অবশেষে সাবেক ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামানকে তিন দিনের রিমান্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট রাতে গুলশান থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে। ঐ দিন এক ডিবি কর্মকর্তা অবশ্য আরও বলেছিলেন ‘আমরা জানতে পেরেছি, গাজীপুরে সম্ভবত তার নামে খুনের মামলা আছে’। বাহবা দিতে হয় ঐ ডিবি কর্মকর্তাকে। ৫ আগস্টের দু’বছর পরে তিনি বলছেন, সম্ভবত (অর্থাৎ পুলিশ নিশ্চিত নয়) তার নামে গাজীপুরে খুনের মামলা আছে।
কাউকে রিমান্ডে নিতে হলে রেওয়াজ অনুযায়ী রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করে থাকেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামির মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে’। আখতারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে হাসি পেলো এ যুক্তির সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার আরও যুক্তি দেখে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাবি করেন, ‘আসামির হেফাজতে থাকা অবৈধ ককটেল বোমার উৎস সম্পর্কে তথ্য জানতে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন’। অর্থাৎ আক্তারুজ্জামানের হেফাজতে ককটেল বোমা রয়েছে। আর কতকাল আমাদের পুলিশ বিভাগের এ ধরনের পারংগমতা দেখতে হবে!
যতদূর জানি আখতারুজ্জামান আত্মগোপনে ছিলেন না। চলাফেরা সীমিত হলেও গুলশানেই তার আবাসস্থল ও ব্যবসা বানিজ্যকে কেন্দ্র করেই ছিলেন। আমার গুলশানস্থ চাকরিস্থলেও গল্প করার জন্য তিনি একদিন আসতে চেয়েছিলেন। আমি কি মনে করে যে সময় দেই নাই। যেহেতু তিনি ২০২৪ এ আওয়ামী লীগ থেকে নৌকায় নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন এবং ‘বিজয়ী’ হয়েছিলেন, সে সুযোগে ৫ আগস্টের আগে পরে তিনি অনেকটা স্বতন্ত্রই হয়ে যান। তিনি দলীয় নেত্রীর অনুমতি না নিয়ে বা অন্তত তাকে অবগত না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে জেনেছি।
পাঠকের বা পুলিশ কর্মকর্তাদের আগ্রহ জন্মাতে পারে, আমি আবার এতো সব কি ভাবে জানলাম! জানলাম যোগাযোগ ছিল বলেই। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারির দিনে এবং তার আগে পরে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো। ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের এক মাইলফলক হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। সে দিন যে স্ফুলিংগ সৃষ্টি হয়েছিল তা-ই ১৯৯০ - এ দাবানলে পরিণত হয়েছিল। ঐ সময়ে আমরা যারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সূচনা পর্বের নেতৃত্বে ছিলাম, তারা যে দলেই থাকি বা না থাকি আমাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ ছিলো ও আছে। বিগত দুই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলেও ঐ দুই দিন এবং আগে পরে তার সঙ্গে টেলিফোনে অনেক কথা হয়েছে। স্মৃতিচারণ ছাড়াও বর্তমান রাজনীতি বিরাজনীতি নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। সে সব কথা থেকেই এ সব জানা বা বোঝা। তিন চার মাস তার সঙ্গে কথা হয় না। এই সময়ে তার পূর্বের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে বলে তো মনে হয় না।
আখতারুজ্জামান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জাসদ ও পরবর্তীতে বাসদ-এ যুক্ত হয়ে। বাসদে বিভক্তির পরে তিনি যে অংশে ছিলেন তা ক্রমশ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি নীতি নির্ধারকদের পর্যায়ে তো ছিলেন না। তার রাজনৈতিক জীবন বিশেষ আলোচিত না হলেও ছাত্র আন্দোলনের জীবনটা কিন্তু খুবই বর্ণাঢ্য ছিল। সবে কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনে শামিল ছিলেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ সালে জগন্নাথ কলেজছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালে ডাকসু নির্বাচনে পরপর দুইবার জিএস এবং ১৯৮২ সনে ভিপি নির্বাচিত হন। ঐ একই সময়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার মোঃ ফারুক পর পর তিনবার ইকসু ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই দুই ছাত্র নেতা ছাড়া এতো অধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের মূল পদে বিজয়ের রেকর্ড বাংলাদেশে সম্ভবত আর কোনো ছাত্র নেতার নেই। খন্দকার ফারুক এবং পরবর্তীতে আমিও ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেয়ার পরে আরো কিছু দিন আখতারুজ্জামান ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আখতারুজ্জামান ও আমি সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ছিলাম এবং ১৯৮২ সনে একইসঙ্গে আমরা দুজন ঐ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ১৯৮২ সনের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে আমিও তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। তবে সখ্য গড়ে ওঠে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া ও সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে- যা আজও অব্যাহত আছে। আখতার ভাই বামপন্থি রাজনীতি পরিত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তিনি যে নিজ দলে স্বস্তি অনুভব করছেন না এটা বুঝতে পেরে, ছাত্র আন্দোলনের দিনগুলোতেই সেই ১৯৮৫ সালে আমি তাকে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত বামপন্থায় রাখা যায়নি। তার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সাথী মাহমুদুর রহমান মান্নাকেই তিনি অনুসরণ করেছিলেন এবং আওয়ামী লীগ দলকেই বেছে নিয়েছিলেন।
ফরহাদ ভাইয়ের নেতৃত্বগুনে তিনি মুগ্ধ ছিলেন এবং আমার সঙ্গে দেখা হলেই মৃত্যুর এতো বছর পরেও সে সব গল্প করতেন।
যাক সে সব কথা। মূল কথা হলো ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারের আমলেও আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণের খবর দেখে মনে হলো দেশে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার দূরস্ত। আওয়ামী লীগ দল- যে দল এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে সে দলে একটা সময় যুক্ত থাকাও কি অপরাধ? তিনি তো আওয়ামী লীগে নীতি নির্ধারকের কোনো আসনে ছিলেন না এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে আওয়ামী লীগের হয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নেও নামেননি। যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে মামলার এজাহারেও তার নাম নেই। দেশে বা সমাজে তার উপস্থিতি পছন্দ হচ্ছে না, তাই তিনি যুক্ত নন এমন একটি ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসাবে তাকে ফাঁসানো হলো। ইউনূস আমলের মতো নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি কি নির্বাচিত সরকারের আমলেও চলতে থাকবে? এত রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পরেও প্রতিহিংসামূলক মামলা ও আটকাদেশ যদি চলতেই থাকে তবে আওয়ামী লীগ আমলকে সমালোচনা করার নৈতিক ভিত্তিও কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ে।
আখতারুজ্জামান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছিলেন রণাঙ্গনের সৈনিক। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। ঐ সময়ে তাকে দীর্ঘদিন কারাবরণও করতে হয়েছে। তিনি শুধুমাত্র বিতর্কিত নির্বাচনেই এম.পি নির্বাচিত হন নি, ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেছিলেন। তাই আদালত প্রাঙ্গণে সরকারি পিপি যখন তাকে একজন ‘অবৈধ এমপি’ হিসেবে সম্বোধন করে প্রেস ব্রিফিং করলেন, তা তার জনপ্রিয়তা ও তার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে তাচ্ছিল্য করার সামিল। আশা করি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি লাভ করে আখতারুজ্জামান সুবিচার পাবেন। আর যদি প্রকৃতই সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ সহ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, বিচার কার্যক্রম চলুক; কিন্তু তিনি যেন জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। বিচারের নামে অবিচারের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
অবশেষে সাবেক ডাকসু ভিপি আখতারুজ্জামানকে তিন দিনের রিমান্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। গত ৫ আগস্ট রাতে গুলশান থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে। ঐ দিন এক ডিবি কর্মকর্তা অবশ্য আরও বলেছিলেন ‘আমরা জানতে পেরেছি, গাজীপুরে সম্ভবত তার নামে খুনের মামলা আছে’। বাহবা দিতে হয় ঐ ডিবি কর্মকর্তাকে। ৫ আগস্টের দু’বছর পরে তিনি বলছেন, সম্ভবত (অর্থাৎ পুলিশ নিশ্চিত নয়) তার নামে গাজীপুরে খুনের মামলা আছে।
কাউকে রিমান্ডে নিতে হলে রেওয়াজ অনুযায়ী রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করে থাকেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামির মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে’। আখতারুজ্জামানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে হাসি পেলো এ যুক্তির সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার আরও যুক্তি দেখে। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে দাবি করেন, ‘আসামির হেফাজতে থাকা অবৈধ ককটেল বোমার উৎস সম্পর্কে তথ্য জানতে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন’। অর্থাৎ আক্তারুজ্জামানের হেফাজতে ককটেল বোমা রয়েছে। আর কতকাল আমাদের পুলিশ বিভাগের এ ধরনের পারংগমতা দেখতে হবে!
যতদূর জানি আখতারুজ্জামান আত্মগোপনে ছিলেন না। চলাফেরা সীমিত হলেও গুলশানেই তার আবাসস্থল ও ব্যবসা বানিজ্যকে কেন্দ্র করেই ছিলেন। আমার গুলশানস্থ চাকরিস্থলেও গল্প করার জন্য তিনি একদিন আসতে চেয়েছিলেন। আমি কি মনে করে যে সময় দেই নাই। যেহেতু তিনি ২০২৪ এ আওয়ামী লীগ থেকে নৌকায় নির্বাচন না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন এবং ‘বিজয়ী’ হয়েছিলেন, সে সুযোগে ৫ আগস্টের আগে পরে তিনি অনেকটা স্বতন্ত্রই হয়ে যান। তিনি দলীয় নেত্রীর অনুমতি না নিয়ে বা অন্তত তাকে অবগত না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দলের সঙ্গে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে জেনেছি।
পাঠকের বা পুলিশ কর্মকর্তাদের আগ্রহ জন্মাতে পারে, আমি আবার এতো সব কি ভাবে জানলাম! জানলাম যোগাযোগ ছিল বলেই। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারির দিনে এবং তার আগে পরে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো। ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি, সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের এক মাইলফলক হিসেবে আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। সে দিন যে স্ফুলিংগ সৃষ্টি হয়েছিল তা-ই ১৯৯০ - এ দাবানলে পরিণত হয়েছিল। ঐ সময়ে আমরা যারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সূচনা পর্বের নেতৃত্বে ছিলাম, তারা যে দলেই থাকি বা না থাকি আমাদের মধ্যে একটা যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ ছিলো ও আছে। বিগত দুই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আখতার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না হলেও ঐ দুই দিন এবং আগে পরে তার সঙ্গে টেলিফোনে অনেক কথা হয়েছে। স্মৃতিচারণ ছাড়াও বর্তমান রাজনীতি বিরাজনীতি নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। সে সব কথা থেকেই এ সব জানা বা বোঝা। তিন চার মাস তার সঙ্গে কথা হয় না। এই সময়ে তার পূর্বের চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে বলে তো মনে হয় না।
আখতারুজ্জামান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জাসদ ও পরবর্তীতে বাসদ-এ যুক্ত হয়ে। বাসদে বিভক্তির পরে তিনি যে অংশে ছিলেন তা ক্রমশ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি নীতি নির্ধারকদের পর্যায়ে তো ছিলেন না। তার রাজনৈতিক জীবন বিশেষ আলোচিত না হলেও ছাত্র আন্দোলনের জীবনটা কিন্তু খুবই বর্ণাঢ্য ছিল। সবে কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনে শামিল ছিলেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ সালে জগন্নাথ কলেজছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালে ডাকসু নির্বাচনে পরপর দুইবার জিএস এবং ১৯৮২ সনে ভিপি নির্বাচিত হন। ঐ একই সময়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার মোঃ ফারুক পর পর তিনবার ইকসু ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই দুই ছাত্র নেতা ছাড়া এতো অধিকবার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের মূল পদে বিজয়ের রেকর্ড বাংলাদেশে সম্ভবত আর কোনো ছাত্র নেতার নেই। খন্দকার ফারুক এবং পরবর্তীতে আমিও ছাত্র আন্দোলন থেকে বিদায় নেয়ার পরে আরো কিছু দিন আখতারুজ্জামান ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আখতারুজ্জামান ও আমি সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ছিলাম এবং ১৯৮২ সনে