সংবাদ

অনূদিত গল্প

আয়না


মূল: হারুকি মুরাকামি। অনুবাদ: পল্লব শাহরিয়ার
মূল: হারুকি মুরাকামি। অনুবাদ: পল্লব শাহরিয়ার
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

আয়না

আজ রাতে আপনারা যতগুলো গল্প শোনালেন, আমার মনে হচ্ছে সেগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে রয়েছে এমন সব গল্প, যেখানে একদিকে আছে জীবিতদের পৃথিবী, আর অন্যদিকে মৃত্যুর ওপার। আর এই দুই ভুবনের মাঝে যাতায়াতের জন্য কোনো এক অদৃশ্য শক্তি কাজ করে— ভূতপ্রেত বা এই জাতীয় অলৌকিক বিষয়গুলো এই ভাগের মধ্যেই পড়ে। আর দ্বিতীয় ভাগটি হলো মানুষের অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা বা পূর্বভাসের গল্প, যেখানে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ আগে থেকেই টের পেয়ে যান। আপনাদের বলা গল্পগুলোর প্রতিটাই কোনো না কোনোভাবে এই দুটি দলের যেকোনো একটিতে পড়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোও সাধারণত এই দুটির যেকোনো একটির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সহজ কথায়, যারা ভূত দেখেন তারা কেবল ভূত-ই দেখেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পূর্বাভাস তারা কখনোই পান না। আবার যারা আগে থেকেই ভবিষ্যৎ টের পান, তারা কখনো চোখের সামনে ভূত দেখতে পান না। কেন এমন হয় আমি জানি না, তবে মনে হয় মানুষের মনের অবচেতন ঝোঁকটা যেকোনো একদিকেই থাকে। অন্তত গল্পগুলো শুনে আমার এমনটাই মনে হলো।

অবশ্য এমন মানুষও আছেন যারা এই দুই দলের কোনোটাতেই পড়েন না যেমন আমি নিজে। আমার এই তিরিশ বছরেরও বেশি জীবনে আমি একটা ভূতের দেখাও পাইনি, কখনো কোনো পূর্বাভাস বা ভবিষ্যৎ নির্দেশক স্বপ্নও দেখিনি। একবার অবশ্য একটা ঘটনা ঘটেছিল আমি আমার দুই বন্ধুর সাথে লিফটে উঠছিলাম, ওরা দুজনেই কসম খেয়ে বলেছিল যে আমাদের সাথে লিফটে নাকি একটা ভূতও চড়ছে! কিন্তু আমি কিচ্ছু দেখিনি। ওদের দাবি ছিল, ঠিক আমার পাশেই নাকি ধূসর রঙের স্যুট পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। অথচ আমার চোখে কোনো মহিলাই পড়েনি। যতদূর মনে পড়ে, লিফটে আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউই ছিল না। সত্যি বলছি! আর ওই দুই বন্ধু আবার এমন ছেলে ছিল না যে আমার সাথে ইচ্ছে করে ইয়ার্কি মারবে। পুরো ব্যাপারটা আসলেই খুব অদ্ভুত ছিল, তবে দিনশেষে কথা একটাই আমি নিজে কখনো কোনো ভূত দেখিনি।

কিন্তু আমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল ঠিক একবারই, যা আমাকে একেবারে হাড়মাস কাঁপানো ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটা দশ বছরেরও বেশি সময় আগের, আর আজ পর্যন্ত আমি এই কথা কাউকেই বলিনি। আসলে মুখ খুলতেই ভয় লাগত। মনে হতো, এই নিয়ে কথা বললেই বুঝি ঘটনাটা আবার আমার সাথে ঘটবে। তাই কখনো নিজে থেকে প্রসঙ্গটা তুলিনি। কিন্তু আজ রাতে আপনারা প্রত্যেকেই যখন নিজের জীবনের এতসব ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা শোনালেন, তখন এই আড্ডার আয়োজক বা হোস্ট হিসেবে নিজের ঝুলির কিছু না শুনিয়ে বিদায় নেওয়াটা ঠিক দেখায় না। তাই ভাবলাম বলেই ফেলি। শুনুন তবে—

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে আমি হাই স্কুলের গণ্ডি পার হই; ঠিক তখন, যখন ছাত্র আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে। আমি ছিলাম সেই হিপ্পি প্রজন্মের ছেলে, তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ধার ধারিনি। তার বদলে জাপানের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম আর পেটের দায়ে যখন যা পেতাম কায়িক শ্রমের কাজ করতাম। আমার তখন মনে হতো, জীবন কাটানোর এটাই সবচেয়ে সৎ আর সঠিক উপায়। এখন ভাবলে মনে হয়— তখন বয়সটা কাঁচা ছিল, রক্তও গরম ছিল। তবে পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, জীবনটা কিন্তু বেশ মজাতেই কেটেছিল। সেই সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল কি ভুল তা নিয়ে ভাবি না; তবে আমাকে যদি আবার সেই সময়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আমি নিশ্চিত আবারও একই কাজ করব।

সারা দেশ ঘুরে বেড়ানোর দ্বিতীয় বছরের শরতের কথা। নিয়গাতা প্রিফেকচারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা জুনিয়র হাই স্কুলে মাস দুয়েকের জন্য নৈশপ্রহরীর কাজ পেয়ে গেলাম। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল, তাই কদিন একটু আরাম-আয়েশে কাটানোর জন্যই এই কাজটা বেছে নিয়েছিলাম।

নৈশপ্রহরীর কাজটা কিন্তু রকেট সায়েন্সের মতো অত জটিল কিছু নয়। দিনের বেলা আমি দপ্তরির ঘরে ঘুমাতাম, আর রাতে কাজ বলতে ছিল স্রেফ পুরো স্কুলটা দুবার চক্কর দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখে নেওয়া। বাকি সময়টা আমি মিউজিক রুমে গিয়ে রেকর্ড করা গান শুনতাম, লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তাম, নয়তো জিমনেসিয়ামে একা একা বাস্কেটবল খেলতাম। সত্যি বলতে, সারারাত একটা ফাঁকা স্কুলে একাকী সময় কাটানোটা কিন্তু মোটেও মন্দ ছিল না। ভয় করত? আরে ধুর, কখনোই না! বয়স যখন আঠারো-উনিশ থাকে, তখন কোনো কিছুই মানুষকে টলাতে পারে না।

আপনাদের মধ্যে কেউ কখনো নৈশপ্রহরীর কাজ করেছেন বলে মনে হয় না, তাই দায়িত্বটা ঠিক কী ছিল তা একটু বুঝিয়ে বলি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি রাতে দুবার রাউন্ড দিতে হতো একবার রাত ৯টায়, আরেকবার রাত ৩টায়। এটাই ছিল বাঁধা রুটিন। স্কুল ভবনটি ছিল তুলনামূলক নতুন, তিন তলা কংক্রিটের তৈরি। আঠারো থেকে বিশটির মতো ক্লাসরুম ছিল। স্কুলের পরিধি হিসেবে এটি খুব একটা বড় ছিল না। ক্লাসরুমগুলো ছাড়াও সেখানে একটা মিউজিক রুম, একটা হোম ইকোনমিক্স রুম, আর্ট স্টুডিও, শিক্ষক মিলনায়তন এবং প্রধান শিক্ষকের রুম ছিল। এর সাথে আলাদা একটা ক্যাফেটেরিয়া, সুইমিং পুল, জিম আর অডিটোরিয়াম তো ছিলই। আমার কাজ ছিল এই সবকটি জায়গা ঘুরে এক নজর দেখে নেওয়া।

রাউন্ড দেওয়ার সময় আমি ২০টি পয়েন্টের একটি চেকলিস্ট মেলাতাম। প্রতিটি জায়গায় গিয়ে নামের পাশে টিক চিহ্ন দিতাম শিক্ষক মিলনায়তন, টিক; সায়েন্স ল্যাব, টিক...। চাইলে অবশ্য কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে না ঘুরে, যে দপ্তরির ঘরে আমি ঘুমাতাম সেখানে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাগজে টিকগুলো বসিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি অতটা ফাঁকিবাজ বা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলে ছিলাম না। তা ছাড়া রাউন্ড দিতে খুব একটা সময়ও লাগত না। আর আমি যখন ঘুমাচ্ছি, তখন যদি কেউ ভেতরে ঢুকে পড়ে, তবে উল্টো আমার ওপরই হামলা হওয়ার ভয় থাকত।

যা-ই হোক, প্রতি রাতে ঠিক ৯টা আর ৩টায় আমি রাউন্ডে বের হতাম। বাঁ হাতে থাকত একটা টর্চলাইট আর ডান হাতে কেন্ডো খেলার কাঠের তলোয়ার। হাই স্কুলে থাকতে আমি কেন্ডো (জাপানি ঐতিহ্যবাহী তলোয়ার যুদ্ধ) খেলতাম, তাই যে কাউকে প্রতিহত করার ব্যাপারে নিজের দক্ষতার ওপর বেশ ভরসা ছিল। কোনো আনাড়ি চোর বা হামলাকারী যদি আসল ধারালো তলোয়ার নিয়েও আসত, তবুও আমি ভয় পেতাম না। মনে রাখবেন, তখন বয়সটা কাঁচা ছিল। কিন্তু আজ যদি এমন কিছু ঘটে, তবে আমি বাপের নাম ভুলে এক দৌড়ে পালাব!

ঘটনাটা ঘটেছিল অক্টোবরের শুরুর দিকের এক ঝড়ো রাতে। বছরের ওই সময়টার তুলনায় আবহাওয়াটা বেশ গুমোট আর ভ্যাপসা ছিল। সন্ধ্যার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছিল, তাই সেগুলোকে তাড়াতে দুটো মশার কয়েল জ্বালানোর কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। বাতাসের শব্দ ছিল প্রচণ্ড। সুইমিং পুলের গেটটা ভাঙা ছিল, আর বাতাসের ধাক্কায় সেটা অনবরত ‘দুমদাম’ করে খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল। ভাবলাম ঠিক করে দিই, কিন্তু বাইরে বড্ড অন্ধকার থাকায় আর হাত দিইনি। ফলে সারারাত ওটা অমন শব্দ করতেই থাকল।

রাত ৯টার রাউন্ডটা বেশ ভালোভাবেই কেটে গেল। তালিকার ২০টি জায়গাই নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে টিক দিলাম। সব দরজা লক করা ছিল, সবকিছু যার যার জায়গায় ঠিকঠাক গোছানো। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়েনি। এরপর দপ্তরির ঘরে ফিরে এলাম, রাত ৩টার অ্যালার্ম দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কিন্তু রাত ৩টায় যখন অ্যালার্মটা বেজে উঠল, ঘুম থেকে উঠেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না, তবে অনুভূতিটা একদম অন্যরকম ছিল। বিছানা ছেড়ে উঠতে একদম ইচ্ছে করছিল না, মনে হচ্ছিল কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমার গা চেপে ধরেছে, বিছানা থেকে ওঠার ইচ্ছেটাকেই দমিয়ে দিচ্ছে। অথচ আমি এমন একজন মানুষ যে অ্যালার্ম বাজামাত্রই বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠি। তাই নিজের এই অবস্থাটা নিজেই বুঝতে পারছিলাম না। অনেক জোর করে নিজেকে বিছানা থেকে তুললাম এবং রাউন্ড দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। সুইমিং পুলের গেটটা তখনও তাল মিলিয়ে দুমদাম শব্দ করে যাচ্ছিল, কিন্তু কেমন যেন মনে হলো শব্দের ধরনটা বদলে গেছে। ‘নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় আছে’ মনে মনে ভাবলাম, আর পা বাড়াতে মন সায় দিচ্ছিল না। তবে শেষমেশ মন শক্ত করলাম; যা-ই হোক না কেন, নিজের কাজটা তো করতেই হবে। একবার যদি কর্তব্যে ফাঁকি দেওয়া শুরু করি, তবে বারবারই ফাঁকি দিতে ইচ্ছে করবে, আর আমি নিজেকে সেই অভ্যাসে জড়াতে চাইনি। তাই টর্চলাইট আর কাঠের তলোয়ারটা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে পড়লাম।

রাতটা আসলেই অদ্ভুত ছিল। সময় বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়ছিল, বাতাস আরও বেশি স্যাঁতসেঁতে আর আর্দ্র হয়ে উঠছিল। আমার সারা শরীর কেমন যেন চুলকাতে লাগল, কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না। ঠিক করলাম আগে জিমনেসিয়াম, অডিটোরিয়াম আর পুলের দিকটা ঘুরে আসব। ওদিকের সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। বাতাসের ধাক্কায় সুইমিং পুলের গেটটা এমনভাবে আছাড় খাচ্ছিল, যেন কোনো পাগল মানুষ পর্যায়ক্রমে মাথা নাড়ছে আর সায় দিচ্ছে। এর কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। প্রথমে দুবার মাথা ওপর-নিচ করা— হ্যাঁ, হ্যাঁ— তারপর আবার ডানে-বামে মাথা ঝাঁকানো— না, না, না...। তুলনাটা শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগছে, আমি জানি, তবে আমার কাছে অনুভূতিটা ঠিক তেমনই হয়েছিল।

মূল স্কুল ভবনের ভেতরে পরিস্থিতি অবশ্য স্বাভাবিকই ছিল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে চেকলিস্টের পয়েন্টগুলো মিলিয়ে নিলাম। মনের ভেতর ওই অদ্ভুত ভীতি থাকা সত্ত্বেও খারাপ কিছু ঘটেনি। একটু স্বস্তি পেয়ে দপ্তরির ঘরের দিকে ফিরতে শুরু করলাম। আমার চেকলিস্টের একদম শেষ জায়গাটি ছিল বয়লার রুম। এটি ভবনের পূর্ব দিকে, ক্যাফেটেরিয়ার ঠিক পাশেই অবস্থিত অর্থাৎ দপ্তরির ঘর থেকে একদম উল্টো দিকে। এর মানে হলো, ফেরার পথে আমাকে নিচ তলার ওই দীর্ঘ করিডোর ধরে হেঁটে আসতে হবে। আর সেখানটা ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার।

যেসব রাতে আকাশে চাঁদ থাকত, করিডোরে অন্তত কিছুটা আলো পাওয়া যেত। কিন্তু চাঁদ না থাকলে সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখার উপায় থাকত না। তাই কোন দিকে যাচ্ছি তা দেখার জন্য আমাকে সামনের দিকে টর্চের আলো ফেলে এগোতে হতো। সে রাতে একটা টাইফুন খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, ফলে আকাশে চাঁদের কোনো নামনিশানাই ছিল না। মাঝেসাঝে মেঘের ফাঁক গলে একটু আলো আসছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবকিছু অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল।

আমি অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলাম। আমার বাস্কেটবল জুতোজোড়ার রাবারের তলাগুলো লিনোলিয়ামের মেঝের ওপর ঘষা খেয়ে একটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দ তুলছিল। মেঝেটা ছিল শ্যাওলা পড়া ঘোলাটে সবুজ রঙের লিনোলিয়ামের। আজ এত বছর পরেও আমি চোখ বুজলে সেই মেঝের রংটা স্পষ্ট দেখতে পাই।

করিডোরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ছিল স্কুলের মূল প্রবেশদ্বার। ওখানটা পার হওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো আরে, এটা কী? অন্ধকারের মধ্যে কী যেন একটা নড়ে উঠল! ভয়ে আমার সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। হাতের কাঠের তলোয়ারটা আরও শক্ত করে ধরে, যেদিকে জিনিসটা দেখেছি সেদিকে ঘুরলাম। জুতো রাখার তাকটার ঠিক পাশের দেওয়ালে আমার টর্চের আলোটা ফেললাম।

আর ঠিক তখনই আমি আমাকেই দেখতে পেলাম। মানে, ওটা আসলে একটা আয়না ছিল। আয়নায় স্রেফ আমার নিজের প্রতিবিম্বই ভেসে উঠেছিল। আগের রাতে তো ওখানে কোনো আয়না ছিল না, তার মানে আজ দিনের বেলার কোনো এক সময়ে ওটা ওখানে বসানো হয়েছে। ওফ! আমি যে কী পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম! ওটা ছিল লম্বায় একটা আস্ত খাড়া আয়না, যাতে মানুষের পুরো শরীর দেখা যায়। যখন বুঝলাম ওটা স্রেফ আয়নায় ভেসে ওঠা আমার নিজেরই রূপ, তখন এত ভয় পাওয়ার জন্য নিজের ওপরই বড্ড বোকামি বোধ হলো। ‘ধুর! এই সামান্য বিষয়!’ —নিজেকে নিজেই বললাম। কতটা বোকা আমি! হাতের টর্চলাইটটা নিচে নামিয়ে রেখে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিলাম। সিগারেটে একটা টান দিয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। বাইর থেকে একটা মৃদু ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালার কাচ গলে এসে আয়নাটার ওপর পড়েছিল। আর আমার পেছন থেকে সুইমিং পুলের ভাঙা গেটটা বাতাসে তখনও দুমদাম করে আছাড় খাচ্ছিল।

দুই-এক টান দেওয়ার পর হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস আমার চোখে পড়ল। আয়নার ভেতরে যে প্রতিবিম্বটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা আমি নই! বাইরে থেকে দেখতে ওটা অবিকল আমার মতোই, কিন্তু ওটা আমি ছিলাম না এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। না, ভুল বললাম। ওটা আমিই ছিলাম ঠিকই, কিন্তু ওটা ছিল আমারই অন্য এক সত্তা। এমন এক আমি যার অস্তিত্ব কখনোই থাকা উচিত নয়। আমি ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। সেই অনুভূতিটা কেমন ছিল, তা বুঝিয়ে বলা আসলেই খুব কঠিন।

তবে একটা বিষয় আমি খুব পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম আয়নার ভেতরের ওই অবয়বটা আমাকে তীব্র ঘৃণা করত। গভীর কালো সমুদ্রে ভেসে থাকা বরফখণ্ডের মতোই এক জমাটবদ্ধ, আদিম হিংসা লুকিয়ে ছিল তার ভেতরে। এমন এক ঘৃণা যা পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই কখনো কমানো সম্ভব নয়।

আমি কিছুক্ষণ একদম বোবা হয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার আঙুলের ফাঁক গলে সিগারেটটা মেঝেতে খসে পড়ল। অদ্ভুত ব্যাপার, আয়নার ভেতরের সিগারেটটাও ঠিক একইভাবে মেঝেতে পড়ে গেল। আমরা দুজন ওভাবেই নিশ্চল দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হচ্ছিল, কে যেন আমার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রেখেছে, নড়ার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আমার নেই।

অবশেষে তার হাতটা নড়ে উঠল। তার ডান হাতের আঙুলের ডগাগুলো প্রথমে নিজের থুতনি ছুঁল, তারপর ঠিক একটা পোকার মতো ধীরে ধীরে বেয়ে বেয়ে তার মুখের ওপর উঠতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি চমকে উঠে আবিষ্কার করলাম— আমিও হুবহু একই কাজ করছি! আমার মনে হলো, আমি নিজেই যেন আয়নার ওই সত্তাটার প্রতিবিম্ব হয়ে গেছি, আর সে দূর থেকে আমাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে!

আমার শরীরের শেষবিন্দু শক্তিটুকু এক করে আমি জানোয়ারের মতো এক আর্তনাদ করে উঠলাম। আর সাথে সাথেই আমাকে মাটির সাথে জমিয়ে রাখা সেই অদৃশ্য বাঁধনটা যেন একঝটকায় ছিঁড়ে গেল। আমি আমার কেন্ডো তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরে গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে আয়নাটার ওপর আঘাত করলাম। কাচ ভেঙে চুরমার হওয়ার এক বিকট শব্দ আমার কানে এলো, কিন্তু পেছনে ফিরে তাকানোর মতো সাহস বা সময় কোনোটিই আমার ছিল না। আমি এক দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে পালালাম। ঘরে ঢুকেই তড়িঘড়ি করে দরজায় তালা মারলাম এবং বিছানায় কম্বলের নিচে গিয়ে সেঁধিয়ে গেলাম। মেঝেতে ফেলে আসা জ্বলন্ত সিগারেটটার কথা ভেবে একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ওই নরকে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সারারাত বাইরে বাতাস গর্জন করে যাচ্ছিল, আর ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত সুইমিং পুলের গেটটা একইভাবে তাণ্ডব চালিয়ে গেল— হ্যাঁ, হ্যাঁ, না, হ্যাঁ, না, না, না...।

আমি নিশ্চিত, আপনারা এতক্ষণে এই গল্পের শেষটা আন্দাজ করে ফেলেছেন। আসলে সেখানে কোনো আয়না ছিলই না।

সকালে যখন সূর্য উঠল, টাইফুন ততক্ষণে কেটে গেছে। বাতাস একদম শান্ত, চারপাশ ঝলমলে রোদ। আমি গুটি গুটি পায়ে সেই প্রবেশদ্বারের দিকে গেলাম। আমার ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরোটা ঠিক ওখানেই পড়ে ছিল, আর পাশেই পড়ে ছিল আমার কাঠের তলোয়ারটা। কিন্তু কোনো আয়না ছিল না। ওখানে আসলে কোনোদিন কোনো আয়না বসানোই হয়নি।

সে রাতে আমি যা দেখেছি, তা কোনো ভূতপ্রেত ছিল না। ওটা ছিল স্রেফ আমি নিজে। সেই রাতে আমি যে কী পরিমাণ আতঙ্কিত হয়েছিলাম, তা আমি জীবনেও ভুলব না। আর যখনই আমার এই ঘটনাটা মনে পড়ে, তখনই একটা চিরন্তন সত্য আমার মাথায় ঘোরপাক খায়: এই পৃথিবীতে নিজের চেয়ে ভয়ংকর আর কোনো কিছুই হতে পারে না। আপনাদের কী মনে হয়?

আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, আমার এই পুরো বাড়িতে একটাও আয়না নেই। বিশ্বাস করুন, আয়না ছাড়া দাড়ি কামানো শেখাটা কিন্তু মোটেও সহজ কাজ ছিল না!

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


আয়না

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আজ রাতে আপনারা যতগুলো গল্প শোনালেন, আমার মনে হচ্ছে সেগুলোকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে রয়েছে এমন সব গল্প, যেখানে একদিকে আছে জীবিতদের পৃথিবী, আর অন্যদিকে মৃত্যুর ওপার। আর এই দুই ভুবনের মাঝে যাতায়াতের জন্য কোনো এক অদৃশ্য শক্তি কাজ করে— ভূতপ্রেত বা এই জাতীয় অলৌকিক বিষয়গুলো এই ভাগের মধ্যেই পড়ে। আর দ্বিতীয় ভাগটি হলো মানুষের অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা বা পূর্বভাসের গল্প, যেখানে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ আগে থেকেই টের পেয়ে যান। আপনাদের বলা গল্পগুলোর প্রতিটাই কোনো না কোনোভাবে এই দুটি দলের যেকোনো একটিতে পড়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের অভিজ্ঞতাগুলোও সাধারণত এই দুটির যেকোনো একটির গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। সহজ কথায়, যারা ভূত দেখেন তারা কেবল ভূত-ই দেখেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পূর্বাভাস তারা কখনোই পান না। আবার যারা আগে থেকেই ভবিষ্যৎ টের পান, তারা কখনো চোখের সামনে ভূত দেখতে পান না। কেন এমন হয় আমি জানি না, তবে মনে হয় মানুষের মনের অবচেতন ঝোঁকটা যেকোনো একদিকেই থাকে। অন্তত গল্পগুলো শুনে আমার এমনটাই মনে হলো।

অবশ্য এমন মানুষও আছেন যারা এই দুই দলের কোনোটাতেই পড়েন না যেমন আমি নিজে। আমার এই তিরিশ বছরেরও বেশি জীবনে আমি একটা ভূতের দেখাও পাইনি, কখনো কোনো পূর্বাভাস বা ভবিষ্যৎ নির্দেশক স্বপ্নও দেখিনি। একবার অবশ্য একটা ঘটনা ঘটেছিল আমি আমার দুই বন্ধুর সাথে লিফটে উঠছিলাম, ওরা দুজনেই কসম খেয়ে বলেছিল যে আমাদের সাথে লিফটে নাকি একটা ভূতও চড়ছে! কিন্তু আমি কিচ্ছু দেখিনি। ওদের দাবি ছিল, ঠিক আমার পাশেই নাকি ধূসর রঙের স্যুট পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। অথচ আমার চোখে কোনো মহিলাই পড়েনি। যতদূর মনে পড়ে, লিফটে আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউই ছিল না। সত্যি বলছি! আর ওই দুই বন্ধু আবার এমন ছেলে ছিল না যে আমার সাথে ইচ্ছে করে ইয়ার্কি মারবে। পুরো ব্যাপারটা আসলেই খুব অদ্ভুত ছিল, তবে দিনশেষে কথা একটাই আমি নিজে কখনো কোনো ভূত দেখিনি।

কিন্তু আমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল ঠিক একবারই, যা আমাকে একেবারে হাড়মাস কাঁপানো ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটা দশ বছরেরও বেশি সময় আগের, আর আজ পর্যন্ত আমি এই কথা কাউকেই বলিনি। আসলে মুখ খুলতেই ভয় লাগত। মনে হতো, এই নিয়ে কথা বললেই বুঝি ঘটনাটা আবার আমার সাথে ঘটবে। তাই কখনো নিজে থেকে প্রসঙ্গটা তুলিনি। কিন্তু আজ রাতে আপনারা প্রত্যেকেই যখন নিজের জীবনের এতসব ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা শোনালেন, তখন এই আড্ডার আয়োজক বা হোস্ট হিসেবে নিজের ঝুলির কিছু না শুনিয়ে বিদায় নেওয়াটা ঠিক দেখায় না। তাই ভাবলাম বলেই ফেলি। শুনুন তবে—

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে আমি হাই স্কুলের গণ্ডি পার হই; ঠিক তখন, যখন ছাত্র আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে। আমি ছিলাম সেই হিপ্পি প্রজন্মের ছেলে, তাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার ধার ধারিনি। তার বদলে জাপানের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম আর পেটের দায়ে যখন যা পেতাম কায়িক শ্রমের কাজ করতাম। আমার তখন মনে হতো, জীবন কাটানোর এটাই সবচেয়ে সৎ আর সঠিক উপায়। এখন ভাবলে মনে হয়— তখন বয়সটা কাঁচা ছিল, রক্তও গরম ছিল। তবে পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, জীবনটা কিন্তু বেশ মজাতেই কেটেছিল। সেই সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল কি ভুল তা নিয়ে ভাবি না; তবে আমাকে যদি আবার সেই সময়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আমি নিশ্চিত আবারও একই কাজ করব।

সারা দেশ ঘুরে বেড়ানোর দ্বিতীয় বছরের শরতের কথা। নিয়গাতা প্রিফেকচারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা জুনিয়র হাই স্কুলে মাস দুয়েকের জন্য নৈশপ্রহরীর কাজ পেয়ে গেলাম। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে শরীরটা বড্ড ক্লান্ত ছিল, তাই কদিন একটু আরাম-আয়েশে কাটানোর জন্যই এই কাজটা বেছে নিয়েছিলাম।

নৈশপ্রহরীর কাজটা কিন্তু রকেট সায়েন্সের মতো অত জটিল কিছু নয়। দিনের বেলা আমি দপ্তরির ঘরে ঘুমাতাম, আর রাতে কাজ বলতে ছিল স্রেফ পুরো স্কুলটা দুবার চক্কর দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখে নেওয়া। বাকি সময়টা আমি মিউজিক রুমে গিয়ে রেকর্ড করা গান শুনতাম, লাইব্রেরিতে বসে বই পড়তাম, নয়তো জিমনেসিয়ামে একা একা বাস্কেটবল খেলতাম। সত্যি বলতে, সারারাত একটা ফাঁকা স্কুলে একাকী সময় কাটানোটা কিন্তু মোটেও মন্দ ছিল না। ভয় করত? আরে ধুর, কখনোই না! বয়স যখন আঠারো-উনিশ থাকে, তখন কোনো কিছুই মানুষকে টলাতে পারে না।

আপনাদের মধ্যে কেউ কখনো নৈশপ্রহরীর কাজ করেছেন বলে মনে হয় না, তাই দায়িত্বটা ঠিক কী ছিল তা একটু বুঝিয়ে বলি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি রাতে দুবার রাউন্ড দিতে হতো একবার রাত ৯টায়, আরেকবার রাত ৩টায়। এটাই ছিল বাঁধা রুটিন। স্কুল ভবনটি ছিল তুলনামূলক নতুন, তিন তলা কংক্রিটের তৈরি। আঠারো থেকে বিশটির মতো ক্লাসরুম ছিল। স্কুলের পরিধি হিসেবে এটি খুব একটা বড় ছিল না। ক্লাসরুমগুলো ছাড়াও সেখানে একটা মিউজিক রুম, একটা হোম ইকোনমিক্স রুম, আর্ট স্টুডিও, শিক্ষক মিলনায়তন এবং প্রধান শিক্ষকের রুম ছিল। এর সাথে আলাদা একটা ক্যাফেটেরিয়া, সুইমিং পুল, জিম আর অডিটোরিয়াম তো ছিলই। আমার কাজ ছিল এই সবকটি জায়গা ঘুরে এক নজর দেখে নেওয়া।

রাউন্ড দেওয়ার সময় আমি ২০টি পয়েন্টের একটি চেকলিস্ট মেলাতাম। প্রতিটি জায়গায় গিয়ে নামের পাশে টিক চিহ্ন দিতাম শিক্ষক মিলনায়তন, টিক; সায়েন্স ল্যাব, টিক...। চাইলে অবশ্য কষ্ট করে হেঁটে হেঁটে না ঘুরে, যে দপ্তরির ঘরে আমি ঘুমাতাম সেখানে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাগজে টিকগুলো বসিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি অতটা ফাঁকিবাজ বা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলে ছিলাম না। তা ছাড়া রাউন্ড দিতে খুব একটা সময়ও লাগত না। আর আমি যখন ঘুমাচ্ছি, তখন যদি কেউ ভেতরে ঢুকে পড়ে, তবে উল্টো আমার ওপরই হামলা হওয়ার ভয় থাকত।

যা-ই হোক, প্রতি রাতে ঠিক ৯টা আর ৩টায় আমি রাউন্ডে বের হতাম। বাঁ হাতে থাকত একটা টর্চলাইট আর ডান হাতে কেন্ডো খেলার কাঠের তলোয়ার। হাই স্কুলে থাকতে আমি কেন্ডো (জাপানি ঐতিহ্যবাহী তলোয়ার যুদ্ধ) খেলতাম, তাই যে কাউকে প্রতিহত করার ব্যাপারে নিজের দক্ষতার ওপর বেশ ভরসা ছিল। কোনো আনাড়ি চোর বা হামলাকারী যদি আসল ধারালো তলোয়ার নিয়েও আসত, তবুও আমি ভয় পেতাম না। মনে রাখবেন, তখন বয়সটা কাঁচা ছিল। কিন্তু আজ যদি এমন কিছু ঘটে, তবে আমি বাপের নাম ভুলে এক দৌড়ে পালাব!

ঘটনাটা ঘটেছিল অক্টোবরের শুরুর দিকের এক ঝড়ো রাতে। বছরের ওই সময়টার তুলনায় আবহাওয়াটা বেশ গুমোট আর ভ্যাপসা ছিল। সন্ধ্যার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছিল, তাই সেগুলোকে তাড়াতে দুটো মশার কয়েল জ্বালানোর কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। বাতাসের শব্দ ছিল প্রচণ্ড। সুইমিং পুলের গেটটা ভাঙা ছিল, আর বাতাসের ধাক্কায় সেটা অনবরত ‘দুমদাম’ করে খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল। ভাবলাম ঠিক করে দিই, কিন্তু বাইরে বড্ড অন্ধকার থাকায় আর হাত দিইনি। ফলে সারারাত ওটা অমন শব্দ করতেই থাকল।

রাত ৯টার রাউন্ডটা বেশ ভালোভাবেই কেটে গেল। তালিকার ২০টি জায়গাই নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে টিক দিলাম। সব দরজা লক করা ছিল, সবকিছু যার যার জায়গায় ঠিকঠাক গোছানো। অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়েনি। এরপর দপ্তরির ঘরে ফিরে এলাম, রাত ৩টার অ্যালার্ম দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কিন্তু রাত ৩টায় যখন অ্যালার্মটা বেজে উঠল, ঘুম থেকে উঠেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না, তবে অনুভূতিটা একদম অন্যরকম ছিল। বিছানা ছেড়ে উঠতে একদম ইচ্ছে করছিল না, মনে হচ্ছিল কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমার গা চেপে ধরেছে, বিছানা থেকে ওঠার ইচ্ছেটাকেই দমিয়ে দিচ্ছে। অথচ আমি এমন একজন মানুষ যে অ্যালার্ম বাজামাত্রই বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠি। তাই নিজের এই অবস্থাটা নিজেই বুঝতে পারছিলাম না। অনেক জোর করে নিজেকে বিছানা থেকে তুললাম এবং রাউন্ড দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। সুইমিং পুলের গেটটা তখনও তাল মিলিয়ে দুমদাম শব্দ করে যাচ্ছিল, কিন্তু কেমন যেন মনে হলো শব্দের ধরনটা বদলে গেছে। ‘নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় আছে’ মনে মনে ভাবলাম, আর পা বাড়াতে মন সায় দিচ্ছিল না। তবে শেষমেশ মন শক্ত করলাম; যা-ই হোক না কেন, নিজের কাজটা তো করতেই হবে। একবার যদি কর্তব্যে ফাঁকি দেওয়া শুরু করি, তবে বারবারই ফাঁকি দিতে ইচ্ছে করবে, আর আমি নিজেকে সেই অভ্যাসে জড়াতে চাইনি। তাই টর্চলাইট আর কাঠের তলোয়ারটা শক্ত করে ধরে বেরিয়ে পড়লাম।

রাতটা আসলেই অদ্ভুত ছিল। সময় বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়ছিল, বাতাস আরও বেশি স্যাঁতসেঁতে আর আর্দ্র হয়ে উঠছিল। আমার সারা শরীর কেমন যেন চুলকাতে লাগল, কিছুতেই মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না। ঠিক করলাম আগে জিমনেসিয়াম, অডিটোরিয়াম আর পুলের দিকটা ঘুরে আসব। ওদিকের সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। বাতাসের ধাক্কায় সুইমিং পুলের গেটটা এমনভাবে আছাড় খাচ্ছিল, যেন কোনো পাগল মানুষ পর্যায়ক্রমে মাথা নাড়ছে আর সায় দিচ্ছে। এর কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। প্রথমে দুবার মাথা ওপর-নিচ করা— হ্যাঁ, হ্যাঁ— তারপর আবার ডানে-বামে মাথা ঝাঁকানো— না, না, না...। তুলনাটা শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগছে, আমি জানি, তবে আমার কাছে অনুভূতিটা ঠিক তেমনই হয়েছিল।

মূল স্কুল ভবনের ভেতরে পরিস্থিতি অবশ্য স্বাভাবিকই ছিল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে চেকলিস্টের পয়েন্টগুলো মিলিয়ে নিলাম। মনের ভেতর ওই অদ্ভুত ভীতি থাকা সত্ত্বেও খারাপ কিছু ঘটেনি। একটু স্বস্তি পেয়ে দপ্তরির ঘরের দিকে ফিরতে শুরু করলাম। আমার চেকলিস্টের একদম শেষ জায়গাটি ছিল বয়লার রুম। এটি ভবনের পূর্ব দিকে, ক্যাফেটেরিয়ার ঠিক পাশেই অবস্থিত অর্থাৎ দপ্তরির ঘর থেকে একদম উল্টো দিকে। এর মানে হলো, ফেরার পথে আমাকে নিচ তলার ওই দীর্ঘ করিডোর ধরে হেঁটে আসতে হবে। আর সেখানটা ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার।

যেসব রাতে আকাশে চাঁদ থাকত, করিডোরে অন্তত কিছুটা আলো পাওয়া যেত। কিন্তু চাঁদ না থাকলে সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখার উপায় থাকত না। তাই কোন দিকে যাচ্ছি তা দেখার জন্য আমাকে সামনের দিকে টর্চের আলো ফেলে এগোতে হতো। সে রাতে একটা টাইফুন খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, ফলে আকাশে চাঁদের কোনো নামনিশানাই ছিল না। মাঝেসাঝে মেঘের ফাঁক গলে একটু আলো আসছিল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার সবকিছু অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছিল।

আমি অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলাম। আমার বাস্কেটবল জুতোজোড়ার রাবারের তলাগুলো লিনোলিয়ামের মেঝের ওপর ঘষা খেয়ে একটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দ তুলছিল। মেঝেটা ছিল শ্যাওলা পড়া ঘোলাটে সবুজ রঙের লিনোলিয়ামের। আজ এত বছর পরেও আমি চোখ বুজলে সেই মেঝের রংটা স্পষ্ট দেখতে পাই।

করিডোরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় ছিল স্কুলের মূল প্রবেশদ্বার। ওখানটা পার হওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো আরে, এটা কী? অন্ধকারের মধ্যে কী যেন একটা নড়ে উঠল! ভয়ে আমার সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। হাতের কাঠের তলোয়ারটা আরও শক্ত করে ধরে, যেদিকে জিনিসটা দেখেছি সেদিকে ঘুরলাম। জুতো রাখার তাকটার ঠিক পাশের দেওয়ালে আমার টর্চের আলোটা ফেললাম।

আর ঠিক তখনই আমি আমাকেই দেখতে পেলাম। মানে, ওটা আসলে একটা আয়না ছিল। আয়নায় স্রেফ আমার নিজের প্রতিবিম্বই ভেসে উঠেছিল। আগের রাতে তো ওখানে কোনো আয়না ছিল না, তার মানে আজ দিনের বেলার কোনো এক সময়ে ওটা ওখানে বসানো হয়েছে। ওফ! আমি যে কী পরিমাণ ভয় পেয়েছিলাম! ওটা ছিল লম্বায় একটা আস্ত খাড়া আয়না, যাতে মানুষের পুরো শরীর দেখা যায়। যখন বুঝলাম ওটা স্রেফ আয়নায় ভেসে ওঠা আমার নিজেরই রূপ, তখন এত ভয় পাওয়ার জন্য নিজের ওপরই বড্ড বোকামি বোধ হলো। ‘ধুর! এই সামান্য বিষয়!’ —নিজেকে নিজেই বললাম। কতটা বোকা আমি! হাতের টর্চলাইটটা নিচে নামিয়ে রেখে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিলাম। সিগারেটে একটা টান দিয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। বাইর থেকে একটা মৃদু ল্যাম্পপোস্টের আলো জানালার কাচ গলে এসে আয়নাটার ওপর পড়েছিল। আর আমার পেছন থেকে সুইমিং পুলের ভাঙা গেটটা বাতাসে তখনও দুমদাম করে আছাড় খাচ্ছিল।

দুই-এক টান দেওয়ার পর হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস আমার চোখে পড়ল। আয়নার ভেতরে যে প্রতিবিম্বটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা আমি নই! বাইরে থেকে দেখতে ওটা অবিকল আমার মতোই, কিন্তু ওটা আমি ছিলাম না এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। না, ভুল বললাম। ওটা আমিই ছিলাম ঠিকই, কিন্তু ওটা ছিল আমারই অন্য এক সত্তা। এমন এক আমি যার অস্তিত্ব কখনোই থাকা উচিত নয়। আমি ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। সেই অনুভূতিটা কেমন ছিল, তা বুঝিয়ে বলা আসলেই খুব কঠিন।

তবে একটা বিষয় আমি খুব পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম আয়নার ভেতরের ওই অবয়বটা আমাকে তীব্র ঘৃণা করত। গভীর কালো সমুদ্রে ভেসে থাকা বরফখণ্ডের মতোই এক জমাটবদ্ধ, আদিম হিংসা লুকিয়ে ছিল তার ভেতরে। এমন এক ঘৃণা যা পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই কখনো কমানো সম্ভব নয়।

আমি কিছুক্ষণ একদম বোবা হয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার আঙুলের ফাঁক গলে সিগারেটটা মেঝেতে খসে পড়ল। অদ্ভুত ব্যাপার, আয়নার ভেতরের সিগারেটটাও ঠিক একইভাবে মেঝেতে পড়ে গেল। আমরা দুজন ওভাবেই নিশ্চল দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমার মনে হচ্ছিল, কে যেন আমার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রেখেছে, নড়ার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আমার নেই।

অবশেষে তার হাতটা নড়ে উঠল। তার ডান হাতের আঙুলের ডগাগুলো প্রথমে নিজের থুতনি ছুঁল, তারপর ঠিক একটা পোকার মতো ধীরে ধীরে বেয়ে বেয়ে তার মুখের ওপর উঠতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি চমকে উঠে আবিষ্কার করলাম— আমিও হুবহু একই কাজ করছি! আমার মনে হলো, আমি নিজেই যেন আয়নার ওই সত্তাটার প্রতিবিম্ব হয়ে গেছি, আর সে দূর থেকে আমাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে!

আমার শরীরের শেষবিন্দু শক্তিটুকু এক করে আমি জানোয়ারের মতো এক আর্তনাদ করে উঠলাম। আর সাথে সাথেই আমাকে মাটির সাথে জমিয়ে রাখা সেই অদৃশ্য বাঁধনটা যেন একঝটকায় ছিঁড়ে গেল। আমি আমার কেন্ডো তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরে গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে আয়নাটার ওপর আঘাত করলাম। কাচ ভেঙে চুরমার হওয়ার এক বিকট শব্দ আমার কানে এলো, কিন্তু পেছনে ফিরে তাকানোর মতো সাহস বা সময় কোনোটিই আমার ছিল না। আমি এক দৌড়ে নিজের ঘরের দিকে পালালাম। ঘরে ঢুকেই তড়িঘড়ি করে দরজায় তালা মারলাম এবং বিছানায় কম্বলের নিচে গিয়ে সেঁধিয়ে গেলাম। মেঝেতে ফেলে আসা জ্বলন্ত সিগারেটটার কথা ভেবে একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ওই নরকে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সারারাত বাইরে বাতাস গর্জন করে যাচ্ছিল, আর ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত সুইমিং পুলের গেটটা একইভাবে তাণ্ডব চালিয়ে গেল— হ্যাঁ, হ্যাঁ, না, হ্যাঁ, না, না, না...।

আমি নিশ্চিত, আপনারা এতক্ষণে এই গল্পের শেষটা আন্দাজ করে ফেলেছেন। আসলে সেখানে কোনো আয়না ছিলই না।

সকালে যখন সূর্য উঠল, টাইফুন ততক্ষণে কেটে গেছে। বাতাস একদম শান্ত, চারপাশ ঝলমলে রোদ। আমি গুটি গুটি পায়ে সেই প্রবেশদ্বারের দিকে গেলাম। আমার ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরোটা ঠিক ওখানেই পড়ে ছিল, আর পাশেই পড়ে ছিল আমার কাঠের তলোয়ারটা। কিন্তু কোনো আয়না ছিল না। ওখানে আসলে কোনোদিন কোনো আয়না বসানোই হয়নি।

সে রাতে আমি যা দেখেছি, তা কোনো ভূতপ্রেত ছিল না। ওটা ছিল স্রেফ আমি নিজে। সেই রাতে আমি যে কী পরিমাণ আতঙ্কিত হয়েছিলাম, তা আমি জীবনেও ভুলব না। আর যখনই আমার এই ঘটনাটা মনে পড়ে, তখনই একটা চিরন্তন সত্য আমার মাথায় ঘোরপাক খায়: এই পৃথিবীতে নিজের চেয়ে ভয়ংকর আর কোনো কিছুই হতে পারে না। আপনাদের কী মনে হয়?

আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, আমার এই পুরো বাড়িতে একটাও আয়না নেই। বিশ্বাস করুন, আয়না ছাড়া দাড়ি কামানো শেখাটা কিন্তু মোটেও সহজ কাজ ছিল না!


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত