বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বন্যার পানি যখন স্কুলের গেট ছাড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে, তখন সেখানে এক বিশেষ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে উঁচু কোনো স্থানে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগ মোকাবিলার হিসাব-নিকাশের এক পর্যায়ে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্কুল ভবনটি নীরবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ দেশের বর্ষাকাল প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত পরিচিত; তবে ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে এক চমকপ্রদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং নীতিনির্ধারকদেরও গভীর ভাবনায় ফেলার মতো।
“লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অফ ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশনস ইন ২০২৫” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ১০৬টি দেশ বা অঞ্চলের স্কুলগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪০টি দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এমন বিঘ্ন ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং তথ্য-উপাত্ত বলছে যে, এই সংকট ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—অর্থাৎ সেই সব দেশে, যারা এই সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী এবং যাদের এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও সবচেয়ে কম। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক অবিচারটিকেই এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বিঘ্নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আজীবন আয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষেত্রে গড়ে আঠারো দিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া ও ভবিষ্যৎ আয় কমে যাওয়ার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই এই হিসাব করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষেত্রে ঝড় ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ; এতে আনুমানিক ১০ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বন্যা (৭ কোটি শিক্ষার্থী) এবং তাপপ্রবাহ (অন্তত দশটি দেশে প্রায় ৫ কোটি শিশু)। বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসটি ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর; মূলত বন্যার কারণেই ওই মাসে ২ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'মন্থা'র প্রভাবে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেন 'মেলিসা'র কারণে ৩০ লাখের বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। ২০২৫ সালে অন্তত এগারোটি দেশে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন্যাকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও আগস্ট মাসে মৌসুমি বন্যার কারণে ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে স্কুলে ফিরতে পারেনি। একইভাবে নাইজারে বন্যার কারণে ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল শুরু হতে দুই সপ্তাহ দেরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশকে সরাসরি স্কুল বন্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; অন্যদিকে ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে বিলম্বের শিকার হয়েছে কারণ তাদের স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অথবা সেগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষে বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নেওয়ায় কোনো শিশু যদিকয়েক সপ্তাহ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে পানি সরে যাওয়ার পর সে আগের অবস্থান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার এই ঘাটতি বাড়তেই থাকে। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে—যেমন রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারের মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং অত্যন্তদরিদ্র পরিবারের সন্তান—তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া মানেই হতে পারে শিক্ষা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ২.৫ শতাংশ কমে যায় এবং এতে মেয়েশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে স্কুল ভবনগুলো প্রায়শই কোনো এলাকার সবচেয়ে মজবুত কাঠামো হওয়ায় এগুলো একই সাথে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিঃসন্দেহে এই ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমন জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার সাত মাস পরেও শত শত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। এর সমাধান স্কুলগুলোর সুরক্ষামূলক ভূমিকা কেড়ে নেওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা; যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
আরেকটি নীরব হুমকি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। ২০২৫ সালে অন্তত দশটি দেশের প্রায় ৫ কোটি শিশুর পড়াশোনা তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয়েছে; যার মধ্যে দক্ষিণ সুদান টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশু তাপমাত্রাজনিত কারণে পরিবর্তিত সময়সূচির মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও বর্ষা-পূর্ববর্তী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই স্কুলের সময়সীমা কমিয়ে আনতে বা ক্লাস স্থগিত করতে হচ্ছে। অত্যধিক তাপ প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশকে ব্যাহত করে এবং সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার মতো মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মানবিক সংকটের সম্মুখীন ২১টি দেশের মধ্যে ১৯টি দেশই ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফের সম্পূরক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৯০ লাখ বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে এই সতর্কবার্তাটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানটি হলো—বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংক্রান্ত মোট অর্থায়নের মাত্র ১.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক আরও ৬০ লাখ শিশু স্কুল-বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই মানবিক সংকটের শিকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ সংক্রান্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাকে যেন কেবল মানবিক সহায়তার সাথে জুড়ে দেওয়া কোনো গৌণ বিষয় না ভেবে একটি ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেই দাবি বাংলাদেশের জোরালোভাবে তোলা উচিত।
জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা নীতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম ‘জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা কাঠামো’ প্রণয়নে ইউনিসেফের সহায়তাও। এখনকার কাজ হলো সহনশীলতাকে শ্রেণিকক্ষের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে পরবর্তী কোনো দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের কেবল কয়েক দিনের স্কুলই বন্ধ না হয়, বরং কোনো শিশুর ভবিষ্যতের মূল্যবান বছরগুলো যেন হারিয়ে না যায়।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের কোনো গ্রামে বন্যার পানি যখন স্কুলের গেট ছাড়িয়ে উপরে উঠতে থাকে, তখন সেখানে এক বিশেষ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। পাঠদান বন্ধ হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের পরিবারের সাথে উঁচু কোনো স্থানে আশ্রয় নেয়। দুর্যোগ মোকাবিলার হিসাব-নিকাশের এক পর্যায়ে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত স্কুল ভবনটি নীরবে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ দেশের বর্ষাকাল প্রত্যক্ষ করা মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি অত্যন্ত পরিচিত; তবে ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে বিষয়টিকে এক চমকপ্রদ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, বরং নীতিনির্ধারকদেরও গভীর ভাবনায় ফেলার মতো।
“লার্নিং ইন্টারাপ্টেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অফ ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশনস ইন ২০২৫” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধুমাত্র গত বছরেই বিশ্বজুড়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ১০৬টি দেশ বা অঞ্চলের স্কুলগুলো এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর মধ্যে ৪০টি দেশে বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এমন বিঘ্ন ঘটেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছরই এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় এবং তথ্য-উপাত্ত বলছে যে, এই সংকট ক্রমশ আরও তীব্র হচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজনের পড়াশোনা জলবায়ু-জনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ কোটি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে—অর্থাৎ সেই সব দেশে, যারা এই সংকট সৃষ্টিকারী নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী এবং যাদের এই সংকটের প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতাও সবচেয়ে কম। জলবায়ু বিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মৌলিক অবিচারটিকেই এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই বিঘ্নের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আজীবন আয়ের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর ক্ষেত্রে গড়ে আঠারো দিন স্কুল বন্ধ থাকা এবং পাঠদানের সময় নষ্ট হওয়া ও ভবিষ্যৎ আয় কমে যাওয়ার সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করেই এই হিসাব করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটানোর ক্ষেত্রে ঝড় ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ; এতে আনুমানিক ১০ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে বন্যা (৭ কোটি শিক্ষার্থী) এবং তাপপ্রবাহ (অন্তত দশটি দেশে প্রায় ৫ কোটি শিশু)। বিশ্বব্যাপী আগস্ট মাসটি ছিল সবচেয়ে বিপর্যয়কর; মূলত বন্যার কারণেই ওই মাসে ২ কোটি ৮০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় 'মন্থা'র প্রভাবে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে হারিকেন 'মেলিসা'র কারণে ৩০ লাখের বেশি শিশু শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়। ২০২৫ সালে অন্তত এগারোটি দেশে দেশজুড়ে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বন্যাকে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সংখ্যাটি একটি রক্ষণশীল হিসাব। প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও আগস্ট মাসে মৌসুমি বন্যার কারণে ২ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে স্কুলে ফিরতে পারেনি। একইভাবে নাইজারে বন্যার কারণে ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর স্কুল শুরু হতে দুই সপ্তাহ দেরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশকে সরাসরি স্কুল বন্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে; অন্যদিকে ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরতে বিলম্বের শিকার হয়েছে কারণ তাদের স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল অথবা সেগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষে বাস্তুচ্যুত পরিবার আশ্রয় নেওয়ায় কোনো শিশু যদিকয়েক সপ্তাহ পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে পানি সরে যাওয়ার পর সে আগের অবস্থান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে পারে না। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার এই ঘাটতি বাড়তেই থাকে। যারা আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে—যেমন রক্ষণশীল গ্রামীণ পরিবারের মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং অত্যন্তদরিদ্র পরিবারের সন্তান—তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়া মানেই হতে পারে শিক্ষা থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়া শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা ২.৫ শতাংশ কমে যায় এবং এতে মেয়েশিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশে স্কুল ভবনগুলো প্রায়শই কোনো এলাকার সবচেয়ে মজবুত কাঠামো হওয়ায় এগুলো একই সাথে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিঃসন্দেহে এই ব্যবস্থা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচিয়ে আসছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। যেমন জ্যামাইকায় হারিকেন মেলিসার সাত মাস পরেও শত শত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেরামত করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সপ্তাহে মাত্র দুই বা তিন দিন ক্লাসে অংশ নিতে পেরেছে। এর সমাধান স্কুলগুলোর সুরক্ষামূলক ভূমিকা কেড়ে নেওয়া নয়, বরং শ্রেণিকক্ষ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা; যাতে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
আরেকটি নীরব হুমকি হলো তীব্র তাপপ্রবাহ। ২০২৫ সালে অন্তত দশটি দেশের প্রায় ৫ কোটি শিশুর পড়াশোনা তাপপ্রবাহের কারণে ব্যাহত হয়েছে; যার মধ্যে দক্ষিণ সুদান টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দেশজুড়ে স্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ শিশু তাপমাত্রাজনিত কারণে পরিবর্তিত সময়সূচির মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশেও বর্ষা-পূর্ববর্তী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঝেমধ্যেই স্কুলের সময়সীমা কমিয়ে আনতে বা ক্লাস স্থগিত করতে হচ্ছে। অত্যধিক তাপ প্রারম্ভিক শিশু-বিকাশকে ব্যাহত করে এবং সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার মতো মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে দেয়, যা তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র মানবিক সংকটের সম্মুখীন ২১টি দেশের মধ্যে ১৯টি দেশই ২০২৫ সালে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের শিকার হয়েছে। ইউনিসেফের সম্পূরক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতির মতো পরিস্থিতির কারণে এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৯০ লাখ বেশি হতে পারে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে বাংলাদেশকে এই সতর্কবার্তাটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানটি হলো—বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংক্রান্ত মোট অর্থায়নের মাত্র ১.৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আনুমানিক আরও ৬০ লাখ শিশু স্কুল-বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই মানবিক সংকটের শিকার। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ফোরামগুলোতে জলবায়ু অভিযোজন এবং ‘ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি’ সংক্রান্ত অর্থায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাকে যেন কেবল মানবিক সহায়তার সাথে জুড়ে দেওয়া কোনো গৌণ বিষয় না ভেবে একটি ‘অগ্রাধিকার খাত’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেই দাবি বাংলাদেশের জোরালোভাবে তোলা উচিত।
জলবায়ু-সহনশীল স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা নীতিতে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং জলবায়ু বিষয়ক পরিকল্পনায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম ‘জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা কাঠামো’ প্রণয়নে ইউনিসেফের সহায়তাও। এখনকার কাজ হলো সহনশীলতাকে শ্রেণিকক্ষের গভীরে পৌঁছে দেওয়া, যাতে পরবর্তী কোনো দুর্যোগের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের কেবল কয়েক দিনের স্কুলই বন্ধ না হয়, বরং কোনো শিশুর ভবিষ্যতের মূল্যবান বছরগুলো যেন হারিয়ে না যায়।
[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।]

আপনার মতামত লিখুন