সংবাদ

এক ভোটে লোকসভা-বিধানসভা

২০২৯-এ ২২ রাজ্য নিয়ে বিজেপির বড় পরীক্ষা


দীপক মুখার্জী, কলকাতা
দীপক মুখার্জী, কলকাতা
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

২০২৯-এ ২২ রাজ্য নিয়ে বিজেপির বড় পরীক্ষা

“ভারতের রাজনীতিতে কি এবার ঘটতে চলেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরীক্ষা? ২০৩৪ নয়—২০২৯ সালেই লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে ২২টি NDA-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করার ভাবনা! আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একাধিক বিধানসভা ভেঙে দিতে হতে পারে।

অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নয়—প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি কি ২০২৯-এর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে নিজেদেরই কয়েকটি সরকারের মেয়াদ কাটার ঝুঁকি নিতে চলেছে? এর রাজনৈতিক লাভ কোথায়, আর বিপদই বা কতটা—আজকের বিশ্লেষণে খতিয়ে দেখব পুরো বিষয়টি।”

ভারতের রাজনীতিতে ফের সামনে চলে এসেছে ‘One Nation One Election’ বা এক দেশ, এক নির্বাচনের বিতর্ক। তবে এবার আলোচনাটি শুধু নীতিগত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২২টি NDA-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন।

Indian Express-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০৩৪ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালেই লোকসভা ও এই রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করার সম্ভাবনা নিয়ে NDA-র মধ্যে আলোচনা চলছে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভার স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেগুলি ভেঙে দিতে হতে পারে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিজেপি এবং তার শরিকরা কি নিজেদের হাতে থাকা রাজ্য সরকারগুলির মেয়াদ নিজেরাই কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত? কারণ ২০২৯ সালে লোকসভার সঙ্গে নির্বাচন করতে গেলে যে রাজ্যগুলিতে ২০২৭ বা ২০২৮ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা, সেখানেও আগাম বিধানসভা নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ কিছু রাজ্যে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ প্রায় তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বর্তমান One Nation One Election বিলের কাঠামো অনুযায়ী প্রথম পূর্ণ সমন্বিত নির্বাচন ২০৩৪ সালের দিকে হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২৯-কে সামনে এনে সেই সময়সূচি পাঁচ বছর এগিয়ে আনার অর্থ হবে ভারতের নির্বাচনী ক্যালেন্ডারকে কার্যত নতুন করে সাজানো। এই কারণেই বিষয়টি শুধুমাত্র নির্বাচনী সংস্কারের প্রশ্ন নয়, এটি একটি বড় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেও সামনে আসছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, NDA-শাসিত ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। আবার অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম এবং ওডিশায় ইতিমধ্যেই লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ২০২৯-কে কেন্দ্র করে একটি অভিন্ন নির্বাচনী চক্র তৈরির ক্ষেত্রে এই চারটি রাজ্য তুলনামূলকভাবে সহজ অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু আসল জটিলতা অন্য জায়গায়। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, গোয়া, মণিপুর ও উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে নির্বাচনের সময়সূচি ২০২৯-এর সঙ্গে মেলাতে গেলে বিধানসভার মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হতে পারে। ছত্তীসগড়, মধ্যপ্রদেশ, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, রাজস্থান এবং ত্রিপুরার ক্ষেত্রেও মেয়াদ প্রায় চার বছর পর্যন্ত কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ এক দেশ, এক নির্বাচন চালু করতে গেলে NDA-কে প্রথম বড় রাজনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করতে হতে পারে নিজেদেরই রাজ্য সরকারগুলির মেয়াদ নিয়ে।

এই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক, নাকি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি?

সমর্থকদের যুক্তি, দেশে বারবার নির্বাচন হলে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ে, নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রায় সারা বছরই নির্বাচনী প্রস্তুতিতে থাকতে হয়। একসঙ্গে নির্বাচন হলে এই সমস্যা কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেশি সময় দিতে পারবে—এমন যুক্তিও সামনে রয়েছে।

কিন্তু বিরোধীদের আপত্তি আরও মৌলিক। তাদের প্রশ্ন, পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি বিধানসভার মেয়াদ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কমিয়ে দেওয়া হলে ভোটারের দেওয়া ম্যান্ডেটের মূল্য কোথায় থাকে? কোনও রাজ্যের সরকার যদি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়, তাহলে শুধুমাত্র জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে সেই মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া কতটা গণতান্ত্রিক—এই প্রশ্নই এখন One Nation One Election বিতর্কের কেন্দ্রে।

আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। ২২টি NDA-শাসিত রাজ্যকে ২০২৯-এর নির্বাচনী চক্রে আনা গেলেও বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে একই সমীকরণ থাকবে না। পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, কর্ণাটক, মিজোরাম এবং তেলঙ্গানার মতো রাজ্যে ২০২৯-এর আগেই নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে শুধু NDA-শাসিত রাজ্যগুলির নির্বাচন এগিয়ে আনলেই গোটা দেশের নির্বাচন একসঙ্গে হয়ে যাচ্ছে না। বরং একটি অসম নির্বাচনী কাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

এখানেই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে পারে, ‘One Nation One Election’-এর নামে কি আসলে NDA-শাসিত রাজ্যগুলিকে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে? যদিও এই মুহূর্তে এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি, এবং বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।

আর বিজেপির জন্যও এই পরিকল্পনা একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। একই দিনে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন হলে জাতীয় ইস্যুর প্রভাব রাজ্য নির্বাচনে পড়তে পারে—যা NDA-র পক্ষে সুবিধাজনকও হতে পারে। কিন্তু উল্টো দিকে কোনও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভ থাকলে সেই ক্ষোভও একই নির্বাচনে NDA-র ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ ২০২৯-এর একসঙ্গে নির্বাচন বিজেপির জন্য যেমন বড় সুযোগ, তেমনই বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখনও সংসদীয় যৌথ কমিটি One Nation One Election সংক্রান্ত বিলগুলি নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা করছে। কমিটির চেয়ারম্যান পি পি চৌধুরীও বলেছেন, ২০২৯-এ নির্বাচন এগিয়ে আনার বিষয়টি কমিটির ম্যান্ডেটের বাইরে এবং NDA-র মুখ্যমন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের বিষয়। ফলে ২০২৯-এর পরিকল্পনাকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে রাজনৈতিক বার্তাটি যথেষ্ট স্পষ্ট। ২০৩৪ থেকে ২০২৯-এ নির্বাচন এগিয়ে আনার চিন্তা বাস্তবে পরিণত হলে ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ তখন শুধু ভোটের তারিখ বদলাবে না—বিধানসভার মেয়াদ, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল এবং ভোটারদের সামনে জাতীয় ও রাজ্য ইস্যুর সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়বে।

তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিজেপি সরকার নিজেদের সরকার ফেলে দেবে কি না—এটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে ২২টি NDA-শাসিত রাজ্যের নির্বাচন একসঙ্গে করার জন্য বিজেপি এবং তার শরিকরা নিজেদের রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদ কমানোর ঝুঁকি নিতে কতটা প্রস্তুত?

One Nation One Election যদি ২০২৯-এই বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তাহলে সেটি শুধু একটি নির্বাচনী সংস্কার হবে না। এটি হতে পারে ভারতের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় বিজেপির জন্য যেমন বড় রাজনৈতিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনই রয়েছে বড় ঝুঁকিও।

এখন নজর তাই সংসদের যৌথ কমিটির রিপোর্টের দিকে, NDA-র মুখ্যমন্ত্রীদের অবস্থানের দিকে এবং সবচেয়ে বড় করে—২০২৯-এর রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬


২০২৯-এ ২২ রাজ্য নিয়ে বিজেপির বড় পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

“ভারতের রাজনীতিতে কি এবার ঘটতে চলেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরীক্ষা? ২০৩৪ নয়—২০২৯ সালেই লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে ২২টি NDA-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করার ভাবনা! আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একাধিক বিধানসভা ভেঙে দিতে হতে পারে।

অর্থাৎ প্রশ্নটা শুধু ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নয়—প্রশ্ন উঠছে, বিজেপি কি ২০২৯-এর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে নিজেদেরই কয়েকটি সরকারের মেয়াদ কাটার ঝুঁকি নিতে চলেছে? এর রাজনৈতিক লাভ কোথায়, আর বিপদই বা কতটা—আজকের বিশ্লেষণে খতিয়ে দেখব পুরো বিষয়টি।”

ভারতের রাজনীতিতে ফের সামনে চলে এসেছে ‘One Nation One Election’ বা এক দেশ, এক নির্বাচনের বিতর্ক। তবে এবার আলোচনাটি শুধু নীতিগত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২২টি NDA-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন।

Indian Express-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০৩৪ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালেই লোকসভা ও এই রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচন একসঙ্গে করার সম্ভাবনা নিয়ে NDA-র মধ্যে আলোচনা চলছে। আর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভার স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেগুলি ভেঙে দিতে হতে পারে।

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিজেপি এবং তার শরিকরা কি নিজেদের হাতে থাকা রাজ্য সরকারগুলির মেয়াদ নিজেরাই কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত? কারণ ২০২৯ সালে লোকসভার সঙ্গে নির্বাচন করতে গেলে যে রাজ্যগুলিতে ২০২৭ বা ২০২৮ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা, সেখানেও আগাম বিধানসভা নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ কিছু রাজ্যে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ প্রায় তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বর্তমান One Nation One Election বিলের কাঠামো অনুযায়ী প্রথম পূর্ণ সমন্বিত নির্বাচন ২০৩৪ সালের দিকে হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২৯-কে সামনে এনে সেই সময়সূচি পাঁচ বছর এগিয়ে আনার অর্থ হবে ভারতের নির্বাচনী ক্যালেন্ডারকে কার্যত নতুন করে সাজানো। এই কারণেই বিষয়টি শুধুমাত্র নির্বাচনী সংস্কারের প্রশ্ন নয়, এটি একটি বড় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেও সামনে আসছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, NDA-শাসিত ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। আবার অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম এবং ওডিশায় ইতিমধ্যেই লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ২০২৯-কে কেন্দ্র করে একটি অভিন্ন নির্বাচনী চক্র তৈরির ক্ষেত্রে এই চারটি রাজ্য তুলনামূলকভাবে সহজ অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু আসল জটিলতা অন্য জায়গায়। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, গোয়া, মণিপুর ও উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে নির্বাচনের সময়সূচি ২০২৯-এর সঙ্গে মেলাতে গেলে বিধানসভার মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হতে পারে। ছত্তীসগড়, মধ্যপ্রদেশ, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, রাজস্থান এবং ত্রিপুরার ক্ষেত্রেও মেয়াদ প্রায় চার বছর পর্যন্ত কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ এক দেশ, এক নির্বাচন চালু করতে গেলে NDA-কে প্রথম বড় রাজনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করতে হতে পারে নিজেদেরই রাজ্য সরকারগুলির মেয়াদ নিয়ে।

এই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক, নাকি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি?

সমর্থকদের যুক্তি, দেশে বারবার নির্বাচন হলে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ে, নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রায় সারা বছরই নির্বাচনী প্রস্তুতিতে থাকতে হয়। একসঙ্গে নির্বাচন হলে এই সমস্যা কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেশি সময় দিতে পারবে—এমন যুক্তিও সামনে রয়েছে।

কিন্তু বিরোধীদের আপত্তি আরও মৌলিক। তাদের প্রশ্ন, পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি বিধানসভার মেয়াদ রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কমিয়ে দেওয়া হলে ভোটারের দেওয়া ম্যান্ডেটের মূল্য কোথায় থাকে? কোনও রাজ্যের সরকার যদি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়, তাহলে শুধুমাত্র জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে সেই মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া কতটা গণতান্ত্রিক—এই প্রশ্নই এখন One Nation One Election বিতর্কের কেন্দ্রে।

আরও একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। ২২টি NDA-শাসিত রাজ্যকে ২০২৯-এর নির্বাচনী চক্রে আনা গেলেও বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে একই সমীকরণ থাকবে না। পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, কর্ণাটক, মিজোরাম এবং তেলঙ্গানার মতো রাজ্যে ২০২৯-এর আগেই নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে শুধু NDA-শাসিত রাজ্যগুলির নির্বাচন এগিয়ে আনলেই গোটা দেশের নির্বাচন একসঙ্গে হয়ে যাচ্ছে না। বরং একটি অসম নির্বাচনী কাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকছে।

এখানেই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে পারে, ‘One Nation One Election’-এর নামে কি আসলে NDA-শাসিত রাজ্যগুলিকে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে? যদিও এই মুহূর্তে এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি, এবং বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।

আর বিজেপির জন্যও এই পরিকল্পনা একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। একই দিনে লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচন হলে জাতীয় ইস্যুর প্রভাব রাজ্য নির্বাচনে পড়তে পারে—যা NDA-র পক্ষে সুবিধাজনকও হতে পারে। কিন্তু উল্টো দিকে কোনও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভ থাকলে সেই ক্ষোভও একই নির্বাচনে NDA-র ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ ২০২৯-এর একসঙ্গে নির্বাচন বিজেপির জন্য যেমন বড় সুযোগ, তেমনই বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখনও সংসদীয় যৌথ কমিটি One Nation One Election সংক্রান্ত বিলগুলি নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা করছে। কমিটির চেয়ারম্যান পি পি চৌধুরীও বলেছেন, ২০২৯-এ নির্বাচন এগিয়ে আনার বিষয়টি কমিটির ম্যান্ডেটের বাইরে এবং NDA-র মুখ্যমন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের বিষয়। ফলে ২০২৯-এর পরিকল্পনাকে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে রাজনৈতিক বার্তাটি যথেষ্ট স্পষ্ট। ২০৩৪ থেকে ২০২৯-এ নির্বাচন এগিয়ে আনার চিন্তা বাস্তবে পরিণত হলে ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ তখন শুধু ভোটের তারিখ বদলাবে না—বিধানসভার মেয়াদ, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, রাজনৈতিক দলগুলির কৌশল এবং ভোটারদের সামনে জাতীয় ও রাজ্য ইস্যুর সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়বে।

তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিজেপি সরকার নিজেদের সরকার ফেলে দেবে কি না—এটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে ২২টি NDA-শাসিত রাজ্যের নির্বাচন একসঙ্গে করার জন্য বিজেপি এবং তার শরিকরা নিজেদের রাজনৈতিক সরকারের মেয়াদ কমানোর ঝুঁকি নিতে কতটা প্রস্তুত?

One Nation One Election যদি ২০২৯-এই বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তাহলে সেটি শুধু একটি নির্বাচনী সংস্কার হবে না। এটি হতে পারে ভারতের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় বিজেপির জন্য যেমন বড় রাজনৈতিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনই রয়েছে বড় ঝুঁকিও।

এখন নজর তাই সংসদের যৌথ কমিটির রিপোর্টের দিকে, NDA-র মুখ্যমন্ত্রীদের অবস্থানের দিকে এবং সবচেয়ে বড় করে—২০২৯-এর রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত