সংবাদ

শাস্তির প্রদর্শন নয়, বিচার নিশ্চিত হোক


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ৬ জুন ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

শাস্তির প্রদর্শন নয়, বিচার নিশ্চিত হোক
ছবি: সংগৃহীত

গত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের রামিসা আক্তার স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। আর ফেরেনি। পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানা তাকে ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করে, ধামাচাপা দিতে গলা কেটে হত্যা করে, মাথা আলাদা করে বালতিতে লুকিয়ে রাখে। রামিসাই বাংলাদেশে প্রথম শিশু নয়, তার আগে এবং পরেও অনেক শিশুর এমন করুণ পরিণতি হয়েছে। রামিসার পরেই একটি মাদ্রাসার বাথরুমে একটি মৃতশিশু পাওয়া যায়, যার পায়ুপথ রক্তাক্ত ছিল ! আছিয়া, পথশিশু আয়েশা— প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে খুনের খবর আসছে। ধর্ষণ এবং খুনের নৃশংসতা দেখে অনেকেই দেশে শরিয়া আইন চায়। 

শরীয়া আইনে ‘ধর্ষণ’ বলতে কোন শব্দই নেই, আছে জেনা, ব্যভিচার। জেনা, ব্যভিচার হচ্ছে সম্মতি-অসম্মতি নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম, আর ধর্ষণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অসম্মতিতে যৌনকর্ম। জেনার শরিয়া বিধান ধর্ষণেও প্রয়োগ করা যায় কি-না আমার জানা নেই, প্রয়োগ করা গেলে সেই ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকেই ৪ জন মুসলমান সাক্ষী হাজির করতে হবে। কেবল ৪ জন সাক্ষী হলেই হবে না, চোর-ডাকাত-চরিত্রহীন-মিথ্যুক সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়, সাক্ষীকে হতে হবে সাচ্চা ইমানদার, সত্যবাদী ও চরিত্রবান। কারো কাছে শুনে সাক্ষী দিলে হবে না, ধর্ষণকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে এমন সাক্ষী লাগবে। কিন্তু ধর্ষক কি কখনো ৪ জন ইমানদার লোককে সম্মুখে বসিয়ে রেখে ধর্ষণ করে ? আবার নারী সাক্ষী নয়, ৪ জন পুরুষ সাক্ষী লাগবে, নারী সাক্ষী হলে সম্ভবত ৮ জন লাগবে। সাক্ষী হাজির করতে না পারলে মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে ধর্ষিতাকেই শাস্তি পেতে হয়। কারণ ধর্ষিতার বিচার করে শাস্তির দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না, কারণ ধর্ষিতা তার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ লুকাতে পারে না। 

ধর্ষক বা খুনি স্বীকারোক্তি দিলে সাক্ষী ব্যতিরেকেও শাস্তি দেয়া যায়। এই ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে নির্যাতন করেও স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। বাংলাদেশের এমন একটি ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছিল, ২০২০ সনে নারায়ণগঞ্জের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়; কিন্তু কিছুদিন পর মেয়েটি ফেরত আসে এবং এতে পুরো বিচার কাজ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ততদিনে খুনির ফাঁসি হয়ে গিয়েছিল কি-না তা আর মনে নেই। বারবার রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা না হলে এমন স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা নয়। তাই শুধু স্বীকারোক্তি অপরাধ নিরূপণে একমাত্র নিয়ামক হওয়া উচিত নয়। শরিয়া আইনের অপরিহার্য ৪ জন পুরুষ সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ১৯৭৯ সন থেকেই ধর্ষণের প্রায় সব মামলাই ঝুলে গেছে, অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ডিএনএ বা ফরেনসিক পরীক্ষার কথা শরিয়া আইনে নেই, কারণ এগুলো সাম্প্রতিককালের আবিস্কার। দ্বিতীয়ত শরিয়া আইনের সঙ্গে মনুষ্য আবিস্কৃত ফরেনসিক পরীক্ষা যোগ করা কতটুকু শরিয়া সম্মত তা আমার জানা নেই, কারণ মানুষ সৃষ্ট আইন হচ্ছে ‘তাগুত’, যা ইসলাম ধর্মমতে পরিত্যজ্য। মনুষ্য সৃষ্ট তাগুত আইন দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করার কারণে বাংলাদেশের কয়েকটি আদালতে বোমাও মারা হয়েছিল। 

শরিয়া আইন থাকলেই যে হত্যা-খুন-ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু প্রমাণিত সত্য নয়। বহু মুসলিম দেশে শরিয়া আইন আছে, তারমধ্যে আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ইরানে শরিয়া আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এই তিনটি দেশেও ধর্ষণ-খুন বন্ধ হয়নি। আফগানিস্তানে তালেবানের আমলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, হাত-পা কাটা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ থামেনি। সউদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, কিন্তু গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কমেনি। সউদি আরব দরিদ্র দেশগুলো থেকে গৃহকর্মী নিয়ে ধর্ষকদের মুখে ঠেলে দেয়। সউদি আরবে পিতা-সন্তান পালাক্রমে গৃহকর্মীদের ধর্ষণ করে। এই কারণেই ফিলিপিন্স, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শরিয়া শাসিত দেশে গৃহকর্মী ধর্ষণের নানা করুণ চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলেও আজ পর্যন্ত কোন ধর্ষকের শরিয়া আইনে বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি। 

বাংলাদেশে শরিয়া আইন না থাকলেও আলেমদের মনে তা গেঁথে থাকার কথা, তারা শরিয়া আইন পড়ান, নিয়মিত শরিয়া আইন চালুর পক্ষে কথা বলে থাকেন। যারা শরিয়া আইনের পক্ষে কথা বলছেন তাদের অনেকেই আবার ধর্ষকও। ‘তারাও মানুষ, তাদেরও যৌনাকাঙ্খা আছে’ - এমন বয়ান ইদানীং শোনা যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ স্বাধীন। মাদ্রাসার ভেতরে শরিয়ার মত কঠোর আইন অনুসৃত হয়। কওমী মাদ্রাসায় কোন রকম সরকারী হস্তক্ষেপ চলে না, স্ব-স্ব মাদ্রাসা তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, মাদ্রাসায় কী পড়ানো হবে তাও তারাই নির্ধারণ করে থাকেন। এমন একটি পরিবেশে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত আলেমগণও যদি ধর্ষণ এবং বলাৎকার থেকে বের হতে না পারেন তাহলে শরিয়া আইন কীভাবে শিশু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেবে ? মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম ধর্ষক হলে তার বিরুদ্ধে ৪ জন সাক্ষী যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কোরআন-হাদিসে মুসলমানদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ‘আস-সিত্তির’, যার অর্থ যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন। 

মানুষ যখন বিচার পায় না, তখন তারা বিকল্প খোঁজে- কেউ শরিয়া আইন চায়, কেউ গণপিটুনিতে ন্যায় বিচার খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশে একটি ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৫-৭ বছর লাগে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৩ সনের তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণ মামলায় সাজা হয় মাত্র ৩-৪ শতাংশের। রামিসা হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর তৎপরতায় বিচার ব্যবস্থার আড়মোড়া কেটেছে, আইনমন্ত্রী ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫-৭ দিনে বিচার শেষ হওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে এত দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। এত তাড়াহুড়োও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। যত নিকৃষ্ট অপরাধীই হোক না কেন, তারও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ভিক্টিম ও অপরাধী উভয়ই যখন ন্যায় বিচার পায় শুধু তখনই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, অভাব আছে আইনের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। নির্ভয়া কাণ্ডের পর ভারতে গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মতো বাংলাদেশেও কোর্ট গঠন করা যায়, যেগুলো ৬ মাসের মধ্যে রায় দিতে বাধ্য থাকবে। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের বাস্তব প্রয়োগও জরুরি। 

জনগণ যদি দেখে যে রাষ্ট্র অপরাধীকে ছাড় দেয় না, তাহলে মানুষ প্রচলিত আইনের বিকল্প খুঁজবে না। তবে শাস্তি প্রদানে তদন্ত, প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। জনসম্মুখে বিভৎস ও নৃশংস কায়দায় শাস্তি দেয়ার বিধান প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাকে তৃপ্ত করলেও সভ্য দুনিয়া তা গ্রহণ করেনি। কারণ প্রতিশোধ আর বিচার এক নয়। কপালে পট্টি বেঁধে সিনেমার নায়কের মতো প্রতিশোধ নেওয়ার হুঙ্কার সমর্থন করা আদালতের কাজ নয়। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


শাস্তির প্রদর্শন নয়, বিচার নিশ্চিত হোক

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image

গত ১৯ মে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের রামিসা আক্তার স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। আর ফেরেনি। পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল রানা তাকে ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করে, ধামাচাপা দিতে গলা কেটে হত্যা করে, মাথা আলাদা করে বালতিতে লুকিয়ে রাখে। রামিসাই বাংলাদেশে প্রথম শিশু নয়, তার আগে এবং পরেও অনেক শিশুর এমন করুণ পরিণতি হয়েছে। রামিসার পরেই একটি মাদ্রাসার বাথরুমে একটি মৃতশিশু পাওয়া যায়, যার পায়ুপথ রক্তাক্ত ছিল ! আছিয়া, পথশিশু আয়েশা— প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণ, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে খুনের খবর আসছে। ধর্ষণ এবং খুনের নৃশংসতা দেখে অনেকেই দেশে শরিয়া আইন চায়। 

শরীয়া আইনে ‘ধর্ষণ’ বলতে কোন শব্দই নেই, আছে জেনা, ব্যভিচার। জেনা, ব্যভিচার হচ্ছে সম্মতি-অসম্মতি নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত যৌনকর্ম, আর ধর্ষণ হচ্ছে সম্পূর্ণ অসম্মতিতে যৌনকর্ম। জেনার শরিয়া বিধান ধর্ষণেও প্রয়োগ করা যায় কি-না আমার জানা নেই, প্রয়োগ করা গেলে সেই ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকেই ৪ জন মুসলমান সাক্ষী হাজির করতে হবে। কেবল ৪ জন সাক্ষী হলেই হবে না, চোর-ডাকাত-চরিত্রহীন-মিথ্যুক সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়, সাক্ষীকে হতে হবে সাচ্চা ইমানদার, সত্যবাদী ও চরিত্রবান। কারো কাছে শুনে সাক্ষী দিলে হবে না, ধর্ষণকর্ম স্বচক্ষে দেখেছে এমন সাক্ষী লাগবে। কিন্তু ধর্ষক কি কখনো ৪ জন ইমানদার লোককে সম্মুখে বসিয়ে রেখে ধর্ষণ করে ? আবার নারী সাক্ষী নয়, ৪ জন পুরুষ সাক্ষী লাগবে, নারী সাক্ষী হলে সম্ভবত ৮ জন লাগবে। সাক্ষী হাজির করতে না পারলে মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে ধর্ষিতাকেই শাস্তি পেতে হয়। কারণ ধর্ষিতার বিচার করে শাস্তির দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না, কারণ ধর্ষিতা তার গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ লুকাতে পারে না। 

ধর্ষক বা খুনি স্বীকারোক্তি দিলে সাক্ষী ব্যতিরেকেও শাস্তি দেয়া যায়। এই ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে নির্যাতন করেও স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। বাংলাদেশের এমন একটি ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিয়েছিল, ২০২০ সনে নারায়ণগঞ্জের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়; কিন্তু কিছুদিন পর মেয়েটি ফেরত আসে এবং এতে পুরো বিচার কাজ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ততদিনে খুনির ফাঁসি হয়ে গিয়েছিল কি-না তা আর মনে নেই। বারবার রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা না হলে এমন স্বীকারোক্তি দেয়ার কথা নয়। তাই শুধু স্বীকারোক্তি অপরাধ নিরূপণে একমাত্র নিয়ামক হওয়া উচিত নয়। শরিয়া আইনের অপরিহার্য ৪ জন পুরুষ সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ১৯৭৯ সন থেকেই ধর্ষণের প্রায় সব মামলাই ঝুলে গেছে, অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ডিএনএ বা ফরেনসিক পরীক্ষার কথা শরিয়া আইনে নেই, কারণ এগুলো সাম্প্রতিককালের আবিস্কার। দ্বিতীয়ত শরিয়া আইনের সঙ্গে মনুষ্য আবিস্কৃত ফরেনসিক পরীক্ষা যোগ করা কতটুকু শরিয়া সম্মত তা আমার জানা নেই, কারণ মানুষ সৃষ্ট আইন হচ্ছে ‘তাগুত’, যা ইসলাম ধর্মমতে পরিত্যজ্য। মনুষ্য সৃষ্ট তাগুত আইন দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করার কারণে বাংলাদেশের কয়েকটি আদালতে বোমাও মারা হয়েছিল। 

শরিয়া আইন থাকলেই যে হত্যা-খুন-ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু প্রমাণিত সত্য নয়। বহু মুসলিম দেশে শরিয়া আইন আছে, তারমধ্যে আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ইরানে শরিয়া আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এই তিনটি দেশেও ধর্ষণ-খুন বন্ধ হয়নি। আফগানিস্তানে তালেবানের আমলে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড, হাত-পা কাটা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধ থামেনি। সউদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ, কিন্তু গার্হস্থ্য সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কমেনি। সউদি আরব দরিদ্র দেশগুলো থেকে গৃহকর্মী নিয়ে ধর্ষকদের মুখে ঠেলে দেয়। সউদি আরবে পিতা-সন্তান পালাক্রমে গৃহকর্মীদের ধর্ষণ করে। এই কারণেই ফিলিপিন্স, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া মাঝে মাঝে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শরিয়া শাসিত দেশে গৃহকর্মী ধর্ষণের নানা করুণ চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলেও আজ পর্যন্ত কোন ধর্ষকের শরিয়া আইনে বিচার হয়েছে বলে শোনা যায়নি। 

বাংলাদেশে শরিয়া আইন না থাকলেও আলেমদের মনে তা গেঁথে থাকার কথা, তারা শরিয়া আইন পড়ান, নিয়মিত শরিয়া আইন চালুর পক্ষে কথা বলে থাকেন। যারা শরিয়া আইনের পক্ষে কথা বলছেন তাদের অনেকেই আবার ধর্ষকও। ‘তারাও মানুষ, তাদেরও যৌনাকাঙ্খা আছে’ - এমন বয়ান ইদানীং শোনা যাচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ স্বাধীন। মাদ্রাসার ভেতরে শরিয়ার মত কঠোর আইন অনুসৃত হয়। কওমী মাদ্রাসায় কোন রকম সরকারী হস্তক্ষেপ চলে না, স্ব-স্ব মাদ্রাসা তাদের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, মাদ্রাসায় কী পড়ানো হবে তাও তারাই নির্ধারণ করে থাকেন। এমন একটি পরিবেশে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত আলেমগণও যদি ধর্ষণ এবং বলাৎকার থেকে বের হতে না পারেন তাহলে শরিয়া আইন কীভাবে শিশু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেবে ? মাদ্রাসার শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম ধর্ষক হলে তার বিরুদ্ধে ৪ জন সাক্ষী যোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কোরআন-হাদিসে মুসলমানদের দোষত্রুটি গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ‘আস-সিত্তির’, যার অর্থ যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন। 

মানুষ যখন বিচার পায় না, তখন তারা বিকল্প খোঁজে- কেউ শরিয়া আইন চায়, কেউ গণপিটুনিতে ন্যায় বিচার খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশে একটি ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ৫-৭ বছর লাগে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৩ সনের তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণ মামলায় সাজা হয় মাত্র ৩-৪ শতাংশের। রামিসা হত্যার পর প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর তৎপরতায় বিচার ব্যবস্থার আড়মোড়া কেটেছে, আইনমন্ত্রী ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৫-৭ দিনে বিচার শেষ হওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন। তবে এত দ্রুত বিচার সম্ভব নয়। এত তাড়াহুড়োও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। যত নিকৃষ্ট অপরাধীই হোক না কেন, তারও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। ভিক্টিম ও অপরাধী উভয়ই যখন ন্যায় বিচার পায় শুধু তখনই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, অভাব আছে আইনের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। নির্ভয়া কাণ্ডের পর ভারতে গঠিত ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের মতো বাংলাদেশেও কোর্ট গঠন করা যায়, যেগুলো ৬ মাসের মধ্যে রায় দিতে বাধ্য থাকবে। ভিডিও কনফারেন্সে সাক্ষ্য, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের বাস্তব প্রয়োগও জরুরি। 

জনগণ যদি দেখে যে রাষ্ট্র অপরাধীকে ছাড় দেয় না, তাহলে মানুষ প্রচলিত আইনের বিকল্প খুঁজবে না। তবে শাস্তি প্রদানে তদন্ত, প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়া নির্ভরযোগ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। জনসম্মুখে বিভৎস ও নৃশংস কায়দায় শাস্তি দেয়ার বিধান প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহাকে তৃপ্ত করলেও সভ্য দুনিয়া তা গ্রহণ করেনি। কারণ প্রতিশোধ আর বিচার এক নয়। কপালে পট্টি বেঁধে সিনেমার নায়কের মতো প্রতিশোধ নেওয়ার হুঙ্কার সমর্থন করা আদালতের কাজ নয়। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত