জমা দিয়ে “প্রকৃত বিরোধী দল” হিসেবে স্বীকৃতি চাইবে। সেই মতো বুধবার (৩ জুন) সকালে ৫২ জন বিধায়ক বিধানসভায় হাজির হয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক- বিদ্রোহীরা এখনও প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জীর নাম সরাচ্ছে না। অর্থাৎ লড়াইটা সরাসরি নেতৃত্ব বদলের নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ দখলের। দ্বিতীয়ত, ৫২-৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি যদি বাস্তবের কাছাকাছি হয়, তাহলে তা তৃণমূলের সংগঠনগত ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তৃতীয়ত, ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মানার ঘোষণা স্পষ্ট বার্তা- দলের ভেতরে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই- দলের লাগাম কি এখনও মমতা ব্যানার্জীর হাতেই থাকবে, না কি ধীরে ধীরে তা সরে যাবে বিদ্রোহী শিবিরের নিয়ন্ত্রণে? রাজ্যের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এটিই সবচেয়ে বড় ‘পাওয়ার গেম’।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬


মমতার তৃণমূলে ভয়াবহ ভাঙন!

প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

featured Image

রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড়সড় ধাক্কা খেল তৃণমূল কংগ্রেস। পালাবদলের পর থেকেই যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরণে রূপ নিল। দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে একাধিক বিধায়ক সরাসরি বিধানসভায় উপস্থিত হয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করলেন।যা রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে, দলের বহিষ্কৃত দুই নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দ্বিপন সাহা ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের চিঠি নিয়ে বিধানসভায় হাজির হন। শুধু চিঠি জমা দিয়েই থেমে থাকেননি, একে একে বিদ্রোহী শিবিরের বিধায়করাও উপস্থিত হয়ে বুঝিয়ে দেন- এই লড়াই আর আড়ালে নেই, এখন তা প্রকাশ্য শক্তিপরীক্ষা।

বিধানসভায় কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠকের পর বিদ্রোহী বিধায়কেরা স্পিকারের কক্ষে যান। তাদের জমা দেওয়া চিঠিতে এখনও মমতা ব্যানার্জীকেই সভানেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে ডেপুটি লিডার হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, সাবিনা ইয়াসমিন ও শিউলি সাহার। মুখ্য সচেতক হিসেবে রাখা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।

এদিন সকাল থেকেই বিধানসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুখের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যাদের মধ্যে ছিলেন অরূপ রায়, শিউলি সাহা, আখরুজ্জামান, সাবিনা ইয়াসমিন, চন্দ্রনাথ সিংহ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে।

বিধানসভায় ঢোকার আগে চন্দ্রনাথ সিংহ সরাসরি ঘোষণা করেন, “আমরা ঋতব্রত ব্যানার্জীকেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে মেনে নিয়েছি।”

অন্যদিকে, সন্দীপন সাহার দাবি- দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক তাদের সঙ্গেই রয়েছেন। যদিও অনেক বিধায়ক এই বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে এড়িয়ে গিয়েছেন, তবুও ভিতরে ভিতরে যে বড়সড় ভাঙন তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এর মধ্যেই পাল্টা পদক্ষেপ নেয় দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী স্পিকার রথীনবসুকে চিঠি দিয়ে বর্ষীয়ান নেতা শোভন চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান। যদিও স্পিকার শহরে না থাকায় সেই চিঠি গ্রহণ করা হয়নি। এই অবস্থাতেই আসে নাটকীয় মোড়।

এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে শোভনদের চট্টোপাধ্যায়কেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু আচমকাই বিদ্রোহী শিবির নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে তুলে ধরে- যা সরাসরি দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া না দিলেও দলীয় সূত্রে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, “দলবিরোধী কার্যকলাপ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। শৃঙ্খলাভঙ্গ হলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে, দলের মুখপাত্রদের দাবি- এই ‘সংখ্যার খেলা’ আসলে বিভ্রান্তি তৈরির কৌশল। তাদের মতে, তৃণমূল এখনও ঐক্যবদ্ধ এবং নেতৃত্ব নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা নেই।

এদিকে বিদ্রোহী শিবির আগেই দাবি করেছিল, তারা ৫২-৫৫ জন বিধায়কের তালিকা জমা দিয়ে “প্রকৃত বিরোধী দল” হিসেবে স্বীকৃতি চাইবে। সেই মতো বুধবার (৩ জুন) সকালে ৫২ জন বিধায়ক বিধানসভায় হাজির হয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন।

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক- বিদ্রোহীরা এখনও প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জীর নাম সরাচ্ছে না। অর্থাৎ লড়াইটা সরাসরি নেতৃত্ব বদলের নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ দখলের। দ্বিতীয়ত, ৫২-৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি যদি বাস্তবের কাছাকাছি হয়, তাহলে তা তৃণমূলের সংগঠনগত ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তৃতীয়ত, ঋতব্রত ব্যানার্জীকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মানার ঘোষণা স্পষ্ট বার্তা- দলের ভেতরে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই- দলের লাগাম কি এখনও মমতা ব্যানার্জীর হাতেই থাকবে, না কি ধীরে ধীরে তা সরে যাবে বিদ্রোহী শিবিরের নিয়ন্ত্রণে? রাজ্যের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এটিই সবচেয়ে বড় ‘পাওয়ার গেম’।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত