(পূর্ব প্রকাশের পর)
অপরাধবোধের নন্দনভাষা: বিবেকের বিচারালয় বনাম বাস্তবতা
মানুষের ভেতরে এমন এক অদৃশ্য বিচারালয় আছে, যেখানে সাক্ষ্য হতে পারে একটি মুখ, না-বলা বাক্য, বিপন্ন মুহূর্তের নীরবতা বা স্মৃতির হঠাৎ জেগে ওঠা দৃশ্য। সেখানে মানুষ একই সঙ্গে অভিযুক্ত, সাক্ষী ও বিচারক। কিন্তু মূল প্রশ্ন অপরাধের চেয়ে দায়ের: যা ঘটেছে, তার কতখানি আমার দ্বারা; যা ঘটেনি অথচ ঘটানো সম্ভব ছিল, তার দায় কতখানি; আর জন্মের আগের ইতিহাসের ছায়া কি বর্তমান নৈতিকতাকেও স্পর্শ করে? এই প্রশ্নেই অপরাধবোধ ব্যক্তিগত অনুভূতি ছাড়িয়ে সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতির নন্দনভাষায় পরিণত হয়।
অপরাধবোধ কাজের বিচার করে, লজ্জা সত্তার। তাই অপরাধবোধ সংশোধনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, অপরদিকে লজ্জা মানুষকে নিজের কাছ থেকেই নির্বাসিত করে। কিন্তু দুটির সীমা দ্রুত মুছে যায়: ‘আমি ভুল করেছি’ ধীরে ধীরে ‘আমিই ভুল’ হয়ে ওঠে। তখন অপরাধ শেষ হলেও বিবেকের শাস্তি চলতে থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী শাস্তিই স্মৃতিকে নৈতিক শক্তি ও আত্মনিপীড়ন— দুই সম্ভাবনায় বিভক্ত করে।
সফোক্লিসের ‘ইডিপাস রেক্স’ অনিচ্ছাকৃত অপরাধের এই সংকটকে ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়। ইডিপাস জানত না, তবু ঘটনাগুলো তার হাত দিয়েই ঘটেছে; সত্য আবিষ্কারের পর আত্মঅন্ধত্ব তাই শাস্তির পাশাপাশি আত্মপরিচয় হারানোর প্রতীক। গ্রিক ট্র্যাজেডি প্রশ্ন তোলে: মানুষ কি কেবল অভিপ্রায়ের জন্য দায়ী, নাকি অনিচ্ছাকৃত ফলও তাকে বহন করতে হয়?
শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এ অপরাধ পরিকল্পিত, কিন্তু তার মানসিক পরিণতি হত্যার আগেই শুরু হয়। কল্পিত ছুরি, রক্তের স্মৃতি ও লেডি ম্যাকবেথের অনবরত হাত ধোয়া দেখায়— বস্তুগত প্রমাণ মুছে ফেলা গেলেও চেতনার প্রতিলিপি মুছে যায় না। বাস্তবতার মেঝে পরিষ্কার হতে পারে; বিবেকের মেঝে নয়।
দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ দেখায়, তত্ত্ব দিয়ে অপরাধ বৈধ করা গেলেও চেতনাকে পুরোপুরি যুক্তির অধীন করা যায় না। রাসকলনিকভের জ্বর, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিভাজন তার দর্শনের ব্যর্থতার লক্ষণ। সোনিয়ার সামনে স্বীকারোক্তি তাই কেবল আইনি আত্মসমর্পণ নয়; বিভক্ত সত্তাকে পুনর্গঠনের চেষ্টা। অনুশোচনা অতীত মুছে না দিলেও অপরাধীকে তার অপরাধের একমাত্র পরিচয় হয়ে থাকতে বাধা দিতে পারে।
বোদলেয়ার পাপকে মুক্তির সরল পথে রাখেন না; তাঁর কবিতায় তা আকর্ষণ, সৌন্দর্য, পচন ও আত্মঘৃণার একসঙ্গে কাজ করা শক্তি। ‘রেমোর পোস্তিউম’-এ অনুশোচনা মৃত্যুর পরও শরীরকে অনুসরণ করে। এখানে অপরাধবোধ ধর্মীয় বিধি নয়, নিজের অন্ধকারের প্রতি আকর্ষণ ও তার প্রতি বিতৃষ্ণার নান্দনিক দ্বন্দ্ব।
ফ্রয়েড এই দ্বন্দ্বকে মনস্তত্ত্বে স্থানান্তর করেন। দমিত প্রবৃত্তি বিলুপ্ত হয় না; সুপার ইগো তাকে নিজের বিরুদ্ধেই ফিরিয়ে দেয়। ফলে আইন যেখানে কাজ বিচার করে, অন্তর্গত নৈতিক প্রহরী সেখানে কামনা, ঈর্ষা বা ক্ষণিক মৃত্যুকামনাকেও অপরাধের মতো শাস্তি দিতে পারে। বাস্তব অপরাধ ও অনুভূত অপরাধের ব্যবধান এখানেই বিপজ্জনক হয়।
নীটশে অপরাধবোধেরে ভেতরে ঋণের ইতিহাস খুঁজে পান: "Schuld" একই সঙ্গে অপরাধ ও দেনাকে প্রকাশ করে। সমাজ, পূর্বপুরুষ, ঈশ্বর ও কর্তৃত্বের কাছে মানুষের অন্তহীন ঋণবোধ প্রবৃত্তিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে তৈরি করে। ফ্রয়েডের সুপার ইগোও নীটশের ‘ব্যাড কনশায়েন্স ভিন্ন ভাষায় একই সত্য প্রকাশ করে— সভ্যতা মানুষকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও শেখায়।
সার্ত্রের `The Flies' এ প্রশ্ন তোলেন: দায় গ্রহণ ও অপরাধবোধ কি এক? Argos-এ অনুশোচনা রাজনৈতিক শাসনের যন্ত্র; Orestes তাই দায় অস্বীকার না করেও আরোপিত guilt প্রত্যাখ্যান করে। নাটকটি দেখায়, স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের নির্বাচনের দায় নেওয়া নয়; ক্ষমতার তৈরি অপরাধবোধকে শনাক্ত করাও।
আলবেয়ার কামুর The Stranger-এ Meursault-কে হত্যার পাশাপাশি শোকের সামাজিক অভিনয় না করার জন্যও বিচার করা হয়। সমাজ কাজের সঙ্গে আবেগের বিধিও নির্ধারণ করে। T Fall-এ Clamence আবার আত্মস্বীকারোক্তিকে অন্যকে বিচার করার কৌশলে পরিণত করে। ফলে কখনো নৈতিক সত্য, কখনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, কখনো আত্মপ্রবঞ্চনা।
টনি মরিসনের Beloved-এ ব্যক্তিগত অপরাধ দাসত্বের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। Sethe-র সন্তানহত্যা নৈতিকভাবে ভয়ংকর, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে সম্ভব করেছে দাসত্বের অমানবিকতা। Beloved-এর প্রত্যাবর্তন দমন করা ইতিহাসের শরীরী রূপ। স্মৃতি এখানে ক্ষতও, নিরাময়ের শর্তও; মুক্তি আসে ব্যক্তিগত বোঝাকে সমষ্টিগত সাক্ষ্যে রূপান্তরিত করলে।
হারপার লী-র ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’ দেখায়, আইন ও ন্যায় এক নয়। টম রবিনসন-এর বিচার বর্ণবাদী পূর্বধারণায় নির্ধারিত; Atticus-এর দায় তাই শুধু আইনি প্রতিরক্ষা নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান। এখানেই bystander guilt-এর প্রশ্ন: আমি অন্যায় করিনি, কিন্তু অন্যায়ের সুবিধাভোগী কাঠামোর মধ্যে আছি— তাহলে কি সম্পূর্ণ নির্দোষ?
রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’-তে ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও রাজনৈতিক মোহ নৈতিক দায়কে জটিল করে। বিমলার আত্মোপলব্ধি দেখায়, দেশ বা জাতির মতো মহৎ শব্দ ব্যক্তিমানুষকে নৈতিক জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয় না। রাজনৈতিক আবেগ যখন সত্য ও স্বাধীনতাকে গ্রাস করে, তখন ব্যক্তিগত অনুশোচনা বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
দেবদাস-এ guilt কোনো প্রত্যক্ষ অপরাধের নয়; সিদ্ধান্তহীনতার। পার্বতীকে গ্রহণ করতে না পারা ও হারানো সম্ভাবনার কাছে ফিরে যেতে না আসে ‘পারা তাকে যে এটা যে আত্মবিধ্বংসী জীবনে ঠেলে দেয়। তার মদ্যপান তাই শুধু প্রেমবিরহ নয়, নিজের অক্ষম নির্বাচনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আত্মদণ্ড।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নৈতিক সিদ্ধান্তকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শরীর ও অর্থনৈতিক নিয়তির মধ্যে স্থাপন করে। কুবেরের আকাঙ্ক্ষা ও সংকট দেখায়, মানুষ শূন্যে সিদ্ধান্ত নেয় না; পরিস্থিতিও নৈতিকতার সহলেখক। তাই অপরাধবোধ বিচার করতে হলে ব্যক্তির কাজের পাশাপাশি তার সম্ভাবনা সংকুচিত করা সামাজিক বাস্তবতাকেও বিচার করতে হয়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে ব্যক্তিগত ভয়, নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ইতিহাসের সহিংসতার সঙ্গে মিশে যায়। ব্যক্তি ইতিহাসের শিকার, কিন্তু কোনো মুহূর্তে তার নীরব সহযোগীও হতে পারে। আধুনিক-এর সংকট এখানেই: ইতিহাস আমাদের ওপরে ঘটে, আবার আমাদের নীরবতার মধ্য দিয়েও ঘটে। অরুন্ধতী রায়-এর ‘দ্য মাউন্ট’, ‘মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ দেখায়, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান অপরাধকে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য করে দিতে পারে। আনজুম, টিলো ও মুসার জীবন প্রান্তিক শরীরের ওপর দোষ চাপানোর বিপরীতে কাঠামোগত মুখোশ খুলে দেয়। কবরস্থান থেকে ‘গেস্ট হাউস’-এর জন্ম তাই বিকল্প আশ্রয়ের পাশাপাশি সরকারি ইতিহাস যা মুছে দেয়, স্মৃতি তা সংরক্ষণ করে। এখানে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও, যদিও প্রতিষ্ঠানের একক বিবেক নেই।
কার্ল জাসপারস্-এর ক্রিমিনাল, পলিটিক্যাল, মোরাল ও মেটাফিজিক্যাল গিল্ট এই স্তরগুলো আলাদা করে। আদালত ক্রিমিনাল গিল্ট নির্ধারণ করতে পারে; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পলিটিক্যাল গিল্ট তৈরি করে; বিবেক মোরাল গিল্ট অনুভব করে; আর মেটফিজিক্যাল গিল্ট জন্মায় অন্যায় দেখে যথাসাধ্য প্রতিরোধ না করলে। ‘আমি হত্যা করিনি’ তাই নির্দোষতার শেষ কথা নয়; প্রশ্ন থাকে, হত্যার সময় আমি কোথায় ছিলাম এবং অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম কি না।
হাইডেগ্যার-এর এক্সিস্টেনশিয়াল গিল্ট মানুষকে নিজের সম্ভাবনার কাছে ফিরিয়ে আনে। প্রতিটি নির্বাচন অসংখ্য সম্ভাবনা ত্যাগ করে; তাই অপরাধবোধ কখনো অন্যকে আঘাত করার নয়, নিজের না-বাঁচা জীবনগুলোর প্রতিও। কিয়ের্কেগার্ড-এর anxiety ও সার্ত্রের ‘ফ্রিডম’ এই উপলব্ধির দুই ভাষা: অন্যভাবে বেছে নেওয়ার ক্ষমতাই স্বাধীনতা, আবার তার ভারও।
অপরাধবোধের নন্দনতত্ত্ব তাই অপরাধের তালিকা নয়; দায়ের সীমা নির্ণয়ের শিল্প। Macbeth, Raskolnikov, Orestes, Meursault, Sethe, Tom Robinson, বিমলা, দেবদাস ও জড়ু-এর প্রান্তিক চরিত্রেরা ভিন্নভাবে একই প্রশ্ন তোলে: বাস্তবতা যেখানে দায়ের হিসাব শেষ করে, বিবেক কি সেখানেই থামে? তবে বিবেকের প্রতিটি অভিযোগ সত্য নয়। পরিবার, ধর্ম, রাষ্ট্র, পিতৃতন্ত্র ও স্বৈরক্ষমতা কৃত্রিম গিল্ট তৈরি করে মানুষকে শাসন করতে পারে। স্বাধীন নারীকে স্বার্থপর, অবাধ্য সন্তানকে অকৃতজ্ঞ, প্রতিবাদী নাগরিককে বিশ্বাসঘাতক বলা সেই প্রযুক্তির উদাহরণ। তাই বিবেকের আদালতকেও জিজ্ঞেস করতে হয়: এই বিচারকের ভাষা কি সত্যিই আমার, নাকি কোনো পুরোনো কর্তৃত্ব আমার ভেতর থেকে কথা বলছে? সত্যিকারের নৈতিকতা অনন্ত আত্মদণ্ড নয়; নিজের কাজ স্বীকার করা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি দায় নেওয়া এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করা। অনুশোচনা যদি কেবল যন্ত্রণা উৎপন্ন করে, তা আত্মনির্যাতন; যদি অন্যের যন্ত্রণা দেখতে শেখায়, তবে তা নৈতিক কল্পনার সূচনা। আত্মক্ষমাও বিস্মৃতি নয়। অতীতের রক্তকে নির্দোষ ঘোষণা না করে তার স্মৃতি নিয়ে এমনভাবে বাঁচা, যাতে একই ক্ষত পুনরাবৃত্ত না হয়— এটাই আত্মক্ষমার অর্থ। ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক মুক্তি আসে দমন করা স্মৃতিকে ভাষা দেওয়ায়। সাহিত্য সেই স্মৃতির সংরক্ষণাগার, যেখানে আদালতের নথি শেষ হলেও পরাজিত ও মৃতেরা সাক্ষ্য দিতে থাকে।
ইতিহাসে বিভিন্ন যুগের চিত্রশিল্পীরা মানবমনের গভীর অনুশোচনা, পাপবোধ এবং এর ফলে সৃষ্ট মানসিক যন্ত্রণা বা আত্মদহনকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের আঁকা বেশকিছু কালজয়ী চিত্রকর্মে। রেমব্রন্ট-এর ‘Judas Returning the Thirty Pieces of Silver’ (১৬২৯) হলো খ্রিস্টীয় শিল্পকলায় অপরাধবোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ছবিটির মূল চরিত্র জুডাস ইস্কারিওট, যিনি মাত্র ৩০টি রূপার মুদ্রার বিনিময়ে যিশু খ্রিস্টকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ছবিতে রেমব্রন্ট জুডাসের চরম অপরাধবোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যিশুকে বন্দি করার পর জুডাস যখন তার ভুল বুঝতে পারেন, তখন তিনি প্রধান পুরোহিতদের কাছে টাকা ফেরত দিতে যান। ছবিতে জুডাসকে হাঁটু গেড়ে বসে, তীব্র যন্ত্রণায় নিজের হাত মোচড়াতে এবং ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে দেখা যায়। তার মুখের অভিব্যক্তি এবং শারীরিক ভাষা তীব্র আত্মদহনের এক নিখুঁত চিত্র। ফের্নান্ড করমন -এর ‘Cain Flying Before JehovahÕs Curse’ (১৮৮০) চিত্রকর্মটি বাইবেলের একটি কাহিনির রূপায়ণ , যেখানে ভাই অ্যাবেলকে (হাবিল) হত্যার অভিশাপ মাথায় নিয়ে কেইন (কাবিল) তার পরিবারসহ যাযাবরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মানব ইতিহাসের প্রথম খুনি হিসেবে কেইনের চোখে-মুখে তাড়া করে ফেরে অপরাধবোধ এবং ফুটে ওঠে মানসিক যন্ত্রণার এক স্পষ্ট অন্ধকারের আভা, যা তাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারছে। ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা এবং মানুষের তাৎক্ষণিক ক্রোধের পর সৃষ্ট চরম অপরাধবোধের এটি একটি নির্মম উদাহরণ হলো ইলিয়া রেপিন এর চিত্রকর্ম ‘Ivan the Terrible and His Son Ivan on 16 November 1581’ (১৮৮৫)। রাশিয়ার জার ‘ইভান দ্য টেরিবল’ রাগের মাথায় নিজের ছেলেকে আঘাত করে হত্যা করেছিলেন। রেপিন তার চিত্রকর্মে সেই আঘাতের ঠিক পরের মুহূর্তটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ছবিতে দেখা যায়, ইভান তার রক্তাক্ত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। ইভানের চোখ দুটি আতঙ্কে বড় বড় হয়ে আছে, যেখানে একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে তীব্র অনুশোচনা, পাগলামি এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য চরম আত্মদহন। ইতালীয় রেঁনেসা যুগের চিত্রশিল্পী কারাভাজিও’র ‘ডেভিড উইথ দি হেড অফ গোলিয়াথ চিত্রকর্মে অপরাধবোধের প্রকাশ ঘটেছে খোদ শিল্পীর নিজের জীবনের ছায়ায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন খুনী ছিলেন এবং রোম থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এই ছবিতে তিনি ডেভিডের হাতে কাটা পড়া গোলিয়াথের মুখে নিজের আত্মপ্রত এঁকেছেন। গোলিয়াথের মৃত মুখের অভিব্যক্তিটি বিজয়ের নয়, বরং এক গভীর যন্ত্রণার। অনেকে মনে করেন, কারাভাজিও তার নিজের অপরাধের অনুশোচনা ও মৃত্যুদণ্ডের ভয়কে এই ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ‘Guernica’ হলো চিত্রশিল্পের ইতিহাসে যুদ্ধ, সহিংসতা এবং এর থেকে সৃষ্ট তীব্র মানবিক যন্ত্রণা ও অপরাধবোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদী চিত্রকর্ম। স্প্যানিশ মাস্টার আর্টিস্ট পাবলো পিকাসো ১৯৩৭ সালে এই বিখ্যাত তৈলচিত্রটি অঙ্কন করেন। এটি সরাসরি কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধবোধের গল্প না হলেও, যুদ্ধের নৃশংসতা, শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতা থেকে উৎসারিত সামষ্টিক অপরাধবোধকে পিকাসো বিশ্ববাসীর সামনে এক নগ্ন ও বীভৎস আত্মদহন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি এই ছবিতে কোনো রঙিন আলো ব্যবহার করেননি। পুরো ছবিটি কালো, সাদা এবং ধূসর রঙে আঁকা, যা ঘটনার ভয়াবহতা, শোক এবং একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। ছবির প্রতিটি চরিত্র তীব্র চিৎকার ও যন্ত্রণায় ছটফট করছে, যা মূলত মানবতার আত্মদহনের প্রতীক।
ছবিটির প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনা প্রচলিত আছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর এক অফিসার প্যারিসে পিকাসোর স্টুডিওতে গিয়ে ‘গুয়ের্নিকা’র একটি ছবি দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এটি কি আপনার সৃষ্টি?’ পিকাসো তখন উত্তর দিয়েছিলেন: ‘না, এটি আপনাদের সৃষ্টি’ ।
চিত্রশিল্পের এইসব অনন্যকুশল শিল্পকর্ম ক্যানভাসের রং এবং তুলির আঁচড়ে প্রমাণ করে যে, অপরাধবোধ কেবলমাত্র একটি অনুভূতি নয়, এটি মানুষকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে তাকে আত্মদহনের দিকে ঠেলে দেয়, যাতে সে অনুতপ্ত হতে পারে।
সভ্যতার ইতিহাসকে তাই শুধু অপরাধের ইতিহাস হিসেবে নয়, অপরাধবোধের বিস্তারের ইতিহাস হিসেবেও পড়া যায়: কোন অন্যায়কে আমরা স্বাভাবিক বলেছি, আর কোন ক্ষতকে অবশেষে বুঝতে শিখেছি। নৈতিক অগ্রগতি সম্ভবত এই বোধবুদ্ধির প্রসার— নিজের ক্ষতের পাশাপাশি অন্যের ক্ষত অনুভব করার ক্ষমতা। বিবেকের বিচারালয় ও বাস্তবতার আদালতের মধ্যে সহজ কোনো সমঝোতা নেই। আইন অপরাধের সীমা নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু নৈতিকতা দায়ের সীমা প্রসারিত করে। ইতিহাস বিজয়ীর দলিল রাখে, সাহিত্য পরাজিতের অসমাপ্ত সাক্ষ্যও সংরক্ষণ করে। কিন্তু বিবেকও নির্ভুল নয়; সে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে পারে, নির্দোষ মানুষকেও শাস্তি দিতে পারে। তাই নৈতিক মানুষের কাজ শুধু বিবেকের কথা শোনা নয়, নিজের বিবেককেও বিচারের মুখোমুখি করা। অপরাধবোধের গভীরতম প্রশ্ন ‘আমি কি দোষী? সেটি নয়; বরং— কিসের জন্য, কতখানি, কার কাছে আমি দায়ী, এবং সেই দায় স্বীকারের পর আমাকে ক্ষতিগ্রস্তের অনুকূলে কী এবং কতটূকু করা সম্ভব— সেটি। রাষ্ট্রের আদালত মুলতবি হয়, রায় পুরোনো কাগজে পরিণত হয়; কিন্তু অন্তর্গত আদালতে স্মৃতি বারংবার সাক্ষ্য দেয়। এর রক্ত, রস যে-এর বিবেক, এর প্রত্যাবর্তন ও ইতিহাসের নির্বাসিত মানুষের কণ্ঠ তখন বর্তমানকে জিজ্ঞেস করে— দায় এড়িয়ে কি মুক্তি আদৌ সম্ভব? মানুষের সামনে তাই দুটি পথ: অনন্ত আত্মদণ্ড, অথবা দায়ের দিকে তাকানো। প্রথমটি আত্মনির্যাতন।দ্বিতীয়টি নৈতিকতা। মানবিক মুক্তি শুরু হয় যখন মানুষ অপরাধের স্মৃতি মুছে না ফেলে, নির্দোষতার মিথ্যাও না বানিয়ে বলতে শেখে— যা আমার দায়, আমি তা বহন করব; যা আমার দায় নয়, তার মিথ্যা শৃঙ্খলও বহন করব না। বিবেকের বিচারালয়ে সম্ভবত এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন এবং ন্যায়সংগত রায়। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
অপরাধবোধের নন্দনভাষা: বিবেকের বিচারালয় বনাম বাস্তবতা
মানুষের ভেতরে এমন এক অদৃশ্য বিচারালয় আছে, যেখানে সাক্ষ্য হতে পারে একটি মুখ, না-বলা বাক্য, বিপন্ন মুহূর্তের নীরবতা বা স্মৃতির হঠাৎ জেগে ওঠা দৃশ্য। সেখানে মানুষ একই সঙ্গে অভিযুক্ত, সাক্ষী ও বিচারক। কিন্তু মূল প্রশ্ন অপরাধের চেয়ে দায়ের: যা ঘটেছে, তার কতখানি আমার দ্বারা; যা ঘটেনি অথচ ঘটানো সম্ভব ছিল, তার দায় কতখানি; আর জন্মের আগের ইতিহাসের ছায়া কি বর্তমান নৈতিকতাকেও স্পর্শ করে? এই প্রশ্নেই অপরাধবোধ ব্যক্তিগত অনুভূতি ছাড়িয়ে সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, ইতিহাস ও রাজনীতির নন্দনভাষায় পরিণত হয়।
অপরাধবোধ কাজের বিচার করে, লজ্জা সত্তার। তাই অপরাধবোধ সংশোধনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, অপরদিকে লজ্জা মানুষকে নিজের কাছ থেকেই নির্বাসিত করে। কিন্তু দুটির সীমা দ্রুত মুছে যায়: ‘আমি ভুল করেছি’ ধীরে ধীরে ‘আমিই ভুল’ হয়ে ওঠে। তখন অপরাধ শেষ হলেও বিবেকের শাস্তি চলতে থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী শাস্তিই স্মৃতিকে নৈতিক শক্তি ও আত্মনিপীড়ন— দুই সম্ভাবনায় বিভক্ত করে।
সফোক্লিসের ‘ইডিপাস রেক্স’ অনিচ্ছাকৃত অপরাধের এই সংকটকে ট্র্যাজেডিতে রূপ দেয়। ইডিপাস জানত না, তবু ঘটনাগুলো তার হাত দিয়েই ঘটেছে; সত্য আবিষ্কারের পর আত্মঅন্ধত্ব তাই শাস্তির পাশাপাশি আত্মপরিচয় হারানোর প্রতীক। গ্রিক ট্র্যাজেডি প্রশ্ন তোলে: মানুষ কি কেবল অভিপ্রায়ের জন্য দায়ী, নাকি অনিচ্ছাকৃত ফলও তাকে বহন করতে হয়?
শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’-এ অপরাধ পরিকল্পিত, কিন্তু তার মানসিক পরিণতি হত্যার আগেই শুরু হয়। কল্পিত ছুরি, রক্তের স্মৃতি ও লেডি ম্যাকবেথের অনবরত হাত ধোয়া দেখায়— বস্তুগত প্রমাণ মুছে ফেলা গেলেও চেতনার প্রতিলিপি মুছে যায় না। বাস্তবতার মেঝে পরিষ্কার হতে পারে; বিবেকের মেঝে নয়।
দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ দেখায়, তত্ত্ব দিয়ে অপরাধ বৈধ করা গেলেও চেতনাকে পুরোপুরি যুক্তির অধীন করা যায় না। রাসকলনিকভের জ্বর, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মবিভাজন তার দর্শনের ব্যর্থতার লক্ষণ। সোনিয়ার সামনে স্বীকারোক্তি তাই কেবল আইনি আত্মসমর্পণ নয়; বিভক্ত সত্তাকে পুনর্গঠনের চেষ্টা। অনুশোচনা অতীত মুছে না দিলেও অপরাধীকে তার অপরাধের একমাত্র পরিচয় হয়ে থাকতে বাধা দিতে পারে।
বোদলেয়ার পাপকে মুক্তির সরল পথে রাখেন না; তাঁর কবিতায় তা আকর্ষণ, সৌন্দর্য, পচন ও আত্মঘৃণার একসঙ্গে কাজ করা শক্তি। ‘রেমোর পোস্তিউম’-এ অনুশোচনা মৃত্যুর পরও শরীরকে অনুসরণ করে। এখানে অপরাধবোধ ধর্মীয় বিধি নয়, নিজের অন্ধকারের প্রতি আকর্ষণ ও তার প্রতি বিতৃষ্ণার নান্দনিক দ্বন্দ্ব।
ফ্রয়েড এই দ্বন্দ্বকে মনস্তত্ত্বে স্থানান্তর করেন। দমিত প্রবৃত্তি বিলুপ্ত হয় না; সুপার ইগো তাকে নিজের বিরুদ্ধেই ফিরিয়ে দেয়। ফলে আইন যেখানে কাজ বিচার করে, অন্তর্গত নৈতিক প্রহরী সেখানে কামনা, ঈর্ষা বা ক্ষণিক মৃত্যুকামনাকেও অপরাধের মতো শাস্তি দিতে পারে। বাস্তব অপরাধ ও অনুভূত অপরাধের ব্যবধান এখানেই বিপজ্জনক হয়।
নীটশে অপরাধবোধেরে ভেতরে ঋণের ইতিহাস খুঁজে পান: "Schuld" একই সঙ্গে অপরাধ ও দেনাকে প্রকাশ করে। সমাজ, পূর্বপুরুষ, ঈশ্বর ও কর্তৃত্বের কাছে মানুষের অন্তহীন ঋণবোধ প্রবৃত্তিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে তৈরি করে। ফ্রয়েডের সুপার ইগোও নীটশের ‘ব্যাড কনশায়েন্স ভিন্ন ভাষায় একই সত্য প্রকাশ করে— সভ্যতা মানুষকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও শেখায়।
সার্ত্রের `The Flies' এ প্রশ্ন তোলেন: দায় গ্রহণ ও অপরাধবোধ কি এক? Argos-এ অনুশোচনা রাজনৈতিক শাসনের যন্ত্র; Orestes তাই দায় অস্বীকার না করেও আরোপিত guilt প্রত্যাখ্যান করে। নাটকটি দেখায়, স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের নির্বাচনের দায় নেওয়া নয়; ক্ষমতার তৈরি অপরাধবোধকে শনাক্ত করাও।
আলবেয়ার কামুর The Stranger-এ Meursault-কে হত্যার পাশাপাশি শোকের সামাজিক অভিনয় না করার জন্যও বিচার করা হয়। সমাজ কাজের সঙ্গে আবেগের বিধিও নির্ধারণ করে। T Fall-এ Clamence আবার আত্মস্বীকারোক্তিকে অন্যকে বিচার করার কৌশলে পরিণত করে। ফলে কখনো নৈতিক সত্য, কখনো সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, কখনো আত্মপ্রবঞ্চনা।
টনি মরিসনের Beloved-এ ব্যক্তিগত অপরাধ দাসত্বের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। Sethe-র সন্তানহত্যা নৈতিকভাবে ভয়ংকর, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকে সম্ভব করেছে দাসত্বের অমানবিকতা। Beloved-এর প্রত্যাবর্তন দমন করা ইতিহাসের শরীরী রূপ। স্মৃতি এখানে ক্ষতও, নিরাময়ের শর্তও; মুক্তি আসে ব্যক্তিগত বোঝাকে সমষ্টিগত সাক্ষ্যে রূপান্তরিত করলে।
হারপার লী-র ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’ দেখায়, আইন ও ন্যায় এক নয়। টম রবিনসন-এর বিচার বর্ণবাদী পূর্বধারণায় নির্ধারিত; Atticus-এর দায় তাই শুধু আইনি প্রতিরক্ষা নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান। এখানেই bystander guilt-এর প্রশ্ন: আমি অন্যায় করিনি, কিন্তু অন্যায়ের সুবিধাভোগী কাঠামোর মধ্যে আছি— তাহলে কি সম্পূর্ণ নির্দোষ?
রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’-তে ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও রাজনৈতিক মোহ নৈতিক দায়কে জটিল করে। বিমলার আত্মোপলব্ধি দেখায়, দেশ বা জাতির মতো মহৎ শব্দ ব্যক্তিমানুষকে নৈতিক জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দেয় না। রাজনৈতিক আবেগ যখন সত্য ও স্বাধীনতাকে গ্রাস করে, তখন ব্যক্তিগত অনুশোচনা বৃহত্তর ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
দেবদাস-এ guilt কোনো প্রত্যক্ষ অপরাধের নয়; সিদ্ধান্তহীনতার। পার্বতীকে গ্রহণ করতে না পারা ও হারানো সম্ভাবনার কাছে ফিরে যেতে না আসে ‘পারা তাকে যে এটা যে আত্মবিধ্বংসী জীবনে ঠেলে দেয়। তার মদ্যপান তাই শুধু প্রেমবিরহ নয়, নিজের অক্ষম নির্বাচনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আত্মদণ্ড।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি নৈতিক সিদ্ধান্তকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শরীর ও অর্থনৈতিক নিয়তির মধ্যে স্থাপন করে। কুবেরের আকাঙ্ক্ষা ও সংকট দেখায়, মানুষ শূন্যে সিদ্ধান্ত নেয় না; পরিস্থিতিও নৈতিকতার সহলেখক। তাই অপরাধবোধ বিচার করতে হলে ব্যক্তির কাজের পাশাপাশি তার সম্ভাবনা সংকুচিত করা সামাজিক বাস্তবতাকেও বিচার করতে হয়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে ব্যক্তিগত ভয়, নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ইতিহাসের সহিংসতার সঙ্গে মিশে যায়। ব্যক্তি ইতিহাসের শিকার, কিন্তু কোনো মুহূর্তে তার নীরব সহযোগীও হতে পারে। আধুনিক-এর সংকট এখানেই: ইতিহাস আমাদের ওপরে ঘটে, আবার আমাদের নীরবতার মধ্য দিয়েও ঘটে। অরুন্ধতী রায়-এর ‘দ্য মাউন্ট’, ‘মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ দেখায়, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান অপরাধকে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য করে দিতে পারে। আনজুম, টিলো ও মুসার জীবন প্রান্তিক শরীরের ওপর দোষ চাপানোর বিপরীতে কাঠামোগত মুখোশ খুলে দেয়। কবরস্থান থেকে ‘গেস্ট হাউস’-এর জন্ম তাই বিকল্প আশ্রয়ের পাশাপাশি সরকারি ইতিহাস যা মুছে দেয়, স্মৃতি তা সংরক্ষণ করে। এখানে ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও, যদিও প্রতিষ্ঠানের একক বিবেক নেই।
কার্ল জাসপারস্-এর ক্রিমিনাল, পলিটিক্যাল, মোরাল ও মেটাফিজিক্যাল গিল্ট এই স্তরগুলো আলাদা করে। আদালত ক্রিমিনাল গিল্ট নির্ধারণ করতে পারে; রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পলিটিক্যাল গিল্ট তৈরি করে; বিবেক মোরাল গিল্ট অনুভব করে; আর মেটফিজিক্যাল গিল্ট জন্মায় অন্যায় দেখে যথাসাধ্য প্রতিরোধ না করলে। ‘আমি হত্যা করিনি’ তাই নির্দোষতার শেষ কথা নয়; প্রশ্ন থাকে, হত্যার সময় আমি কোথায় ছিলাম এবং অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম কি না।
হাইডেগ্যার-এর এক্সিস্টেনশিয়াল গিল্ট মানুষকে নিজের সম্ভাবনার কাছে ফিরিয়ে আনে। প্রতিটি নির্বাচন অসংখ্য সম্ভাবনা ত্যাগ করে; তাই অপরাধবোধ কখনো অন্যকে আঘাত করার নয়, নিজের না-বাঁচা জীবনগুলোর প্রতিও। কিয়ের্কেগার্ড-এর anxiety ও সার্ত্রের ‘ফ্রিডম’ এই উপলব্ধির দুই ভাষা: অন্যভাবে বেছে নেওয়ার ক্ষমতাই স্বাধীনতা, আবার তার ভারও।
অপরাধবোধের নন্দনতত্ত্ব তাই অপরাধের তালিকা নয়; দায়ের সীমা নির্ণয়ের শিল্প। Macbeth, Raskolnikov, Orestes, Meursault, Sethe, Tom Robinson, বিমলা, দেবদাস ও জড়ু-এর প্রান্তিক চরিত্রেরা ভিন্নভাবে একই প্রশ্ন তোলে: বাস্তবতা যেখানে দায়ের হিসাব শেষ করে, বিবেক কি সেখানেই থামে? তবে বিবেকের প্রতিটি অভিযোগ সত্য নয়। পরিবার, ধর্ম, রাষ্ট্র, পিতৃতন্ত্র ও স্বৈরক্ষমতা কৃত্রিম গিল্ট তৈরি করে মানুষকে শাসন করতে পারে। স্বাধীন নারীকে স্বার্থপর, অবাধ্য সন্তানকে অকৃতজ্ঞ, প্রতিবাদী নাগরিককে বিশ্বাসঘাতক বলা সেই প্রযুক্তির উদাহরণ। তাই বিবেকের আদালতকেও জিজ্ঞেস করতে হয়: এই বিচারকের ভাষা কি সত্যিই আমার, নাকি কোনো পুরোনো কর্তৃত্ব আমার ভেতর থেকে কথা বলছে? সত্যিকারের নৈতিকতা অনন্ত আত্মদণ্ড নয়; নিজের কাজ স্বীকার করা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি দায় নেওয়া এবং পরিবর্তনের চেষ্টা করা। অনুশোচনা যদি কেবল যন্ত্রণা উৎপন্ন করে, তা আত্মনির্যাতন; যদি অন্যের যন্ত্রণা দেখতে শেখায়, তবে তা নৈতিক কল্পনার সূচনা। আত্মক্ষমাও বিস্মৃতি নয়। অতীতের রক্তকে নির্দোষ ঘোষণা না করে তার স্মৃতি নিয়ে এমনভাবে বাঁচা, যাতে একই ক্ষত পুনরাবৃত্ত না হয়— এটাই আত্মক্ষমার অর্থ। ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক মুক্তি আসে দমন করা স্মৃতিকে ভাষা দেওয়ায়। সাহিত্য সেই স্মৃতির সংরক্ষণাগার, যেখানে আদালতের নথি শেষ হলেও পরাজিত ও মৃতেরা সাক্ষ্য দিতে থাকে।
ইতিহাসে বিভিন্ন যুগের চিত্রশিল্পীরা মানবমনের গভীর অনুশোচনা, পাপবোধ এবং এর ফলে সৃষ্ট মানসিক যন্ত্রণা বা আত্মদহনকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের আঁকা বেশকিছু কালজয়ী চিত্রকর্মে। রেমব্রন্ট-এর ‘Judas Returning the Thirty Pieces of Silver’ (১৬২৯) হলো খ্রিস্টীয় শিল্পকলায় অপরাধবোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ছবিটির মূল চরিত্র জুডাস ইস্কারিওট, যিনি মাত্র ৩০টি রূপার মুদ্রার বিনিময়ে যিশু খ্রিস্টকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ছবিতে রেমব্রন্ট জুডাসের চরম অপরাধবোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন। যিশুকে বন্দি করার পর জুডাস যখন তার ভুল বুঝতে পারেন, তখন তিনি প্রধান পুরোহিতদের কাছে টাকা ফেরত দিতে যান। ছবিতে জুডাসকে হাঁটু গেড়ে বসে, তীব্র যন্ত্রণায় নিজের হাত মোচড়াতে এবং ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে দেখা যায়। তার মুখের অভিব্যক্তি এবং শারীরিক ভাষা তীব্র আত্মদহনের এক নিখুঁত চিত্র। ফের্নান্ড করমন -এর ‘Cain Flying Before JehovahÕs Curse’ (১৮৮০) চিত্রকর্মটি বাইবেলের একটি কাহিনির রূপায়ণ , যেখানে ভাই অ্যাবেলকে (হাবিল) হত্যার অভিশাপ মাথায় নিয়ে কেইন (কাবিল) তার পরিবারসহ যাযাবরের মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মানব ইতিহাসের প্রথম খুনি হিসেবে কেইনের চোখে-মুখে তাড়া করে ফেরে অপরাধবোধ এবং ফুটে ওঠে মানসিক যন্ত্রণার এক স্পষ্ট অন্ধকারের আভা, যা তাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারছে। ইতিহাসের বাস্তব ঘটনা এবং মানুষের তাৎক্ষণিক ক্রোধের পর সৃষ্ট চরম অপরাধবোধের এটি একটি নির্মম উদাহরণ হলো ইলিয়া রেপিন এর চিত্রকর্ম ‘Ivan the Terrible and His Son Ivan on 16 November 1581’ (১৮৮৫)। রাশিয়ার জার ‘ইভান দ্য টেরিবল’ রাগের মাথায় নিজের ছেলেকে আঘাত করে হত্যা করেছিলেন। রেপিন তার চিত্রকর্মে সেই আঘাতের ঠিক পরের মুহূর্তটি ফুটিয়ে তুলেছেন। ছবিতে দেখা যায়, ইভান তার রক্তাক্ত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। ইভানের চোখ দুটি আতঙ্কে বড় বড় হয়ে আছে, যেখানে একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে তীব্র অনুশোচনা, পাগলামি এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য চরম আত্মদহন। ইতালীয় রেঁনেসা যুগের চিত্রশিল্পী কারাভাজিও’র ‘ডেভিড উইথ দি হেড অফ গোলিয়াথ চিত্রকর্মে অপরাধবোধের প্রকাশ ঘটেছে খোদ শিল্পীর নিজের জীবনের ছায়ায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন খুনী ছিলেন এবং রোম থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এই ছবিতে তিনি ডেভিডের হাতে কাটা পড়া গোলিয়াথের মুখে নিজের আত্মপ্রত এঁকেছেন। গোলিয়াথের মৃত মুখের অভিব্যক্তিটি বিজয়ের নয়, বরং এক গভীর যন্ত্রণার। অনেকে মনে করেন, কারাভাজিও তার নিজের অপরাধের অনুশোচনা ও মৃত্যুদণ্ডের ভয়কে এই ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ‘Guernica’ হলো চিত্রশিল্পের ইতিহাসে যুদ্ধ, সহিংসতা এবং এর থেকে সৃষ্ট তীব্র মানবিক যন্ত্রণা ও অপরাধবোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদী চিত্রকর্ম। স্প্যানিশ মাস্টার আর্টিস্ট পাবলো পিকাসো ১৯৩৭ সালে এই বিখ্যাত তৈলচিত্রটি অঙ্কন করেন। এটি সরাসরি কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধবোধের গল্প না হলেও, যুদ্ধের নৃশংসতা, শাসকগোষ্ঠীর নির্মমতা থেকে উৎসারিত সামষ্টিক অপরাধবোধকে পিকাসো বিশ্ববাসীর সামনে এক নগ্ন ও বীভৎস আত্মদহন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি এই ছবিতে কোনো রঙিন আলো ব্যবহার করেননি। পুরো ছবিটি কালো, সাদা এবং ধূসর রঙে আঁকা, যা ঘটনার ভয়াবহতা, শোক এবং একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশকে ফুটিয়ে তোলে। ছবির প্রতিটি চরিত্র তীব্র চিৎকার ও যন্ত্রণায় ছটফট করছে, যা মূলত মানবতার আত্মদহনের প্রতীক।
ছবিটির প্রসঙ্গে একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনা প্রচলিত আছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর এক অফিসার প্যারিসে পিকাসোর স্টুডিওতে গিয়ে ‘গুয়ের্নিকা’র একটি ছবি দেখে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এটি কি আপনার সৃষ্টি?’ পিকাসো তখন উত্তর দিয়েছিলেন: ‘না, এটি আপনাদের সৃষ্টি’ ।
চিত্রশিল্পের এইসব অনন্যকুশল শিল্পকর্ম ক্যানভাসের রং এবং তুলির আঁচড়ে প্রমাণ করে যে, অপরাধবোধ কেবলমাত্র একটি অনুভূতি নয়, এটি মানুষকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে তাকে আত্মদহনের দিকে ঠেলে দেয়, যাতে সে অনুতপ্ত হতে পারে।
সভ্যতার ইতিহাসকে তাই শুধু অপরাধের ইতিহাস হিসেবে নয়, অপরাধবোধের বিস্তারের ইতিহাস হিসেবেও পড়া যায়: কোন অন্যায়কে আমরা স্বাভাবিক বলেছি, আর কোন ক্ষতকে অবশেষে বুঝতে শিখেছি। নৈতিক অগ্রগতি সম্ভবত এই বোধবুদ্ধির প্রসার— নিজের ক্ষতের পাশাপাশি অন্যের ক্ষত অনুভব করার ক্ষমতা। বিবেকের বিচারালয় ও বাস্তবতার আদালতের মধ্যে সহজ কোনো সমঝোতা নেই। আইন অপরাধের সীমা নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু নৈতিকতা দায়ের সীমা প্রসারিত করে। ইতিহাস বিজয়ীর দলিল রাখে, সাহিত্য পরাজিতের অসমাপ্ত সাক্ষ্যও সংরক্ষণ করে। কিন্তু বিবেকও নির্ভুল নয়; সে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলতে পারে, নির্দোষ মানুষকেও শাস্তি দিতে পারে। তাই নৈতিক মানুষের কাজ শুধু বিবেকের কথা শোনা নয়, নিজের বিবেককেও বিচারের মুখোমুখি করা। অপরাধবোধের গভীরতম প্রশ্ন ‘আমি কি দোষী? সেটি নয়; বরং— কিসের জন্য, কতখানি, কার কাছে আমি দায়ী, এবং সেই দায় স্বীকারের পর আমাকে ক্ষতিগ্রস্তের অনুকূলে কী এবং কতটূকু করা সম্ভব— সেটি। রাষ্ট্রের আদালত মুলতবি হয়, রায় পুরোনো কাগজে পরিণত হয়; কিন্তু অন্তর্গত আদালতে স্মৃতি বারংবার সাক্ষ্য দেয়। এর রক্ত, রস যে-এর বিবেক, এর প্রত্যাবর্তন ও ইতিহাসের নির্বাসিত মানুষের কণ্ঠ তখন বর্তমানকে জিজ্ঞেস করে— দায় এড়িয়ে কি মুক্তি আদৌ সম্ভব? মানুষের সামনে তাই দুটি পথ: অনন্ত আত্মদণ্ড, অথবা দায়ের দিকে তাকানো। প্রথমটি আত্মনির্যাতন।দ্বিতীয়টি নৈতিকতা। মানবিক মুক্তি শুরু হয় যখন মানুষ অপরাধের স্মৃতি মুছে না ফেলে, নির্দোষতার মিথ্যাও না বানিয়ে বলতে শেখে— যা আমার দায়, আমি তা বহন করব; যা আমার দায় নয়, তার মিথ্যা শৃঙ্খলও বহন করব না। বিবেকের বিচারালয়ে সম্ভবত এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন এবং ন্যায়সংগত রায়। ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন