দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগে দুই জেলায় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার (৯ আগস্ট) এক দিনের এই সফরকে ঘিরে কক্সবাজারের মহেশখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও নগরীতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো-সব পক্ষই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারে মহেশখালীতে পৌঁছাবেন। সেখানে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পটি দেশের বৃহত্তম গভীর সমুদ্রবন্দর, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। মিডা এই অঞ্চলের সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে।
দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় যাবেন। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে ১০০টি পরিবার নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচনের মানদণ্ড ছিল-যাদের ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং নতুন ঘর নির্মাণের কোনো সামর্থ্য নেই। এর মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে নারী-মুখী পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্যবিশিষ্ট পরিবার এবং সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষকে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে একজন স্বামীহারা নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন, যিনি সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। তার হাতেই প্রথম চাবি তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে ১০০টি পরিবারের কাছে ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি ঘর ২৫০ বর্গফুটের, যাতে দুটি শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর ও একটি স্যানিটারি ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী সফর ঘিরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য গৌরবের দিন। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ঐতিহাসিক সংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও জানান, বাঁশখালীতে স্বাগত মঞ্চ, ব্যানার ও ফেস্টুন স্থাপন করা হয়েছে। সড়কগুলো পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সক্রিয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার ও সিসি ক্যামেরা বসানোর কথা রয়েছে।
দুপুর ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালী থেকে ফটিকছড়ি যাবেন। সেখানে নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর এলাকায় আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। পরে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন সিনিয়র নেতার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এই সফরকে অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির আমিরের মুখপাত্র ও নাতি মাওলানা রহমতুল্লাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের সময় আমিরের সঙ্গে দেখা করার যে কথা দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতেই আজকের এই সফর। সেখানে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসভা হবে না। শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হবে।’
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী জানিয়েছেন, ফটিকছড়িবাসীর সার্বিক কল্যাণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ফটিকছড়িতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন (বর্তমানে উপজেলায় কোনো বড় সরকারি হাসপাতাল নেই);
২. চট্টগ্রাম শহর থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ (যাতে পাহাড়ি অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়);
৩. চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা (বর্তমানে এটি দুই লেনের, যা যানজট ও দুর্ঘটনার জন্য খ্যাত);
৪. ফটিকছড়িতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নতুন বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপন;
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ফটিকছড়ির পেলাগাজিতে অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। সেখান থেকে তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কপথে বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর আগমনস্থল বাবুনগর মাদ্রাসা ও পেলাগাজির অস্থায়ী হেলিপ্যাড পরিদর্শন করেছেন রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর। তারা সড়কের সংস্কার, নিরাপত্তা ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ফটিকছড়ির উন্নয়নের মাইলফলক উল্লেখ করে এমপি সরোয়ার আলমগীর বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। ফটিকছড়ির সর্বস্তরের জনগণ তাকে বরণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। ফটিকছড়ির স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি-দীর্ঘদিনের এসব দাবি আমরা তার কাছে তুলে ধরব। আমি বিশ্বাস করি, এই সফরের মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য বদলে যাবে।’
এমপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ি আসছেন-এজন্য আমি আনন্দিত। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত-তিনি মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আমার পরিবারেরই সদস্যের মতো। তিনি ফটিকছড়ি থেকে রিকশায় গিয়ে আমার ভাইয়ের জানাজা পড়িয়েছিলেন। বাবুনগর আমাদের আবেগের জায়গা। এটি রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি গভীর।’
ফটিকছড়ি থেকে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বেলা ২টা ৩০ মিনিটে হাটহাজারী পৌঁছাবেন। হাটহাজারীতে পৌঁছে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করবেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব, যিনি ২০২০ সালে ইন্তেকাল করেন। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ছিলেন তার উত্তরসূরি, যিনি ২০২১ সালে মারা যান। তাদের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
এরপর মাদ্রাসা সংলগ্ন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন। প্রশাসন ডাকবাংলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, রং-চুনকাম ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেছে। প্রধান ফটক সাজানো হয়েছে। হাটহাজারী-ফটিকছড়ি আঞ্চলিক সড়কের অবৈধ স্থাপনা সরানোর কাজও শেষ হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ডাকবাংলোর আশপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
বিকেল ৫টায় হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মাঠে ১০ হাজার মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ এলে স্ট্যান্ডিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঘিরে হাটহাজারী কলেজ মাঠে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ছাদে স্নাইপার মোতায়েনের কথাও রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০টি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে-যার মধ্যে সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আপ্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটও মাঠে থাকবে।
হাটহাজারী সংসদীয় আসনের বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দুই ওয়ার্ডে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি সভা করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসাধারণকে অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নগরীতে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার লাগানো হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে, যা হাটহাজারী কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হবে।
সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন। এই সভায় বিভাগীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। সভায় দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, আগামী নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।
একদিনের এই সফরকে ঘিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেখা গেছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই উন্নয়নের এজেন্ডা নিয়ে আশাবাদী, আবার কেউ কেউ সফরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।
ফটিকছড়ির বাসিন্দা মো. ইদ্রিস বলেন, ‘আমরা চাই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতে আমাদের পণ্য বাজারে পাঠাতে সুবিধা হয়। এটাই আমাদের প্রধান দাবি।’ অন্যদিকে হাটহাজারী কলেজের শিক্ষক আবদুল মালেক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আসছেন, এটা ভালো। কিন্তু তিনি আসলে কী কী বাস্তবায়ন করবেন, সেটাই দেখার বিষয়।’

রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বিভাগে দুই জেলায় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ রোববার (৯ আগস্ট) এক দিনের এই সফরকে ঘিরে কক্সবাজারের মহেশখালী ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও নগরীতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো-সব পক্ষই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারে মহেশখালীতে পৌঁছাবেন। সেখানে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পটি দেশের বৃহত্তম গভীর সমুদ্রবন্দর, যার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। মিডা এই অঞ্চলের সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে।
দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় যাবেন। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ত্রাণ বিতরণ করবেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বাঁশখালী পৌরসভা ও উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন থেকে ১০০টি পরিবার নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচনের মানদণ্ড ছিল-যাদের ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং নতুন ঘর নির্মাণের কোনো সামর্থ্য নেই। এর মধ্যে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে নারী-মুখী পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্যবিশিষ্ট পরিবার এবং সবচেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষকে।
প্রধানমন্ত্রী প্রথমে একজন স্বামীহারা নারীর হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন, যিনি সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। তার হাতেই প্রথম চাবি তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতীকীভাবে ১০০টি পরিবারের কাছে ঘর হস্তান্তর কার্যক্রম শুরু হবে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি ঘর ২৫০ বর্গফুটের, যাতে দুটি শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর ও একটি স্যানিটারি ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালী সফর ঘিরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য গৌরবের দিন। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ঐতিহাসিক সংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও জানান, বাঁশখালীতে স্বাগত মঞ্চ, ব্যানার ও ফেস্টুন স্থাপন করা হয়েছে। সড়কগুলো পরিষ্কার ও সংস্কার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সক্রিয় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার ও সিসি ক্যামেরা বসানোর কথা রয়েছে।
দুপুর ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালী থেকে ফটিকছড়ি যাবেন। সেখানে নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর এলাকায় আল জামিয়াতুল ইসলামীয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। পরে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রায় ৫০ জন সিনিয়র নেতার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে এই সফরকে অরাজনৈতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির আমিরের মুখপাত্র ও নাতি মাওলানা রহমতুল্লাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের সময় আমিরের সঙ্গে দেখা করার যে কথা দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতেই আজকের এই সফর। সেখানে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ বা জনসভা হবে না। শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হবে।’
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী জানিয়েছেন, ফটিকছড়িবাসীর সার্বিক কল্যাণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ফটিকছড়িতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন (বর্তমানে উপজেলায় কোনো বড় সরকারি হাসপাতাল নেই);
২. চট্টগ্রাম শহর থেকে নাজিরহাট হয়ে রামগড় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ (যাতে পাহাড়ি অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়);
৩. চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা (বর্তমানে এটি দুই লেনের, যা যানজট ও দুর্ঘটনার জন্য খ্যাত);
৪. ফটিকছড়িতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নতুন বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপন;
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ফটিকছড়ির পেলাগাজিতে অস্থায়ী হেলিপ্যাড নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। সেখান থেকে তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কপথে বাবুনগর মাদ্রাসায় যাবেন। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর আগমনস্থল বাবুনগর মাদ্রাসা ও পেলাগাজির অস্থায়ী হেলিপ্যাড পরিদর্শন করেছেন রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর। তারা সড়কের সংস্কার, নিরাপত্তা ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ফটিকছড়ির উন্নয়নের মাইলফলক উল্লেখ করে এমপি সরোয়ার আলমগীর বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়ি সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের। ফটিকছড়ির সর্বস্তরের জনগণ তাকে বরণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। ফটিকছড়ির স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি-দীর্ঘদিনের এসব দাবি আমরা তার কাছে তুলে ধরব। আমি বিশ্বাস করি, এই সফরের মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ির অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগণের ভাগ্য বদলে যাবে।’
এমপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ি আসছেন-এজন্য আমি আনন্দিত। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত-তিনি মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী আমার পরিবারেরই সদস্যের মতো। তিনি ফটিকছড়ি থেকে রিকশায় গিয়ে আমার ভাইয়ের জানাজা পড়িয়েছিলেন। বাবুনগর আমাদের আবেগের জায়গা। এটি রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি গভীর।’
ফটিকছড়ি থেকে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বেলা ২টা ৩০ মিনিটে হাটহাজারী পৌঁছাবেন। হাটহাজারীতে পৌঁছে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করবেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফী ছিলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব, যিনি ২০২০ সালে ইন্তেকাল করেন। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ছিলেন তার উত্তরসূরি, যিনি ২০২১ সালে মারা যান। তাদের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
এরপর মাদ্রাসা সংলগ্ন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় কিছু সময় বিশ্রাম নেবেন। প্রশাসন ডাকবাংলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, রং-চুনকাম ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করেছে। প্রধান ফটক সাজানো হয়েছে। হাটহাজারী-ফটিকছড়ি আঞ্চলিক সড়কের অবৈধ স্থাপনা সরানোর কাজও শেষ হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ডাকবাংলোর আশপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
বিকেল ৫টায় হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে ৩০টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। একই অনুষ্ঠানে ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মাঠে ১০ হাজার মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল প্যান্ডেল ও মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ এলে স্ট্যান্ডিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঘিরে হাটহাজারী কলেজ মাঠে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। ছাদে স্নাইপার মোতায়েনের কথাও রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০টি পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে-যার মধ্যে সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আপ্যায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটও মাঠে থাকবে।
হাটহাজারী সংসদীয় আসনের বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দুই ওয়ার্ডে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি সভা করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসাধারণকে অনুষ্ঠানে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। নগরীতে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার লাগানো হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে একটি বিশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে, যা হাটহাজারী কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হবে।
সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন। এই সভায় বিভাগীয়, জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত থাকবেন। সভায় দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, আগামী নির্বাচনী প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়ে আলোচনা হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।
রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।
একদিনের এই সফরকে ঘিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেখা গেছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই উন্নয়নের এজেন্ডা নিয়ে আশাবাদী, আবার কেউ কেউ সফরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন।
ফটিকছড়ির বাসিন্দা মো. ইদ্রিস বলেন, ‘আমরা চাই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যাতে আমাদের পণ্য বাজারে পাঠাতে সুবিধা হয়। এটাই আমাদের প্রধান দাবি।’ অন্যদিকে হাটহাজারী কলেজের শিক্ষক আবদুল মালেক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আসছেন, এটা ভালো। কিন্তু তিনি আসলে কী কী বাস্তবায়ন করবেন, সেটাই দেখার বিষয়।’

আপনার মতামত লিখুন