কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনে বিএনপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও অন্য ৬টি বোর্ডের প্রধানদের ৯ জুলাই আহুত বৈঠকে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয় ; কিন্তু তারা অংশগ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদান বা আর্থিক সহায়তার ধার ধারে না। তাই শিক্ষানীতি বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সামান্যতম হস্তক্ষেপও তারা সহ্য করবে না- এ কথা তারা বহুবার বলেছে। দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসৃত নীতিমালার আলোকে তারা মক্তব থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত ১৪টি শ্রেণী চালায়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেফজ বিভাগ। এই অবস্থানই আমাকে আজকের কলামটি লিখতে বাধ্য করেছে।
গত কয়েক মাসেই দেশের কয়েকটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনের যে খবর বেরিয়েছে তা পড়লে গা শিউরে ওঠে। চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক ছাত্রকে চুরির অপবাদে হাত-পা বেঁধে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেটানো হয়। মাথা নিচের দিকে, রক্ত জমে চোখ-মুখ ফুলে যায়, তবুও থামেনি শিক্ষক। গত বছরের শেষ দিকে কুমিল্লার এক কওমি মাদ্রাসায় ‘পড়া না পারার’ অপরাধে আরেক শিশুকে রাতভর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পর সকালে পা বেঁধে সিলিং-এর সাথে ঝুলিয়ে বেত, লাঠি আর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজশাহীর একটি মাদ্রাসায় কুরআন মুখস্থ না পারার অপরাধে শিশুকে শিকল দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল তিন দিন। খাবার দেয়া হয়নি, বাথরুমে যেতে দেয়া হয়নি। সিলেটেও ভাত চুরির অপবাদে এক শিশুর দুই হাত পেছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন অসংখ্য ঘটনা নেট দুনিয়ায় গেলেই নজরে পড়বে।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না। প্রতি বছর শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কাছে যে অভিযোগগুলো জমা হয়, তার বড় অংশই আসে মাদ্রাসা-মক্তব-হেফজখানা থেকে। যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক পিটুনি, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, উপুড় করে লাঠি দিয়ে আঘাত করা এখনও ‘আদব শেখানো’ আর ‘দ্বীনি তালিমের’ নামে চলে আসছে। প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানে নবীর রহমতের কথা শেখানো হয়, নৈতিকতার সবক দেয়া হয়, সেখানেই কেন শিশুর শরীরে পড়ে সবচেয়ে নির্মম আঘাত ? এটা কেমন নৈতিকতা ? কুরআন শিক্ষায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে তারা পাশ্চাত্যের ‘কুরআন শূন্য করার পুরানা কৌশল’ বলে আখ্যা দেয়। ফলে তারা নিজেদের এক ধরনের রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি মনে করে, বিএনপি সরকারকে তা বুঝতে হবে।
অনেকেই তখনই পাল্টা যুক্তি তোলেন ‘শুধু মাদ্রাসা কেন ? স্কুলের শিক্ষকরাও তো পেটায়। মা-বাবাও পেটায়। আপনারা মাদ্রাসা নিয়ে পড়ে আছেন কেন’? যুক্তিটা আংশিক সত্য। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই স্কুলে বেতের বাড়ি খেয়েছি। বাসায় এসে বাবাকে বললে উল্টো আরও দুইটা বেতের বাড়ি জুটত। ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই বাক্য দ্বারা বাবারা গর্ব করে শিক্ষকের হাতে নিজ সন্তানকে তুলে দিতেও দেখেছি। কিন্তু পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। শহরের বেশিরভাগ স্কুলে এখন বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে, অভিভাবকরা সচেতন। কোনো শিক্ষক সীমা ছাড়ালে মামলা হয়, মিডিয়া আসে, শিক্ষক বরখাস্ত হয়। কিন্তু মাদ্রাসা-মক্তবের বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার বাইরে। সেখানে অভিযোগ করলে বলা হয় ‘এটা তালিমের অংশ’, ‘গুনাহ হবে’, ‘হুজুরের বদনাম করো না’। সেখানে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না। তাই স্কুলে দুইটা বেতের বাড়ি আর মাদ্রাসায় শিকল দিয়ে বেঁধে ফ্যানে ঝুলিয়ে পেটানো- দুটোকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সরকারি স্কুল-কলেজ থাকতে মানুষ কেন গরীবের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় ? উত্তরটা খুব সোজা এবং খুব নির্মম। কারণ সরকারি স্কুলে থাকা-খাওয়া নেই, কিন্তু মাদ্রাসায় আছে। গরীব বাবা-মা দুই বেলা পেটের চিন্তায় সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। সেখানে অন্তত ছেলেটা না খেয়ে থাকবে না, থাকার জায়গা পাবে। রাষ্ট্র যখন শিক্ষার পাশাপাশি খাবারের দায়িত্ব নেয় না, তখন মাদ্রাসা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। কিন্তু এই ‘ফ্রি’ থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শিশুকে দিতে হয় তার শরীরের উপর দিয়ে যাওয়া নির্যাতন। এটা দান না, এটা একটা অলিখিত চুক্তি- তোমার পেট ভরাব, বদলে তোমার শরীরের উপর আমাদের অধিকার থাকবে।
আর এই মাদ্রাসাগুলো চলে কার টাকায় ? মানুষের দানে। মানুষ মাদ্রাসায় মুক্তহস্তে টাকা দেয়। কারণ অনেকে মনে করে মাদ্রাসায় দান করলে সওয়াব হয়, বেহেশতের রাস্তা সহজ হয়। ফলে যারা সারাজীবন ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে, দুর্নীতি করে তারাও শেষ বয়সে মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। টাকা দিয়ে তারা পাপ ধোয়, আর মাদ্রাসা সেই টাকায় চলে। স্কুলের জন্য মানুষ এভাবে দান করে না। কারণ স্কুলে ‘সওয়াব’ নেই। ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়, আর বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোতে কোনো তদারকি থাকে না। দেশে এরা এত শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ যে, প্রতিটি সরকার এদের সমীহ করতে বাধ্য হয়। দীনি শিক্ষার নামে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর দৈহিক নির্যাতন হলেও সরকার তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
শেষ কথা একটাই। কওমি কর্তৃপক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধান প্রত্যাখ্যান করছে কি শুধুই ‘দীনি শিক্ষার স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য, নাকি তাদের প্রতিষ্ঠানে চলা শিশু নিপীড়নকে অবাধ রাখার জন্যও? উত্তরটা সময়ই দেবে। নৈতিকতা শুধু কিতাব মুখস্থ করলে আসে না। আসে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন আর শিশুকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে। যে শিক্ষক নিজেই শিশুকে পশুর মতো পেটায়, সে সারাদিন হাদিস পড়ালেও তার ছাত্র শিখবে- ক্ষমতা থাকলে দুর্বলকে পেটানো যায়। ধর্মের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা গেলে, ধর্মই তখন অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, বাড়ি হোক বা মসজিদের মক্তব- যেখানেই শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ পড়বে, সেখানেই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। প্রথম কাজ শিশুর গা থেকে বেত আর শিকল সরিয়ে নেয়া। তারপর বই, ভালোবাসা আর জবাবদিহির ক্লাসরুম। নইলে ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই নিষ্ঠুর প্রবাদ দিয়েই আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। যে জাতি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি কোনো মূল্যবোধ দিয়েই বাঁচতে পারে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনে বিএনপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। এজন্য ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ ও অন্য ৬টি বোর্ডের প্রধানদের ৯ জুলাই আহুত বৈঠকে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয় ; কিন্তু তারা অংশগ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি অনুদান বা আর্থিক সহায়তার ধার ধারে না। তাই শিক্ষানীতি বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সামান্যতম হস্তক্ষেপও তারা সহ্য করবে না- এ কথা তারা বহুবার বলেছে। দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসৃত নীতিমালার আলোকে তারা মক্তব থেকে দাওরা হাদিস পর্যন্ত ১৪টি শ্রেণী চালায়, যার একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হেফজ বিভাগ। এই অবস্থানই আমাকে আজকের কলামটি লিখতে বাধ্য করেছে।
গত কয়েক মাসেই দেশের কয়েকটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী নির্যাতনের যে খবর বেরিয়েছে তা পড়লে গা শিউরে ওঠে। চট্টগ্রামের একটি মাদ্রাসায় ১০ বছরের এক ছাত্রকে চুরির অপবাদে হাত-পা বেঁধে সিলিং ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেটানো হয়। মাথা নিচের দিকে, রক্ত জমে চোখ-মুখ ফুলে যায়, তবুও থামেনি শিক্ষক। গত বছরের শেষ দিকে কুমিল্লার এক কওমি মাদ্রাসায় ‘পড়া না পারার’ অপরাধে আরেক শিশুকে রাতভর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার পর সকালে পা বেঁধে সিলিং-এর সাথে ঝুলিয়ে বেত, লাঠি আর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রাজশাহীর একটি মাদ্রাসায় কুরআন মুখস্থ না পারার অপরাধে শিশুকে শিকল দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল তিন দিন। খাবার দেয়া হয়নি, বাথরুমে যেতে দেয়া হয়নি। সিলেটেও ভাত চুরির অপবাদে এক শিশুর দুই হাত পেছনে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন অসংখ্য ঘটনা নেট দুনিয়ায় গেলেই নজরে পড়বে।
এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন না। প্রতি বছর শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কাছে যে অভিযোগগুলো জমা হয়, তার বড় অংশই আসে মাদ্রাসা-মক্তব-হেফজখানা থেকে। যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিক পিটুনি, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, উপুড় করে লাঠি দিয়ে আঘাত করা এখনও ‘আদব শেখানো’ আর ‘দ্বীনি তালিমের’ নামে চলে আসছে। প্রশ্ন হলো, যে প্রতিষ্ঠানে নবীর রহমতের কথা শেখানো হয়, নৈতিকতার সবক দেয়া হয়, সেখানেই কেন শিশুর শরীরে পড়ে সবচেয়ে নির্মম আঘাত ? এটা কেমন নৈতিকতা ? কুরআন শিক্ষায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে তারা পাশ্চাত্যের ‘কুরআন শূন্য করার পুরানা কৌশল’ বলে আখ্যা দেয়। ফলে তারা নিজেদের এক ধরনের রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি মনে করে, বিএনপি সরকারকে তা বুঝতে হবে।
অনেকেই তখনই পাল্টা যুক্তি তোলেন ‘শুধু মাদ্রাসা কেন ? স্কুলের শিক্ষকরাও তো পেটায়। মা-বাবাও পেটায়। আপনারা মাদ্রাসা নিয়ে পড়ে আছেন কেন’? যুক্তিটা আংশিক সত্য। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই স্কুলে বেতের বাড়ি খেয়েছি। বাসায় এসে বাবাকে বললে উল্টো আরও দুইটা বেতের বাড়ি জুটত। ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই বাক্য দ্বারা বাবারা গর্ব করে শিক্ষকের হাতে নিজ সন্তানকে তুলে দিতেও দেখেছি। কিন্তু পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। শহরের বেশিরভাগ স্কুলে এখন বেত্রাঘাত নিষিদ্ধ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে, অভিভাবকরা সচেতন। কোনো শিক্ষক সীমা ছাড়ালে মামলা হয়, মিডিয়া আসে, শিক্ষক বরখাস্ত হয়। কিন্তু মাদ্রাসা-মক্তবের বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার বাইরে। সেখানে অভিযোগ করলে বলা হয় ‘এটা তালিমের অংশ’, ‘গুনাহ হবে’, ‘হুজুরের বদনাম করো না’। সেখানে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকে না। তাই স্কুলে দুইটা বেতের বাড়ি আর মাদ্রাসায় শিকল দিয়ে বেঁধে ফ্যানে ঝুলিয়ে পেটানো- দুটোকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সরকারি স্কুল-কলেজ থাকতে মানুষ কেন গরীবের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠায় ? উত্তরটা খুব সোজা এবং খুব নির্মম। কারণ সরকারি স্কুলে থাকা-খাওয়া নেই, কিন্তু মাদ্রাসায় আছে। গরীব বাবা-মা দুই বেলা পেটের চিন্তায় সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে দেন। সেখানে অন্তত ছেলেটা না খেয়ে থাকবে না, থাকার জায়গা পাবে। রাষ্ট্র যখন শিক্ষার পাশাপাশি খাবারের দায়িত্ব নেয় না, তখন মাদ্রাসা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। কিন্তু এই ‘ফ্রি’ থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে শিশুকে দিতে হয় তার শরীরের উপর দিয়ে যাওয়া নির্যাতন। এটা দান না, এটা একটা অলিখিত চুক্তি- তোমার পেট ভরাব, বদলে তোমার শরীরের উপর আমাদের অধিকার থাকবে।
আর এই মাদ্রাসাগুলো চলে কার টাকায় ? মানুষের দানে। মানুষ মাদ্রাসায় মুক্তহস্তে টাকা দেয়। কারণ অনেকে মনে করে মাদ্রাসায় দান করলে সওয়াব হয়, বেহেশতের রাস্তা সহজ হয়। ফলে যারা সারাজীবন ঘুষ খায়, চাঁদাবাজি করে, দুর্নীতি করে তারাও শেষ বয়সে মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। টাকা দিয়ে তারা পাপ ধোয়, আর মাদ্রাসা সেই টাকায় চলে। স্কুলের জন্য মানুষ এভাবে দান করে না। কারণ স্কুলে ‘সওয়াব’ নেই। ফলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়, আর বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা মাদ্রাসাগুলোতে কোনো তদারকি থাকে না। দেশে এরা এত শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপ যে, প্রতিটি সরকার এদের সমীহ করতে বাধ্য হয়। দীনি শিক্ষার নামে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর দৈহিক নির্যাতন হলেও সরকার তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
শেষ কথা একটাই। কওমি কর্তৃপক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধান প্রত্যাখ্যান করছে কি শুধুই ‘দীনি শিক্ষার স্বাধীনতা’ রক্ষার জন্য, নাকি তাদের প্রতিষ্ঠানে চলা শিশু নিপীড়নকে অবাধ রাখার জন্যও? উত্তরটা সময়ই দেবে। নৈতিকতা শুধু কিতাব মুখস্থ করলে আসে না। আসে জবাবদিহিতা, আইনের শাসন আর শিশুকে মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে। যে শিক্ষক নিজেই শিশুকে পশুর মতো পেটায়, সে সারাদিন হাদিস পড়ালেও তার ছাত্র শিখবে- ক্ষমতা থাকলে দুর্বলকে পেটানো যায়। ধর্মের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা গেলে, ধর্মই তখন অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, বাড়ি হোক বা মসজিদের মক্তব- যেখানেই শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ পড়বে, সেখানেই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। প্রথম কাজ শিশুর গা থেকে বেত আর শিকল সরিয়ে নেয়া। তারপর বই, ভালোবাসা আর জবাবদিহির ক্লাসরুম। নইলে ‘হাড্ডি আমার, মাংস আপনার’- এই নিষ্ঠুর প্রবাদ দিয়েই আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। যে জাতি তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে জাতি কোনো মূল্যবোধ দিয়েই বাঁচতে পারে না।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন