মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যেন তারুণ্যের প্রাণ কেড়ে নেয়ার এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের কান্না, স্বপ্নভঙ্গ এবং সারাজীবনের ক্ষত।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়Ñএই নিহত ও আহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। অর্থাৎ যে বয়সে একজন মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, চাকরিতে প্রবেশ করার কথা, পরিবারকে এগিয়ে নেয়ার কথা, উদ্যোক্তা হওয়ার কথা কিংবা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার কথা, সেই বয়সেই অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে সড়কে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই মৃত্যগুলোকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাব?
মোটরসাইকেল তরুণদের কাছে স্বাধীনতা ও দ্রুত চলাচলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যানজটের শহরে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো, স্বল্প খরচে যাতায়াত এবং সহজলভ্যতার কারণে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চালনা।
রাস্তায় একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়Ñ একদল তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছেন অস্বাভাবিক গতিতে। কেউ ওভারটেক করছেন, কেউ দুই গাড়ির মাঝ দিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ হেলমেট ছাড়া, কেউ আবার হেলমেট ব্যবহার করলেও তা ঠিকমতো বাঁধছেন না। রাতের সড়কে চলছে গতির প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার কখনো কখনো এই ঝুঁকিপূর্ণ চালনাই ‘স্টাইল’ কিংবা ‘রোমাঞ্চ’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। যে গতি কয়েক সেকেন্ড সময় বাঁচায়, সেই গতিই কখনো কখনো একটি পুরো জীবন কেড়ে নেয়।
মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে চালকের চারপাশে কোনো ধাতব সুরক্ষা কাঠামো নেই। ফলে দুর্ঘটনার সময় শরীর সরাসরি আঘাতের মুখে পড়ে। গতি যত বেশি হয়, দুর্ঘটনার পরিণতিও তত ভয়াবহ হয়। তাই মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কথা উঠলেই আমরা প্রায়ই চালকের দিকে আঙুল তুলি। ‘বেপরোয়া চালায়’, ‘আইন মানে না’, ‘হেলমেট পরে না’Ñএসব অভিযোগের অনেকটাই সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু চালককে দায়ী করেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?
একজন তরুণ যদি আইন ভাঙে, তাকে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবেÑআইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর? সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, মহাসড়ক কিংবা শহরের ব্যস্ত সড়কে নজরদারি কতটা কার্যকর? মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? মোটরসাইকেল বিক্রির আগে নিরাপত্তা সম্পর্কে ক্রেতাকে কতটা সচেতন করা হচ্ছে?
অর্থাৎ সড়ক নিরাপত্তার দায় শুধু চালকের নয়; সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারক, পরিবার এবং সমাজÑসবার।
মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে এখন আর শুধু পুলিশের বাঁশি কিংবা মামলা নির্ভর করে থাকার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, স্পিড গভর্নর বা অন্য কার্যকর প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ, ডিজিটাল ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় গতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একজন চালক ইচ্ছা করলেই যেন তার মোটরসাইকেলকে বিপজ্জনক গতিতে নিয়ে যেতে না পারেনÑএমন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মানুষের ভুলকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে একটি ভুলের পরিণতি মৃত্যু না হয়। বাংলাদেশকেও সেই সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ-এর দিকে যেতে হবে।
হেলমেট ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক চালক ও আরোহী মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করেন না। অনেকে শুধু পুলিশের চোখ এড়াতে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন। কেউ আবার হেলমেট মাথায় রাখলেও স্ট্র্যাপ বাঁধেন না। ফলে ‘হেলমেট পরা’ এবং ‘নিরাপদ হেলমেট ব্যবহার’Ñদুটিকে এক করে দেখা যাবে না।
মানসম্পন্ন হেলমেটের মান নির্ধারণ, বাজারে নিম্নমানের হেলমেট নিয়ন্ত্রণ এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও আরোহীÑউভয়ের জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু ‘সাবধানে গাড়ি চালান’ কিংবা ‘দ্রুত গাড়ি চালাবেন না’Ñএই ধরনের প্রচলিত বার্তা দিয়ে তরুণদের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন। তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে তাদের ভাষায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার নতুন ধরনের প্রচার চালাতে হবে। বাস্তব দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষের গল্প, দুর্ঘটনায় আহত পরিবারের সংগ্রাম এবং একটি ভুলের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণার ক্ষেত্রেও আরও সৃজনশীল হতে হবে। তরুণদের জন্য তরুণদের দিয়েই কনটেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। কারণ যে বার্তা একজন তরুণ নিজের বয়সী আরেকজন তরুণের কাছ থেকে শুনবে, সেটি হয়তো সরকারি বিজ্ঞপ্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিজ্ঞাপনে গতি, রোমাঞ্চ, ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হলে তা তরুণদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। মোটরসাইকেলকে ‘আরও দ্রুত’, ‘আরও শক্তিশালী’ বা ‘চ্যালেঞ্জ নেয়ার বাহন’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপদ চালনা, দায়িত্বশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিজ্ঞাপন শুধু পণ্য বিক্রি করে না; এটি আচরণও তৈরি করে।
মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো নিরাপদ, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি। একজন তরুণ যদি সময়মতো, নিরাপদে ও যুক্তিসংগত ভাড়ায় গণপরিবহনে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের ওপর তার নির্ভরতা কমতে পারে। তাই মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মোটরসাইকেল কমানোর কথা বললে হবে না; মানুষকে নিরাপদ বিকল্পও দিতে হবে।
১৫ হাজার মৃত্যু কি আমাদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা নয়? গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা একটি দেশের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। আরও ভয়াবহ হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশ তরুণদের। একজন তরুণের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের আয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু, কিশোর ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। তাহলে আন্তর্জাতিক যুব দিবসে আমরা যদি তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি, সড়কে তাদের নিরাপত্তার কথা না বললে সেই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকর প্রচারণা চালাতে হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে গণপরিবহন।
আমাদের অঙ্গীকার হোকÑতরুণদের গতি থামানো নয়, তাদের গতি নিরাপদ করা।
যে তরুণ আজ মোটরসাইকেলে ছুটছে, সে-ই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তার জীবন কোনোভাবেই কয়েক মিনিটের গতি, সামান্য অসচেতনতা কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্তের কাছে হার মানতে পারে না। তারুণ্যের হাতে গতি থাকুক, কিন্তু সেই গতি যেন মৃত্যুর দিকে না যায়।
আজ যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, আগামী দিনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আরও বড় হবে। আর তখন হয়তো আমরা আবারও সংখ্যা গুনবÑকতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো।
কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তখনও পাওয়া যাবে না। আর কত তরুণ প্রাণ হারালে আমরা সত্যিই বুঝব যে, এটি আর নিছক দুর্ঘটনা নয়Ñএটি প্রতিরোধযোগ্য একটি জাতীয় সংকট?
[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা যেন তারুণ্যের প্রাণ কেড়ে নেয়ার এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত এই পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার পরিবারের কান্না, স্বপ্নভঙ্গ এবং সারাজীবনের ক্ষত।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়Ñএই নিহত ও আহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। অর্থাৎ যে বয়সে একজন মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, চাকরিতে প্রবেশ করার কথা, পরিবারকে এগিয়ে নেয়ার কথা, উদ্যোক্তা হওয়ার কথা কিংবা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার কথা, সেই বয়সেই অনেকের জীবন থেমে যাচ্ছে সড়কে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই মৃত্যগুলোকে কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাব?
মোটরসাইকেল তরুণদের কাছে স্বাধীনতা ও দ্রুত চলাচলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যানজটের শহরে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো, স্বল্প খরচে যাতায়াত এবং সহজলভ্যতার কারণে মোটরসাইকেলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ চালনা।
রাস্তায় একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়Ñ একদল তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটছেন অস্বাভাবিক গতিতে। কেউ ওভারটেক করছেন, কেউ দুই গাড়ির মাঝ দিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ হেলমেট ছাড়া, কেউ আবার হেলমেট ব্যবহার করলেও তা ঠিকমতো বাঁধছেন না। রাতের সড়কে চলছে গতির প্রতিযোগিতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার কখনো কখনো এই ঝুঁকিপূর্ণ চালনাই ‘স্টাইল’ কিংবা ‘রোমাঞ্চ’ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। সমস্যাটা এখানেই। যে গতি কয়েক সেকেন্ড সময় বাঁচায়, সেই গতিই কখনো কখনো একটি পুরো জীবন কেড়ে নেয়।
মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে চালকের চারপাশে কোনো ধাতব সুরক্ষা কাঠামো নেই। ফলে দুর্ঘটনার সময় শরীর সরাসরি আঘাতের মুখে পড়ে। গতি যত বেশি হয়, দুর্ঘটনার পরিণতিও তত ভয়াবহ হয়। তাই মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জীবন রক্ষার মৌলিক শর্ত।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কথা উঠলেই আমরা প্রায়ই চালকের দিকে আঙুল তুলি। ‘বেপরোয়া চালায়’, ‘আইন মানে না’, ‘হেলমেট পরে না’Ñএসব অভিযোগের অনেকটাই সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু চালককে দায়ী করেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব?
একজন তরুণ যদি আইন ভাঙে, তাকে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবেÑআইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর? সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, মহাসড়ক কিংবা শহরের ব্যস্ত সড়কে নজরদারি কতটা কার্যকর? মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কী? মোটরসাইকেল বিক্রির আগে নিরাপত্তা সম্পর্কে ক্রেতাকে কতটা সচেতন করা হচ্ছে?
অর্থাৎ সড়ক নিরাপত্তার দায় শুধু চালকের নয়; সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, মোটরসাইকেল প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারক, পরিবার এবং সমাজÑসবার।
মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে এখন আর শুধু পুলিশের বাঁশি কিংবা মামলা নির্ভর করে থাকার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, স্পিড গভর্নর বা অন্য কার্যকর প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ, ডিজিটাল ট্রাফিক ইনফোর্সমেন্ট এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্বয়ংক্রিয় গতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একজন চালক ইচ্ছা করলেই যেন তার মোটরসাইকেলকে বিপজ্জনক গতিতে নিয়ে যেতে না পারেনÑএমন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মানুষের ভুলকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে একটি ভুলের পরিণতি মৃত্যু না হয়। বাংলাদেশকেও সেই সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ-এর দিকে যেতে হবে।
হেলমেট ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক চালক ও আরোহী মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করেন না। অনেকে শুধু পুলিশের চোখ এড়াতে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন। কেউ আবার হেলমেট মাথায় রাখলেও স্ট্র্যাপ বাঁধেন না। ফলে ‘হেলমেট পরা’ এবং ‘নিরাপদ হেলমেট ব্যবহার’Ñদুটিকে এক করে দেখা যাবে না।
মানসম্পন্ন হেলমেটের মান নির্ধারণ, বাজারে নিম্নমানের হেলমেট নিয়ন্ত্রণ এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও আরোহীÑউভয়ের জন্য হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি নিয়মিত এনফোর্সমেন্ট নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু ‘সাবধানে গাড়ি চালান’ কিংবা ‘দ্রুত গাড়ি চালাবেন না’Ñএই ধরনের প্রচলিত বার্তা দিয়ে তরুণদের আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন। তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে তাদের ভাষায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, যুব সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার নতুন ধরনের প্রচার চালাতে হবে। বাস্তব দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষের গল্প, দুর্ঘটনায় আহত পরিবারের সংগ্রাম এবং একটি ভুলের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণার ক্ষেত্রেও আরও সৃজনশীল হতে হবে। তরুণদের জন্য তরুণদের দিয়েই কনটেন্ট তৈরি করা যেতে পারে। কারণ যে বার্তা একজন তরুণ নিজের বয়সী আরেকজন তরুণের কাছ থেকে শুনবে, সেটি হয়তো সরকারি বিজ্ঞপ্তির চেয়ে বেশি কার্যকর হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিজ্ঞাপনে গতি, রোমাঞ্চ, ঝুঁকি ও প্রতিযোগিতাকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হলে তা তরুণদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। মোটরসাইকেলকে ‘আরও দ্রুত’, ‘আরও শক্তিশালী’ বা ‘চ্যালেঞ্জ নেয়ার বাহন’ হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপদ চালনা, দায়িত্বশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিজ্ঞাপন শুধু পণ্য বিক্রি করে না; এটি আচরণও তৈরি করে।
মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো নিরাপদ, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি। একজন তরুণ যদি সময়মতো, নিরাপদে ও যুক্তিসংগত ভাড়ায় গণপরিবহনে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের ওপর তার নির্ভরতা কমতে পারে। তাই মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মোটরসাইকেল কমানোর কথা বললে হবে না; মানুষকে নিরাপদ বিকল্পও দিতে হবে।
১৫ হাজার মৃত্যু কি আমাদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা নয়? গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা একটি দেশের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। আরও ভয়াবহ হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশ তরুণদের। একজন তরুণের মৃত্যু মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়। তার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি পরিবারের আয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু, কিশোর ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। তাহলে আন্তর্জাতিক যুব দিবসে আমরা যদি তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি, সড়কে তাদের নিরাপত্তার কথা না বললে সেই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকর প্রচারণা চালাতে হবে। মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষা পরিবর্তন করতে হবে। নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত করতে হবে গণপরিবহন।
আমাদের অঙ্গীকার হোকÑতরুণদের গতি থামানো নয়, তাদের গতি নিরাপদ করা।
যে তরুণ আজ মোটরসাইকেলে ছুটছে, সে-ই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তার জীবন কোনোভাবেই কয়েক মিনিটের গতি, সামান্য অসচেতনতা কিংবা একটি ভুল সিদ্ধান্তের কাছে হার মানতে পারে না। তারুণ্যের হাতে গতি থাকুক, কিন্তু সেই গতি যেন মৃত্যুর দিকে না যায়।
আজ যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, আগামী দিনে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আরও বড় হবে। আর তখন হয়তো আমরা আবারও সংখ্যা গুনবÑকতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো।
কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তখনও পাওয়া যাবে না। আর কত তরুণ প্রাণ হারালে আমরা সত্যিই বুঝব যে, এটি আর নিছক দুর্ঘটনা নয়Ñএটি প্রতিরোধযোগ্য একটি জাতীয় সংকট?
[লেখক: অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন]

আপনার মতামত লিখুন