(এখানে যা কিছু বলা হচ্ছে, সবই সেই তরুণের বর্ণনা, যে সমুদ্র থেকে বোতলটি খুঁজে পেয়েছিল।)
অল্প কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রে ভাসতে থাকা যে বোতলটি আমি উদ্ধার করেছি, তার ভেতর থেকে পাওয়া চিঠিগুলো একটি ছোট আলো-নিঃসরণকারী যন্ত্র, এখনো ধীরে ধীরে পাঠোদ্ধার করে চলেছে। শুরুতে সে বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ তুলে আনলো— মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক, নলখাগড়া, মাচা, এক মুঠো মাটি, হালকা বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মসলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি মাদি ঘোড়া, তুষার...
বোতলটি পাওয়ার আগেই আমি “ভালোবাসা” শব্দটির অর্থ অনুসন্ধান করছিলাম। হঠাৎ করে পাওয়া কিছু দুর্বোধ্য লেখায় এই শব্দটিরও দেখা পাই। কিছু চিত্র, কিছু টেপ— যেগুলো মহাপ্লাবনের আগের পৃথিবীর জীবনযাত্রার আভাস বহন করত— সেখানেও এর উপস্থিতি লক্ষ করি। এই সব অচেনা নাম ও ধারণা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলেই এক ধরনের অস্থিরতা গ্রাস করত। প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত বহু শব্দের সঙ্গে অপরিচিত থাকা যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। মহাপ্লাবনের পর পৃথিবী আর আগের মতো নেই— সবকিছুই বদলে গেছে।
সমুদ্রে ভাসমান বোতলের ভেতর একটি চিঠি পেয়ে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সেখানে এমন কিছু শব্দ ছিল, যা সেই ভালোবাসারই বর্ণনা দিচ্ছিল— যে ভালোবাসাকে আমি বুঝতে চাই। চিঠিটি লিখেছিলেন এক ব্যক্তি, যিনি মহাসাগর পৃথিবী গ্রাস করার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিজের গভীর অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করতে চেয়েছিলেন।
আমার এই ছোট জাপানি যন্ত্রটির কাজ হলো বস্তু, ধারণা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে আমাকে সাহায্য করা। একটি বোতাম ছোঁয়াতেই এটি অসংখ্য বিশেষায়িত বিশ্বকোষে অনুসন্ধান চালাতে পারে, এমনকি কোনো ব্যাখ্যায় আমি সন্তুষ্ট কি না, সেটিও যেন টেলিপ্যাথির মতো অনুভব করতে পারে।
আমি জানতে চাই— ভালোবাসা আসলে কী? আমি তাকে স্পর্শ করতে চাই, তার জন্য অপেক্ষা করতে চাই, এবং যদি তা সত্যিই থেকে থাকে, তবে তাকে চিরকাল নিজের মধ্যে ধারণ করতে চাই। এই একটি শব্দই আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, আমার অস্তিত্বে এনে দিয়েছে এক নতুন, রহস্যময় ও আকর্ষণীয় সুর। অনুসন্ধানের মুহূর্তগুলোতে আমার আঙুলের ডগায় এক অদ্ভুত উষ্ণতা বয়ে যেত— যা সাধারণত বরফশীতল থাকে।
চিঠিতে উল্লেখ ছিল, একই ব্যক্তি আরও ত্রিশটি চিঠি লিখেছিলেন। এখন পর্যন্ত আমি কেবল একটি পেয়েছি; বাকিগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমার দলের মধ্যে আমিই একমাত্র, যে ডাইভিং এবং দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার অনুশীলন করেছিলাম। সেই দক্ষতার কারণেই, পুরোনো মানচিত্র হারিয়ে যাওয়া, দেশভাগ, আর পরিবেশের আমূল পরিবর্তনের পরও আমি এই বোতলটি খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছি। ভূমি বদলেছে, মানুষ বদলেছে— সবকিছুই রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের সূত্রপাত “মহা সুনামি”-তে, যখন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলে গিয়েছিল। এরপর মানবসমাজ ভাগ হয়ে যায়— পাহাড়ের মানুষ এবং সমুদ্রের মানুষে।
অগণিত প্রাণ হারানোর পর নানা রূপ ও বর্ণের একটিমাত্র মানবপ্রজাতিই টিকে থাকে। এক ঘোষণায় তাদের বলা হয় “বেঁচে থাকতে ভালোবাসে এমন প্রজাতি”। জাতিসংঘ আর বাস্তব কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ভার্চুয়াল নৈতিক সত্তা। তারা ঘোষণা করে— পৃথিবীর সব মানুষ একটিমাত্র জিন থেকে উদ্ভূত, তাই জাতিগত বিভাজনের ভ্রান্ত অহং ত্যাগ করা জরুরি, কারণ সেটিই মানব জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ব্রাইটন মানবের আবিষ্কারসহ আরও কিছু অনুসন্ধানে প্রমাণ করেন যে প্রাচীন উত্তরাঞ্চলীয় মানুষ এবং ইংল্যান্ডের আদিবাসীদের গায়ের রং ছিল গাঢ়, অথচ চোখ ছিল নীল— যার শিকড় পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত প্রসারিত। এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় এক নতুন প্রজন্ম— যাদের গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল, চোখ রঙিন ও দীপ্তিময়। তারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও বৈশিষ্ট্যের মানুষের সঙ্গে মিশে সর্বত্র বসতি স্থাপন করে। ফলে ত্বক ও চোখের রঙ দিয়ে মানুষকে বিচার করার সংকীর্ণ মানসিকতার অবসান ঘটে।
তবু সর্বনাশের সূচনা ঘটেছিল তারও বহু আগে— ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে, যখন উত্তরের শক্তিধর এক শাসক দক্ষিণের এক নেতার সঙ্গে মিলিত হয়। দুজনেই ছিলেন রূঢ়, উত্তেজনাপ্রবণ এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থে জড়িত। একদিন একটি ফেরিতে তারা কে অধিক শক্তিশালী পারমাণবিক বোতামের অধিকারী— তা নিয়ে বিবাদে জড়ায়। সেই বিবাদই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন ও ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারে রূপ নেয়— ক্ষমতার এক অন্ধ প্রদর্শন হিসেবে। পৃথিবী কেঁপে ওঠে, অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়, আর মনোরম উপকূলীয় নগরীগুলো চিরতরে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যায়।
এরপর আশ্রয় বলতে থাকে পাহাড়ের চূড়া, নৌকা, অথবা পানির নিচে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার কঠোর অনুশীলন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য মানুষ নিজেদের কঠিন প্রশিক্ষণে নিয়োজিত করে। পাহাড়ের মানুষরা শিখে যায় পাহাড় ডিঙিয়ে লাফিয়ে চলা— যেমন একসময় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা গিয়েছিল “রাবার মানুষ”-দের, যারা বিপদের মুখে অবিশ্বাস্যভাবে উঁচু দেয়াল টপকে যেত। তাদের উপনিবেশকারীরা— গ্রাম, শহর, পরিবার— সবকিছুকে আলাদা করতে উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। কিন্তু সেই বিভাজনই এক নতুন প্রজন্মের জন্ম দেয়— যারা বিদ্যুতায়িত বেড়া, লোহার দেয়াল, কাঁটাতার সবকিছু অতিক্রম করতে শিখে যায় এবং শেষে গাছের উঁচু ডালেও বসতি গড়ে তোলে।
অন্যদিকে, নিপীড়কেরা ব্যস্ত ছিল অস্ত্র বিক্রি আর পৃথিবীর সর্বত্র প্রাচীর নির্মাণে। তারা দরিদ্র মানুষকে বন্দি করে রেখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে উন্মত্ত ছিল। ভাঙাচোরা রাস্তা, ধসে পড়া সেতু, বন্যায় ক্ষতবিক্ষত অট্টালিকার গায়ে তারা লিখে রাখত— “আমাদের কোনো শান্তি-সহযোগী নেই”; “এই ভূমি ও আকাশ কেবল আমাদের”; “আমরাই তোমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করি, এবং আমরা ঈশ্বরের নির্বাচিত জাতি হিসেবেই থাকব।”
তারা সেইসব মানুষের মতোই, যারা যুগে যুগে জাতিগত মিশ্রণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ কোনো জাতি আছে— এই ধারণা নিছক ভ্রান্তি। ধর্ম, বিশ্বাস, ভাষা ভিন্ন হলেও মানুষ মূলত এক ও অভিন্ন। গাত্রবর্ণ ও জাতিগত বৈচিত্র্য কেবল বাহ্যিক আবরণ— যেমন আপেলের বিভিন্ন রং।
তবু এই বোতল, আর তার ভেতরের রহস্যময় চিঠি, আমাকে যেন পাগল করে তুলছিল।
আমি ভালোবাসার প্রকৃত সারমর্ম জানতে চাই, অথচ যন্ত্রটি কেবল এমন তথ্য দেয় যা কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। “ভালোবাসা” শব্দটির নিচে জমা রয়েছে অগণিত গান, অঙ্গভঙ্গি, নক্ষত্রের মতো ছন্দোময় নৃত্য, আর দূরবর্তী গ্যালাক্সির মতো অসংখ্য দুর্বোধ্য প্রকাশ। বর্তমানে আমি মানব জাতির টিকে থাকার স্বার্থে সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছি— জলের অম্লতা ও তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরিমাপ করি; কিন্তু এসবের সঙ্গে ভালোবাসার ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই।
চিঠির শব্দগুলো ছিল জটিল ও দুর্বোধ্য। আমার সামনে ভেসে ওঠা চিত্রগুলোর তাৎপর্য বুঝতে আমি বাধ্য হলাম নতুন করে ভাবতে। অভিধান ও বিশ্বকোষের গণ্ডি পেরিয়ে ভালোবাসার অর্থ খুঁজতে চাইলাম। এই অন্তহীন অনুসন্ধানের মাঝেই আমি খুঁজে পেলাম আন্দালুসীয় কবি ইবনে হাজমের আরবি পাণ্ডুলিপি— “দ্য রিং অব দ্য ডাভ”। ত্রিশটি অধ্যায়ে রচিত এই গ্রন্থের বারোটি অধ্যায় ভালোবাসার গুণ ও দোষ নিয়ে আলোচনা করেছে। ভূমিকাটি পড়তে গিয়ে আমার মাথা ঘুরে উঠল—
“ঈশ্বর তোমাকে আশীর্বাদ করুন; ভালোবাসা শুরুতে খেলাচ্ছলে আসে, কিন্তু শেষে তা গম্ভীর হয়ে ওঠে।”
আমি তো শুরু থেকেই জানি না কোনটা খেলাচ্ছলে আর কোনটা গম্ভীর— তবে এই কথার মানে কী?
ভালোবাসা যেন এক রহস্যময় জগৎ— যেখানে একই সঙ্গে ট্র্যাজেডি, বিপদ, ক্রোধ, আবার অদ্ভুত আনন্দ ও সুখ সহাবস্থান করে। যখন এটি একজন মানুষের ভাগ্য অন্য কারও হাতে সমর্পণ করে, তখন তা আরও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। আমি নানা ভাষার অসংখ্য গান শুনেছি, বহু কবিতা পড়েছি— কিন্তু কেউই ভালোবাসাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। যেন এটি এক কিংবদন্তিসম সত্তা, যার গঠন কোনো বিজ্ঞানই ব্যাখ্যা করতে পারে না।
অদ্ভুত লাগে, ভালোবাসাকে কখনো খাবার, কখনো নৃত্য, কখনো সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। “স্ওয়ে” গানের কথায় যেমন বলা হয়— সমুদ্র নাকি তটকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে! অথচ আমি জানি, এই সমুদ্রই অসংখ্য মানুষকে গিলে নিয়েছে— আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তরের পথে পাড়ি দেওয়া মানুষেরা যার পানিতে হারিয়ে গেছে। সেই সমুদ্র কীভাবে আবার কোমল হয়ে ওঠে?
যেখানে আমি বোতলটি পেয়েছিলাম, তার কাছেই একটি দূরবীনও খুঁজে পাই। মনে হলো, হয়তো আমাদের যন্ত্রগুলো টেলিপ্যাথির মাধ্যমে সেই মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে, যারা এগুলো পাঠিয়েছিল— তাদের চোখ দিয়ে আমরা পৃথিবীকে দেখতে পারব।
চিঠিটি পাওয়ার পর দূরবীনের গায়ে খোদাই করা লেখাগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করি। শেষে বুঝতে পারি— এদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। ইস্পাতের নলের গায়ে হৃদয়াকৃতির নকশার ভেতরে দুটি প্রতীক খোদাই করা ছিল। আমার যন্ত্র জানাল— এই প্রতীক দুটি দুই অজানা প্রেমিক-প্রেমিকার নাম নির্দেশ করে।
এরপর টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠল এক ভয়াবহ দৃশ্যপট— মধ্যপ্রাচ্য, বলকান, ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন— সবখানে যুদ্ধের আগুন। সেইসব যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত মহাপ্লাবনের পথ তৈরি করেছিল। তবু বিস্ময়করভাবে কিছু মানুষ টিকে থাকতে পেরেছিল— প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে চলা এক অন্তহীন সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় চীনা পাইন তেল সঙ্গে না থাকলেও সেদিন আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে রেডিওর সুরে— যেটিকে আমি “ভালোবাসা” শব্দে স্থির করে রেখেছিলাম। ভেসে আসছিল ওয়াল্টজ, প্রাচ্য নৃত্যসঙ্গীত, স্প্যানিশ ফ্লামেঙ্কো— পুরোনো পৃথিবীর এক অবিরাম উৎসব যেন আমার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ মনে হলো— যদি এই যন্ত্রকে দূরবীনের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়! কারণ পরমাণু নাকি অতীতের স্মৃতি বহন করে। সংযোগ স্থাপনের পর দূরবীনটির মালিক তার শেষ মুহূর্তে যা দেখেছিলেন, তা আমার সামনে ভেসে উঠল। তিনি এক হ্রদের ধারে শুয়ে ছিলেন, আর দেখছিলেন— সাদা পাখিরা নীল সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে।
আমি বিস্ময়ে অভিভূত হলাম— এমন রং যে পৃথিবীতে ছিল, তা তো আমার জানা ছিল না! এখনকার সমুদ্র তো দূষণে কালিমালিপ্ত। অথচ সেখানে আমি দেখলাম নীলাভ সমুদ্র, নির্মল সাদা আকাশ— কী অপূর্ব, কী অনির্বচনীয় এক সুষমা!
লোকটি ঘাসের ওপর শুয়ে শান্তভাবে বিশ্রাম নিচ্ছিল, স্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়। তার স্ত্রী “ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক” নামের একটি সুপরিচিত সাময়িকীর আলোকচিত্রী; প্রকৃতি ও বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। লোকটি ছিলেন সেই সাময়িকীর সম্পাদক, আর তার স্ত্রী ক্যামেরায় ধারণ করতেন সেই সব প্রাণীর ছবি— যারা শিকার, দূষণ এবং হিমবাহ গলার ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। ডলফিন, কুমির, সিল ও তাদের শাবক, কোমল পাখি, উত্তর মেরুর সাদা শিয়াল, কুকুর-নেকড়ে, ধূসর ও বাদামি সীগাল— এই সব প্রাণির প্রতি দম্পতির ছিল গভীর মমতা ও টান। একসময় যে অঞ্চলগুলো ছিল দুর্গম ও নিভৃত, এখন সেগুলো পর্যটক ও আমোদপ্রিয় মানুষের ভিড়ে কলরোলমুখর; সেই সঙ্গে বেড়েছে দূষণ ও অস্বস্তিকর ময়লা— যা দেখে তাদের হৃদয় ভেঙে যেত। প্রকৃতি ধীরে ধীরে বিলাসদ্রব্য ও বিনোদনের উপকরণে পরিণত হচ্ছিল। অপরদিকে, আদিবাসী মানুষদের— যেমন ভারতীয়দের— দেয়াল ও কাঁটাতারের আড়ালে আড়াল করে রাখা হতো, যেন সুখসন্ধানী মানুষের চোখে তাদের বাস্তবতা ধরা না পড়ে।
মধুরঙা সূর্যের কোমল আলোয় লোকটি ঘাসের ওপর শুয়ে ছিল, স্ত্রীর অপেক্ষায়— যিনি উত্তর সাগরের দিকে মুখ করে থাকা সবুজ পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাখিদের ছবি তুলছিলেন। ঠিক তখনই, যখন প্রথম জলধারা আক্রমণের মতো ছুটে আসতে শুরু করল, সে চোখ বুজে ডুবে গেল এক অপরূপ স্বপ্নে।
হঠাৎই সে উঠে দাঁড়াল এবং স্ত্রীর খোঁজে ছুটে গেল, পেছনে ফেলে গেল একটি ভারি, স্ফীত ব্যাগ— যার ভেতরে ছিল একটি দূরবীন এবং তার শেষ প্রেমপত্রসহ একটি বোতল, যা জলে নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত রাখা ছিল। এর আগেও সে এমন ঊনত্রিশটি বোতল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল— কেন, তার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না; হয়তো তা ছিল তাদের প্রেমের এক নিঃশব্দ উদ্যাপন, যা তাদের দুজনকে অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল।
তারপর বিশাল ঢেউ উত্থিত হয়ে যেন সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করে নিল— অন্তত তার অনুভূতিতে তাই প্রতিভাত হয়েছিল।
এই বেদনাময় কাহিনি শুনে আমার শরীর শিউরে ওঠে— এখন আমি কী করব? আমার সামনে একমাত্র পথ রয়ে যায় সেই সব শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করার, যেগুলো আমি কখনো বুঝিনি, এমনকি ভাবতেও পারিনি: মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক, নলখাগড়া, মাচা, এক মুঠো মাটি, হালকা বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মসলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি মাদি ঘোড়া, তুষার।
আমি সেই স্বপ্নমগ্ন মানুষের ভাষা বুঝতে চাই— তার মতো হতে চাই, তার অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে চাই, এবং এই শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত ব্যবহার ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে চাই।
সম্ভবত আমি কিছু তরুণের কাছে যেতে পারি— যারা বৃক্ষ ও উদ্ভিদবিদ্যায় পারদর্শী; তারা হয়তো এই শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারবে, কিংবা কোনো অচেনা স্থানে ফুটে ওঠা একেকটি ফুলের প্রতি আমার অদ্ভুত আকর্ষণটুকু বুঝতে পারবে।
আমি সূর্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের কাছেও যেতে পারি— কারণ এখন সূর্যের অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে; আবার মনোবিজ্ঞানীদের কাছেও যেতে পারি, এই আশায় যে তারা হয়তো মানুষের সেই মানসিকতার কোনো প্রতিকার আবিষ্কার করেছেন— যারা পৃথিবীর সবকিছু নিজের করে নিতে চায় এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে গিয়ে ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা সেতু আর ধ্বংসাবশেষের ওপর প্রশংসার স্তবক লিখে চলে।
আমি জানতে চাই— এমন কোনো মানুষ কি আছে, যে আমাকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে?
একদিন আমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারব— লোকটি স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে কী স্বপ্ন দেখছিল—
নীল, সাদা, আকাশী, ফিরোজা...
এই রঙগুলোই আমার কাছে স্বপ্ন দেখার প্রথম পাঠ— অথবা হয়তো ভালোবাসা বোঝারও প্রথম সূচনা!
আমাকে তা জানতেই হবে, বুঝতেই হবে!
এখানেই তরুণটির উন্মুক্ত স্বপ্নের ইতি ঘটল, যখন সে তার কাহিনি বলা শেষ করল। আমি তাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যক্ষ করলাম— এক জাগ্রত অবস্থায়, যা আমি আগে কখনো এত স্বচ্ছভাবে কল্পনা করতে পারিনি।
লেখক পরিচিতি
ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র লিয়ানা বদর (জন্ম: ১৯৫০, জেরুজালেম) একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত স্মৃতি, নির্বাসনের বেদনা এবং স্বদেশচ্যুত মানুষের অস্তিত্বসংকট গভীর মানবিক সংবেদনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৬৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জেরিকো থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি লেবানন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন— যা তাঁর লেখনীতে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার বিস্তার ঘটায়। তাঁর এই গল্পটির ইংরেজি নাম ‘Letters from the Sea’। গল্পটি Omnia Amin এবং Aida Bamia যৌথভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী World Literature Today-তে প্রকাশিত হয়েছিল।
লিয়ানা বদরের রচনায় ফিলিস্তিনি জীবনের অন্তর্লীন বেদনা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি আছে প্রতিরোধ, স্মৃতি ও স্বপ্নের এক অনন্য বয়ান। তাঁর ভাষা সংযত অথচ গভীর আবেগময়; চরিত্রগুলো জীবন্ত ও বহুরূপী। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি সাতটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য বিশ্বজুড়ে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, ফলে সমকালীন ফিলিস্তিনি সাহিত্যের এক অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬
(এখানে যা কিছু বলা হচ্ছে, সবই সেই তরুণের বর্ণনা, যে সমুদ্র থেকে বোতলটি খুঁজে পেয়েছিল।)
অল্প কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রে ভাসতে থাকা যে বোতলটি আমি উদ্ধার করেছি, তার ভেতর থেকে পাওয়া চিঠিগুলো একটি ছোট আলো-নিঃসরণকারী যন্ত্র, এখনো ধীরে ধীরে পাঠোদ্ধার করে চলেছে। শুরুতে সে বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ তুলে আনলো— মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক, নলখাগড়া, মাচা, এক মুঠো মাটি, হালকা বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মসলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি মাদি ঘোড়া, তুষার...
বোতলটি পাওয়ার আগেই আমি “ভালোবাসা” শব্দটির অর্থ অনুসন্ধান করছিলাম। হঠাৎ করে পাওয়া কিছু দুর্বোধ্য লেখায় এই শব্দটিরও দেখা পাই। কিছু চিত্র, কিছু টেপ— যেগুলো মহাপ্লাবনের আগের পৃথিবীর জীবনযাত্রার আভাস বহন করত— সেখানেও এর উপস্থিতি লক্ষ করি। এই সব অচেনা নাম ও ধারণা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলেই এক ধরনের অস্থিরতা গ্রাস করত। প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত বহু শব্দের সঙ্গে অপরিচিত থাকা যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। মহাপ্লাবনের পর পৃথিবী আর আগের মতো নেই— সবকিছুই বদলে গেছে।
সমুদ্রে ভাসমান বোতলের ভেতর একটি চিঠি পেয়ে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সেখানে এমন কিছু শব্দ ছিল, যা সেই ভালোবাসারই বর্ণনা দিচ্ছিল— যে ভালোবাসাকে আমি বুঝতে চাই। চিঠিটি লিখেছিলেন এক ব্যক্তি, যিনি মহাসাগর পৃথিবী গ্রাস করার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নিজের গভীর অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করতে চেয়েছিলেন।
আমার এই ছোট জাপানি যন্ত্রটির কাজ হলো বস্তু, ধারণা ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে আমাকে সাহায্য করা। একটি বোতাম ছোঁয়াতেই এটি অসংখ্য বিশেষায়িত বিশ্বকোষে অনুসন্ধান চালাতে পারে, এমনকি কোনো ব্যাখ্যায় আমি সন্তুষ্ট কি না, সেটিও যেন টেলিপ্যাথির মতো অনুভব করতে পারে।
আমি জানতে চাই— ভালোবাসা আসলে কী? আমি তাকে স্পর্শ করতে চাই, তার জন্য অপেক্ষা করতে চাই, এবং যদি তা সত্যিই থেকে থাকে, তবে তাকে চিরকাল নিজের মধ্যে ধারণ করতে চাই। এই একটি শব্দই আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, আমার অস্তিত্বে এনে দিয়েছে এক নতুন, রহস্যময় ও আকর্ষণীয় সুর। অনুসন্ধানের মুহূর্তগুলোতে আমার আঙুলের ডগায় এক অদ্ভুত উষ্ণতা বয়ে যেত— যা সাধারণত বরফশীতল থাকে।
চিঠিতে উল্লেখ ছিল, একই ব্যক্তি আরও ত্রিশটি চিঠি লিখেছিলেন। এখন পর্যন্ত আমি কেবল একটি পেয়েছি; বাকিগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমার দলের মধ্যে আমিই একমাত্র, যে ডাইভিং এবং দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার অনুশীলন করেছিলাম। সেই দক্ষতার কারণেই, পুরোনো মানচিত্র হারিয়ে যাওয়া, দেশভাগ, আর পরিবেশের আমূল পরিবর্তনের পরও আমি এই বোতলটি খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছি। ভূমি বদলেছে, মানুষ বদলেছে— সবকিছুই রূপান্তরিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের সূত্রপাত “মহা সুনামি”-তে, যখন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলে গিয়েছিল। এরপর মানবসমাজ ভাগ হয়ে যায়— পাহাড়ের মানুষ এবং সমুদ্রের মানুষে।
অগণিত প্রাণ হারানোর পর নানা রূপ ও বর্ণের একটিমাত্র মানবপ্রজাতিই টিকে থাকে। এক ঘোষণায় তাদের বলা হয় “বেঁচে থাকতে ভালোবাসে এমন প্রজাতি”। জাতিসংঘ আর বাস্তব কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ভার্চুয়াল নৈতিক সত্তা। তারা ঘোষণা করে— পৃথিবীর সব মানুষ একটিমাত্র জিন থেকে উদ্ভূত, তাই জাতিগত বিভাজনের ভ্রান্ত অহং ত্যাগ করা জরুরি, কারণ সেটিই মানব জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল। ২০১৭ সালে ব্রাইটন মানবের আবিষ্কারসহ আরও কিছু অনুসন্ধানে প্রমাণ করেন যে প্রাচীন উত্তরাঞ্চলীয় মানুষ এবং ইংল্যান্ডের আদিবাসীদের গায়ের রং ছিল গাঢ়, অথচ চোখ ছিল নীল— যার শিকড় পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত প্রসারিত। এই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয় এক নতুন প্রজন্ম— যাদের গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল, চোখ রঙিন ও দীপ্তিময়। তারা ভিন্ন ভিন্ন বর্ণ ও বৈশিষ্ট্যের মানুষের সঙ্গে মিশে সর্বত্র বসতি স্থাপন করে। ফলে ত্বক ও চোখের রঙ দিয়ে মানুষকে বিচার করার সংকীর্ণ মানসিকতার অবসান ঘটে।
তবু সর্বনাশের সূচনা ঘটেছিল তারও বহু আগে— ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে, যখন উত্তরের শক্তিধর এক শাসক দক্ষিণের এক নেতার সঙ্গে মিলিত হয়। দুজনেই ছিলেন রূঢ়, উত্তেজনাপ্রবণ এবং পরস্পরবিরোধী স্বার্থে জড়িত। একদিন একটি ফেরিতে তারা কে অধিক শক্তিশালী পারমাণবিক বোতামের অধিকারী— তা নিয়ে বিবাদে জড়ায়। সেই বিবাদই শেষ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন ও ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহারে রূপ নেয়— ক্ষমতার এক অন্ধ প্রদর্শন হিসেবে। পৃথিবী কেঁপে ওঠে, অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়, আর মনোরম উপকূলীয় নগরীগুলো চিরতরে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যায়।
এরপর আশ্রয় বলতে থাকে পাহাড়ের চূড়া, নৌকা, অথবা পানির নিচে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার কঠোর অনুশীলন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য মানুষ নিজেদের কঠিন প্রশিক্ষণে নিয়োজিত করে। পাহাড়ের মানুষরা শিখে যায় পাহাড় ডিঙিয়ে লাফিয়ে চলা— যেমন একসময় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা গিয়েছিল “রাবার মানুষ”-দের, যারা বিপদের মুখে অবিশ্বাস্যভাবে উঁচু দেয়াল টপকে যেত। তাদের উপনিবেশকারীরা— গ্রাম, শহর, পরিবার— সবকিছুকে আলাদা করতে উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। কিন্তু সেই বিভাজনই এক নতুন প্রজন্মের জন্ম দেয়— যারা বিদ্যুতায়িত বেড়া, লোহার দেয়াল, কাঁটাতার সবকিছু অতিক্রম করতে শিখে যায় এবং শেষে গাছের উঁচু ডালেও বসতি গড়ে তোলে।
অন্যদিকে, নিপীড়কেরা ব্যস্ত ছিল অস্ত্র বিক্রি আর পৃথিবীর সর্বত্র প্রাচীর নির্মাণে। তারা দরিদ্র মানুষকে বন্দি করে রেখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে উন্মত্ত ছিল। ভাঙাচোরা রাস্তা, ধসে পড়া সেতু, বন্যায় ক্ষতবিক্ষত অট্টালিকার গায়ে তারা লিখে রাখত— “আমাদের কোনো শান্তি-সহযোগী নেই”; “এই ভূমি ও আকাশ কেবল আমাদের”; “আমরাই তোমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করি, এবং আমরা ঈশ্বরের নির্বাচিত জাতি হিসেবেই থাকব।”
তারা সেইসব মানুষের মতোই, যারা যুগে যুগে জাতিগত মিশ্রণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। বিশুদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ কোনো জাতি আছে— এই ধারণা নিছক ভ্রান্তি। ধর্ম, বিশ্বাস, ভাষা ভিন্ন হলেও মানুষ মূলত এক ও অভিন্ন। গাত্রবর্ণ ও জাতিগত বৈচিত্র্য কেবল বাহ্যিক আবরণ— যেমন আপেলের বিভিন্ন রং।
তবু এই বোতল, আর তার ভেতরের রহস্যময় চিঠি, আমাকে যেন পাগল করে তুলছিল।
আমি ভালোবাসার প্রকৃত সারমর্ম জানতে চাই, অথচ যন্ত্রটি কেবল এমন তথ্য দেয় যা কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। “ভালোবাসা” শব্দটির নিচে জমা রয়েছে অগণিত গান, অঙ্গভঙ্গি, নক্ষত্রের মতো ছন্দোময় নৃত্য, আর দূরবর্তী গ্যালাক্সির মতো অসংখ্য দুর্বোধ্য প্রকাশ। বর্তমানে আমি মানব জাতির টিকে থাকার স্বার্থে সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছি— জলের অম্লতা ও তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরিমাপ করি; কিন্তু এসবের সঙ্গে ভালোবাসার ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই।
চিঠির শব্দগুলো ছিল জটিল ও দুর্বোধ্য। আমার সামনে ভেসে ওঠা চিত্রগুলোর তাৎপর্য বুঝতে আমি বাধ্য হলাম নতুন করে ভাবতে। অভিধান ও বিশ্বকোষের গণ্ডি পেরিয়ে ভালোবাসার অর্থ খুঁজতে চাইলাম। এই অন্তহীন অনুসন্ধানের মাঝেই আমি খুঁজে পেলাম আন্দালুসীয় কবি ইবনে হাজমের আরবি পাণ্ডুলিপি— “দ্য রিং অব দ্য ডাভ”। ত্রিশটি অধ্যায়ে রচিত এই গ্রন্থের বারোটি অধ্যায় ভালোবাসার গুণ ও দোষ নিয়ে আলোচনা করেছে। ভূমিকাটি পড়তে গিয়ে আমার মাথা ঘুরে উঠল—
“ঈশ্বর তোমাকে আশীর্বাদ করুন; ভালোবাসা শুরুতে খেলাচ্ছলে আসে, কিন্তু শেষে তা গম্ভীর হয়ে ওঠে।”
আমি তো শুরু থেকেই জানি না কোনটা খেলাচ্ছলে আর কোনটা গম্ভীর— তবে এই কথার মানে কী?
ভালোবাসা যেন এক রহস্যময় জগৎ— যেখানে একই সঙ্গে ট্র্যাজেডি, বিপদ, ক্রোধ, আবার অদ্ভুত আনন্দ ও সুখ সহাবস্থান করে। যখন এটি একজন মানুষের ভাগ্য অন্য কারও হাতে সমর্পণ করে, তখন তা আরও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। আমি নানা ভাষার অসংখ্য গান শুনেছি, বহু কবিতা পড়েছি— কিন্তু কেউই ভালোবাসাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। যেন এটি এক কিংবদন্তিসম সত্তা, যার গঠন কোনো বিজ্ঞানই ব্যাখ্যা করতে পারে না।
অদ্ভুত লাগে, ভালোবাসাকে কখনো খাবার, কখনো নৃত্য, কখনো সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা করা হয়। “স্ওয়ে” গানের কথায় যেমন বলা হয়— সমুদ্র নাকি তটকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে! অথচ আমি জানি, এই সমুদ্রই অসংখ্য মানুষকে গিলে নিয়েছে— আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তরের পথে পাড়ি দেওয়া মানুষেরা যার পানিতে হারিয়ে গেছে। সেই সমুদ্র কীভাবে আবার কোমল হয়ে ওঠে?
যেখানে আমি বোতলটি পেয়েছিলাম, তার কাছেই একটি দূরবীনও খুঁজে পাই। মনে হলো, হয়তো আমাদের যন্ত্রগুলো টেলিপ্যাথির মাধ্যমে সেই মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে, যারা এগুলো পাঠিয়েছিল— তাদের চোখ দিয়ে আমরা পৃথিবীকে দেখতে পারব।
চিঠিটি পাওয়ার পর দূরবীনের গায়ে খোদাই করা লেখাগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করি। শেষে বুঝতে পারি— এদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। ইস্পাতের নলের গায়ে হৃদয়াকৃতির নকশার ভেতরে দুটি প্রতীক খোদাই করা ছিল। আমার যন্ত্র জানাল— এই প্রতীক দুটি দুই অজানা প্রেমিক-প্রেমিকার নাম নির্দেশ করে।
এরপর টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠল এক ভয়াবহ দৃশ্যপট— মধ্যপ্রাচ্য, বলকান, ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন— সবখানে যুদ্ধের আগুন। সেইসব যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত মহাপ্লাবনের পথ তৈরি করেছিল। তবু বিস্ময়করভাবে কিছু মানুষ টিকে থাকতে পেরেছিল— প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে চলা এক অন্তহীন সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।
ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় চীনা পাইন তেল সঙ্গে না থাকলেও সেদিন আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে রেডিওর সুরে— যেটিকে আমি “ভালোবাসা” শব্দে স্থির করে রেখেছিলাম। ভেসে আসছিল ওয়াল্টজ, প্রাচ্য নৃত্যসঙ্গীত, স্প্যানিশ ফ্লামেঙ্কো— পুরোনো পৃথিবীর এক অবিরাম উৎসব যেন আমার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ মনে হলো— যদি এই যন্ত্রকে দূরবীনের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়! কারণ পরমাণু নাকি অতীতের স্মৃতি বহন করে। সংযোগ স্থাপনের পর দূরবীনটির মালিক তার শেষ মুহূর্তে যা দেখেছিলেন, তা আমার সামনে ভেসে উঠল। তিনি এক হ্রদের ধারে শুয়ে ছিলেন, আর দেখছিলেন— সাদা পাখিরা নীল সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে আকাশ ঢেকে দিচ্ছে।
আমি বিস্ময়ে অভিভূত হলাম— এমন রং যে পৃথিবীতে ছিল, তা তো আমার জানা ছিল না! এখনকার সমুদ্র তো দূষণে কালিমালিপ্ত। অথচ সেখানে আমি দেখলাম নীলাভ সমুদ্র, নির্মল সাদা আকাশ— কী অপূর্ব, কী অনির্বচনীয় এক সুষমা!
লোকটি ঘাসের ওপর শুয়ে শান্তভাবে বিশ্রাম নিচ্ছিল, স্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়। তার স্ত্রী “ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক” নামের একটি সুপরিচিত সাময়িকীর আলোকচিত্রী; প্রকৃতি ও বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। লোকটি ছিলেন সেই সাময়িকীর সম্পাদক, আর তার স্ত্রী ক্যামেরায় ধারণ করতেন সেই সব প্রাণীর ছবি— যারা শিকার, দূষণ এবং হিমবাহ গলার ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। ডলফিন, কুমির, সিল ও তাদের শাবক, কোমল পাখি, উত্তর মেরুর সাদা শিয়াল, কুকুর-নেকড়ে, ধূসর ও বাদামি সীগাল— এই সব প্রাণির প্রতি দম্পতির ছিল গভীর মমতা ও টান। একসময় যে অঞ্চলগুলো ছিল দুর্গম ও নিভৃত, এখন সেগুলো পর্যটক ও আমোদপ্রিয় মানুষের ভিড়ে কলরোলমুখর; সেই সঙ্গে বেড়েছে দূষণ ও অস্বস্তিকর ময়লা— যা দেখে তাদের হৃদয় ভেঙে যেত। প্রকৃতি ধীরে ধীরে বিলাসদ্রব্য ও বিনোদনের উপকরণে পরিণত হচ্ছিল। অপরদিকে, আদিবাসী মানুষদের— যেমন ভারতীয়দের— দেয়াল ও কাঁটাতারের আড়ালে আড়াল করে রাখা হতো, যেন সুখসন্ধানী মানুষের চোখে তাদের বাস্তবতা ধরা না পড়ে।
মধুরঙা সূর্যের কোমল আলোয় লোকটি ঘাসের ওপর শুয়ে ছিল, স্ত্রীর অপেক্ষায়— যিনি উত্তর সাগরের দিকে মুখ করে থাকা সবুজ পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাখিদের ছবি তুলছিলেন। ঠিক তখনই, যখন প্রথম জলধারা আক্রমণের মতো ছুটে আসতে শুরু করল, সে চোখ বুজে ডুবে গেল এক অপরূপ স্বপ্নে।
হঠাৎই সে উঠে দাঁড়াল এবং স্ত্রীর খোঁজে ছুটে গেল, পেছনে ফেলে গেল একটি ভারি, স্ফীত ব্যাগ— যার ভেতরে ছিল একটি দূরবীন এবং তার শেষ প্রেমপত্রসহ একটি বোতল, যা জলে নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত রাখা ছিল। এর আগেও সে এমন ঊনত্রিশটি বোতল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল— কেন, তার নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না; হয়তো তা ছিল তাদের প্রেমের এক নিঃশব্দ উদ্যাপন, যা তাদের দুজনকে অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল।
তারপর বিশাল ঢেউ উত্থিত হয়ে যেন সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করে নিল— অন্তত তার অনুভূতিতে তাই প্রতিভাত হয়েছিল।
এই বেদনাময় কাহিনি শুনে আমার শরীর শিউরে ওঠে— এখন আমি কী করব? আমার সামনে একমাত্র পথ রয়ে যায় সেই সব শব্দের অর্থ অনুসন্ধান করার, যেগুলো আমি কখনো বুঝিনি, এমনকি ভাবতেও পারিনি: মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক, নলখাগড়া, মাচা, এক মুঠো মাটি, হালকা বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মসলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি মাদি ঘোড়া, তুষার।
আমি সেই স্বপ্নমগ্ন মানুষের ভাষা বুঝতে চাই— তার মতো হতে চাই, তার অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে চাই, এবং এই শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত ব্যবহার ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে চাই।
সম্ভবত আমি কিছু তরুণের কাছে যেতে পারি— যারা বৃক্ষ ও উদ্ভিদবিদ্যায় পারদর্শী; তারা হয়তো এই শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারবে, কিংবা কোনো অচেনা স্থানে ফুটে ওঠা একেকটি ফুলের প্রতি আমার অদ্ভুত আকর্ষণটুকু বুঝতে পারবে।
আমি সূর্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের কাছেও যেতে পারি— কারণ এখন সূর্যের অস্তিত্ব নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে; আবার মনোবিজ্ঞানীদের কাছেও যেতে পারি, এই আশায় যে তারা হয়তো মানুষের সেই মানসিকতার কোনো প্রতিকার আবিষ্কার করেছেন— যারা পৃথিবীর সবকিছু নিজের করে নিতে চায় এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে গিয়ে ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা সেতু আর ধ্বংসাবশেষের ওপর প্রশংসার স্তবক লিখে চলে।
আমি জানতে চাই— এমন কোনো মানুষ কি আছে, যে আমাকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারে?
একদিন আমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারব— লোকটি স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে কী স্বপ্ন দেখছিল—
নীল, সাদা, আকাশী, ফিরোজা...
এই রঙগুলোই আমার কাছে স্বপ্ন দেখার প্রথম পাঠ— অথবা হয়তো ভালোবাসা বোঝারও প্রথম সূচনা!
আমাকে তা জানতেই হবে, বুঝতেই হবে!
এখানেই তরুণটির উন্মুক্ত স্বপ্নের ইতি ঘটল, যখন সে তার কাহিনি বলা শেষ করল। আমি তাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যক্ষ করলাম— এক জাগ্রত অবস্থায়, যা আমি আগে কখনো এত স্বচ্ছভাবে কল্পনা করতে পারিনি।
লেখক পরিচিতি
ফিলিস্তিনি কথাসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র লিয়ানা বদর (জন্ম: ১৯৫০, জেরুজালেম) একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত স্মৃতি, নির্বাসনের বেদনা এবং স্বদেশচ্যুত মানুষের অস্তিত্বসংকট গভীর মানবিক সংবেদনায় প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৬৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জেরিকো থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি লেবানন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন— যা তাঁর লেখনীতে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার বিস্তার ঘটায়। তাঁর এই গল্পটির ইংরেজি নাম ‘Letters from the Sea’। গল্পটি Omnia Amin এবং Aida Bamia যৌথভাবে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী World Literature Today-তে প্রকাশিত হয়েছিল।
লিয়ানা বদরের রচনায় ফিলিস্তিনি জীবনের অন্তর্লীন বেদনা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি আছে প্রতিরোধ, স্মৃতি ও স্বপ্নের এক অনন্য বয়ান। তাঁর ভাষা সংযত অথচ গভীর আবেগময়; চরিত্রগুলো জীবন্ত ও বহুরূপী। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি সাতটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। অনুবাদের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য বিশ্বজুড়ে পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, ফলে সমকালীন ফিলিস্তিনি সাহিত্যের এক অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত।

আপনার মতামত লিখুন