সংবাদ

সাহিত্য

শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতা

পৃথিবী এক বনভোজন চলো— এইখানে আমরা রশি টানাটানি খেলি, তুমি আর আমি—ঠিক এইখানেই- চলো, দুজনে মিলে সেরে নিই লাঞ্চএইখানেই আমি তোমাকে ভালোবাসবো| তোমার চোখে ভেসে উঠবে আকাশের সুদূর নীলিমাতোমার পিঠ ভিজে যাবে বুনো সবুজে—চলো— দুজনে মিলে জেনে নিই নক্ষত্রপুঞ্জের নাম আমাদের স্বপ্নে ভেসে আসুক সুদূরের গানভোরের আকাশের সমুদ্র থেকে চলো— ঝিনুক কুড়িয়ে আনি—আজলায় তুলে নিই তারামাছ নাস্তার টেবিল থেকে মাছগুলো ছেড়ে দেই আর রাতটাকেও—এখানে আমি বারবার বলে যাবো— আমি বাড়ি ফিরেছি,তুমি হয়তো বলতেই থাকবে— তোমাকে স্বাগত! আমি বহুবার ফিরে আসতে চাই— এই আঙিনায়—চলো— গরম চায়ে ঠোঁট ভেজাই— একসাথে বসি দুজনায়—আর কিছুক্ষণ মেখে নিই ঐ হিমেল হাওয়ার আদর| গাছ খুব শীঘ্রই আমি গাছ হয়ে যাচ্ছিআমার মধ্য আঙুলের ডগাটা কেমন চিনচিন করছেযেন সেখান থেকে গজাচ্ছে কচি সবুজ পাতাদেখছি— অনামিকা আর তর্জনি থেকেও উঁকি দিচ্ছে কিশলয়| আমার দু হাত ডালপালা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আকাশেশার্টের নিচে আমার শরীরটা হয়ে পরেছে খসখসে গুঁড়িপায়ের পাতাগুলো শেকড় হয়ে ঢুকে যাচ্ছে মাটিতেআর তলপেট অবধি ক্রমশ বেয়ে উঠছে উষ্ণ বুদবুদ| আমি স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিখেলাধুলা, মাছ মারা আমার সবকিছুই থেমে গেছেশুধু ঠায় দাঁড়িয়ে আছি— এমনকি গভীর রাতেও—বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিচ্ছে আমার তাবৎ শরীর| কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে নাদ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে সবাইচিরতরে চলে যাওয়ার আগে আমার কোনো গন্তব্য নেইআমি শুধু পাতায় পাতায় ঝিরঝির গান গাইছিআর ক্রমাগত দোল খাচ্ছি দমকা হাওয়ায়| যদি এই মুহূর্তে কিছু করার থাকে যদি এই মুহূর্তে আমার করার মতো কিছু থাকেতবে তা হলো— কেবলি মৃত্যু অবধি বেঁচে থাকা|কোন গানের উল্লাস কিংবা হাহাকার নয়—যা দেখেছি সব ভুলে গিয়ে— কিছুই না লিখে রেখে—নির্বাক গোবরে পোকার মতো জীবন-সুধা শুষে নিয়ে,ফুল থেকে ফল হওয়ার মুহূর্তগুলোকে আগলে রাখা| ওই পাহাড়ের বাঁকে কিংবা নদীর কিনারে যারাসামান্য জ্ঞানটুকু সম্বল করে বেঁচে আছেতাদের শেখানোর মতো আজ কিছুই নেই আমার|যদি এই মুহূর্তে আমার করার মতো কিছু থাকেতবে তা হলো— তাদের কাছ থেকে দূরে থাকা—আর প্রার্থনা শুরুর মূর্ছনাগুলোকে স্মরণে আনা| অর্ধগলিত পরিত্যক্ত ঐ ঝুলন্ত ব্রিজটা পেরিয়েপ্রিয় মানুষদের আরো কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ামৃত্যু নিষিদ্ধ এ শরীরে উষ্ণ রক্তধারা বইতে দেয়া—আর একটি টিটেনিয়াম মাস্ক পরে অ্যামোনাইটেরআদিম অন্ধকারে ডুব দিয়ে হারিয়ে যাওয়া| সত্যি যদি এই মুহূর্তে আমার করার কিছু থেকে থাকে... সমুদ্রের রূপক এমন নয় যে মানুষ শুধু সমুদ্রকে দেখে—বরং সমুদ্রই তার উজ্জ্বল চোখে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকেসময়ের সেই আদি লগ্ন থেকে আজও তার দৃষ্টি অবিচল| এমন নয় যে মানুষ শুধু সমুদ্রের গর্জন শোনে—তটরেখার নিচে পড়ে থাকা অগুনতি ঝিনুকেরকান পেতে সমুদ্রই মানুষের কথা শোনে| ঝড়ের তাণ্ডবে কিংবা সমুদ্রের স্তব্ধতায়জল কেটে কেটে চির ধ্রুপদী রেখা টেনেমানুষ এক অক্ষয় দিগন্তের দিকে ছুটে চলে| একজোড়া মানানসই চপস্টিক আর চায়ের কাপ—কিছু হাঁড়ি পাতিল, উপচেপড়া আবেগের উষ্ণ বুদ্বুদএকজন নারী ও পুরুষকে হৃদয়ের কাছে টেনে নেয়| তবে যা তাদের আরো গভীরভাবে বেঁধে রাখেতা হলো— সমুদ্র নামের এই অখণ্ড পূর্ণতা;চিরদিন বহমান— চিরসুন্দর| এমন তো নয় যে মানুষ শুধু সমুদ্রের গান করেবরং সমুদ্রই মানুষের গান গায়মানুষকে উদযাপন করে| বিদায়— স্রেফ এক সাময়িক শব্দ গোধূলির রক্তিম আলো নিভে গেলেরাতের সাথে আমার দেখা হয়ে যায়;লালচে মেঘগুলো তখনো স্থির দাঁড়িয়ে—যেন অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছে শরীর| রাতের নক্ষত্ররাজিকে আমি কখনো বিদায় বলি না,তারা লুকিয়ে থাকে দিনের আলোর গভীরে|একদিন যে শিশু ছিলাম আমি—আজও তাই আছি, বেড়ে ওঠার বৃত্তায়নে| আমি জানি, কেউই হারায় না কোনদিন—আমার মৃত পিতামহ যেন আমার কাঁধেগজিয়ে ওঠা ডানা— যে মৃতফুলের ঝরেপড়াবীজের ঘ্রাণে আমাকে নিয়ে যায় অনন্ত অসীমে| বিদায় এক অতি সাময়িক শব্দ— স্মৃতি কিংবাবিস্মৃতির চেয়েও গভীর এক সুতোয় আমাদেরগেঁথে রাখে; যদি তুমি তা-ই বিশ্বাস করো—তবে তাকে খুঁজতে যেও না কোনদিন| *মূল জাপানি থেকে ইংরেজি অনুবাদ:উইলিয়াম আই এলিয়ট ও কাজুও কাওয়ামুরা *কবি পরিচিতি: শুনতারো তানিকাওয়ার জন্ম ১৯৩১ সালে, জাপানের টোকিওতে|  প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি কবিতাকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন| ১৯৫২ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘টু-বিলিয়ন লাইট-ইয়ার্স অফ সলিটিউড’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি জাপানি সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেন| তানিকাওয়ার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রথাগত জাপানি কাব্যরীতি যেমন: ওয়াকা বা হাইকু থেকে বেরিয়ে এসে এক ধরনের মুক্তি বা ‘ফ্রিয়িং-আপ’| তাঁর কবিতা জাপানি পাঠকদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার দ্বার উন্মোচন করেছিল, যা অনেকটা পশ্চিমা ‘ভার্স লিব্রে’বা মুক্তছন্দের সমতুল্য| তবে এই আধুনিকতা সত্ত্বেও তাঁর কবিতা জাপানের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে| তিনি ভাষাকে জটিল করার পরিবর্তে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেই বেশি পছন্দ করেন| দর্শন,  দৈনন্দিন জীবন, মহাকাশ এবং মানব অস্তিত্বের টানাপোড়েন তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে| তিনি  খুব সামান্য ও তুচ্ছ বিষয়ের মধ্য দিয়ে গভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলার জাদুকরি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন| তিনি কেবল জাপানেই জনপ্রিয় নন, তাঁর কবিতা ইংরেজি, উর্দু, গ্রিক এমনকি জার্মানসহ বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে| তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক| তিনি ২০২৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন|

শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতা