সংবাদ

দিল্লির বাতাস কোন দিকে বইছে


মো. জোহান
মো. জোহান
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

দিল্লির বাতাস কোন দিকে বইছে
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জেন-জি এখন আর দর্শক নয়

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ছিল অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের সময়। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জনরোষ ক্ষমতাচ্যুত করেছে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসাকে। বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনে গিয়ে ঠেকেছে। নেপালেও তরুণদের ধারাবাহিক চাপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

এবার নজর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষায় দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ শিক্ষা সংস্কার, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিবিরোধী বৃহত্তর জনআন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে-দিল্লির বাতাসও কি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কিংবা নেপালের দিকেই বইছে?

দিল্লির আন্দোলনের পটভূমি: নিট ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সরকার পরীক্ষাটি বাতিল করে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর এক বা একাধিক বছরের প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং মানসিক পরিশ্রম মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এটি কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন। তাদের ভাষায়, ‘যদি টাকা দিয়ে প্রশ্ন কেনা যায়, তাহলে মেধার কোনো মূল্য থাকে না।’

কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন: এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এটি শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো হলো, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, এনটিএর কাঠামোগত সংস্কার, ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন আর পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সিজেপির ভূমিকা: এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সারা ভারতের ছাত্র-যুবকদের একটি বৃহৎ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।  সেজেপি “এভরি ডিস্ট্রিক্ট, ওয়ান ডে, ওয়ান ডিমান্ড” কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সমন্বিত বিক্ষোভের ডাক দেয়। তাদের দাবি, কেবল কয়েকজনকে শাস্তি দিলেই হবে না; পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, কঠোর আইন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সিজেপি বলছে, এসব যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রীলঙ্কা: ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে যায়। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে ‘আরাগলায়া’ নামে পরিচিত গণআন্দোলনের সূচনা হয়। শুরুতে আন্দোলন ছিল অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে। পরে তা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজাপাকসা পরিবারের শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষ প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন দখল করে। অবশেষে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ: বাংলাদেশে ছাত্রদের আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। শুরুতে আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের অংশ যুক্ত হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের দাবি কোটা সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারের জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান এবং তার সরকারের পতন ঘটে।

নেপাল: নেপালে গত এক দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে তরুণদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নতুন প্রজন্ম দুর্নীতি, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং অকার্যকর শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হয়। বিভিন্ন সময়ে গণবিক্ষোভ ও নাগরিক আন্দোলনের ফলে সরকারগুলোর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হয় এবং একাধিকবার সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। যদিও নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার ফল, তবুও জেন-জি এবং তরুণ ভোটারদের ভূমিকা সেখানে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।

দিল্লি কি একই পথে হাঁটছে: এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু মিল অবশ্যই রয়েছে। যেমন- আন্দোলনের নেতৃত্বে তরুণ প্রজন্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার, দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ আর শিক্ষার্থী থেকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রবণতা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্যও রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশে আন্দোলন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। নেপালে পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাংবিধানিক রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে ভারতের বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এখনো মূলত পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি, শিক্ষা সংস্কার এবং জবাবদিহি। যদিও বেকারত্ব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মতো বৃহত্তর ইস্যুও ধীরে ধীরে আলোচনায় আসছে।

তাহলে দিল্লির ভবিষ্যৎ কী: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, সরকার শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মেনে নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে পারে।  দ্বিতীয়ত, আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আরও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হতে পারে। তৃতীয়ত, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ক্রমেই অন্যতম শক্তি হয়ে উঠছে জেন-জি।

বর্তমান বাস্তবতায় দিল্লির পরিস্থিতিকে সরাসরি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে এক করে দেখা সঠিক হবে না। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্ম এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার।

দিল্লির বাতাস কোন দিকে বইছে-তার উত্তর আজও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জেন-জি এখন আর দর্শক নয়; তারা ক্রমেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬


দিল্লির বাতাস কোন দিকে বইছে

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ছিল অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের সময়। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জনরোষ ক্ষমতাচ্যুত করেছে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসাকে। বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনে গিয়ে ঠেকেছে। নেপালেও তরুণদের ধারাবাহিক চাপ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

এবার নজর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষায় দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা আজ শিক্ষা সংস্কার, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিবিরোধী বৃহত্তর জনআন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে-দিল্লির বাতাসও কি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কিংবা নেপালের দিকেই বইছে?

দিল্লির আন্দোলনের পটভূমি: নিট ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর সরকার পরীক্ষাটি বাতিল করে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর এক বা একাধিক বছরের প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং মানসিক পরিশ্রম মুহূর্তেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এটি কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতিফলন। তাদের ভাষায়, ‘যদি টাকা দিয়ে প্রশ্ন কেনা যায়, তাহলে মেধার কোনো মূল্য থাকে না।’

কেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন: এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এটি শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো হলো, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, এনটিএর কাঠামোগত সংস্কার, ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন আর পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সিজেপির ভূমিকা: এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সারা ভারতের ছাত্র-যুবকদের একটি বৃহৎ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।  সেজেপি “এভরি ডিস্ট্রিক্ট, ওয়ান ডে, ওয়ান ডিমান্ড” কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সমন্বিত বিক্ষোভের ডাক দেয়। তাদের দাবি, কেবল কয়েকজনকে শাস্তি দিলেই হবে না; পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, কঠোর আইন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে সিজেপি বলছে, এসব যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রীলঙ্কা: ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে যায়। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকত না। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। এই পরিস্থিতিতে ‘আরাগলায়া’ নামে পরিচিত গণআন্দোলনের সূচনা হয়। শুরুতে আন্দোলন ছিল অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে। পরে তা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজাপাকসা পরিবারের শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষ প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন দখল করে। অবশেষে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।

বাংলাদেশ: বাংলাদেশে ছাত্রদের আন্দোলনের সূচনা হয় সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। শুরুতে আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের অংশ যুক্ত হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের দাবি কোটা সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সরকারের জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান এবং তার সরকারের পতন ঘটে।

নেপাল: নেপালে গত এক দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে তরুণদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নতুন প্রজন্ম দুর্নীতি, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং অকার্যকর শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হয়। বিভিন্ন সময়ে গণবিক্ষোভ ও নাগরিক আন্দোলনের ফলে সরকারগুলোর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হয় এবং একাধিকবার সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। যদিও নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার ফল, তবুও জেন-জি এবং তরুণ ভোটারদের ভূমিকা সেখানে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে।

দিল্লি কি একই পথে হাঁটছে: এই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। কিছু মিল অবশ্যই রয়েছে। যেমন- আন্দোলনের নেতৃত্বে তরুণ প্রজন্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার, দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ আর শিক্ষার্থী থেকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের প্রবণতা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্যও রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। বাংলাদেশে আন্দোলন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। নেপালে পরিবর্তন এসেছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাংবিধানিক রূপান্তরের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে ভারতের বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এখনো মূলত পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি, শিক্ষা সংস্কার এবং জবাবদিহি। যদিও বেকারত্ব, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মতো বৃহত্তর ইস্যুও ধীরে ধীরে আলোচনায় আসছে।

তাহলে দিল্লির ভবিষ্যৎ কী: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, সরকার শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মেনে নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে পারে।  দ্বিতীয়ত, আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আরও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হতে পারে। তৃতীয়ত, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতা হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ক্রমেই অন্যতম শক্তি হয়ে উঠছে জেন-জি।

বর্তমান বাস্তবতায় দিল্লির পরিস্থিতিকে সরাসরি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ বা নেপালের সঙ্গে এক করে দেখা সঠিক হবে না। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্ম এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার।

দিল্লির বাতাস কোন দিকে বইছে-তার উত্তর আজও অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জেন-জি এখন আর দর্শক নয়; তারা ক্রমেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত