সংবাদ

সাহিত্য

হোর্হে লুইস বোর্হেসের কবিতা

আত্মহত্যারাত্রিতে একটি নক্ষত্রও আর অবশিষ্ট থাকবে না।এমনকি রাত্রিও থাকবে না।আমি মরে যাব আর আমার সাথে বিলীন হয়ে যাবেঅসহনীয় সমগ্র মহাবিশ্বের সবকিছু।আমি মুছে দিব পিরামিডগুলো, মুদ্রাগুলোওমহাদেশগুলো এবং মুখগুলো।আমি মুছে দিব সমগ্র অতীতের সঞ্চয়।আমি ইতিহাসকে ধুলো করে দেব, ধুলো করে দিব ধুলোকেও । আমি শেষ সূর্যাস্তের দিকে তাকাই।আমি শেষ পাখিটার গান শুনছি।আমি কারো জন্যেই উত্তরাধিকারসূত্রে শূন্যতা রেখে যাচ্ছি না।একটি বিড়ালের প্রতিআয়নাগুলো অতোটা নীরব নয়হামাগুঁড়ি দিয়ে আসা প্রত্যুষও খুব বেশি গোপনাত্মক নয়;চন্দ্রলোকে তুমিই সেই চিতাবাঘযা অনেক দূর থেকে আমাদের দৃষ্টিতে আসে।একটি ব্যাখ্যাতীত স্বর্গীয় বিধানের কারণেআমরা অযথাই তোমাকে খুঁজে ফিরি;অনেক দূরবর্তী, এমনকি, গঙ্গা অথবা ডুবন্ত সূর্যের চেয়েও,নির্জনতা কেবল তোমার, গেপনীয়তাও তোমার।তোমার কটিদেশ মেনে নেয় আমার হাতের দীর্ঘায়িত আদর।সেই দীর্ঘ বিস্মৃত অতীত থেকে তুমি গ্রহণ করেছসংশয়ী হাতের ভালোবাসা।তুমি এখন অন্য সময়ে আছোতুমি এক আবদ্ধ জগতের অধিপতি যা একটি স্বপ্নের মতো।চাঁদ(মারিয়া কোদামাকে*)ওই সোনার ভেতর রয়েছে কত নিঃসঙ্গতা।রাতগুলোতে যে চাঁদ দেখা যায় তা সেরকম নয় আদম যেটি প্রথম দেখেছিলেন। বহু শতাব্দীর মানব জাগরণ তাকে পূর্ণ করেছে প্রাচীন কান্নায়। তাকে দেখো, সে তোমার আয়না।*মারিয়া কোদামা আর্হেন্তিনার লেখক ও অনুবাদক। তিনি ছিলেনবোর্হেসের দ্বিতীয় স্ত্রী, যিনি তাঁর স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত সাথে ছিলেন।যে কোনো মৃত্যুর জন্য অনুতাপস্মৃতি ও আশা থেকে মুক্ত, সীমাহীন, বিমূর্ত, প্রায় ভবিষ্যৎ,মৃত মানুষটি আসলে কোনো মৃত মানুষ নয়: সে আসলে মৃত্যু।মরমিবাদীদের ঈশ্বরের মতো,তাকে যা কিছইু বলা হোক না কেন, সবই অস্বীকৃত হবে।একজন মৃত মানুষ সব জায়গায়ই এক ভিনদেশি,একটি ধ্বংস এবং এই পৃথিবীতে একটি অনুপস্থিতি।আমরা তার কাছ থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নিই,আমরা তাকে রেখে দিই অতোটা রং অথবা অক্ষর দিয়ে নয়:এখানে, এই চত্বর আর তার চোখ দুটো দেখতে পায় না,ওখানে, পার্শ্বচলার পথে অপেক্ষায় পড়ে আছে তার আশা।এমনকি আমরা যা ভাবছিসেও তাই ভাবতে পারতো:আমরা চোরের মতো রাত্রি ও দিনের উপহারসমূহভাগ করে নিয়েছি।আমরা সেই সময়, আমারা সেই প্রসিদ্ধ রূপকআমরাই সেই সময়, আমরাই সেই প্রসিদ্ধ রূপক‘হেরাক্লিটাস দ্য অবস্কিউর’ থেকে পাওয়া।আমরা সেই জল, কোনো কঠিন হিরাখণ্ড নয়,যা হারিয়ে গেছে সেইটা, যা এখনো স্থির আছে সেইটা নয়।আমরা সেই নদী এবং সেই গ্রিকযে নিজেকে জলের ভেতরে দ্যাখে। যার প্রতিফলনজল হয়ে যায় পরিবর্তনশীল আয়নাতে অতঃপর ক্রিস্টালে এবং আগুনও রূপ পাল্টায়।সমুদের দিকে বহে চলাআমরা সেই নিরর্থক পূর্বনির্ধারিত নদী।ছায়ারা তাকে ঘিরে ফেলেছে।সবকিছুই আমাদের বিদায় জানায়, সবকিছুই চলে যায়।স্মৃতি কখনোই তার নিজের মুদ্রায় সিলমোহর করে না।যাহোক, কিছু জিনিস আছে যা শেষমেশ থেকে যায়কিছু জিনিস আছে যা বিলাপ করে।গোলকধাঁধাআমাকে ঘিরে রাখা পাথরের জাল জিউস নিজেওখুলে দিতে পারতেন না।আমি ভুলে গেছি— একদিন আমি কত রকমের মানুষ ছিলাম;আমি অনুসরণ করি ঘৃণিত ও একঘেঁয়ে দেয়ালের পথ,যা আমার নিয়তি।  গ্যালারিগুলো কেন যেন জটিল,বক্র হয়ে গোপন বৃত্ত এঁকে চলে বছরের শেষ প্রান্তের দিকে।দিনের পর দিন ক্ষয়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত প্রাচীরের কিনারা।ফ্যাকাশে ধুলোর মধ্যে, আমি এমন কিছু চিহ্ন দেখেছিযা আমাকে আতঙ্কিত করে। অবতল সন্ধ্যাগুলোতেবাতাস কখনো আমার দিকে বয়ে এনেছেভীষণ গর্জন, অথবা কোনো এক বিরান হাহাকারের প্রতিধ্বনি।আমি জানি, ছায়ার মধ্যে আছে অন্য আরেকজনযার নিয়তি দীর্ঘ নিঃসঙ্গতাকে ক্রমশ নিঃশেষ করে ফেলাযে নিঃসঙ্গতা এই হেডিসকে বুনে চলে, আবার খুলে দেয়,তার ভাগ্যেও লেখা আছে আমার রক্তের জন্য ব্যাকুলতাএবং আমার মৃত্যুকে গ্রাস করা।আমরা দুজনেই একে অন্যকে খুঁজি। আহা, এ-ই যদি হতো অপেক্ষার শেষ দিন। কবি পরিচিতি:আর্জেন্টিনার ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, কবি ও অনুবাদক হোর্হে লুইস বোর্হেস ২৪ আগস্ট ১৮৯৯ সালে বুয়েনস আইরেসে জন্মগ্রহণ করেন; এবং ১৯৮৬ সালের ১৪ জুন ৮৬ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষায় লেখালেখি করেছেন। তিনি মূলত ছোটগল্পকার। তবে অসংখ্য অসাধারণ কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন। সাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মেচনে জীবনব্যাপী কঠোর পরিশ্রম করেছেন। স্যামুয়েল বেকেটের সাথে যৌথভাবে ফোর্মেন্তোর পুরস্কার লাভ করেন ১৯৬১ সালে। ১৯৮০ সালে পান ‘মিগেল দে সের্বান্তেস’ পুরস্কার। এটি স্প্যানিশ সাহিত্যের সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার। অনূদিত কবিতাগুলোর উৎস আলেকজান্ডার কোলম্যান সম্পাদিত হোর্হে লুইস বোর্হেসের Selected Poems (Viking, 1999) 

হোর্হে লুইস বোর্হেসের কবিতা