একইসঙ্গে আমরা দুজন ঐ বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ১৯৮২ সনের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে আমিও তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলাম। তবে সখ্য গড়ে ওঠে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া ও সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে- যা আজও অব্যাহত আছে। আখতার ভাই বামপন্থি রাজনীতি পরিত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। তিনি যে নিজ দলে স্বস্তি অনুভব করছেন না এটা বুঝতে পেরে, ছাত্র আন্দোলনের দিনগুলোতেই সেই ১৯৮৫ সালে আমি তাকে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে শেষ পর্যন্ত বামপন্থায় রাখা যায়নি। তার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সাথী মাহমুদুর রহমান মান্নাকেই তিনি অনুসরণ করেছিলেন এবং আওয়ামী লীগ দলকেই বেছে নিয়েছিলেন।
ফরহাদ ভাইয়ের নেতৃত্বগুনে তিনি মুগ্ধ ছিলেন এবং আমার সঙ্গে দেখা হলেই মৃত্যুর এতো বছর পরেও সে সব গল্প করতেন।
যাক সে সব কথা। মূল কথা হলো ২০২৬-এ নির্বাচিত সরকারের আমলেও আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে প্রেরণের খবর দেখে মনে হলো দেশে আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার দূরস্ত। আওয়ামী লীগ দল- যে দল এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে সে দলে একটা সময় যুক্ত থাকাও কি অপরাধ? তিনি তো আওয়ামী লীগে নীতি নির্ধারকের কোনো আসনে ছিলেন না এবং জুলাই আন্দোলনের সময়ে আওয়ামী লীগের হয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিপীড়নেও নামেননি। যে মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে মামলার এজাহারেও তার নাম নেই। দেশে বা সমাজে তার উপস্থিতি পছন্দ হচ্ছে না, তাই তিনি যুক্ত নন এমন একটি ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসাবে তাকে ফাঁসানো হলো। ইউনূস আমলের মতো নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানি কি নির্বাচিত সরকারের আমলেও চলতে থাকবে? এত রক্ত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পরেও প্রতিহিংসামূলক মামলা ও আটকাদেশ যদি চলতেই থাকে তবে আওয়ামী লীগ আমলকে সমালোচনা করার নৈতিক ভিত্তিও কিন্তু দুর্বল হয়ে পড়ে।
আখতারুজ্জামান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছিলেন রণাঙ্গনের সৈনিক। এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে তিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। ঐ সময়ে তাকে দীর্ঘদিন কারাবরণও করতে হয়েছে। তিনি শুধুমাত্র বিতর্কিত নির্বাচনেই এম.পি নির্বাচিত হন নি, ১৯৯৬ সালে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি জয়লাভ করেছিলেন। তাই আদালত প্রাঙ্গণে সরকারি পিপি যখন তাকে একজন ‘অবৈধ এমপি’ হিসেবে সম্বোধন করে প্রেস ব্রিফিং করলেন, তা তার জনপ্রিয়তা ও তার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে তাচ্ছিল্য করার সামিল। আশা করি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে অব্যাহতি লাভ করে আখতারুজ্জামান সুবিচার পাবেন। আর যদি প্রকৃতই সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ সহ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, বিচার কার্যক্রম চলুক; কিন্তু তিনি যেন জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। বিচারের নামে অবিচারের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন