সংবাদ

ছোটগল্প

ভূতুদ্দম


নাসরীন জাহান
নাসরীন জাহান
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৮ এএম

ভূতুদ্দম
ছবিসূত্র : ইন্টারনেট

মন তুমি আর আমি এক?

অবশ্যই এক| কেন?

কী জানি, ডুপ্লেক্স বিশাল বাড়িতে আজীবন ভূতের ভয়ে সাংঘাতিক ভীতু নীলিয়া যখন কী মনে পড়ে, কী পড়ে না— এমন অবস্থায় নিজের মধ্যে ছায়ালিয়া ঘূর্ণি খেতে থাকে, তখন আচমকা বাতাসের সশব্দ কেশরে আচমকা মেঝের বহুস্তরের নিচের যেনবা পাতালে ঢুকে যায় সে| 

এরপর... কীভাবে ধীরে ধীরে মাটির ছায়ার আচ্ছন্নতা থেকে যেনবা আচমকা নিজ বাড়িতে আছে, সে সেটা সত্যি সত্যি তির্যকভাবে অনুভব করতে পারে, নাহ! কোত্থাও কিন্তু হয় নি| কেবল হুহু মন উড়ালিয়া গানের পাখি হয়ে নিজের মধ্যে শব্দের ঝর্না বানাতে থাকে, চিৎসাঁতার ঢেউ সাঁতার যে-ই দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবে, সম্মুখে ভূতুদ্দম| করোনা নামের একটা ভয়ংকর ভূত পৃথিবীতে রহস্যময় আততায়ী হয়ে ঢুকে পড়েছে| 

পৃথিবী একদম অপ্রস্তুত এজন্য| মুহূর্তের জন্য হলেও তাজ্জবে বিমূঢ় বোধ করে| এদেশে যদিও অনেক দেরিতে খবর হয়েছে কিন্তু এর জন্ম প্রথমেই চীনে! চীনের ভূমিষ্ঠ সন্তান প্রথমেই আমেরিকাকে, যে আমেরিকা পৃথিবীর রাজার রাজত্বে থাকে, সারা পৃথিবী হাজার দ্বিমত পোষণ করেও হয় বোকা না হলে বদমাশ মহারাজা ট্রাম্প সেখানে...|

এরপর পৃথিবীর কোন দেশ কী ভেবেছে কী ভাবে নি, নীলিয়া অধঃপাতে ডুবে যায়|

এক কলেরায়ই মারা গেছে লক্ষ কোটি| তার কীভাবে জানি জানা হয়ে যায়, এই রহস্যময় আততায়ী, খুনি ভূত, আমেরিকাকে পরাস্ত করেছে সবচেয়ে আগেই প্রায়| আমেরিকাতেই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি| প্রথম পর্যায়ে সিম্পটম সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, গায়ে ব্যথা, জ্বর ও বমি|

করোনার আগে পৃথিবীতে আগে বিষধারক অসুখ আসে নি? তবে সে কেন এত ভাবছে? তারপরও নীলিয়া কেন প্রতিনিয়ত সবচেয়ে বেশি কম্পিত থাকে? সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে সে টেনশনে উজ্জ্বল আলোর জাগরিত নীলিয়াকে অন্ধকারে কানে কানে কোনো এক প্রিয় বান্ধবী ফিস ফিস বলে যেতে থাকে, জানিস, এই রোগের নাম কিন্তু করোনো না, ভূত! ভূতেরও কিছু একটা আশ্চর্য নাম ‘ভূতুদ্দম’! কাউকে বলবি না| কারণ এর নাম যে এটা এখনো কেউ জানে না| আমি কজনকে বলে দেখেছি, দেখি| কেউ জানে না| তুই যদি বলিস, তারা তোকে বদ্ধ পাগল ভাববে| 

ফিস ফিস ধ্বনি প্রতিধ্বনি ধীরে ধীরে এ রোগের প্রাথমিক সিম্পটম বলে যেতে থাকে| মনে হয় কেমন জানি জ্বর জ্বর কপালে সেই জ্বর যতই মনের জোর ভেঙে খান খান... মরি মরি... হুড়মুড় করে বিছানায় বালিশ নাকি গর্জমান কুকুরদের ধাবমানতা! ঘামের সমুদ্দুর থেকে ভুস করে বিছানার বালিশেই কাত নীলিয়া| ঘুম আসছে কি? 

এখন প্লিজ সোনা, একটু ঘুমাও... ফিসফিস করে ফের| কিন্তু বমি বমি স...ব স্নায়ু যখন ছিঁড়ে যায় যায় মনে হয় ভূতু..., না না,  লম্বা এক নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে মনে হয়...

মনে পড়ে, বুকের দুধে ফিগার নষ্ট হবে মাম্মি তাই, সদ্য নবজাতক হারানো বুয়া, নীলিয়াকে নিজের বুকের দুধ খাইয়েছিল!

টিউব লাইটের আলো কামড়ে সেই বুয়াকে খোঁজে ও মমতা মা... বুয়া... তুমি কই...

আচমকা ঘুমন্ত কান বিড়াল পায়ে ফের  ফিস ফিস ধ্বনি শোনে... তোকে কেউ বলে নি? চুউপ... সবচেয়ে মৃত্যু কিন্তু এখন বেশি ঢাকায়! রহস্যময় খুনির হাতে এখানে মৃত্যুর সংখ্যা, চীনকেও ছাড়িয়েছে!

এই তো তোর বাড়ির অনেক কাছের প্রতিবেশী... খুলে বল জাদু... আমি ভয় পাব না!

শারমিন!

শারমিন, আমার দুবছরের বন্ধু, যে আমি কিছু বলার আগেই মুখ চোখে সব বলে দিত!

ধুর! বাখোয়াজি!

না ওরা পাঁচ ভাইবোন, প্রথমেই ও এরপর, ভূতুদ্দম কী করেছে শুনিস নি! শারমিনকে খুন করে সেতুহীন উড়াল নদীতে লটকে দিয়েছে| এখন কড়া নিয়ম, মুখে মাস্ক, একজন থেকে আরেকজনে পাঁচ কি ছয় ফিট দূরত্বে থাকতে হবে, বুঝলি কিছু?

ধুর, বকবক, বকবক প্যাচাল...

অসহ্য!

নীলিয়ার চোখ এইবার প্রস্ফুটিত যেন চোখের ওপর কোনো তো পাপড়ি ছিল না!

কিন্তু চারপাশটা মুহূর্ত চক্করে দেখে সব বাতি জ্বলছে,

বাপ্পি বাপ্পি? শুনেছি ন্যুইয়র্কের সাইরেন শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারে না!

মম...তা...!

না, আগে তুমি বলো, কজন মারা গেছে? শুনেছি সে আন্তর্জাতিক খুনি! নারী, না, পুরুষ কেউ জানে না, দুম করে প্রথমে একটা খুন পরই আরও দশ খুন!

তুমি বাপ্পি তুমি ভালো আছো তো! খালামনি ছোট ফুপি!

কী হয়েছে মা?

ফের সেই অবিনাশী ফিসফিস, কে যে বলে নীলিয়াকে মাথামুণ্ড কিছুই বোঝে না বাপ্পি... বাপ্পিগো... জানিস, হ্যাঁ সে এরপর এক এক করে অন্য ভাইবোন, কেউ জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ কেউ খালি চিৎকার করে কাশছে!!

এরপর! নীলিয়া কানে দ্রুত ওয়াকফোন লাগায়... সব ভ্রম!

এসিতেও গরম কমে না নীলিয়ার আচমকা এসি’র রিমোটের টুটি বন্ধ করে, ওরে বাপরে কী শীত!

আমেরিকার পুলিশ কত সংঘাতিক, তার চোখ ফাঁকি দিয়ে! আগরুম বাগরুম স...ব|

সেইটাই তো, তুই মোবাইল ওপেন করে, প্রথমেই আজকের নিউজ বের কর, তারপর মন দিয়ে পড়, পৃথিবী কোন দিকে,

ˆকশোরের নেকড়েটি ওর হাতের ওপর মুখ রাখে| এবং ক্রমাগত পাক খেতে থাকে| বিকারগ্রস্ত মানুষের মতো স্কার্ট ধরে টানতে টানতে ল্যাম্পপোস্টের উদাসীন মশাদের রাজত্বে নিয়ে ফেলে| একটু আশ্বস্ত হয়ে সে পুনরায় অন্ধ মানুষের মতো নিজের শরীরটাকে শূন্যে ছেড়ে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো জ্যোৎস্না বিবরের স্রোতের দিকে ছুটতে থাকে| 

নীলিয়া নিজে এখন কোথায়? আর অন্যরা কোথায়...?

ধীরে ধীরে পাপড়ির ভাঁজ ভাঙে... অনলাইন আঙুল সর্বশেষ নিউজের হেডলাইন... আন্তর্জাতিক খুনি আচমকা খুন করে মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়...

এখন তখন বাপ্পির ব্যবসায়ও লাটে উঠছে, বড় গার্মেন্টসের ব্যবসা তাঁর| অনেক সৎ উচ্চবিত্ত বাপ্পির কন্যা নীলিয়া!

রাস্তায় বসার অবস্থা!

ধুর! যেন কেউ ভেন্টিলেটরের ফাঁক ধরে ডাকতে থাকে, নীলিয়া... স...ব সবুজ গাছ কাটছে মানুষ! তোমার না সবুজ রং পছন্দ? একটু কাছে আসো... আমি অনেক সবুজ গাছপালা এনেছি| নীলিয়া ভোঁ ছুটে নেমে আসে, ক-বে গ্রামে গিয়েছিল যেন? মাধব শিউলী ফুলের কোমর ঝাঁকাচ্ছিল, নীলিয়ার সারা দেগে গুচ্ছ গুচ্ছ শাখা, মিষ্টি হলুদ ভেতরে| ইস! কী মধুর ঘ্রাণ গো!

নী...লি...য়া... আত্মা...!!

কী বলছিস, আত্মা! ভুতুড়ে নাটক নাকি? হাসতে থাকে নীলিয়া|

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা, যাদের সব পুঁজি বিভিন্ন ব্যবসায় খাটিয়ে, ব্যাংকে কোনো সঞ্চয় রাখত না... এমনও অনেকেই আছে, যারা যারা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন, এখন বাড়িওয়ালা কী বুঝে যেন দু’মাস অপেক্ষা করে দরজায় নক করছে, আমার বউ সারা রাত ঘুমায়নি, তার আপন বড়ভাই আচমকা মাঝরাতে ছুরি বিদ্ধ হয়েছে!

গার্মেন্টসকর্মীরাই কাজের লোকের অসম্মানে দিনরাত প্রায় বিশ্রামহীন, একটু সম্মানে শান্তিতে ঘুমানোর ইচ্ছায় সারাগ্রাম উধাও প্রায়, মানে যারা, বাড়িতে কাজ করত তারা অনেক দিন ধরেই গার্মেন্টসের চাকরিতে যোগ দিয়েছে| ভূতুদ্দম এইবার সৌরজগতের কাছে| এদেশকে পৃথিবী তলাহীন ঝুড়ি বানাচ্ছে!

এখন! আর কী, মূল বড় শিল্পপতির বাড়িওয়ালা নক করছে!

বাপ্পি... বাপ্পি...

আচমকা হুড়মুড় ভূত!

এ অসুখ অনেকটা ছোঁয়াচের মতোই... তাই বেশিরভাগ ধনী দেশের ও সরকার, ঘর থেকে না বের হতে লকডাউন এমনকি কার্ফ্যুও ক-ত দিল? জানে না, সরকারও জানে না|

চিতাভস্ম! শামিন, ও শারমিন, তুই নাকি খুন! এ্যাই বলতো, খুন কী!

ইন্দ্রিয় বেদনা... তেজি ঘূর্ণিতে, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, গরিব দেশে বিশেষ করে ছিন্নমূলরা কতদিন কীভাবে? জাস্ট একবার কল্পনায় তাদের দশা দেখতে পারছিস কিনা, দেখ!

আমি না শীতে কাঁপতে কাঁপতে মরেই যাব,

আমার এক্ষুনি একটা লম্বা ঘুমে ডুবে যেতে হবেই—

ধীরে ধীরে এদেশের বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার শোনে ও বুড়িগঙ্গা তুমি এদেশের সমুদ্র তুমি... কান্না শুনেও বুড়ি... গঙ্গা তুমি... ও সমুদ্র তুমি বইছো কেন? 

নীলিয়ার কানের সীসা ভেঙে ফের ফিসফিস ভূপেনের গানে কান পেতে পেতে বালিশে হেলান দিয়ে দুর্মর ঘুমের সশব্দ আর্তনাদ চোখের পাপড়ির ভাঁজে যেন ঘণ্টির ক্যাঁচ ক্যাঁচ ভারি হয়ে যায়|

নীলিয়া ঘুমিয়ে পড়ে|

বহু বছর এ বাড়ি থাকা দুধ মা মমতাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ছিটকে দিয়েছে সেই কখন! তার আগে খবরের হেডলাইন ‘ভূতুদ্দম’| এ এলাকার দুইজনকে খুন করেছে? মমতা মা তোমাকে কতবার পইপই করে বলেছি, তুমি আমাকে না জানিয়ে বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলবে না| যারা আমাদের মতো পাঁচ-দশটা বিশ্বস্ত কাজের মানুষ ঝেঁটিয়ে বিদায় করছে! আমার বান্ধবী সোনিয়াকে তুমি চিন না? খালি সোনিয়া না ও আমাকে জানাল, এখন সোনিয়া নিজে একা রান্না করে, একা বাড়ির সব কাজ করে, আমাদের মতো আরও যারা আছে তারাও এরকম করছে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না, তুমি জানো না এই রোগটা ছোঁয়াচে? তাহলে আমাকে না জানিয়ে বাইরে গেলে কেন? জানো আমি টিভির স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখেছি সেই ভূতুদ্দম এর চেহারা... নীলিয়ার তাজ্জব ধমকে মমতা থতমত খায়| ফের নীলিয়া চিৎকার করে, ভূতুদ্দম নারী না পুরুষ তুমি জানো না কেউ জানে না? ভূতুদ্দম-এর চেহারা ঠিক তোমার চেহারার মতো, তুমি এখনই বেরিয়ে যাও, নইলে আমি তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব| মমতা মা আচমকা বসে পড়ে!

নীলিয়া তাকে টেনেহিঁচড়ে সত্যি সত্যি এবার দরজার বাইরে ছিটকে বের করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ করে দেয়| এরপর ফের অধঃপাতে ডুবে যেতে থাকে| কিন্তু তার বিড়বিড় করে বুয়ার কানে উচ্চকিত শব্দে পৌঁছে যায়...| আমার প্রিয় বন্ধু শারমিন মারা গেছে, তার পরিবারের আর যা ভাইবোন, কে কেমন আছে বুকের ধড়ফড়ানিতে একবিন্দু শুনতে চাই নি! সাবধান করে দিচ্ছি, তুমি যদি আমার আত্মীয়দের কাছে একটুও আমার সম্পর্কে যদি কিছু বলো আমি তোমাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব| নীলিয়া কাঁপতে কাঁপতে একটু বসে লম্বা একটা শ্বাস নিতে চায়...

অতঃপর অন্ধকার তরঙ্গ বেয়ে নিঃশব্দে আন্তর্জাতিক খুনি পৃথিবীর সব সরকারের মাথায় যেন গণ্ডগোল ঢোকাতে চায়...

রাশিয়ায় না কোথায় জানি না বিজ্ঞানীরা কী এক টিকা আবিষ্কার করেছে সেটা অনেক পরীক্ষায় পজেটিভ ফল পেয়েছে, ফের খবরের হেডলাইন যেনবা, এদেশের হাজার, লক্ষ কেউ সারা দিন উপোস, অনেকেই চাকরিহীন! বেকারদের মাথায় বজ্রপাত পড়েছে, এদেশের সরকার, কিছু বিবেকবান স্টুডেন্ট, কারও সামান্য বেতনের চাকরি, তারা যূথবদ্ধ হয়ে ওদের জন্য কিছু করা যায় কিনা একটা পজেটিভ নম্বর দিয়েছে সে নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে যার যা আছে সাহায্য করতে পারে| ওরা যা পাচ্ছে, সরকার যা দিচ্ছে প্রায় সব, যতটুকুই যা এক করতে করতে ওদের জন্য ত্রাণ পাঠাতে থাকছে কিন্তু এদেশের মন্ত্রী, আমলা, বুর্জুয়ারা আর যাঁরা হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখছে কিন্তু নিজেরা তো দিচ্ছেই না বরং সে রক্ত চুষিরা গরিবের ত্রাণ লুটে খাচ্ছে| এমনকি এদেশের প্রতিষ্ঠিত, একটা দুইটা ওষুধ কোম্পানি সে টিকা তারা পেয়েছে এমন আশ্বাস দিয়ে চড়া মূল্যে সেসব ওষুধ বিক্রি করছে...|

নীলিয়া দুহাতে কান ঢেকে চিৎকার করে না... না... না... আমার বাপ্পি কিছুতেই তেমন না| একজীবনে তিনি ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রপতির মতো কুলি ছিলেন| তিনি অনেক সৎ...

এইবার যেন কানের ভেতরে সবুজ বাতাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনি ফিসফিস জানাতে থাকে তোমার বাপ্পি তেমন কে বলেছে? সব্বাই তাকে ভালো জানে! তুমি কেন মমতা মাকে এত অবিশ্বাস করলে? বেচারি কোথায়... হাঁপাচ্ছে, নাকি মরে গেছে একবারও খোঁজ নিলে না, নীলিয়া বিড়বিড় করতে থাকে, আসলে না ভূতুদ্দম আমাদের ভেন্টিলেটারে ওঁৎ পেতে দাঁড়িয়ে আছে| আমাকে খুন করে চলে যাওয়ার জন্য এরপর আমি কীভাবে ঝুঁকি নিই?

এইভাবেই কখনো চিতাবাঘ কুচকুচে গোখরো অথবা অজগর, নীলিয়ার টুঁটি যেন সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দেয়...

হাঁপাতে হাঁপাতে কীভাবে কোথায় ছিটকে পড়ে আচমকা বিশ্রামে নিজের মেঝেকে উজ্জ্বলিত গুহার পলিমাটি মনে হয়, কানামাছি ভোঁ ভোঁ... অবিরল হাড়ের ধারা, ধুমল ঝরা পত্রপল্লব|  

ক্ষুধার্ত মানুষের কোরাস চিৎকার তার কানে স্রোতের মতো ধেয়ে আসতে থাকে! কান চেপে ফের বসে পড়ে সে| 

সে যেন এক ছুটে শারমিনের দরজায় সজোরে ধাক্কায়— শারমিন, আমাকে বাঁচা!

তুই নাকি খুন হয়েছিস? পাগল হয়ে গেছে সবাই| 

ছুটতে ছটতে নীলিয়া দরজা খুলেই দেখে— যেনবা ভূতুদ্দম অন্য কোনো রাক্ষুসী রূপ ধরে দরজায় দাঁড়ানো... কোত্থেকে কীভাবে তলোয়ার এনে নীলিয়া মেঝেতে চেপে, বুকে বসিয়ে দেয়, তলোয়ার ফলা তীব্র বেগে রক্ত স্রোতে মেঝে ভাসতে থাকে— এরপর সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দেখে| সম্মুখে পুলিশ!!

যখন তার হাতে বেড়ি পরে, ততক্ষণে নীলিয়া কীভাবে যেন নেতিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,

সবশেষে দুঃ¯^প্নের অবসান| নীলিয়া দরজা খুলে বাপ্পিকে জড়িয়ে ধরে, আমি খুন করি নি বাপ্পি আমাকে না ভূতুদ্দম!

জানি মা মণি, ও তো কবেই মারা গেছে| 

তুমিই তো বলেছ|

ওটা তোমার মর্মভেদী দুঃস্বপ্ন ছিল|

এই তো দেখো| আমি তোমাকে কীভাবে বুকে আগলে জড়িয়ে আছি!

ঘুমোও| মা এইবার একটু শান্তিতে ঘুমাও...|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


ভূতুদ্দম

প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

মন তুমি আর আমি এক?

অবশ্যই এক| কেন?

কী জানি, ডুপ্লেক্স বিশাল বাড়িতে আজীবন ভূতের ভয়ে সাংঘাতিক ভীতু নীলিয়া যখন কী মনে পড়ে, কী পড়ে না— এমন অবস্থায় নিজের মধ্যে ছায়ালিয়া ঘূর্ণি খেতে থাকে, তখন আচমকা বাতাসের সশব্দ কেশরে আচমকা মেঝের বহুস্তরের নিচের যেনবা পাতালে ঢুকে যায় সে| 

এরপর... কীভাবে ধীরে ধীরে মাটির ছায়ার আচ্ছন্নতা থেকে যেনবা আচমকা নিজ বাড়িতে আছে, সে সেটা সত্যি সত্যি তির্যকভাবে অনুভব করতে পারে, নাহ! কোত্থাও কিন্তু হয় নি| কেবল হুহু মন উড়ালিয়া গানের পাখি হয়ে নিজের মধ্যে শব্দের ঝর্না বানাতে থাকে, চিৎসাঁতার ঢেউ সাঁতার যে-ই দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াবে, সম্মুখে ভূতুদ্দম| করোনা নামের একটা ভয়ংকর ভূত পৃথিবীতে রহস্যময় আততায়ী হয়ে ঢুকে পড়েছে| 

পৃথিবী একদম অপ্রস্তুত এজন্য| মুহূর্তের জন্য হলেও তাজ্জবে বিমূঢ় বোধ করে| এদেশে যদিও অনেক দেরিতে খবর হয়েছে কিন্তু এর জন্ম প্রথমেই চীনে! চীনের ভূমিষ্ঠ সন্তান প্রথমেই আমেরিকাকে, যে আমেরিকা পৃথিবীর রাজার রাজত্বে থাকে, সারা পৃথিবী হাজার দ্বিমত পোষণ করেও হয় বোকা না হলে বদমাশ মহারাজা ট্রাম্প সেখানে...|

এরপর পৃথিবীর কোন দেশ কী ভেবেছে কী ভাবে নি, নীলিয়া অধঃপাতে ডুবে যায়|

এক কলেরায়ই মারা গেছে লক্ষ কোটি| তার কীভাবে জানি জানা হয়ে যায়, এই রহস্যময় আততায়ী, খুনি ভূত, আমেরিকাকে পরাস্ত করেছে সবচেয়ে আগেই প্রায়| আমেরিকাতেই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি| প্রথম পর্যায়ে সিম্পটম সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা, গায়ে ব্যথা, জ্বর ও বমি|

করোনার আগে পৃথিবীতে আগে বিষধারক অসুখ আসে নি? তবে সে কেন এত ভাবছে? তারপরও নীলিয়া কেন প্রতিনিয়ত সবচেয়ে বেশি কম্পিত থাকে? সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে সে টেনশনে উজ্জ্বল আলোর জাগরিত নীলিয়াকে অন্ধকারে কানে কানে কোনো এক প্রিয় বান্ধবী ফিস ফিস বলে যেতে থাকে, জানিস, এই রোগের নাম কিন্তু করোনো না, ভূত! ভূতেরও কিছু একটা আশ্চর্য নাম ‘ভূতুদ্দম’! কাউকে বলবি না| কারণ এর নাম যে এটা এখনো কেউ জানে না| আমি কজনকে বলে দেখেছি, দেখি| কেউ জানে না| তুই যদি বলিস, তারা তোকে বদ্ধ পাগল ভাববে| 

ফিস ফিস ধ্বনি প্রতিধ্বনি ধীরে ধীরে এ রোগের প্রাথমিক সিম্পটম বলে যেতে থাকে| মনে হয় কেমন জানি জ্বর জ্বর কপালে সেই জ্বর যতই মনের জোর ভেঙে খান খান... মরি মরি... হুড়মুড় করে বিছানায় বালিশ নাকি গর্জমান কুকুরদের ধাবমানতা! ঘামের সমুদ্দুর থেকে ভুস করে বিছানার বালিশেই কাত নীলিয়া| ঘুম আসছে কি? 

এখন প্লিজ সোনা, একটু ঘুমাও... ফিসফিস করে ফের| কিন্তু বমি বমি স...ব স্নায়ু যখন ছিঁড়ে যায় যায় মনে হয় ভূতু..., না না,  লম্বা এক নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে মনে হয়...

মনে পড়ে, বুকের দুধে ফিগার নষ্ট হবে মাম্মি তাই, সদ্য নবজাতক হারানো বুয়া, নীলিয়াকে নিজের বুকের দুধ খাইয়েছিল!

টিউব লাইটের আলো কামড়ে সেই বুয়াকে খোঁজে ও মমতা মা... বুয়া... তুমি কই...

আচমকা ঘুমন্ত কান বিড়াল পায়ে ফের  ফিস ফিস ধ্বনি শোনে... তোকে কেউ বলে নি? চুউপ... সবচেয়ে মৃত্যু কিন্তু এখন বেশি ঢাকায়! রহস্যময় খুনির হাতে এখানে মৃত্যুর সংখ্যা, চীনকেও ছাড়িয়েছে!

এই তো তোর বাড়ির অনেক কাছের প্রতিবেশী... খুলে বল জাদু... আমি ভয় পাব না!

শারমিন!

শারমিন, আমার দুবছরের বন্ধু, যে আমি কিছু বলার আগেই মুখ চোখে সব বলে দিত!

ধুর! বাখোয়াজি!

না ওরা পাঁচ ভাইবোন, প্রথমেই ও এরপর, ভূতুদ্দম কী করেছে শুনিস নি! শারমিনকে খুন করে সেতুহীন উড়াল নদীতে লটকে দিয়েছে| এখন কড়া নিয়ম, মুখে মাস্ক, একজন থেকে আরেকজনে পাঁচ কি ছয় ফিট দূরত্বে থাকতে হবে, বুঝলি কিছু?

ধুর, বকবক, বকবক প্যাচাল...

অসহ্য!

নীলিয়ার চোখ এইবার প্রস্ফুটিত যেন চোখের ওপর কোনো তো পাপড়ি ছিল না!

কিন্তু চারপাশটা মুহূর্ত চক্করে দেখে সব বাতি জ্বলছে,

বাপ্পি বাপ্পি? শুনেছি ন্যুইয়র্কের সাইরেন শব্দে মানুষ ঘুমাতে পারে না!

মম...তা...!

না, আগে তুমি বলো, কজন মারা গেছে? শুনেছি সে আন্তর্জাতিক খুনি! নারী, না, পুরুষ কেউ জানে না, দুম করে প্রথমে একটা খুন পরই আরও দশ খুন!

তুমি বাপ্পি তুমি ভালো আছো তো! খালামনি ছোট ফুপি!

কী হয়েছে মা?

ফের সেই অবিনাশী ফিসফিস, কে যে বলে নীলিয়াকে মাথামুণ্ড কিছুই বোঝে না বাপ্পি... বাপ্পিগো... জানিস, হ্যাঁ সে এরপর এক এক করে অন্য ভাইবোন, কেউ জ্বরের ঘোরে বেহুঁশ কেউ খালি চিৎকার করে কাশছে!!

এরপর! নীলিয়া কানে দ্রুত ওয়াকফোন লাগায়... সব ভ্রম!

এসিতেও গরম কমে না নীলিয়ার আচমকা এসি’র রিমোটের টুটি বন্ধ করে, ওরে বাপরে কী শীত!

আমেরিকার পুলিশ কত সংঘাতিক, তার চোখ ফাঁকি দিয়ে! আগরুম বাগরুম স...ব|

সেইটাই তো, তুই মোবাইল ওপেন করে, প্রথমেই আজকের নিউজ বের কর, তারপর মন দিয়ে পড়, পৃথিবী কোন দিকে,


ˆকশোরের নেকড়েটি ওর হাতের ওপর মুখ রাখে| এবং ক্রমাগত পাক খেতে থাকে| বিকারগ্রস্ত মানুষের মতো স্কার্ট ধরে টানতে টানতে ল্যাম্পপোস্টের উদাসীন মশাদের রাজত্বে নিয়ে ফেলে| একটু আশ্বস্ত হয়ে সে পুনরায় অন্ধ মানুষের মতো নিজের শরীরটাকে শূন্যে ছেড়ে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো জ্যোৎস্না বিবরের স্রোতের দিকে ছুটতে থাকে| 

নীলিয়া নিজে এখন কোথায়? আর অন্যরা কোথায়...?

ধীরে ধীরে পাপড়ির ভাঁজ ভাঙে... অনলাইন আঙুল সর্বশেষ নিউজের হেডলাইন... আন্তর্জাতিক খুনি আচমকা খুন করে মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়...

এখন তখন বাপ্পির ব্যবসায়ও লাটে উঠছে, বড় গার্মেন্টসের ব্যবসা তাঁর| অনেক সৎ উচ্চবিত্ত বাপ্পির কন্যা নীলিয়া!

রাস্তায় বসার অবস্থা!

ধুর! যেন কেউ ভেন্টিলেটরের ফাঁক ধরে ডাকতে থাকে, নীলিয়া... স...ব সবুজ গাছ কাটছে মানুষ! তোমার না সবুজ রং পছন্দ? একটু কাছে আসো... আমি অনেক সবুজ গাছপালা এনেছি| নীলিয়া ভোঁ ছুটে নেমে আসে, ক-বে গ্রামে গিয়েছিল যেন? মাধব শিউলী ফুলের কোমর ঝাঁকাচ্ছিল, নীলিয়ার সারা দেগে গুচ্ছ গুচ্ছ শাখা, মিষ্টি হলুদ ভেতরে| ইস! কী মধুর ঘ্রাণ গো!

নী...লি...য়া... আত্মা...!!

কী বলছিস, আত্মা! ভুতুড়ে নাটক নাকি? হাসতে থাকে নীলিয়া|

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা, যাদের সব পুঁজি বিভিন্ন ব্যবসায় খাটিয়ে, ব্যাংকে কোনো সঞ্চয় রাখত না... এমনও অনেকেই আছে, যারা যারা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন, এখন বাড়িওয়ালা কী বুঝে যেন দু’মাস অপেক্ষা করে দরজায় নক করছে, আমার বউ সারা রাত ঘুমায়নি, তার আপন বড়ভাই আচমকা মাঝরাতে ছুরি বিদ্ধ হয়েছে!

গার্মেন্টসকর্মীরাই কাজের লোকের অসম্মানে দিনরাত প্রায় বিশ্রামহীন, একটু সম্মানে শান্তিতে ঘুমানোর ইচ্ছায় সারাগ্রাম উধাও প্রায়, মানে যারা, বাড়িতে কাজ করত তারা অনেক দিন ধরেই গার্মেন্টসের চাকরিতে যোগ দিয়েছে| ভূতুদ্দম এইবার সৌরজগতের কাছে| এদেশকে পৃথিবী তলাহীন ঝুড়ি বানাচ্ছে!

এখন! আর কী, মূল বড় শিল্পপতির বাড়িওয়ালা নক করছে!

বাপ্পি... বাপ্পি...

আচমকা হুড়মুড় ভূত!

এ অসুখ অনেকটা ছোঁয়াচের মতোই... তাই বেশিরভাগ ধনী দেশের ও সরকার, ঘর থেকে না বের হতে লকডাউন এমনকি কার্ফ্যুও ক-ত দিল? জানে না, সরকারও জানে না|

চিতাভস্ম! শামিন, ও শারমিন, তুই নাকি খুন! এ্যাই বলতো, খুন কী!

ইন্দ্রিয় বেদনা... তেজি ঘূর্ণিতে, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, গরিব দেশে বিশেষ করে ছিন্নমূলরা কতদিন কীভাবে? জাস্ট একবার কল্পনায় তাদের দশা দেখতে পারছিস কিনা, দেখ!

আমি না শীতে কাঁপতে কাঁপতে মরেই যাব,

আমার এক্ষুনি একটা লম্বা ঘুমে ডুবে যেতে হবেই—

ধীরে ধীরে এদেশের বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার শোনে ও বুড়িগঙ্গা তুমি এদেশের সমুদ্র তুমি... কান্না শুনেও বুড়ি... গঙ্গা তুমি... ও সমুদ্র তুমি বইছো কেন? 

নীলিয়ার কানের সীসা ভেঙে ফের ফিসফিস ভূপেনের গানে কান পেতে পেতে বালিশে হেলান দিয়ে দুর্মর ঘুমের সশব্দ আর্তনাদ চোখের পাপড়ির ভাঁজে যেন ঘণ্টির ক্যাঁচ ক্যাঁচ ভারি হয়ে যায়|

নীলিয়া ঘুমিয়ে পড়ে|

বহু বছর এ বাড়ি থাকা দুধ মা মমতাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ছিটকে দিয়েছে সেই কখন! তার আগে খবরের হেডলাইন ‘ভূতুদ্দম’| এ এলাকার দুইজনকে খুন করেছে? মমতা মা তোমাকে কতবার পইপই করে বলেছি, তুমি আমাকে না জানিয়ে বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলবে না| যারা আমাদের মতো পাঁচ-দশটা বিশ্বস্ত কাজের মানুষ ঝেঁটিয়ে বিদায় করছে! আমার বান্ধবী সোনিয়াকে তুমি চিন না? খালি সোনিয়া না ও আমাকে জানাল, এখন সোনিয়া নিজে একা রান্না করে, একা বাড়ির সব কাজ করে, আমাদের মতো আরও যারা আছে তারাও এরকম করছে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না, তুমি জানো না এই রোগটা ছোঁয়াচে? তাহলে আমাকে না জানিয়ে বাইরে গেলে কেন? জানো আমি টিভির স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখেছি সেই ভূতুদ্দম এর চেহারা... নীলিয়ার তাজ্জব ধমকে মমতা থতমত খায়| ফের নীলিয়া চিৎকার করে, ভূতুদ্দম নারী না পুরুষ তুমি জানো না কেউ জানে না? ভূতুদ্দম-এর চেহারা ঠিক তোমার চেহারার মতো, তুমি এখনই বেরিয়ে যাও, নইলে আমি তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিব| মমতা মা আচমকা বসে পড়ে!

নীলিয়া তাকে টেনেহিঁচড়ে সত্যি সত্যি এবার দরজার বাইরে ছিটকে বের করে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ করে দেয়| এরপর ফের অধঃপাতে ডুবে যেতে থাকে| কিন্তু তার বিড়বিড় করে বুয়ার কানে উচ্চকিত শব্দে পৌঁছে যায়...| আমার প্রিয় বন্ধু শারমিন মারা গেছে, তার পরিবারের আর যা ভাইবোন, কে কেমন আছে বুকের ধড়ফড়ানিতে একবিন্দু শুনতে চাই নি! সাবধান করে দিচ্ছি, তুমি যদি আমার আত্মীয়দের কাছে একটুও আমার সম্পর্কে যদি কিছু বলো আমি তোমাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব| নীলিয়া কাঁপতে কাঁপতে একটু বসে লম্বা একটা শ্বাস নিতে চায়...

অতঃপর অন্ধকার তরঙ্গ বেয়ে নিঃশব্দে আন্তর্জাতিক খুনি পৃথিবীর সব সরকারের মাথায় যেন গণ্ডগোল ঢোকাতে চায়...


রাশিয়ায় না কোথায় জানি না বিজ্ঞানীরা কী এক টিকা আবিষ্কার করেছে সেটা অনেক পরীক্ষায় পজেটিভ ফল পেয়েছে, ফের খবরের হেডলাইন যেনবা, এদেশের হাজার, লক্ষ কেউ সারা দিন উপোস, অনেকেই চাকরিহীন! বেকারদের মাথায় বজ্রপাত পড়েছে, এদেশের সরকার, কিছু বিবেকবান স্টুডেন্ট, কারও সামান্য বেতনের চাকরি, তারা যূথবদ্ধ হয়ে ওদের জন্য কিছু করা যায় কিনা একটা পজেটিভ নম্বর দিয়েছে সে নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে যার যা আছে সাহায্য করতে পারে| ওরা যা পাচ্ছে, সরকার যা দিচ্ছে প্রায় সব, যতটুকুই যা এক করতে করতে ওদের জন্য ত্রাণ পাঠাতে থাকছে কিন্তু এদেশের মন্ত্রী, আমলা, বুর্জুয়ারা আর যাঁরা হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখছে কিন্তু নিজেরা তো দিচ্ছেই না বরং সে রক্ত চুষিরা গরিবের ত্রাণ লুটে খাচ্ছে| এমনকি এদেশের প্রতিষ্ঠিত, একটা দুইটা ওষুধ কোম্পানি সে টিকা তারা পেয়েছে এমন আশ্বাস দিয়ে চড়া মূল্যে সেসব ওষুধ বিক্রি করছে...|

নীলিয়া দুহাতে কান ঢেকে চিৎকার করে না... না... না... আমার বাপ্পি কিছুতেই তেমন না| একজীবনে তিনি ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রপতির মতো কুলি ছিলেন| তিনি অনেক সৎ...

এইবার যেন কানের ভেতরে সবুজ বাতাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনি ফিসফিস জানাতে থাকে তোমার বাপ্পি তেমন কে বলেছে? সব্বাই তাকে ভালো জানে! তুমি কেন মমতা মাকে এত অবিশ্বাস করলে? বেচারি কোথায়... হাঁপাচ্ছে, নাকি মরে গেছে একবারও খোঁজ নিলে না, নীলিয়া বিড়বিড় করতে থাকে, আসলে না ভূতুদ্দম আমাদের ভেন্টিলেটারে ওঁৎ পেতে দাঁড়িয়ে আছে| আমাকে খুন করে চলে যাওয়ার জন্য এরপর আমি কীভাবে ঝুঁকি নিই?

এইভাবেই কখনো চিতাবাঘ কুচকুচে গোখরো অথবা অজগর, নীলিয়ার টুঁটি যেন সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দেয়...

হাঁপাতে হাঁপাতে কীভাবে কোথায় ছিটকে পড়ে আচমকা বিশ্রামে নিজের মেঝেকে উজ্জ্বলিত গুহার পলিমাটি মনে হয়, কানামাছি ভোঁ ভোঁ... অবিরল হাড়ের ধারা, ধুমল ঝরা পত্রপল্লব|  

ক্ষুধার্ত মানুষের কোরাস চিৎকার তার কানে স্রোতের মতো ধেয়ে আসতে থাকে! কান চেপে ফের বসে পড়ে সে| 

সে যেন এক ছুটে শারমিনের দরজায় সজোরে ধাক্কায়— শারমিন, আমাকে বাঁচা!

তুই নাকি খুন হয়েছিস? পাগল হয়ে গেছে সবাই| 

ছুটতে ছটতে নীলিয়া দরজা খুলেই দেখে— যেনবা ভূতুদ্দম অন্য কোনো রাক্ষুসী রূপ ধরে দরজায় দাঁড়ানো... কোত্থেকে কীভাবে তলোয়ার এনে নীলিয়া মেঝেতে চেপে, বুকে বসিয়ে দেয়, তলোয়ার ফলা তীব্র বেগে রক্ত স্রোতে মেঝে ভাসতে থাকে— এরপর সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দেখে| সম্মুখে পুলিশ!!

যখন তার হাতে বেড়ি পরে, ততক্ষণে নীলিয়া কীভাবে যেন নেতিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,


সবশেষে দুঃ¯^প্নের অবসান| নীলিয়া দরজা খুলে বাপ্পিকে জড়িয়ে ধরে, আমি খুন করি নি বাপ্পি আমাকে না ভূতুদ্দম!

জানি মা মণি, ও তো কবেই মারা গেছে| 

তুমিই তো বলেছ|

ওটা তোমার মর্মভেদী দুঃস্বপ্ন ছিল|

এই তো দেখো| আমি তোমাকে কীভাবে বুকে আগলে জড়িয়ে আছি!

ঘুমোও| মা এইবার একটু শান্তিতে ঘুমাও...|



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত