সংবাদ

শাহপরীর দ্বীপে আতঙ্ক, ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম

শাহপরীর দ্বীপে আতঙ্ক, ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য

সীমান্তের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা এক চিলতে ভূখণ্ড শাহপরীর দ্বীপ। যেখানে বঙ্গোপসাগর আর নাফ নদীর জলরাশি একাকার হয়ে মিলেছে, সেখানেই বাস করেন হাজার পঞ্চাশেক মানুষ। সাগরের নোনা জলে জাল ফেলে যাদের জীবন চলে, সেই জেলেপল্লীর চোখে এখন আর ঘুম নেই। শীতের শান্ত নদী আর সাগরের বুক চিরে এখন আর শুধু রূপালি ইলিশ উঠছে না, ভেসে আসছে একের পর এক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের লাশ।

গত এক সপ্তাহে টেকনাফ উপকূল ও নাফ নদী দিয়ে ভেসে এসেছে পাঁচটি মরদেহ। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর মিছিল শাহপরীর দ্বীপের শান্ত জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছে এক গভীর আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা।

কঙ্কাল আর বিকৃত মরদেহ, আতঙ্কে দ্বীপবাসী

জেলেদের চিরচেনা নাফ নদীর জল এখন এক ভীতিকর নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। সর্বশেষ গত রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট সংলগ্ন বিজিবি বিওপির সামনে নদীর তীরে আরও এক যুবকের মরদেহ ভেসে আসে। পানির টানে ভেসে আসা আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ওই যুবকের পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের হাফ প্যান্ট ও হালকা সবুজ রঙের জার্সি। মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফ থাকা সেই যুবকের শরীর অনেকদিন পানিতে থাকায় বিকৃত হয়ে গেছে। শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সনজীব এ বিষয়ে মুঠোফোনে বলেন, “গত এক সপ্তাহে পরপর ৪টি লাশ ভেসে আসছে।

গতকাল আরও ১টি লাশ ভেসে আসছে। মরদেহের মধ্যে ২ জন মহিলা ও ১ জন পুরুষ ও একটি কঙ্কাল রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় মরদেহটির চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। একটি কঙ্কালও রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।” ভেসে আসা এই লাশগুলো রোহিঙ্গা নাকি বাংলাদেশি; সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “ভেসে আসা সব লাশ দেখতে একই রকম। এরপরও তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। সেখানে আলামত সংগ্রহ করা হবে। গত এক বছর ধরে শাহপরীর দ্বীপে দায়িত্ব পালন করছি। এই সময় ভেসে আসা প্রায় ৮টি লাশ উদ্ধার করেছি।”

সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণ নাকি মানবপাচারের ট্রলারডুবি?

উপকূলে একের পর এক লাশ ভেসে আসার পেছনে দুটি জোরালো সন্দেহের দানা বাঁধছে স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনে। প্রথমত, সম্প্রতি নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের মন্ডু এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির বিকট শব্দ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওপারকার সংঘাতের শিকার হওয়া কোনো হতভাগাদের লাশ এগুলো হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শীতের এই মৌসুমে গভীর রাতে একদল মানুষ সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে বসে। উত্তাল সাগরে মানবপাচারকারীদের সেই ট্রলারডুবির কারণেও এই সলিল সমাধি হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। আবার এই নাফ নদী ব্যবহার করে রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্র মাদকের চালান নিয়ে আসে, তার সঙ্গেও কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পরিচয়হীন নিথর দেহ আর পুলিশের অন্তহীন খোঁজ

বৈরী আবহাওয়া আর উত্তাল জোয়ারের টানে ভেসে আসা এই মানুষগুলোর শেষ পরিণতি কেবলই মর্গের শীতল কক্ষ। স্বজনদের কাছে তারা নিখোঁজ, আর এই দ্বীপে তারা স্রেফ একেকটি অজ্ঞাত লাশ।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুঠোফোনে পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে বলেন, “গতকাল পর্যন্ত ৫টি লাশ উপকূলে ভেসে আসছে। প্রায় এই ভাবে লাশ উপকূল থেকে নাফ নদী ও শাহপরীর দ্বীপে ভেসে আসে। লাশের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ অভিযোগও করছে না। এরপরও পুলিশ খোঁজ খবর নিচ্ছেন। পরিচয়হীন এই লাশগুলোর নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন এবং এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখন উপকূল জুড়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে প্রশাসন।“

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬


শাহপরীর দ্বীপে আতঙ্ক, ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

সীমান্তের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা এক চিলতে ভূখণ্ড শাহপরীর দ্বীপ। যেখানে বঙ্গোপসাগর আর নাফ নদীর জলরাশি একাকার হয়ে মিলেছে, সেখানেই বাস করেন হাজার পঞ্চাশেক মানুষ। সাগরের নোনা জলে জাল ফেলে যাদের জীবন চলে, সেই জেলেপল্লীর চোখে এখন আর ঘুম নেই। শীতের শান্ত নদী আর সাগরের বুক চিরে এখন আর শুধু রূপালি ইলিশ উঠছে না, ভেসে আসছে একের পর এক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের লাশ।

গত এক সপ্তাহে টেকনাফ উপকূল ও নাফ নদী দিয়ে ভেসে এসেছে পাঁচটি মরদেহ। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর মিছিল শাহপরীর দ্বীপের শান্ত জনপদে ছড়িয়ে দিয়েছে এক গভীর আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা।

কঙ্কাল আর বিকৃত মরদেহ, আতঙ্কে দ্বীপবাসী

জেলেদের চিরচেনা নাফ নদীর জল এখন এক ভীতিকর নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। সর্বশেষ গত রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাট সংলগ্ন বিজিবি বিওপির সামনে নদীর তীরে আরও এক যুবকের মরদেহ ভেসে আসে। পানির টানে ভেসে আসা আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ওই যুবকের পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের হাফ প্যান্ট ও হালকা সবুজ রঙের জার্সি। মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফ থাকা সেই যুবকের শরীর অনেকদিন পানিতে থাকায় বিকৃত হয়ে গেছে। শাহপরীর দ্বীপ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সনজীব এ বিষয়ে মুঠোফোনে বলেন, “গত এক সপ্তাহে পরপর ৪টি লাশ ভেসে আসছে।

গতকাল আরও ১টি লাশ ভেসে আসছে। মরদেহের মধ্যে ২ জন মহিলা ও ১ জন পুরুষ ও একটি কঙ্কাল রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় মরদেহটির চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। একটি কঙ্কালও রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।” ভেসে আসা এই লাশগুলো রোহিঙ্গা নাকি বাংলাদেশি; সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “ভেসে আসা সব লাশ দেখতে একই রকম। এরপরও তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। সেখানে আলামত সংগ্রহ করা হবে। গত এক বছর ধরে শাহপরীর দ্বীপে দায়িত্ব পালন করছি। এই সময় ভেসে আসা প্রায় ৮টি লাশ উদ্ধার করেছি।”

সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণ নাকি মানবপাচারের ট্রলারডুবি?

উপকূলে একের পর এক লাশ ভেসে আসার পেছনে দুটি জোরালো সন্দেহের দানা বাঁধছে স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনে। প্রথমত, সম্প্রতি নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের মন্ডু এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির বিকট শব্দ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওপারকার সংঘাতের শিকার হওয়া কোনো হতভাগাদের লাশ এগুলো হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শীতের এই মৌসুমে গভীর রাতে একদল মানুষ সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে বসে। উত্তাল সাগরে মানবপাচারকারীদের সেই ট্রলারডুবির কারণেও এই সলিল সমাধি হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। আবার এই নাফ নদী ব্যবহার করে রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্র মাদকের চালান নিয়ে আসে, তার সঙ্গেও কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পরিচয়হীন নিথর দেহ আর পুলিশের অন্তহীন খোঁজ

বৈরী আবহাওয়া আর উত্তাল জোয়ারের টানে ভেসে আসা এই মানুষগুলোর শেষ পরিণতি কেবলই মর্গের শীতল কক্ষ। স্বজনদের কাছে তারা নিখোঁজ, আর এই দ্বীপে তারা স্রেফ একেকটি অজ্ঞাত লাশ।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুঠোফোনে পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে বলেন, “গতকাল পর্যন্ত ৫টি লাশ উপকূলে ভেসে আসছে। প্রায় এই ভাবে লাশ উপকূল থেকে নাফ নদী ও শাহপরীর দ্বীপে ভেসে আসে। লাশের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ অভিযোগও করছে না। এরপরও পুলিশ খোঁজ খবর নিচ্ছেন। পরিচয়হীন এই লাশগুলোর নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন এবং এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে এখন উপকূল জুড়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে প্রশাসন।“


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত