সংবাদ

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মৌলিক অধিকার


উজ্জ্বলেন্দু চাকমা
উজ্জ্বলেন্দু চাকমা
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মৌলিক অধিকার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সকলের মত দেশের আদিবাসীরা ভেবেছিল সকল বৈষম্য দূর করে তাদের ন্যয্য অধিকার বাস্তবায়ন করা হবে

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সকলের মত দেশের আদিবাসীরা ভেবেছিল সকল বৈষম্য দূর করে তাদের ন্যয্য অধিকার বাস্তবায়ন করা হবে কিন্তু আদৌতে যে লাউ সে কদুই রয়ে গেল। আদিবাসী শব্দটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে রয়েছে বিতর্ক ও আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রের রয়েছে আপত্তি। কিন্তু আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কিসের এত আপত্তি? পৃথিবীর শান্তির সংঘ যেটাকে বলা হয় জাতিসংঘ। সেই ‘জাতিসংঘ’ যখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই সমর্থন করেছিল। জাতিসংঘের রিপোর্ট মি. মাইগেইল এলফনস কভো তার গবেষণা পত্রে ‘স্টাডি অব দি প্রোব্রেল্মস অব সিক্রিমিনেশন এগেইনস ইন্দিজিনিয়াস পপুলেশন’- এ সকল জনগোষ্ঠিকে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করে স্বীকার করেছেন।   কিন্তু ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক সরকারি দলিলে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বা হয়ে আসছে।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এই অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক শাসনতান্ত্রিক ও আইনী দলিল হিসেবে স্বীকৃতি। উক্ত শাসন বিধির ৪, ৬, ৩৪ ও ৫০ প্রভৃতি ধারায় আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই শাসন বিধি তফসিলে আইনের মধ্যে দি ইন্দিয়ান ইনকাম টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯২২, দিন ইন্দিয়ান ফাইনেনস টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯৪১, দি ফরেষ্ট এ্যাক্ট অব ১৯৭২ প্রভৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ ছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা স্মারক নং- সংস্থাপন (এডি- ২)-৩৯/৯১-১৪৩ তারিখ-১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১। আদিবাসী জনগোষ্ঠির কনভেশনে ১৬৯ প্রসঙ্গে বিশেষ বিভাগে পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী ও উপজাতিদের জন্য চাকরির বয়স সীমায় স্বাভাবিক বয়স সীমায় তুলনায় দশ বছর এবং শ্রম সাধ্য কাজের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে।’ ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত ১২নং আইনেও এ আইনের কার্যকারিতার প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১২ জুলাই ১৯৯৫ লেখা সরকারি পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করা হয়। এমনকি ২০০০ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতীয় আদিবাসী সমন্বয় কমিটির প্রকাশনা ‘সংহতি- ২০০০’ এ প্রদত্ত বাণীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়াও বাংলাদেশে বিশ লাখ আদিবাসী রয়েছেন বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাহলে এখন কেন বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হিসেবে বলা হচ্ছে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও একইভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ‘সংহতি- ২০০৩’ এ প্রদত্ত বাণীতে আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে ওহফরমবহড়ঁং একটি জেনেরিক শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ২০০৭ সালে এটা গৃহীত হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। আমাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ব্রিটিশ আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ওহফরমবহড়ঁং ছিল, সমতলেও ছিল। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে যখন আদিবাসী বলা হলো, তখন তো কেউ কোনো সমস্যার কথা বলেনি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭২ সালে ওহফরমবহড়ঁং ধহফ ঞৎরনধষ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হং ঈড়হাবহঃরড়হ ১৯৫৭, ঈড়হাবহঃরড়হ ১০৭ ড়ভ ১৯৫৭ অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই। তখন কেউ সমস্যা দেখেনি। এখন কেন দেখছে? আশির দশকে জাতিসংঘে লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে আদিবাসী রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেও এটা বলা হয়েছে। গত কয়েক সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে প্রধানমন্ত্রীরা যে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছেন সেখানেও আমাদের আদিবাসী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে।  জাতিসংঘের স্পেসিলাইজ এজেন্সি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৫৭ সালের ইন্দিজিনিয়াস অ্যান্ড ট্রাবল পপুলেশন কনভেশন-১ (১০৭নং) অনুষ্ঠিত হয়। সেই কনভেশন-এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠির সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ বিকাশের বৃদ্ধি সাধন ও জীবন মানোন্নয়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো দায়িত্ব পালন করবে। অথচ বাংলাদেশ অন্য দেশের মতো জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছে। সেই বাংলাদেশ সরকার এখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি’ বলে হচ্ছে। তাতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে কিনা সন্দিহান। এছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী সর্ম্পকিত গ্রাফিতি সংবলিত মুছে ফেলানোর মতোও অপকর্ম করা হয়েছিল। যা ঢাকার রাজপথে আদিবাসী ছাত্রদের উপর হামলা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর অনুযায়ী প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৯০ হাজারের বেশি নৃগোষ্ঠীর বসবাস এবং সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। এই দেশের সব মানুষের সমান অধিকার এ কথাটি তখনই আমরা বিশ্বাস করব যখন ‘পার্বত্য চুক্তি’ যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে। খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় ত্রিপুরা আদিবাসী মা-বোন ওই কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হবে না (২৭ জুন ২০২৫)। সাঁওতালকে তার বাড়ি সামনে উন্নয়নের নামে ইকো নামে পার্ক দেখতে হবে না। কল্পনা চাকমার মতো সহজ-সরল কোন আদিবাসী মেয়ে নারী অপহৃত হবেন না, এমনকি আলফ্রেড সরেনের মতো কোন যোদ্ধা হত্যার স্বীকার হতে হবে না। লংগদু সুজাতা চাকমার মতো অকালে জীবন দিতে হবে না। আদিবাসীদের সংবিধানের অধিকারের বিষয়টির ব্যাপারে রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বিশেষে দেশের সিভিল সমাজ তথা সবাইকে ভাবতে হবে এবং সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শীঘ্রই আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। পর্যটনের নামে স্থানীয় আদিবাসীদের জায়গা দখল করা হবে না এটাই বর্তমান সদাশয় সরকারের কাছে প্রত্যাশা। পরিশেষে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সদাশয় সরকারের কাছে বিনম্রচিত্তে প্রত্যাশা রাখতে চাই- আমরা যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি, সমতলে গারো, সাঁওতালসহ প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষের জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করছি। এটা শুধু শব্দ নয়। এটা আমাদের আত্ম-পরিচয়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]  

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি মৌলিক অধিকার

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সকলের মত দেশের আদিবাসীরা ভেবেছিল সকল বৈষম্য দূর করে তাদের ন্যয্য অধিকার বাস্তবায়ন করা হবে কিন্তু আদৌতে যে লাউ সে কদুই রয়ে গেল। আদিবাসী শব্দটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে রয়েছে বিতর্ক ও আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রের রয়েছে আপত্তি। কিন্তু আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কিসের এত আপত্তি? পৃথিবীর শান্তির সংঘ যেটাকে বলা হয় জাতিসংঘ। সেই ‘জাতিসংঘ’ যখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই সমর্থন করেছিল। জাতিসংঘের রিপোর্ট মি. মাইগেইল এলফনস কভো তার গবেষণা পত্রে ‘স্টাডি অব দি প্রোব্রেল্মস অব সিক্রিমিনেশন এগেইনস ইন্দিজিনিয়াস পপুলেশন’- এ সকল জনগোষ্ঠিকে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করে স্বীকার করেছেন।   কিন্তু ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক সরকারি দলিলে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে বা হয়ে আসছে।

১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এই অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক শাসনতান্ত্রিক ও আইনী দলিল হিসেবে স্বীকৃতি। উক্ত শাসন বিধির ৪, ৬, ৩৪ ও ৫০ প্রভৃতি ধারায় আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই শাসন বিধি তফসিলে আইনের মধ্যে দি ইন্দিয়ান ইনকাম টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯২২, দিন ইন্দিয়ান ফাইনেনস টেক্স এ্যাক্ট অব ১৯৪১, দি ফরেষ্ট এ্যাক্ট অব ১৯৭২ প্রভৃতির ক্ষেত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ ছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা স্মারক নং- সংস্থাপন (এডি- ২)-৩৯/৯১-১৪৩ তারিখ-১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১। আদিবাসী জনগোষ্ঠির কনভেশনে ১৬৯ প্রসঙ্গে বিশেষ বিভাগে পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসী ও উপজাতিদের জন্য চাকরির বয়স সীমায় স্বাভাবিক বয়স সীমায় তুলনায় দশ বছর এবং শ্রম সাধ্য কাজের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে।’ ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত ১২নং আইনেও এ আইনের কার্যকারিতার প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ১২ জুলাই ১৯৯৫ লেখা সরকারি পরিপত্রেও আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করা হয়। এমনকি ২০০০ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে জাতীয় আদিবাসী সমন্বয় কমিটির প্রকাশনা ‘সংহতি- ২০০০’ এ প্রদত্ত বাণীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। তাছাড়াও বাংলাদেশে বিশ লাখ আদিবাসী রয়েছেন বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাহলে এখন কেন বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হিসেবে বলা হচ্ছে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও একইভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ‘সংহতি- ২০০৩’ এ প্রদত্ত বাণীতে আদিবাসী শব্দটি উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে ওহফরমবহড়ঁং একটি জেনেরিক শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ২০০৭ সালে এটা গৃহীত হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। আমাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

ব্রিটিশ আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ওহফরমবহড়ঁং ছিল, সমতলেও ছিল। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে যখন আদিবাসী বলা হলো, তখন তো কেউ কোনো সমস্যার কথা বলেনি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ১৯৭২ সালে ওহফরমবহড়ঁং ধহফ ঞৎরনধষ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হং ঈড়হাবহঃরড়হ ১৯৫৭, ঈড়হাবহঃরড়হ ১০৭ ড়ভ ১৯৫৭ অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সরকার। সেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই। তখন কেউ সমস্যা দেখেনি। এখন কেন দেখছে? আশির দশকে জাতিসংঘে লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে আদিবাসী রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতেও এটা বলা হয়েছে। গত কয়েক সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে প্রধানমন্ত্রীরা যে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছেন সেখানেও আমাদের আদিবাসী বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সমস্যা দেখা দিয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে।  জাতিসংঘের স্পেসিলাইজ এজেন্সি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১৯৫৭ সালের ইন্দিজিনিয়াস অ্যান্ড ট্রাবল পপুলেশন কনভেশন-১ (১০৭নং) অনুষ্ঠিত হয়। সেই কনভেশন-এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠির সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ বিকাশের বৃদ্ধি সাধন ও জীবন মানোন্নয়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো দায়িত্ব পালন করবে। অথচ বাংলাদেশ অন্য দেশের মতো জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য হিসেবে রয়েছে। সেই বাংলাদেশ সরকার এখন আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে উল্টো তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি’ বলে হচ্ছে। তাতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে কিনা সন্দিহান। এছাড়াও পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী সর্ম্পকিত গ্রাফিতি সংবলিত মুছে ফেলানোর মতোও অপকর্ম করা হয়েছিল। যা ঢাকার রাজপথে আদিবাসী ছাত্রদের উপর হামলা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর অনুযায়ী প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৯০ হাজারের বেশি নৃগোষ্ঠীর বসবাস এবং সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। এই দেশের সব মানুষের সমান অধিকার এ কথাটি তখনই আমরা বিশ্বাস করব যখন ‘পার্বত্য চুক্তি’ যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা হবে। খাগড়াছড়ির ভাইবোনছড়ায় ত্রিপুরা আদিবাসী মা-বোন ওই কিশোরী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হবে না (২৭ জুন ২০২৫)। সাঁওতালকে তার বাড়ি সামনে উন্নয়নের নামে ইকো নামে পার্ক দেখতে হবে না। কল্পনা চাকমার মতো সহজ-সরল কোন আদিবাসী মেয়ে নারী অপহৃত হবেন না, এমনকি আলফ্রেড সরেনের মতো কোন যোদ্ধা হত্যার স্বীকার হতে হবে না। লংগদু সুজাতা চাকমার মতো অকালে জীবন দিতে হবে না। আদিবাসীদের সংবিধানের অধিকারের বিষয়টির ব্যাপারে রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বিশেষে দেশের সিভিল সমাজ তথা সবাইকে ভাবতে হবে এবং সেই সমস্ত বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শীঘ্রই আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হোক। পর্যটনের নামে স্থানীয় আদিবাসীদের জায়গা দখল করা হবে না এটাই বর্তমান সদাশয় সরকারের কাছে প্রত্যাশা। পরিশেষে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সদাশয় সরকারের কাছে বিনম্রচিত্তে প্রত্যাশা রাখতে চাই- আমরা যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি, সমতলে গারো, সাঁওতালসহ প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষের জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করছি। এটা শুধু শব্দ নয়। এটা আমাদের আত্ম-পরিচয়।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: সভাপতি, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাজদ্বীপ, রাঙামাটি]  


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত