সংবাদ

মিশরের গোল বাতিল কেন


মোহাম্মদ নেসার
মোহাম্মদ নেসার ডিজিটাল গ্রোথ এডিটর
প্রকাশ: ৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

মিশরের গোল বাতিল কেন

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর মঞ্চে গতকাল মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার পরাশক্তি মিশর। ম্যাচের প্রতিটি মিনিট ছিল রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ঠাসা। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল খেলার ৫৮তম মিনিট। মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো যখন আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে উদযাপনে মেতে উঠলেন, তখন স্টেডিয়ামের এক প্রান্ত উল্লাসে ফেটে পড়ল, আর অন্য প্রান্তে নেমে এলো স্তব্ধতা। কিন্তু সেই উল্লাস স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক মিনিট। আধুনিক ফুটবলের প্রযুক্তি ‘ভিএআর’ (VAR)-এর নাটকীয় হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে গেল মিশরের সেই গোল।

ম্যাচের সেই রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাকর মুহূর্ত

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পেয়ে ল্যাটিন ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান মিশরের তারকা মোস্তফা জিকো। আর্জেন্টিনার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে মিশরের খেলোয়াড়রা যখন আনন্দ উদযাপনে মত্ত, ঠিক তখনই গ্যালারিতে শুরু হয় নতুন এক সাস্পেন্স। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মাঠের প্রধান রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে ঘিরে ধরে আক্রমণের শুরুতে একটি ফাউলের জোরালো দাবি জানাতে থাকেন। রেফারির কানে তখন বাজছিল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সতর্কবার্তা। পুরো স্টেডিয়াম তখন পিনপতন নীরবতায় অপেক্ষমাণ, কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী সিদ্ধান্ত?

অন-ফিল্ড রিভিউ এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির নাটকীয়তা

মাঠের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে খেলা থামিয়ে মাঠের পাশে থাকা ভিএআর (VAR) মনিটরের দিকে এগিয়ে যান। রিপ্লেতে দেখা যায়, গোলটি হওয়ার ঠিক ১৮ সেকেন্ড আগে মাঝমাঠের কিছুটা সামনে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের বাইরে একটি ঘটনা ঘটেছিল। মিশরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আত্তিয়া বল কেড়ে নেওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের ওপর বিপজ্জনকভাবে বুট দিয়ে চেপ দিয়ে বসেন। আত্তিয়ার এই ট্যাকলের আঘাতে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ যন্ত্রণায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন এবং সেই সুযোগেই মিশর বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে গোলটি করেছিল

ফিফা আইনের আলোকে গোল বাতিলের যৌক্তিকতা

ভিডিও রিপ্লেতে স্পষ্ট ফাউল দেখার পর রেফারি মাঠের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল করে মিশরের গোলটি নাকচ করে দেন। আবেগ কিংবা উত্তেজনাকে পাশে সরিয়ে রেখে ফিফার ‘লজ অব দ্য গেম’ (Laws of the Game)-এর নিখুঁত প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে এখানে। ফুটবলীয় নিয়মের যে যৌক্তিকতার ভিত্তিতে এই গোলটি বাতিল করা হয়েছে তা উল্যেখ করা হলো:

  • এপিপি (Attacking Possession Phase) নিয়ম: ফিফার আধুনিক ফুটবল নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল যখন আক্রমণ শুরু করে (যাকে Attacking Possession Phase বা APP বলা হয়), সেই আক্রমণের একদম শুরুর ধাপে যদি আক্রমণকারী দল কোনো ফাউল, হ্যান্ডবল বা নিয়মবহির্ভূত কাজ করে বলের দখল নেয়, তবে সেই আক্রমণের শেষ পরিণতিতে হওয়া গোলটি কখনোই বৈধ হবে না
  • ফাউলের প্রত্যক্ষ প্রভাব: মারওয়ান আত্তিয়া যদি লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল না করতেন, তবে আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতো না এবং মিশরের পক্ষে ওই কাউন্টার অ্যাটাকটি করা সম্ভব হতো না। অর্থাৎ, গোলের মূল উৎসটিই ছিল একটি ফাউল
  • রেফারির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: রেফারি অন-ফিল্ড রিভিউ (OFR) এর মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, ফাউলটি ছিল স্পষ্ট এবং এটি সরাসরি গোলের বিল্ড-আপে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিল করে আর্জেন্টিনার পক্ষে ফ্রি-কিকের নির্দেশ দেওয়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক

ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক

গোল বাতিলের এই সিদ্ধান্ত মাঠের উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মিশরের ডাগআউট এবং সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, ফুটবলের নিয়ম ও রেফারেন্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রেফারির সিদ্ধান্তটি ছিল শতভাগ সঠিক। এটি বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের আরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে রইল।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬


মিশরের গোল বাতিল কেন

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শেষ ষোলোর মঞ্চে গতকাল মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার পরাশক্তি মিশর। ম্যাচের প্রতিটি মিনিট ছিল রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় ঠাসা। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিয়েছিল খেলার ৫৮তম মিনিট। মিশরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো যখন আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে উদযাপনে মেতে উঠলেন, তখন স্টেডিয়ামের এক প্রান্ত উল্লাসে ফেটে পড়ল, আর অন্য প্রান্তে নেমে এলো স্তব্ধতা। কিন্তু সেই উল্লাস স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক মিনিট। আধুনিক ফুটবলের প্রযুক্তি ‘ভিএআর’ (VAR)-এর নাটকীয় হস্তক্ষেপে বাতিল হয়ে গেল মিশরের সেই গোল।

ম্যাচের সেই রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাকর মুহূর্ত

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বল পেয়ে ল্যাটিন ডিফেন্সকে বোকা বানিয়ে বল জালে জড়ান মিশরের তারকা মোস্তফা জিকো। আর্জেন্টিনার বাজপাখি খ্যাত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে মিশরের খেলোয়াড়রা যখন আনন্দ উদযাপনে মত্ত, ঠিক তখনই গ্যালারিতে শুরু হয় নতুন এক সাস্পেন্স। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মাঠের প্রধান রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েকে ঘিরে ধরে আক্রমণের শুরুতে একটি ফাউলের জোরালো দাবি জানাতে থাকেন। রেফারির কানে তখন বাজছিল ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (VAR) সতর্কবার্তা। পুরো স্টেডিয়াম তখন পিনপতন নীরবতায় অপেক্ষমাণ, কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী সিদ্ধান্ত?

অন-ফিল্ড রিভিউ এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির নাটকীয়তা

মাঠের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে খেলা থামিয়ে মাঠের পাশে থাকা ভিএআর (VAR) মনিটরের দিকে এগিয়ে যান। রিপ্লেতে দেখা যায়, গোলটি হওয়ার ঠিক ১৮ সেকেন্ড আগে মাঝমাঠের কিছুটা সামনে আর্জেন্টিনার ডি-বক্সের বাইরে একটি ঘটনা ঘটেছিল। মিশরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আত্তিয়া বল কেড়ে নেওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের ওপর বিপজ্জনকভাবে বুট দিয়ে চেপ দিয়ে বসেন। আত্তিয়ার এই ট্যাকলের আঘাতে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ যন্ত্রণায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন এবং সেই সুযোগেই মিশর বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদ্যুৎগতির কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে গোলটি করেছিল

ফিফা আইনের আলোকে গোল বাতিলের যৌক্তিকতা

ভিডিও রিপ্লেতে স্পষ্ট ফাউল দেখার পর রেফারি মাঠের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল করে মিশরের গোলটি নাকচ করে দেন। আবেগ কিংবা উত্তেজনাকে পাশে সরিয়ে রেখে ফিফার ‘লজ অব দ্য গেম’ (Laws of the Game)-এর নিখুঁত প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে এখানে। ফুটবলীয় নিয়মের যে যৌক্তিকতার ভিত্তিতে এই গোলটি বাতিল করা হয়েছে তা উল্যেখ করা হলো:

  • এপিপি (Attacking Possession Phase) নিয়ম: ফিফার আধুনিক ফুটবল নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল যখন আক্রমণ শুরু করে (যাকে Attacking Possession Phase বা APP বলা হয়), সেই আক্রমণের একদম শুরুর ধাপে যদি আক্রমণকারী দল কোনো ফাউল, হ্যান্ডবল বা নিয়মবহির্ভূত কাজ করে বলের দখল নেয়, তবে সেই আক্রমণের শেষ পরিণতিতে হওয়া গোলটি কখনোই বৈধ হবে না
  • ফাউলের প্রত্যক্ষ প্রভাব: মারওয়ান আত্তিয়া যদি লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল না করতেন, তবে আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতো না এবং মিশরের পক্ষে ওই কাউন্টার অ্যাটাকটি করা সম্ভব হতো না। অর্থাৎ, গোলের মূল উৎসটিই ছিল একটি ফাউল
  • রেফারির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: রেফারি অন-ফিল্ড রিভিউ (OFR) এর মাধ্যমে নিশ্চিত হন যে, ফাউলটি ছিল স্পষ্ট এবং এটি সরাসরি গোলের বিল্ড-আপে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিল করে আর্জেন্টিনার পক্ষে ফ্রি-কিকের নির্দেশ দেওয়া সম্পূর্ণ যৌক্তিক

ম্যাচ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক

গোল বাতিলের এই সিদ্ধান্ত মাঠের উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মিশরের ডাগআউট এবং সমর্থকরা এই সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, ফুটবলের নিয়ম ও রেফারেন্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রেফারির সিদ্ধান্তটি ছিল শতভাগ সঠিক। এটি বিশ্বমঞ্চে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের আরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে রইল।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত