সংবাদ

মতামত

খাবার অপচয়ের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

খাবার মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। ক্ষুধা নিবারণের জন্য মানুষ প্রতিদিন পরিশ্রম করে, অর্থ ব্যয় করে এবং খাদ্য সংগ্রহ করে। অথচ আমাদের সমাজেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার নানা কারণে অপচয় হয়। কারও ঘরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রান্না হয়, কোথাও অনুষ্ঠানে প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নেওয়া হয়, আবার কোথাও খাবার পরিবেশন ও সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় খাবার নষ্ট হয়ে যায়।খাবারের অপচয়কে আমরা অনেক সময় স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখি। বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন, রেস্তোরাঁ কিংবা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে প্লেটে খাবার রেখে উঠে আসা যেন অনেকের কাছে বড় কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু একটি প্লেটে ফেলে রাখা খাবারের পেছনে কৃষকের শ্রম, জমি, পানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, অর্থ—সবকিছুই জড়িয়ে আছে। ফলে খাবার অপচয় শুধু একটি খাবার নষ্ট করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্পদ ও শ্রমের অপচয়ও।প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নেওয়ার সংস্কৃতিখাবার অপচয়ের অন্যতম কারণ আমাদের ভোগের মানসিকতা। কোনো অনুষ্ঠানে নানা ধরনের খাবার দেখলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্লেটে নেন। খাওয়া সম্ভব না হলেও প্লেটে পড়ে থাকা খাবার শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়।অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার আয়োজনের প্রবণতাও দেখা যায়। অতিথি কম হলেও খাবারের পরিমাণ বেশি না হলে যেন আয়োজন অসম্পূর্ণ—এমন একটি ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে।অতিথিকে ভালো খাবার খাওয়ানো অবশ্যই সৌজন্যের অংশ। কিন্তু সৌজন্য ও অপচয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আয়োজনের সৌন্দর্য খাবারের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতায়।খাবারের পেছনে কত মানুষের শ্রমআমরা যখন একটি প্লেট ভাত সামনে পাই, তখন হয়তো শুধু ভাতটুকুই দেখি। কিন্তু সেই ভাতের পেছনে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বোনা, সেচ দেওয়া, ফসলের পরিচর্যা, ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে মানুষের শ্রম রয়েছে।একইভাবে মাছ, মাংস, শাকসবজি, ফল কিংবা অন্যান্য খাদ্যের পেছনেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম।তাই খাবার নষ্ট করার আগে আমাদের একবার ভাবা উচিত—যে খাবারটি আমরা সহজে ফেলে দিচ্ছি, সেটি আমাদের প্লেটে পৌঁছাতে কত মানুষের শ্রম ব্যয় হয়েছে?খাবারের প্রতি সম্মান দেখানো মানে শুধু খাবার না ফেলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রমের প্রতিও সম্মান দেখানো।একদিকে অপচয়, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তার চিন্তাসমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের প্রতিদিনের খাবারের হিসাব করতে হয়। মাসের শুরুতে যে বাজার করা সহজ মনে হয়, মাসের শেষ দিকে সেটিই অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার মধ্যে যখন অন্যদিকে খাবার অনায়াসে ফেলে দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক প্রশ্নও তৈরি করে। অবশ্য খাবারের অপচয় বন্ধ করলেই সমাজের সব মানুষের খাদ্যসংকট দূর হয়ে যাবে—এমন সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়। তবে অপচয় কমানো খাদ্যসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।খাদ্য মানুষের অধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। তাই খাদ্য নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ একটি মানবিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত।রেস্তোরাঁ ও অনুষ্ঠানে সচেতনতা জরুরিখাবার অপচয়ের বড় একটি ক্ষেত্র হতে পারে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও খাবারের আয়োজন। এখানে আয়োজক এবং অতিথি—দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে।আয়োজকদের উচিত অতিথির সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনা করে খাবারের পরিকল্পনা করা। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রান্না না করা, সঠিকভাবে খাবার সংরক্ষণ করা এবং খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অতিথিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। একবারে অনেক খাবার প্লেটে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া যেতে পারে। কোনো খাবার ভালো না লাগলে সেটি প্লেটে তুলে রেখে দেওয়ার পরিবর্তে অল্প পরিমাণ নেওয়াই ভালো।ছোট একটি অভ্যাস বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।অপচয় বন্ধে শুধু আবেগ নয়, ব্যবস্থাপনাও দরকারখাবার অপচয় নিয়ে আমরা অনেক আবেগপূর্ণ কথা বলি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন বাস্তব ব্যবস্থাপনা।খাদ্য সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, সরবরাহব্যবস্থায় অপচয় কমানো, বাজার ও রেস্তোরাঁয় প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।কৃষকের উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহের প্রতিটি ধাপে কোথায় অপচয় হচ্ছে, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।শুধু ভোক্তাকে দায়ী করলেই হবে না। উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ভোগ—প্রতিটি পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।[লেখক :প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি]

খাবার অপচয়ের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক