সংবাদ

ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে ভারতে নতুন তৎপরতা


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে ভারতে নতুন তৎপরতা
ছবি : সংগৃহীত

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ডিলিমিটেশন বিলকে ঘিরে নতুন করে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নয়—বরং ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি বড় কৌশল। সংসদে আগের ব্যর্থতার পরও ভারতীয় জনতা পার্টি এবার সরাসরি সংখ্যার অঙ্কে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলিকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ গড়ার পথে হাঁটছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সাফল্যের পর এই আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে, যার জেরে ডিলিমিটেশন ও “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন”-এই দুই ইস্যুকে একসঙ্গে সামনে এনে বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে কেন্দ্র। ফলে, এই প্রস্তাব এখন শুধু সাংবিধানিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক দলগুলির অবস্থান ও বিরোধী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। 

কেন্দ্রের ডিলিমিটেশন বিল নিয়ে সংসদে ধাক্কা খাওয়ার পরও থামছে না ভারতীয় জনতা পার্টি। বরং ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন করে এই বিল পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন” চালুর দিকেও এগোচ্ছে সরকার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর  রিপোর্ট বলছে, আগেরবার দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ার পর এবার সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলিকে পাশে টানার কৌশল নিচ্ছে BJP—যা স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংখ্যার অঙ্কে ঘাটতি থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে তা পূরণ করতে চাইছে তারা।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ভারতের ডিএমকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ডিলিমিটেশন হলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে উত্তর ভারতের আসন বাড়তে পারে—যার ফলে তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ডিএমকে শুরুতে কড়া বিরোধিতা করলেও, নির্বাচনী ধাক্কার পর এখন দলের ভিতরে “শর্তসাপেক্ষ আলোচনার” সুর শোনা যাচ্ছে। 

ওই সময় কংগ্রেস তাদের সাথে জোটবব্ধ ছিল, কিন্তু তাঁরা সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজয় থালাপাতির দল টিভি-কে সরকার গড়তে সমর্থন দেয় তাই এই ক্ষত্রে কংগ্রেসের উপর তাঁদের খাপ্পাটা স্বাভাবিক অর্থাৎ, কেন্দ্র যদি এমন আশ্বাস দেয় যাতে দক্ষিণের আসন কমে না যায়, তাহলে সরাসরি বিরোধিতা থেকে সরে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না—আর বিজেপি ঠিক এই জায়গাটাকেই কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চাইছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এখন চাপের মুখে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলের পর প্রলোভনে দলীয় ভাঙন, নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এবং জনরোষ—সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দল প্রতিরক্ষায়। বিজেপির কাছে এটি বড় সুযোগ, কারণ সংসদে যদি টিএমসি দুর্বল হয় বা তাদের মধ্যে ভাঙন তৈরি হয়, তাহলে ডিলিমিটেশন বিল পাশ করানো অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর বিজেপির আত্মবিশ্বাস যে বেড়েছে, তাদের নানামুখী আগ্রাসী কৌশলেই স্পষ্ট।

এদিকে কংগ্রেস এখনও এই ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সর্বদলীয় আলোচনার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আইডিআইএ জোটের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেলে কংগ্রেস একা কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডিএমকে যদি নরম হয় এবং টিএমসি দুর্বল হয়, তাহলে বিরোধী ঐক্য ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে—যা সরাসরি বিজেপির পক্ষে যাবে।

এই পুরো পরিস্থিতির সঙ্গে সমান্তরালে “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন” বিলও সামনে আনা হচ্ছে, যা আসলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্যাকেজের অংশ। একদিকে প্রশাসনিক সংস্কারের যুক্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের কোণঠাসা করার কৌশল—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে বিজেপি আসলে বিরোধীদের প্রতিরোধ ভেঙে দিতে চাইছে।

সব মিলিয়ে, ডিলিমিটেশন বিল এখন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রস্তাব নয়—এটি একটি বড় রাজনৈতিক দাবা খেলা, যেখানে আঞ্চলিক দলগুলির অবস্থানই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর বিজেপি বুঝে গেছে, রাজ্যভিত্তিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই এই নতুন উদ্যোগ শুধু বিল পাশ করানোর চেষ্টা নয়, বরং ২০২৯-এর আগে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


ডিলিমিটেশন বিল ঘিরে ভারতে নতুন তৎপরতা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে ডিলিমিটেশন বিলকে ঘিরে নতুন করে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নয়—বরং ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের একটি বড় কৌশল। সংসদে আগের ব্যর্থতার পরও ভারতীয় জনতা পার্টি এবার সরাসরি সংখ্যার অঙ্কে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলিকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ গড়ার পথে হাঁটছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সাফল্যের পর এই আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে, যার জেরে ডিলিমিটেশন ও “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন”-এই দুই ইস্যুকে একসঙ্গে সামনে এনে বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে কেন্দ্র। ফলে, এই প্রস্তাব এখন শুধু সাংবিধানিক বিতর্কের বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক দলগুলির অবস্থান ও বিরোধী ঐক্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। 

কেন্দ্রের ডিলিমিটেশন বিল নিয়ে সংসদে ধাক্কা খাওয়ার পরও থামছে না ভারতীয় জনতা পার্টি। বরং ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনের আগে নতুন করে এই বিল পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন” চালুর দিকেও এগোচ্ছে সরকার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর  রিপোর্ট বলছে, আগেরবার দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ার পর এবার সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে আঞ্চলিক দলগুলিকে পাশে টানার কৌশল নিচ্ছে BJP—যা স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংখ্যার অঙ্কে ঘাটতি থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে তা পূরণ করতে চাইছে তারা।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ ভারতের ডিএমকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। ডিলিমিটেশন হলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে উত্তর ভারতের আসন বাড়তে পারে—যার ফলে তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব কমার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ডিএমকে শুরুতে কড়া বিরোধিতা করলেও, নির্বাচনী ধাক্কার পর এখন দলের ভিতরে “শর্তসাপেক্ষ আলোচনার” সুর শোনা যাচ্ছে। 

ওই সময় কংগ্রেস তাদের সাথে জোটবব্ধ ছিল, কিন্তু তাঁরা সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজয় থালাপাতির দল টিভি-কে সরকার গড়তে সমর্থন দেয় তাই এই ক্ষত্রে কংগ্রেসের উপর তাঁদের খাপ্পাটা স্বাভাবিক অর্থাৎ, কেন্দ্র যদি এমন আশ্বাস দেয় যাতে দক্ষিণের আসন কমে না যায়, তাহলে সরাসরি বিরোধিতা থেকে সরে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না—আর বিজেপি ঠিক এই জায়গাটাকেই কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চাইছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এখন চাপের মুখে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলের পর প্রলোভনে দলীয় ভাঙন, নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এবং জনরোষ—সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর দল প্রতিরক্ষায়। বিজেপির কাছে এটি বড় সুযোগ, কারণ সংসদে যদি টিএমসি দুর্বল হয় বা তাদের মধ্যে ভাঙন তৈরি হয়, তাহলে ডিলিমিটেশন বিল পাশ করানো অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর বিজেপির আত্মবিশ্বাস যে বেড়েছে, তাদের নানামুখী আগ্রাসী কৌশলেই স্পষ্ট।

এদিকে কংগ্রেস এখনও এই ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সর্বদলীয় আলোচনার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে আইডিআইএ জোটের ভিত নড়বড়ে হয়ে গেলে কংগ্রেস একা কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডিএমকে যদি নরম হয় এবং টিএমসি দুর্বল হয়, তাহলে বিরোধী ঐক্য ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে—যা সরাসরি বিজেপির পক্ষে যাবে।

এই পুরো পরিস্থিতির সঙ্গে সমান্তরালে “ওয়ান নেশন, ওয়ান ইলেকশন” বিলও সামনে আনা হচ্ছে, যা আসলে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্যাকেজের অংশ। একদিকে প্রশাসনিক সংস্কারের যুক্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের কোণঠাসা করার কৌশল—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে বিজেপি আসলে বিরোধীদের প্রতিরোধ ভেঙে দিতে চাইছে।

সব মিলিয়ে, ডিলিমিটেশন বিল এখন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রস্তাব নয়—এটি একটি বড় রাজনৈতিক দাবা খেলা, যেখানে আঞ্চলিক দলগুলির অবস্থানই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে। পশ্চিমবঙ্গে জয়ের পর বিজেপি বুঝে গেছে, রাজ্যভিত্তিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই এই নতুন উদ্যোগ শুধু বিল পাশ করানোর চেষ্টা নয়, বরং ২০২৯-এর আগে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত