কাদের সিদ্দিকী নতুন তথ্য জানিয়েছেন। ১৪ আগস্ট রাত ১২ টার পর থেকেই তিনি ঢাকার রাস্তায় বেশ কয়েকটি ট্যাংক দেখতে পান। ছুটে যান প্রথমে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে, পরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধুকে উদ্বেগের কথা জানালে তিনি কাদের সিদ্দিকীকে দুশ্চিন্তা করতে বারন করেন। সেই রাত ও পরদিন এবং পরবর্তীতে নানা অজানা বিষয় কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন সংবাদের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদের কাছে।
সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: ৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে দুটো ঘটনা আপনি জানিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট গভীর রাতে ৩২ নম্বর বাড়িতে আপনি গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা হয়। আর পরবর্তীতে আপনি বিদ্রোহ করেছিলেন। দেশের মধ্যে থেকেই করতে চেয়েছিলেন। পরে আপনাকে ভারতে চলে যেতে হয়েছে।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ওই দিনের কথা যদি বলেন, তাহলে ১৪ই আগস্ট আমার মা তখনকার দিনের পিজি হাসপাতালে ছিলেন। সাধারণত আমি ৮:০০ টা ৮:৩০ টার দিকে মাকে দেখতে যেতাম, ১০:০০ টায় চলে আসতাম। কিন্তু সেদিন এতো লোক এসেছিল যে আমি ১১:০০ টায় মোহাম্মদপুরের বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। মার কাছ থেকে বেরিয়েছি ১২:৩০ টা পৌনে ১:০০ টায়। বঙ্গবন্ধুর ওখানে গিয়ে পৌঁছেছি ১:০৫-৭ মিনিটে।
রাশেদ আহমেদ: রাতের বেলা?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: জী, রাত। ওটাকে আপনি ১৫ই আগস্ট বলতে পারেন। আমি যখন পিজি থেকে বের হই, সোজা উত্তরে না এসে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ওই রাস্তা ধরেছিলাম। তো এখন বোধ হয় নেই, পুলিশ কন্ট্রোল রুম ছিল একটা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোনাতে। সেখানে আমি একটা ট্যাংক দেখেছি। এরপরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের সামনে একটা ট্যাংক দেখেছি। এখন প্রধান বিচারপতির ভবন যেখানে, ওইখানে আমি একটা ট্যাংক দেখেছি। ওখান থেকে বের হয়ে যখন মেইন রাস্তায় উঠেছি, এখন ইন্টারকন্টিনেন্টালই বানাইছে বোধ হয়। আগেও ইন্টারকন্টিনেন্টাল নাম ছিল। ওখান থেকে মোড় নেওয়ার পরেই আমি আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। এর পরে এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, ওর থেকে সামান্য এগিয়ে আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। ওই সময় আমার হঠাৎ মনে হয়েছে আমি যখন যাচ্ছি রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পটাতে একটু যাই। আমি আগে কোনদিন রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের ভিতরে যাইনি। তো রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের গেটে ঢুকতেই দেখি আনোয়ারুল আলম শহীদ দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার দলে ছিল। আমার দলের থেকেই তাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করছি রাস্তায় ট্যাংক দেখলাম কেন? বলছে আমি তো স্যার বলতে পারবো না। কালকে রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, এই জন্য তিনটা ট্যাংক নামানো হয়েছে। কারণ ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পুরানো ঢাকায় দুইটা গ্রেনেড ফেলা হয়েছিল। আমি বলেছি তিনটা কেন? মনে হয় বেশি দেখলাম। উনি বললেন আমি বলতে পারবো না কিন্তু আমার কাছে তিনটা ট্যাংক বেরনোর খবর আছে। রাষ্ট্রপতি এখনো ঘুমান নাই, একটু আগে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনি গিয়ে উনার কাছে শুনতে পারেন। ওখান থেকে ১০ মিনিট লাগছে, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতে। তখন গেট ছিল এতখানি উঁচু চার ফিট বোধ হয়। রিসেপশনে গিয়ে দেখি একজন ডিএসপি অফিসার বসে আছে। আমি যেতে যেতেই বলছেন, স্যার আমি রিং দেবো না আপনি দেবেন? আমি বললাম আপনিই দেন। উনি রিং দিলেন দুটো রিং মনে হয় বাজছে তার পরেই ওপর থেকে সাড়া মিলেছে। কাদের সিদ্দিকী সাহেব এসছেন। কাদের এসছে ওকে নিয়ে আসো। আমাকে ওই ভদ্রলোক দোতলার একদম সিঁড়িতে উঠিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে ছিলেন গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এই তুই এতো রাতে? বললাম মাকে দেখে এলাম সেখান থেকে এলাম। তোর মা ঠিক আছে? আমি তো তাকে সন্ধ্যায় দেখে এসেছি। আমি বলছি না মা ঠিক আছে। তাইলে আসলি কেন? আমি যখন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের ওদিক দিয়ে ঘুরে আসি সেখানে ৪টা ট্যাংক দেখেছি। আরও এগিয়ে আমি আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। মনে হয় আমি আরেকটা দেখেছি। তখন বললেন কি বলিস? তুই জানিস না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রেনেড ফাঠাইছে, পুরানো ঢাকায় বোমা ফাটাইছে তার জন্য আমি তিনটা ট্যাংক নামতে দিছি। আমি বললাম না ৩টা না আমি বেশি দেখেছি। আরে তুই মুক্তিযুদ্ধ করে একটু আলাদা রকম হয়ে গেছিস। বড় সতর্ক হয়ে গেছিস। একটা ট্যাংক হয়তো তুই দুই বার দেখছিস। আমি বললাম না না। আমি ছেলেবেলায় স্কুলে যখন পড়তাম অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। আমি জ্যামিতি বীজগণিত পারতাম না। শুধু পাটিগণিতের উপর পরীক্ষা দিয়ে আমি পাস করেছি। ৪০ এ আমি ৪০ পেয়ে পাস করেছি। তাই আমার গুনতিতে ভুল হয়নি। তখন পিঠে হাত দিয়ে বললেন তুই এখন যা, চিন্তা করিস না। যদি সম্ভব হয় ইউনিভার্সিটি আসিস। সেই দেখাই যে শেষ দেখা হবে এটা ভাবি নাই।
আমি বাড়িতে এসে শুয়ে পড়েছিলাম। ৫ টার দিকে আমার ছোট বোন সুশু এসে দরজা ধাক্কাচ্ছিল ছোট ভাই ছোট ভাই দরজা খোলেন। আমার পরিবারে লতিফ ভাই হলো বড় আর আমি হলাম তার ছোট। আমাদের আরও ৪টি ভাই আছে। দরজা খোল... দরজাটা খুলেছি যে বলছে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। দূর কি বলিস! বলছে হ্যাঁ রহিমা আপা ফোন করেছে আপনারা ফোন এ শোনেন। তখন তো মোবাইল ছিল না। যেয়ে ধরতে ই বলতেছে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। সেনাবাহিনী ক্যু করেছে। আপনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। ক্যু কাকে বলে? এর অর্থ কি আমি তখনও জানতাম না। ওই প্রথম আমি এই শব্দের অর্থ জানলাম। এরপরে রেডিও খুলে শুনি ডালিম অসংলগ্ন ভাবে বলতেছিল শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে। এরকম নানান কিছু। আমার কিন্তু সত্যিই তখনও বিশ্বাস হয়নি। এবং আজকে আপনাকে যেমন বলেছি যে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত। সেদিন কিন্তু আমার মনে হয়েছিল যে কোনো বাঙালিকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মারা যাবে না। বঙ্গবন্ধুকে মারতে হলে অন্য মানুষ আনতে হবে, অন্য দেশের মানুষ। তা কিন্তু হয়নি। বাঙালি নামধারীদের দিয়েই বঙ্গবন্ধুকে মারানো সম্ভব হয়েছে। আমি সেই সময় ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম যাচ্ছিলাম রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পের দিকে। সেখানে গণভবনের মোড়ে একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি আমাকে আটকিয়েছিলেন। তার নাম খুব সম্ভবত মনসুর আহমেদ। কোন দিক কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে। আপনি জানেন না? বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। জী আমি শুনেছি তাই যাচ্ছি। না ওদিকে যাবেন না। না জেনে আপনি রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পেও যাবেন না। কেন উনি ফিরতে বলছিলেন কেন আমি ফিরেছিলাম সেটা আমি আজকে বলতে পারব না। কিন্তু আমি ফিরেছিলাম। ওখান থেকে ফিরে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের বাসায় যাই। মোহাম্মদ মোদাব্বের মুসলিম সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। পশ্চিমবঙ্গে জন্ম তার। এখানে ইকবাল রোডে বাড়ি। স্বাধীনতার পর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তার বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। তার বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রথম ধাক্কাটা তারাই সামলান। তার এক ছেলে ছিল এয়ারফোর্সে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকবার হেলিকপ্টার চালিয়েছে। তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে কিছুই জানা গেল না। আমি সেই সময় মান্নান সাহেবকে ফোন করেছিলাম আমাদের নেতা। তিনি যথার্থ বলেছিলেন যে আগে নিজেকে সেফ করো তারপরে যেটাই করার করবে। এরপরে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ফোন করেছিলাম। আমি খুবই ব্যথিত হয়েছিলাম। তার প্রথম কথা ছিল উনি নিজেও মরেছে আমাদেরকেও মেরে গেছে। তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এরপরে ফোন করেছিলাম মনসুর ভাইকে। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে এই একমাত্র মানুষ যিনি সত্যিকারের একজন রাজনৈতিক নেতা সাহসী নেতার মতো বলেছিলেন তোমরা যেখানে থাকবে যা করবে আমাকে জানালেই আমাকে সাথে পাবে। তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম পাইনি। কামরুজ্জামান সাহেবকেও পাইনি।
জিয়াউর রহমানকে ফোন করেছিলাম।
রাশেদ আহমেদ: আপনি?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: জী।আমি নিজে।
রাশেদ আহমেদ: ১৫ তারিখে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ১৫ তারিখে। আসলে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একটা আমার সম্পর্ক ছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই। আমি মুক্তিযুদ্ধে তাকে খুব সিনসিয়ার দেখেছি। আমার হাতে পায়ে গুলি লাগলে আমি যখন ভারতের তুরাতে গিয়েছিলাম তখন তুরাতেই জিয়াউর রহমানের ব্যাটালিয়ন ছিল। তখন ওটা ব্যাটালিয়ন না হয়ে ওটা ব্রিগেড হয়েছিল। তিন ব্যাটালিয়ন শূন্য ছিল। অরিজিনালি ৮ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য তখন তার কাছে হয়তো ৪০০-৫০০ এর মতো ছিল। কিন্তু ওখানে তারা সৈন্য সংগ্রহ করে ২৪০০-২৫০০ যেটা একটা ব্রিগেডে থাকে তাই করেছিলেন। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন তার পুরা ব্রিগেডই ছিল। উনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানের আচরণ করেছেন। অলি আহমেদ আরও কারা কারা যেন ছিল সবাই। খুব উদ্বেল ছিলেন কারণ তারা বর্ডার ক্রস করে খুব অশান্তিতে ছিলেন। সব সময় উনাদের বাংলাদেশে কি হচ্ছে কিভাবে হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবতে হতো চিন্তায় থাকতেন। আর অন্য একটা দেশে গেলে যা খুশি তাই করা যায় না। অনেক কিছু যদিও করা গেছে কিন্তু তারপরেও একটা মুক্ত স্বাধীন মানুষের যে অবস্থা পরের দেশে সশস্ত্র বাহিনীর সে অবস্থা থাকে না। তো সেই জন্যেই জিয়াউর রহমানকে তখন থেকে দেখেছি। এবং এটাও বলবো যে তার মৃত্যু পর্যন্ত আমার যতটুকু সম্পর্ক ছিল। কখনো অশ্রদ্ধা বা আত্মঅহমিকার কিছু আমি দেখতে পাইনি।
সেদিন জিয়াউর রহমান আমাকে বলেছিলেন, ভাই আমি জানি না, আপনি নিরাপদে থাকেন, সেফ থাকেন তারপরে যা করবেন, পরে করেন। এইটুকুই কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুকে তো আর ১৫ তারিখ শুক্রবার আর পাইনি।
রাশেদ আহমেদ: তারপর আপনাকে কি গাবতলীর ওদিক দিয়ে চলে যেতে হয়েছে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ১৫ তারিখেই আমি ঢাকা ত্যাগ করতে চাচ্ছিলাম। আমি খুব সম্ভবত ১৫ তারিখ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। যারা বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছে তাদের পক্ষের লোকেরা ৭:৩০ টার দিকে বোধ হয় আমার বাড়িতে এসছিল। তখন আমার মা ছিলেন পিজি হাসপাতালে। আমার বাসায় টেলিভিশনের ওপরে বড় ভাইয়ের মেয়ে, ভাবি, আমার চাচি, বড় ভাইয়ের চাচি শাশুড়ি এদের একটা ছবি ছিল। ওটা দেখেই বড় ভাইয়ের চাচি শাশুড়িকে বলছে এই যে এই যে উনার মা। তখন উনি তো চট্টগ্রামের মানুষ চট্টগ্রামের ভাষায় বলছে যে আমি কাদের সিদ্দিকীর মা হইতে যাবো কেন? আমার কাদের সিদ্দিকীর মা হওয়ার সৌভাগ্য আছে? তখন তারা ধাপধুপ করে চলে গেছে। এরপরে আবার এসেছে বোধ হয় ৬ দিন না ৭ দিন পরে সব জিনিস সিজার লিস্ট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তো আমি সেই দিনই তো বেরিয়েছিলাম প্রথম ছিলাম ইকবাল রোডে তারপরে ছিলাম গজনবী রোডে তারপরে ছিলাম এইদিকে একটা স্টাফ কোয়ার্টার আছে মোহাম্মদপুরে। সেখান থেকে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি ৫ নম্বরে। তারপরে ছিলাম ১৯ নম্বরে উনার নাম বোধ হয় কি আর এ গণি। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী ছিলেন। উনি আমাকে মামা বলে ডাকতেন কারণ আমাদের এক খালার উনার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। সে খালা বোধ হয় আমার থেকে ২-৩ বছরের বড় ছিলেন। অসম্ভব যত্ন পেয়েছিলাম তাদের বাড়িতে। আমার তখন মনে হল যে কোনো ভাবে সীমান্ত পার হওয়া দরকার। আমি সেই জন্য সাভার হয়ে নবীনগর হয়ে টাঙ্গাইলের উপর দিয়ে পুরানো বাসস্ট্যান্ড ওখান দিয়ে সরাসরি জামালপুর হয়ে জামালপুর থেকে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে ঝগরার চর, কাইজার চর, ডোবার চর এই সমস্ত চর পার হয়ে তন্তরের পাশ দিয়ে বর্ডার ক্রস করেছিলাম।
রাশেদ আহমেদ: একাই ছিলেন নাকি?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: না আমার সঙ্গে ১০-১১ জন ছিল। আমার পা ফুলে গিয়েছিল আর এক কিলোমিটার হলে হয়তো আমি যেতেই পারতাম না। বর্ডার ক্রস করে ২০০ থেকে ৩০০ গজ যাওয়ার পরে সেটাও তখন মনে হয় নো ম্যানস ল্যান্ড। আমি সেন্স হারিয়েছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর বিএসএফের জোয়ানরা ওখান থেকে খুব বেশি হলে ১ কিলোমিটার হবে। দুই হাত কাঁধে দিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। ২-৩ ঘণ্টা একেবারেই কোনো বোধশক্তি ছিল না। প্রথম নিয়ে গেল ৬০০-৭০০ ফিট উপরে একটা টেন্টের মধ্যে। রাত্রি ৯:০০ টার দিকে ওখান থেকেও ৫-৬ শ গজ উপরে নিয়ে যায়। আমি তখন বললাম না এদের ছাড়া আমি যাবো না। আমার সঙ্গে তখন মনে হয় ৮ জন ই ছিল। এই নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হলো। একটা সময় বলল আসেন সবাইকে নিয়ে গেল। আমাকে নিয়ে বসাইল ওখানকার ক্যাম্প কমান্ডার একটা নায়েব সুবেদার তার বিছানায় আমাকে দেওয়া হলো। তার পাশেই বৃটিশদের একটা ওয়ারলেস সেট ঘড় ঘড় করছিল। খাবার খেয়েছি একটু আগে ওই সুবেদারের বিছানায় আসার আগে। খাবারের মধ্যে মনে হয় কুমড়া টুমড়ার একটা তরকারি আর ডাল। আমি জানি না একজন মা হতে কতখানি তার কষ্ট লাগে। কিন্তু আমি ৪০-৪২ ঘণ্টা খাওয়া ছাড়া ছিলাম। ওই সময় খাওয়া শুরু করলে গলার মধ্যে আমি যে ব্যথা পেয়েছিলাম প্রথম লোকমাতে অনেকক্ষণ লোকমাটা আমি গিলতেও পারিনি।
রাশেদ আহমেদ: দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: গলার শুকনো থাকার কারণে। জানি না প্রসব বেদনা ওর চেয়ে কঠিন কি না কিন্তু আমার জীবনে ওর চেয়ে কঠিন ব্যথা আমি পাইনি।
রাশেদ আহমেদ: তারপর তো আপনি কিছু অর্গানাইজ করার চেষ্টা করেছিলেন বিভিন্ন সময়ে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: অবশ্যই অর্গানাইজ করেছিলাম প্রায় ১২ হাজার যোদ্ধা। তার মধ্যে ৪-৫ হাজার ই হবে গারো বর্ডারের। বাকিরা দেশের ভিতর থেকে গিয়েছেন। এখানে বলে রাখি, ভারতে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় সেই সময় ৭৫ এ ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সেই জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন হতে হতে ৭৭ সালে একটি নির্বাচন হয় সেই নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর পতন হয়। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস ১৪৩ সিট পেয়েছিল। সেই পতনের পরে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে যেমনি আমরা একজন আরেকজনের মুখ দেখতে পারি না ভারতেও এরকম মোরারজি দেশাই আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে মুখ দেখা দেখি বন্ধ ছিল। কিন্তু তারপরেও একটা মর্যাদা তাদের মধ্যে সবসময় থাকতো। আমার সঙ্গে যতবার মোরারজি দেশাইয়ের কথা হয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর নাম নিতে সবসময় ইন্দিরাজী বলেছেন। একটা শ্রদ্ধাবোধ তাদের মধ্যে এক্ষেত্রে দেখা গেছে।
মোশতাকের হাত ধরেই বঙ্গবন্ধুর হত্যা হয়েছে পরিবর্তন হয়েছে। এরপরে সাত্তার সাহেব এসছেন আর সাত্তার সাহেব পরে এসছেন বিচারপতি সায়েম। তারপরে জিয়াউর রহমান আসেন। জিয়াউর রহমানের পরে আবার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আসেন ক্ষমতায়। তার আগে সায়েম সাত্তার এসেছিলেন। এবং সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানের পথ দিয়ে ৯০ সালে এরশাদের পতনের পরে অনেকে আশা করেছিল ভেবেছিল যে আওয়ামী লীগ অবশম্ভাবীভাবে সংসদে যাবে নির্বাচিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। ভোট বেশি পেয়েও সিট কম পেয়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের ভূমিকায় যায় এবং বেগম খালেদা জিয়া নারী হিসেবে প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই সময়। এই রাজনীতি।
/

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
কাদের সিদ্দিকী নতুন তথ্য জানিয়েছেন। ১৪ আগস্ট রাত ১২ টার পর থেকেই তিনি ঢাকার রাস্তায় বেশ কয়েকটি ট্যাংক দেখতে পান। ছুটে যান প্রথমে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে, পরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। বঙ্গবন্ধুকে উদ্বেগের কথা জানালে তিনি কাদের সিদ্দিকীকে দুশ্চিন্তা করতে বারন করেন। সেই রাত ও পরদিন এবং পরবর্তীতে নানা অজানা বিষয় কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন সংবাদের বার্তা প্রধান রাশেদ আহমেদের কাছে।
সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ: ৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে দুটো ঘটনা আপনি জানিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট গভীর রাতে ৩২ নম্বর বাড়িতে আপনি গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা হয়। আর পরবর্তীতে আপনি বিদ্রোহ করেছিলেন। দেশের মধ্যে থেকেই করতে চেয়েছিলেন। পরে আপনাকে ভারতে চলে যেতে হয়েছে।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ওই দিনের কথা যদি বলেন, তাহলে ১৪ই আগস্ট আমার মা তখনকার দিনের পিজি হাসপাতালে ছিলেন। সাধারণত আমি ৮:০০ টা ৮:৩০ টার দিকে মাকে দেখতে যেতাম, ১০:০০ টায় চলে আসতাম। কিন্তু সেদিন এতো লোক এসেছিল যে আমি ১১:০০ টায় মোহাম্মদপুরের বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। মার কাছ থেকে বেরিয়েছি ১২:৩০ টা পৌনে ১:০০ টায়। বঙ্গবন্ধুর ওখানে গিয়ে পৌঁছেছি ১:০৫-৭ মিনিটে।
রাশেদ আহমেদ: রাতের বেলা?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: জী, রাত। ওটাকে আপনি ১৫ই আগস্ট বলতে পারেন। আমি যখন পিজি থেকে বের হই, সোজা উত্তরে না এসে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের ওই রাস্তা ধরেছিলাম। তো এখন বোধ হয় নেই, পুলিশ কন্ট্রোল রুম ছিল একটা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোনাতে। সেখানে আমি একটা ট্যাংক দেখেছি। এরপরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের সামনে একটা ট্যাংক দেখেছি। এখন প্রধান বিচারপতির ভবন যেখানে, ওইখানে আমি একটা ট্যাংক দেখেছি। ওখান থেকে বের হয়ে যখন মেইন রাস্তায় উঠেছি, এখন ইন্টারকন্টিনেন্টালই বানাইছে বোধ হয়। আগেও ইন্টারকন্টিনেন্টাল নাম ছিল। ওখান থেকে মোড় নেওয়ার পরেই আমি আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। এর পরে এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, ওর থেকে সামান্য এগিয়ে আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। ওই সময় আমার হঠাৎ মনে হয়েছে আমি যখন যাচ্ছি রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পটাতে একটু যাই। আমি আগে কোনদিন রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের ভিতরে যাইনি। তো রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের গেটে ঢুকতেই দেখি আনোয়ারুল আলম শহীদ দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার দলে ছিল। আমার দলের থেকেই তাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করছি রাস্তায় ট্যাংক দেখলাম কেন? বলছে আমি তো স্যার বলতে পারবো না। কালকে রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, এই জন্য তিনটা ট্যাংক নামানো হয়েছে। কারণ ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পুরানো ঢাকায় দুইটা গ্রেনেড ফেলা হয়েছিল। আমি বলেছি তিনটা কেন? মনে হয় বেশি দেখলাম। উনি বললেন আমি বলতে পারবো না কিন্তু আমার কাছে তিনটা ট্যাংক বেরনোর খবর আছে। রাষ্ট্রপতি এখনো ঘুমান নাই, একটু আগে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনি গিয়ে উনার কাছে শুনতে পারেন। ওখান থেকে ১০ মিনিট লাগছে, ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতে। তখন গেট ছিল এতখানি উঁচু চার ফিট বোধ হয়। রিসেপশনে গিয়ে দেখি একজন ডিএসপি অফিসার বসে আছে। আমি যেতে যেতেই বলছেন, স্যার আমি রিং দেবো না আপনি দেবেন? আমি বললাম আপনিই দেন। উনি রিং দিলেন দুটো রিং মনে হয় বাজছে তার পরেই ওপর থেকে সাড়া মিলেছে। কাদের সিদ্দিকী সাহেব এসছেন। কাদের এসছে ওকে নিয়ে আসো। আমাকে ওই ভদ্রলোক দোতলার একদম সিঁড়িতে উঠিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে ছিলেন গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন এই তুই এতো রাতে? বললাম মাকে দেখে এলাম সেখান থেকে এলাম। তোর মা ঠিক আছে? আমি তো তাকে সন্ধ্যায় দেখে এসেছি। আমি বলছি না মা ঠিক আছে। তাইলে আসলি কেন? আমি যখন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউটের ওদিক দিয়ে ঘুরে আসি সেখানে ৪টা ট্যাংক দেখেছি। আরও এগিয়ে আমি আরেকটা ট্যাংক দেখেছি। মনে হয় আমি আরেকটা দেখেছি। তখন বললেন কি বলিস? তুই জানিস না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রেনেড ফাঠাইছে, পুরানো ঢাকায় বোমা ফাটাইছে তার জন্য আমি তিনটা ট্যাংক নামতে দিছি। আমি বললাম না ৩টা না আমি বেশি দেখেছি। আরে তুই মুক্তিযুদ্ধ করে একটু আলাদা রকম হয়ে গেছিস। বড় সতর্ক হয়ে গেছিস। একটা ট্যাংক হয়তো তুই দুই বার দেখছিস। আমি বললাম না না। আমি ছেলেবেলায় স্কুলে যখন পড়তাম অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। আমি জ্যামিতি বীজগণিত পারতাম না। শুধু পাটিগণিতের উপর পরীক্ষা দিয়ে আমি পাস করেছি। ৪০ এ আমি ৪০ পেয়ে পাস করেছি। তাই আমার গুনতিতে ভুল হয়নি। তখন পিঠে হাত দিয়ে বললেন তুই এখন যা, চিন্তা করিস না। যদি সম্ভব হয় ইউনিভার্সিটি আসিস। সেই দেখাই যে শেষ দেখা হবে এটা ভাবি নাই।
আমি বাড়িতে এসে শুয়ে পড়েছিলাম। ৫ টার দিকে আমার ছোট বোন সুশু এসে দরজা ধাক্কাচ্ছিল ছোট ভাই ছোট ভাই দরজা খোলেন। আমার পরিবারে লতিফ ভাই হলো বড় আর আমি হলাম তার ছোট। আমাদের আরও ৪টি ভাই আছে। দরজা খোল... দরজাটা খুলেছি যে বলছে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। দূর কি বলিস! বলছে হ্যাঁ রহিমা আপা ফোন করেছে আপনারা ফোন এ শোনেন। তখন তো মোবাইল ছিল না। যেয়ে ধরতে ই বলতেছে বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। সেনাবাহিনী ক্যু করেছে। আপনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। ক্যু কাকে বলে? এর অর্থ কি আমি তখনও জানতাম না। ওই প্রথম আমি এই শব্দের অর্থ জানলাম। এরপরে রেডিও খুলে শুনি ডালিম অসংলগ্ন ভাবে বলতেছিল শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কারফিউ জারি করা হয়েছে। এরকম নানান কিছু। আমার কিন্তু সত্যিই তখনও বিশ্বাস হয়নি। এবং আজকে আপনাকে যেমন বলেছি যে তার মৃত্যু ছিল অবধারিত। সেদিন কিন্তু আমার মনে হয়েছিল যে কোনো বাঙালিকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মারা যাবে না। বঙ্গবন্ধুকে মারতে হলে অন্য মানুষ আনতে হবে, অন্য দেশের মানুষ। তা কিন্তু হয়নি। বাঙালি নামধারীদের দিয়েই বঙ্গবন্ধুকে মারানো সম্ভব হয়েছে। আমি সেই সময় ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম যাচ্ছিলাম রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পের দিকে। সেখানে গণভবনের মোড়ে একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি আমাকে আটকিয়েছিলেন। তার নাম খুব সম্ভবত মনসুর আহমেদ। কোন দিক কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পে। আপনি জানেন না? বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। জী আমি শুনেছি তাই যাচ্ছি। না ওদিকে যাবেন না। না জেনে আপনি রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পেও যাবেন না। কেন উনি ফিরতে বলছিলেন কেন আমি ফিরেছিলাম সেটা আমি আজকে বলতে পারব না। কিন্তু আমি ফিরেছিলাম। ওখান থেকে ফিরে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের বাসায় যাই। মোহাম্মদ মোদাব্বের মুসলিম সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। পশ্চিমবঙ্গে জন্ম তার। এখানে ইকবাল রোডে বাড়ি। স্বাধীনতার পর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তার বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। তার বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রথম ধাক্কাটা তারাই সামলান। তার এক ছেলে ছিল এয়ারফোর্সে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেকবার হেলিকপ্টার চালিয়েছে। তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে কিছুই জানা গেল না। আমি সেই সময় মান্নান সাহেবকে ফোন করেছিলাম আমাদের নেতা। তিনি যথার্থ বলেছিলেন যে আগে নিজেকে সেফ করো তারপরে যেটাই করার করবে। এরপরে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ফোন করেছিলাম। আমি খুবই ব্যথিত হয়েছিলাম। তার প্রথম কথা ছিল উনি নিজেও মরেছে আমাদেরকেও মেরে গেছে। তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এরপরে ফোন করেছিলাম মনসুর ভাইকে। আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরে এই একমাত্র মানুষ যিনি সত্যিকারের একজন রাজনৈতিক নেতা সাহসী নেতার মতো বলেছিলেন তোমরা যেখানে থাকবে যা করবে আমাকে জানালেই আমাকে সাথে পাবে। তাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম পাইনি। কামরুজ্জামান সাহেবকেও পাইনি।
জিয়াউর রহমানকে ফোন করেছিলাম।
রাশেদ আহমেদ: আপনি?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: জী।আমি নিজে।
রাশেদ আহমেদ: ১৫ তারিখে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ১৫ তারিখে। আসলে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একটা আমার সম্পর্ক ছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই। আমি মুক্তিযুদ্ধে তাকে খুব সিনসিয়ার দেখেছি। আমার হাতে পায়ে গুলি লাগলে আমি যখন ভারতের তুরাতে গিয়েছিলাম তখন তুরাতেই জিয়াউর রহমানের ব্যাটালিয়ন ছিল। তখন ওটা ব্যাটালিয়ন না হয়ে ওটা ব্রিগেড হয়েছিল। তিন ব্যাটালিয়ন শূন্য ছিল। অরিজিনালি ৮ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য তখন তার কাছে হয়তো ৪০০-৫০০ এর মতো ছিল। কিন্তু ওখানে তারা সৈন্য সংগ্রহ করে ২৪০০-২৫০০ যেটা একটা ব্রিগেডে থাকে তাই করেছিলেন। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন তার পুরা ব্রিগেডই ছিল। উনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানের আচরণ করেছেন। অলি আহমেদ আরও কারা কারা যেন ছিল সবাই। খুব উদ্বেল ছিলেন কারণ তারা বর্ডার ক্রস করে খুব অশান্তিতে ছিলেন। সব সময় উনাদের বাংলাদেশে কি হচ্ছে কিভাবে হচ্ছে সেটা নিয়ে ভাবতে হতো চিন্তায় থাকতেন। আর অন্য একটা দেশে গেলে যা খুশি তাই করা যায় না। অনেক কিছু যদিও করা গেছে কিন্তু তারপরেও একটা মুক্ত স্বাধীন মানুষের যে অবস্থা পরের দেশে সশস্ত্র বাহিনীর সে অবস্থা থাকে না। তো সেই জন্যেই জিয়াউর রহমানকে তখন থেকে দেখেছি। এবং এটাও বলবো যে তার মৃত্যু পর্যন্ত আমার যতটুকু সম্পর্ক ছিল। কখনো অশ্রদ্ধা বা আত্মঅহমিকার কিছু আমি দেখতে পাইনি।
সেদিন জিয়াউর রহমান আমাকে বলেছিলেন, ভাই আমি জানি না, আপনি নিরাপদে থাকেন, সেফ থাকেন তারপরে যা করবেন, পরে করেন। এইটুকুই কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। বঙ্গবন্ধুকে তো আর ১৫ তারিখ শুক্রবার আর পাইনি।
রাশেদ আহমেদ: তারপর আপনাকে কি গাবতলীর ওদিক দিয়ে চলে যেতে হয়েছে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: ১৫ তারিখেই আমি ঢাকা ত্যাগ করতে চাচ্ছিলাম। আমি খুব সম্ভবত ১৫ তারিখ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। যারা বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছে তাদের পক্ষের লোকেরা ৭:৩০ টার দিকে বোধ হয় আমার বাড়িতে এসছিল। তখন আমার মা ছিলেন পিজি হাসপাতালে। আমার বাসায় টেলিভিশনের ওপরে বড় ভাইয়ের মেয়ে, ভাবি, আমার চাচি, বড় ভাইয়ের চাচি শাশুড়ি এদের একটা ছবি ছিল। ওটা দেখেই বড় ভাইয়ের চাচি শাশুড়িকে বলছে এই যে এই যে উনার মা। তখন উনি তো চট্টগ্রামের মানুষ চট্টগ্রামের ভাষায় বলছে যে আমি কাদের সিদ্দিকীর মা হইতে যাবো কেন? আমার কাদের সিদ্দিকীর মা হওয়ার সৌভাগ্য আছে? তখন তারা ধাপধুপ করে চলে গেছে। এরপরে আবার এসেছে বোধ হয় ৬ দিন না ৭ দিন পরে সব জিনিস সিজার লিস্ট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তো আমি সেই দিনই তো বেরিয়েছিলাম প্রথম ছিলাম ইকবাল রোডে তারপরে ছিলাম গজনবী রোডে তারপরে ছিলাম এইদিকে একটা স্টাফ কোয়ার্টার আছে মোহাম্মদপুরে। সেখান থেকে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি ৫ নম্বরে। তারপরে ছিলাম ১৯ নম্বরে উনার নাম বোধ হয় কি আর এ গণি। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী ছিলেন। উনি আমাকে মামা বলে ডাকতেন কারণ আমাদের এক খালার উনার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। সে খালা বোধ হয় আমার থেকে ২-৩ বছরের বড় ছিলেন। অসম্ভব যত্ন পেয়েছিলাম তাদের বাড়িতে। আমার তখন মনে হল যে কোনো ভাবে সীমান্ত পার হওয়া দরকার। আমি সেই জন্য সাভার হয়ে নবীনগর হয়ে টাঙ্গাইলের উপর দিয়ে পুরানো বাসস্ট্যান্ড ওখান দিয়ে সরাসরি জামালপুর হয়ে জামালপুর থেকে ব্রহ্মপুত্র পার হয়ে ঝগরার চর, কাইজার চর, ডোবার চর এই সমস্ত চর পার হয়ে তন্তরের পাশ দিয়ে বর্ডার ক্রস করেছিলাম।
রাশেদ আহমেদ: একাই ছিলেন নাকি?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: না আমার সঙ্গে ১০-১১ জন ছিল। আমার পা ফুলে গিয়েছিল আর এক কিলোমিটার হলে হয়তো আমি যেতেই পারতাম না। বর্ডার ক্রস করে ২০০ থেকে ৩০০ গজ যাওয়ার পরে সেটাও তখন মনে হয় নো ম্যানস ল্যান্ড। আমি সেন্স হারিয়েছিলাম। ঘণ্টাখানেক পর বিএসএফের জোয়ানরা ওখান থেকে খুব বেশি হলে ১ কিলোমিটার হবে। দুই হাত কাঁধে দিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। ২-৩ ঘণ্টা একেবারেই কোনো বোধশক্তি ছিল না। প্রথম নিয়ে গেল ৬০০-৭০০ ফিট উপরে একটা টেন্টের মধ্যে। রাত্রি ৯:০০ টার দিকে ওখান থেকেও ৫-৬ শ গজ উপরে নিয়ে যায়। আমি তখন বললাম না এদের ছাড়া আমি যাবো না। আমার সঙ্গে তখন মনে হয় ৮ জন ই ছিল। এই নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হলো। একটা সময় বলল আসেন সবাইকে নিয়ে গেল। আমাকে নিয়ে বসাইল ওখানকার ক্যাম্প কমান্ডার একটা নায়েব সুবেদার তার বিছানায় আমাকে দেওয়া হলো। তার পাশেই বৃটিশদের একটা ওয়ারলেস সেট ঘড় ঘড় করছিল। খাবার খেয়েছি একটু আগে ওই সুবেদারের বিছানায় আসার আগে। খাবারের মধ্যে মনে হয় কুমড়া টুমড়ার একটা তরকারি আর ডাল। আমি জানি না একজন মা হতে কতখানি তার কষ্ট লাগে। কিন্তু আমি ৪০-৪২ ঘণ্টা খাওয়া ছাড়া ছিলাম। ওই সময় খাওয়া শুরু করলে গলার মধ্যে আমি যে ব্যথা পেয়েছিলাম প্রথম লোকমাতে অনেকক্ষণ লোকমাটা আমি গিলতেও পারিনি।
রাশেদ আহমেদ: দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: গলার শুকনো থাকার কারণে। জানি না প্রসব বেদনা ওর চেয়ে কঠিন কি না কিন্তু আমার জীবনে ওর চেয়ে কঠিন ব্যথা আমি পাইনি।
রাশেদ আহমেদ: তারপর তো আপনি কিছু অর্গানাইজ করার চেষ্টা করেছিলেন বিভিন্ন সময়ে?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী: অবশ্যই অর্গানাইজ করেছিলাম প্রায় ১২ হাজার যোদ্ধা। তার মধ্যে ৪-৫ হাজার ই হবে গারো বর্ডারের। বাকিরা দেশের ভিতর থেকে গিয়েছেন। এখানে বলে রাখি, ভারতে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন হয় সেই সময় ৭৫ এ ভারতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সেই জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন হতে হতে ৭৭ সালে একটি নির্বাচন হয় সেই নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর পতন হয়। ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস ১৪৩ সিট পেয়েছিল। সেই পতনের পরে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে যেমনি আমরা একজন আরেকজনের মুখ দেখতে পারি না ভারতেও এরকম মোরারজি দেশাই আর ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে মুখ দেখা দেখি বন্ধ ছিল। কিন্তু তারপরেও একটা মর্যাদা তাদের মধ্যে সবসময় থাকতো। আমার সঙ্গে যতবার মোরারজি দেশাইয়ের কথা হয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর নাম নিতে সবসময় ইন্দিরাজী বলেছেন। একটা শ্রদ্ধাবোধ তাদের মধ্যে এক্ষেত্রে দেখা গেছে।
মোশতাকের হাত ধরেই বঙ্গবন্ধুর হত্যা হয়েছে পরিবর্তন হয়েছে। এরপরে সাত্তার সাহেব এসছেন আর সাত্তার সাহেব পরে এসছেন বিচারপতি সায়েম। তারপরে জিয়াউর রহমান আসেন। জিয়াউর রহমানের পরে আবার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ আসেন ক্ষমতায়। তার আগে সায়েম সাত্তার এসেছিলেন। এবং সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানের পথ দিয়ে ৯০ সালে এরশাদের পতনের পরে অনেকে আশা করেছিল ভেবেছিল যে আওয়ামী লীগ অবশম্ভাবীভাবে সংসদে যাবে নির্বাচিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। ভোট বেশি পেয়েও সিট কম পেয়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের ভূমিকায় যায় এবং বেগম খালেদা জিয়া নারী হিসেবে প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই সময়। এই রাজনীতি।
/

আপনার মতামত লিখুন