সংবাদ

দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে ত্বরান্বিত করছে


আল শাহারিয়া
আল শাহারিয়া
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে ত্বরান্বিত করছে
বন্যায় ফসল হারিয়েছেন অনেক কৃষক

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রকৃতির রোষানলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়ে যায়। যখনই কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর আঘাত হানে, তখন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সকলের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে কেবল দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির দিকে। কয়টি কাঁচা ঘরবাড়ি ভাঙলো, কত হাজার একর ফসলের জমি তলিয়ে গেল কিংবা ঠিক কতগুলো গবাদিপশু ভেসে গেল, আমরা মূলত সেই হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সরকারি ও বেসরকারি নানাবিধ উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ হিসেবে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় চাল, ডাল, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল এবং নগদ অর্থ। কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর মনের ভেতর যে ভয়াবহ এক নীরব ঝড় শুরু হয়, তার খবর আমরা কয়জন রাখি? BJPsych International জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ৪৮ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর বিচ্ছেদ উদ্বেগ, পিটিএসডি, প্যানিক অ্যাটাক ও বিষণ্নতাসহ নানা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল  । দুর্যোগ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট আমাদের দেশে আজও প্রায় সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে।

একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন সেই মানুষটির কথা, যার সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো পয়সায় বোনা স্বপ্নের ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে রাক্ষুসে নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। অথবা সেই প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবুন, চোখের সামনে যার সোনালি ধানের মাঠ সাগরের লোনা জলে ডুবে গিয়ে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এই মানুষগুলো দুর্যোগে শুধু তাদের বৈষয়িক সম্পদই হারায় না, তারা হারায় বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বোনা তাদের সমস্ত স্বপ্ন। রাতে যখন জোয়ারের পানি বাড়ে কিংবা আকাশে কালো মেঘ জমে, তখন তাদের বুকে যে অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে, তা কোনো সাধারণ ভয় নয়। এটি এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত বা ট্রমা। বারবার সবকিছু হারিয়ে তারা একসময় তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে শুরু করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন এক ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি।

নদীভাঙন এবং বন্যায় বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারের নারী এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে বা নতুন জায়গায় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অভাব তাদের মনে গভীর দাগ কাটে। Journal of Affective Disorders Reports -এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় খুলনার দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের ৩৫০ জন নারীর মধ্যে ৬৩ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছেন বলে পাওয়া গেছে, যেখানে বাড়িঘর ক্ষতি, জীবিকা হারানো এবং পারিবারিক সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাস্তুচ্যুতির ফলে সৃষ্ট এই মানসিক সংকট কেবল দুর্যোগকালীন নির্দিষ্ট সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন একজন মানুষ নদীভাঙন বা বন্যার কারণে নিজের পৈতৃক ভিটে চিরতরে ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তিনি আসলে তার আজন্ম চেনা সামাজিক পরিচয় এবং আত্মীয়তার বন্ধন থেকেও ছিটকে পড়েন। নিজের পরিচিত শ্যামল গ্রাম ছেড়ে শহরের কোনো ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে আশ্রয় নেয়া মানুষটি প্রতিনিয়ত এক ধরনের শেকড়হীন অনুভূতিতে ভোগেন। PLOS ONE -এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে উদ্বেগের হার ৭৬ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া মানুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। শহরের সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ, জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক জীবনযাপন তাদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই পুঞ্জীভূত হতাশা অনেক সময় পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়।

অথচ এই রূঢ় ও ভয়াবহ বাস্তবতার পরও আমাদের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার বিষয়টি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাব। আমরা সাধারণত মনে করি, যার পেটে ভাত নেই বা মাথার ওপর ছাদ নেই, তার আবার মনের অসুখ নিয়ে ভাবার বিলাসিতা কেন! আমাদের এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসী বিষয় নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চরম বিপদের সময় একজন মানুষের যদি মানসিক জোরই পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে তাকে শুধু কয়েক বস্তা ত্রাণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।

এখন সময় এসেছে আমাদের এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলানোর। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে। সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বা মানসিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রতিটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে গিয়ে তাদের কথা শোনার, তাদের সান্ত্বনা দেয়ার এবং ভয় কাটানোর জন্য একটি দক্ষ ও মানবিক কর্মীবাহিনী তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, যারা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা বা বিষণ্নতায় ভুগছেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং বা চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়তো বারবার ঝড় আসবে, নদীর জল কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করবে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে পুরোপুরি ঠেকানোর ক্ষমতা হয়তো আমাদের মানুষের হাতে নেই। কিন্তু দুর্যোগের পর সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষগুলোর পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে তাদের মনের সাহসটুকু জুগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের অবশ্যই আছে। আসুন, আগামী দিনগুলোতে ত্রাণের বস্তার পাশাপাশি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর প্রতি একটু মানসিক সমর্থন ও গভীর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই। মনের ভেতরের অদৃশ্য ক্ষতগুলো দূর করতে পারলে তবেই তারা নতুন করে জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আসল শক্তিটুকু খুঁজে পাবে।

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬


দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে ত্বরান্বিত করছে

প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে প্রকৃতির রোষানলের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। প্রতি বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়ে যায়। যখনই কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর আঘাত হানে, তখন গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রশাসন পর্যন্ত সকলের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে কেবল দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির দিকে। কয়টি কাঁচা ঘরবাড়ি ভাঙলো, কত হাজার একর ফসলের জমি তলিয়ে গেল কিংবা ঠিক কতগুলো গবাদিপশু ভেসে গেল, আমরা মূলত সেই হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সরকারি ও বেসরকারি নানাবিধ উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ হিসেবে খুব দ্রুত পৌঁছে যায় চাল, ডাল, বিশুদ্ধ পানি, ত্রিপল এবং নগদ অর্থ। কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের পর বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর মনের ভেতর যে ভয়াবহ এক নীরব ঝড় শুরু হয়, তার খবর আমরা কয়জন রাখি? BJPsych International জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ৪৮ শতাংশেরও বেশি শিশু ও কিশোর বিচ্ছেদ উদ্বেগ, পিটিএসডি, প্যানিক অ্যাটাক ও বিষণ্নতাসহ নানা গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল  । দুর্যোগ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট আমাদের দেশে আজও প্রায় সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে।

একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন সেই মানুষটির কথা, যার সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো পয়সায় বোনা স্বপ্নের ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে রাক্ষুসে নদীর পেটে বিলীন হয়ে গেছে। অথবা সেই প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবুন, চোখের সামনে যার সোনালি ধানের মাঠ সাগরের লোনা জলে ডুবে গিয়ে চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে। এই মানুষগুলো দুর্যোগে শুধু তাদের বৈষয়িক সম্পদই হারায় না, তারা হারায় বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বোনা তাদের সমস্ত স্বপ্ন। রাতে যখন জোয়ারের পানি বাড়ে কিংবা আকাশে কালো মেঘ জমে, তখন তাদের বুকে যে অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে, তা কোনো সাধারণ ভয় নয়। এটি এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত বা ট্রমা। বারবার সবকিছু হারিয়ে তারা একসময় তীব্র অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে শুরু করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন নতুন এক ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ক্লাইমেট অ্যাংজাইটি।

নদীভাঙন এবং বন্যায় বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারের নারী এবং শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আশ্রয়কেন্দ্রে বা নতুন জায়গায় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অভাব তাদের মনে গভীর দাগ কাটে। Journal of Affective Disorders Reports -এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত গবেষণায় খুলনার দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের ৩৫০ জন নারীর মধ্যে ৬৩ শতাংশ মাঝারি থেকে গুরুতর মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছেন বলে পাওয়া গেছে, যেখানে বাড়িঘর ক্ষতি, জীবিকা হারানো এবং পারিবারিক সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাস্তুচ্যুতির ফলে সৃষ্ট এই মানসিক সংকট কেবল দুর্যোগকালীন নির্দিষ্ট সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন একজন মানুষ নদীভাঙন বা বন্যার কারণে নিজের পৈতৃক ভিটে চিরতরে ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তিনি আসলে তার আজন্ম চেনা সামাজিক পরিচয় এবং আত্মীয়তার বন্ধন থেকেও ছিটকে পড়েন। নিজের পরিচিত শ্যামল গ্রাম ছেড়ে শহরের কোনো ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে আশ্রয় নেয়া মানুষটি প্রতিনিয়ত এক ধরনের শেকড়হীন অনুভূতিতে ভোগেন। PLOS ONE -এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে উদ্বেগের হার ৭৬ শতাংশেরও বেশি পাওয়া গেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া মানুষদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। শহরের সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশ, জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক জীবনযাপন তাদের মাঝে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই পুঞ্জীভূত হতাশা অনেক সময় পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে মানুষকে ঠেলে দেয়।

অথচ এই রূঢ় ও ভয়াবহ বাস্তবতার পরও আমাদের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার বিষয়টি একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের বদ্ধমূল কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাব। আমরা সাধারণত মনে করি, যার পেটে ভাত নেই বা মাথার ওপর ছাদ নেই, তার আবার মনের অসুখ নিয়ে ভাবার বিলাসিতা কেন! আমাদের এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসী বিষয় নয়, এটি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চরম বিপদের সময় একজন মানুষের যদি মানসিক জোরই পুরোপুরি ভেঙে যায়, তবে তাকে শুধু কয়েক বস্তা ত্রাণ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব নয়।

এখন সময় এসেছে আমাদের এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলানোর। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত করতে হবে। সাইকোলজিক্যাল ফার্স্ট এইড বা মানসিক প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে প্রতিটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত জরুরি। দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে গিয়ে তাদের কথা শোনার, তাদের সান্ত্বনা দেয়ার এবং ভয় কাটানোর জন্য একটি দক্ষ ও মানবিক কর্মীবাহিনী তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, যারা দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা বা বিষণ্নতায় ভুগছেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাউন্সিলিং বা চিকিৎসার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই হয়তো বারবার ঝড় আসবে, নদীর জল কূল ছাপিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করবে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোকে পুরোপুরি ঠেকানোর ক্ষমতা হয়তো আমাদের মানুষের হাতে নেই। কিন্তু দুর্যোগের পর সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষগুলোর পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে তাদের মনের সাহসটুকু জুগিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের অবশ্যই আছে। আসুন, আগামী দিনগুলোতে ত্রাণের বস্তার পাশাপাশি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর প্রতি একটু মানসিক সমর্থন ও গভীর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই। মনের ভেতরের অদৃশ্য ক্ষতগুলো দূর করতে পারলে তবেই তারা নতুন করে জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর আসল শক্তিটুকু খুঁজে পাবে।

[লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত