সংবাদ

বর্ষার শুরুতে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

বর্ষার শুরুতে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে

  • ২৪ ঘন্টায় ৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৪
  • এডিস মশাসহ ঢাকায় ১৪ থেকে ১৬ ধরনের মশার কামড়ে অতিষ্ঠ মানুষ
  • আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত আরও বাড়বে

মেডিকেলের বারান্দায় স্বজনদের আহাজারি আর আইসিইউর বাইরে থমথমে নীরবতা যেন প্রতি বছরের এক চেনা কিন্তু নির্মম বাস্তবতা। বর্ষার শুরুতেই এডিস মশার ডানা ঝাপটানোয় একের পর এক নিভে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুর কামড়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও জন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগেই মারা গেছেন জন।

ছাড়া ঢাকা উত্তর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং ময়মনসিংহে জন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এই নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে, যার মধ্যে কেবল জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন।

২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১২৪: জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২৪ জন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৭ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৬, দক্ষিণ সিটিতে ১৭, খুলনা বিভাগে ১৪, রাজশাহী বিভাগে এবং ঢাকা ময়মনসিংহ বিভাগে জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুর এই মরণকামড় থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো বয়সীরাই। আক্রান্তদের মধ্যে বছরের শিশু রয়েছে জন, থেকে ১০ বছরের জন, এবং ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোর রয়েছে ১০ জন। তরুণদের মধ্যে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৩০ জন। ছাড়া ২৬ থেকে ৩০ বছরের ১২ জন এবং প্রবীণদের মধ্যেও আক্রান্তের হার উদ্বেগজনক। বছরের জানুয়ারিতে ,০৮১ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন আক্রান্ত হলেও জুনে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ,৭২৭ জনে। প্রতিদিন এই গ্রাফ কেবলই ঊর্ধ্বমুখী।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে পরিস্থিতি: বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক খ্যাতনামা কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, "এখন থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়বে। আগামী আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে আরও বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।"

তিনি এই মহামারি রুখতে ব্যক্তিপর্যায়ের সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, "ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নির্মূলে নিজ নিজ বাসাবাড়ি আঙিনা নিজেরাই পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এডিস মশার প্রজনন না হয়। এই জন্য এখন থেকে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।"

সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, "দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির জন্য আগাম ডেঙ্গু ওয়ার্ড বা বেড প্রস্তুত রাখতে হবে।" তিনি তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ক্ষুদ্র প্রাণী মশা পৃথিবীতে মানুষের জন্য বড় হুমকি।

জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৬৩ সালে ঢাকায় প্রথম এই রোগটি ধরা পড়ে, যা তখনঢাকা ফিভারনামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং বিজ্ঞানীরা একে ডেঙ্গু হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই বছর হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জন মারা যান।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতি। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো মশাবাহিত রোগগুলো আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এখন বড় হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জনসচেতনতার অভাবের ফলেই এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ফ্রিজ বা এসির ট্রে এবং বাসাবাড়িতে ড্রাম বা বালতিতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে। এখনই যদি আগাম কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬


বর্ষার শুরুতে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬

featured Image

  • ২৪ ঘন্টায় ৫ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৪
  • এডিস মশাসহ ঢাকায় ১৪ থেকে ১৬ ধরনের মশার কামড়ে অতিষ্ঠ মানুষ
  • আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত আরও বাড়বে

মেডিকেলের বারান্দায় স্বজনদের আহাজারি আর আইসিইউর বাইরে থমথমে নীরবতা যেন প্রতি বছরের এক চেনা কিন্তু নির্মম বাস্তবতা। বর্ষার শুরুতেই এডিস মশার ডানা ঝাপটানোয় একের পর এক নিভে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুর কামড়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও জন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগেই মারা গেছেন জন।

ছাড়া ঢাকা উত্তর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং ময়মনসিংহে জন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এই নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে, যার মধ্যে কেবল জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন।

২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১২৪: জ্যামিতিক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

হাসপাতালগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২৪ জন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৭ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৬, দক্ষিণ সিটিতে ১৭, খুলনা বিভাগে ১৪, রাজশাহী বিভাগে এবং ঢাকা ময়মনসিংহ বিভাগে জন করে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুর এই মরণকামড় থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো বয়সীরাই। আক্রান্তদের মধ্যে বছরের শিশু রয়েছে জন, থেকে ১০ বছরের জন, এবং ১১ থেকে ১৫ বছরের কিশোর রয়েছে ১০ জন। তরুণদের মধ্যে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৩০ জন। ছাড়া ২৬ থেকে ৩০ বছরের ১২ জন এবং প্রবীণদের মধ্যেও আক্রান্তের হার উদ্বেগজনক। বছরের জানুয়ারিতে ,০৮১ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন আক্রান্ত হলেও জুনে এসে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ,৭২৭ জনে। প্রতিদিন এই গ্রাফ কেবলই ঊর্ধ্বমুখী।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে পরিস্থিতি: বিশেষজ্ঞরা

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক খ্যাতনামা কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, "এখন থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত বাড়বে। আগামী আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে আরও বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।"

তিনি এই মহামারি রুখতে ব্যক্তিপর্যায়ের সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, "ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নির্মূলে নিজ নিজ বাসাবাড়ি আঙিনা নিজেরাই পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে এডিস মশার প্রজনন না হয়। এই জন্য এখন থেকে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।"

সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, "দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির জন্য আগাম ডেঙ্গু ওয়ার্ড বা বেড প্রস্তুত রাখতে হবে।" তিনি তার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ক্ষুদ্র প্রাণী মশা পৃথিবীতে মানুষের জন্য বড় হুমকি।

জনস্বাস্থ্যের বড় সংকট

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৬৩ সালে ঢাকায় প্রথম এই রোগটি ধরা পড়ে, যা তখনঢাকা ফিভারনামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং বিজ্ঞানীরা একে ডেঙ্গু হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই বছর হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জন মারা যান।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৬ প্রজাতির মশা শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ১৪ থেকে ১৬ প্রজাতি। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো মশাবাহিত রোগগুলো আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এখন বড় হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জনসচেতনতার অভাবের ফলেই এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ফ্রিজ বা এসির ট্রে এবং বাসাবাড়িতে ড্রাম বা বালতিতে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে। এখনই যদি আগাম কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত