গ্রামের নাম বলরামপুর| এ
গ্রামেরই এক জমিদার শ্রেণির
মানুষ সালামত আলী| তিনি গত
হয়েছেন বেশ আগে| রেখে
গেছেন বিশাল একটি দোতলা বাড়ি|
ইংরেজি বর্ণ ‘এল’ আকৃতির বাড়িটির
ভিতরেই একটা শান বাঁধানো
ইন্দারা, কপিকলে পানি ওঠানোর ব্যবস্থা
আছে, আছে গোসলখানা, বাড়ির
এক প্রান্তে পাকা শৌচাগার, বাড়ি
সংলগ্ন তিন কামরা বিশিষ্ট
বৈঠক ঘর, অদূরে গোলাবাড়ি,
বিশাল দীঘি আকারের একটি
পুকুর আর চৌদ্দ থেকে
পনের বিঘা জমি| এছাড়া,
জ্ঞাতিদারী প্রজাসত্ব তো আছেই|
এই বিস্তর বিত্তবৈভবের মালিক একমাত্র পুত্র মহব্বত আলী; কিন্তু ভদ্রলোক
নিঃসন্তান| পাচঁ/সাত বছর
দাম্পত্য জীবন অতিক্রান্ত হলো
বংশে বাতি দেওয়ার মতো
এখনো কেউ নেই| ইতিপূর্বে
একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলো তবে জন্মের বছরখানেক
পরেই শিশুটি মারা যায়| এই
সুবিশাল বাড়িটিতে দাস-দাসী, চাকর-বাকর আছে তবুও
যেন বাড়িটি খাঁ খাঁ করছে|
মহব্বত সাহেব সাদামাটা প্রকৃতির লোক| অত্যন্ত হাসিখুশি
এবং হৈহুল্লোড় পছন্দকারী একজন ব্যক্তি| বাবার
অবর্তমানে পঞ্চাশের দশকে জমিদারী/জ্ঞাতিদারী
প্রথা বিলুপ্ত হলো; দেশ ভাগ
ইতিপূর্বেই হয়েছে| অশান্ত উপমহাদেশ, হঠাৎ করেই তার
মাতৃ-বিয়োগ| বেশ কিছু সম্পত্তিও
সরকারের খাসে চলে গেলো|
এই অবস্থায় অমন প্রাণবন্ত মানুষটি
কেমন যেন নিষ্প্রভ হয়ে
গেলেন| স্ত্রীর মুখে হাসি নেই,
নেই আত্মীয়-স্বজনের আগের মতো আনাগোনা|
আঁধার ক্রমান্বয়ে যেন ঘনিয়ে আসছে|
তবে কবির সেই শাশ^ত বাণী “মেঘ
দেখে কেউ করিসনে ভয়/আড়ালে তার সূর্য হাসে|”
মহব্বত আলীর সংসারেও যেন
দেখা গেলো সূর্যের হাসি|
মহব্বত আলী দ্বিতীয় সন্তানের
পিতা হলেন| ভোরের সূর্যের মতোই লালাভ রং
ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান|
মহব্বত আলী প্রথম যখন
নবজাত পুত্রের দিকে তাকালেন তখন
মনের অজান্তেই মনে মনে বলে
উঠলেন আলহামদুলিল্লাহ! ও বাবা! এ
তো দেখি রাজাদের রাজা!
নাম রাখলেন শরাফত আলী| শিশুটির মা
শিশুটিকে নিজের বাহুতে রেখে এক নজরে
তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন|
ভাবলেন এ যেন সাত
রাজার ধন এক মানিক|
আদর করে ডাকলেন, “আমার
‘রতন’, হীরের টুকরো ‘রতন’ কই রে!
বলে তার গালে একটু
আলতো ভাবে চুমু দিলেন|
গোটা বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো| মিষ্টির
ছড়াছড়ি| শিশুটির ডাকনাম দাঁড়ালো রতন| ক্রমান্বয়ে
প্রসূতি মা সুস্থ হলেন,
ঘুমন্ত শিশুটির দিকে নজর রাখার
নির্দেশ দিলেন এক কিশোরী গৃহকর্মী
হায়াতনের ওপর এবং নিজে
কখনো কখনো গৃহকর্মের তদারকিতে
বেরিয়ে পড়তেন| হায়াতন পাশের গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের
সন্তান, বাবা দিনমজুর| মেয়েটির
গায়ের রং শ্যামলা, গড়ন-পিটন সুন্দর তবে
একটু তোতলা প্রকৃতির| একদিন এক মজার ব্যাপার
ঘটলো| রতনের মা রতনকে ঘুম
পাড়িয়ে আগের মতোই হায়াতনকে
রতনের পাশে বসিয়ে গৃহস্থালির
কাজে দৃষ্টি দিতে লাগলেন| এমন
সময় হায়াতন দৌড়ে রতনের মায়ের
কাছে এসে বললো, ‘খা-খা আলা রটন
কানছে|’ সবাই তো হেসে
খুন, রটন কানছে| সেই
থেকে মজা করে রতনকে
সকলে রটন বলে ডাকতে
শুরু করলো|
দিন গড়ায় রতনও তার
অয়েল-ক্লথ এ গড়ায়|
দাপুড় দুপুড় করে অয়েল-ক্লথের
ওপর দু-পায়ের গোড়ালি
ঠোকে, মনে হয় যেন
এক নাগাড়ে অনেক পথ বেয়ে
চলেছে, মুখে আ উ
শব্দ করে| কখনো কখনো
একা একাই উপুড় হয়|
মা, ছেলের কাণ্ড দেখে আনন্দে আত্মহারা|
মনে মনে স্বপ্ন দেখে
ছেলে তার অনেক বড়
হবে; উচ্চ শিক্ষা লাভ
করে কলকাতা হাইকোর্টের জজ ব্যারিস্টার হবে;
টুকটুকে একটা বৌমা আনবে,
এমনই অনেক অনেক স্বপ্ন
তার মনে| আছে উৎকণ্ঠাও|
কী জানি, আগেরটার মতো যদি এটাও...
থু থু করে নিজের
বুকে থুতকুড়ি দেয়, অন্তরাত্মা কেঁপে
ওঠে, বলে, নাউজুবিল্লাহ| পরক্ষণেই
সহাস্যে ছেলেকে কোলে জড়িয়ে ধরে|
গুন গুনিয়ে গান করে, ছেলের
পিঠে মৃদু মন্দ থাবা
দেয়, ঘুম পাড়ায়, ঘুমন্ত
শিশুকে শুইয়ে স্বপ্নীল রাতের কোলে নিশ্চিন্তে গা
এলিয়ে দেয় মা| গেরস্থ
বাড়ি বলে কথা; জন,
মায়েন্দারের দু’বেলা খাবারের
তদারকি, ছেলে সামলানো, গৃহকর্ত্রীর
এতটুকু বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ কোথায়| চরকির মতো ঘুরতে হয়
রতনের মাকে| নিজ হাতে ঘর
সংসারের কাজ করতে হয়
না ঠিকই কিন্তু সর্বক্ষণেই
তদারকি, সবকিছু মাথার মধ্যে রাখা এক সুকঠিন
কাজ| তবুও চলছিলো এক
ছন্দোময় নান্দনিক গ্রাম বাংলার এই মায়ের জীবন|
বোশেখের রোদ্দুর-খরতাপের আলোক উজ্জ্বল দিনে
হঠাৎ করেই ঈশান কোণের
কালো মেঘের প্রলয় ঝড়ে যেমন সবকিছু
লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় মহব্বত
আলীর সংসার তেমনই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো| দশ
মাস বয়সী রতনকে ফেলে
রেখে এক রাতের জ্বর
আর ডায়রিয়ার প্রকোপে রতনের মা রতনকে রেখে
জগৎ সংসার থেকে চিরবিদায় নিলেন|
রতন আর রতন রইলো
না| একটুকরো পচা গলা পরিত্যক্ত
আবর্জনার মতোই ‘রটন’ হিসেবে রয়ে
গেলো জীবন সমুদ্র পাড়ি
দেওয়ার প্রয়োজনে| ঝড় থেমে গেলে
প্রকৃতি যেমন স্তব্ধ হয়ে
যায়, মহব্বত আলীও তেমনই নিঃসাড়
স্তব্ধতায় থমকে দাঁড়ালেন| কী
হবে এই শিশুর পরিচর্যার|
মহব্বত আলীর আত্ম-জিজ্ঞাসার
উত্তর খোদ সৃষ্টিকর্তা যেন
সমাধান করে দিলেন “তাই
লিখে দিলো বিশ^ নিখিল
দু’ বিঘার পরিবর্তে” কবির এই উক্তি
যেন রতনের জীবনেও ঘটে গেলো, রতন
তার এক মাকে হারিয়ে
একাধিক মাতৃস্নেহে প্রতিপালিত হতে লাগলো| আত্মীয়
পরিজন নিজের সন্তানের চেয়েও অধিক যত্নে রতনকে
দেখভাল করতে লাগলো| সর্বোপরি,
মহব্বত আলীর মহব্বতের শাণিত
ধারা একটুও রতনকে বুঝতেই দিলো না যে
সে মাতৃহারা|
বছর দুই আড়াই যেতে
না যেতেই মহব্বত আলী দ্বিতীয় বিবাহ
করলেন| আত্মজনের অনেকেই শঙ্কিত হয়ে উঠলেন রতনের
ভবিষ্যত ভাবনায় কিন্তু “হিরা রত্ন কে
না করে যত্ন|” একটি
দৃশ্যের যবনিকার পর নাটকের মঞ্চের
পর্দা ওঠার মতোই রতনের
মা যেন পূণর্বার আবির্ভূত
হলেন| রতন তার চোখ
খোলার পর থেকে কোনোদিনও
মায়ের অদেখাকে অনুভব করেনি| অনুধাবন করতেও পারেনি তার মাতৃবিয়োগের কথা|
রতনের সব দস্যিপনা, বায়না,
আবদার, অনুযোগ সবকিছু মিটিয়েছেন তার (আগন্তুক) মা|
এমনকি এই মায়ের গর্ভজাত
সন্তানের সাথে দু’ভাই
মিলে একত্রে মাতৃদুগ্ধ পান করেছে| তবে
দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়াঝাটি যেমন লেগে থাকতো,
তেমনই ছিলো মিল-মহব্বত|
ছোট ভাই মানিকের সাথে
ছাড়া রতন সাধারণত আর
কারো সাথে খেলতো না|
রতন ছিলো ভীষণ ডানপিটে
এবং গোঁয়ার গোবিন্দ টাইপ; প্রায়শই
ছোট ভাই মানিককে চড়
কিল লাথি মেরে তাকে
পর্যুদস্ত করে ছাড়তো| একবার
তো খেলা করতে করতে
গাছি দা দিয়ে রতন
মানিকের ডান হাতের কড়ে
আঙ্গুলে কোপ বসিয়ে দিলো|
কান্না আর নালিশ ছাড়া
মানিকের আর কোনো পুঁজি
ছিলো না| সেদিনও রতনকে
কেউ বকাঝকা বা মারপিঠ করেনি|
(২)
এরই মধ্যে অনেক পঞ্জি-বর্ষ
অতিক্রান্ত হয়েছে রতন এখন পাঁচ/ছয় বছরের এক
অস্থির ডানপিটে, আত্মবিশ^াসী এক চপল
শিশু| এই বয়সেই সে
বলরামপুর গ্রামের প্রতিটি পাড়ার আনাচে-কানাচে চেনে| স্কুলেও হাতেখড়ি হয়েছে তার| বলরামপুর বুনোপাড়া
প্রাইমারি স্কুলে সে যাতাযাত করে
পায়ে হেঁটে| বাড়ি থেকে অন্ততঃ
একপোয়া পথ তো হবেই|
পশ্চিম পাড়ার মনিধার কাকার দোকান, উত্তরের পুকুর ঘাট, মসজিদ, আমতলা,
তেঁতুলতলা সর্বত্র তার হামেশা যাতায়াত,
তাকে শাসন করার যেন
কেউ নেই; অতি আদরে
সে হয়ে উঠেছে এক
স্বশাসিত নিজ রাজ্যের রাজা|
মনিধার কাকার দোকানের লেবুনচুষ তাকে খুব হাতছানি
দেয়| চার পয়সায় অনেকগুলো
লেবুনচুষ হয়| কোনোটা লাল,
কোনোটা সবুজ, কোনোটা হলুদ বিভিন্ন স্বাদের
এই লেবুনচুষ তার খুব পছন্দ|
বাপের পকেট তো আছেই,
এছাড়া তার নিজ রোজগার
আছে| খামারবাড়িতে বাঁশের আড়া করে সেখানে
পাট শুকানো হয় এই পাটের
গাট বাঁধার সময় পরিত্যক্ত পাটের
আঁশ, কুষ্টার ফেসো কুড়িয়ে নিয়ে
মনিধার কাকার দোকানে ওজন দরে বিক্রি
হয়| সেই পাটের বিক্রিত
পয়সা দিয়ে রতন লেবুনচুষ,
মুড়িমোয়া, ঝাল চানাচুরের প্যাকেট
কেনে| সারাদিন তার প্যান্টের পকেটে
কোনো না কোনো একটা
খাবার থাকেই| মনিধার কাকাও তাকে খুব পছন্দ
করে| আদর করে, দোকানের
বেঞ্চের উপর তাকে বসতে
দেয়, তাকে বাবু বলে
ডাকে| একবার একদিন মনিধার কাকার দোকানের বেঞ্চে বসা অবস্থায় রতন
দেখে মনিধার কাকার ঠোঁটে কালিঘাটের লম্বা বিড়ি| ধোঁয়া ছাড়ছেন মনিধার কাকা| কুণ্ডলি পাকানো সেই ধোঁয়ার দিকে
তাকিয়ে দেখছে আর দেখছে মনিধার
কাকার বিড়ি টানার ধরন|
খুব ভালোই লাগছে তার| মনিধার কাকা
তার উৎসুক চাহনি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কি বাবু, একটা টান দেবে
না কি?” রতন তাৎক্ষণিক
রাজি হয়ে যায়| মনিধার
কাকা জ্বলন্ত বিড়ি রতনের কচি
হাতে ধরিয়ে দেন| রতন মনিধার
কাকার মতোই একটান দেওয়ার
সাথে সাথে বিশ্রি কাশি,
চোখ মুখ দিয়ে পানি
বেরিয়ে গেলো| মনিধার কাকা তাকে তাড়াতাড়ি
কোলে তুলে নিয়ে মাথায়
ফুঁ দিয়ে হাত বুলাতে
লাগলেন, কিছুক্ষণ বাদেই রতন স্বাভাবিক হলো|
কুড়ানো পাটের আঁশ আর ফেঁসো
দিয়ে রতনের যেন পোষাচ্ছিল না,
সে নিজেকে নিজের চাইতে বড়ভাবে ভাবতো| তেঁতুলতলার পাশের মাঠে শনগাছ লাগানো
আছে| শনের দাম পাটের
চেয়ে বেশি, এর আঁশগুলোও হয়
অত্যন্ত সোনালি আর চকচকে| একদিন
সে বেশ কয়েকটা শনগাছ
কেটে আঁটি বেঁধে পাশের
গর্তে ডুবিয়ে রেখে আসলো| অপেক্ষা
করতে হবে অন্তত দিন
পনেরো বিশ, তারপর গাছ
পচে গেলে তার থেকে
আঁশ ছাড়াতে হবে| অপেক্ষায় থাকে
রতন|
(৩)
আজ মহব্বত আলী বাড়ি নেই|
রানাঘাট গেছেন| তাতে অবশ্য রতনের
গা হালকা হয়েছে এমনটা সে ভাবে না|
তার দৈনন্দিন চলার ধরন একই|
রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন| শীতটা বড্ড
বেশি পড়েছে আজ| তাই রতন
একটু দেরি করে ঘুম
থেকে উঠলো| শীতের প্রকোপ এতোটাই বেশি যে সে
দোতলার ছাদে চলে গেলো
রোদ পোহাতে| ছোট ভাই মানিক
তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি|
আজ এবং কাল স্কুল
নেই তাই সে মনে
মনে ভাবছে সারাদিন কী করা যায়|
সারাদিন সে হঠ হঠ
করে সারা পাড়া ঘুরলো|
বিকেলের দিকে পূর্ব পাড়ার
মোয়াজ্জেমদের বাড়ির উঠানে গেলো| সেখানে সে দারুণ এক
অঘটন ঘটিয়ে ফেললো| মোয়াজ্জেমদের উঠানে তখন রতনের সমবয়সী
ছেলেরা ‘এককা দোককা’ খেলছিলো|
সেখানে গিয়ে রতন বললো—
আমিও খেলবো| সাধারণত সে পাড়ার অন্য
ছেলেমেয়েদের সাথে খেলে না|
এদিন কী মনে হলো—
রতন তার খেলার ইচ্ছা
প্রকাশ করে ফেললো| রতনের
এমন প্রস্তাব পাওয়ার পর মোয়াজ্জেমের ইশারায়
এবং তার দলবল কিছুক্ষণের
জন্য খেলা থামিয়ে সকলে
একত্রিত হয়ে একে অপরের
কানে কানে কী যেন
বলাবলি করলো, তারপর খেলার অনুমতি দিলো| এক পর্যায়ে রতনের
এককা দোককা খেলার পালা আসলো, রতন
সইল (খাপড়া) হাতে নিয়ে সামনের
দিকে ছুড়ে মেরে এক
পায়ের ওপর ভর দিয়ে
‘কিত কিত’ বলতে বলতে
উঠানে দাগকাটা ঘর বা ছকগুলো
এড়িয়ে খাপড়া অবধি পৌঁছানোর চেষ্টা
করছে| হঠাৎ মোয়াজ্জেম বলে
উঠলো— দাগে পা পড়েছে
ফলে তুমি পচা— বাতিল
হয়ে গেছো| সইল অন্য কেউ
পাবে| রতন দৃঢ় কণ্ঠে
বলল— না দাগে পা
পড়েনি, আমি দাগ মাড়াইনি|
এক কথায় দু’কথায়
দারুণ ঝগড়া, বাকবিতণ্ডা শুরু হয়ে গেলো|
সকলেই মোয়াজ্জেমের পক্ষ নিলো| একপর্যায়ে
হাতাহাতি এবং মারামারি| সকলে
মিলে রতনকে উঠানের ওপর চিৎ করে
শুইয়ে ফেললো এবং মোয়াজ্জেম বললো—
যা কাঠিতে করে মুরগির বিষ্ঠা
নিয়ে আয়, ওর গালের
মধ্যে ঢুকিয়ে দেবো| পাশেই মুরগির পায়খানা ছিলো, একটি কাঠিতে করে
একটি ছেলে বেশ খানিকটা
মুরগির বিষ্ঠা এনে মোয়াজ্জেমের হাতে
দিলো| মোয়াজ্জেম সেই কাঠির বিষ্ঠা
রতনের ঠোঁটে মুখে লাগাতে লাগলো|
রতন প্রাণপণে ঠোঁট বন্ধ করে
সজোরে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে
দিলো| রতন উঠে দাঁড়িয়েই
দেখে পাশেই একটা ঝামা ইটের
টুকরো, সেটা হাতে নিয়ে
মোয়াজ্জেমের প্রতি সজোরে ছুড়ে মারলো| ধারালো
ইটের টুকরোর আঘাতে মোয়াজ্জেমের কপাল ফেটে গেলো
এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে
লাগলো| রতন এই দেখে
ক্ষীপ্র বেগে ছুটতে ছুটতে
নিজ বাড়ির দোতলায় তার চিলেকোঠার ঘরে
যেখানে পাটের বাণ্ডিল সাজানো ছিলো সে রকম
দুটি বাণ্ডিলের মাঝামাঝি অংশে নিজের দেহটাকে
ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে
উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলো|
এদিকে মোয়াজ্জেমের মা, চাচি মোয়াজ্জেমকে
রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে আসলো রতনদের
বাড়ি| রতনের মাকে উদ্দেশ্য করে
বললো— এই দেখো! তোমার
ছেলে কী করে মোয়াজ্জেমের
মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে
দিয়েছে| রতনের মা তো দেখে
হতবাক| কোথায় সে রতন! আজ
দেখে নেবো তাকে| আশকারা
পেতে পেতে ছেলেটা একেবারে
মাথায় উঠে গেছে| আসুক
সে বাড়ি| আজ তার একদিন
কি আমার একদিন| এসব
কথা বলে মোয়াজ্জেমের মাকে
সান্ত্বনা দিয়ে আশ^স্ত
করলো| তারা মোয়াজ্জেমকে নিয়ে
বাড়ি ফিরে গেলো| রতন
এই দৃশ্য উঁকি মেরে মেরে
দেখলো এবং সবই শুনলো
কিন্তু সে নিচে নামলো
না| সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত
রতন সেই পাট গাদায়
লুকিয়ে রইলো| এদিকে রতনের মা বেশ উৎকণ্ঠিত!
কোথায় গেলো ছেলেটা? বেশ
ঘণ্টা খানেক বাদে রতন আস্তে
আস্তে নিচে নেমে এলো|
এবং মায়ের সামনে দাঁড়ালো| মা শান্ত অথচ
রাগাšি^তভাবেই রতনকে
জিজ্ঞাসা করলেন— মোয়াজ্জেমের মাথা ফাটালে কেনো?
রতন ভয়ে ভয়ে মাকে
সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত বললো| মা দেখলেন দোষটা
মোয়াজ্জেমেরই তাই আর রতনকে
কিছু না বলে তাকে
রাতের খাবার খাইয়ে বললেন— শুয়ে পড়োগে| রতন
শীতে কাতর হয়ে লেপ
মুড়ি দিয়ে শোয়ার পর
পরই ক্লান্ত শরীর আর উৎকণ্ঠিত
মনের কিছুটা প্রশমন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো|
(৪)
রাত এগারোটার দিকে মহব্বত আলী
বাড়ি ফিরলেন| রতন তখন গভীর
ঘুমে নিমগ্ন| মহব্বত আলী ঘরে ঢুকেই
জিজ্ঞাসা করলেন— রতন কি ঘুমিয়ে
পড়েছে? রতনের মা উত্তর দিলেন—
রতন সেই সন্ধ্যার পর
পরই ঘুমিয়ে পড়েছে| তার দস্যিপনার কথা
কিছুই জানালেন না মহব্বত আলীকে|
ওকে একটু তুলে দেবে?
কিছু জামাকাপড় এনেছিলাম ওর জন্য, পরনে
ঠিক ঠাক লাগে কি
না দেখতাম, বললেন মহব্বত আলী তার স্ত্রীকে|
স্ত্রী জানালেন, ও ঘুমাচ্ছে, কাল
সকালে পরালে হয় না? না, তাকে ডাকো
এখনই দেখি| রতনের মা রতনকে ঘুম
থেকে জাগালেন| এদিকে মহব্বত আলী একটা শপিং
ব্যাগ থেকে একে একে
বের করতে লাগলেন রতনের
পোশাক আশাক আর চকোলেট
জাতীয় মিষ্টান্ন| যার মধ্যে রয়েছে
নীল রঙের ওপর সাদা
রেখা টানা একটা হাফ-শার্ট, নীল তবে আকাশ
নীল নয় একটু গাঢ়
নীল তার ওপর সাদা
রেখা টানা| বেশ দামী একটা
সুতির শার্ট; দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়|
সেই সাথে আছে ঘিয়ে
রঙের একটা গ্যাভাডিনের হাফপ্যান্ট|
এছাড়াও শার্টের রং সাদৃশ্য নীল
সাদা মিশ্রিত রঙের হাটুর নিচ
অবধি লম্বা একজোড়া মোজা, ‘নটিবয়’ লেদার স্যু, চামড়ার ˆতরি কোমর-বন্ধনী
আরও আছে বয়াম ভর্তি ভিন্ন
ভিন্ন রঙ ও স্বাদের
মাছরাঙা লেবুনচুষ| ইতিমধ্যেই রতন ঘুম থেকে
উঠে বসেছে| চোখ ডলতে ডলতে
দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকিয়ে উৎফুল্লের
হাসি দিয়ে শার্টটা গায়ের
গেঞ্জির ওপর দিয়ে পরে
নিলো| ঘিয়ে প্যান্টের নিচে
শার্টটা ইন করে চামড়ার
বেল্টটি প্যান্টের লুফের মধ্যে ঢুকাতে ঢুকাতে বলতে লাগলো এখনই
সব পরিয়ে দাও| বাবা মা
মিলে রতনকে জুতা-মোজা, শার্ট
ও প্যান্ট পরিয়ে দিলেন| রতন বিছানা থেকে
উঠে মেঝেতে কয়েকবার পায়চারি করলো| চকোলেটের বয়ামটা মায়ের হাতে দিয়ে বললো—
উঠিয়ে রাখো| পাশের ঘরের বড় আয়নায়
নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সেই
পোশাক পরা অবস্থায় লেপের
নিচে চলে গেলো রতন;
এমনকি জুতা মোজাও পা
থেকে খুললো না|
(৫)
সকাল হতেই ঘুম ভাঙলো
রতনের| কারো সাথে কোনো
কথা না বলেই ছুট
দিলো লেবুতলার মাঠের সেই জঙ্গলের মধ্যে
ছোট একটা ডোবার ধারে,
যে গর্তে শনগাছ (পাট গাছের মতো)
ভিজিয়ে রেখেছিলো| এখন সে ওই
শনগাছের আশঁ ছাড়াবে তারপর
রৌদ্রে শুকিয়ে মনিধার কাকার দোকানে বিক্রি করবে| শনগাছের আঁশ সিল্কের মতো
চকচকে হয় এবং কাঁচা
সোনার রঙে চিকচিক করে|
আঁশগুলো ছাড়িয়ে ধুয়ে নিয়ে শুকানোর
পর বিক্রি করবে| এই সব ভাবতে
ভাবতে রতন পৌঁছে গেলো
সেই ডোবার ধারে আঁটি বাঁধা
দশ/বারোটা শনগাছের কাছে| পানির মধ্যে আজ পনের/বিশ
দিন ধরে ডুবানো আছে
গাছগুলো| ওগুলোকে আজ সে উঠাবে|
কিন্তু এই পোশাকে তো
পানির মধ্যে নামা যাবে না|
তাই সে একের পর
এক শার্ট প্যান্ট, জুতা মোজা, গেঞ্জি
সব খুলে এক জায়গায়
রেখে একেবারে জন্মকালীন পোশাকে নেমে পড়লো হিম
শীতল পানিতে| পানি তার বুক
অবধি হবে, এক পা
এক পা করে পৌঁছে
গেলো তার সেই ভেজানো
শনগাছের বান্ডিলটার দিকে| বান্ডিলের ওপরে রাখা মাটির
ঢেলাগুলো সরিয়ে পাড়ের দিকে আনছে রতন|
হঠাৎ তার নজরে পড়লো
পেছনের দিকে যেখানে সে
তার নতুনের গন্ধ যুক্ত শার্ট-প্যান্ট জুতা-মোজা স্তূপ
করে রেখেছিলো| দেখে তো রতনের
চক্ষু ‘চড়কগাছ’| এমন দৃশ্য সে
জীবনেও দেখেনি| আলেয়াদের শ্যামলা রঙের বকনা গরুটা
তার নতুন শার্টটা মুখের
মধ্যে নিয়ে চিবাচ্ছে| রতন
তড়িঘড়ি করে গরুর মুখ
থেকে তার শার্ট ছাড়াবার
আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো; কিন্তু
গরুটা শিংসহ মুখ দুলিয়ে জঙ্গল
ও আগাছা বনের দিকে দৌড়
দিলো| রতনও তার পিছু
পিছু দৌড়াচ্ছে| সারা জঙ্গল বিছুটি
চুৎরা গাছে পরিপূর্ণ| চুৎরার
পাতা রতনের সমস্ত ভেজা শরীরে পরশ
বুলিয়ে দিলো| আর যা হবার
তাই হলো| সমস্ত শরীর
চুলকাতে চুলকাতে ফুলে লাল হয়ে
গেল| ও কান্নায় ভেঙে
পড়লো| একদিকে অসহ্য চুলকানি আর অন্যদিকে নতুন
শার্ট খোয়া যাওয়ার বেদনা
তাকে বিপর্যস্ত করে তুললো| তবুও
সে গরুর পিছু ছাড়লো
না| এক পর্যায়ে গরুটি
তার মালিকের বাড়িতে অর্থাৎ আলেয়াদের বাড়ি পৌঁছালো| রতন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলেয়ার বাবার কাছে তার জামাটি
তাদের গরু মুখে নিয়ে
দৌড় দিয়েছে বলে জানালো এবং
সে তার জামাটি ফেরত
দেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলো|
আলেয়ার বাবা সমস্ত ঘটনা
শুনে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, জামাটি
ফেরত দেবে; এই বলে আলেয়ার
গরুর দিকে গেলো এবং
দেখলো, রতনের শার্টটি এখন আর গরুর
মুখে নেই| সামান্য অংশ
দেখা গেলেও বাকিটা গলাধকরণ করে ফেলেছে|
আলেয়ার বাবা রতনকে বুকের
মধ্যে নিয়ে শুখনো গামছা
দিয়ে তার সমস্ত শরীর
মুছে দিলেন| বাড়ির ভেতর থেকে শরিষার
তেল এনে তার সমস্ত
ফোলা শরীরে মাখিয়ে দিলেন| রতনের কান্না কিছুতেই থামছে না, সে কাঁদছে
আর ফুপাতে ফুপাতে বলছে, কালই আব্বু আমার
শার্টটি রানাঘাট থেকে এনে দিয়েছেন|
কী সুন্দর জামা বলে আবারও
কান্নায় ভেঙে পড়লো| আলেয়ার
বাবা রতনকে সঙ্গে নিয়ে গর্তের পাশে
রাখা সেই জুতা, প্যান্ট,
গেঞ্জি, মোজাগুলোসহ রতনকে
