সংবাদ

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: কী পেলেন, কী হারালেন!


শায়লা শবনম
শায়লা শবনম
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: কী পেলেন, কী হারালেন!
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের গুঞ্জন, বঙ্গভবনের নীরবতা, সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান, স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটি কেবল তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত কী পেলেন, আর কী হারালেন?

বিতর্কের মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ

২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক, সাবেক জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় ধারণা করা হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোর একটির মুখোমুখি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন সব সিদ্ধান্তের অংশ হতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক শেষ হয়নি।

বড় অর্জন—সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থকেরা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভাকে তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

বড় ক্ষতি—বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

তবে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। একজন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন অসামঞ্জস্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্রীয় নথি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই একটি ঘটনাই তার পুরো মেয়াদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

নিজের ইচ্ছায় নাকি পরিস্থিতির চাপে?

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরে দেশীয় গণমাধ্যমকেও বলেছিলেন, 'আমার ভালো লাগে না।'

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঙ্গভবনের কার্যক্রম সীমিত হওয়া, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অনুভূতির কথাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এবার পদত্যাগের গুঞ্জনের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণকে সামনে আনা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সম্মানজনক প্রস্থান?

স্বাস্থ্যও একটি বাস্তবতা

রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে গিয়ে এনজিওগ্রামের সময় আবারও একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়ে এবং স্টেন্ট বসাতে হয়। 

বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই ব্যক্তিগত আলোচনায় শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথাও বলেছেন। অতএব, যদি তিনি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তবে স্বাস্থ্যগত কারণকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগও নেই।

গুঞ্জন, নীরবতা ও রাজনৈতিক বার্তা

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সরকারিভাবে সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ জানানো হয়নি, তবু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয় এবং পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। 

একই সময়ে সরকারের মন্ত্রীদের সংযত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের মন্তব্য, ‘আপনার মতো আমিও খবরটি দেখছি। পুরো পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি গণমাধ্যমকে পাঠানো বার্তায় তার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি ফোনালাপের খবরকে “কল্পনার বাইরে” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ গুঞ্জনের সব উপাদানই এখনো নিশ্চিত তথ্য নয়।’

রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটিকে প্রধান নিয়ামক করে তুলেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির পুনর্গঠনেরও সূচনা হবে।

ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?

একজন রাষ্ট্রপতির সাফল্য শুধু তিনি কতগুলো ফাইলে সই করেছেন, কতজন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন কিংবা কতটি বিদেশ সফর করেছেন— এসব দিয়ে মূল্যায়িত হয় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে তার ভূমিকার মাধ্যমে।

মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন বাংলাদেশ ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন— এটি তার পক্ষে যাবে। আবার তার কিছু বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং নীরবতা বিতর্ক তৈরি করেছে—এটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করুন বা মেয়াদ পূর্ণ করুন- তার রাষ্ট্রপতিত্বের মূল্যায়ন এখনই শুরু হয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের দীর্ঘ ছায়া। সম্ভবত এ কারণেই তার রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হতে পারে- তিনি পদ পেয়েছিলেন অনেক, কিন্তু সেই পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার উত্তর নির্ভর করবে কেবল তার বিদায়ের ওপর নয়; বরং সংকটের সময় রাষ্ট্র, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে বিচার করে, তার ওপর।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬


রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: কী পেলেন, কী হারালেন!

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদত্যাগের গুঞ্জন, বঙ্গভবনের নীরবতা, সরকারের অস্পষ্ট অবস্থান, স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরা এবং রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত অবস্থা- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অপেক্ষার আবহ তৈরি হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটি কেবল তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত কী পেলেন, আর কী হারালেন?

বিতর্কের মাঝেই দায়িত্ব গ্রহণ

২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনীতিক, সাবেক জেলা জজ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় ধারণা করা হয়েছিল, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে এগিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল সময়গুলোর একটির মুখোমুখি হন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাকে এমন সব সিদ্ধান্তের অংশ হতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে এখনো রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক শেষ হয়নি।

বড় অর্জন—সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সমর্থকেরা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একদিকে ক্ষমতার পালাবদল, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, পরে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভাকে তিনিই শপথবাক্য পাঠ করান। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তার এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

বড় ক্ষতি—বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

তবে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

কয়েক মাস পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। একজন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এমন অসামঞ্জস্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই তৈরি করেনি; বরং রাষ্ট্রীয় নথি, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই একটি ঘটনাই তার পুরো মেয়াদের মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

নিজের ইচ্ছায় নাকি পরিস্থিতির চাপে?

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরে দেশীয় গণমাধ্যমকেও বলেছিলেন, 'আমার ভালো লাগে না।'

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বঙ্গভবনের কার্যক্রম সীমিত হওয়া, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং রাষ্ট্রপতির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অনুভূতির কথাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। এবার পদত্যাগের গুঞ্জনের পেছনে স্বাস্থ্যগত কারণকে সামনে আনা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের প্রশ্ন— এটি কি শুধুই স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সম্মানজনক প্রস্থান?

স্বাস্থ্যও একটি বাস্তবতা

রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়। চলতি বছর যুক্তরাজ্যে গিয়ে এনজিওগ্রামের সময় আবারও একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়ে এবং স্টেন্ট বসাতে হয়। 

বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রায়ই ব্যক্তিগত আলোচনায় শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন এবং দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছার কথাও বলেছেন। অতএব, যদি তিনি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তবে স্বাস্থ্যগত কারণকে পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগও নেই।

গুঞ্জন, নীরবতা ও রাজনৈতিক বার্তা

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও সরকারিভাবে সফর সংক্ষিপ্ত করার কারণ জানানো হয়নি, তবু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছেই জমা দিতে হয় এবং পদ শূন্য হলে তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। 

একই সময়ে সরকারের মন্ত্রীদের সংযত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিক নীরবতা এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিবের মন্তব্য, ‘আপনার মতো আমিও খবরটি দেখছি। পুরো পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি গণমাধ্যমকে পাঠানো বার্তায় তার বিরুদ্ধে প্রচারিত একটি ফোনালাপের খবরকে “কল্পনার বাইরে” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অর্থাৎ গুঞ্জনের সব উপাদানই এখনো নিশ্চিত তথ্য নয়।’

রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটিকে প্রধান নিয়ামক করে তুলেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ফলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির বিদায় নয়; বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির পুনর্গঠনেরও সূচনা হবে।

ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?

একজন রাষ্ট্রপতির সাফল্য শুধু তিনি কতগুলো ফাইলে সই করেছেন, কতজন রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেছেন কিংবা কতটি বিদেশ সফর করেছেন— এসব দিয়ে মূল্যায়িত হয় না। তার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সংকটের মুহূর্তে তার ভূমিকার মাধ্যমে।

মো. সাহাবুদ্দিন এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, যখন বাংলাদেশ ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন— এটি তার পক্ষে যাবে। আবার তার কিছু বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং নীরবতা বিতর্ক তৈরি করেছে—এটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করুন বা মেয়াদ পূর্ণ করুন- তার রাষ্ট্রপতিত্বের মূল্যায়ন এখনই শুরু হয়ে গেছে। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক চাপের দীর্ঘ ছায়া। সম্ভবত এ কারণেই তার রাষ্ট্রপতিত্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হতে পারে- তিনি পদ পেয়েছিলেন অনেক, কিন্তু সেই পদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার পথ ছিল অনেক বেশি কঠিন।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তার উত্তর নির্ভর করবে কেবল তার বিদায়ের ওপর নয়; বরং সংকটের সময় রাষ্ট্র, সংবিধান এবং গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে বিচার করে, তার ওপর।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত