সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর প্রকোপ। ইতোমধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণেই মূলত মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় জ্বর কমে গেলে রোগীরা নিজেদের সুস্থ মনে করে ভুল করেন, অথচ ঠিক এই ক্রিটিক্যাল ফেজেই শুরু হয় আসল জটিলতা। বর্তমানে যে হারে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তাতে আগামী সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং ডিসেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জ্বর কমলেই নামছে বিপদ
ডেঙ্গু চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে চিকিৎসকরা জানান, জ্বর কমে যাওয়ার পর শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া, শক সিন্ড্রোম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো প্রাণঘাতী সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন, "তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব; এসবের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা মাত্রই কালবিলম্ব না করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হলে অধিকাংশ গুরুতর রোগীকেও পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব।"
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, কেবল হাসপাতালেই নয়, ডেঙ্গু দমনের প্রধান লড়াইটা হতে হবে মশার উৎসে। এ বিষয়ে ড. কবিরুল বাশার যোগ করেন, "ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো এডিস মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, গাড়ির পার্কিং, ভবনের বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দা, ফুলের টব, এসি কিংবা ফ্রিজের ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার বা যেকোনো পাত্রে ৩ দিনের বেশি সময় ধরে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের একসূত্রে গেঁথে সমন্বিতভাবে প্রজনন উৎস ধ্বংসের সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।"
বিএমইউ সেমিনারে সতর্কবার্তা
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির চেয়ারম্যান ডা. আফজালুন নেছার সভাপতিত্বে এবং ডা. ডিএমএম ফারুক ওসমানীর সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, "সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলারে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।"
তবে তিনি কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক প্রতিরোধের জোর তাগিদ দিয়ে বলেন, "ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ ও বিস্তার ঠেকাতে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।"
রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের তাগিদ দিয়ে অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, "মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ শনাক্ত করা সম্ভব না হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাই শুরুতে রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করাই এখন সময়ের দাবি।"
উক্ত সেমিনারে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতারসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ভার্সিটির ভাইরোলজি বিভাগের ডা. এস. এম. রাশেদ উল ইসলাম এবং ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ ডেঙ্গুর আধুনিক চিকিৎসা ও সেরোটাইপ পরিবর্তন নিয়ে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক বক্তব্য পেশ করেন।
একনজরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মৃত্যুর হিসাব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী শাখার সর্বশেষ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৭৪ জনে। আর নতুন ৭৫৩ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১ হাজার ৭৮০ জন রোগী।
বিভাগে নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৯২ জন, বরিশালে ৯৮ জন, চট্টগ্রামে ৯৪ জন, খুলনায় ১৩৫ জন, ময়মনসিংহে ৬১ জন, রাজশাহীতে ৪৬ জন, রংপুরে ২৪ জন এবং সিলেটে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ভৌগোলিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় (২৪ জন) এবং খুলনা বিভাগে (২৪ জন)। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদায়ী জুলাই মাসেই মারা গেছেন ৩৬ জন এবং চলতি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়েই প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। তবে এই হিসেব কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা হাসপাতালে না গিয়ে নিজ বাসাবাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের হিসাব যুক্ত করলে প্রকৃত আক্রান্ত ও ঝুঁকির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
বর্ষায় এডিসের বিস্তার ও প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গুর বর্তমান রূপ ও এডিসের বংশবৃদ্ধি নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মহাখালী আইসিডিডিআর,বি/আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি উল্লেখ করেন, "বর্ষাকাল মানুষের কাছে স্বস্তির হলেও এটি আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক উদ্বেগের সময়। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত, বাতাসে আদ্রতা এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে। বৃষ্টির সময় পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা গাছের পাতা, ঝোপঝাড় ও ঘরের কোণে নিরাপদ আশ্রয় নেয়। কিন্তু বৃষ্টি থামলেই এরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।"
এডিসের জীবনচক্র ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, "মশার ডিম বৃষ্টির পানিতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ার পর অনুকূল পরিবেশে ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে লার্ভা এবং ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। সেই মশা ভাইরাসবাহক কোনো রোগীকে কামড়ানোর পর সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গু দ্রুত মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাই ডেঙ্গু রোগী দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে আমাদের অবিলম্বে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।"

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর প্রকোপ। ইতোমধ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ৭৪ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণেই মূলত মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক সময় জ্বর কমে গেলে রোগীরা নিজেদের সুস্থ মনে করে ভুল করেন, অথচ ঠিক এই ক্রিটিক্যাল ফেজেই শুরু হয় আসল জটিলতা। বর্তমানে যে হারে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তাতে আগামী সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং ডিসেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জ্বর কমলেই নামছে বিপদ
ডেঙ্গু চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে চিকিৎসকরা জানান, জ্বর কমে যাওয়ার পর শরীর থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া, শক সিন্ড্রোম, অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো প্রাণঘাতী সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেন, "তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব; এসবের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা মাত্রই কালবিলম্ব না করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হলে অধিকাংশ গুরুতর রোগীকেও পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব।"
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, কেবল হাসপাতালেই নয়, ডেঙ্গু দমনের প্রধান লড়াইটা হতে হবে মশার উৎসে। এ বিষয়ে ড. কবিরুল বাশার যোগ করেন, "ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো এডিস মশার প্রজননস্থল পুরোপুরি ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, গাড়ির পার্কিং, ভবনের বেসমেন্টে জমে থাকা পানি, বারান্দা, ফুলের টব, এসি কিংবা ফ্রিজের ট্রে, প্লাস্টিকের ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার বা যেকোনো পাত্রে ৩ দিনের বেশি সময় ধরে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের একসূত্রে গেঁথে সমন্বিতভাবে প্রজনন উৎস ধ্বংসের সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।"
বিএমইউ সেমিনারে সতর্কবার্তা
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘ডেঙ্গুর পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেন্ট্রাল সেমিনার সাব-কমিটির চেয়ারম্যান ডা. আফজালুন নেছার সভাপতিত্বে এবং ডা. ডিএমএম ফারুক ওসমানীর সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ উপাচার্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী।
সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, "সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলারে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে রোগীদের চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।"
তবে তিনি কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক প্রতিরোধের জোর তাগিদ দিয়ে বলেন, "ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতিই যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ ও বিস্তার ঠেকাতে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।"
রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের তাগিদ দিয়ে অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, "মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ শনাক্ত করা সম্ভব না হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাই শুরুতে রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করাই এখন সময়ের দাবি।"
উক্ত সেমিনারে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ ডা. নাহরীন আখতারসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ভার্সিটির ভাইরোলজি বিভাগের ডা. এস. এম. রাশেদ উল ইসলাম এবং ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ ডেঙ্গুর আধুনিক চিকিৎসা ও সেরোটাইপ পরিবর্তন নিয়ে নিজস্ব বৈজ্ঞানিক বক্তব্য পেশ করেন।
একনজরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও মৃত্যুর হিসাব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী শাখার সর্বশেষ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৭৪ জনে। আর নতুন ৭৫৩ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১ হাজার ৭৮০ জন রোগী।
বিভাগে নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৯২ জন, বরিশালে ৯৮ জন, চট্টগ্রামে ৯৪ জন, খুলনায় ১৩৫ জন, ময়মনসিংহে ৬১ জন, রাজশাহীতে ৪৬ জন, রংপুরে ২৪ জন এবং সিলেটে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ভৌগোলিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় (২৪ জন) এবং খুলনা বিভাগে (২৪ জন)। এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদায়ী জুলাই মাসেই মারা গেছেন ৩৬ জন এবং চলতি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়েই প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। তবে এই হিসেব কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা হাসপাতালে না গিয়ে নিজ বাসাবাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের হিসাব যুক্ত করলে প্রকৃত আক্রান্ত ও ঝুঁকির সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
বর্ষায় এডিসের বিস্তার ও প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গুর বর্তমান রূপ ও এডিসের বংশবৃদ্ধি নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও মহাখালী আইসিডিডিআর,বি/আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি উল্লেখ করেন, "বর্ষাকাল মানুষের কাছে স্বস্তির হলেও এটি আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক উদ্বেগের সময়। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত, বাতাসে আদ্রতা এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে। বৃষ্টির সময় পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা গাছের পাতা, ঝোপঝাড় ও ঘরের কোণে নিরাপদ আশ্রয় নেয়। কিন্তু বৃষ্টি থামলেই এরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।"
এডিসের জীবনচক্র ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, "মশার ডিম বৃষ্টির পানিতে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছড়িয়ে পড়ার পর অনুকূল পরিবেশে ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে লার্ভা এবং ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হয়। সেই মশা ভাইরাসবাহক কোনো রোগীকে কামড়ানোর পর সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গু দ্রুত মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাই ডেঙ্গু রোগী দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে আমাদের অবিলম্বে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।"

আপনার মতামত লিখুন