তার বাড়িতে পৌঁছে দিলো|
(৬)
শরাফত আলী রতন এখন আশি ছুঁই ছুই| শরীর মন সবই ভারাক্রান্ত| জীবনে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছিলেন| তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী| নিয়মিত কোর্টে যেতে পারেন না; বিছানায় অধিকাংশ সময় কাটান| উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ, ভার্টিগো, স্পন্ডিলোসিস এমন সব স্থাবর অস্থাবর রোগে এখন রতন আক্রান্ত| অলস শরীর আর সঞ্চালিত মন ঘুরেফিরে নানান স্মৃতির পাতায় পাতায়| দেশে-বিদেশে কত সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছেন, নানা রঙের নামি-দামি স্যুট-কোট, পোশাক আশাকে সজ্জিত হয়েছেন, কিন্তু জীবনের এই সায়াহ্নবেলায় আজও ভুলতে পারেনি তার আব্বুর আনা রানাঘাটের সেই নীল রঙের ওপর সাদা দাগ টানা নতুন শার্টের কথা, যে দাগ তার মনের গভীরে আজও উৎকীর্ণ হয়ে আছে| চারদিকে একটু নির্জনতা নেমে এলেই অনেক স্মৃতির ভিড়ে তাকে তুমুল নস্টালজিক করে ছোট্টবেলার সেই রানাঘাটের জামা|

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
গ্রামের নাম বলরামপুর| এ
গ্রামেরই এক জমিদার শ্রেণির
মানুষ সালামত আলী| তিনি গত
হয়েছেন বেশ আগে| রেখে
গেছেন বিশাল একটি দোতলা বাড়ি|
ইংরেজি বর্ণ ‘এল’ আকৃতির বাড়িটির
ভিতরেই একটা শান বাঁধানো
ইন্দারা, কপিকলে পানি ওঠানোর ব্যবস্থা
আছে, আছে গোসলখানা, বাড়ির
এক প্রান্তে পাকা শৌচাগার, বাড়ি
সংলগ্ন তিন কামরা বিশিষ্ট
বৈঠক ঘর, অদূরে গোলাবাড়ি,
বিশাল দীঘি আকারের একটি
পুকুর আর চৌদ্দ থেকে
পনের বিঘা জমি| এছাড়া,
জ্ঞাতিদারী প্রজাসত্ব তো আছেই|
এই বিস্তর বিত্তবৈভবের মালিক একমাত্র পুত্র মহব্বত আলী; কিন্তু ভদ্রলোক
নিঃসন্তান| পাচঁ/সাত বছর
দাম্পত্য জীবন অতিক্রান্ত হলো
বংশে বাতি দেওয়ার মতো
এখনো কেউ নেই| ইতিপূর্বে
একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলো তবে জন্মের বছরখানেক
পরেই শিশুটি মারা যায়| এই
সুবিশাল বাড়িটিতে দাস-দাসী, চাকর-বাকর আছে তবুও
যেন বাড়িটি খাঁ খাঁ করছে|
মহব্বত সাহেব সাদামাটা প্রকৃতির লোক| অত্যন্ত হাসিখুশি
এবং হৈহুল্লোড় পছন্দকারী একজন ব্যক্তি| বাবার
অবর্তমানে পঞ্চাশের দশকে জমিদারী/জ্ঞাতিদারী
প্রথা বিলুপ্ত হলো; দেশ ভাগ
ইতিপূর্বেই হয়েছে| অশান্ত উপমহাদেশ, হঠাৎ করেই তার
মাতৃ-বিয়োগ| বেশ কিছু সম্পত্তিও
সরকারের খাসে চলে গেলো|
এই অবস্থায় অমন প্রাণবন্ত মানুষটি
কেমন যেন নিষ্প্রভ হয়ে
গেলেন| স্ত্রীর মুখে হাসি নেই,
নেই আত্মীয়-স্বজনের আগের মতো আনাগোনা|
আঁধার ক্রমান্বয়ে যেন ঘনিয়ে আসছে|
তবে কবির সেই শাশ^ত বাণী “মেঘ
দেখে কেউ করিসনে ভয়/আড়ালে তার সূর্য হাসে|”
মহব্বত আলীর সংসারেও যেন
দেখা গেলো সূর্যের হাসি|
মহব্বত আলী দ্বিতীয় সন্তানের
পিতা হলেন| ভোরের সূর্যের মতোই লালাভ রং
ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান|
মহব্বত আলী প্রথম যখন
নবজাত পুত্রের দিকে তাকালেন তখন
মনের অজান্তেই মনে মনে বলে
উঠলেন আলহামদুলিল্লাহ! ও বাবা! এ
তো দেখি রাজাদের রাজা!
নাম রাখলেন শরাফত আলী| শিশুটির মা
শিশুটিকে নিজের বাহুতে রেখে এক নজরে
তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন|
ভাবলেন এ যেন সাত
রাজার ধন এক মানিক|
আদর করে ডাকলেন, “আমার
‘রতন’, হীরের টুকরো ‘রতন’ কই রে!
বলে তার গালে একটু
আলতো ভাবে চুমু দিলেন|
গোটা বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলো| মিষ্টির
ছড়াছড়ি| শিশুটির ডাকনাম দাঁড়ালো রতন| ক্রমান্বয়ে
প্রসূতি মা সুস্থ হলেন,
ঘুমন্ত শিশুটির দিকে নজর রাখার
নির্দেশ দিলেন এক কিশোরী গৃহকর্মী
হায়াতনের ওপর এবং নিজে
কখনো কখনো গৃহকর্মের তদারকিতে
বেরিয়ে পড়তেন| হায়াতন পাশের গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের
সন্তান, বাবা দিনমজুর| মেয়েটির
গায়ের রং শ্যামলা, গড়ন-পিটন সুন্দর তবে
একটু তোতলা প্রকৃতির| একদিন এক মজার ব্যাপার
ঘটলো| রতনের মা রতনকে ঘুম
পাড়িয়ে আগের মতোই হায়াতনকে
রতনের পাশে বসিয়ে গৃহস্থালির
কাজে দৃষ্টি দিতে লাগলেন| এমন
সময় হায়াতন দৌড়ে রতনের মায়ের
কাছে এসে বললো, ‘খা-খা আলা রটন
কানছে|’ সবাই তো হেসে
খুন, রটন কানছে| সেই
থেকে মজা করে রতনকে
সকলে রটন বলে ডাকতে
শুরু করলো|
দিন গড়ায় রতনও তার
অয়েল-ক্লথ এ গড়ায়|
দাপুড় দুপুড় করে অয়েল-ক্লথের
ওপর দু-পায়ের গোড়ালি
ঠোকে, মনে হয় যেন
এক নাগাড়ে অনেক পথ বেয়ে
চলেছে, মুখে আ উ
শব্দ করে| কখনো কখনো
একা একাই উপুড় হয়|
মা, ছেলের কাণ্ড দেখে আনন্দে আত্মহারা|
মনে মনে স্বপ্ন দেখে
ছেলে তার অনেক বড়
হবে; উচ্চ শিক্ষা লাভ
করে কলকাতা হাইকোর্টের জজ ব্যারিস্টার হবে;
টুকটুকে একটা বৌমা আনবে,
এমনই অনেক অনেক স্বপ্ন
তার মনে| আছে উৎকণ্ঠাও|
কী জানি, আগেরটার মতো যদি এটাও...
থু থু করে নিজের
বুকে থুতকুড়ি দেয়, অন্তরাত্মা কেঁপে
ওঠে, বলে, নাউজুবিল্লাহ| পরক্ষণেই
সহাস্যে ছেলেকে কোলে জড়িয়ে ধরে|
গুন গুনিয়ে গান করে, ছেলের
পিঠে মৃদু মন্দ থাবা
দেয়, ঘুম পাড়ায়, ঘুমন্ত
শিশুকে শুইয়ে স্বপ্নীল রাতের কোলে নিশ্চিন্তে গা
এলিয়ে দেয় মা| গেরস্থ
বাড়ি বলে কথা; জন,
মায়েন্দারের দু’বেলা খাবারের
তদারকি, ছেলে সামলানো, গৃহকর্ত্রীর
এতটুকু বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ কোথায়| চরকির মতো ঘুরতে হয়
রতনের মাকে| নিজ হাতে ঘর
সংসারের কাজ করতে হয়
না ঠিকই কিন্তু সর্বক্ষণেই
তদারকি, সবকিছু মাথার মধ্যে রাখা এক সুকঠিন
কাজ| তবুও চলছিলো এক
ছন্দোময় নান্দনিক গ্রাম বাংলার এই মায়ের জীবন|
বোশেখের রোদ্দুর-খরতাপের আলোক উজ্জ্বল দিনে
হঠাৎ করেই ঈশান কোণের
কালো মেঘের প্রলয় ঝড়ে যেমন সবকিছু
লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় মহব্বত
আলীর সংসার তেমনই লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো| দশ
মাস বয়সী রতনকে ফেলে
রেখে এক রাতের জ্বর
আর ডায়রিয়ার প্রকোপে রতনের মা রতনকে রেখে
জগৎ সংসার থেকে চিরবিদায় নিলেন|
রতন আর রতন রইলো
না| একটুকরো পচা গলা পরিত্যক্ত
আবর্জনার মতোই ‘রটন’ হিসেবে রয়ে
গেলো জীবন সমুদ্র পাড়ি
দেওয়ার প্রয়োজনে| ঝড় থেমে গেলে
প্রকৃতি যেমন স্তব্ধ হয়ে
যায়, মহব্বত আলীও তেমনই নিঃসাড়
স্তব্ধতায় থমকে দাঁড়ালেন| কী
হবে এই শিশুর পরিচর্যার|
মহব্বত আলীর আত্ম-জিজ্ঞাসার
উত্তর খোদ সৃষ্টিকর্তা যেন
সমাধান করে দিলেন “তাই
লিখে দিলো বিশ^ নিখিল
দু’ বিঘার পরিবর্তে” কবির এই উক্তি
যেন রতনের জীবনেও ঘটে গেলো, রতন
তার এক মাকে হারিয়ে
একাধিক মাতৃস্নেহে প্রতিপালিত হতে লাগলো| আত্মীয়
পরিজন নিজের সন্তানের চেয়েও অধিক যত্নে রতনকে
দেখভাল করতে লাগলো| সর্বোপরি,
মহব্বত আলীর মহব্বতের শাণিত
ধারা একটুও রতনকে বুঝতেই দিলো না যে
সে মাতৃহারা|
বছর দুই আড়াই যেতে
না যেতেই মহব্বত আলী দ্বিতীয় বিবাহ
করলেন| আত্মজনের অনেকেই শঙ্কিত হয়ে উঠলেন রতনের
ভবিষ্যত ভাবনায় কিন্তু “হিরা রত্ন কে
না করে যত্ন|” একটি
দৃশ্যের যবনিকার পর নাটকের মঞ্চের
পর্দা ওঠার মতোই রতনের
মা যেন পূণর্বার আবির্ভূত
হলেন| রতন তার চোখ
খোলার পর থেকে কোনোদিনও
মায়ের অদেখাকে অনুভব করেনি| অনুধাবন করতেও পারেনি তার মাতৃবিয়োগের কথা|
রতনের সব দস্যিপনা, বায়না,
আবদার, অনুযোগ সবকিছু মিটিয়েছেন তার (আগন্তুক) মা|
এমনকি এই মায়ের গর্ভজাত
সন্তানের সাথে দু’ভাই
মিলে একত্রে মাতৃদুগ্ধ পান করেছে| তবে
দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়াঝাটি যেমন লেগে থাকতো,
তেমনই ছিলো মিল-মহব্বত|
ছোট ভাই মানিকের সাথে
ছাড়া রতন সাধারণত আর
কারো সাথে খেলতো না|
রতন ছিলো ভীষণ ডানপিটে
এবং গোঁয়ার গোবিন্দ টাইপ; প্রায়শই
ছোট ভাই মানিককে চড়
কিল লাথি মেরে তাকে
পর্যুদস্ত করে ছাড়তো| একবার
তো খেলা করতে করতে
গাছি দা দিয়ে রতন
মানিকের ডান হাতের কড়ে
আঙ্গুলে কোপ বসিয়ে দিলো|
কান্না আর নালিশ ছাড়া
মানিকের আর কোনো পুঁজি
ছিলো না| সেদিনও রতনকে
কেউ বকাঝকা বা মারপিঠ করেনি|
(২)
এরই মধ্যে অনেক পঞ্জি-বর্ষ
অতিক্রান্ত হয়েছে রতন এখন পাঁচ/ছয় বছরের এক
অস্থির ডানপিটে, আত্মবিশ^াসী এক চপল
শিশু| এই বয়সেই সে
বলরামপুর গ্রামের প্রতিটি পাড়ার আনাচে-কানাচে চেনে| স্কুলেও হাতেখড়ি হয়েছে তার| বলরামপুর বুনোপাড়া
প্রাইমারি স্কুলে সে যাতাযাত করে
পায়ে হেঁটে| বাড়ি থেকে অন্ততঃ
একপোয়া পথ তো হবেই|
পশ্চিম পাড়ার মনিধার কাকার দোকান, উত্তরের পুকুর ঘাট, মসজিদ, আমতলা,
তেঁতুলতলা সর্বত্র তার হামেশা যাতায়াত,
তাকে শাসন করার যেন
কেউ নেই; অতি আদরে
সে হয়ে উঠেছে এক
স্বশাসিত নিজ রাজ্যের রাজা|
মনিধার কাকার দোকানের লেবুনচুষ তাকে খুব হাতছানি
দেয়| চার পয়সায় অনেকগুলো
লেবুনচুষ হয়| কোনোটা লাল,
কোনোটা সবুজ, কোনোটা হলুদ বিভিন্ন স্বাদের
এই লেবুনচুষ তার খুব পছন্দ|
বাপের পকেট তো আছেই,
এছাড়া তার নিজ রোজগার
আছে| খামারবাড়িতে বাঁশের আড়া করে সেখানে
পাট শুকানো হয় এই পাটের
গাট বাঁধার সময় পরিত্যক্ত পাটের
আঁশ, কুষ্টার ফেসো কুড়িয়ে নিয়ে
মনিধার কাকার দোকানে ওজন দরে বিক্রি
হয়| সেই পাটের বিক্রিত
পয়সা দিয়ে রতন লেবুনচুষ,
মুড়িমোয়া, ঝাল চানাচুরের প্যাকেট
কেনে| সারাদিন তার প্যান্টের পকেটে
কোনো না কোনো একটা
খাবার থাকেই| মনিধার কাকাও তাকে খুব পছন্দ
করে| আদর করে, দোকানের
বেঞ্চের উপর তাকে বসতে
দেয়, তাকে বাবু বলে
ডাকে| একবার একদিন মনিধার কাকার দোকানের বেঞ্চে বসা অবস্থায় রতন
দেখে মনিধার কাকার ঠোঁটে কালিঘাটের লম্বা বিড়ি| ধোঁয়া ছাড়ছেন মনিধার কাকা| কুণ্ডলি পাকানো সেই ধোঁয়ার দিকে
তাকিয়ে দেখছে আর দেখছে মনিধার
কাকার বিড়ি টানার ধরন|
খুব ভালোই লাগছে তার| মনিধার কাকা
তার উৎসুক চাহনি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কি বাবু, একটা টান দেবে
না কি?” রতন তাৎক্ষণিক
রাজি হয়ে যায়| মনিধার
কাকা জ্বলন্ত বিড়ি রতনের কচি
হাতে ধরিয়ে দেন| রতন মনিধার
কাকার মতোই একটান দেওয়ার
সাথে সাথে বিশ্রি কাশি,
চোখ মুখ দিয়ে পানি
বেরিয়ে গেলো| মনিধার কাকা তাকে তাড়াতাড়ি
কোলে তুলে নিয়ে মাথায়
ফুঁ দিয়ে হাত বুলাতে
লাগলেন, কিছুক্ষণ বাদেই রতন স্বাভাবিক হলো|
কুড়ানো পাটের আঁশ আর ফেঁসো
দিয়ে রতনের যেন পোষাচ্ছিল না,
সে নিজেকে নিজের চাইতে বড়ভাবে ভাবতো| তেঁতুলতলার পাশের মাঠে শনগাছ লাগানো
আছে| শনের দাম পাটের
চেয়ে বেশি, এর আঁশগুলোও হয়
অত্যন্ত সোনালি আর চকচকে| একদিন
সে বেশ কয়েকটা শনগাছ
কেটে আঁটি বেঁধে পাশের
গর্তে ডুবিয়ে রেখে আসলো| অপেক্ষা
করতে হবে অন্তত দিন
পনেরো বিশ, তারপর গাছ
পচে গেলে তার থেকে
আঁশ ছাড়াতে হবে| অপেক্ষায় থাকে
রতন|
(৩)
আজ মহব্বত আলী বাড়ি নেই|
রানাঘাট গেছেন| তাতে অবশ্য রতনের
গা হালকা হয়েছে এমনটা সে ভাবে না|
তার দৈনন্দিন চলার ধরন একই|
রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন| শীতটা বড্ড
বেশি পড়েছে আজ| তাই রতন
একটু দেরি করে ঘুম
থেকে উঠলো| শীতের প্রকোপ এতোটাই বেশি যে সে
দোতলার ছাদে চলে গেলো
রোদ পোহাতে| ছোট ভাই মানিক
তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি|
আজ এবং কাল স্কুল
নেই তাই সে মনে
মনে ভাবছে সারাদিন কী করা যায়|
সারাদিন সে হঠ হঠ
করে সারা পাড়া ঘুরলো|
বিকেলের দিকে পূর্ব পাড়ার
মোয়াজ্জেমদের বাড়ির উঠানে গেলো| সেখানে সে দারুণ এক
অঘটন ঘটিয়ে ফেললো| মোয়াজ্জেমদের উঠানে তখন রতনের সমবয়সী
ছেলেরা ‘এককা দোককা’ খেলছিলো|
সেখানে গিয়ে রতন বললো—
আমিও খেলবো| সাধারণত সে পাড়ার অন্য
ছেলেমেয়েদের সাথে খেলে না|
এদিন কী মনে হলো—
রতন তার খেলার ইচ্ছা
প্রকাশ করে ফেললো| রতনের
এমন প্রস্তাব পাওয়ার পর মোয়াজ্জেমের ইশারায়
এবং তার দলবল কিছুক্ষণের
জন্য খেলা থামিয়ে সকলে
একত্রিত হয়ে একে অপরের
কানে কানে কী যেন
বলাবলি করলো, তারপর খেলার অনুমতি দিলো| এক পর্যায়ে রতনের
এককা দোককা খেলার পালা আসলো, রতন
সইল (খাপড়া) হাতে নিয়ে সামনের
দিকে ছুড়ে মেরে এক
পায়ের ওপর ভর দিয়ে
‘কিত কিত’ বলতে বলতে
উঠানে দাগকাটা ঘর বা ছকগুলো
এড়িয়ে খাপড়া অবধি পৌঁছানোর চেষ্টা
করছে| হঠাৎ মোয়াজ্জেম বলে
উঠলো— দাগে পা পড়েছে
ফলে তুমি পচা— বাতিল
হয়ে গেছো| সইল অন্য কেউ
পাবে| রতন দৃঢ় কণ্ঠে
বলল— না দাগে পা
পড়েনি, আমি দাগ মাড়াইনি|
এক কথায় দু’কথায়
দারুণ ঝগড়া, বাকবিতণ্ডা শুরু হয়ে গেলো|
সকলেই মোয়াজ্জেমের পক্ষ নিলো| একপর্যায়ে
হাতাহাতি এবং মারামারি| সকলে
মিলে রতনকে উঠানের ওপর চিৎ করে
শুইয়ে ফেললো এবং মোয়াজ্জেম বললো—
যা কাঠিতে করে মুরগির বিষ্ঠা
নিয়ে আয়, ওর গালের
মধ্যে ঢুকিয়ে দেবো| পাশেই মুরগির পায়খানা ছিলো, একটি কাঠিতে করে
একটি ছেলে বেশ খানিকটা
মুরগির বিষ্ঠা এনে মোয়াজ্জেমের হাতে
দিলো| মোয়াজ্জেম সেই কাঠির বিষ্ঠা
রতনের ঠোঁটে মুখে লাগাতে লাগলো|
রতন প্রাণপণে ঠোঁট বন্ধ করে
সজোরে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে
দিলো| রতন উঠে দাঁড়িয়েই
দেখে পাশেই একটা ঝামা ইটের
টুকরো, সেটা হাতে নিয়ে
মোয়াজ্জেমের প্রতি সজোরে ছুড়ে মারলো| ধারালো
ইটের টুকরোর আঘাতে মোয়াজ্জেমের কপাল ফেটে গেলো
এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে
লাগলো| রতন এই দেখে
ক্ষীপ্র বেগে ছুটতে ছুটতে
নিজ বাড়ির দোতলায় তার চিলেকোঠার ঘরে
যেখানে পাটের বাণ্ডিল সাজানো ছিলো সে রকম
দুটি বাণ্ডিলের মাঝামাঝি অংশে নিজের দেহটাকে
ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাপটি মেরে
উপুড় হয়ে শুয়ে থাকলো|
এদিকে মোয়াজ্জেমের মা, চাচি মোয়াজ্জেমকে
রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে আসলো রতনদের
বাড়ি| রতনের মাকে উদ্দেশ্য করে
বললো— এই দেখো! তোমার
ছেলে কী করে মোয়াজ্জেমের
মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে
দিয়েছে| রতনের মা তো দেখে
হতবাক| কোথায় সে রতন! আজ
দেখে নেবো তাকে| আশকারা
পেতে পেতে ছেলেটা একেবারে
মাথায় উঠে গেছে| আসুক
সে বাড়ি| আজ তার একদিন
কি আমার একদিন| এসব
কথা বলে মোয়াজ্জেমের মাকে
সান্ত্বনা দিয়ে আশ^স্ত
করলো| তারা মোয়াজ্জেমকে নিয়ে
বাড়ি ফিরে গেলো| রতন
এই দৃশ্য উঁকি মেরে মেরে
দেখলো এবং সবই শুনলো
কিন্তু সে নিচে নামলো
না| সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত
রতন সেই পাট গাদায়
লুকিয়ে রইলো| এদিকে রতনের মা বেশ উৎকণ্ঠিত!
কোথায় গেলো ছেলেটা? বেশ
ঘণ্টা খানেক বাদে রতন আস্তে
আস্তে নিচে নেমে এলো|
এবং মায়ের সামনে দাঁড়ালো| মা শান্ত অথচ
রাগাšি^তভাবেই রতনকে
জিজ্ঞাসা করলেন— মোয়াজ্জেমের মাথা ফাটালে কেনো?
রতন ভয়ে ভয়ে মাকে
সমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত বললো| মা দেখলেন দোষটা
মোয়াজ্জেমেরই তাই আর রতনকে
কিছু না বলে তাকে
রাতের খাবার খাইয়ে বললেন— শুয়ে পড়োগে| রতন
শীতে কাতর হয়ে লেপ
মুড়ি দিয়ে শোয়ার পর
পরই ক্লান্ত শরীর আর উৎকণ্ঠিত
মনের কিছুটা প্রশমন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো|
(৪)
রাত এগারোটার দিকে মহব্বত আলী
বাড়ি ফিরলেন| রতন তখন গভীর
ঘুমে নিমগ্ন| মহব্বত আলী ঘরে ঢুকেই
জিজ্ঞাসা করলেন— রতন কি ঘুমিয়ে
পড়েছে? রতনের মা উত্তর দিলেন—
রতন সেই সন্ধ্যার পর
পরই ঘুমিয়ে পড়েছে| তার দস্যিপনার কথা
কিছুই জানালেন না মহব্বত আলীকে|
ওকে একটু তুলে দেবে?
কিছু জামাকাপড় এনেছিলাম ওর জন্য, পরনে
ঠিক ঠাক লাগে কি
না দেখতাম, বললেন মহব্বত আলী তার স্ত্রীকে|
স্ত্রী জানালেন, ও ঘুমাচ্ছে, কাল
সকালে পরালে হয় না? না, তাকে ডাকো
এখনই দেখি| রতনের মা রতনকে ঘুম
থেকে জাগালেন| এদিকে মহব্বত আলী একটা শপিং
ব্যাগ থেকে একে একে
বের করতে লাগলেন রতনের
পোশাক আশাক আর চকোলেট
জাতীয় মিষ্টান্ন| যার মধ্যে রয়েছে
নীল রঙের ওপর সাদা
রেখা টানা একটা হাফ-শার্ট, নীল তবে আকাশ
নীল নয় একটু গাঢ়
নীল তার ওপর সাদা
রেখা টানা| বেশ দামী একটা
সুতির শার্ট; দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়|
সেই সাথে আছে ঘিয়ে
রঙের একটা গ্যাভাডিনের হাফপ্যান্ট|
এছাড়াও শার্টের রং সাদৃশ্য নীল
সাদা মিশ্রিত রঙের হাটুর নিচ
অবধি লম্বা একজোড়া মোজা, ‘নটিবয়’ লেদার স্যু, চামড়ার ˆতরি কোমর-বন্ধনী
আরও আছে বয়াম ভর্তি ভিন্ন
ভিন্ন রঙ ও স্বাদের
মাছরাঙা লেবুনচুষ| ইতিমধ্যেই রতন ঘুম থেকে
উঠে বসেছে| চোখ ডলতে ডলতে
দ্রব্য সামগ্রীর দিকে তাকিয়ে উৎফুল্লের
হাসি দিয়ে শার্টটা গায়ের
গেঞ্জির ওপর দিয়ে পরে
নিলো| ঘিয়ে প্যান্টের নিচে
শার্টটা ইন করে চামড়ার
বেল্টটি প্যান্টের লুফের মধ্যে ঢুকাতে ঢুকাতে বলতে লাগলো এখনই
সব পরিয়ে দাও| বাবা মা
মিলে রতনকে জুতা-মোজা, শার্ট
ও প্যান্ট পরিয়ে দিলেন| রতন বিছানা থেকে
উঠে মেঝেতে কয়েকবার পায়চারি করলো| চকোলেটের বয়ামটা মায়ের হাতে দিয়ে বললো—
উঠিয়ে রাখো| পাশের ঘরের বড় আয়নায়
নিজেকে একবার দেখে নিয়ে সেই
পোশাক পরা অবস্থায় লেপের
নিচে চলে গেলো রতন;
এমনকি জুতা মোজাও পা
থেকে খুললো না|
(৫)
সকাল হতেই ঘুম ভাঙলো
রতনের| কারো সাথে কোনো
কথা না বলেই ছুট
দিলো লেবুতলার মাঠের সেই জঙ্গলের মধ্যে
ছোট একটা ডোবার ধারে,
যে গর্তে শনগাছ (পাট গাছের মতো)
ভিজিয়ে রেখেছিলো| এখন সে ওই
শনগাছের আশঁ ছাড়াবে তারপর
রৌদ্রে শুকিয়ে মনিধার কাকার দোকানে বিক্রি করবে| শনগাছের আঁশ সিল্কের মতো
চকচকে হয় এবং কাঁচা
সোনার রঙে চিকচিক করে|
আঁশগুলো ছাড়িয়ে ধুয়ে নিয়ে শুকানোর
পর বিক্রি করবে| এই সব ভাবতে
ভাবতে রতন পৌঁছে গেলো
সেই ডোবার ধারে আঁটি বাঁধা
দশ/বারোটা শনগাছের কাছে| পানির মধ্যে আজ পনের/বিশ
দিন ধরে ডুবানো আছে
গাছগুলো| ওগুলোকে আজ সে উঠাবে|
কিন্তু এই পোশাকে তো
পানির মধ্যে নামা যাবে না|
তাই সে একের পর
এক শার্ট প্যান্ট, জুতা মোজা, গেঞ্জি
সব খুলে এক জায়গায়
রেখে একেবারে জন্মকালীন পোশাকে নেমে পড়লো হিম
শীতল পানিতে| পানি তার বুক
অবধি হবে, এক পা
এক পা করে পৌঁছে
গেলো তার সেই ভেজানো
শনগাছের বান্ডিলটার দিকে| বান্ডিলের ওপরে রাখা মাটির
ঢেলাগুলো সরিয়ে পাড়ের দিকে আনছে রতন|
হঠাৎ তার নজরে পড়লো
পেছনের দিকে যেখানে সে
তার নতুনের গন্ধ যুক্ত শার্ট-প্যান্ট জুতা-মোজা স্তূপ
করে রেখেছিলো| দেখে তো রতনের
চক্ষু ‘চড়কগাছ’| এমন দৃশ্য সে
জীবনেও দেখেনি| আলেয়াদের শ্যামলা রঙের বকনা গরুটা
তার নতুন শার্টটা মুখের
মধ্যে নিয়ে চিবাচ্ছে| রতন
তড়িঘড়ি করে গরুর মুখ
থেকে তার শার্ট ছাড়াবার
আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো; কিন্তু
গরুটা শিংসহ মুখ দুলিয়ে জঙ্গল
ও আগাছা বনের দিকে দৌড়
দিলো| রতনও তার পিছু
পিছু দৌড়াচ্ছে| সারা জঙ্গল বিছুটি
চুৎরা গাছে পরিপূর্ণ| চুৎরার
পাতা রতনের সমস্ত ভেজা শরীরে পরশ
বুলিয়ে দিলো| আর যা হবার
তাই হলো| সমস্ত শরীর
চুলকাতে চুলকাতে ফুলে লাল হয়ে
গেল| ও কান্নায় ভেঙে
পড়লো| একদিকে অসহ্য চুলকানি আর অন্যদিকে নতুন
শার্ট খোয়া যাওয়ার বেদনা
তাকে বিপর্যস্ত করে তুললো| তবুও
সে গরুর পিছু ছাড়লো
না| এক পর্যায়ে গরুটি
তার মালিকের বাড়িতে অর্থাৎ আলেয়াদের বাড়ি পৌঁছালো| রতন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলেয়ার বাবার কাছে তার জামাটি
তাদের গরু মুখে নিয়ে
দৌড় দিয়েছে বলে জানালো এবং
সে তার জামাটি ফেরত
দেওয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলো|
আলেয়ার বাবা সমস্ত ঘটনা
শুনে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, জামাটি
ফেরত দেবে; এই বলে আলেয়ার
গরুর দিকে গেলো এবং
দেখলো, রতনের শার্টটি এখন আর গরুর
মুখে নেই| সামান্য অংশ
দেখা গেলেও বাকিটা গলাধকরণ করে ফেলেছে|
আলেয়ার বাবা রতনকে বুকের
মধ্যে নিয়ে শুখনো গামছা
দিয়ে তার সমস্ত শরীর
মুছে দিলেন| বাড়ির ভেতর থেকে শরিষার
তেল এনে তার সমস্ত
ফোলা শরীরে মাখিয়ে দিলেন| রতনের কান্না কিছুতেই থামছে না, সে কাঁদছে
আর ফুপাতে ফুপাতে বলছে, কালই আব্বু আমার
শার্টটি রানাঘাট থেকে এনে দিয়েছেন|
কী সুন্দর জামা বলে আবারও
কান্নায় ভেঙে পড়লো| আলেয়ার
বাবা রতনকে সঙ্গে নিয়ে গর্তের পাশে
রাখা সেই জুতা, প্যান্ট,
গেঞ্জি, মোজাগুলোসহ রতনকে
তার বাড়িতে পৌঁছে দিলো|
(৬)
শরাফত আলী রতন এখন আশি ছুঁই ছুই| শরীর মন সবই ভারাক্রান্ত| জীবনে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছিলেন| তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী| নিয়মিত কোর্টে যেতে পারেন না; বিছানায় অধিকাংশ সময় কাটান| উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ, ভার্টিগো, স্পন্ডিলোসিস এমন সব স্থাবর অস্থাবর রোগে এখন রতন আক্রান্ত| অলস শরীর আর সঞ্চালিত মন ঘুরেফিরে নানান স্মৃতির পাতায় পাতায়| দেশে-বিদেশে কত সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছেন, নানা রঙের নামি-দামি স্যুট-কোট, পোশাক আশাকে সজ্জিত হয়েছেন, কিন্তু জীবনের এই সায়াহ্নবেলায় আজও ভুলতে পারেনি তার আব্বুর আনা রানাঘাটের সেই নীল রঙের ওপর সাদা দাগ টানা নতুন শার্টের কথা, যে দাগ তার মনের গভীরে আজও উৎকীর্ণ হয়ে আছে| চারদিকে একটু নির্জনতা নেমে এলেই অনেক স্মৃতির ভিড়ে তাকে তুমুল নস্টালজিক করে ছোট্টবেলার সেই রানাঘাটের জামা|

আপনার মতামত লিখুন