সংবাদ

গল্প সংখ্যা

ধোঁয়ার কুণ্ডলী কিংবা প্রত্যাবর্তনের গল্প


হাসান অরিন্দম
হাসান অরিন্দম
প্রকাশ: ৬ জুন ২০২৬, ১২:২৯ এএম

ধোঁয়ার কুণ্ডলী কিংবা প্রত্যাবর্তনের গল্প
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের এই বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে নিকোলাস মাস্টার্স আর আমি পিএইচডি কোর্সের ফেলো| সুঠাম ও সুদর্শন শ্বেতাঙ্গ নিকোলাস পার্কার বয়সে আমার চেয়ে ৬-৭ বছরের ছোট| ও এদেশেরই বাসিন্দা আর আমি দর্শনশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক, এসেছি বাংলাদেশ থেকে| তবু ওর সাথে কয়েক মাস হলো আমার বন্ধুত্বটা বেশ জমে উঠেছে| আমি খেয়াল করেছি ওর তিনজন গার্লফ্রেন্ড আছে| আমার বেশ অবাকই লাগে কীভাবে তিন-তিনজনকে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব| আর ওই মেয়েরাও ব্যাপারটাকে কেন সহজভাবে নেয়| নাকি নিকোলাস তিনজনের সাথে চালাকি করে চলে? কারো কথা কাউকে বলে না| থাক, ওগুলো ওর ব্যক্তিগত বিষয়| আমার অতটা কৌতূহল রাখা অনুচিত| তবে নিকোলাস খুব প্রাণবন্ত মজার একটা ছেলে| আমার সঙ্গে খুব খোলামেলা কথা বলে| এখানে এসেছি বছরখানেক হলো— খোদ কানাডিয়ান আর কারো সাথে এরকম সম্পর্ক আমার গড়ে ওঠেনি| একদিন ক্যাফেতে বসে কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাস্টার্সের পর তুমি কী করবে?’

হালকা নীল চোখের নিকোলাস উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি আমার এলাকায় ফিরে যাব, ক্যাটালিনা শহর|’

‘কী কাজ করতে চাও সেখানে— কোনো চাকরি?’

‘ঠিক জানি না, তবে একটা চাকরি আমার পছন্দের আছে|’

‘কোন ধরনের?’

‘সিকিউরিটি গার্ড|’

নিকোলাসের কথায় আমি একটু অবাক হলেও বিস্ময় চেপে রেখে কেবল জিজ্ঞেস করি, ‘এই পেশাটার কোন&দিক তোমাকে টানে?

‘আসলে সিকিউরিটি গার্ডদের তেমন কোনো কাজ থাকে না, আমি বসে বসে ইচ্ছেমতো বই পড়তে পারব, হেডফোন লাগিয়ে গান শুনব|’

নিকোলাসের কথা শুনে আমার মনে হয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কোনো মানুষের পক্ষে এই ধরনের ভাবনা আজও অসম্ভব| কানাডায় দেখি কোনো কাজই ছোট নয়| আমরা তো নীতিকথায় খুব ওস্তাদ| কিন্তু এরা কেবল মুখের কথায় নয়— বাস্তবে সকল মানুষকে মানুষ বলে মর্যাদা দেয়| আমাদের দেশের মতো পদ-পদবী আর ক্ষমতা সর্বত্র মূল বিবেচ্য নয়| আমার বন্ধুর স্ত্রী যখন এখানকার একটা হাসপাতালে ভর্তি ছিল আমি খেয়াল করেছি চেহারা পোশাক-আশাক ব্যক্তিত্ব-বাচনভঙ্গি কোনোকিছু দেখেই একজন বড় ডাক্তার আর একজন সুইপারকে আলাদা করা সম্ভব নয়| ডাক্তাররা অবশ্য বেশিরভাগ সময় নির্দিষ্ট এপ্রোন পরে থাকেন, এই যা|

‘আচ্ছা এখানে তোমার যে-তিনজন বান্ধবী আছে ওদের কাউকে যাওয়ার সময় সঙ্গে নেয়ার ইচ্ছে আছে, মানে কারো সাথে সেটেল করবার?’

আমার এই কথায় নিকোলাস বিব্রত হয় না বরং অবাক হয়|

আমি জানি এই বান্ধবীদের সাথে সে মাঝে-মাঝে বা বলা যায় ঘুরে-ফিরে নিয়মিত রাত্রি-যাপন করে| আর শরীরী সম্পর্ক এক ধরনের হৃদয়বৃত্তিক আকর্ষণ বা সহজ করে বললে অন্তরের টানও গড়ে দেয় বলে আমার ধারণা| আমাদের দেশে সেটেল ম্যারেজে মানসিক বোঝাপড়ার আগেই তো শরীরের সম্পর্ক ˆতরি হয়| সেখান থেকেই আস্তে-আস্তে নির্মিত হয় মানসিক সমঝোতা, কাছাকাছি থাকবার আকুতি| আমি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য পড়েও জেনেছি কৃষ্ণের সাথে শরীরী সম্পর্কের পরই তার প্রতি রাধার দুর্দমনীয় টান ˆতরি হতে থাকে|

নিকোলাস বলে, ‘না, সে-রকম কিছু পরিকল্পনা নেই| তুমি এভাবে ভাবছ কেন? জীবনটা তো উপভোগের জন্য, বিশেষ করে এই তরুণ বয়স|’

‘শুধুই কি উপভোগ, আর কিছু নয়?’

‘আমার মতে বস্তুত, সবটাই উপভোগ— কোনোটা স্থূল, কোনোটা সূক্ষ্ম| সুস্বাদু খাবার উপভোগ আর ক্লাসিক মিউজিক উপভোগ দুটো আলাদা ব্যাপার| সে যা-ই হোক, অহেতুক বেশি ভেবে জীবনকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না|’

আমার মনে হয় আমি হয়তো ওর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে একটু বেশিই বলে ফেলেছি| তাই ওর সাথে এ নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে বরং একটু সায় দিই, ‘এটা খুব ভালো বলেছ, অধিক ভাবনার ফলাফল শূন্য বা নেগেটিভ| কম ভাবা-ই শ্রেয়|’

আমাদের বাংলাদেশের প্রথাবদ্ধ সমাজের সাথে এ দেশের ˆনতিকতা-ধারণার ভিন্নতার কথা ভাবতে-ভাবতে আমি কেন যেন অন্তত চৌদ্দ-পনেরো বছর পেছনে চলে যাই| মনে পড়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সহপাঠী জাকারিয়ার কথা|

বিজ্ঞান শাখা থেকে পাস করে আমি ইচ্ছে করেই, হয়তো হতে পারে বিজ্ঞান খটমটে লাগে বলে মানবিকের কোনো বিষয়ে অনার্স করতে চেয়েছিলাম| বাবার মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও বিশ্বিবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম দর্শন বিভাগে| প্রথম তিন দিনের ক্লাসের পর কেমন ঘোর-ঘোর লাগতে থাকে| ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ইচ্ছার স্বাধীনতা, টাইম-স্পেস— বিবিধ বিষয়ে অধ্যাপকদের লেকচার শুনে মাথার ভেতর কেমন করতে থাকে| এসব পড়তে-পড়তে দর্শনের ছাত্রদের বেশিরভাগ নাকি নাস্তিক হয়ে যায়| আর আল্লাহ তো নাস্তিকদের পছন্দ করেন না, তাই পরলোকে তাদের জন্য নির্ধারিত আছে জাহান্নামের আগুন| তবে কি এই বিভাগে ভর্তি হয়ে ভুল করলাম| আমার তরুণ মনে কেমন ভয়-ভয় লাগে| বিভাগের শ্রেণিকক্ষ, সহপাঠী, শিক্ষক, ক্যাফেটেরিয়া, চারপাশের পরিবেশ কোনো কিছুকেই সহজভাবে বা আপন করে নিতে পারি না|

মধ্য ডিসেম্বর শীতের সকাল| চতুর্থ দিন ক্লাসে গিয়ে দেখি নতুন একটি ছেলে বসে আছে, তখন কেবল দু-একজন ক্লাসরুমে আসতে শুরু করেছে| ঘরটা প্রায় ফাঁকাই| ছেলেটির মুখে দাড়ি, পরনে রুচিশীল পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় টুপি ও পাগড়ি| গা থেকে আতরের মৃদু গন্ধ আসছে| আমি ওর পাশে বসে বলি, ‘আপনি কি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?’

‘হ্যাঁ, আমি এই ক্লাসেরই| ফিলোসফি, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস না এটা?’ ছেলেটির চেহারায় জড়তা ও সংশয়ের ভাব|

সঙ্গত কারণেই, মানে সহপাঠী বলে আমি ‘তুমি’-তে চলে আসি| ‘কিন্তু তোমাকে তো আগে দেখিনি? আজই প্রথম এলে?’

‘হ্যাঁ বাড়ি থেকে আগে আসতে পারিনি, মা অসুস্থ ছিল তাই|’

‘তোমার মা এখন ভালো আছেন?’

‘অনেকটাই|’

‘তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে| তোমার মতো কাউকেই যেন আমি খুঁজছিলাম|’

‘কেন? কী রকম?’

‘তুমি ধার্মিক, নামাজ পড়ো| এই ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে| দেখ চারিদিকে সবাই কেমন অস্থির-চঞ্চল, তুমি শান্ত, ধীরস্থির| আমার নাম আবরার হোসাইন, তোমার নাম?’

আমি হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিই|

‘আমার নাম জাকারিয়া, বাড়ি মধুপুর, টাঙ্গাইল|’

আমাদের কথা চলতে-চলতে কয়েক মিনিটের মধ্যে ছাত্রছাত্রীতে ক্লাসরুম ভর্তি হয়ে যায়| আমি জাকারিয়ার পাশে বসেই সেদিনের ক্লাসগুলো করেছিলাম|

প্রথম ক’দিন কিছু আলাপ হলেও জাকারিয়ার সাথে অবশ্য আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি| তবে একই আবাসিক হলে থাকায় প্রতিদিন কয়েকবার সাক্ষাৎ হতো| দর্শন পড়লেও ওর চিন্তাশক্তি কেমন একটু স্থূল মনে হতো আমার কাছে| শিল্প-সাহিত্যে কিংবা জীবনের বিচিত্র জিজ্ঞাসায় আমার যে-আগ্রহ ওর ভেতর তার ছিটেফোঁটা নেই| দ্বিতীয় বর্ষেও পিকনিক থেকে ফেরার পর জাকারিয়ার ভেতর একটু পরিবর্তন টের পাই| সে দাড়ির দৈর্ঘ্য একটু-একটু করে কমিয়ে এক বিঘত থেকে দু-তিন ইঞ্চিতে নামিয়ে এনেছে| পাঞ্জাবি-পাজামার বদলে শার্ট-প্যান্টও পরছে মাঝে-মাঝে|

সে-বার কী-একটা কারণে বিভাগে ৫-৬ দিন ক্লাস বন্ধ ছিল, এই ফাঁকে জাকারিয়া বাড়ি চলে গিয়েছিল| শনিবার ফিরে সন্ধ্যার দিকে আমার রুমে একবার ঢুকে বলল, ‘আবরার পড়তে বসবে এখন?’

আমি বলি, ‘না, জরুরি কোনো পড়া নেই| আরও পরে বসব| তুমি এসে বসো|’

জাকারিয়া ইতস্তত করে বলে, ‘না, ঠিক আছে| একটা কথা ছিল| পরে বললেও হবে|’

আমি বুঝতে পারি, আমার রুমমেটের উপস্থিতিতে জাকারিয়া তার কথাগুলো বলতে চাইছে না|

রাতে ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে না ফিরে আমি জাকারিয়ার ২০৫ ন¤^র কক্ষে ঢুঁ দিই, ও কী বলতে চায় আমার শোনা উচিৎ| আমাকে দেখে তার দৃষ্টিতে এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে সে যেন আমার প্রতীক্ষাতেই ছিল| যদিও মুখে কেবল বলে, ‘আবরার, এসো বসো|’

তখন ˆজ্যষ্ঠ মাস| জাকারিয়া মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খালি গায়ে বসেছিল, আমি ওর কাছেই বসে পড়ি| ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখো তো আমার চেহারাটা কি কালো হয়ে গিয়েছে?’

আমি কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলি, ‘গ্রামে ছিলে, রোদে ঘুরাঘুরি করেছ, আজ আবার জার্নি— একটু গ্লুমি তো লাগছেই|’

‘সে-সব নয়| চেহারায় কোনো পাপকর্মের ছাপ পড়েছে মনে হয়?’

‘কী বলো— পাপ কীসের? তুমি কি পাপ করবার মানুষ?’

‘এবার বাড়িতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে|’ বলে জাকারিয়া দৃষ্টি নামিয়ে মেঝের দিকে তাকায়|

আমি কৌতূহল নিয়ে বলি, ‘কী?’

‘আমার চাচাতো বোনের মেয়ে তুলিকা ক্লাস টেনে পড়ে, দেখতে-শুনতে বেশ| গড়ন খুব ভালো| আপার অনুরোধে আমি ওকে দিনের বেলা এই ক’দিন ইংরেজিটা দেখিয়ে দিয়েছি|’

‘সে তো ভালো কথা|’

এরপর জাকারিয়া যা বয়ান করল তার সারমর্ম হলো, তুলিকাই তাকে আহ্বান করেছিল রাত সাড়ে দশটার দিকে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, গলি পেরিয়ে তার ঘরের পেছন দরজায় গিয়ে যেন দাঁড়ায়| জাকারিয়া সেদিন সন্ধ্যা থেকে নিজের সাথে যুদ্ধ করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে আধা মাইল পথ অন্ধকারে পাড়ি দিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই ওই দরজার সামনে| দু’মিনিট না-পেরোতেই প্রায় নিঃশব্দে খুলে গিয়েছিল সেই রাত-দরজা| জাকারিয়া ভগ্নিকন্যা তুলিকার আঙুল ধরেছিল, শেষ অবধি চূড়ান্ত পতন| একটি নয়, তিনটি রাত কেটেছে এই অবিশ্বাস্য স্বপ্নময়তায়, অনিবার্য দুঃস্বপ্নে| সবকিছু এত নিপুণ সতর্কতায় ঘটেছে আশপাশের কেউ কিছু টের পাওয়া তো দূরে থাক, সন্দেহ করারও সুযোগ পায়নি|

নিকোলাসের সাথে আলাপ করতে-করতে আমার মনে হয় এসব ঘটনা এদেশে হলে জাকারিয়ার মতো পাপবোধ সৃষ্টি হবার ব্যাপারটি অবান্তর হতো| অথচ জাকারিয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল তার মুখ পাপের কারণে কোনো কালিমা চিহ্ন বহন করছে কিনা| তাহলে নৈতিকতা আর পাপপুণ্যেও বিষয়টি এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কতটা আপেক্ষিক! ক্যাম্পাস ছাড়ার পর জাকারিয়ার সাথে বিগত ৯-১০ বছরে আর কখানো দেখা হয়নি| তবে বছরখানেক আগে ফেসবুক-লাইভে ওকে দেখা গিয়েছে| লাইভটা ও নিজে করেনি| করেছিল আমাদেরই আরেক বন্ধু মিনহাজ| উপলক্ষ্যটা অবশ্য খুব কষ্টের| সমাজবিজ্ঞানের আমাদের অকালপ্রয়াত বন্ধু শিমুল দত্তের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি দেখানো হচ্ছিল| শিমুল বেশ ভালো একটা বিদেশি এনজিওতে বড় পদে চাকরি করত| বিয়ে করলেও সংসার টেকেনি দু’বছরের বেশি| তিন মাসের বাচ্চা নিয়ে বৌটা বাপের বাড়ি গিয়ে আর ফেরেনি| তারপর থেকে শিমুলের ড্রিংক করবার পুরনো অভ্যাসটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে| নিত্য-নতুন নারী-শরীরের আকাঙ্ক্ষায় অজায়গায়-কুজায়গায় অবাধ বিচরণ শুরু করে| ওর মাত্র ৩৪-৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত পানাসক্তি| সে যা-ই হোক, শিমুলের শেষকৃত্যে জাকায়িরাকে দেখা গেল লাইভে| ক্যাম্পাস জীবনে ওরা ভালো বন্ধু ছিল কিনা সে তথ্য আমার কাছে নেই| জাকায়িরার দাড়ি আছে, তবে সব সময় বোধহয় এখন আর টুপি পরে না| চিতার পাশে আনুষ্ঠানিকতায় শিমুলের বৃদ্ধ বাবা, ছোট ভাই, আর কয়েকজন হিন্দু বন্ধুই ছিল| চিতা দাউ-দাউ করে জ্বলতে শুরু করার খানিক পর ভয়ার্ত জাকারিয়াকে কাঁদতে দেখে আমি ওপাশ থেকে অবাক হই, হয়তো প্রত্যক্ষদর্শী যারা তারাও অবাক হয়েছিল|

আমার খুব কৌতূহল হয় জাকারিয়ার ওই আচরণের কারণ জানতে| কিন্তু ওর ফোন ন¤^র আমার কাছে ছিল না, গণিতের বন্ধু ব্যাংক অফিসার মনিরের কাছ থেকে ন¤^রটা নিয়ে ঘটনার তিনদিন পর আমি জাকারিয়াকে ফোন দিই|

আমার ন¤^র ওর কাছে সেভ ছিল| রিসিভ করে বলে, ‘বন্ধু আবরার কেমন আছো?’

‘ভালো, তোমার কেমন চলছে? বহুদিন পর তোমার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে ভালে ালাগছে|’

‘আছি এক রকম|’

‘আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’

‘বলো|’

‘শিমুলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তোমার কী হয়েছিল?’

‘কেন? তুমি কী করে জানলে— কেউ কিছু বলেছে— তুমি তো ওই দিন ময়মনসিংহ ছিলে না|’

‘আমি ফেসবুক লাইভটা দেখেছিলাম, তোমার রিঅ্যাকশনটা আমার কাছে ঠিক স্বাভাবিক লাগেনি|’

‘তুমি ভিডিও দেখেও টের পেয়েছ তাহলে? আমি কাউকে বলিনি এ পর্যন্ত| তুমি জিজ্ঞেস করলে যেহেতু তাহলে শোনো|’

জাকারিয়া বিষয়টির যে-ব্যাখ্যা আমার কাছে দিয়েছিল তা হলো— শিমুলের চিতা জ্বলে ওঠার খানিক পর সে দেখতে পায় কালো ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে| একটু বাদেই ধোঁয়া নানা মূর্তির আকৃতি নিতে থাকে| ‘এক সময় মনে হলো ধোঁয়া জমাট বেঁধে দানবের আকার ধারণ করে আমার দিকে ধেয়ে আসছে| দানবটা দু হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করবার চেষ্টা করছে| তুমি বোধহয় ভিডিওতে আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে| সবাই ভেবেছিল শিমুলের লাশ পোড়ানোর দৃশ্য আমি হয়তো সহ্য করতে পারছি না, কিন্তু ভেতরের রহস্য কাউকে বলিনি| আমি তিনদিন ধরে ওই ধোঁয়া মূর্তির কোনো ব্যাখ্যাও খুঁজে পাইনি|’

‘আচ্ছা তুমি ছাড়া আর কেউ ধোঁয়ার ওই বিশেষ কুণ্ডলি দেখতে পেয়েছিল?’

‘ধোঁয়টা তো স্বাভাবিক কিন্তু আমি যে-দানবটাকে দেখেছি তা তো আর কেউ দেখেনি| উপস্থিত সকলে দেখলে নিশ্চয়ই একটা সোরগোল পড়ে যেত| শোনো বন্ধু, তোমাকে একটা অনুরোধ করি|’

‘বলো বন্ধু!’

‘আমি বিশ^বিদ্যালয়ে তোমাকে একটি বিশেষ ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করেছিলাম, তুমি সেকথা বলোনি তো কাউকে?’

আমার বুঝতে মোটেই বিলম্ব হয় না জাকারিয়া কোন বিষয়ের কথা বলছে| ‘না, বন্ধু| একাবারেই না|’

‘শোনো, প্লিজ তুমি ঘুণাক্ষরেও যেন এসব কাউকে জানতে দিও না|’

নিকোলাস একটা ফোন পেয়ে হঠাৎ বাড়ি চলে গিয়েছিল| ফিরে আসে ৯ দিন পর| আমার সাথে দেখা তারও দুদিন বাদে| এবার সে কেমন বিষণ্ন-ক্লান্ত-গভীর| আমি বললাম, ‘তুমি ঠিক আছো নিকোলাস?’

‘না, একটা শোকের ঘটনা পেরিয়ে এলাম| এসে আরেকটি ঝামেলার ইঙ্গিত পাচ্ছি|’

‘আমাকে বলা যাবে?’

‘বাড়ি গিয়েছিলাম জানো তো, আমার বড় বোনের ১১ বছর বয়সী মেয়েটা গলায় খাবার আটকে মারা গিয়েছে| তুমি ভাবতে পারো এমন মৃত্যুও মানুষের হয়|’

‘ওহ, কী ভয়ানক!’

‘ভাগ্নির মৃতদেহ দেখার পর থেকে আমি আর স্বাভাবিক হতে পারছি না| জানো, ওর জন্মের পর প্রথম আমিই কোলে নিয়েছিলাম| আমাদের সেই ছোট্ট এমিলিয়া!’

নিকোলাসের ধরা কণ্ঠ শুনে, চোখের কোনায় অশ্রুর ইঙ্গিত দেখে মনে হয় এই যুবককে কি আমি আগে চিনতাম|

‘আসলেই, এমন মৃত্যু সহ্য করা কঠিন|’

‘আমার বোধহয় মাস্টার্সটা শেষ করা হবে না, সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব| তার আগে তোমাকে সাথে নিয়ে একবার এডোয়ার্ড স্মিথের সাথে শেষ-দেখা করতে চাই|’

এডোয়ার্ড স্মিথ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র প্রফেসর, আমাদের দুজনেরই কোর্স শিক্ষক| ব্যক্তিত্ব, সততা, আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা আর মহানুভবতায় এই ক্যাম্পাসে অনন্য বলে অধিকাংশ ছাত্র তাকে ‘সেইন্ট স্মিথ’ বলে চেনে| আমি নিজে একাধিক ঘটনায় টের পেয়েছি স্মিথ আসলে মহামানব টাইপের একজন মানুষ| কেবল পড়াশোনা নয়, ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিগত অনেক সমস্যার সমাধান দেন বলে সবাই তাকে বিশেষ ভক্তি করে| লোকে বলে তার নাকি বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাও আছে| 

‘তোমার দ্বিতীয় সমস্যাটা কি শুনতে পারি?’

‘হ্যাঁ, সে-জন্যই আমি একটু স্মিথের সাথে পরামর্শ করতে চাই| তোমাকে বলতে দোষ নেই, আমি যেদিন বাড়ি থেকে ফিরে আসি সেই রাতেই জেনিফার সুইসাইডের চেষ্টা করেছিল| এ-যাত্রা এক প্রকার যুদ্ধ করে ওকে ফেরানো গিয়েছে| কিন্তু আমি তো রীতিমত আতঙ্কের ভেতর আছি| মনে হচ্ছে সবকিছু ছেড়েছুড়ে এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি|’

জেনিফার হলো নিকোলাসের তিন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর অন্যতম| ও মূলত আইরিশ মেয়ে, নিকোলাস বলেছিল সে ভীষণ ইমোশনাল আর খামখেয়ালি| ও কি তাহলে নিকোলাসের অন্য দুই বান্ধবী বিষয়ে সিরিয়াসলি জেলাস হয়ে পড়েছে? সে চাচ্ছে নিকোলাস কেবল তারই হবে? আমি নিশ্চিত নই সমস্যাটা আসলে কী| এদের এই জাতীয় কালচারের গভীরে তো আমি ঢুকিনি কখনো|

‘স্মিথের কাছে কি আজই যেতে চাও?’

‘আমি ফোন দিয়েছিলাম| আজ তিনি বিজি, কাল সকাল সাড়ে নটায় আমাকে সময় দিয়েছেন|’

পরদিন স্মিথের সাথে দেখা করার আগে নিকোলাস আর আমি নয়টার দিকে লাইব্রেরির সামনের লনে এক হই| আমি খেয়াল করি ওর চোখ লাল, ঝোঝা-ই যায় রাতে ঘুম হয়নি| আমি না-বলে পারি না, ‘তোমার কী হয়েছে নিকোলাস?’

‘রাতে প্রথম এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম| কী-এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেল| ¯^প্নটা ভয়েরও বলতে পারো|’

‘একট বিস্তারিত বলো তো!’

‘ঘুমের ভেতর দেখছি আমি খুব প্রাচীন এক গ্রেভ ইয়ার্ডে, আমার নিজের শহরে| কারো কবরে ফুল দিতে গিয়েছি, হতে পারে সদ্যপ্রয়াত ভাগ্নি এমিলিয়ার কবরে| হঠাৎ উপরে তাকিয়ে দেখি আমার মাথার উপর কালো মেঘ, অথচ একটু আগেই আকাশ ছিল ঝকঝকে| দুরাত্মা মেঘগুলো জমা হয়ে মুহূর্তে একটা  দৈত্যের আকৃতি নিল| নির্জন কবরস্থানে ভয় পেয়ে আমি দ্রুত বেরিয়ে আসবার পথ ধরি| ঊর্ধ্বশ্বাসে সে দৌড়াচ্ছি কিন্তু দৈত্যটা আমাকে ধাওয়া করে আমার টুঁটি চেপে ধরল| এরপর সারারাত আর ঘুমতে পারিনি| যতবার চোখ একটু লেগে এসেছে অমনি ওই স্বপ্নটা হানা দেয়ার চেষ্টা করেছে| এ কী সমস্যায় পড়লাম বলো তো আবরার| এমন বিটকেল স্বপ্ন কি তোমার কখানো হয়েছে? কী মানে এ-সবের— আমি কি সাইকো-প্যাশেন্ট হয়ে গেলাম| এই দুটো সপ্তাহের ভেতর আমার জীবনটা এমন হয়ে যাবে কখনো কি তা ভেবেছি!’

নিকোলাসের কথা শুনতে শুনতে আমি আবারও ভাবি পৃথিবীর দুই প্রান্তের, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন পরিবেশের দুজন মানুষ| অথচ তারা প্রায়ই একই ধারার একটা দুঃস্বপ্ন দ্বারা তাড়িত হলো| অবশ্য জাকারিয়া ওই ধোঁয়ার দৈত্য প্রথম দেখেছিল জাগ্রত অবস্থায়ই| পরে কি সে দৈত্যের তাড়না থেকে মুক্তি পেয়েছিল? পেলে কীভাবে— তা জানলে আমি নিকোলাসকে এখন বলতে পারতাম| অবশ্য স্বয়ং জাকায়িরাকে আজও সেই দৈত্যটা ধাওয়া করে কিনা তাও তো আমি নিশ্চিত নই| আবার একদিন ফোন করে ওর কুশলাদি জানা দরকার|

স্মিথকে নিকোলাস তার সমস্যার কথা বললে খানিক নীরব থেকে স্মিথ বলেন, ‘তুমি কি জেনিফারকে নিয়ে সেটেল করতে পারবে?’

‘না, সেটা বোধহয় সম্ভব নয়|’

‘তাহলে কি নিউ ফাউন্ডল্যান্ড থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত?’

‘তাছাড়া আর উপায় কী?’

‘তুমি মনে করো বাড়িতে গেলেই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারবে? জেনিফার কোনো পাগলামি করে ফেললে তোমাকেও হয়তো খুঁজে বের করা হবে, তাই না?’

‘কিন্তু এর জন্য আমি কি দায়ী?’

‘এর উত্তর আমি তোমার উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি| আমরা কি সবকিছু আইন দিয়ে জাস্টিফাই করতে পারি? আমাদের বোধবুদ্ধি কি আইন-কানুনের চেয়ে সূক্ষ্ম ও গভীর নয়?’

স্মিথের রুম থেকে বের হয়ে নিকোলাস উষ্মা প্রকাশ করে বলে, ‘তোমরা অহেতুক তাকে সেইন্ট বলে ডাক| তিনি পারলেন কোনো সমাধান দিতে? আমি জানতাম পারবেন না|’

আমি বলি, ‘সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান থাকে না, অপেক্ষা করতে হয়| এখন হয়তো সমাধান মিলছে না কদিন পরে হয়তো দেখলে পরিস্থিতি তোমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে|’

‘আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ?’

‘না, তবে আমার বিশ^াস ˆধর্য ধরলে সব ঠিক হয়ে যাবে|’ খানিক নীরব থেকে প্রসঙ্গ অন্যদিকে নিতে বলি, ‘তোমার তো সকালের নাস্তা করা হয়নি, চল বসি কোথাও|’

‘না, আমার কোনো খিদের অনুভূতি কাজ করছে না| তোমার আপত্তি না-থাকলে চলো ওই লেকের ধারটাতে নিরিবিলি একটু বসি|’

নিকোলাসের কথামতো খানিক পথ এগোবার পর আমরা দেখি মেরুন জ্যাকেট পরে লম্বা চুল দুলিয়ে জেনিফার আসছে| ও কাছাকাছি এসে বলে, ‘নিকোলাস তোমার সাথে আমার কথা আছে|’

আমি পরিস্থিতি বুঝে ভদ্রতার খাতিরে দূরে গিয়ে দাঁড়াই|

দূর থেকে বোঝা যায় জেনিফার খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাতপা ছুড়ে কথা বলছে| তার সামনে নিকোলাসকে খুব অসহায় দেখায়|

আমি  ওদের থেকে আরও খানিকটা দূরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসে থাকি| নিকোলাসকে না-বলে চলে যাওয়া ঠিক হবে না বলে অন্য দিকে দৃষ্টি রেখে অপেক্ষা করতে থাকি| কয়েক মিনিট পর ওদের দিকে তাকাই, কথা শেষ হলো কিনা| কিন্তু তখনও সম্ভবত জেনিফার উত্তপ্ত ভঙ্গিতে কথা বলে চলেছে| ওদের পেছনে কী-একটা বিশেষ চলমান দেখে চোখ কচলে আরার তাকাই| লেকের জল থেকে ছাইরঙের ধোঁয়া উঠে ওদের দুজনের মাথার উপর ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে| আমার কৌতূহল হলো : ধোঁয়ার স্বরূপ উদঘাটন করা দরকার| কিন্তু এই মুহূর্তে ওদিকে যাওয়া সম্ভব নয়| আমি দু মিনিট অন্যদিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে আবার নিকোলাস ও জেনিফারের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখি ধোঁয়া দিব্যি একটি ˆদত্যের মূর্তি ধারণ করেছে| ওটা কি বাতাসে ভেসে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে| আমার একটু ভয়-ভয় করতে থাকে| কিন্তু আমার ভয় পাওয়ার কি কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে? আমি আনমনে বসা থেকে উঠে দাঁড়াই| নিজেকে বলি জাকায়িরা বা নিকোলাস ও-সব ফালতু ধোঁয়াটোয়া দেখে ভয় পেতেই পারে| আমি কেন ভয় পাব?

তখন পেছন থেকে কে যেন ভারি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যিই কি ভয়ের কোনো করাণ নেই, বুকে হাত দিয়ে বলো তো?’

এটা কার কণ্ঠ হতে পারে নিকোলাস তো নয়, তাহলে কি ওই ছায়ামূর্তির? ও আমার নিঃশব্দ স্বগতোক্তি কীভাবে শুনতে পেল?

আমি ভয়ে পেছনে তাকাতে পারি না| নিকোলাস এখনো আসছে না কেন?

বেশ খানিকটা সময় বাদে আমার শ্বাসকষ্টের মতো লাগে| আমি হাঁপাতে-হাঁপাতে ঘাসের উপর বসে পড়ি, তারপর শুয়ে থাকি আকাশের দিকে তাকিয়ে| তখন টের পাই আমি আসলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দৌড়চ্ছিলাম, আনমনে হয়তো কিছু না-ভেবেই, হয়তো ভয়ে| কই, আমার চারপাশের আকাশে এখন কোনো ধোঁয়ামূর্তি তো নেই! কিন্তু আমি দৌড়লাম কেন? আমার ভয় পাওয়ার কি কোনো কারণ আছে?

ক্যাফে থেকে নাস্তা সেরে নিজের ঘরে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিই| ক্লান্ত মন নিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বিক্ষিপ্ত কী-সব ভাবতে থাকি| ১৮ বছর আগে বিশ^বিদ্যালয়ে দর্শন পড়তে শঙ্কা হয়েছিল আমার, নানা রকম সংশয় ও জিজ্ঞাসা শেষে আমার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে| একবার ভেবেছিলাম এলাকায় ফিরে গিয়ে কলেজে বিএ-তে ভর্তি হই| কী দরকার অস্তিত্ব খুঁড়ে এত জ্ঞান অর্জনের? পরে অবশ্য ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিলাম| শুধু মানিয়েই নিইনি| বিভাগে সেরা ফলাফল করে শেষ পর্যন্ত আজ গবেষণা করতে সুদূর কানাডায়| এই কদিনে দেখলাম জাকারিয়া থেকে নিকোলাস, ময়মনসিংহ থেকে কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ড— মানুষের অভিজ্ঞতা আর কল্পনার কত ˆবচিত্র্য, কত মিল! একই সংশয়, একই অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা| ছাদের সাদা রঙ ভেদ করে হঠাৎ আমার সামনে কিছু মানুষের নারী ও পুরুষের অনেকটা অশরীরী ছায়া ভেসে ওঠে| কেউ জীবিত, কেউ মৃত— কিন্তু এরা সবাই যেন আমার বিপক্ষে কোনো সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত| আর ছাদে ছাই রঙের ওগুলো কী? আবার সেই কালো ধোঁয়া! কুণ্ডলী পাকিয়ে বিশেষ আকৃতি নেয়ার চেষ্টা করছে| এরা কেন আমার পিছু ছাড়ছে না? তবে কি দেশে ফিরে যাব ডিগ্রি না-নিয়েই? যাওয়া যেতে পারে| ডিগ্রির চেয়ে স্বস্তি ও সুস্থিরতা জরুরি| আমি ছাদ ফুঁড়ে বের-হওয়া মানুষগুলোর চেহারা স্পষ্ট বুঝবার চেষ্টা করি— ওরা কী আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চায়? বরং ফিরে যাব দেশে| স্ত্রী-পুত্রের দীর্ঘ বিচ্ছেদ আর প্রবাসের নিঃসঙ্গতাই হয়তো আমাকে অপ্রকৃতিস্থ করে তুলছে| ওসব ছায়াটায়া কিছু নয়| আপনজনের কাছে দেশে ফিরে যাব| কিন্তু ওই অস্পষ্ট মুখচ্ছবি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে মুক্তি পাব তো? একবার পিছু নিলে মুক্তি মেলে কি? জানি না| এতটা বছর দর্শনশাস্ত্র পাঠ একেবারেই বৃথা| জানি না, আমি আসলে কিচ্ছু জানি না| এই ধোঁয়া-কুণ্ডলীর কী জবাব দেবে শাস্ত্র? আসলে কেউ কিচ্ছু জানে না| নিকোলাস ফিরে যাচ্ছে| আমিও ফিরব| 

প্রত্যাবর্তন তো অনিবার্য| কিন্তু ওই ছায়াগুলোর সাক্ষ্য থেকে মুক্তি পাব কি কোনোদিন? মহাকালের অন্যকোনো প্রান্তে? জানি না| আসলে কেউ কিচ্ছু জানে না! আমি বিছানা ছেড়ে দেয়ালের বড় আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই| শরীরটা সামান্য কাঁপছে| প্রতিবিম্বে নিজের চোখে চোখ রাখি| পাথরের মতো চোখজোড়া যেন ˆনঃশব্দ্যের ভাষায় বলে, ‘সকল কিছুই আমরা অবগত আছি, যেমন অবগত আছে তোমার ওই হস্ত ও চরণযুগল!’ 

ফিরে তো যেতেই হবে| ভেতরের মৃদুকম্পন সারি সারি পিঁপড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে আপাদমস্তক— আমার অস্তিত্ব জুড়ে কেবল হিম ছড়াতে থাকে!

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬


ধোঁয়ার কুণ্ডলী কিংবা প্রত্যাবর্তনের গল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬

featured Image


কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের এই বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে নিকোলাস মাস্টার্স আর আমি পিএইচডি কোর্সের ফেলো| সুঠাম ও সুদর্শন শ্বেতাঙ্গ নিকোলাস পার্কার বয়সে আমার চেয়ে ৬-৭ বছরের ছোট| ও এদেশেরই বাসিন্দা আর আমি দর্শনশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক, এসেছি বাংলাদেশ থেকে| তবু ওর সাথে কয়েক মাস হলো আমার বন্ধুত্বটা বেশ জমে উঠেছে| আমি খেয়াল করেছি ওর তিনজন গার্লফ্রেন্ড আছে| আমার বেশ অবাকই লাগে কীভাবে তিন-তিনজনকে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব| আর ওই মেয়েরাও ব্যাপারটাকে কেন সহজভাবে নেয়| নাকি নিকোলাস তিনজনের সাথে চালাকি করে চলে? কারো কথা কাউকে বলে না| থাক, ওগুলো ওর ব্যক্তিগত বিষয়| আমার অতটা কৌতূহল রাখা অনুচিত| তবে নিকোলাস খুব প্রাণবন্ত মজার একটা ছেলে| আমার সঙ্গে খুব খোলামেলা কথা বলে| এখানে এসেছি বছরখানেক হলো— খোদ কানাডিয়ান আর কারো সাথে এরকম সম্পর্ক আমার গড়ে ওঠেনি| একদিন ক্যাফেতে বসে কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মাস্টার্সের পর তুমি কী করবে?’

হালকা নীল চোখের নিকোলাস উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি আমার এলাকায় ফিরে যাব, ক্যাটালিনা শহর|’

‘কী কাজ করতে চাও সেখানে— কোনো চাকরি?’

‘ঠিক জানি না, তবে একটা চাকরি আমার পছন্দের আছে|’

‘কোন ধরনের?’

‘সিকিউরিটি গার্ড|’

নিকোলাসের কথায় আমি একটু অবাক হলেও বিস্ময় চেপে রেখে কেবল জিজ্ঞেস করি, ‘এই পেশাটার কোন&দিক তোমাকে টানে?

‘আসলে সিকিউরিটি গার্ডদের তেমন কোনো কাজ থাকে না, আমি বসে বসে ইচ্ছেমতো বই পড়তে পারব, হেডফোন লাগিয়ে গান শুনব|’

নিকোলাসের কথা শুনে আমার মনে হয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত কোনো মানুষের পক্ষে এই ধরনের ভাবনা আজও অসম্ভব| কানাডায় দেখি কোনো কাজই ছোট নয়| আমরা তো নীতিকথায় খুব ওস্তাদ| কিন্তু এরা কেবল মুখের কথায় নয়— বাস্তবে সকল মানুষকে মানুষ বলে মর্যাদা দেয়| আমাদের দেশের মতো পদ-পদবী আর ক্ষমতা সর্বত্র মূল বিবেচ্য নয়| আমার বন্ধুর স্ত্রী যখন এখানকার একটা হাসপাতালে ভর্তি ছিল আমি খেয়াল করেছি চেহারা পোশাক-আশাক ব্যক্তিত্ব-বাচনভঙ্গি কোনোকিছু দেখেই একজন বড় ডাক্তার আর একজন সুইপারকে আলাদা করা সম্ভব নয়| ডাক্তাররা অবশ্য বেশিরভাগ সময় নির্দিষ্ট এপ্রোন পরে থাকেন, এই যা|

‘আচ্ছা এখানে তোমার যে-তিনজন বান্ধবী আছে ওদের কাউকে যাওয়ার সময় সঙ্গে নেয়ার ইচ্ছে আছে, মানে কারো সাথে সেটেল করবার?’

আমার এই কথায় নিকোলাস বিব্রত হয় না বরং অবাক হয়|

আমি জানি এই বান্ধবীদের সাথে সে মাঝে-মাঝে বা বলা যায় ঘুরে-ফিরে নিয়মিত রাত্রি-যাপন করে| আর শরীরী সম্পর্ক এক ধরনের হৃদয়বৃত্তিক আকর্ষণ বা সহজ করে বললে অন্তরের টানও গড়ে দেয় বলে আমার ধারণা| আমাদের দেশে সেটেল ম্যারেজে মানসিক বোঝাপড়ার আগেই তো শরীরের সম্পর্ক ˆতরি হয়| সেখান থেকেই আস্তে-আস্তে নির্মিত হয় মানসিক সমঝোতা, কাছাকাছি থাকবার আকুতি| আমি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য পড়েও জেনেছি কৃষ্ণের সাথে শরীরী সম্পর্কের পরই তার প্রতি রাধার দুর্দমনীয় টান ˆতরি হতে থাকে|

নিকোলাস বলে, ‘না, সে-রকম কিছু পরিকল্পনা নেই| তুমি এভাবে ভাবছ কেন? জীবনটা তো উপভোগের জন্য, বিশেষ করে এই তরুণ বয়স|’

‘শুধুই কি উপভোগ, আর কিছু নয়?’

‘আমার মতে বস্তুত, সবটাই উপভোগ— কোনোটা স্থূল, কোনোটা সূক্ষ্ম| সুস্বাদু খাবার উপভোগ আর ক্লাসিক মিউজিক উপভোগ দুটো আলাদা ব্যাপার| সে যা-ই হোক, অহেতুক বেশি ভেবে জীবনকে ভারাক্রান্ত করতে চাই না|’

আমার মনে হয় আমি হয়তো ওর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে একটু বেশিই বলে ফেলেছি| তাই ওর সাথে এ নিয়ে কথা আর না বাড়িয়ে বরং একটু সায় দিই, ‘এটা খুব ভালো বলেছ, অধিক ভাবনার ফলাফল শূন্য বা নেগেটিভ| কম ভাবা-ই শ্রেয়|’

আমাদের বাংলাদেশের প্রথাবদ্ধ সমাজের সাথে এ দেশের ˆনতিকতা-ধারণার ভিন্নতার কথা ভাবতে-ভাবতে আমি কেন যেন অন্তত চৌদ্দ-পনেরো বছর পেছনে চলে যাই| মনে পড়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সহপাঠী জাকারিয়ার কথা|

বিজ্ঞান শাখা থেকে পাস করে আমি ইচ্ছে করেই, হয়তো হতে পারে বিজ্ঞান খটমটে লাগে বলে মানবিকের কোনো বিষয়ে অনার্স করতে চেয়েছিলাম| বাবার মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও বিশ্বিবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম দর্শন বিভাগে| প্রথম তিন দিনের ক্লাসের পর কেমন ঘোর-ঘোর লাগতে থাকে| ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ইচ্ছার স্বাধীনতা, টাইম-স্পেস— বিবিধ বিষয়ে অধ্যাপকদের লেকচার শুনে মাথার ভেতর কেমন করতে থাকে| এসব পড়তে-পড়তে দর্শনের ছাত্রদের বেশিরভাগ নাকি নাস্তিক হয়ে যায়| আর আল্লাহ তো নাস্তিকদের পছন্দ করেন না, তাই পরলোকে তাদের জন্য নির্ধারিত আছে জাহান্নামের আগুন| তবে কি এই বিভাগে ভর্তি হয়ে ভুল করলাম| আমার তরুণ মনে কেমন ভয়-ভয় লাগে| বিভাগের শ্রেণিকক্ষ, সহপাঠী, শিক্ষক, ক্যাফেটেরিয়া, চারপাশের পরিবেশ কোনো কিছুকেই সহজভাবে বা আপন করে নিতে পারি না|

মধ্য ডিসেম্বর শীতের সকাল| চতুর্থ দিন ক্লাসে গিয়ে দেখি নতুন একটি ছেলে বসে আছে, তখন কেবল দু-একজন ক্লাসরুমে আসতে শুরু করেছে| ঘরটা প্রায় ফাঁকাই| ছেলেটির মুখে দাড়ি, পরনে রুচিশীল পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় টুপি ও পাগড়ি| গা থেকে আতরের মৃদু গন্ধ আসছে| আমি ওর পাশে বসে বলি, ‘আপনি কি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?’

‘হ্যাঁ, আমি এই ক্লাসেরই| ফিলোসফি, ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস না এটা?’ ছেলেটির চেহারায় জড়তা ও সংশয়ের ভাব|

সঙ্গত কারণেই, মানে সহপাঠী বলে আমি ‘তুমি’-তে চলে আসি| ‘কিন্তু তোমাকে তো আগে দেখিনি? আজই প্রথম এলে?’

‘হ্যাঁ বাড়ি থেকে আগে আসতে পারিনি, মা অসুস্থ ছিল তাই|’

‘তোমার মা এখন ভালো আছেন?’

‘অনেকটাই|’

‘তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে| তোমার মতো কাউকেই যেন আমি খুঁজছিলাম|’

‘কেন? কী রকম?’

‘তুমি ধার্মিক, নামাজ পড়ো| এই ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে| দেখ চারিদিকে সবাই কেমন অস্থির-চঞ্চল, তুমি শান্ত, ধীরস্থির| আমার নাম আবরার হোসাইন, তোমার নাম?’

আমি হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিই|

‘আমার নাম জাকারিয়া, বাড়ি মধুপুর, টাঙ্গাইল|’

আমাদের কথা চলতে-চলতে কয়েক মিনিটের মধ্যে ছাত্রছাত্রীতে ক্লাসরুম ভর্তি হয়ে যায়| আমি জাকারিয়ার পাশে বসেই সেদিনের ক্লাসগুলো করেছিলাম|

প্রথম ক’দিন কিছু আলাপ হলেও জাকারিয়ার সাথে অবশ্য আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি| তবে একই আবাসিক হলে থাকায় প্রতিদিন কয়েকবার সাক্ষাৎ হতো| দর্শন পড়লেও ওর চিন্তাশক্তি কেমন একটু স্থূল মনে হতো আমার কাছে| শিল্প-সাহিত্যে কিংবা জীবনের বিচিত্র জিজ্ঞাসায় আমার যে-আগ্রহ ওর ভেতর তার ছিটেফোঁটা নেই| দ্বিতীয় বর্ষেও পিকনিক থেকে ফেরার পর জাকারিয়ার ভেতর একটু পরিবর্তন টের পাই| সে দাড়ির দৈর্ঘ্য একটু-একটু করে কমিয়ে এক বিঘত থেকে দু-তিন ইঞ্চিতে নামিয়ে এনেছে| পাঞ্জাবি-পাজামার বদলে শার্ট-প্যান্টও পরছে মাঝে-মাঝে|

সে-বার কী-একটা কারণে বিভাগে ৫-৬ দিন ক্লাস বন্ধ ছিল, এই ফাঁকে জাকারিয়া বাড়ি চলে গিয়েছিল| শনিবার ফিরে সন্ধ্যার দিকে আমার রুমে একবার ঢুকে বলল, ‘আবরার পড়তে বসবে এখন?’

আমি বলি, ‘না, জরুরি কোনো পড়া নেই| আরও পরে বসব| তুমি এসে বসো|’

জাকারিয়া ইতস্তত করে বলে, ‘না, ঠিক আছে| একটা কথা ছিল| পরে বললেও হবে|’

আমি বুঝতে পারি, আমার রুমমেটের উপস্থিতিতে জাকারিয়া তার কথাগুলো বলতে চাইছে না|

রাতে ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে না ফিরে আমি জাকারিয়ার ২০৫ ন¤^র কক্ষে ঢুঁ দিই, ও কী বলতে চায় আমার শোনা উচিৎ| আমাকে দেখে তার দৃষ্টিতে এমন একটা ভাব ফুটে ওঠে সে যেন আমার প্রতীক্ষাতেই ছিল| যদিও মুখে কেবল বলে, ‘আবরার, এসো বসো|’

তখন ˆজ্যষ্ঠ মাস| জাকারিয়া মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খালি গায়ে বসেছিল, আমি ওর কাছেই বসে পড়ি| ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখো তো আমার চেহারাটা কি কালো হয়ে গিয়েছে?’

আমি কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলি, ‘গ্রামে ছিলে, রোদে ঘুরাঘুরি করেছ, আজ আবার জার্নি— একটু গ্লুমি তো লাগছেই|’

‘সে-সব নয়| চেহারায় কোনো পাপকর্মের ছাপ পড়েছে মনে হয়?’

‘কী বলো— পাপ কীসের? তুমি কি পাপ করবার মানুষ?’

‘এবার বাড়িতে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে|’ বলে জাকারিয়া দৃষ্টি নামিয়ে মেঝের দিকে তাকায়|

আমি কৌতূহল নিয়ে বলি, ‘কী?’

‘আমার চাচাতো বোনের মেয়ে তুলিকা ক্লাস টেনে পড়ে, দেখতে-শুনতে বেশ| গড়ন খুব ভালো| আপার অনুরোধে আমি ওকে দিনের বেলা এই ক’দিন ইংরেজিটা দেখিয়ে দিয়েছি|’

‘সে তো ভালো কথা|’

এরপর জাকারিয়া যা বয়ান করল তার সারমর্ম হলো, তুলিকাই তাকে আহ্বান করেছিল রাত সাড়ে দশটার দিকে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, গলি পেরিয়ে তার ঘরের পেছন দরজায় গিয়ে যেন দাঁড়ায়| জাকারিয়া সেদিন সন্ধ্যা থেকে নিজের সাথে যুদ্ধ করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে আধা মাইল পথ অন্ধকারে পাড়ি দিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিকই ওই দরজার সামনে| দু’মিনিট না-পেরোতেই প্রায় নিঃশব্দে খুলে গিয়েছিল সেই রাত-দরজা| জাকারিয়া ভগ্নিকন্যা তুলিকার আঙুল ধরেছিল, শেষ অবধি চূড়ান্ত পতন| একটি নয়, তিনটি রাত কেটেছে এই অবিশ্বাস্য স্বপ্নময়তায়, অনিবার্য দুঃস্বপ্নে| সবকিছু এত নিপুণ সতর্কতায় ঘটেছে আশপাশের কেউ কিছু টের পাওয়া তো দূরে থাক, সন্দেহ করারও সুযোগ পায়নি|

নিকোলাসের সাথে আলাপ করতে-করতে আমার মনে হয় এসব ঘটনা এদেশে হলে জাকারিয়ার মতো পাপবোধ সৃষ্টি হবার ব্যাপারটি অবান্তর হতো| অথচ জাকারিয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল তার মুখ পাপের কারণে কোনো কালিমা চিহ্ন বহন করছে কিনা| তাহলে নৈতিকতা আর পাপপুণ্যেও বিষয়টি এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কতটা আপেক্ষিক! ক্যাম্পাস ছাড়ার পর জাকারিয়ার সাথে বিগত ৯-১০ বছরে আর কখানো দেখা হয়নি| তবে বছরখানেক আগে ফেসবুক-লাইভে ওকে দেখা গিয়েছে| লাইভটা ও নিজে করেনি| করেছিল আমাদেরই আরেক বন্ধু মিনহাজ| উপলক্ষ্যটা অবশ্য খুব কষ্টের| সমাজবিজ্ঞানের আমাদের অকালপ্রয়াত বন্ধু শিমুল দত্তের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি দেখানো হচ্ছিল| শিমুল বেশ ভালো একটা বিদেশি এনজিওতে বড় পদে চাকরি করত| বিয়ে করলেও সংসার টেকেনি দু’বছরের বেশি| তিন মাসের বাচ্চা নিয়ে বৌটা বাপের বাড়ি গিয়ে আর ফেরেনি| তারপর থেকে শিমুলের ড্রিংক করবার পুরনো অভ্যাসটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে| নিত্য-নতুন নারী-শরীরের আকাঙ্ক্ষায় অজায়গায়-কুজায়গায় অবাধ বিচরণ শুরু করে| ওর মাত্র ৩৪-৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত পানাসক্তি| সে যা-ই হোক, শিমুলের শেষকৃত্যে জাকায়িরাকে দেখা গেল লাইভে| ক্যাম্পাস জীবনে ওরা ভালো বন্ধু ছিল কিনা সে তথ্য আমার কাছে নেই| জাকায়িরার দাড়ি আছে, তবে সব সময় বোধহয় এখন আর টুপি পরে না| চিতার পাশে আনুষ্ঠানিকতায় শিমুলের বৃদ্ধ বাবা, ছোট ভাই, আর কয়েকজন হিন্দু বন্ধুই ছিল| চিতা দাউ-দাউ করে জ্বলতে শুরু করার খানিক পর ভয়ার্ত জাকারিয়াকে কাঁদতে দেখে আমি ওপাশ থেকে অবাক হই, হয়তো প্রত্যক্ষদর্শী যারা তারাও অবাক হয়েছিল|

আমার খুব কৌতূহল হয় জাকারিয়ার ওই আচরণের কারণ জানতে| কিন্তু ওর ফোন ন¤^র আমার কাছে ছিল না, গণিতের বন্ধু ব্যাংক অফিসার মনিরের কাছ থেকে ন¤^রটা নিয়ে ঘটনার তিনদিন পর আমি জাকারিয়াকে ফোন দিই|

আমার ন¤^র ওর কাছে সেভ ছিল| রিসিভ করে বলে, ‘বন্ধু আবরার কেমন আছো?’

‘ভালো, তোমার কেমন চলছে? বহুদিন পর তোমার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে ভালে ালাগছে|’

‘আছি এক রকম|’

‘আচ্ছা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’

‘বলো|’

‘শিমুলের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তোমার কী হয়েছিল?’

‘কেন? তুমি কী করে জানলে— কেউ কিছু বলেছে— তুমি তো ওই দিন ময়মনসিংহ ছিলে না|’

‘আমি ফেসবুক লাইভটা দেখেছিলাম, তোমার রিঅ্যাকশনটা আমার কাছে ঠিক স্বাভাবিক লাগেনি|’

‘তুমি ভিডিও দেখেও টের পেয়েছ তাহলে? আমি কাউকে বলিনি এ পর্যন্ত| তুমি জিজ্ঞেস করলে যেহেতু তাহলে শোনো|’

জাকারিয়া বিষয়টির যে-ব্যাখ্যা আমার কাছে দিয়েছিল তা হলো— শিমুলের চিতা জ্বলে ওঠার খানিক পর সে দেখতে পায় কালো ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে| একটু বাদেই ধোঁয়া নানা মূর্তির আকৃতি নিতে থাকে| ‘এক সময় মনে হলো ধোঁয়া জমাট বেঁধে দানবের আকার ধারণ করে আমার দিকে ধেয়ে আসছে| দানবটা দু হাত দিয়ে আমার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করবার চেষ্টা করছে| তুমি বোধহয় ভিডিওতে আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে| সবাই ভেবেছিল শিমুলের লাশ পোড়ানোর দৃশ্য আমি হয়তো সহ্য করতে পারছি না, কিন্তু ভেতরের রহস্য কাউকে বলিনি| আমি তিনদিন ধরে ওই ধোঁয়া মূর্তির কোনো ব্যাখ্যাও খুঁজে পাইনি|’

‘আচ্ছা তুমি ছাড়া আর কেউ ধোঁয়ার ওই বিশেষ কুণ্ডলি দেখতে পেয়েছিল?’

‘ধোঁয়টা তো স্বাভাবিক কিন্তু আমি যে-দানবটাকে দেখেছি তা তো আর কেউ দেখেনি| উপস্থিত সকলে দেখলে নিশ্চয়ই একটা সোরগোল পড়ে যেত| শোনো বন্ধু, তোমাকে একটা অনুরোধ করি|’

‘বলো বন্ধু!’

‘আমি বিশ^বিদ্যালয়ে তোমাকে একটি বিশেষ ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করেছিলাম, তুমি সেকথা বলোনি তো কাউকে?’

আমার বুঝতে মোটেই বিলম্ব হয় না জাকারিয়া কোন বিষয়ের কথা বলছে| ‘না, বন্ধু| একাবারেই না|’

‘শোনো, প্লিজ তুমি ঘুণাক্ষরেও যেন এসব কাউকে জানতে দিও না|’

নিকোলাস একটা ফোন পেয়ে হঠাৎ বাড়ি চলে গিয়েছিল| ফিরে আসে ৯ দিন পর| আমার সাথে দেখা তারও দুদিন বাদে| এবার সে কেমন বিষণ্ন-ক্লান্ত-গভীর| আমি বললাম, ‘তুমি ঠিক আছো নিকোলাস?’

‘না, একটা শোকের ঘটনা পেরিয়ে এলাম| এসে আরেকটি ঝামেলার ইঙ্গিত পাচ্ছি|’

‘আমাকে বলা যাবে?’

‘বাড়ি গিয়েছিলাম জানো তো, আমার বড় বোনের ১১ বছর বয়সী মেয়েটা গলায় খাবার আটকে মারা গিয়েছে| তুমি ভাবতে পারো এমন মৃত্যুও মানুষের হয়|’

‘ওহ, কী ভয়ানক!’

‘ভাগ্নির মৃতদেহ দেখার পর থেকে আমি আর স্বাভাবিক হতে পারছি না| জানো, ওর জন্মের পর প্রথম আমিই কোলে নিয়েছিলাম| আমাদের সেই ছোট্ট এমিলিয়া!’

নিকোলাসের ধরা কণ্ঠ শুনে, চোখের কোনায় অশ্রুর ইঙ্গিত দেখে মনে হয় এই যুবককে কি আমি আগে চিনতাম|

‘আসলেই, এমন মৃত্যু সহ্য করা কঠিন|’

‘আমার বোধহয় মাস্টার্সটা শেষ করা হবে না, সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব| তার আগে তোমাকে সাথে নিয়ে একবার এডোয়ার্ড স্মিথের সাথে শেষ-দেখা করতে চাই|’

এডোয়ার্ড স্মিথ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র প্রফেসর, আমাদের দুজনেরই কোর্স শিক্ষক| ব্যক্তিত্ব, সততা, আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা আর মহানুভবতায় এই ক্যাম্পাসে অনন্য বলে অধিকাংশ ছাত্র তাকে ‘সেইন্ট স্মিথ’ বলে চেনে| আমি নিজে একাধিক ঘটনায় টের পেয়েছি স্মিথ আসলে মহামানব টাইপের একজন মানুষ| কেবল পড়াশোনা নয়, ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিগত অনেক সমস্যার সমাধান দেন বলে সবাই তাকে বিশেষ ভক্তি করে| লোকে বলে তার নাকি বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাও আছে| 

‘তোমার দ্বিতীয় সমস্যাটা কি শুনতে পারি?’

‘হ্যাঁ, সে-জন্যই আমি একটু স্মিথের সাথে পরামর্শ করতে চাই| তোমাকে বলতে দোষ নেই, আমি যেদিন বাড়ি থেকে ফিরে আসি সেই রাতেই জেনিফার সুইসাইডের চেষ্টা করেছিল| এ-যাত্রা এক প্রকার যুদ্ধ করে ওকে ফেরানো গিয়েছে| কিন্তু আমি তো রীতিমত আতঙ্কের ভেতর আছি| মনে হচ্ছে সবকিছু ছেড়েছুড়ে এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি|’

জেনিফার হলো নিকোলাসের তিন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর অন্যতম| ও মূলত আইরিশ মেয়ে, নিকোলাস বলেছিল সে ভীষণ ইমোশনাল আর খামখেয়ালি| ও কি তাহলে নিকোলাসের অন্য দুই বান্ধবী বিষয়ে সিরিয়াসলি জেলাস হয়ে পড়েছে? সে চাচ্ছে নিকোলাস কেবল তারই হবে? আমি নিশ্চিত নই সমস্যাটা আসলে কী| এদের এই জাতীয় কালচারের গভীরে তো আমি ঢুকিনি কখনো|

‘স্মিথের কাছে কি আজই যেতে চাও?’

‘আমি ফোন দিয়েছিলাম| আজ তিনি বিজি, কাল সকাল সাড়ে নটায় আমাকে সময় দিয়েছেন|’

পরদিন স্মিথের সাথে দেখা করার আগে নিকোলাস আর আমি নয়টার দিকে লাইব্রেরির সামনের লনে এক হই| আমি খেয়াল করি ওর চোখ লাল, ঝোঝা-ই যায় রাতে ঘুম হয়নি| আমি না-বলে পারি না, ‘তোমার কী হয়েছে নিকোলাস?’

‘রাতে প্রথম এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম| কী-এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেল| ¯^প্নটা ভয়েরও বলতে পারো|’

‘একট বিস্তারিত বলো তো!’

‘ঘুমের ভেতর দেখছি আমি খুব প্রাচীন এক গ্রেভ ইয়ার্ডে, আমার নিজের শহরে| কারো কবরে ফুল দিতে গিয়েছি, হতে পারে সদ্যপ্রয়াত ভাগ্নি এমিলিয়ার কবরে| হঠাৎ উপরে তাকিয়ে দেখি আমার মাথার উপর কালো মেঘ, অথচ একটু আগেই আকাশ ছিল ঝকঝকে| দুরাত্মা মেঘগুলো জমা হয়ে মুহূর্তে একটা  দৈত্যের আকৃতি নিল| নির্জন কবরস্থানে ভয় পেয়ে আমি দ্রুত বেরিয়ে আসবার পথ ধরি| ঊর্ধ্বশ্বাসে সে দৌড়াচ্ছি কিন্তু দৈত্যটা আমাকে ধাওয়া করে আমার টুঁটি চেপে ধরল| এরপর সারারাত আর ঘুমতে পারিনি| যতবার চোখ একটু লেগে এসেছে অমনি ওই স্বপ্নটা হানা দেয়ার চেষ্টা করেছে| এ কী সমস্যায় পড়লাম বলো তো আবরার| এমন বিটকেল স্বপ্ন কি তোমার কখানো হয়েছে? কী মানে এ-সবের— আমি কি সাইকো-প্যাশেন্ট হয়ে গেলাম| এই দুটো সপ্তাহের ভেতর আমার জীবনটা এমন হয়ে যাবে কখনো কি তা ভেবেছি!’

নিকোলাসের কথা শুনতে শুনতে আমি আবারও ভাবি পৃথিবীর দুই প্রান্তের, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন পরিবেশের দুজন মানুষ| অথচ তারা প্রায়ই একই ধারার একটা দুঃস্বপ্ন দ্বারা তাড়িত হলো| অবশ্য জাকারিয়া ওই ধোঁয়ার দৈত্য প্রথম দেখেছিল জাগ্রত অবস্থায়ই| পরে কি সে দৈত্যের তাড়না থেকে মুক্তি পেয়েছিল? পেলে কীভাবে— তা জানলে আমি নিকোলাসকে এখন বলতে পারতাম| অবশ্য স্বয়ং জাকায়িরাকে আজও সেই দৈত্যটা ধাওয়া করে কিনা তাও তো আমি নিশ্চিত নই| আবার একদিন ফোন করে ওর কুশলাদি জানা দরকার|

স্মিথকে নিকোলাস তার সমস্যার কথা বললে খানিক নীরব থেকে স্মিথ বলেন, ‘তুমি কি জেনিফারকে নিয়ে সেটেল করতে পারবে?’

‘না, সেটা বোধহয় সম্ভব নয়|’

‘তাহলে কি নিউ ফাউন্ডল্যান্ড থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত?’

‘তাছাড়া আর উপায় কী?’

‘তুমি মনে করো বাড়িতে গেলেই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারবে? জেনিফার কোনো পাগলামি করে ফেললে তোমাকেও হয়তো খুঁজে বের করা হবে, তাই না?’

‘কিন্তু এর জন্য আমি কি দায়ী?’

‘এর উত্তর আমি তোমার উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি| আমরা কি সবকিছু আইন দিয়ে জাস্টিফাই করতে পারি? আমাদের বোধবুদ্ধি কি আইন-কানুনের চেয়ে সূক্ষ্ম ও গভীর নয়?’

স্মিথের রুম থেকে বের হয়ে নিকোলাস উষ্মা প্রকাশ করে বলে, ‘তোমরা অহেতুক তাকে সেইন্ট বলে ডাক| তিনি পারলেন কোনো সমাধান দিতে? আমি জানতাম পারবেন না|’

আমি বলি, ‘সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান থাকে না, অপেক্ষা করতে হয়| এখন হয়তো সমাধান মিলছে না কদিন পরে হয়তো দেখলে পরিস্থিতি তোমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে|’

‘আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছ?’

‘না, তবে আমার বিশ^াস ˆধর্য ধরলে সব ঠিক হয়ে যাবে|’ খানিক নীরব থেকে প্রসঙ্গ অন্যদিকে নিতে বলি, ‘তোমার তো সকালের নাস্তা করা হয়নি, চল বসি কোথাও|’

‘না, আমার কোনো খিদের অনুভূতি কাজ করছে না| তোমার আপত্তি না-থাকলে চলো ওই লেকের ধারটাতে নিরিবিলি একটু বসি|’

নিকোলাসের কথামতো খানিক পথ এগোবার পর আমরা দেখি মেরুন জ্যাকেট পরে লম্বা চুল দুলিয়ে জেনিফার আসছে| ও কাছাকাছি এসে বলে, ‘নিকোলাস তোমার সাথে আমার কথা আছে|’

আমি পরিস্থিতি বুঝে ভদ্রতার খাতিরে দূরে গিয়ে দাঁড়াই|

দূর থেকে বোঝা যায় জেনিফার খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাতপা ছুড়ে কথা বলছে| তার সামনে নিকোলাসকে খুব অসহায় দেখায়|

আমি  ওদের থেকে আরও খানিকটা দূরে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসে থাকি| নিকোলাসকে না-বলে চলে যাওয়া ঠিক হবে না বলে অন্য দিকে দৃষ্টি রেখে অপেক্ষা করতে থাকি| কয়েক মিনিট পর ওদের দিকে তাকাই, কথা শেষ হলো কিনা| কিন্তু তখনও সম্ভবত জেনিফার উত্তপ্ত ভঙ্গিতে কথা বলে চলেছে| ওদের পেছনে কী-একটা বিশেষ চলমান দেখে চোখ কচলে আরার তাকাই| লেকের জল থেকে ছাইরঙের ধোঁয়া উঠে ওদের দুজনের মাথার উপর ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে| আমার কৌতূহল হলো : ধোঁয়ার স্বরূপ উদঘাটন করা দরকার| কিন্তু এই মুহূর্তে ওদিকে যাওয়া সম্ভব নয়| আমি দু মিনিট অন্যদিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে আবার নিকোলাস ও জেনিফারের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখি ধোঁয়া দিব্যি একটি ˆদত্যের মূর্তি ধারণ করেছে| ওটা কি বাতাসে ভেসে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে| আমার একটু ভয়-ভয় করতে থাকে| কিন্তু আমার ভয় পাওয়ার কি কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে? আমি আনমনে বসা থেকে উঠে দাঁড়াই| নিজেকে বলি জাকায়িরা বা নিকোলাস ও-সব ফালতু ধোঁয়াটোয়া দেখে ভয় পেতেই পারে| আমি কেন ভয় পাব?

তখন পেছন থেকে কে যেন ভারি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘সত্যিই কি ভয়ের কোনো করাণ নেই, বুকে হাত দিয়ে বলো তো?’

এটা কার কণ্ঠ হতে পারে নিকোলাস তো নয়, তাহলে কি ওই ছায়ামূর্তির? ও আমার নিঃশব্দ স্বগতোক্তি কীভাবে শুনতে পেল?

আমি ভয়ে পেছনে তাকাতে পারি না| নিকোলাস এখনো আসছে না কেন?

বেশ খানিকটা সময় বাদে আমার শ্বাসকষ্টের মতো লাগে| আমি হাঁপাতে-হাঁপাতে ঘাসের উপর বসে পড়ি, তারপর শুয়ে থাকি আকাশের দিকে তাকিয়ে| তখন টের পাই আমি আসলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দৌড়চ্ছিলাম, আনমনে হয়তো কিছু না-ভেবেই, হয়তো ভয়ে| কই, আমার চারপাশের আকাশে এখন কোনো ধোঁয়ামূর্তি তো নেই! কিন্তু আমি দৌড়লাম কেন? আমার ভয় পাওয়ার কি কোনো কারণ আছে?

ক্যাফে থেকে নাস্তা সেরে নিজের ঘরে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিই| ক্লান্ত মন নিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বিক্ষিপ্ত কী-সব ভাবতে থাকি| ১৮ বছর আগে বিশ^বিদ্যালয়ে দর্শন পড়তে শঙ্কা হয়েছিল আমার, নানা রকম সংশয় ও জিজ্ঞাসা শেষে আমার অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলতে পারে| একবার ভেবেছিলাম এলাকায় ফিরে গিয়ে কলেজে বিএ-তে ভর্তি হই| কী দরকার অস্তিত্ব খুঁড়ে এত জ্ঞান অর্জনের? পরে অবশ্য ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিলাম| শুধু মানিয়েই নিইনি| বিভাগে সেরা ফলাফল করে শেষ পর্যন্ত আজ গবেষণা করতে সুদূর কানাডায়| এই কদিনে দেখলাম জাকারিয়া থেকে নিকোলাস, ময়মনসিংহ থেকে কানাডার নিউ ফাউন্ডল্যান্ড— মানুষের অভিজ্ঞতা আর কল্পনার কত ˆবচিত্র্য, কত মিল! একই সংশয়, একই অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা| ছাদের সাদা রঙ ভেদ করে হঠাৎ আমার সামনে কিছু মানুষের নারী ও পুরুষের অনেকটা অশরীরী ছায়া ভেসে ওঠে| কেউ জীবিত, কেউ মৃত— কিন্তু এরা সবাই যেন আমার বিপক্ষে কোনো সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত| আর ছাদে ছাই রঙের ওগুলো কী? আবার সেই কালো ধোঁয়া! কুণ্ডলী পাকিয়ে বিশেষ আকৃতি নেয়ার চেষ্টা করছে| এরা কেন আমার পিছু ছাড়ছে না? তবে কি দেশে ফিরে যাব ডিগ্রি না-নিয়েই? যাওয়া যেতে পারে| ডিগ্রির চেয়ে স্বস্তি ও সুস্থিরতা জরুরি| আমি ছাদ ফুঁড়ে বের-হওয়া মানুষগুলোর চেহারা স্পষ্ট বুঝবার চেষ্টা করি— ওরা কী আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চায়? বরং ফিরে যাব দেশে| স্ত্রী-পুত্রের দীর্ঘ বিচ্ছেদ আর প্রবাসের নিঃসঙ্গতাই হয়তো আমাকে অপ্রকৃতিস্থ করে তুলছে| ওসব ছায়াটায়া কিছু নয়| আপনজনের কাছে দেশে ফিরে যাব| কিন্তু ওই অস্পষ্ট মুখচ্ছবি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে মুক্তি পাব তো? একবার পিছু নিলে মুক্তি মেলে কি? জানি না| এতটা বছর দর্শনশাস্ত্র পাঠ একেবারেই বৃথা| জানি না, আমি আসলে কিচ্ছু জানি না| এই ধোঁয়া-কুণ্ডলীর কী জবাব দেবে শাস্ত্র? আসলে কেউ কিচ্ছু জানে না| নিকোলাস ফিরে যাচ্ছে| আমিও ফিরব| 

প্রত্যাবর্তন তো অনিবার্য| কিন্তু ওই ছায়াগুলোর সাক্ষ্য থেকে মুক্তি পাব কি কোনোদিন? মহাকালের অন্যকোনো প্রান্তে? জানি না| আসলে কেউ কিচ্ছু জানে না! আমি বিছানা ছেড়ে দেয়ালের বড় আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই| শরীরটা সামান্য কাঁপছে| প্রতিবিম্বে নিজের চোখে চোখ রাখি| পাথরের মতো চোখজোড়া যেন ˆনঃশব্দ্যের ভাষায় বলে, ‘সকল কিছুই আমরা অবগত আছি, যেমন অবগত আছে তোমার ওই হস্ত ও চরণযুগল!’ 

ফিরে তো যেতেই হবে| ভেতরের মৃদুকম্পন সারি সারি পিঁপড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে আপাদমস্তক— আমার অস্তিত্ব জুড়ে কেবল হিম ছড়াতে থাকে!


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত