দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। প্রতিষ্ঠার পর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো প্রশাসনিক অস্থিরতা, শিক্ষক-কর্মচারী আন্দোলন আর চরম সেশনজট থেকে মুক্তি পায়নি। বারবার উপাচার্য পরিবর্তন হলেও শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ ‘সুবিধাভোগী বলয়’ ও তোষামোদকারী গোষ্ঠীকে দায়ী করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত সাতজন উপাচার্য দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন—প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনুর রশিদ খান, অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক, অধ্যাপক ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম, অধ্যাপক ড. সুচিতা শারমিন এবং বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পূর্ণকালীন নিয়োগ পাওয়া আগের ছয়জন উপাচার্যের মধ্যে চারজনই তাদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠেনি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চার বছরের স্নাতক শেষ করতে সময় লাগছে ছয় থেকে সাত বছর। মাহাবুব নামের এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বারবার উপাচার্য পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ওপর। দীর্ঘ সেশনজট এখন আমাদের জন্য মানসিক চাপের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমন্বয়ক সুজয় শুভ ও ভূমিকা সরকারসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, উপাচার্য পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের আশপাশে থাকা সুবিধাভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা অপরিবর্তিত থাকেন। তারা দ্রুত নতুন প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন। এই তোষামোদকারী বলয়ের কারণেই উপাচার্যরা মাঝেমধ্যে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন এবং পরে এর দায় নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়।
সম্প্রতি শিক্ষকদের পদোন্নতি নিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির সময় ৭২ জন শিক্ষকের প্রতীকী পদত্যাগ এবং শ্রেণিকক্ষে তালা দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশারফ হোসেনের মতে, বারবার উপাচার্য বদল হলেও সাধারণ শিক্ষার পরিবেশ ফেরেনি।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের দাবিগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি। তোষামোদকারীরা চারপাশে থাকাটা স্বাভাবিক, তবে তাদের অনৈতিক আবদার থেকে সচেতন থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করাই আমার মূল লক্ষ্য।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, বর্তমান উপাচার্য বরিশালের স্থানীয় হওয়ায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো স্থানীয় আবেগ ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন বলে আশা করা যায়।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে তোষামোদ ও সুবিধাবাদী সংস্কৃতির অবসান এবং নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার নিশ্চিত করার দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
আপনার মতামত লিখুন