(পূর্ব প্রকাশের পর)
তেরো.
থানা থেকে বের হয়ে একটা রিকশায় করে নৌকা ঘাটে আসতে আসতে আনিসের মনে হলো, ঝড় উঠবে। শ্রাবণ মাসে ঝড় ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এছাড়া প্রকৃতি যেভাবে গুমোট হয়ে উঠেছে, গাছের ঝুলে থাকা সহজ পাতাটাও নড়ছে না। চারিদিকে স্তব্ধতা। মানুষজন চলছে, কিন্তু কী যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। উপজেলা সড়ক ধরে রিকশা, ভ্যান, সিএনজি ও মোটরযান চলছে, কিন্তু স্থবিরতা সেখানেও।
নৌকাঘাটটা থানা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটে আসতে সময় লাগলেও রিকশায় অল্প সময়ের মধ্যে চলে আসা যায়। আনিসের আজ নৌকাঘাটে আসতে সাত কি আট মিনিট লাগল। সে রিকশায় আসতে আসতে ঝড় উঠবে বলে যেটা ভেবেছিল, নৌকায় উঠতে গিয়ে দেখল ঝড় নয় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সঙ্গে অবশ্য স্বস্তির হাল্কা বাতাস।
আনিস নৌকায় উঠে গলুইতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ভেতর ভিজতে শুরু করল।
বশির বলল, ‘ভাইজান, বিস্টিতে ভিজবেন না। শরীল খারাপ হইব।’
আনিস হাসল। বলল, ‘আরে না। বেশি ভিজবো।’
বশির কিছু বলল না। খুঁটি থেকে নৌকার রশি খুলল।
আনিস বৃষ্টিতে একটুই ভিজল। স্বস্তির ভেজা। ছইয়ের নিচে যেতে যেতে বশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বশির, নৌকা ছাড়লি যে? তুই তো বৃষ্টিতে ভিজবি? ভিজে অসুখ বাঁধাবি। বৃষ্টি থামুক। তারপর না হয় নৌকা ছাড়তি?’
বশির বলল, ‘ভাইজান, ‘ওইসব বিস্টি-টিস্টিতে আমার কিচ্ছু হইব না। যা গরম পড়তেছিল! অখন ভালা লাগতাছে। আপনে ছইয়ের নিচে আরাম কইরা বসেন। আমি নৌকাটা টাইনা লইয়া যাইমুনে।’
আনিস সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকাল। ছইয়ের নিচে সে জুত হয়ে বসল। দৃষ্টিটা গলুইর সামনের দিকে ফেলে বৃষ্টি দেখতে শুরু করল। বৃষ্টিটা দক্ষিণ থেকে উত্তরে, বাতাসের শরীরে গা ভাসিয়ে উড়ছে। দক্ষিণের বাতাস এখন একটু একটু বাড়তে শুরু করেছে। ওদিকে প্রকৃতি ক্রমশ ধূসর হয়ে উঠছে। সাদা ধূসর, বকের পালকের মতো রং। গোমতীর জলের রং ও প্রকৃতির ধূসর রং কেমন এক হয়ে যাচ্ছে।
আনিস ছইয়ের নিচে বসেই বৃষ্টিটা ভালো করে দেখার জন্য দৃষ্টিটা আরেকটু বাড়াল। তখনই পুবের আড়াআড়ি দক্ষিণের বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট শিশিরবিন্দুর মতো তার মুখে এসে পড়ল। সে মুখটা সরাতে গিয়ে সরাল না। তার ভেতর কী এক অনুভূতি এসে ভিড় করল। বেশ ভালো লাগার অনুভূতি। অবশ্য সে এই ভালো লাগার অনুভূতি থানার ওসি মহিউদ্দিন আহমেদের রুম থেকেই বয়ে নিয়ে এসেছে। মহিউদ্দিন আহমেদ তার কবিতার যেভাবে প্রশংসা করলেন!
গোমতীর স্রোত ঠেলে খানিকক্ষণ যেতেই বৃষ্টিটা বাড়তে শুরু করল। মইজুদ্দির চর পেরোতেই ঝুম বৃষ্টি নামল। গোমতীর জলে এখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বড় বড় বৃত্ত করে পড়ছে। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলে গর্ত করে কেমন লাফিয়ে উঠছে। লাফিয়ে উঠে প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যেন রূপোর দানা হয়ে যাচ্ছে। কোনোটা বড় রূপোর দানা, কোনোটা ছোট।
আনিসের কেন জানি বৃষ্টির ফোঁটায় রূপোর দানা দেখতে দেখতে সেতারা বেগমের কথা মনে পড়ে গেল। সেতারা বেগমের নাকের নথ, কানের দুল, গলার তাবিজ ছাপা, এমনকি পায়ের নূপুর সবই রূপোর ছিল। সেতারা যখন এগুলো পরে তার সামনে আসত, তখন সে যেন সত্যি সত্যি গোমতীর একাদশী চাঁদের রাতে গোমতীকন্যা হয়ে যেত। তাকে অমোঘ আহ্বানে ডাকত।
আনিস সেতারা বেগমকে ডাকত রূপোর কন্যা বলে।
‘গোমতীর একাদশী চাঁদ’— আনিসের দ্বিতীয় কবিতার বইয়ের নাম। এই নামে বইটা বের করার পেছনের ঘটনাটা আনিসের মনে পড়ে গেল। দুই বছর আগে এমনই এক বর্ষার মওসুমে, বৃহস্পতিবারের এক পড়ন্ত বিকেলে স্কুলের কী এক মিটিং শেষে বাড়ি ফিরছিল। শুক্র ও শনিবার স্কুলে সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রায় প্রতি শুক্র-শনিবারে সে মাকে দেখতে তাদের আঁধারিয়া গ্রামে চলে যায়। বশির নৌকা নিয়ে আসে তাকে নিতে।
সেদিনও বশির যথারীতি নৌকা নিয়ে অনুতপুর ঘাটে আসে। শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে নৌকা ঘাট আধা কিলোমিটার দূরত্বের পথ। আনিস যেই স্কুলের গেইট পেরিয়ে হেঁটে নৌকা ঘাটের দিকে পা বাড়ায়, ঠিক তখনই পেছন থেকে কে একজন ডেকে ওঠে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, সেতারা বেগম।
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি এখানে?’
সেতারা বেগম বলে, ‘বাড়িত যামু।’
‘বাড়িতে যাবে ভালো কথা। এদিকে কেন? তোমাদের বাড়ি তো ওদিকে?
‘আপনাগো বাড়িত যামু।’
‘আঁধারিয়া গ্রামে?’
‘আর কই যামু?’
আনিস মৃদু হাসে। বলে, ‘আঁধারিয়া গ্রামে যাবে, ভালো কথা। আমাদের বাড়িতে তো যাবে না। যাবে তোমার শ্বশুর বাড়িতে।’
সেতারা বেগম খলবল করে হেসে বলে, ‘ওই একই কথা। আমারে আপনার লগে নাওয়ে লইয়া যাইতে হইব।’
আনিস প্রথমে একটু দ্বিধায় পড়ে। পরক্ষণ ভাবে, এটাই তো প্রথম নয় যে সেতারা বেগম তার নৌকায় যেতে চাচ্ছে। এর আগেও সে দুইবার তার নৌকায় করে আঁধারিয়া গ্রাম থেকে অনুতপুর এসেছে। একবার অনুতপুর থেকে আঁধারিয়া গ্রামে।
আনিস এমনিই জিজ্ঞেস করে, ‘পাগলা কই?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হেইডা জানমু কেমনে? আমি তো গত চাইর দিন ধইরা আমাগো অনুতপুর গেরামে। নিশ্চয়ই হেয় দরগায় গিয়া পইড়া আছে।’
‘চার দিন ধরে অনুতপুর গ্রামে, আমাকে জানালে না?’
‘জানাইলে কী করতেন, আমার বাপের বাড়িত আইতেন?’
‘সেটা কি সম্ভব?’
‘হেইডা সম্ভব না ক্যান?’
‘কেন সম্ভব না, সেটা তুমি ভালো করেই বোঝো।’
‘কী ভালা কইরা বুঝমু?’
‘আরে, ধুর, কী সব প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছ!’
সেতারা বেগম খলবল করে হাসে- হিহি, হিহি। বলে, ‘আমি কি ভুল কথা জিগাইতাছি?’
আনিস এদিকওদিক তাকায়। এমনিই। বলে, ‘আস্তে, আস্তে বলো। আর এমনে হাসবে না। এখন তুমি বলো, পাগলা কি নিতে আসেনি?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হেয় আইলে কি আপনার লগে যাইতাম?’
আনিস বিরক্ত হওয়ার গলায় বলে, ‘আরে ধুর! তুমি সিধা প্রশ্নের সিধা উত্তর দাও তো!’
সেতারা বেগম আবার খলবল করে হেসে ওঠে। বলে, ‘না। কাইল আসার কথা আছিল। আসে নাই।’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘ও, তাই?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হ, আইজ ভাবছিলাম আপনের স্কুলে যামু। পরে ভাবলাম, আপনে তো আইজকা বাড়িত যাইবেনই। পথে ধরমু। আপনের আইজ এত দেরি হইল যে?’
‘স্কুলে মিটিং ছিল।’
‘সেই কখন থাইকা গেইটের কাছে দাঁড়াইয়া আছি। একবার তো ভাবতেছিলাম, আপনে আমার চোখরে ফাঁকি দিয়া চইলা গেছেন।’
‘তুমি কী যে বলো এর কোনো আগা-মাথা নেই!’
সেতারা বেগম আবারও খলবল করে হাসে, হিহি, হিহি।
আনিস বলে, ‘হয়েছে, এবার চলো। এভাবে কথার পেছনে কথা বাড়ালে নৌকা ছাড়তে ছাড়তেই রাত হয়ে যাবে।’
সেতারা বেগম কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। কী ভেবে একটু মৃদু হাসে। বলে, ‘চলেন।’
সেদিন অনুতপুর ঘাট থেকে নৌকা ছাড়তে ছাড়তেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। নদীতে স্রোতের বিপরীতে অনুতপুরের বাঁক পেরোতে পেরোতেই রাতটা পুরোপুরি নেমে আসে। আনিস ও সেতারা বেগম বসে নৌকার সামনের গলুইর দুই পাশে, শঙ্কিতভাবেই সামান্য দূরত্ব রেখে। বশির নৌকা চালাচ্ছে। তার সামনে ওরা এমন কিছু করবে না যাতে গ্রামে কানকথা হয়। যদিও বশির কখনই কিছু বলবে না। বেশ বিশ্বস্ত সে।
অনুতপুরের বাঁক পেরোতেই আনিস দেখে আকাশে একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় গোমতীর জলে রূপোলি বিচ্ছুরণ হচ্ছে। সেতারা বেগমের পরনে তখন রূপোর গহনা। জলের রূপোলি বিচ্ছুরণের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে যেন সেতারা বেগমের সেই রূপোর গহনা বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে। আনিস হিসেব করে দেখে, চাঁদটা শুক্লপক্ষের একাদশতম রাতের চাঁদ।
আনিস সেতারা বেগমকে দেখিয়ে বলে, ‘দেখো, দেখো, একাদশীর চাঁদ।’
সেতারা বেগমের একটা গুণ ছিল, সে না বুঝেও সায় দিত। মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল। কবিতা তেমন বুঝত না। কিন্তু আনিস যখন কবিতা পড়ত, সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনত। মাঝেমধ্যে সুন্দর মন্তব্য করেও বসত।
সেতারা বেগম আনিসের কথায় চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ হ, চানটা সুন্দর। আপনে চানটার নাম কী কইলেন?
‘শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদ।’
‘আইচ্ছা, আইচ্ছা। শুকপাখির চান।’
আনিস হাসে।
সেরাতে আনিস বাড়ি ফিরেই এক দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলে। পরে সে সেই দীর্ঘ কবিতা সহ আরও কিছু কবিতা নিয়ে দ্বিতীয় কবিতার বই বের করে— ‘গোমতীর একাদশী চাঁদ।’
গোমতীর ভাটিতে একটা মিথ আছে, শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদের কোনো কোনো রাতে গোমতীকন্যা জলে নেমে আসে। বেগানা পুরুষকে প্রেমের আহ্বানে ডাকে- ‘আয়, আয়, আয়।’ তখন এ অঞ্চলের কোনো না কোনো গ্রামের কোনো না কোনো যুবতী গোমতীর জলে নেমে আসে। পরদিন তার লাশ পাওয়া যায়।
সেতারা বেগমও চারদিন আগে এমনই শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদের রাতে গোমতীর জলে ডুবে মারা যায়...।
নৌকা ছাড়ার সময় বশির যাই বলুক, নৌকাটা সে টেনে নিয়ে যাবে, এখন সে ঠিক টেনে নিয়ে যেতে পারছে না। একে তো পশ্চিম থেকে পুবে, নৌকাটা চলছে স্রোতের বিপরীতে। তার ওপর বর্ষার বান এখন। সে বৈঠা বাইছে শব্দ করে— ও হা, ও হা, ও হা। বৈঠার আঘাতে জলের শব্দ হচ্ছে— ঝপাৎ ঝপাৎ ঝপাৎ।
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘বশির, নৌকা কোথাও ভিড়াবি নাকি?’
বশির পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, ভাইজান?’
‘বৃষ্টি যে হারে বাড়ছে, তুই তো নৌকা চালাতে পারছিস না।’
‘না, না, অখন নাও কোনোখানে ভিড়ামু না। তাড়াতাড়ি বাড়িত গেলে ভালা হইব। মনে হয় তুফান আইব।’
আনিস বশিরের কথা শুনে ঘাড় বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টি হচ্ছে বেশ। অবিরত ধারার বৃষ্টি। নদীর জলে বৃষ্টি পড়ার শব্দ হচ্ছে— ঝম ঝম, ঝম ঝম। সঙ্গে বাতাস বইছে ঠিকই, তবে বাতাসের তীব্রতা তেমন নেই। নদীর দুই ধারের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত ধূসর থেকে আরও ধূসরতর হচ্ছে।
আনিস দৃষ্টিটা ছইয়ের ভেতরে টেনে এনে বশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না, বশির, তুফান আসবে না।’
বশির বলল, ‘ভাইজান, তারপরও নাও না ভিড়াইয়া বাড়িত চইলা যাওয়াই ভালা।’
আনিস আন্তরিকতার সুরে বলল, ‘যাবি, যা। তোর কষ্ট না হলেই হয়।’
‘আমার কোনো কষ্ট হইব না, ভাইজান।’
‘ঠিক আছে, চালা। যখন না পারবি, আমাকে দিস। আমি নৌকা চালাব।’
‘না না, ভাইজান, আপনের চালাইতে হইব না। আপনে অখন ছইয়ের মুখের কাপড়টা নামাইয়া দেন। নইলে ভিইজা যাইবেন।’
‘না রে, বশির। একটু একটু ভিজতেই ভালো লাগছে।’
বশির হাসল। কিছু বলল না।
আনিস আবার দিঘল দৃষ্টি মেলে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকাল। বৃষ্টি হওয়ার কারণে এখন বিকেলটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তবে এখন যে মধ্যবিকেল সেটা বোঝা যাচ্ছে। তার শার্টের পকেটেই মোবাইলটা। কিন্তু তার মোবাইলটা পকেট থেকে নিয়ে সময়টা দেখতে ইচ্ছে হলো না। এমনই। সে হাতে ঘড়ি পরে না। সে আগে যে ঘড়ি পড়ত না, তা নয়। মোবাইল আসার পর সে ঘড়ি পরা ছেড়ে দিয়েছে।
নদীতে এখন একদল হাঁস সাঁতার কাটছে স্রোতের দিকে। উদ্ভ্রান্ত ও ভয়ার্ত গলায় ডাকছে- প্যাঁক প্যাঁক, প্যাঁক প্যাঁক। হাঁসগুলো দিশা হারিয়ে ফেলছে, বোঝা যায়। খানিকটা দূরেই ধানক্ষেতের জমিতে পুঁতে রাখা একটা বাঁশের কঞ্চিতে ধ্যানমগ্ন হয়ে একটা মাছরাঙা বসে আছে। এমন বৃষ্টির মধ্যেও কঞ্চি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। নদীতে থেকে ভেতরে গৃহস্থের বাড়িগুলো ভেসে আছে দ্বীপের মতো। নারিকেল গাছের ডগা, সুপারিগাছের চিরল পাতা অনবরত নড়ছে বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
আনিস বৃষ্টি দেখতে দেখতে নিজের ভেতর কেমন ক্ষয়ে গেল। তার ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল কোনো অর্বাচীন নোঙরের আহ্বানে। সেই অর্বাচীন নোঙরের আহ্বান আর কারও নয়, সেতারা বেগমের। তার তখনই মনে হলো, এতদিন সে যে ভেবে এসেছে সেতারা বেগমের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শুধুমাত্র শারীরিক, তা ঠিক নয়। সম্পর্কটা আত্মিকও ছিল। আর সেটা ভাবতেই তার মনে হলো, মনসুর পাগলার প্রতি সে অন্যায় করেছে। অক্ষম্য অন্যায়। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
তেরো.
থানা থেকে বের হয়ে একটা রিকশায় করে নৌকা ঘাটে আসতে আসতে আনিসের মনে হলো, ঝড় উঠবে। শ্রাবণ মাসে ঝড় ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এছাড়া প্রকৃতি যেভাবে গুমোট হয়ে উঠেছে, গাছের ঝুলে থাকা সহজ পাতাটাও নড়ছে না। চারিদিকে স্তব্ধতা। মানুষজন চলছে, কিন্তু কী যেন স্তব্ধ হয়ে আছে। উপজেলা সড়ক ধরে রিকশা, ভ্যান, সিএনজি ও মোটরযান চলছে, কিন্তু স্থবিরতা সেখানেও।
নৌকাঘাটটা থানা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটে আসতে সময় লাগলেও রিকশায় অল্প সময়ের মধ্যে চলে আসা যায়। আনিসের আজ নৌকাঘাটে আসতে সাত কি আট মিনিট লাগল। সে রিকশায় আসতে আসতে ঝড় উঠবে বলে যেটা ভেবেছিল, নৌকায় উঠতে গিয়ে দেখল ঝড় নয় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। সঙ্গে অবশ্য স্বস্তির হাল্কা বাতাস।
আনিস নৌকায় উঠে গলুইতে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ভেতর ভিজতে শুরু করল।
বশির বলল, ‘ভাইজান, বিস্টিতে ভিজবেন না। শরীল খারাপ হইব।’
আনিস হাসল। বলল, ‘আরে না। বেশি ভিজবো।’
বশির কিছু বলল না। খুঁটি থেকে নৌকার রশি খুলল।
আনিস বৃষ্টিতে একটুই ভিজল। স্বস্তির ভেজা। ছইয়ের নিচে যেতে যেতে বশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বশির, নৌকা ছাড়লি যে? তুই তো বৃষ্টিতে ভিজবি? ভিজে অসুখ বাঁধাবি। বৃষ্টি থামুক। তারপর না হয় নৌকা ছাড়তি?’
বশির বলল, ‘ভাইজান, ‘ওইসব বিস্টি-টিস্টিতে আমার কিচ্ছু হইব না। যা গরম পড়তেছিল! অখন ভালা লাগতাছে। আপনে ছইয়ের নিচে আরাম কইরা বসেন। আমি নৌকাটা টাইনা লইয়া যাইমুনে।’
আনিস সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকাল। ছইয়ের নিচে সে জুত হয়ে বসল। দৃষ্টিটা গলুইর সামনের দিকে ফেলে বৃষ্টি দেখতে শুরু করল। বৃষ্টিটা দক্ষিণ থেকে উত্তরে, বাতাসের শরীরে গা ভাসিয়ে উড়ছে। দক্ষিণের বাতাস এখন একটু একটু বাড়তে শুরু করেছে। ওদিকে প্রকৃতি ক্রমশ ধূসর হয়ে উঠছে। সাদা ধূসর, বকের পালকের মতো রং। গোমতীর জলের রং ও প্রকৃতির ধূসর রং কেমন এক হয়ে যাচ্ছে।
আনিস ছইয়ের নিচে বসেই বৃষ্টিটা ভালো করে দেখার জন্য দৃষ্টিটা আরেকটু বাড়াল। তখনই পুবের আড়াআড়ি দক্ষিণের বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট শিশিরবিন্দুর মতো তার মুখে এসে পড়ল। সে মুখটা সরাতে গিয়ে সরাল না। তার ভেতর কী এক অনুভূতি এসে ভিড় করল। বেশ ভালো লাগার অনুভূতি। অবশ্য সে এই ভালো লাগার অনুভূতি থানার ওসি মহিউদ্দিন আহমেদের রুম থেকেই বয়ে নিয়ে এসেছে। মহিউদ্দিন আহমেদ তার কবিতার যেভাবে প্রশংসা করলেন!
গোমতীর স্রোত ঠেলে খানিকক্ষণ যেতেই বৃষ্টিটা বাড়তে শুরু করল। মইজুদ্দির চর পেরোতেই ঝুম বৃষ্টি নামল। গোমতীর জলে এখন বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বড় বড় বৃত্ত করে পড়ছে। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলে গর্ত করে কেমন লাফিয়ে উঠছে। লাফিয়ে উঠে প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যেন রূপোর দানা হয়ে যাচ্ছে। কোনোটা বড় রূপোর দানা, কোনোটা ছোট।
আনিসের কেন জানি বৃষ্টির ফোঁটায় রূপোর দানা দেখতে দেখতে সেতারা বেগমের কথা মনে পড়ে গেল। সেতারা বেগমের নাকের নথ, কানের দুল, গলার তাবিজ ছাপা, এমনকি পায়ের নূপুর সবই রূপোর ছিল। সেতারা যখন এগুলো পরে তার সামনে আসত, তখন সে যেন সত্যি সত্যি গোমতীর একাদশী চাঁদের রাতে গোমতীকন্যা হয়ে যেত। তাকে অমোঘ আহ্বানে ডাকত।
আনিস সেতারা বেগমকে ডাকত রূপোর কন্যা বলে।
‘গোমতীর একাদশী চাঁদ’— আনিসের দ্বিতীয় কবিতার বইয়ের নাম। এই নামে বইটা বের করার পেছনের ঘটনাটা আনিসের মনে পড়ে গেল। দুই বছর আগে এমনই এক বর্ষার মওসুমে, বৃহস্পতিবারের এক পড়ন্ত বিকেলে স্কুলের কী এক মিটিং শেষে বাড়ি ফিরছিল। শুক্র ও শনিবার স্কুলে সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রায় প্রতি শুক্র-শনিবারে সে মাকে দেখতে তাদের আঁধারিয়া গ্রামে চলে যায়। বশির নৌকা নিয়ে আসে তাকে নিতে।
সেদিনও বশির যথারীতি নৌকা নিয়ে অনুতপুর ঘাটে আসে। শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে নৌকা ঘাট আধা কিলোমিটার দূরত্বের পথ। আনিস যেই স্কুলের গেইট পেরিয়ে হেঁটে নৌকা ঘাটের দিকে পা বাড়ায়, ঠিক তখনই পেছন থেকে কে একজন ডেকে ওঠে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, সেতারা বেগম।
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি এখানে?’
সেতারা বেগম বলে, ‘বাড়িত যামু।’
‘বাড়িতে যাবে ভালো কথা। এদিকে কেন? তোমাদের বাড়ি তো ওদিকে?
‘আপনাগো বাড়িত যামু।’
‘আঁধারিয়া গ্রামে?’
‘আর কই যামু?’
আনিস মৃদু হাসে। বলে, ‘আঁধারিয়া গ্রামে যাবে, ভালো কথা। আমাদের বাড়িতে তো যাবে না। যাবে তোমার শ্বশুর বাড়িতে।’
সেতারা বেগম খলবল করে হেসে বলে, ‘ওই একই কথা। আমারে আপনার লগে নাওয়ে লইয়া যাইতে হইব।’
আনিস প্রথমে একটু দ্বিধায় পড়ে। পরক্ষণ ভাবে, এটাই তো প্রথম নয় যে সেতারা বেগম তার নৌকায় যেতে চাচ্ছে। এর আগেও সে দুইবার তার নৌকায় করে আঁধারিয়া গ্রাম থেকে অনুতপুর এসেছে। একবার অনুতপুর থেকে আঁধারিয়া গ্রামে।
আনিস এমনিই জিজ্ঞেস করে, ‘পাগলা কই?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হেইডা জানমু কেমনে? আমি তো গত চাইর দিন ধইরা আমাগো অনুতপুর গেরামে। নিশ্চয়ই হেয় দরগায় গিয়া পইড়া আছে।’
‘চার দিন ধরে অনুতপুর গ্রামে, আমাকে জানালে না?’
‘জানাইলে কী করতেন, আমার বাপের বাড়িত আইতেন?’
‘সেটা কি সম্ভব?’
‘হেইডা সম্ভব না ক্যান?’
‘কেন সম্ভব না, সেটা তুমি ভালো করেই বোঝো।’
‘কী ভালা কইরা বুঝমু?’
‘আরে, ধুর, কী সব প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছ!’
সেতারা বেগম খলবল করে হাসে- হিহি, হিহি। বলে, ‘আমি কি ভুল কথা জিগাইতাছি?’
আনিস এদিকওদিক তাকায়। এমনিই। বলে, ‘আস্তে, আস্তে বলো। আর এমনে হাসবে না। এখন তুমি বলো, পাগলা কি নিতে আসেনি?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হেয় আইলে কি আপনার লগে যাইতাম?’
আনিস বিরক্ত হওয়ার গলায় বলে, ‘আরে ধুর! তুমি সিধা প্রশ্নের সিধা উত্তর দাও তো!’
সেতারা বেগম আবার খলবল করে হেসে ওঠে। বলে, ‘না। কাইল আসার কথা আছিল। আসে নাই।’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘ও, তাই?’
সেতারা বেগম বলে, ‘হ, আইজ ভাবছিলাম আপনের স্কুলে যামু। পরে ভাবলাম, আপনে তো আইজকা বাড়িত যাইবেনই। পথে ধরমু। আপনের আইজ এত দেরি হইল যে?’
‘স্কুলে মিটিং ছিল।’
‘সেই কখন থাইকা গেইটের কাছে দাঁড়াইয়া আছি। একবার তো ভাবতেছিলাম, আপনে আমার চোখরে ফাঁকি দিয়া চইলা গেছেন।’
‘তুমি কী যে বলো এর কোনো আগা-মাথা নেই!’
সেতারা বেগম আবারও খলবল করে হাসে, হিহি, হিহি।
আনিস বলে, ‘হয়েছে, এবার চলো। এভাবে কথার পেছনে কথা বাড়ালে নৌকা ছাড়তে ছাড়তেই রাত হয়ে যাবে।’
সেতারা বেগম কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায়। কী ভেবে একটু মৃদু হাসে। বলে, ‘চলেন।’
সেদিন অনুতপুর ঘাট থেকে নৌকা ছাড়তে ছাড়তেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। নদীতে স্রোতের বিপরীতে অনুতপুরের বাঁক পেরোতে পেরোতেই রাতটা পুরোপুরি নেমে আসে। আনিস ও সেতারা বেগম বসে নৌকার সামনের গলুইর দুই পাশে, শঙ্কিতভাবেই সামান্য দূরত্ব রেখে। বশির নৌকা চালাচ্ছে। তার সামনে ওরা এমন কিছু করবে না যাতে গ্রামে কানকথা হয়। যদিও বশির কখনই কিছু বলবে না। বেশ বিশ্বস্ত সে।
অনুতপুরের বাঁক পেরোতেই আনিস দেখে আকাশে একটা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় গোমতীর জলে রূপোলি বিচ্ছুরণ হচ্ছে। সেতারা বেগমের পরনে তখন রূপোর গহনা। জলের রূপোলি বিচ্ছুরণের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে যেন সেতারা বেগমের সেই রূপোর গহনা বিচ্ছুরণ ছড়াচ্ছে। আনিস হিসেব করে দেখে, চাঁদটা শুক্লপক্ষের একাদশতম রাতের চাঁদ।
আনিস সেতারা বেগমকে দেখিয়ে বলে, ‘দেখো, দেখো, একাদশীর চাঁদ।’
সেতারা বেগমের একটা গুণ ছিল, সে না বুঝেও সায় দিত। মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল। কবিতা তেমন বুঝত না। কিন্তু আনিস যখন কবিতা পড়ত, সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনত। মাঝেমধ্যে সুন্দর মন্তব্য করেও বসত।
সেতারা বেগম আনিসের কথায় চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হ হ, চানটা সুন্দর। আপনে চানটার নাম কী কইলেন?
‘শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদ।’
‘আইচ্ছা, আইচ্ছা। শুকপাখির চান।’
আনিস হাসে।
সেরাতে আনিস বাড়ি ফিরেই এক দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলে। পরে সে সেই দীর্ঘ কবিতা সহ আরও কিছু কবিতা নিয়ে দ্বিতীয় কবিতার বই বের করে— ‘গোমতীর একাদশী চাঁদ।’
গোমতীর ভাটিতে একটা মিথ আছে, শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদের কোনো কোনো রাতে গোমতীকন্যা জলে নেমে আসে। বেগানা পুরুষকে প্রেমের আহ্বানে ডাকে- ‘আয়, আয়, আয়।’ তখন এ অঞ্চলের কোনো না কোনো গ্রামের কোনো না কোনো যুবতী গোমতীর জলে নেমে আসে। পরদিন তার লাশ পাওয়া যায়।
সেতারা বেগমও চারদিন আগে এমনই শুক্লপক্ষের একাদশী চাঁদের রাতে গোমতীর জলে ডুবে মারা যায়...।
নৌকা ছাড়ার সময় বশির যাই বলুক, নৌকাটা সে টেনে নিয়ে যাবে, এখন সে ঠিক টেনে নিয়ে যেতে পারছে না। একে তো পশ্চিম থেকে পুবে, নৌকাটা চলছে স্রোতের বিপরীতে। তার ওপর বর্ষার বান এখন। সে বৈঠা বাইছে শব্দ করে— ও হা, ও হা, ও হা। বৈঠার আঘাতে জলের শব্দ হচ্ছে— ঝপাৎ ঝপাৎ ঝপাৎ।
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘বশির, নৌকা কোথাও ভিড়াবি নাকি?’
বশির পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যান, ভাইজান?’
‘বৃষ্টি যে হারে বাড়ছে, তুই তো নৌকা চালাতে পারছিস না।’
‘না, না, অখন নাও কোনোখানে ভিড়ামু না। তাড়াতাড়ি বাড়িত গেলে ভালা হইব। মনে হয় তুফান আইব।’
আনিস বশিরের কথা শুনে ঘাড় বাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। বৃষ্টি হচ্ছে বেশ। অবিরত ধারার বৃষ্টি। নদীর জলে বৃষ্টি পড়ার শব্দ হচ্ছে— ঝম ঝম, ঝম ঝম। সঙ্গে বাতাস বইছে ঠিকই, তবে বাতাসের তীব্রতা তেমন নেই। নদীর দুই ধারের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত ধূসর থেকে আরও ধূসরতর হচ্ছে।
আনিস দৃষ্টিটা ছইয়ের ভেতরে টেনে এনে বশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘না, বশির, তুফান আসবে না।’
বশির বলল, ‘ভাইজান, তারপরও নাও না ভিড়াইয়া বাড়িত চইলা যাওয়াই ভালা।’
আনিস আন্তরিকতার সুরে বলল, ‘যাবি, যা। তোর কষ্ট না হলেই হয়।’
‘আমার কোনো কষ্ট হইব না, ভাইজান।’
‘ঠিক আছে, চালা। যখন না পারবি, আমাকে দিস। আমি নৌকা চালাব।’
‘না না, ভাইজান, আপনের চালাইতে হইব না। আপনে অখন ছইয়ের মুখের কাপড়টা নামাইয়া দেন। নইলে ভিইজা যাইবেন।’
‘না রে, বশির। একটু একটু ভিজতেই ভালো লাগছে।’
বশির হাসল। কিছু বলল না।
আনিস আবার দিঘল দৃষ্টি মেলে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকাল। বৃষ্টি হওয়ার কারণে এখন বিকেলটা পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তবে এখন যে মধ্যবিকেল সেটা বোঝা যাচ্ছে। তার শার্টের পকেটেই মোবাইলটা। কিন্তু তার মোবাইলটা পকেট থেকে নিয়ে সময়টা দেখতে ইচ্ছে হলো না। এমনই। সে হাতে ঘড়ি পরে না। সে আগে যে ঘড়ি পড়ত না, তা নয়। মোবাইল আসার পর সে ঘড়ি পরা ছেড়ে দিয়েছে।
নদীতে এখন একদল হাঁস সাঁতার কাটছে স্রোতের দিকে। উদ্ভ্রান্ত ও ভয়ার্ত গলায় ডাকছে- প্যাঁক প্যাঁক, প্যাঁক প্যাঁক। হাঁসগুলো দিশা হারিয়ে ফেলছে, বোঝা যায়। খানিকটা দূরেই ধানক্ষেতের জমিতে পুঁতে রাখা একটা বাঁশের কঞ্চিতে ধ্যানমগ্ন হয়ে একটা মাছরাঙা বসে আছে। এমন বৃষ্টির মধ্যেও কঞ্চি ছেড়ে কোথাও যাওয়ার নাম নিচ্ছে না। নদীতে থেকে ভেতরে গৃহস্থের বাড়িগুলো ভেসে আছে দ্বীপের মতো। নারিকেল গাছের ডগা, সুপারিগাছের চিরল পাতা অনবরত নড়ছে বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
আনিস বৃষ্টি দেখতে দেখতে নিজের ভেতর কেমন ক্ষয়ে গেল। তার ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল কোনো অর্বাচীন নোঙরের আহ্বানে। সেই অর্বাচীন নোঙরের আহ্বান আর কারও নয়, সেতারা বেগমের। তার তখনই মনে হলো, এতদিন সে যে ভেবে এসেছে সেতারা বেগমের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শুধুমাত্র শারীরিক, তা ঠিক নয়। সম্পর্কটা আত্মিকও ছিল। আর সেটা ভাবতেই তার মনে হলো, মনসুর পাগলার প্রতি সে অন্যায় করেছে। অক্ষম্য অন্যায়। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন