বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে আছি| শ্রাবণ মাস| বেশ কয়েকটি কাক ডেকে যাচ্ছে দূরে| এক ভিখারিনী কতক্ষণ ধরে এ-বাস, সে-বাস করে ভিক্ষে চাইছে| পাচ্ছেও টুকটাক| সাইড ব্যাগে থাকার মধ্যে একটা পাঁচশ’ টাকার নোট, একটা দু’শ’, একটা একশ’| কী মনে হলো একশ’ টাকাটা বের করলাম| বাড়িয়ে দিতেই ফিক করে হেসে বললো “অ পাগলি খুচরো দাও|”
বললাম
এটা রেখে দাও| সে
টাকাটা নিয়ে চলে গেলো
স্বাচ্ছন্দ্যে| রোদ, হর্ন, ধুলো,
লোকজন— সব ছাপিয়ে হঠাৎই
খানিকটা দূরে একটা কৃষ্ণচূড়া
গাছের নিচে দৃষ্টি পড়লো|
আশ্চর্য! ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে কেমন
যেন চেনা চেনা লাগছে!
পাশ থেকে একদম ঠিক
যেন রিয়াদের মতো| হুবহু| অমনই
শ্যামলা ও লম্বা গড়নের
মুখ| আর সেই চেনা
শান্ত চোয়াল| একটু গম্ভীর ও
গভীর চোখ, তরতরে নাক|
ঠিক এরকম একটা কালো
শার্টই আগে রিয়াদ প্রায়
পরত| কালো পরতে ভালোবাসে
সে| আমি নিজের অজান্তেই
অজানা কোনো উত্তেজনাবশত একটু
এগিয়ে গেলাম সেদিকেই| নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না| আরও একটু
এগিয়ে গেলাম| ছেলেটার সামনাসামনি যেতেই আমি নির্বাক| এ
কী! হুবহু মিল! হ্যাঁ এইতো...
এইই তো রিয়াদ!
কথা
বলতে যাব| পা বাড়ালাম|
অনেক... অনেক কথা জমা
আছে তোমার সাথে, অনেক কথা!ু
অমনি কোনো একটা অজানা
ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে| ভয়?
না, না-না, ইতস্ততা,
না-কি লজ্জা! অপরাধবোধ?
জানি না!
মনে
পড়ল কলেজের শেষ দিনে ওর
সাথে আমি একটাও কথা
বলিনি| ফিরেও তাকাইনি ওর দিকে| কষ্ট
হয়েছে খুব| তাও কথা
বলিনি| কেনো পারিনি, তার
কারণ হিসেবে আমি একটিমাত্র কারণকে
দাঁড় করাতে পারব না| অনেক
কারণ আছে| রিয়াদ ছেলেটা
একদম যেন চোরাবালির মতো|
ওর সাথে যে-ই
থাকবে, একটা মায়ায় গেঁথে
যাবে আত্মিকভাবে| হারিয়ে ফেলবে নিজেকে তাঁর ভেতর| তাঁর
সত্তায়| নিঃসীম নিঃস্বার্থতায়|
আমি
ফিরছি আমার জীবনসঙ্গী হৃদয়ের
অফিস থেকে| দু’বছর আগে
এমনই একটা দিনে ওর
সাথে আমার দেখা, আলাপ|
তারপর পারিবারিকভাবে বিয়ে| মায়ের অসুস্থতার বাড়বাড়ন্ত| ঋণের বোঝা আর
আমার পড়াশোনা| বাবা চলে যাবার
পর সমস্ত দায়ভার, সবটাই আমাদের মাথার ওপর এসে পড়েছিল|
আমি টুকটাক টিউশন পড়িয়ে যেটুকু পাই, আর ভাইয়ের
এনজিওর চাকরিটা থেকে যা আসত|
সেটুকুই তখন অবলম্বন| আমি
এমএ পাস করে চাকরি
খুঁজে খুঁজে পায়ের তলা ক্ষয় করে
ফেলেছিলাম| পাইনি| কোথাও কোনো কাজও জোটেনি|
কোত্থাও না| লোকের কটুকথায়
জীবন বিপর্যস্ত এক পাড়ভাঙা নদীর
মতো| একটা সময় কূলকিনারা
পাই| ছায়া পাই| সেটিই
ছিল হৃদয়| তখনই তাকে পেয়েছিলাম
আমি| যেন তৃষ্ণার্ত চাতকের
একপশলা ভরসার বৃষ্টি হয়ে এসেছিল সে|
দুঃখগুলোকে ভেঙেচুরে দেবার মতো একটা কাঁধ
পেলাম| পেলাম ওর কাছে ভরসার
হাত| পেলাম মায়ের মন ভালো করার
মেডিসিন| শুরু হলো নতুন
জীবন| আমার বাবারই একজন
কাছের বন্ধু ও সহকর্মীর ছেলেই
হৃদয়|
এখন
দুপুরের শেষ তপ্ত রোদ|
বেলা ফুরিয়েছে| রাস্তায় জ্যাম পড়েছে প্রচণ্ড| বাড়িতে মা একা| যেতে
হবে| একটা বাস এসে
দাঁড়িয়েছে সামনে| বাড়িতে ফেরার তাড়া একদিকে| কিন্তু
তারচেয়েও বেশি পালিয়ে যাবার
এক অসম্ভব ছটফটানি| এরচেয়েও ঢের বেশি বয়ে
চলা ঝড় বুকের ভেতরে
ঘূর্ণায়মান| তীব্র ভয়— যা ক্রমশ
বাড়ছে| বেড়েই চলেছে| যেন কালবৈশাখীর অবাধ
ঘূর্ণিঝড়| রক্তে অদ্ভুত একটা শীতলতা| হিম
হয়ে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে|
হৃৎপিণ্ড| আমি পা বাড়াবো
ঠিক এমন সময় কোনো
এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমায় থামিয়ে
দিলো| পা আড়ষ্ট হয়ে
থমকে গেলাম আমি| আমার দু’চোখ থমকে আছে
সেদিকে| আর পারলাম না
আমি রিয়াদকে দেখেও এড়িয়ে যেতে| আমি চকিতে পা
বাড়ালাম এবার সেদিকেই| একটা
নিঝুম দুপুরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা
শান্ত ছেলেটার দিকে| অথচ, আমি যে
শান্ত নই! পথটা যে
আজ শান্ত নয়! ভীষণ অশান্ত|
তবুও আমি অসাড় পায়ে
পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি| এগিয়ে চলেছি| বাসের দিকে নয়| উল্টো
দিকে| হাতের ঠিক ডানদিকটায় এগিয়ে
যাচ্ছি| আচ্ছা! কেমন আছে রিয়াদ?
একবার নাহয় ভুল করেই
সামনে গেলাম ওর! করলাম ই
বা একটা দুঃসাহস!
কীইবা এমন বলবে? খুব
জোর শান্ত মুখে তাকিয়ে বলবে,
“কেমন আছ!” এটুকুই| আমি
জানি|
সেদিকে
এগিয়ে যেতেই দেখি একটা মহিলা
এসে দাঁড়ালেন রিয়াদের পাশে| কে ইনি? ওর
মা? হ্যাঁ| একবার দেখেছিলাম কলেজে| সেইযে সেই সময়ে| এক বর্ষামুখর দিনে,
কলেজে ছেলের সাথে এসেছিলেন তিনি,
কলেজের মাঝামাঝি সময়ে| তখনই দেখেছি তাকে|
কাঁপা
কাঁপা কণ্ঠে অথচ বেশ উচ্ছ্বসিত
হয়ে ডেকে উঠলাম,“রিয়াদ!”
ভদ্রমহিলা
এবার আলতো চোখে তাকালেন
আমার দিকে| আমি আরো এগিয়ে
যেতে লাগলাম| ঠিক উনার পাশেই|
“কে
তুমি মা? ওকে চেনো?”
“আমি
মালিনী| আমরা একসাথে কলেজে
পড়েছিলাম| রিয়াদের ভালো ব-ন্ধু|”
বন্ধু? আসলেই কি বন্ধু? কথা
অস্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ| জড়িয়ে যাচ্ছে শব্দ|
“আন্টি
আপনি রিয়াদের মা না?” উনি
তাকিয়ে রইলেন কোমল দৃষ্টিতে|
আমার
বুকের ভেতরে কালবৈশাখীর ঝড়| দমকা হাওয়া
আছড়ে পড়ছে বারবার|
এ সেই রিয়াদ... সেই
রিয়াদ! যাকে আমি সেদিন
এত এত অপমান করেছি
যে— ও যেন মাটির
সাথে মিশে যাচ্ছিল সেদিন|
অথচ টুঁ শব্দটিও করেনি
ছেলেটা| আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম|
খুব| সেও বেসেছিল| রিয়াদ
আমাকে ওর ভালোবাসার স্বীকারোক্তি
দিয়েছিল ঠিকই| কিন্তু তারপরেই আমাদের সম্পর্ক নিয়ে অপারগতার অজুহাত
দেখিয়েছিল সেদিন| অনর্থক হাজারটা বুলি আউড়ে নিজের
জীবনকে দায়ী করে আমার
থেকে পালাতে চেয়েছিল সেদিন| চেয়েছিল বলেই বলেছিলাম, সে
যেন আমার চোখের সামনে
আর কোনোদিন, কখখনো না আসে| কোনোদিন
না! রিয়াদ আর আসেনি| সত্যি
সত্যিই এরপর সে আর
আসতে চায়নি| আমি বুঝতে পারতাম|
সব বুঝতাম| ও আমার মুখোমুখি
হতে আর চায় না
কোনোদিন|
কিছুক্ষণ
নিস্তব্ধ সব| এখানকার হাওয়া
ভারী হয়ে উঠছে ক্রমশ|
কিছু একটা ভাবার পর
কাঁপা কাঁপা গলায় ভদ্রমহিলা বললেন,
“হ্যাঁ|
চিনেছি| আমার রিয়াদ তো
চোখে দেখতে পায় না আর|
তুমি জানোনা হয়ত| তাই তোমাকে
চেনেনি রিয়াদ| মা তুমিই মালিনী?”
“হ্যাঁ,
আমি| কিন্তু! কী কী কী
বলছেন আপনি! আন্টি কীভাবে হলো এমন!.. কীভাবে?...”
“মালিনী,
তুমি জানোনা হয়ত| রিয়াদের একটা
এক্সিডেন্ট হয়েছিল| তারপর...” চোখ ঢাকলেন তিনি|
আমার
আকাশ বাতাস আরও ভারী হয়ে
এলো নিমিষেই| চারপাশটা অন্ধকার যেন| খুব অন্ধকার|
সেই অন্ধকারে আর কেউ নেই|
কিছু নেই| শুধু রিয়াদ
আর আমি পথ চলেছি,
পথ চলেছি|... এইতো সেদিন! হঠাৎ রিয়াদ আমাদের
সেই চলতি পথে হাঁটতে
হাঁটতেই হঠাৎ থেমে গিয়ে
বলে উঠলো, একটা কথা বলব
তোকে?
-বল|
“তুই
আর আমার সাথে থাকিস
না| তোকে বড্ড ভালোবাসি
রে, কিন্তু তোর জন্য আমি
স্বার্থপর হতে পারব না|
হারাতেও পারব না| মালিনী
তুই শুধু ভালো থাক
এটুকুই চাওয়া| ক্ষমা করিস আমায়|”
ওর নতচোখে তখন বাঁধভাঙা জলধারা
দেখেছিলাম আমি| কিন্তু মেনে
নিতে পারিনি ওর কথা| পাগল
হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন! আমি নিজেকে ভেঙেচুরে
তাঁর ভালোবাসার ভিক্ষা চেয়েছিলাম সেদিন| ভীষণভাবে| এরপর, এরপর আর মাথা
ঠিক ছিল না| যা
মুখে এসেছে তাই বলেছি| তীব্র
অভিমানে, যন্ত্রণায়... এরপর ওকে ওর
হাতের মুঠোয় গুঁজে দেবো বলে নিয়ে
আসা সেই চিঠিটাকে দুমড়েমুচড়ে
ফেলে দিয়েছিলাম দূরে| আর তারপর ওকে
যেন আর দেখতে না
হয় সেজন্যে আর কলেজে আসিনি
বহুদিন| ওর স্মৃতিগুলোকে বুকে
বেঁধে নিয়ে নিজেকে মৃত্যু
যন্ত্রণায় নিঃশেষ করে ফেলতে ফেলেছিলাম|
রিয়াদ এবং রিয়াদের প্রতি
আমার তীব্র রাগ, অভিমানকে অস্ত্র
বানিয়ে জখম করে চলেছিলাম
নিজেকে দিনের পর দিন| আমি
শুধু জানতাম, ওকে দেখার জন্য
কীভাবে আমার প্রাণ বেরিয়ে
যেত| আমি তখন শুধুই
ডানা ঝাপ্টাতাম| অথচ, ডানা কেটে
গেলে কি আর ওড়া
যায়? যায় না| চেষ্টা
করলেও, ইচ্ছে হলেও সেই শুধু
কাটা ডানা হতে শুধুই
রক্তক্ষরণ হতে থাকে অবিরত|
আমার মনের ভেতরেও তখন
তাই হচ্ছিল| সেই রিয়াদ এখন
আমারই সামনে দাঁড়িয়ে আছে| রিয়াদ কিন্তু
তাঁর মনের সেই চিরায়ত
সুপ্ত প্রতিজ্ঞা আজ রেখেছে| ও
আমায় দেখছে না| দু’চোখের
কোথাও না| অথচ, আজ
আমিই কীনা ওকে দেখছি,
চোখ ভরে দেখছি| আমি
হারিয়ে যাচ্ছি কোনো অথৈ জলে|
অতলান্তিক আঁধারে|
এই তো, শেষ পরীক্ষা
সেদিন| ছেলেটা সত্যিই কেমন যেন হয়ে
গিয়েছিল| বুকের ভেতরে কোথাও তার প্রাণ নেই,
আবেগের চিহ্নও নেই| শুধু ফ্যাকাসে
চেহারাটা জানান দিত ওর ভেতরের
লুক্কায়িত লাশটাকে| এই তো এখনো
তাই| এখনও| আমার সামনে আজ
সেই নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াদ| যার
চোখে কোনো দৃষ্টি নেই|
ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে না| পাবে না
কখনো| শুধু ওর চোখভরা
অশ্রু ঝরে পড়ছে| প্রাণের
দৃষ্টি থেকে| সেই যে আমাদের
শেষ পথ, শেষ শেষ
দিন... সেদিনও যেমন অশ্রু গড়িয়ে
পড়ছিল, ঠিক সেদিনের মতোই|
মেঘভাঙা জল|
-রিয়াদ,
রিয়াদ...স্য-র-রি!
রি-য়াদ...!
দমবন্ধ
হয়ে আসছে| আমি আর কিছু
ভাবতে পারছি না| পারছি না|
এমন সময় ফোনটা বেজে
উঠল|
“কোথায়
তুমি? শোনো আমি ফিরছি
আধঘণ্টার মধ্যে, তুমি তৈরি হয়ে
থেকো মাকে নিয়ে| পিজি
তে ভালো একটা ডাক্তার
বসবে আজ| নিয়ে যেতে
হবে আজই| রাখছি|”
আমি
চোখ মুছলাম| আর পেছনে ফিরে
তাকালাম না| তাকালে হয়তো
আমিটাকে আর ফেরাতে পারব
না| বাসটা ছাড়লো| এখনও রিয়াদ নিঃশব্দে
যেন বলছে—
মালিনী
যাস না! যাস না!
তোর সাথে আমার অনেক
কথা আছে! অনেক...
আচ্ছা
আমি স্যরি টা ছাড়া আর
কিছু ওকে বলতে পারলাম
না কেন? আর কোনো
কথা? কেন বললাম না?
প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আমার
নিজের প্রতি| আকাশ ভেঙে বৃষ্টি
নামলো| জানালাটা লাগিয়ে দিতেই কোথাও যেন বেজে উঠলো;
যদি
মন কাঁদে, তুমি ফিরে এসো...
ফিরে
এসো...এক বরষায়|
এ জীবন আমাদেরকে সবসময়
ফিরতে দেয় না; ফেরাতেও
দেয় না| শুধু পথেঘাটে
থামিয়ে দেয় আচমকা| নতমুখে|
নিঃশব্দে| শুধু স্বীকারোক্তি নিয়ে
চলে যায়, এই না-ফেরা মানুষগুলোর| ফেরারি
স্মৃতিরা ফিরে আসে| মানুষেরা
নয়; মানুষেরা নয়! তবে পথেরা
ঠিক ফিরে আসে, আচমকা|
এইযে এরকম কোনো এক
শ্রাবণের দুপুরে| হঠাৎ আগন্তুকের মতো|
রিয়াদের অন্ধত্বতায়; আমার আর ওর
চোখের জলধারায়! আমার মনের জ্বরে!
আমার এখনকার উপরের প্রলেপ দেওয়া মানুষটার ভেতরের পুরোনো আমিতে| আমার ব্যাগের রুমালে|
আমার অবসন্ন দৃষ্টিতে| আজকের এই বলা নেই
কওয়া নেই; এমনি করে
আসা শ্রাবণের বৃষ্টিতে! আমার এগোতে না
পারা প্রতিটি ধাপে ধাপে... আর
চিৎকার করে “বাসটা থামাও
কেউ”...বলতে চাওয়ার প্রবল
ইচ্ছায়! সময় যে আমাকে
থামতে দেবে না রিয়াদ|
সময় বড় নিষ্ঠুর| পথেরা
আরো নিষ্ঠুর| ক্ষতকে আরো গাঢ় করে
তোলে সে| বর্তমানের এই
রাখঢাকহীনতায় শুধু পুরোনো দিনগুলোর
ঝাঁপি নিয়ে এই ফেরারি
পথেরা আসে... আসে আমার আর
রিয়াদের সেই খুনসুটি মাখা
ক্যালকুলেটর, অঙ্কের খাতা, লুকিয়ে রাখা বই, বসার
বেঞ্চ, আমাদের অপেক্ষা, একসাথে চলা পথ, আমাদের
প্রিয় ক্লাস, প্রিয় ক্যান্টিন, প্রিয় মাধবীলতার গাছটা, প্রিয় চিরকুট, প্রিয় স্বীকারোক্তি, প্রিয় গানগুলো... আর সেইযে দৃষ্টি
থাকা রিয়াদের বলা শেষ কথাটা
নিয়ে, “তুমি ভালো থেক”!
সব— সবকিছু নিয়ে পথেরা ফিরে
আসে| ফিরে আসে! ফেরারি
পথেরা আমাদের ক্ষত বাড়াতে, কাঁদাতে
ফিরে আসে| কিন্তু দায়িত্ববোধ যে আমাদের আর
পিছু হটতে দেয় না!
বাস্তবতায় গেঁথে রাখে| ঠিক রিয়াদের মতো|
চোরাবালির মতো| ব্ল্যাকহোলের মতো|
মা—হৃদয়, সংসার, ভবিষ্যৎ ওসবে রিয়াদ পৌঁছুতে
পারবে না| পথ আমাদের
এটুকুতেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে| এই
ছন্দপতনে অনুভূতিরা ছানার মতো কেটে যায়|
শুধু জীবনের পথ এসে কোনো
এক বাসস্টপেজে আচমকা থমকে দাঁড়ায়|
যান্ত্রিক
চাকার গতি কমলো| বাস
থামলো| চশমাটা মুছে ফেললাম| ঝাপসা
চোখ আর চশমা, দু’টোই একান্ত ব্যক্তিগত
জিনিস| তা কাউকে দেখতে
দেওয়া অনুচিত| বুঝতে দিলে দুর্বলতা বাড়ে|
অনেক কাজ এখন আমার
| অনেক দায়িত্ব| অনেক পথ!...
বেশ
কয়েকটি কাক ডেকে যাচ্ছে
দূরে| এক ভিখারিনী কতক্ষণ
ধরে এ-বাস, সে-বাস করে ভিক্ষে
চাইছে| অথচ এ পথে
পুরোনো কোনো পথ রিয়াদের
অন্ধত্ব নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে
নেই| ওর পাশে আমি
নেই| শুধু এপথে দাঁড়িয়ে
আছে এক অন্য আমি|
এই আমির জীবন ঠিক
সেখানেই থেমে গেছে, যেখানে
ফেরারি পথেরা থেমে গেছে বহুকাল|
বহুবার| বহুবছর আগে|

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬
বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে আছি| শ্রাবণ মাস| বেশ কয়েকটি কাক ডেকে যাচ্ছে দূরে| এক ভিখারিনী কতক্ষণ ধরে এ-বাস, সে-বাস করে ভিক্ষে চাইছে| পাচ্ছেও টুকটাক| সাইড ব্যাগে থাকার মধ্যে একটা পাঁচশ’ টাকার নোট, একটা দু’শ’, একটা একশ’| কী মনে হলো একশ’ টাকাটা বের করলাম| বাড়িয়ে দিতেই ফিক করে হেসে বললো “অ পাগলি খুচরো দাও|”
বললাম
এটা রেখে দাও| সে
টাকাটা নিয়ে চলে গেলো
স্বাচ্ছন্দ্যে| রোদ, হর্ন, ধুলো,
লোকজন— সব ছাপিয়ে হঠাৎই
খানিকটা দূরে একটা কৃষ্ণচূড়া
গাছের নিচে দৃষ্টি পড়লো|
আশ্চর্য! ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে কেমন
যেন চেনা চেনা লাগছে!
পাশ থেকে একদম ঠিক
যেন রিয়াদের মতো| হুবহু| অমনই
শ্যামলা ও লম্বা গড়নের
মুখ| আর সেই চেনা
শান্ত চোয়াল| একটু গম্ভীর ও
গভীর চোখ, তরতরে নাক|
ঠিক এরকম একটা কালো
শার্টই আগে রিয়াদ প্রায়
পরত| কালো পরতে ভালোবাসে
সে| আমি নিজের অজান্তেই
অজানা কোনো উত্তেজনাবশত একটু
এগিয়ে গেলাম সেদিকেই| নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না| আরও একটু
এগিয়ে গেলাম| ছেলেটার সামনাসামনি যেতেই আমি নির্বাক| এ
কী! হুবহু মিল! হ্যাঁ এইতো...
এইই তো রিয়াদ!
কথা
বলতে যাব| পা বাড়ালাম|
অনেক... অনেক কথা জমা
আছে তোমার সাথে, অনেক কথা!ু
অমনি কোনো একটা অজানা
ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরলো আষ্টেপৃষ্ঠে| ভয়?
না, না-না, ইতস্ততা,
না-কি লজ্জা! অপরাধবোধ?
জানি না!
মনে
পড়ল কলেজের শেষ দিনে ওর
সাথে আমি একটাও কথা
বলিনি| ফিরেও তাকাইনি ওর দিকে| কষ্ট
হয়েছে খুব| তাও কথা
বলিনি| কেনো পারিনি, তার
কারণ হিসেবে আমি একটিমাত্র কারণকে
দাঁড় করাতে পারব না| অনেক
কারণ আছে| রিয়াদ ছেলেটা
একদম যেন চোরাবালির মতো|
ওর সাথে যে-ই
থাকবে, একটা মায়ায় গেঁথে
যাবে আত্মিকভাবে| হারিয়ে ফেলবে নিজেকে তাঁর ভেতর| তাঁর
সত্তায়| নিঃসীম নিঃস্বার্থতায়|
আমি
ফিরছি আমার জীবনসঙ্গী হৃদয়ের
অফিস থেকে| দু’বছর আগে
এমনই একটা দিনে ওর
সাথে আমার দেখা, আলাপ|
তারপর পারিবারিকভাবে বিয়ে| মায়ের অসুস্থতার বাড়বাড়ন্ত| ঋণের বোঝা আর
আমার পড়াশোনা| বাবা চলে যাবার
পর সমস্ত দায়ভার, সবটাই আমাদের মাথার ওপর এসে পড়েছিল|
আমি টুকটাক টিউশন পড়িয়ে যেটুকু পাই, আর ভাইয়ের
এনজিওর চাকরিটা থেকে যা আসত|
সেটুকুই তখন অবলম্বন| আমি
এমএ পাস করে চাকরি
খুঁজে খুঁজে পায়ের তলা ক্ষয় করে
ফেলেছিলাম| পাইনি| কোথাও কোনো কাজও জোটেনি|
কোত্থাও না| লোকের কটুকথায়
জীবন বিপর্যস্ত এক পাড়ভাঙা নদীর
মতো| একটা সময় কূলকিনারা
পাই| ছায়া পাই| সেটিই
ছিল হৃদয়| তখনই তাকে পেয়েছিলাম
আমি| যেন তৃষ্ণার্ত চাতকের
একপশলা ভরসার বৃষ্টি হয়ে এসেছিল সে|
দুঃখগুলোকে ভেঙেচুরে দেবার মতো একটা কাঁধ
পেলাম| পেলাম ওর কাছে ভরসার
হাত| পেলাম মায়ের মন ভালো করার
মেডিসিন| শুরু হলো নতুন
জীবন| আমার বাবারই একজন
কাছের বন্ধু ও সহকর্মীর ছেলেই
হৃদয়|
এখন
দুপুরের শেষ তপ্ত রোদ|
বেলা ফুরিয়েছে| রাস্তায় জ্যাম পড়েছে প্রচণ্ড| বাড়িতে মা একা| যেতে
হবে| একটা বাস এসে
দাঁড়িয়েছে সামনে| বাড়িতে ফেরার তাড়া একদিকে| কিন্তু
তারচেয়েও বেশি পালিয়ে যাবার
এক অসম্ভব ছটফটানি| এরচেয়েও ঢের বেশি বয়ে
চলা ঝড় বুকের ভেতরে
ঘূর্ণায়মান| তীব্র ভয়— যা ক্রমশ
বাড়ছে| বেড়েই চলেছে| যেন কালবৈশাখীর অবাধ
ঘূর্ণিঝড়| রক্তে অদ্ভুত একটা শীতলতা| হিম
হয়ে গেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে|
হৃৎপিণ্ড| আমি পা বাড়াবো
ঠিক এমন সময় কোনো
এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমায় থামিয়ে
দিলো| পা আড়ষ্ট হয়ে
থমকে গেলাম আমি| আমার দু’চোখ থমকে আছে
সেদিকে| আর পারলাম না
আমি রিয়াদকে দেখেও এড়িয়ে যেতে| আমি চকিতে পা
বাড়ালাম এবার সেদিকেই| একটা
নিঝুম দুপুরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা
শান্ত ছেলেটার দিকে| অথচ, আমি যে
শান্ত নই! পথটা যে
আজ শান্ত নয়! ভীষণ অশান্ত|
তবুও আমি অসাড় পায়ে
পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি| এগিয়ে চলেছি| বাসের দিকে নয়| উল্টো
দিকে| হাতের ঠিক ডানদিকটায় এগিয়ে
যাচ্ছি| আচ্ছা! কেমন আছে রিয়াদ?
একবার নাহয় ভুল করেই
সামনে গেলাম ওর! করলাম ই
বা একটা দুঃসাহস!
কীইবা এমন বলবে? খুব
জোর শান্ত মুখে তাকিয়ে বলবে,
“কেমন আছ!” এটুকুই| আমি
জানি|
সেদিকে
এগিয়ে যেতেই দেখি একটা মহিলা
এসে দাঁড়ালেন রিয়াদের পাশে| কে ইনি? ওর
মা? হ্যাঁ| একবার দেখেছিলাম কলেজে| সেইযে সেই সময়ে| এক বর্ষামুখর দিনে,
কলেজে ছেলের সাথে এসেছিলেন তিনি,
কলেজের মাঝামাঝি সময়ে| তখনই দেখেছি তাকে|
কাঁপা
কাঁপা কণ্ঠে অথচ বেশ উচ্ছ্বসিত
হয়ে ডেকে উঠলাম,“রিয়াদ!”
ভদ্রমহিলা
এবার আলতো চোখে তাকালেন
আমার দিকে| আমি আরো এগিয়ে
যেতে লাগলাম| ঠিক উনার পাশেই|
“কে
তুমি মা? ওকে চেনো?”
“আমি
মালিনী| আমরা একসাথে কলেজে
পড়েছিলাম| রিয়াদের ভালো ব-ন্ধু|”
বন্ধু? আসলেই কি বন্ধু? কথা
অস্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ| জড়িয়ে যাচ্ছে শব্দ|
“আন্টি
আপনি রিয়াদের মা না?” উনি
তাকিয়ে রইলেন কোমল দৃষ্টিতে|
আমার
বুকের ভেতরে কালবৈশাখীর ঝড়| দমকা হাওয়া
আছড়ে পড়ছে বারবার|
এ সেই রিয়াদ... সেই
রিয়াদ! যাকে আমি সেদিন
এত এত অপমান করেছি
যে— ও যেন মাটির
সাথে মিশে যাচ্ছিল সেদিন|
অথচ টুঁ শব্দটিও করেনি
ছেলেটা| আমি ওকে ভালোবেসেছিলাম|
খুব| সেও বেসেছিল| রিয়াদ
আমাকে ওর ভালোবাসার স্বীকারোক্তি
দিয়েছিল ঠিকই| কিন্তু তারপরেই আমাদের সম্পর্ক নিয়ে অপারগতার অজুহাত
দেখিয়েছিল সেদিন| অনর্থক হাজারটা বুলি আউড়ে নিজের
জীবনকে দায়ী করে আমার
থেকে পালাতে চেয়েছিল সেদিন| চেয়েছিল বলেই বলেছিলাম, সে
যেন আমার চোখের সামনে
আর কোনোদিন, কখখনো না আসে| কোনোদিন
না! রিয়াদ আর আসেনি| সত্যি
সত্যিই এরপর সে আর
আসতে চায়নি| আমি বুঝতে পারতাম|
সব বুঝতাম| ও আমার মুখোমুখি
হতে আর চায় না
কোনোদিন|
কিছুক্ষণ
নিস্তব্ধ সব| এখানকার হাওয়া
ভারী হয়ে উঠছে ক্রমশ|
কিছু একটা ভাবার পর
কাঁপা কাঁপা গলায় ভদ্রমহিলা বললেন,
“হ্যাঁ|
চিনেছি| আমার রিয়াদ তো
চোখে দেখতে পায় না আর|
তুমি জানোনা হয়ত| তাই তোমাকে
চেনেনি রিয়াদ| মা তুমিই মালিনী?”
“হ্যাঁ,
আমি| কিন্তু! কী কী কী
বলছেন আপনি! আন্টি কীভাবে হলো এমন!.. কীভাবে?...”
“মালিনী,
তুমি জানোনা হয়ত| রিয়াদের একটা
এক্সিডেন্ট হয়েছিল| তারপর...” চোখ ঢাকলেন তিনি|
আমার
আকাশ বাতাস আরও ভারী হয়ে
এলো নিমিষেই| চারপাশটা অন্ধকার যেন| খুব অন্ধকার|
সেই অন্ধকারে আর কেউ নেই|
কিছু নেই| শুধু রিয়াদ
আর আমি পথ চলেছি,
পথ চলেছি|... এইতো সেদিন! হঠাৎ রিয়াদ আমাদের
সেই চলতি পথে হাঁটতে
হাঁটতেই হঠাৎ থেমে গিয়ে
বলে উঠলো, একটা কথা বলব
তোকে?
-বল|
“তুই
আর আমার সাথে থাকিস
না| তোকে বড্ড ভালোবাসি
রে, কিন্তু তোর জন্য আমি
স্বার্থপর হতে পারব না|
হারাতেও পারব না| মালিনী
তুই শুধু ভালো থাক
এটুকুই চাওয়া| ক্ষমা করিস আমায়|”
ওর নতচোখে তখন বাঁধভাঙা জলধারা
দেখেছিলাম আমি| কিন্তু মেনে
নিতে পারিনি ওর কথা| পাগল
হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন! আমি নিজেকে ভেঙেচুরে
তাঁর ভালোবাসার ভিক্ষা চেয়েছিলাম সেদিন| ভীষণভাবে| এরপর, এরপর আর মাথা
ঠিক ছিল না| যা
মুখে এসেছে তাই বলেছি| তীব্র
অভিমানে, যন্ত্রণায়... এরপর ওকে ওর
হাতের মুঠোয় গুঁজে দেবো বলে নিয়ে
আসা সেই চিঠিটাকে দুমড়েমুচড়ে
ফেলে দিয়েছিলাম দূরে| আর তারপর ওকে
যেন আর দেখতে না
হয় সেজন্যে আর কলেজে আসিনি
বহুদিন| ওর স্মৃতিগুলোকে বুকে
বেঁধে নিয়ে নিজেকে মৃত্যু
যন্ত্রণায় নিঃশেষ করে ফেলতে ফেলেছিলাম|
রিয়াদ এবং রিয়াদের প্রতি
আমার তীব্র রাগ, অভিমানকে অস্ত্র
বানিয়ে জখম করে চলেছিলাম
নিজেকে দিনের পর দিন| আমি
শুধু জানতাম, ওকে দেখার জন্য
কীভাবে আমার প্রাণ বেরিয়ে
যেত| আমি তখন শুধুই
ডানা ঝাপ্টাতাম| অথচ, ডানা কেটে
গেলে কি আর ওড়া
যায়? যায় না| চেষ্টা
করলেও, ইচ্ছে হলেও সেই শুধু
কাটা ডানা হতে শুধুই
রক্তক্ষরণ হতে থাকে অবিরত|
আমার মনের ভেতরেও তখন
তাই হচ্ছিল| সেই রিয়াদ এখন
আমারই সামনে দাঁড়িয়ে আছে| রিয়াদ কিন্তু
তাঁর মনের সেই চিরায়ত
সুপ্ত প্রতিজ্ঞা আজ রেখেছে| ও
আমায় দেখছে না| দু’চোখের
কোথাও না| অথচ, আজ
আমিই কীনা ওকে দেখছি,
চোখ ভরে দেখছি| আমি
হারিয়ে যাচ্ছি কোনো অথৈ জলে|
অতলান্তিক আঁধারে|
এই তো, শেষ পরীক্ষা
সেদিন| ছেলেটা সত্যিই কেমন যেন হয়ে
গিয়েছিল| বুকের ভেতরে কোথাও তার প্রাণ নেই,
আবেগের চিহ্নও নেই| শুধু ফ্যাকাসে
চেহারাটা জানান দিত ওর ভেতরের
লুক্কায়িত লাশটাকে| এই তো এখনো
তাই| এখনও| আমার সামনে আজ
সেই নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াদ| যার
চোখে কোনো দৃষ্টি নেই|
ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে না| পাবে না
কখনো| শুধু ওর চোখভরা
অশ্রু ঝরে পড়ছে| প্রাণের
দৃষ্টি থেকে| সেই যে আমাদের
শেষ পথ, শেষ শেষ
দিন... সেদিনও যেমন অশ্রু গড়িয়ে
পড়ছিল, ঠিক সেদিনের মতোই|
মেঘভাঙা জল|
-রিয়াদ,
রিয়াদ...স্য-র-রি!
রি-য়াদ...!
দমবন্ধ
হয়ে আসছে| আমি আর কিছু
ভাবতে পারছি না| পারছি না|
এমন সময় ফোনটা বেজে
উঠল|
“কোথায়
তুমি? শোনো আমি ফিরছি
আধঘণ্টার মধ্যে, তুমি তৈরি হয়ে
থেকো মাকে নিয়ে| পিজি
তে ভালো একটা ডাক্তার
বসবে আজ| নিয়ে যেতে
হবে আজই| রাখছি|”
আমি
চোখ মুছলাম| আর পেছনে ফিরে
তাকালাম না| তাকালে হয়তো
আমিটাকে আর ফেরাতে পারব
না| বাসটা ছাড়লো| এখনও রিয়াদ নিঃশব্দে
যেন বলছে—
মালিনী
যাস না! যাস না!
তোর সাথে আমার অনেক
কথা আছে! অনেক...
আচ্ছা
আমি স্যরি টা ছাড়া আর
কিছু ওকে বলতে পারলাম
না কেন? আর কোনো
কথা? কেন বললাম না?
প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আমার
নিজের প্রতি| আকাশ ভেঙে বৃষ্টি
নামলো| জানালাটা লাগিয়ে দিতেই কোথাও যেন বেজে উঠলো;
যদি
মন কাঁদে, তুমি ফিরে এসো...
ফিরে
এসো...এক বরষায়|
এ জীবন আমাদেরকে সবসময়
ফিরতে দেয় না; ফেরাতেও
দেয় না| শুধু পথেঘাটে
থামিয়ে দেয় আচমকা| নতমুখে|
নিঃশব্দে| শুধু স্বীকারোক্তি নিয়ে
চলে যায়, এই না-ফেরা মানুষগুলোর| ফেরারি
স্মৃতিরা ফিরে আসে| মানুষেরা
নয়; মানুষেরা নয়! তবে পথেরা
ঠিক ফিরে আসে, আচমকা|
এইযে এরকম কোনো এক
শ্রাবণের দুপুরে| হঠাৎ আগন্তুকের মতো|
রিয়াদের অন্ধত্বতায়; আমার আর ওর
চোখের জলধারায়! আমার মনের জ্বরে!
আমার এখনকার উপরের প্রলেপ দেওয়া মানুষটার ভেতরের পুরোনো আমিতে| আমার ব্যাগের রুমালে|
আমার অবসন্ন দৃষ্টিতে| আজকের এই বলা নেই
কওয়া নেই; এমনি করে
আসা শ্রাবণের বৃষ্টিতে! আমার এগোতে না
পারা প্রতিটি ধাপে ধাপে... আর
চিৎকার করে “বাসটা থামাও
কেউ”...বলতে চাওয়ার প্রবল
ইচ্ছায়! সময় যে আমাকে
থামতে দেবে না রিয়াদ|
সময় বড় নিষ্ঠুর| পথেরা
আরো নিষ্ঠুর| ক্ষতকে আরো গাঢ় করে
তোলে সে| বর্তমানের এই
রাখঢাকহীনতায় শুধু পুরোনো দিনগুলোর
ঝাঁপি নিয়ে এই ফেরারি
পথেরা আসে... আসে আমার আর
রিয়াদের সেই খুনসুটি মাখা
ক্যালকুলেটর, অঙ্কের খাতা, লুকিয়ে রাখা বই, বসার
বেঞ্চ, আমাদের অপেক্ষা, একসাথে চলা পথ, আমাদের
প্রিয় ক্লাস, প্রিয় ক্যান্টিন, প্রিয় মাধবীলতার গাছটা, প্রিয় চিরকুট, প্রিয় স্বীকারোক্তি, প্রিয় গানগুলো... আর সেইযে দৃষ্টি
থাকা রিয়াদের বলা শেষ কথাটা
নিয়ে, “তুমি ভালো থেক”!
সব— সবকিছু নিয়ে পথেরা ফিরে
আসে| ফিরে আসে! ফেরারি
পথেরা আমাদের ক্ষত বাড়াতে, কাঁদাতে
ফিরে আসে| কিন্তু দায়িত্ববোধ যে আমাদের আর
পিছু হটতে দেয় না!
বাস্তবতায় গেঁথে রাখে| ঠিক রিয়াদের মতো|
চোরাবালির মতো| ব্ল্যাকহোলের মতো|
মা—হৃদয়, সংসার, ভবিষ্যৎ ওসবে রিয়াদ পৌঁছুতে
পারবে না| পথ আমাদের
এটুকুতেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে| এই
ছন্দপতনে অনুভূতিরা ছানার মতো কেটে যায়|
শুধু জীবনের পথ এসে কোনো
এক বাসস্টপেজে আচমকা থমকে দাঁড়ায়|
যান্ত্রিক
চাকার গতি কমলো| বাস
থামলো| চশমাটা মুছে ফেললাম| ঝাপসা
চোখ আর চশমা, দু’টোই একান্ত ব্যক্তিগত
জিনিস| তা কাউকে দেখতে
দেওয়া অনুচিত| বুঝতে দিলে দুর্বলতা বাড়ে|
অনেক কাজ এখন আমার
| অনেক দায়িত্ব| অনেক পথ!...
বেশ
কয়েকটি কাক ডেকে যাচ্ছে
দূরে| এক ভিখারিনী কতক্ষণ
ধরে এ-বাস, সে-বাস করে ভিক্ষে
চাইছে| অথচ এ পথে
পুরোনো কোনো পথ রিয়াদের
অন্ধত্ব নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে
নেই| ওর পাশে আমি
নেই| শুধু এপথে দাঁড়িয়ে
আছে এক অন্য আমি|
এই আমির জীবন ঠিক
সেখানেই থেমে গেছে, যেখানে
ফেরারি পথেরা থেমে গেছে বহুকাল|
বহুবার| বহুবছর আগে|

আপনার মতামত লিখুন