বর্ষার বৃষ্টিতে ঢাকার আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ধুলোমলিন শহরটিকে তখন তুলনামূলকভাবে নির্মল মনে হয়। মুষলধারে বৃষ্টি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ধুয়ে ফেলে, বায়ুমণ্ডলকে শীতল করে।দৃশ্যমান বায়ুদূষণ কমিয়ে আনে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বর্ষাকালে শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু চোখে দেখা এই স্বচ্ছতার আড়ালেও থেকে যেতে পারে এক অদৃশ্য ও ক্ষতিকর দূষক ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার রসায়ন বিভাগ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগটি বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কার্যক্রম গড়ে তুলেছে। নিউক্লিয়ার বিশ্লেষণ পদ্ধতি, অ্যারোসলের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং বিভিন্ন উন্নত বিশ্লেষণধর্মী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বায়ুদূষণের প্রকৃতি ও উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের গবেষণালব্ধ ফলাফল দূষণের প্রধান উৎস শনাক্তকরণ, বাংলাদেশে অ্যারোসলের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।
বর্ষাকালে বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ওয়েট ডিপোজিশন’ বা বৃষ্টিজনিত অপসারণ। বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও অন্যান্য বস্তুকণাকে সঙ্গে নিয়ে ভূমিতে নামিয়ে আনে। ফলে বাতাসে কণার মোট পরিমাণ কমে যায় এবং আকাশ দৃশ্যত পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতি
খনিজ ধূলিকণা সাধারণত বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বন প্রায় সম্পূর্ণভাবে জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন থেকে উৎপন্ন হয়। যানবাহনের ডিজেল ইঞ্জিন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ ও বায়োমাস পোড়ানো, অপরিষ্কার রান্নার চুলা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ব্ল্যাক কার্বনের বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্রমেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের চেয়ে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা অধিক কার্যকর নির্দেশক হতে পারে। কারণ ব্ল্যাক কার্বন দহন থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
ব্ল্যাক কার্বনের অতি সূক্ষ্ম কণা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীর অ্যালভিওলার অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। কিছু কণা বায়ু, রক্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে রক্তসঞ্চালনেও পৌঁছাতে সক্ষম। এর ফলে শরীরে সিস্টেমিক প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আবরণের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়া শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন যানজটপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, গণপরিবহনের চালক ও শ্রমিক, পথচারী, সড়কের পাশের দোকানি, নির্মাণশ্রমিক এবং স্কুলগামী শিশুরা নিয়মিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও দহনজনিত দূষণের সংস্পর্শে আসে।
এ কারণে ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ, যা আরও বেশি বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক ও নীতিগত মনোযোগ দাবি করে।
ব্ল্যাক কার্বন শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি জলবায়ুর ওপরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবস্থান করতে পারে। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল তুলনামূলকভাবে খুবই কম-সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। তবে স্বল্পস্থায়ী হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর আলো শোষণকারী কণা এবং জলবায়ু উষ্ণায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বায়ুমণ্ডলের অধিকাংশ অ্যারোসল সূর্যালোককে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শীতলীকরণ প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের আগত বিকিরণ শোষণ করে তা তাপে রূপান্তরিত করে। এর ফলে পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়, পৃথিবীর বিকিরণ ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা, মেঘের গঠন ও আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ওপর প্রভাব পড়ে।
ব্ল্যাক কার্বন বিভিন্ন পরোক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর কণা মেঘ ঘনীভবন কেন্দ্রক হিসেবে কাজ করতে পারে অথবা বিদ্যমান মেঘকণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বৃষ্টিপাতের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে।
অ্যারোসল ও মেঘের এই মিথস্ক্রিয়া জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও অনিশ্চিত বিষয়। তবে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক কার্বন আঞ্চলিক আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ছাড়া ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা উল্লম্ব তাপমাত্রা বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনাবৃষ্টি ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জাতীয় বায়ুর গুণমান মানদণ্ড ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সাধারণত সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) ভরঘনত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এই বস্তুকণার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এর মোট ভরঘনত্ব পরিমাপ করে নির্ণয় করা যায় না যে, কণাগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ভূত্বকীয় ধূলিকণা থেকে এসেছে, নাকি অধিক বিষাক্ত দহনজনিত উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
একই পরিমাণ সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মধ্যে ধূলিকণা, ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত যৌগের অনুপাত ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট পরিমাণ জানলেই বাতাসের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতি
এ ধরনের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জানা যাবে, বায়ুদূষণের কতটুকু যানবাহন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, বায়োমাস দহন, নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানো কিংবা আঞ্চলিক দূষণ পরিবহন থেকে আসছে। দূষণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে প্রমাণভিত্তিক, লক্ষ্যনির্ভর ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শহরের যেসব এলাকায় যানবাহন ও দহনজনিত দূষণের মাত্রা বেশি, সেসব স্থানে নিয়মিত ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণ চালু করা যেতে পারে। স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা, বাস টার্মিনাল, প্রধান সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলের বাতাসে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা আলাদাভাবে নির্ণয় করা দরকার।
বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আবর্জনা পোড়ানো, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধোঁয়া সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তাই বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনাকে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভর পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দূষণের প্রকৃত ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।
ব্ল্যাক কার্বন কমানো গেলে একই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, নগরের বাতাস পরিচ্ছন্ন হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ কারণেই বাংলাদেশের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় ব্ল্যাক কার্বনকে এখন আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা

রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬
বর্ষার বৃষ্টিতে ঢাকার আকাশ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ধুলোমলিন শহরটিকে তখন তুলনামূলকভাবে নির্মল মনে হয়। মুষলধারে বৃষ্টি বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ধুয়ে ফেলে, বায়ুমণ্ডলকে শীতল করে।দৃশ্যমান বায়ুদূষণ কমিয়ে আনে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বর্ষাকালে শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস অনেক বেশি নিরাপদ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু চোখে দেখা এই স্বচ্ছতার আড়ালেও থেকে যেতে পারে এক অদৃশ্য ও ক্ষতিকর দূষক ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকার রসায়ন বিভাগ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগটি বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কার্যক্রম গড়ে তুলেছে। নিউক্লিয়ার বিশ্লেষণ পদ্ধতি, অ্যারোসলের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং বিভিন্ন উন্নত বিশ্লেষণধর্মী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের বায়ুদূষণের প্রকৃতি ও উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের গবেষণালব্ধ ফলাফল দূষণের প্রধান উৎস শনাক্তকরণ, বাংলাদেশে অ্যারোসলের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত উদ্যোগ গ্রহণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।
বর্ষাকালে বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ওয়েট ডিপোজিশন’ বা বৃষ্টিজনিত অপসারণ। বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও অন্যান্য বস্তুকণাকে সঙ্গে নিয়ে ভূমিতে নামিয়ে আনে। ফলে বাতাসে কণার মোট পরিমাণ কমে যায় এবং আকাশ দৃশ্যত পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতি
খনিজ ধূলিকণা সাধারণত বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের একটি বড় অংশের জন্য দায়ী। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বন প্রায় সম্পূর্ণভাবে জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন থেকে উৎপন্ন হয়। যানবাহনের ডিজেল ইঞ্জিন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি, কাঠ ও বায়োমাস পোড়ানো, অপরিষ্কার রান্নার চুলা এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো ব্ল্যাক কার্বনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ব্ল্যাক কার্বনের বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্রমেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভরের চেয়ে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা অধিক কার্যকর নির্দেশক হতে পারে। কারণ ব্ল্যাক কার্বন দহন থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
ব্ল্যাক কার্বনের অতি সূক্ষ্ম কণা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীর অ্যালভিওলার অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। কিছু কণা বায়ু, রক্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করে রক্তসঞ্চালনেও পৌঁছাতে সক্ষম। এর ফলে শরীরে সিস্টেমিক প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আবরণের কার্যকারিতায় ব্যাঘাত এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। এসব প্রতিক্রিয়া শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন যানজটপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, গণপরিবহনের চালক ও শ্রমিক, পথচারী, সড়কের পাশের দোকানি, নির্মাণশ্রমিক এবং স্কুলগামী শিশুরা নিয়মিত যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও দহনজনিত দূষণের সংস্পর্শে আসে।
এ কারণে ব্ল্যাক কার্বন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ, যা আরও বেশি বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক ও নীতিগত মনোযোগ দাবি করে।
ব্ল্যাক কার্বন শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়; এটি জলবায়ুর ওপরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবস্থান করতে পারে। অন্যদিকে ব্ল্যাক কার্বনের বায়ুমণ্ডলীয় স্থায়িত্বকাল তুলনামূলকভাবে খুবই কম-সাধারণত কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ। তবে স্বল্পস্থায়ী হলেও এটি অত্যন্ত কার্যকর আলো শোষণকারী কণা এবং জলবায়ু উষ্ণায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বায়ুমণ্ডলের অধিকাংশ অ্যারোসল সূর্যালোককে চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে শীতলীকরণ প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু ব্ল্যাক কার্বন সূর্যের আগত বিকিরণ শোষণ করে তা তাপে রূপান্তরিত করে। এর ফলে পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়, পৃথিবীর বিকিরণ ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং বায়ুমণ্ডলের স্থিতিশীলতা, মেঘের গঠন ও আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ওপর প্রভাব পড়ে।
ব্ল্যাক কার্বন বিভিন্ন পরোক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। এর কণা মেঘ ঘনীভবন কেন্দ্রক হিসেবে কাজ করতে পারে অথবা বিদ্যমান মেঘকণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মেঘের প্রতিফলনক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং বৃষ্টিপাতের কার্যকারিতায় পরিবর্তন আনতে পারে।
অ্যারোসল ও মেঘের এই মিথস্ক্রিয়া জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও অনিশ্চিত বিষয়। তবে এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্ল্যাক কার্বন আঞ্চলিক আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ছাড়া ব্ল্যাক কার্বনের কারণে সৃষ্ট বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতা উল্লম্ব তাপমাত্রা বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো কোনো অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনাবৃষ্টি ও খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জাতীয় বায়ুর গুণমান মানদণ্ড ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে সাধারণত সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) ভরঘনত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এই বস্তুকণার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু এর মোট ভরঘনত্ব পরিমাপ করে নির্ণয় করা যায় না যে, কণাগুলো তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর ভূত্বকীয় ধূলিকণা থেকে এসেছে, নাকি অধিক বিষাক্ত দহনজনিত উৎস থেকে উৎপন্ন হয়েছে।
একই পরিমাণ সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মধ্যে ধূলিকণা, ব্ল্যাক কার্বন, জৈব কার্বন, মৌলিক কার্বন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত যৌগের অনুপাত ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট পরিমাণ জানলেই বাতাসের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।
বাতাসে ভাসমান বস্তুর কণার উপস্থিতি
এ ধরনের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জানা যাবে, বায়ুদূষণের কতটুকু যানবাহন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, বায়োমাস দহন, নির্মাণকাজ, বর্জ্য পোড়ানো কিংবা আঞ্চলিক দূষণ পরিবহন থেকে আসছে। দূষণের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেলে প্রমাণভিত্তিক, লক্ষ্যনির্ভর ও কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শহরের যেসব এলাকায় যানবাহন ও দহনজনিত দূষণের মাত্রা বেশি, সেসব স্থানে নিয়মিত ব্ল্যাক কার্বন পর্যবেক্ষণ চালু করা যেতে পারে। স্কুল, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকা, বাস টার্মিনাল, প্রধান সড়ক এবং শিল্পাঞ্চলের বাতাসে ব্ল্যাক কার্বনের মাত্রা আলাদাভাবে নির্ণয় করা দরকার।
বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আবর্জনা পোড়ানো, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধোঁয়া সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তাই বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনাকে শুধু সূক্ষ্ম বস্তুকণার (ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের কম) মোট ভর পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দূষণের প্রকৃত ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।
ব্ল্যাক কার্বন কমানো গেলে একই সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে, নগরের বাতাস পরিচ্ছন্ন হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ কারণেই বাংলাদেশের বায়ুর গুণমান ব্যবস্থাপনায় ব্ল্যাক কার্বনকে এখন আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, ঢাকা

আপনার মতামত লিখুন